Home "ধারাবাহিক গল্প" কিং অব দ্য ডার্ক কিং_অব_দ্য_ডার্ক (পর্ব :২৫ অন্তিম)

কিং_অব_দ্য_ডার্ক (পর্ব :২৫ অন্তিম)

কিং_অব_দ্য_ডার্ক (পর্ব :২৫ অন্তিম)
লেখক :শিহাব_শাহরিয়ার

সময়টা হয়তো মধ্যাহ্ন। কারণ সূর্য এখন মাথার উপরে। রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে পুরো ডার্ক ওয়াল্ডকে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে। দালানের প্রতিটি পাথর চিকচিক করছে।গাছপালাগুলো আবার সতেজ হয়ে উঠেছে। প্রাসাদ প্রাঙ্গণের বাগান গাছ গুলোতেও ফুল ফুটতে শুরু করেছে।পুরো রাজ্য যেন নতুনত্ব ফিরে পেয়েছে। এমন একটা সময়কে আরো সৌন্দর্যময় করে তুলতে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। সব গাছপালাসহ পুরো রাজ্যের প্রত্যেকটা জিনিসকে ভিজিয়ে দিলো।কিন্তু কোনো টাইটানকে বাইরে দেখা গেলো না।কারণ তারা সবাই ভোজনালয়ে। মানুষদের হয়তো একটু বেশিই বিশ্বাস করে টাইটানরা।এরিসরা একটু চেষ্টা করতেই তাদের সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে এটা ফ্যারাডের কাজ ছিল না।ছিল তার পুত্র ক্যালভিনের।যে এখন আর বেঁচে নেই। কিন্তু বেচারা ফ্যারাডে কিছুই বুঝতে পারছে না। সে পাগলের মতো তার ছেলেকে খুঁজছে।ক্যালভিন অন্য এক গ্রহে গেছে বলে ফ্যারাডেকে শান্ত রেখেছে ওই দানবীয় লোকরা।তাদের উপর খুব সহজেই বিশ্বাস করবে ফ্যারাডে কারণ তারা দু’জন এই রাজ্যের আলোচনা সভার প্রদান সহকারী। সব কিছুই একটা দুঃস্বপ্নের মতো লাগবে ফ্যারাডের কাছে।ওই প্রথম দেখা দানবাকৃতির লোকটা তো এই কথাই বলল। বিশাল আকারের একটি উৎসব রেখেছে ফ্যারাডে।এরিসদের দেখে সে প্রথমে অবাক হলেও পরে যখন ওই দানবাকৃতির লোকটার কাছে শুনলো তাদেরকে এখানে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হয়েছে তখন আর কিছুই বলল না ফ্যারাডে। মূলত এরিসদের জন্যই এই উৎসব রাখা হয়েছে।ক্রিস্টিন আর জেরিনের জ্ঞান ইতিমধ্যে ফিরিয়ে এনেছে এরিস ও নীলয়।তারা দু’জন জানালো তাদের সাথে কিছু করার সুযোগ পায় নি ওই শয়তান।কমসেকম তাদের সজ্ঞানে তো না। তারা সবাই খুশি থাকলেও নীলয় একদম খুশি নয়। কারণটা নীলয় ছাড়া আর কেও জানে না।অবশ্য ওই লোকটা জানে যে তাকে সবকিছু বলেছিল। নীলয় নিজেই বুঝতে পারছে না সে আসলে কি? একটি নেকড়ে, না টাইটান, না একজন মানুষ? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হয়রান নীলয়। তবে সে বেশিক্ষণ যাবৎ মন খারাপ করে বসে থাকতে পারছে না। কারণ ক্রিস্টিন আর জেরিনকে সমস্ত কাহানী খুলে বলতে হচ্ছে। তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে পাঁচটা কামরা।তবে কেও নিজ নিজ কামরায় নেই।সবাই একত্রিত হয়ে খোশগল্প করছে।ফ্যারাডে বলেছিল সে খুব শীঘ্রই তাদের সাথে দেখা করতে আসবে।কিন্তু কিছুক্ষণ পর খবর আসলো ফ্যারাডে তাদের সাথে এখন দেখা করবে না।সন্ধ্যার পর ভোজনালয়ে দেখা করবে। সূর্য উদয়ের পর বাইরে বের হয়েছিল ইথানরা। এই আলো তাদের শরীরে কোনো ক্ষতি করে নি।সূর্যটা তাদের কাছে কেমন কৃত্রিম লাগছে।এখানেই থাকার ইচ্ছা পোষণ করলো ইথান কিন্তু ফিরে না গিয়ে যে উপায় নেই। তবে হাজারও খুশির মধ্যে তারা একজনের অনুপস্থিতি খুব অনুভব করছে। আর সে হলো মির্জা। মির্জার শরীরটা পর্যন্ত তারা দেখতে পায় নি। জেলখানায় তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায় নি। ভাগ্যকে মেনে নিল সবাই। সন্ধ্যার পর এরিসদের ডাক পড়লো। এক প্রহরী আসলো তাদের নিয়ে যেতে। সকলে কামরা ত্যাগ করে প্রহরীটির পিছু নিলো।