কি আশায় বাঁধি খেলাঘর ১+২

0
99

“আম্মা যে রাতে আব্বা কে কুপিয়ে হত্যা করে,নিজেও আত্মহত্যা করলেন,সে রাতে ছিলো প্রচন্ড বৃষ্টি। সেই ঝুম বৃষ্টির রাতেই আম্মা আব্বাকে আমি শেষবারের মতো দেখেছিলাম জীবিত।
আমার যা একটু তন্দ্রামতো লেগে আসছিলো তাও উদাও হয়ে গিয়েছিলো বজ্রপাতের শব্দে। বিছানায় আমার ছোট শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছিলো ভয়ে।

আম্মা প্রতি রাতে আমার সাথে ঘুমাতো,অথচ সে রাতেই আম্মা আমাকে একা ঘুমাতে দিলেন।আম্মাকে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারতাম না,আম্মার গায়ের গন্ধ না পেলে আমার চোখে ঘুম আসতোই না কিছুতে।
রাতে ভয়ে আম্মাকে ডাকার জন্য উঠে যাই।আম্মার রুমের দরজা খোলা কি-না দেখার জন্য হালকা ধাক্কা দিতেই দরজা কিছুটা খুলে গেলো। আমি আড়াল থেকে দেখলাম আম্মা আব্বাকে ছুরি দিয়ে কোপাচ্ছেন।
ভয়ে,আতঙ্কে আমি জমে পাথর হয়ে গেলাম।রক্তে সব ভেসে যাচ্ছিলো।আম্মার পুরো শরীর রক্তে জবজবে হয়ে আছে।আব্বাকে দেখতে পেলাম নিথর হয়ে শুয়ে আছেন।দুচোখ খোলা আব্বার।আব্বার নীল দুই চোখে রাজ্যের বিস্ময়!
যেনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন আম্মার দিকে।আব্বা হয়তো কখনো ভাবেন নি আম্মা এভাবে তাকে খুন করবে তাই এই বিস্ময় ছিলো। আব্বার হাত পা বাঁধা ছিলো।মুখ ও বেঁধে রেখেছিলো আম্মা।
আব্বা একটু চিৎকার ও করতে পারেন নাই মনে হয় মরে যাওয়ার সময়।

আমি কোনো শব্দ না করে নিজের রুমে ছুটে এলাম এক দৌড়ে। বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটা করছিলো।আমার ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করে কাঁদতে কিন্তু কাঁদতে পারি নি।

চাদর গায়ে দিয়ে আমি অনবরত কাঁপছিলাম বিছানায় শুয়ে,কিছুক্ষণ পর আম্মা আমার রুমে এলেন।
আমাকে আদুরে গলায় ডাকলেন, “চন্দ্র,আমার চাঁদের আলো মা,এদিকে তাকা।”

আমি কোনোমতে চাদর সরিয়ে তাকালাম আম্মার দিকে।মনে হয় আম্মা এই প্রথম আমাকে ডাকছেন নরম স্বরে।আম্মা আমার বিছানার পাশে বসলেন,হাত বাড়িয়ে আমাকে কোলে টেনে নিলেন।
আমার কাঁপুনি বন্ধ হলো না।আম্মার গায়ের এলাচের ঘ্রাণের সাথে আমার নাকে রক্তের একটা ঝাঁঝালো গন্ধ এলো।
আব্বার শরীরের রক্ত!
সেই থেকে রক্ত আমার সহ্য হয় না।

আম্মা আমার কপালে চুমু খেলেন,জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদলেন।তারপর বললেন,”আজ থেকে আর কোনো ভয় নেই মা।আমি খুন করে ফেলেছি তোর বাবাকে।তোর উকিল আংকেলের কাছে এই বাড়ির দলিল,তোর বাবার আমার ব্যাংকের সব কাগজপত্র আছে।আরো অনেক কিছু আছে যা তুই এখন বুঝবি না।যেদিন তোর আঠারোতম জন্মদিন পালন করবি সেদিন সব হাতে পাবি।আম্মাকে তুই ক্ষমা করে দিস।ওখানে আম্মার একটা ডায়েরি ও আছে,সেটা পড়লে তুই সব কিছু জানতে পারবি।আর সব জানে তোর ছোট খালামনি।
কাল সকালে তোর খালামনি আসলে ওর সাথে চলে যাবি ওর বাসায়।
এখন আয় আম্মাকে একটা চুমু দে।”

আম্মার কথা অনেক কিছুই আমি বুঝলাম না।তবে চুমু দিতে ও এগিয়ে গেলাম না আম্মাকে।
কেনো চুমু দিবো আমি?
উনি আব্বাকে মেরে ফেলেছেন কেনো?

