এক_আকাশ_ভালোবাসি শেষ_পর্ব (শেষাংশ)

এক_আকাশ_ভালোবাসি
শেষ_পর্ব (শেষাংশ)
#নিশাত_জাহান_নিশি

রূপ মলিন হেসে মুহিত আর ওর মেয়েকে ঝাপটে ধরল।



”’

দীর্ঘ দশ বছর পর,,,,,,

একজন মহিলা রাগে কটকট করতে করতে এক্টা ছোট ছেলের হাত ধরে রূপদের বাড়ির ড্রইং রুমে ঢুকে পড়ল। উনার বাম হাতে স্কুলের ব্যাগ আর ডান হাতে বাচ্চা ছেলেটা। ছেলেটা একনাগাড়ে চোখ কচলাচ্ছে আর কাঁদছে। মহিলাটি ছোট ছেলেটার দিকে একবার তাকিয়ে জোরে চেঁচিয়ে ড্রইং রুমের এদিক সেদিক তাকিয়ে বলল,,,,,,,,,

—–“বাড়িতে কি কেউ নেই? রূপ আপনি কোথায়? আপনার গুনধর মেয়ে কি করেছে এক্টু শুনে যান।”

মহিলার গলার আওয়াজ পেয়ে মারু কিচেন রুম থেকে দৌঁড়ে এলো। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মারু বেশ ব্যস্ত ভঙ্গিতে মহিলাটির মুখোমুখি দাঁড়ালো। মলিন হেসে মারু মহিলাটিকে দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,,

—–“কি হয়েছে শালিনী?”

মিসেস শালিনী কিছু বলার আগেই বাচ্চাটা কেঁদে কেটে বলে উঠল,,,,,,,

—–“আম্মু আম্মু। এই আন্টির ছেলে ইয়াদ ও আমাকে মেরেছে। রোশনী আর ইয়াদ মিলে আমাকে খুব মেরেছে।”

মারু মুহূর্তেই ভ্রু যুগল কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,,

—–“কি বললে অথৈ? রোশনী আর ইয়াদ তোমাকে মেরেছে?”

—–“হুম আন্টি। ওরা আমাকে খুব মেরেছে।”

মিসেস শালিনী মারুর দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,,

—–‘দেখলেন তো ভাবী। ওরা দুই ভাই বোন মিলে আমার ছেলেটাকে কিভাবে মেরেছে? আমি কিন্তু এর বিচার চাই ভাবী। প্লিজ আপনি বাচ্চাদের সহ রূপকে ডেকে আনুন।”

মারু মলিন হেসে শালিনীর দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,

—–‘আমার ছেলে মেয়েরা কিন্তু অকারনে কাউকে মারে না ভাবী। নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিলো। যাই হোক আমি ওদের ডেকে দিচ্ছি। আপনারা বসুন।”

মারু সিঁড়ি বেয়ে রূপদের রুমের দিকে পা বাড়াচ্ছে। এক্টা পুচকো ছেলে উপর তলার রুম থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে নিচের সব কর্মকান্ড দেখছিলো। তাৎক্ষনিক ছেলেটা দৌঁড়ে স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়ালো। স্টাডি রুমে ঢুকেই ছেলেটা পড়ার টেবিলে বসে থাকা রোশনী আর ইয়াদকে উদ্দেশ্য করে জোরে চেঁচিয়ে বলল,,,,,,,

——“ভাইয়া, আপু তোমরা দুজনই লুকিয়ে পড়ো। অথৈ ভাইয়া শালিনী আন্টিকে নিয়ে বাড়ি বয়ে বিচার দিতে এসেছে। বড় চাচী মনির কাছে তোমাদের নামে নালিশ দিয়েছে। রূপ মনির কানে কথাটা গেলেই উনি তোমাদের দুজনকে মেরে ভর্তা করে ফেলবে।’

ইয়াদ কয়েকটা শুকনো ঢোক গিলে রোশনীর দিকে তাকালো। রোশনী পুচকে ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে মিনমিন করে বলল,,,,,,

—–“এই সুবাহ। তুই ও রুমে ঢুকে পড়। চল তিনজন মিলে লুকিয়ে পড়ি। সবাই ভাববে আমরা তিনজনই বাইরে খেলতে গেছি।”