এতো দিন এখানে কোনো প্রহরী ছিল না।কিন্তু আজ আবার যেন সব আগের মতো ঠিক হয়ে গেছে।এতো দিন এই প্রহরীদের ক্যালভিন কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল তা ভেবেও পেলো না কেও।কিন্তু এটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা নয়।এর থেকেও বড় একটি দুঃশ্চিন্তা বাসা বেঁধেছে এরিসদের মনে। যদি ফ্যারাডে কখনো জেনে যায় এগুলো শুধু স্বপ্ন নয় বাস্তব ছিল,তাহলে সে কি করবে? এই প্রশ্নটা কাওকে করতে পারলে যেন মন হাল্কা হতো নীলয়ের।কিন্তু প্রশ্ন করার মতো এখানে না আছে পরিবেশ না আছে কোনো লোক। এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে চুপচাপ সবার সাথে হাটতে লাগলো নীলয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা এসে পৌঁছে গেলো ভোজনালয়ের দরজার সামনে।তাদেরকে দরজার সামনেই দাঁড় করিয়ে রেখে পাহারাদারের মতো একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রহরীটি। তার আচরণে বেশ অবাক হলো সবাই।ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারা কেও বুঝতে পারছে না দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে কি না। ভিতর থেকে হৈহল্লার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে।অনেক দিন পর যেনো তারা কোনো উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে। ফ্যারাডের মধ্যেও কোনো চিন্তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। টাইটানরা ভাবছে, ক্যালভিনের করা সকল অপকর্ম জেনে গেছে ফ্যারাডে। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে কিছু বলছে না। অপরদিকে ফ্যারাডে ভাবছে, তার ছেলে কোন গ্রহে গেছে, তাকে তো কিছুই জানিয়ে যায় নি।তাছাড়া সে কখন গেছে, কিভাবে গেছে? তারওপর আরেকটি দুঃশ্চিন্তা হলো, ফ্যারাডের দেখা দুঃস্বপ্ন। এমন স্বপ্ন আগে কোনো দিনও দেখে নি ফ্যারাডে। সব কিছু যেন সত্যি মনে হচ্ছিল। কিন্তু স্বপ্নের সব কিছু তার ঠিক মনে নেই। কিছু কিছু চিত্র শুধু মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে দরজায় প্রথমে পা রাখলো নীলয়।তারপর বাকি সবাই তার পিছনে ঢুকলো।এরিস এসে তার একপাশে দাঁড়ালো। চারিপাশে চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগলো তারা। অনেক বড় একটি কামরা। কামরায় কমপক্ষে শতটা টেবিল আছে। একেক টেবিলে ছয়টি চেয়ার। সব টেবিলই পূর্ণ। সবাই বসে আছে আর তাদের সামনে রাখা নানান রঙের খাবার খেয়ে হৈ-হল্লা হাসিঠাট্টা করছে। একেক টেবিলের জন্য একেকজন লোক বরাদ্দ আছে।তারা খাবার পরিবেশন করছে। হঠাৎ করে কেও একজন এসে ঝাপটে ধরলো এরিসকে। ডান-বাম থেকে চোখ সরিয়ে নিজের বুকে যেই লোক আছে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো সে। কয়েকপা পিছিয়ে গেলো সেই লোকটা। হতবুদ্ধির মতো ড্যাবড্যাব করে এরিসদের দিকে তাকিয়ে থাকলো সে। লোকটার চেহারা দেখতেই খুশিতে আপ্লুত হয়ে আবার লোকটাকে জড়িয়ে ধরলো এরিস। তার কানে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“মির্জা তুমি বেঁচে আছ?” এরিসের কণ্ঠে কান্নার কিছুটা আভাস পেলো মির্জা। মুচকি হাসি দিয়ে সে বলে উঠল,