আম্মা আমাকে চুপ থাকতে দেখে হাসলেন।তারপর বললো,”যাই মা।একদিন বুঝবি সব কিছু।আর একটা কথা বলি,কখনো পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করবি না।এরা গিরগিটি,ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়।কোনো পুরুষকে কাছে ঘেঁষতে দিবি না,কিছুতেই না,কিছুতেই না।সকালে পুলিশ এলে সব বলবি যা যা দেখেছিস তুই।
আফসোস একটাই রইলো তোর কেউ থাকবে না আর এই দুনিয়ায় আপন বলে।সারা পৃথিবীতে এতো মানুষ থাকতেও আমার চন্দ্র মানুষ হবে একা,মা বাবা ছাড়া।আমার মেয়েটা বাবা মা কারো আদর পেলো না। ”

আম্মা আমাকে রেখে চলে গেলেন আবার নিজের রুমে,তারপর রুমের দরজা বন্ধ করে দিলেন।আমি কাঁপতে লাগলাম চাদর গায়ে দিয়ে।

আব্বার খুব একটা আদর আমি পাই নি।
আব্বা কখনো আমার সাথে কথা ও বলেন নি।কেনো জানি না আব্বা আমাকে পছন্দ করতেন না।
আম্মাও করতেন না আমাকে পছন্দ।আমি যেনো ওনাদের দুজনের চক্ষুশূল ছিলাম।
আমি খুব চাইতাম একটু বাবা মায়ের আদর পেতে।অথচ কিছুতেই তাদের কাছে ঘেঁষতে পারতাম না।

আম্মা আমার পাশে থাকলেই আমি এলাচের একটা মিষ্টি সুগন্ধ পেতাম।
আমার সবসময় ইচ্ছে করতো আম্মার গায়ের এই ঘ্রাণ নিতে কিন্তু সবসময় পারতাম না।আম্মার মেজাজ সবসময়ই তিরিক্ষি হয়ে থাকতো।
কিসের জন্য আম্মা এতো রেগে থাকতেন আমি জানতাম না,বুঝতাম ও না তখন।৮ বছর বয়সী আমার এতোকিছু বুঝার ও ক্ষমতা ছিলো না।
আমি শুধু জানতাম রাত হলে আম্মা আমার পাশে এসে শুবেন,তারপর আমি ঘুমিয়েছি নিশ্চিত হলে আমাকে বুকের ভিতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরবেন।অথচ জেগে থাকলে আম্মা আমাকে ছুঁতেন না মোটেও।
আমিও তাই ঘুমের ভান করে থাকতাম।আম্মার আদর এটুকুই পেতাম আমি।
আর আব্বার একটুও পেতাম না।আব্বা মাঝেমাঝে দূর থেকে আমার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেন।আব্বার চোখের মনি নীল রঙের ছিলো,সেসময় তার নীল চোখে গভীর ভালোবাসা ফুটে উঠতো।আমি ও নির্বাক তাকিয়ে থাকতাম আব্বার চোখের দিকে কিন্তু আম্মা দেখতে পেলেই ছোঁ মেরে সরিয়ে দিতেন আমাকে আব্বার সামনে থেকে। আব্বা যতোক্ষণ বাসায় থাকতেন আম্মা আমাকে চোখে চোখে রাখতেন আব্বা বের হলেই আম্মা আর আমার খোঁজ নিতেন না।

সকাল হতেই ছোট খালামনি এলেন আমাদের বাসায়,এসে দেখলেন আমি বিছানায় অজ্ঞান হয়ে আছি।আম্মার রুমের দরজা বন্ধ। খালামনি পানির ঝাপটা দিতেই আমার জ্ঞান ফেরে।আমি খালামনিকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে রইলাম।কেনো জানি কান্না পাচ্ছিলো না আমার। আমার জামায় ও রক্ত লেগেছিলো আম্মার শরীর থেকে।
খালামনি সব শুনে পুলিশে খবর দিলেন।

পুলিশ এলো ২০ মিনিটের মাথায়। আম্মার রুমের দরজা ভাঙা হলো।দরজার নিচ দিয়ে রক্তের স্রোত বেরিয়ে এসেছিলো।
আম্মার ঝুলন্ত দেহ দেখা গেলো সবার আগে।ফ্যানের সাথে ফাঁস লাগিয়ে আম্মা ঝুলে ছিলেন,বিছানায় আব্বা।আমার পুরো শরীর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।

আমার আম্মা,আমার আব্বা!