সুবাহ তাড়াহুড়ো করে রুমে ঢুকে পড়ল। তিনজনই স্টাডি রুমের টেবিলের নিচে ঘাপটি মেরে বসে পড়ল। কেউ এক্টা টু শব্দ ও করছে না। রোশনী মুখে হাত দিয়ে খুব মিনমিন করে ইয়াদ আর সুবাহকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,,,,

—–“ইসসস দাদাভাই ও আজ বাড়িতে নেই। আমাদের কে বাঁচাবে বল তো? আমি সিউর আম্মু আজ আমাদের খুঁজে বের করে খুব মারবে।”

রোশনী মুখে এক্টা ভেংচি কেটে আবার বলল,,,,,,

—-“ধ্যাত এটা কোনো ব্যাপার ই না। বাবাই এলেই আমি আম্মুর নামে নালিশ দিবো। দেখবে বাবাই আম্মুকে খুব বকবে।”

ইয়াদ রোশনীর মাথায় গাড্ডা মেরে বলল,,,,,,,

—–“এই তুই চুপ থাক। বেশি পাকাস না। ধরা খেলে রক্ষে থাকবে না।”

রোশনী ইয়াদকে ভেংচি কেটে সুবাহকে ঝাপটে ধরে বলল,,,,,,,

—-“তুই হচ্ছিস আমার লক্ষি ভাই বুঝেছিস? তুই না একদম আদ্রিতা চাচীমনির মতো হয়েছিস। খুব শান্ত শিষ্ট।”

বিনিময়ে সুবাহ মুচকি হেসে রোশনীকে ঝাপটে ধরল। ইয়াদ কোঁমড়ে হাত দিয়ে রোশনীর বেনুনি টেনে বলল,,,,,,

—–“তার মানে আমি অশান্ত? তুই এটাই মিন করতে চাইছিস?”

রোশনী নাক, মুখ কুঁচকে ইয়াদের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,,

—–“আমি কিছুই মিন করতে চাইছি না ভাইয়া। প্লিজ চুপ করো। নয়তো আমরা ধরা পড়ে যাবো।”

রোশনীর কথায় সবাই চুপ হয়ে গেলো। নিশব্দে সবাই টেবিলের তলায় থম মেরে বসে আছে।

,
,,
,,,

মারু রূপের রুমে ঢুকে এদিক সেদিক তাকিয়ে রূপকে খুঁজছে। বেডের উপর রূপের দুই বছরের ছেলে রনিত হাত, পা ছুড়ে খেলছে আর খিলখিল করে হাসছে। ওয়াশরুম থেকে পানি ছাড়ার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। মারু বেশ বুঝতে পেরেছে রূপ ওয়াশরুমে আছে। রনিতের পাশে বসে মারু রনিতের চোখে, মুখে চুমো খেয়ে রনিতের সাথে আহ্লাদি স্বরে নানা রকমের কথা বলছে। আর রনিত বাবুটা খিলখিল করে হাসছে। এমন সময় রূপ ও ওয়াশরুম থেকে বের হলো। হাতে নিয়ে এক বালতি কাপড়, চোপড়। সবই মুহিতের পড়নের শার্ট, প্যান্ট। এক সপ্তাহের জামা কাপড় ভিজিয়ে রেখেছিলো। আজ অনেক সময় নিয়ে ধুঁতে হলো।

কাপড়ের বালতিটা রূপ ওয়াশরুমের দরজার সামনে রেখে মারুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,,,,,,

—–“কি রে কি হয়েছে? নিচ থেকে কারো গলার আওয়াজ শুনছিলাম। কে এসেছে বল তো?”

মারু বসা থেকে উঠে রূপের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,

—–“আমার ছেলে আর তোর মেয়ে মিলে অথৈকে খুব মেরেছে। শালিনী নালিশ নিয়ে এসেছে।”

রূপ ভ্রু কুঁচকে বলল,,,,,,,

—–“ওয়েট ওয়েট। ইয়াদ আর রোশনী তো এমন না। কারন ছাড়া কারো গাঁয়ে হাত তুলে না। নিশ্চয়ই অথৈ কিছু করেছে তাই তো অথৈকে ওরা মেরেছে।”

—–“হুম তাই তো বলছি। নিচে চল। সত্যি টা আগে জানি। ছেলে মেয়ে দুটোকে খুঁজতে হবে। সুবাহ টাকে ও অনেকক্ষন ধরে দেখছি না। আদ্রিতা কিচেন রুমে খেঁটে মরছে। সুবাহ র খোঁজ নিতে পারছে না। আমরা মনে হয় ওরা তিন ভাই বোন খেলতে গেছে!”