“ওই লোকটা না বাঁচালে হয়তো আমি আর পৃথিবীর আলো দেখতে পেতাম না”, বলতে বলতে এরিস থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নিল মির্জা।তারপর চোখ তুলে সবার দিকে তাকালো। সবাই যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে। খুশিতে আত্মহারা সকলেই।পুরনো বন্ধু আবার ফিরে পেলে কে না খুশি হয়। একে একে সবার সাথে আবারও মোলাকাত করে নিলো মির্জা। তখনই দেখা গেলো ওই জেলখানার লোকটাকে।ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। তাদের সামনে এসে সে বলে উঠল,
“ক্ষমা করবেন।অনেক দিন ধরে সকল চিকিৎসক বন্দী ছিল তো, তাই চিকিৎসা করতে একটু সময় লাগলো”। এরিস গিয়ে লোকটাকে গলা জড়িয়ে ধরতে চাইল কিন্তু তার উচ্চতায় তা করতে দিলো না। মুচকি হেসে কিছুটা মাথা ঝুঁকিয়ে দিলো লোকটা। এইবার এরিস লোকটাকে জড়িয়ে ধরে শুকরিয়া আদায় করলো। লোকটা তাদের সকলকে সামনের দিকে হাটতে বলল।লোকটার পিছু নিলো তারা।কেও যেন তাদেরকে চোখেও দেখছে না। নিজেদের হাসিঠাট্টা নিয়ে ব্যস্ত তারা সবাই। অথচ এরিসরাই তাদের রাজ্যকে বাঁচালো। লোকটা এরিসদেরকে নিয়ে এলো কামরার সর্বশেষ মাথায়।সেখানে আছে একটি বিশাল আকারের টেবিল। সবার জন্য একেকটি চেয়ার আছে। তারচেয়ে বড় কথা হলো সবার সামনে বসা আছে ফ্যারাডে। সবাই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলো। এরিসের পাশে বসেছে নীলয়।আর তাদের বিপরীত পাশে পাশাপাশি বসেছে জেরিন আর ক্রিস্টিন।বাকি সবাই দুইপাশে ভাগ করে বসেছে। ফ্যারাডের আদেশে সবাই খাওয়া শুরু করলো। নানান রঙের খাবারের উপর ঝাপিয়ে পড়লো তৌহিদ। রহিম চাচার বয়সটা একটু বেশি হওয়ায় উনি এতো কিছু খেতে পারছেন না। কিন্তু নীলয় আর এরিসের মন যেন খাবারে নেই। তারা দু’জন তাকিয়ে আছে তাদের সামনে মাথা নিচু করে বসা অবস্থায় জেরিন আর ক্রিস্টিনের দিকে।নীলয় দুষ্টুমি করে তার পা-টা বাড়িয়ে ক্রিস্টিনের পায়ের উপর নিয়ে রাখল।এমনি যেন তার দিকে চোখ তুলে তাকালো জেরিন। পা সরিয়ে আনলো নীলয়। মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো ক্রিস্টিন। তখনই হাসি বন্ধ করে এরিসের দিকে বড়বড় চোখ দিয়ে তাকালো সে। নীলয় এরিসের কানে কানে বলল,
“ভুল জায়গায় দু’জনে পা দিয়ে ফেলেছি।ভাই তোমারটা তুমি দেখ আর আমারটা আমি”। তাদের সবার কথার মধ্যখানে ফ্যারাডে বলে উঠল,
“আপনাদের দেখে মনে হয় আপনারা পৃথিবীর দেবতা। বিশেষ করে আপনাদের দু’জনকে”, এরিস আর নীলয়ের দিকে আঙুল তুলে বলল ফ্যারাডে। তারপর আবার মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“ক্ষমা করবেন আমাকে তবে আমার একটি প্রশ্ন ছিল।যদি আপনারা মনে কিছু না করেন তাহলে আমি প্রশ্নটা করব”। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো নীলয়।ফ্যারাডে বলে উঠল,
“আমার জানা মতে এই কয়দিন আমি কাওকে দাওয়াত দেই নি। তো আপনাদেরকে……. “, বলতে বলতে থামলো ফ্যারাডে। নীলয়রা বুঝতে পারলো ফ্যারাডে কি বলতে চাইছে। এবার তারা কি উত্তর দেবে। খাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো তৌহিদের। গলা দিয়ে ঢুকছে না কিছুই। ভিতরে ভিতরে ভয় পেলেও মুখে হাসির সাথে সাহসিকতার ছাপ ফুটিয়ে তুলল তারা।তাদের কিছু বলার আগেই ফ্যারাডে হেসে উঠে হাত নেড়ে বলল,