পুলিশ আংকেল আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন,আম্মা আমাকে বলেছিলেন সব সত্যি বলতে। আমিও সব সত্যি কথা বলে দিয়েছিলাম।

পুলিশ আংকেল খালামনিকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।আমি আমার রুমে বসে আনমনা হলাম এই ভেবে,আম্মার গায়ের ঘ্রাণ আমি কোথায় পাবো?
আমি কিভাবে ঘুমাবো রাতে এখন থেকে?
রাতে আমাকে কে জড়িয়ে ধরবে?
এলাচের মিষ্টি ঘ্রাণ আমি কার গায়ে পাবো আর?

এতো কিছু হয়ে যাওয়ার পর তখনও আমি কাঁদি নি।কিন্তু যখন আম্মাকে আর আব্বাকে পাশাপাশি শোয়ানো হলো তখনই কেঁদে উঠেছি আমি।আমার জন্মের পর সেই প্রথম আর শেষ বার তাদের একসাথে দেখেছি।সারাজীবনের জন্য আমি দুজনকে নয়ন ভরে দেখে নিয়েছিলাম।কেমন শান্ত দুজন,চুপচাপ হয়ে শুয়ে ছিলো।
কে বলবে এরা দু’জন একে অপরের ছায়া ও মাড়াত না?

আমি সেদিন প্রথম বারের মতো খেয়াল করলাম আমি দেখতে পুরোপুরি আব্বার মতো হয়েছি।
আব্বার চোখের মতো আমার নীল চোখ।সব ভুলে আমি আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।এই দুই চোখ আর কখনো আমার দিকে তাকাবে না এক রাশ ভালোবাসা নিয়ে!
কে একজন আব্বার দুচোখ বন্ধ করে দিলো।

এরপর আমি বড় হতে লাগলাম ছোট খালামনির কাছে।আমার জন্মের পর থেকে নানাবাড়ির কাউকে দেখি নি কখনো ছোট খালামনিকে ছাড়া,আম্মাকে কখনো জিজ্ঞেস করে ও জানতে পারি নি।আম্মা জবাব দেন নি,অথবা থাপ্পড় দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিয়েছেন।কিন্তু আম্মার মৃত্যুর পর নানা,নানি,মামা,খালা সবাইকে দেখলাম।নানি আর ছোট খালামনি ছাড়া বাকি সবাই কেমন কঠোর মুখ করে আমার দিকে তাকাতো,আমার সাথে কথা বলতো।
আমার ভীষণ ভয় করতো ওনাদের দেখলে।ওনারা সবাই যেনো আমার আম্মার প্রতিচ্ছবি। ঠিক আমার আম্মার মতো রেগে থাকতেন যেনো সবসময় আমার সাথে।

শেষ পর্যন্ত খালামনি ও আমাকে রাখলেন না সাথে।আমি ১২ বছর বয়সী হতেই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন হোস্টেলে।তারপর থেকে আজও আমি হোস্টেলেই আছি।”

কথা শেষ করে চন্দ্র এক বোতল পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিলো।তারপর উঠে গিয়ে একটা জানালা খুলে দিলো।মাঘ মাসের শীতেও যেনো চন্দ্রর কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
প্রভা কেঁপে উঠলো শীতে।দৌড়ে গিয়ে জানালা বন্ধ করে দিয়ে বললো,”পাগল হয়ে গেলি না-কি!
কি ঠান্ডা দেখছিস না?
জানালা খুলছিস কেনো?”