রূপ রনিতকে কোলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াচ্ছে আর বলছে,,,,,,,,,

—–“নিশ্চয়ই পাঁজি তিনটে বাবার রুমে আছে নয়তো স্টাডি রুমে ঘাপটি মেরে বসে আছে। দাঁড়া আমি খুঁজে আনছি।”

মারু ও রূপের পিছু পিছু ছুটল। রূপ আর মারু প্রথমে সানোয়ার আহমেদের রুমটা সার্চ করল। কাউকে কোথাও না পেয়ে ওরা এবার স্টাডি রুমে ঢুকে টেবিলের তলায় চোখ রাখতেই তিন চোরকে দেখতে পেলো। তিনজনই হাঁটু ভাজ করে হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে বসে আছে। রূপ এক্টু ঝুঁকে এক হাতে রোশনীর কান টেনে বলল,,,,,,,

—–“রোশনী তাড়াতাড়ি টেবিলের তলা থেকে বের হও বলছি। তোমার ভাইকে নিয়ে আমি ঝুঁকতে পারছি না। রনিত কিন্তু আমার কোলে আছে।”

মারু ও এক এক করে ইয়াদ আর সুবাহর কান টেনে টেবিলের তলা থেকে বের করল। তিনজনই টেবিলের তলা থেকে বের হয়ে প্যাচ প্যাচ করে কাঁদছে। রূপ রোশনীর কান ছেড়ে রাগী চোখে তিন ভাই বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,,

—–“তোমরা তিনজনই এখন আমাদের সাথে নিচে যাবে। অথৈকে মারার মূল কারনটা সবাইকে বলবে। বুঝেছ?”

ইয়াদ আর রোশনী মাথা নাঁড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালো। সবাই এক এক করে রুম থেকে বের হয়ে নিচে চলে গেলো। মিসেস শালিনী এখনো একই ভাবে উনার ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রূপ, মারু আর বাচ্চাদের দেখার সাথে সাথেই উনি চেঁচিয়ে বলে উঠল,,,,,,,,

—–“আজ কিন্তু আপনাদের সঠিক বিচার করতেই হবে ভাবী। আপনাদের ছেলে মেয়েরা অকারনে আমার ছেলেকে মেরেছে।”

অথৈ আবার ন্যাকা কান্না জুড়ে দিলো। রোশনী কাঁদতে কাঁদতে রূপের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,

—–“আম্মু বিশ্বাস করো আমি আর ইয়াদ ভাইয়া অকারনে অথৈ কে মারি নি। অথৈ আমার দাদুর দেওয়া আংটি টা নিয়ে খুব টানাটানি করছিলো। আমার দাদু তো খুব ব্যাথা পাচ্ছিলো বলো। আংটি টা তো আমার দাদুর দেওয়া শেষ স্মৃতি। আমি খুব আগলে রাখি আংটি টাকে। আংটি টাকে কেউ টাচ করলেই আমার খুব কষ্ট হয়। মনে হয় আমার দাদুকে কেউ নিয়ে যাচ্ছে। আংটি টা আমার সাথে থাকলে মনে হয় দাদু আমার সাথে আছে। আমি বার বার করে অথৈ কে বারন করেছি আমার আংটি টা না ধরতে। সে কিছুতেই শুনতে চাইছিলো না। আংটি টা আমার হাত থেকে খুলে নিয়েছিলো। তাই তো আমি রাগ করে অথৈ কে চড় মেরে ছিলাম। আমি কাঁদছিলাম বলে ইয়াদ ভাইয়া কষ্ট পাচ্ছিলো। তাই ইয়াদ ভাইয়া ও তেড়ে এসে অথৈ কে চড় মেরে দেয়।”