“মনে হয় আমার প্রিয় পুত্র ক্যালভিন আপনাদের দাওয়াত দিয়েছে।কিন্তু আফসোস তার সাথে দেখা করার সুযোগ হলো না।সে অন্য গ্রহে বেড়াতে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে আসবে।আমি হলাম তার পিতা ফ্যারাডে”। ফ্যারাডের সাথে সাথে তারা সকলেও হাসার চেষ্টা করলো। হঠাৎ করে এরিস জিজ্ঞেস করে বসলো,
“আপনার পুরো রাজ্যই আমরা ঘুরে দেখেছি।আপনি হয়তো ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই লোকটা আমাদের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখিয়েছে”, দানবাকৃতির লোকটার দিকে ইশারা করলো এরিস।তারপর আবার বলল,
“মাঠির নিচে আপনার একটি কামরা দেখেছি আমরা।সেখানে অদ্ভুত কিছু চিত্রাঙ্কন ছিল।আমরা কি জানতে পারি সেই চিত্রাঙ্কনগুলো কিসের?”, এরিসের প্রশ্নে হাসলো ফ্যারাডে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলে উঠল,
“এখানের যা কিছু আপনারা দেখছেন সবকিছুই আমার নিজের হাতের গড়া। এমনকি এই চন্দ্র সূর্যও আমি তৈরি করেছি। বলতে পারেন পুরো গ্রহের নির্মাতা আমি নিজেই।আপনারা যে কামরা দেখেছেন সেই কামরার ভিতর আরেকটি কামরা আছে যেখানে আমি ছাড়া কেও প্রবেশ করতে পারে না।ওইটা গোপন কামরা। সেই কামরায় এই জগতের সূর্যের ভাগ্য তৈরি করে রেখেছি আমি। ওই কামরায় আছে অন্ধকার-আলোর তফাৎ,ব্যবধান আর ভাগ্যের লিখন। এই জগতটি যাতে অন্যান্য জগতের মতো স্বাভাবিক থাকে এই জন্য আমি ওই কামরায় বিশেষ কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছি”। এই বলে থামলো ফ্যারাডে। নীলয়দের কাছে এখন সবকিছুই পরিষ্কার। ক্যালভিনের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ছিল অন্ধকারের।তাই সেই তার পিতার দেহ ব্যবহার করে ওই কামরায় ঢুকে পাথরটি নিয়ে আসে। ফলে সব কিছু অন্ধকারে ঢাকা পড়ে। পাথরটি যাতে অন্যকেও খুঁজে না পায় সেজন্য এটা ইওবার্ডের কাছে দিয়ে দেয়। কিন্তু ভাগ্যের জোরে এরিসরা ওই পাথর পাও। তাদের কাছে এই পাথরটি থাকায় ওই দরজা খুলে যায় আর তারা ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ওই মহিলাটির জন্য বেশ কষ্ট লাগছে নীলয়ের। তাদের জন্য নিজের জীবন বলি দিয়েছে ওই লোকটার স্ত্রী। লোকটার জন্যও কষ্ট লাগছে নীলয়ের। নিজের স্ত্রীর জীবন দিয়ে দিয়েছে সে।কিন্তু লোকটা তো বলেছে ওই মহিলা বেঁচে থাকবে। তাও একটি কঙ্কাল হয়ে! নীলয়ের ভাবনার জগতের ছেদ পড়ে ফ্যারাডের কণ্ঠে। ফ্যারাডে বলে উঠে,
“আচ্ছা আমি কি কখনো আপনাদের দু’জনের সাথে লড়াই করেছি?”, ফ্যারাডের এমন প্রশ্নে তার দিকে নীলয়রা এমনভাবে তাকালো যেন তাদেরকে কেও আকাশ থেকে লাথি মেরে মাঠিতে ফেলে দিয়েছে। ফ্যারাডে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে আবার বলল,