চন্দ্র কথা বললো না।দেয়ালঘড়ি ঢংঢং করে জানান দিলো রাত ২টা বেজে গেছে।

চন্দ্র বিছানায় শুয়ে কম্বল মুড়ি দিলো,প্রভাও শুয়ে পড়লো নিজ বিছানায়।সকালে আবার উঠতে হবে।
কি আশায় বাঁধি খেলাঘর (০২)

মনোয়ারা বেগম রেগে গিয়ে খুন্তি হাতে নিয়ে স্বামীর সামনে এসে বললেন,”বিয়ে হয়েছে ৩২ বছর,সবসময় দেখছি কথায় কথায় তুমি আমার ভুল ধরো।”
হাসনাত সাহেব জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে জবাব দিলেন,”৩২ বছর নয়,৩৪ বছর হবে বিয়ের।”

মনোয়ারা বেগম আরো রেগে গেলেন হাসনাত সাহেব আবারও তার ভুল ধরায়।গরম খুন্তি ছুঁড়ে মারলেন কোন দিকে খেয়াল না করেই।
নিষাদ সিড়ি বেয়ে নামছিলো নিচের দিকে,খুন্তি মুখে লাগতে যাচ্ছে দেখে ধরে ফেললো নিষাদ খুন্তি।
তারপর মা’য়ের সামনে এসে বললো,”কি ব্যাপার মা?
তুমি তো দেখছি আমাকেই ছ্যাঁকা দিতে খুন্তি দিয়ে,বাবার উপর রাগ করে আমাকে শাস্তি দেওয়া!
ভেরি ব্যাড!”

মনোয়ারা বেগম সমান রেগে বললেন,”তা-ও তো বাছা বন্ধুদের সামনে বুক ফুলিয়ে,গর্ব করে বলতে পারতে জীবনে একটা ছ্যাঁকা খাইছি।তোমার যা স্বভাবচরিত্র,প্রেম ট্রেম তো করতে পারলে না একটা।”

হাসনাত সাহেব এতোক্ষণের ঝগড়া ভুলে গিয়ে সুর মেলালেন স্ত্রীর সাথে।ছেলের দিকে তাকিয়ে বলিলেন,”তুমি জানো,তোমার মতো বয়সে আমি কতোবার ছ্যাঁকা খেয়েছি?
তোমার মা ছাড়া আমার বাকী ৭-৮ টা প্রেম সবগুলোতেই আমি ছ্যাঁকা খেয়েছি,ছ্যাঁকা খাওয়া মূল উদ্দেশ্য না,প্রেমে অংশগ্রহণ করাটাই মূল উদ্দেশ্য। আমি তো ৮-৯ বার প্রেমে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি অথচ আমার ছেলে হয়ে তুমি এতোটাই ষ্টুপিড হয়েছ যে একটা প্রেমও করতে পারলে না এই জীবনে!
তোমাদের মেডিকেলে কি কোনো ছাত্রী নেই না-কি?
অন্তত মানুষ ক্রাশ খায়,তুমি তো তাও খেতে পারলে না আজও।আমার তো ক্রাশের সংখ্যাই ছিলো শতাধিক। ”

নিষাদ কিছু না বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলো,হাসনাত সাহেব খেয়াল না করলেও নিষাদ খেয়াল করেছে মনোয়ারা বেগমের মুখ রেগে গিয়ে লাল হয়ে গেছে।

মনোয়ারা বেগম তেড়ে গিয়ে বললেন,”কি বললে তুমি,হ্যাঁ কি বললে এটা তুমি?
আমার আগেও এতো প্রেমিকা ছিলো তোমার?
আর ক্রাশ কি-না ১০০ এর বেশি?
সত্যি কথা এতোদিনে মুখ থেকে বের হলো তোমার? ”

হাসনাত সাহেব নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে যাচ্ছেন বুঝতে পেরে নিষাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”চল রে ব্যাটা,জগিং এর সময় চলে যাচ্ছে। ”

আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেলেন বাসা থেকে।পিছন থেকে হাসতে হাসতে নিষাদও বের হয়ে গেলো দৌড়ে।
.
.
.
হোস্টেলের মাঠে মেয়েরা সবাই লাফাচ্ছে।হোস্টেলের মেট্রন নিজেও মেয়েদের সাথে ব্যায়াম করছেন।এই হাড় কাঁপানো শীতেও প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হয়,মাঠে দৌড়াতে হয়।সবার পিছনে চন্দ্র ধুপ করে বসে পড়লো ভেজা ঘাসের উপর।
শরীর আর মানতে চাইছে না কিছুতেই এই কসরত।
ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে চন্দ্রর।
মেট্রনের বাঁশির হুইসেলের সাথে মেয়েরা সবাই মাঠে উপুড় হয়ে পড়লো প্ল্যাঙ্ক করতে।