কথা গুলো বলেই রোশনী হেচকি তুলে কেঁদে অথৈ এর হাত ধরে বলল,,,,,,,,

—–“আমাকে মাফ করে দাও অথৈ। আমি কিন্তু তোমাকে অকারণে মারি নি। আমার দাদুকে আঘাত করেছ বলে আমি তোমাকে মেরেছি। জানো, এই আংটি টা আমার দাদু আমাকে দিয়ে গেছে। বলেছে সবসময় হাতে পড়ে থাকতে। সবসময় আগলে রাখতে। আমি যখন এক্টু এক্টু করে বড় হচ্ছিলাম তখন আংটি টা আমার আঙ্গুলে জায়গা হতো না। তখন বাবাই এই আংটি টাকে আরো এক্টু বাড়িয়ে নতুন করে গড়ে দেয়। এরপর থেকে আমি খুব ইজিলি আংটি টাকে পড়তে পারি। এই আংটি টাতে আমার দাদুর ছোঁয়া আছে। এর মাধ্যমেই আমি আমার দাদুকে সবসময় ফিল করি। আমি আমার দাদুকে কখনো সামনে থেকে দেখি নি তো, তাই আংটি টা দেখেই দাদুকে ফিল করি।”

রোশনীর কথা শুনে উপস্থিত সবার চোখে জল চলে এলো। ছোট রনিত ও খুব জোরে কান্না জুড়ে দিলো। বাচ্চাদের সাথে ফেরেশতা আছে বলেই হয়তো ওরা সবকিছু বুঝতে পারে। রূপ চোখের জল ছেড়ে রোশনীকে ঝাপটে ধরে বলল,,,,,,,

—–“কেঁদো না মা। নয়তো তোমার দাদু খুব কষ্ট পাবে। তুমি তোমার দাদুর খুব আদরের নাতনী। তুমি কাঁদলে তোমার দাদু মোটে ও ভালো থাকবে না।”

মিসেস শালিনী চোখের জল মুছে রোশনীর কপালে চুমো খেয়ে বলল,,,,,,,

—–“আল্লাহ্ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুক মা। তোমার দাদু খুব লাকী। কারন উনি তোমার মতো একজন নাতনী পেয়েছে। তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই মা। আমার ছেলে আর কখনো তোমার আংটি তে টাচ করবে না।”

অথৈ রোশনীকে জড়িয়ে ধরে বলল,,,,,,

—–“কেঁদো না রোশনী। আমি তোমাকে আর কক্ষনো হার্ট করব না।”

রোশনীকে ছেড়ে অথৈ ওর মা কে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলো। ইয়াদ আর সুবাহ এসে রোশনীকে জড়িয়ে ধরে ওদের দাদুর জন্য অনেকক্ষন কান্না কাটি করে উপরে চলে গেলো। আদ্রিতা কিচেন রুম থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছে আর চোখের জল ছাড়ছে। এতোটা বছরে ও কেউ মায়া আহমেদকে ভুলতে পারে নি। সবাই উনাকে দারুনভাবে মিস করে।

এর মধ্যেই বাড়ির ল্যান্ডলাইনে কল বেজে উঠল। মারু দৌঁড়ে গিয়ে কলটা পিক করল। প্রায় দশ মিনিট পর মারু কলটা কেটে হাসি মুখে রূপকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,,,,,,

—–“চাচীমনি কল করেছে। সানায়ার মেয়ে হয়েছে।”

মারু দৌঁড়ে গিয়ে খবরটা আদ্রিতাকে ও দিয়ে এলো। ওরা তিন জা মিলে খুশিতে হাসাহাসি করছে। বিগত নয় বছর পর সানায়ার প্রথম বাচ্চা জন্ম নিলো। কোনো এক্টা সমস্যার কারনে সানায়ার কনসিভ করতে এতোটা লেইট হয়ে গেলো। দোলার টুইন বেবি হয়েছে। দুজনেরই সাত বছর বয়স।

,
,,
,,,

ঘড়িতে রাত দশটা। বাড়ির পুরুষরা অফিস থেকে মাএ বাড়ি ফিরেছে। সবাই হসপিটাল থেকে সানায়া এবং,ওর বাবুকে দেখে একেবারে বাড়ি ফিরেছে। মৃন্ময় রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ইয়াদের সাথে খুনশুটিতে লেগে পড়ল। মারু খুব ব্যস্ত হয়ে কাবার্ড গুছাচ্ছে।