“কিছু মনে করবেন না।আসলে আমি একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছি।সেখানে দু’জন ব্যক্তির সাথে আমার লড়াই হয়েছিল। সেই দু’জন ব্যক্তির চেহারা আমার ঠিক মনে পড়ছে না।তারা দু’জন দেখতে কিছুটা আপনাদের মতো হয়তো। তাই জিজ্ঞেস করলাম আরকি।কিছু মনে করবেন না দয়া করে”। ফ্যারাডের কথায় না চাইতেও মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল এরিসরা। মাথা নেড়ে নাবোধক সম্মতি প্রদান করলো তারা।খাবার আর গলা দিয়ে নামলো না কারোরই। তারা বুঝে গেলো এখান থেকে যতদ্রুত সম্ভব প্রস্থান করতে হবে। ফ্যারাডেকে তারা এই বিষয়টা জানালো যে আগামীকাল সকালেই তারা পৃথিবীতে চলে যেতে চায়। ফ্যারাডেও হাসি মুখে তাদের কথা মেনে নিল। নীলয়দের এখন শুধু একটি মাত্র চিন্তা। আর তা হলো কিভাবে এই জগত থেকে বের হওয়া যায়।ভুলেও আর এখানে দ্বিতীয় বার পা রাখার চিন্তা মাথায় আনবে না কেও। যদি কখনো ফ্যারাডে সবকিছু জেনে যায় তাহলে ওইলোকগুলো সবকিছু সামলে নেবে।আপাতত এটাই ভাবছে তারা।
.
.
ইওবার্ডের শাহী কামরায় বসে আছে সবাই। সকল দরজা জানালা বন্ধ কারণ এখন দিন।বাইরে সূর্য তার সর্বোচ্চ আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলো মির্জা আর ইথানের জন্য মোটেও ভালো নয়।তাই তো দরজা জানালা সব বন্ধ।ভোরের সূর্যের আলো ফোটার আগেই তারা ডার্ক ওয়াল্ড থেকে এখানে এসেছে। তাদের সবার চোখ বাঁধা ছিল যার ফলে রাস্তা তারা দেখতে পায় নি।যখন চোখ খোলা হলো তখন একটি পুকুর সামনে দেখলো।সেই পুকুরে ঝাপ দিতেই তারা একটি গুহার নিচের মাঠি ছেঁদ করে উপরে উঠে এলো।সেই গুহা ধরেই তারা নেকড়ে নগরীতে পৌঁছেছে। অনেক রহস্যময় জায়গা ওই রাজ্য। কিন্তু এখন এসব চিন্তা করার সময় নয়। এখন তারা শুনবে এরিসের কাহানী।
.
.
ভ্যাম্পায়ার রাজ্যের সীমান্তের উঁচু প্রাচীরের দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে এরিস। এখন সম্পূর্ণ এলাকা রাতের অন্ধকারে ঢাকা।শুধু দিন হবার অপেক্ষা তার।অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর দিনের আলো ফুটতে শুরু করলো। সকল ভ্যাম্পায়ার সৈন্য প্রাচীরের দ্বার ঘেঁষে তৈরি করা মাচার উপর ছোট ছোট ঘরগুলোতে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখল। সেই ঘরে সূর্যের আলো ঢোকার কোনো রাস্তা নেই। এটাই উত্তম সময় এরিসের জন্য। ডানা বের করে দেয়াল টপকে সে ভিতরে প্রবেশ করলো। চুপিচুপি হেটে প্রাসাদের পিছন দিকে চলে আসলো। ডানা মেলে উঁচু প্রাসাদের সবচেয়ে উপরের কামরার জানালার কাঁচের সামনে দাঁড়ালো সে। এক ঘুষিতে জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলল ।সাথে সাথে নিজের ডানা মেলে ধরলো যাতে করে কামরার ভিতরে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে না পারে।কামরার ভিতরে ঢুকে জানালার পর্দা মেলে দিল। ধীর পায়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হলো সে। বিছানায় চোখ বুঁজে শুয়ে আছে জেরিন।তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো এরিস। জেরিনের নাম ধরে কয়েকবার ডাকার পরও চোখ খুলল না জেরিন। শরীরে হাত দিতে বাধ্য হলো এরিস।বেশ কয়েকবার ধাক্কা দেওয়ার পরও যখন জেরিন কোনো সাড়া দিলো না তখন ভয় পেয়ে গেলো এরিস। জেরিন কব্জিতে হাত ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই আঁতকে উঠল সে। বেঁচে নেই জেরিন..! দুকদম পিছিয়ে গেলো এরিস। মুখে হাত দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো সে। বিছানার পাশে এক বাটিতে তরল জাতীয় কিছু একটার দিকে চোখ গেলো তার। কাঁপা হাতে সেই বাটি তুলে নিলো সে। গন্ধ শুকতেই তার হাত থেকে পিতলের বাটিটি পড়ে গেলো। নিজের মধ্যে যেন নেই এরিস।বিড়বিড়িয়ে বলে উঠল, “বিষ!”