ক্লান্ত চন্দ্র দেখলো ও না মেয়েরা সবাই প্ল্যাঙ্ক করছে একা ও বসে আছে মাঠে।
খেয়াল করলো মেট্রন যখন এসে ওর সামনে দাঁড়ালো তখন।
ভয়ে লাফ দিয়ে উঠে গেলো চন্দ্র।

মেট্রন আবার হুইসেল দিতে সব মেয়েরা উঠে দাঁড়ালো।

চন্দ্রকে সবার সামনে নিয়ে মেট্রন জিজ্ঞেস করলো,”খুব টায়ার্ড হয়ে গেছো না এক্সারসাইজ করতে করতে? ”

চন্দ্র জবাব দিলো না কোনো।এই প্রচন্ড শীতেও টের পেলো ধরধর করে ঘামছে ও।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

গুরুগম্ভীর কণ্ঠে মেট্রন বললো,”তোমরা সবাই আমার সাথে আসো।আর চন্দ্র,তুমি আমার সাথে আসো।”

মনে মনে চন্দ্র নিজেকে ১০১ টা গালি দিলো নিজের এই বোকামির জন্য।
চন্দ্র জানে এখন একটা কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে ওর জন্য।
মেয়েরা সবাই ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো।

সবাইকে নিয়ে মেট্রন হোস্টেলের নিকটবর্তী পার্কে গেলো।বিশাল বড় এই পার্কে সকাল বেলা এই এলাকার অনেক মানুষ জগিং করতে আসে।

একটা বেঞ্চে নিজে বসে চন্দ্রকে বললো,”এই পুরো পার্কটা তুমি ঘড়ি ধরে ১ ঘন্টা দৌড়াবে।
১ সপ্তাহ দৌড়াবে এখানে এসে,এটাই তোমার শাস্তি। মেয়েরা তোমরা সবাই পুরো পার্ক ঘেরাও দিয়ে দাঁড়াও,চন্দ্র এক সেকেন্ডের জন্য থামলেই আমাকে ইনফর্ম করবে।সবাই দেখে নাও চন্দ্রর শাস্তি,দ্বিতীয় বার কেউ যদি এই ভুল করো তবে তাকে আমি টানা ১ মাস এই পার্কে চক্কর দেওয়াবো”

চন্দ্রর ইচ্ছে করলো সেখানেই লুটিয়ে পড়তে অজ্ঞান হয়ে শাস্তি শুনে।কিন্তু পারলো না।অজ্ঞান কিভাবে হয় চন্দ্র জানে না।অজ্ঞান হতে জানার ভান কিভাবে করে তাও জানে না।জানলে অভিনয়টা করতে পারতো।

অগত্যা শাস্তি মেনে নিয়ে দৌড়ানো শুরু করলো। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ছয়টা। সাতটায় সোহান ফোন দিবে চন্দ্রকে,আজ আর কথা হবে না।সপ্তাহে এই একদিন শুক্রবারে চন্দ্রর সুযোগ হয় সোহানের সাথে কথা বলার,আজকে সেই সুযোগ ও মাটি হয়ে গেলো চন্দ্রর।
নিজের কষ্টের কথা ভুলে গিয়ে চন্দ্র কাঁদতে লাগলো সোহানের জন্য।কবে আবার কথা হবে সোহানের সাথে!
সারা সপ্তাহ চাতকিনীর মতো চন্দ্র অপেক্ষা করে শুক্রবারের। শুক্রবার আসলেই ১৫-২০ মিনিট সুযোগ পায় চন্দ্র প্রেম করার।

এসব ভাবতে ভাবতে চন্দ্র চোখ মুছতে লাগলো।
চোখ মুছতে গিয়ে হঠাৎ চন্দ্রর মনে হলো সে একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেয়েছে।ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলো।