মুহিত রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে রনিতকে কোলে নিয়ে পাশে শুয়ে থাকা রোশনীর মাথায় হাত বুলাচ্ছে। দুই ছেলে মেয়ের সাথেই সে খুব আহ্লাদি স্বরে নানা রকমের কথা বলছে। রোশনী কিছুক্ষন পর মুহিতের কাঁধে উঠে যাচ্ছে। মুহিত হাসি হাসি মুখে মেয়ের গাল টেনে দিচ্ছে। রূপ কিচেন রুমে ব্যস্ত। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। আদ্রিতা ও রূপের সাথে কাজ করছে। সাকিব রুমে ঢুকে সুবাহকে নিয়ে পড়েছে। সুবাহ সাকিবের কাঁধে উঠে ঘোড়া ঘোড়া খেলছে। সানোয়ার আহমেদ রুমে ঢুকে এক্টা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়ালে ঝুলানো মায়া আহমেদের ছবিটার দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল,,,,,,,,,

—–“কেমন আছো মায়া? কতো দিন তোমাকে দেখি না বলো? তোমার ছবির সাথে কথা বলতে বলতে প্রায় ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমার জীবনে দু দুটো প্রেম এসে ধরা দিয়েছিলো। এক্টা যৌবনে আর এক্টা বার্ধক্যে। কোনো প্রেম ই আমার জীবনে স্থায়ী হলো না। সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। আমি পুরো একা হয়ে গেলাম মায়া। একাকিত্বের জীবন আমার আর ভালো লাগছে না। উপর ওয়ালা কেনো যে আমাকে তুলে নিচ্ছে না।”

কথাগুলো বলেই সানোয়ার আহমেদ ইজি চেয়ারে বসে পড়ল। পিছন থেকে রোশনী কোঁমড়ে হাত দিয়ে তেঁড়ে এসে সানোয়ার আহমেদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,,,,,,,,

—–“এই এই…… তুমি কোন দিক থেকে একা বলো তো? এই যে আমার মতো সুন্দুরী রাজ রানীকে তোমার চোখে লাগে না? দেখো দেখো আমি তোমার দু দুটো বউয়ের চেয়ে ও ডাবল সুন্দুরী। আমাকে বিয়ে করে নাও। তবে তোমাকে আর একা থাকতে হবে না। আমি সারাক্ষন তোমার পাশে থাকব। তোমার সেবা যত্ন করব।”

সানোয়ার আহমেদ হু হা করে হেসে রোশনীর গাল টেনে বলল,,,,,,,

—–“তাহলে চলো। আমরা কালই বিয়ে করে নেই।”

—–“হুম করব তো। আগে তো আমার দাদুর মৃত্যুবার্ষিকি টা করে নেই। আমি আর ইয়াদ ভাইয়া মিলে কোরআন খতম দিয়েছি দাদুর নামে। কাল তো দাদুর মৃত্যুবার্ষিকী বলো? আব্বু আর চাচ্চুরা মিলে ড্রইং রুমে এসব নিয়ে আলোচনা করছে। সুপ্রিয়া দাদু আর মায়া দাদুর একদিনেই মৃত্যুবার্ষিকি। তাই আব্বু বলছে কাল এতিমখানার বাচ্চাদের খাইয়ে দিবে। আর আমাকে বলেছে তোমাকে নিচে নিয়ে যেতে। তাই তো আমি এক ছুটর তোমার কাছে চলে এলাম।”

সানোয়ার আহমেদ এক্টা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রোশনীর হাত ধরে নিচে নেমে এলো। সানোয়ার আহমেদকে সোফায় বসিয়ে মুহিত সানোয়ার আহমেদের হাঁটুতে মাথা রেখে বলল,,,,,,,,

—–“আব্বু…..আগামীকাল আমার দুই মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা সবাই চাইছি এতিমখানায় বড় করে এক্টা খাবারের অনুষ্ঠান করতে। যা আমরা প্রতি বছরি করে থাকি।”

সানোয়ার আহমেদ মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,

—–“হুম তাই করো।”

রাতে সবাই ডিনার সেরে সবাই যে যার রুমে চলে গেলো। ইয়াদ, রোশনী আর সুবাহ তিন ভাই বোন মিলে ছোট্ট এক্টা রুমে থাকে। তিনজনেরই আলাদা আলাদা তিনটি বেড। রূপ এসে একে একে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে রুমে চলে গেলো। মারু আর আদ্রিতা ওদের পার্টনারদের নিয়ে অলরেডি ঘুমিয়ে পড়েছে। রূপ রুমে ঢুকে ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে দেখল মুহিত ব্যালকনির গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার আকাশের দিকে। রূপ ধীর পায়ে হেঁটে পিছন থেকে মুহিতকে ঝাপটে ধরল। মুহিত মলিন হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,,,

—–“রূপ…… জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না তাই না?”