হঠাৎ করে কেও একজন দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো। অশ্রুসিক্ত চোখে তার দিকে তাকালো এরিস। হার্মিস আর যর্ডান দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।তৎক্ষনাৎ জেরিনকে আঁকড়ে ধরে জানালা দিয়ে লাফ দিল সে।হাতে থাকা ধনুক থেকে বেশ কয়েকটা তীর ছুঁড়ল হার্মিস।তা গিয়ে এরিসের ডানায় গেঁথে গেল।আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল এরিস।কিন্তু থামলো না সে। জেরিনের শরীরের যে যে অংশ কাপড় দ্বারা ঢাকা ছিল না সেসকল অংশ নিজের কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলো এরিস।বুকের সাথে জেরিনকে জড়িয়ে ধরে উড়াল দিলো সে। চারবছরের একটি ছেলে আছে যর্ডানের। তার নাম ইথান।হয়তো একমাত্র সেই ব্যক্তি যে এরিসের অনুপস্থিতিঅনুভব করবে।ভাঙা জানালার কাছে গেলো না হার্মিস। ফিরে গেলো সে নিজ কামরায়।
“এরকম মেয়ে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো”, বিড়বিড়িয়ে বলল সে।
.
.
এই পর্যন্ত বলে থামলো এরিস। তার দিকে তাকিয়ে থাকলো সকলে। নীলয় জিজ্ঞেস করলো,
“তারপর কি হলো?” তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো এরিস। মুখের মধ্যে সে হাসি ধরে রেখে সে বলে উঠল,
“এর পরের কাহানী খুবই সংক্ষিপ্ত। একদিকে ভ্যাম্পায়ারদের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মেছিল আর অন্যদিকে মানবদের প্রতি।মানবরা কি করেছিল আমার সাথে তা আমি ভুলতে পারি নি।দুই জাতিকেই শাস্তি দেওয়ার চিন্তা করি আমি।কিন্তু আমার মাথার এরচেয়েও বড় চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল।আর তা হলো জেরিন।জেরিনকে ছাড়া আমি বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।ওইদিকে ভ্যাম্পায়ার নগরীতে হার্মিস ঘোষণা করে দিলো যে আমি তার মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছি।কেও যদি আমাকে দেখতে পায় তাহলে যেন সাথে সাথে হত্যা করার উদ্যোগ নেয়।আমার সামনে কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না।ঠিক তখনই বের হয়ে আসে আমার আসল রূপ। পৃথিবীতে তখন কালোজাদুর চর্চা চলছিল। জেরিনকে বাঁচাতে আমি সেই কালোজাদুর চর্চা শুরু করি।সেই কালোজাদুতে মানুষের রক্তের প্রয়োজন হতো।আমি সেই রক্ত মানুষকে হত্যা করে যোগাড় করতাম। কিন্তু এতোকিছুর পরও আমি জেরিনকে বাঁচাতে পারছিলাম না।তখন আমি ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করি। না….না অবলম্বন না।আমি ভিন্ন পন্থা তৈরি করি।মিশরীয়রা মনে করত তাদের রাজাদের মমি বানিয়ে রাখলে মৃত্যুর পরও তারা জীবিত থাকে। আমিও ঠিক তাদের মতো ভাবতে লাগলাম। জেরিনকে বাঁচাতে হলে তাদের পন্থা অবলম্বন করতে হবে। তারা তাদের রাজার সাথে আরো কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন দিত।আমিও তাই করলাম। কয়েকশো ভ্যাম্পায়ারকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে আসতে লাগলাম।