মাটিতে পড়েই চন্দ্র ভাবলো এখন কি সে অজ্ঞান হবার অভিনয় করবে?
পরক্ষণেই মনে পড়লো অজ্ঞান হলে কেমন করতে হয় সেটাই তো চন্দ্র জানে না।মেট্রন যদি বুঝতে পারে এটা চন্দ্রর অভিনয় ছিলো তবে হয়তো ওকে আরো ২ সপ্তাহ শাস্তি দিবে।

চোখ খুলে তাকালো চন্দ্র দেখার জন্য কী গাছের সাথে ধাক্কা লেগেছে ওর।কিন্তু কোনো গাছ খুঁজে পেলো না এক জোড়া পা ছাড়া।

বিষয়টা বুঝে উঠতে চন্দ্রর ১ মিনিট সময় লাগলো। তারপর বুঝলো গাছের সাথে না,ধাক্কা লেগেছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির সাথে।
কিছু বলতে গিয়েও চন্দ্র বললো না,ইতিমধ্যে অনেকক্ষণ দেরি করে ফেলেছে ও মাটিতে পড়ে।হোস্টেলের একটা মেয়ে তাকিয়ে আছে চন্দ্রর দিকে,এখন যদি চন্দ্র লোকটার সাথে কথা বলতে যায় আরো দেরি হবে,আর দেরি হলে আরো শাস্তি বাড়বে!

কিছু না বলেই চন্দ্র দৌড় লাগালো।

নিষাদ হতভম্ব হয়ে গেলো মেয়েটাকে এভাবে দৌড় দিতে দেখে।নিষাদের মনে হলো মেয়েটা হয়তো ওকে ভয় পেয়েছে।কিন্তু কেনো ভয় পেয়েছে মেয়েটা ওকে?
মনে মনে ভাবতে লাগলো নিষাদ,”আমাকে এভাবে ভয় পাবার কী আছে,আমি কি অসুন্দর দেখতে?
নাকি আমাকে বনমানুষ ভেবেছে মেয়েটা?”

ফোন বের করে একটা সেলফি নিলো নিষাদ,ততক্ষণে চন্দ্র দৌড়ে নিষাদের পিছনে চলে এলো।

ছবিটি দেখতে গিয়ে নিষাদ দেখতে পেলো ছবিতে পিছনে সেই মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে।আর নিষাদকেও দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত সুপুরুষ সে,ছবি তো তাই বলে।তবে মেয়েটা এরকম দৌড়ালো কেনো?
মাটিতে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় নি তো মেয়েটা?
সেই আঘাতের থেকে ব্রেইনে ইফেক্ট পড়ে নি তো?
মেয়েটা কি প্রচন্ড শক থেকে এভাবে দৌড়াচ্ছে?
হায় হায়!শেষ পর্যন্ত ওর কারণে একটা মেয়ে পাগল হয়ে গেলো!
নিষাদ চন্দ্রর পিছনে ছুটতে লাগলো হন্তদন্ত হয়ে।
চন্দ্র দৌড়াতে দৌড়াতে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো গাছের মতো ছেলেটা ওর পিছন পিছন আসছে দৌড়ে,চন্দ্র দৌড়ের গতি আরো বাড়িয়ে দিলো।

নিষাদের দৌড়ের গতি কমে গেলো চন্দ্রর চাহনি দেখে।
নীল চোখা মেয়েটা সাদা ট্রাক সুট পরনে,মুহুর্তের জন্য নিষাদের মনে হলো এই সেই মুখ যে মুখটা নিষাদ কল্পনায় এঁকে রেখেছিলো।
মনে পড়তেই নিষাদের মনে হলো,আহারে,এতোদিনে যাও তাকে খুঁজে পেলাম তাও সে পাগল হয়ে গেলো আমার সাথে ধাক্কা লেগে!
ওকে তো আমার সুস্থ করতেই হবে!

দৌড়ের গতি বাড়িয়ে নিষাদ ছুটলো চন্দ্রকে ধরার জন্য।

হাসনাত সাহেব এক পাশে দাঁড়িয়ে জাম্পিং জ্যাক করছিলেন,ছেলেকে এভাবে দৌড়াতে দেখে প্রথমে অবাক হলেন তারপর নিজেও ছুটলেন কি ঘটেছে সেটা জানার জন্য।
বাবাকে পিছনে দৌড়ে আসতে দেখে নিষাদ জিজ্ঞেস করলো,”বাবা,তুমি এভাবে দৌড়াচ্ছ কেনো?”