—–“না মুহিত। জীবন তার নিজস্ব গতিতেই চলমান।”

—–“হুম। তাই তো আমরা আপন জনদের ছাড়াই সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছি। জীবনটা অবলীলায় পাড় হয়ে যাচ্ছে। পিছে রয়ে গেছে কিছু আপন মানুষের রেখে যাওয়া হাজার হাজার স্মৃতি। যে স্মৃতি গুলো রাতের আঁধারে হানা দেয়। রাতের আকাশে তাঁরার মতো মিটমিট করে জ্বলে। ধীরে ধীরে যন্ত্রনা গুলো বুকের মাঝে চেঁপে বসে। কি অসহ্য এ জ্বালা। বুকটাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয়।”

মুহিতের চোখের কোনে জল জমে এলো। চোখের জল গুলো মুছে দিয়ে রূপ মুহিতকে সামনে থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,,,,,,,

—–“আমাদের মা রা ভালো আছে মুহিত। তুমি কেঁদে কেটে ওদের ভালো থাকাটাকে নষ্ট করে দিও না। ওদের নিজেদের মতো করে ভালো থাকতে দাও। কেবল প্রাণ ভরে দো’আ করে তবেই হবে।”

মুহিত খুব জোরে এক্টা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে চোখ জোড়া বুজে রূপকে বুকের মাঝে ঝাপটে ধরে বলল,,,,,,,

—–“ভালোবাসি রূপ। এক আকাশ ভালোবাসি। এভাবেই আজীবন আমার পাশে থেকো।”

—–“আমি ও তোমায় এক আকাশ ভালোবাসি মুহিত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই তোমার পাশে থাকব।”

এর মাঝেই রনিত ঘুম থেকে উঠে কান্না জুড়ে দিলো। রূপ তাড়াহুড়ো করে মুহিতের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে রনিতকে খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মুহিত মা ও ছেলের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে রুম থেকে বের হয়ে সোজা রোশনীদের রুম গেলো। তিন ভাই বোন খুব আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। মুহিত একে একে ইয়াদ, সুবাহর কপালে চুমো খেলো। রোশনীর কপালে চুমো খেয়েই মুহিত হঠাৎ থেমে গেলো। রোশনী মায়া আহমেদের এক্টা ছবিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। চোখের জল ছেড়ে মুহিত মায়া আহমেদের ছবিটাতে এক্টা চুমো খেয়ে রূপের পাশে গিয়ে চুপটি করে শুয়ে পড়ল।

,
,,
,,,

পরের দিন। সবাই খাবার দাবার প্যাক করে এতিম খানায় চলে গেলো। রোশনী রনিতকে কোলে নিয়ে পুরো এতিমখানাটা ঘুড়ে ঘুড়ে দেখছে। রোশনীর পাশে ইয়াদ আর সুবাহ ও আছে। দোলার দুটো টুইন মেয়ে রনিতের হাত ধরে টানছে আর খিলখিল করে হাসছে। মারু, রূপ, মৃন্ময়, মুহিত, সাকিব, আদ্রিতা, দোলা, লিয়েন, সানোয়ার আহমেদ সবাই এতিমখানার ছোট ছোট ছেলেদের খুব আপ্যায়ন করে খাওয়াচ্ছে। পেট ভরে খেতে দিচ্ছে।

রোশনী কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করে রনিতকে কোলে নিয়ে এতিমখানার বাচ্চাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠল,,,,,,,,

—–“তোমার সবাই তৃপ্তি মিটিয়ে খাও কেমন? ভালো করে খেয়ে আমাদের দাদুদের জন্য দো’আ করো। আল্লাহ্ যেনো আমার দাদুদের জান্নাত নসিব করে। ওরা যেনো পরকালে শান্তিতে থাকে। পাশাপাশি আমাদের ভাই বোনদের জন্য ও দো’আ করো। আমরা যেনো সবসময় আমাদের দাদুদের জন্য আল্লাহ্ র কাছে প্রার্থণা করতে পারি। ওদের ভালো থাকার জন্য বেশি বেশি করে আমল করতে পারি।”