কিন্তু শুধু ভ্যাম্পায়ারই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল না। মানুষের প্রতি আমার যে ক্ষোভ ছিল সেই ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে আমি এক হাজার মানুষকেও হত্যা করলাম।তাদের অর্ধেক আর ভ্যাম্পায়ারদের অর্ধেকের রক্ত মিশ্রিত করে আমি জেরিনের শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর তাকে কফিনে বন্ধ করে ঐ চার্চের মধ্যে দাফন করে দিয়েছিলাম। বাকি যেসকল মানুষ আর ভ্যাম্পায়ার ছিল তাদের অর্ধেকের রক্ত দিয়ে তৈরি করি আমার এই তলোয়ার।আর বাকি অর্ধেকের রক্ত দিয়ে আমি শয়তানের পূজা শুরু করি।যখন আমি দেখলাম আমার মধ্যের অন্ধকার দিক বেড়ে যাচ্ছে তখন আমি এসব থেকে দূরে সরে গেলাম।কিন্তু পারলাম না।আমি বুঝতে পারলাম শয়তান আমাকে তার বসে নিয়ে গেছে।আমার এখন বাঁচার শুধু একটাই রাস্তা। আর তা হলো মৃত্যু। জেরিনকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা এমনিতেই মুশকিল হয়ে পড়েছিল।জেরিন বাঁচবে কি না তা আমি ঠিক জানতাম না। তাই আমি নিজেকেও কফিনে বদ্ধ করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।কিন্তু তার আগে আমার প্রতিশোধ নেয়া বাকি রয়েছিলো। ভ্যাম্পায়ার রাজ্যে হামলা করে আমি সেই প্রতিশোধ নিয়ে নেই। আমার ক্ষমতা তুমি সচক্ষে দেখেছ। ভ্যাম্পায়ারদের হারাতে আমার এত বেশি কষ্ট হয় নি। যখন সকল সৈন্য মারা গিয়ে শুধু হার্মিস আর যর্ডান বাকি রয়েছিল তখন তাদের নিয়ে আমি ওই চার্চে চলে যাই। সেখানেই তাদের দু’জনকে আমি হত্যা করি।কিন্তু সকলে ভাবে হার্মিস আমাকে মারতে গিয়ে শহীদ হয়েছে।কিন্তু আসল কথা হলো আমাকে মারার মতো শক্তি তার কাছে ছিল না।সে আত্মসমর্পণ করেছিল কিন্তু এই আত্মসমর্পণ আমার কাছে কোনো মূল্য রাখে না।আমি হত্যা করি তাদের দু’জনকে সাথে নিজেকেও। কারণ ছিল দুইটা। এক,শয়তান থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে আমাকে নিজেকে হত্যা করতেই হবে।দ্বিতীয়, জেরিন ছাড়া আমার এই দুনিয়ায় কেও ছিল না। যদি আমি আবার বেঁচে উঠি তাহলে জেরিনও উঠবে।সকলে আমাকে অমর ভাবে কিন্তু আসলে আমি তা নই।সকলের মতো আমারও একদিন মৃত্যু হবে।ওইদিন আমাকে কফিন বদ্ধ করে মির্জা।সে সব কিছু জানতো।আমি যে অমর এই কথা সে সকলের মধ্যে প্রচার করেছিল। জেরিনকে যেই জায়গায় দাফন করেছিলাম সেই জায়গা আমি আগে থেকেই মাঠি দ্বারা পূর্ণ করে রেখেছিলাম।যাতে করে কেও বুঝতে না পারে। মির্জা আমার তলোয়ার ওই মূর্তির ভিতর ঢুকিয়ে রেখছিল যেই মূর্তির অবস্থান আমার কবরের পাশেই ছিল।একটি বদ্ধ কামরায়। ওইদিন হার্মিস আর যর্ডানকে চার্চে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইথানসহ সবাই মনে করেছিল আমাকে মারতে গিয়ে মারা গেছে হার্মিস ও তার পুত্র। কিন্তু আসল কাহানী তারা কেও জানে না।তারা কেও জানে না যে ওইখানে যে আমাকে মাঠিতে দাফন করেছিল সে মির্জা ছিল”
.