এতিমখানার ছেলেরা মাথা নাঁড়িয়ে হ্যাঁ জানালো। উপস্থিত সবাই হাসি মুখে রোশনীর দিকে তাকালো। সানোয়ার আহমেদ রোশনীর কাছে এগিয়ে এসে রোশনীর কপালে চুমো খেয়ে বলল,,,,,

——“দো’আ করি তোকে। যুগ যুগ বেঁচে থাক। আর আমাদের জন্য আমল করে যা। হয়তো আমি ও আর বেশি দিন বাঁচব না। তবে তোদের ভালোবাসায় আমি বেঁচে থাকব। যেমনটা সুপ্রিয়া আর মায়া আছে।”

একে একে মুহিত, মৃন্ময়, রূপ, মারু, সাকিব, আদ্রিতা, দোলা এসে সানোয়ার আহমেদকে ঝাপটে ধরে কেঁদে দিলো। সানোয়ার আহমেদের কথা গুলো ওরা মানতে পারছে না। সানোয়ার আহমেদ সবাইকে শান্তনা দিয়ে বলল,,,,,,

—–“এভাবে ভেঙ্গে পড়িস না তোরা। একদিন সবাইকেই পরকালে পাড়ি জমাতে হবে। হয়তো কেউ আগে, পরে। তবে পৃথিবীর মায়া সবাইকে ত্যাগ করতেই হবে।”

এতিম খানার বাচ্চাদের খাইয়ে পড়িয়ে সবাই বাড়িতে ফিরে গেলো। আবারো জীবনের বিভিন্ন কর্মকান্ডে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সময়ের স্রোতে গাঁ ভাসাতে লাগল। চলে যাচ্ছে জীবন, যে যার জীবনকে যেভাবে নিচ্ছে, জীবনটা ঠিক সেভাবেই চলছে। শুধু মাঝে মাঝে খনিকের জন্য থমকে যেতে হয়। পিছিয়ে পড়া কিছু স্মৃতির মুখো মুখি হতে হয়। যা দুই দিনের জীবনের বেঁচে থাকার সব লড়াইকে ফিকে করে দেয়। জীবনের বেঁচে থাকার সব আয়োজনকে ব্যর্থ করে দেয়।

মুহিত এবং রূপ ওদের জীবনে দারুন খুশি। দুই ছেলে, মেয়েকে নিয়ে খুব হাসি খুশিতেই জীবন কেটে যাচ্ছে। মারু এবং মৃন্ময় ও খুশি। ওদের একমাএ ছেলেকে নিয়ে। তেমনিভাবে, দোলা, লিয়েন, সাকিব, আদ্রিতা, আদনান, সানায়া সবাই খুব খুশি। ওদের খুশি দেখে সানোয়ার আহমেদ ও বেশ খুশি।

মায়া আহমেদ প্রমাণ করে গেলো জীবনের শেষটা কিভাবে সুন্দর করতে হয়। কিভাবে খারাপ দিক গুলো ঝেঁড়ে ফেলে ভালো দিকে নিজকে অগ্রসর করতে হয়। কিভাবে সবার মনে ভালো কাজের মাধ্যমে জায়গা করে নিতে হয়। কথা ই তো আছে,,,,,,

—–“শেষ ভালো যার। সব ভালো তার!”

——————————সমাপ্ত————————

(গল্পটা যদি সত্যিই পাঠক/পাঠিকাদের ভালো লেগে থাকে, তবে আপনাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে ভুলবেন না। অন্তত দু, এক লাইন গঠনমূলক মন্তব্য করে যাবেন। আজ সবার কমেন্টের রিপ্লাই দিবো। শেষ পর্যন্ত গল্পটার পাশে থাকার জন্য আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন সবাই। আল্লাহ্ হাফেজ।)

"এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে। আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার। আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন "

Golper Sohor
গল্পের শহরhttps://golpershohor.com
গল্পের শহরে আপনাকে স্বাগতম......... গল্পপোকা ডট কম কতৃক সৃষ্ট গল্পের অনলাইন প্লাটফরম

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Articles

error: ©গল্পেরশহর ডট কম