.
এরিসের কথা শুনে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো নীলয়সহ বাকি সবাই।এমনকি জেরিনও। বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে সবাই। সুন্দর একটা চেহারার আড়ালে এতোবড় একটা শয়তান লুকিয়ে থাকতে পারে তা ভেবেও দেখে নি তারা।কিন্তু এতে এরিসেরও কোনো দোষ নেই। সে যা করেছে তার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য করেছে। সকল দোষ তাদের যারা নিজের অহংকারকে বড় করে দেখে। নিচু শ্রেণির মানুষ যাদের কাছে তুচ্ছ এঁদের এই অবস্থাই হওয়ার ছিল। এরিসের কথা শুনে আর কিছু বলার থাকলো না কারোর।তবে নীলয়ের একটি প্রশ্ন থেকে গেলো। সেই প্রশ্ন ঝট করে সে এরিসকে করে বসলো,
“আচ্ছা ওই পুরনো রাজমহল তুমিই ভেঙেছিলে তাই না?” নীলয়ের প্রশ্নে মুচকি হাসলো এরিস। লম্বা একটি নিশ্বাস ছেড়ে সে বলল,
“এবার ভাবছি এসব থেকে ছুটি নিবো। পৃথিবীতে চলে যাবো ভাবছি।তুমি কি বল?”। খুশি লাফিয়ে উঠল নীলয়। সে বলে উঠল,
“অবশ্য আমার বাসাটা কিন্তু খালিই পড়ে থাকে”। নীলয়ের কথায় মাথা নাড়তে নাড়তে হাসলো এরিস। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরই নেকড়ে রাজ্য ত্যাগ করলো তারা সবাই। ইথান আর মির্জা নিজ রাজ্যে চলে গেলো। জেরিনকে নিয়ে এরিস চলে গেলো নীলয় ক্রিস্টিন,রহিম চাচা ও তৌহিদের সঙ্গে।মানবের মধ্যে স্বাভাবিক জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলো সে।
.
সমাপ্ত
.
. পুরো গল্পটা আপনাদের কাছে কেমন লাগলো তা জানাবেন।আর হ্যাঁ অবশ্যই খারাপ দিক গুলো তুলে খরবেন যাতে করে পরবর্তীতে আর এমন ভুল না হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

ভাবি যখন বউ পর্ব ১৫ ও শেষ

গল্পঃ ভাবি যখন বউ পর্ব ১৫ ও শেষ (জুয়েল) (১৪তম পর্বের পর থেকে) আমি গিয়ে অবন্তীর পাশে বসলাম। অবন্তী আমার কানের কাছে ওর মুখ এনে বললো.... অবন্তীঃ...

ভাবি যখন বউ পর্ব ১৪|রোমান্টিক ভালোবাসার নতুন গল্প

গল্পঃ ভাবি যখন বউ পর্ব ১৪ (জুয়েল) (১৩তম পর্বের পর থেকে) বিকালবেলা অবন্তীকে কল দিলাম, কিছুক্ষণ পর অবন্তী কল ধরলো.... আমিঃ ওই কল ধরতে এতো দেরি করো...

ভাবি যখন বউ পর্ব ১৩|ভালোবাসার রোমান্টিক নতুন গল্প

গল্পঃ ভাবি যখন বউ পর্ব ১৩ (জুয়েল) (১২তম পর্বের পর থেকে) লিমা আমার ডেস্ক থেকে চলে গেলো। আমি অবন্তীকে কল দিলাম। কল দিয়ে কথাটা বললাম, অবন্তী শুনেই...

ভাবি যখন বউ পর্ব ১২

গল্পঃ ভাবি যখন বউ পর্ব ১২ (জুয়েল) (১১তম পর্বের পর থেকে) ৩০ মিনিট পর অবন্তীদের বাসায় গেলাম, কলিং বেল চাপ দিলাম। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দেয়। তাকিয়ে...

Recent Comments

Mohima akter on Ek The Vampire 18
error: ©গল্পেরশহর ডট কম