হাসনাত সাহেব দৌড়াতে দৌড়াতে জবাব দিলেন,”আমি কি জানি না-কি কেনো দৌড়াচ্ছি,জানলে তো দৌড়াতাম না।আমি তো দৌড়াচ্ছি তোকে দৌড়াতে দেখে এভাবে,কি হয়েছে তোর,একরকম হরিণের মতো ছুটছিস কেনো?”

নিষাদ আরো গতি বাড়ালো দৌড়ের,তারপর বাবাকে বললো,”ভুল বললে বাবা,হরিণের মতো না তো,বাঘের মতো দৌড়াচ্ছি হরিণ ধরার জন্য,আমার সোনার হরিণ আমার আগে দৌড়াচ্ছে দেখতে পাচ্ছো না বাবা?
আমি এতোদিনে ক্রাশ খেয়েছি বাবা।”

হাসনাত সাহেব ছেলের কথা শুনে খুব রেগে গেলেন। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,”হতভাগা এতোদিনে ক্রাশ খেলি একটা মেয়ের উপর,তাও তাকে দৌড়ে ধরতে পারছিস না?
ধর ধর পাগলা,জানিস না রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,একবার ছেড়ে গেলে সোনার গৌড় আর তো পাবো না,খ্যাপা ছেড়ে গেলে সোনার গৌড় আর পাবো না,না,না…..”

চন্দ্র ভয়ার্ত চোখে আবার পিছনে তাকালো,তাকিয়ে আরো বড় ধাক্কা খেলো।এতোক্ষণ দেখেছে গাছের মতো একটা লোক দৌড়াচ্ছে ওর পিছনে এখন দেখছে তার পিছনে আরেক লোক।শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে দৌড়াতে লাগলো চন্দ্র,মনে মনে ধন্যবাদ দিলো মেট্রন কে,প্রতিদিন যদি মেট্রন এক্সারসাইজ না করাতো তবে এভাবে হরিণের মতো ছুটতে পারতো না চন্দ্র আজ।

নিষাদ কোনোমতে চন্দ্রকে ধরতে পারলো না।নিষাদের মাথা চক্কর দিচ্ছে দৌড়াতে দৌড়াতে। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে যেতে নিষাদ বাবাকে বললো,”বাবা আমি তো ভালো মতো ক্রাশ খেয়েছি বাবা,মেয়ে তো নয় গরিবের উসাইন বোল্ট যেনো!”

তারপর নিষাদ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলো। হাসনাত সাহেব থামলেন না,চিৎকার করে বললেন,”হাঁদারাম,তোর এখনই ঘুমাতে হলো,একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছে,কোথায় গিয়ে নামধাম জিজ্ঞেস করবে,আমরা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবো তা না,উল্টো চিৎ হয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে!
আর বুড়ো বাপকে রেখে গেছে মেয়ের পিছনে দৌড়ানোর জন্য,ব্যাটা প্রেম করার বয়স তোর,আর তোর জন্য মেয়ের পিছনে দৌড়াচ্ছি কি-না আমি!
এই দিন ও আমার জীবনে আসবে আমি কি ভেবেছি কোনোদিন?
আহা কপাল আমার।তাও যদি মেয়েটার ঠিকানা জানতে পারি।”

১ ঘন্টা হতেই মেট্রন হুইসেল দিলো বাঁশিতে।চন্দ্র থামতে গিয়ে দেখলো বয়স্ক লোকটা এখনো তার পিছনে আসছে।কোনো দিকে না তাকিয়ে চন্দ্র দৌড়ে বের হয়ে গেলো। তারপর বাহিরে জগিং করতে করতে বাড়িতে ফেরা মানুষের সাথে মিশে কিছুদূর দৌড়ে ঢুকে গেলো হোস্টেলের গেইটের ভিতর।

হাসনাত সাহেব কিছুদূর এসে হারিয়ে ফেললেন মেয়েটাকে।এক বুক হতাশা নিয়ে ছেলের সাথে গিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে গেলেন।

ভীষণ আফসোস হলো তার ছেলেটার জন্য।মনে মনে আফসোসে করে তিনি তিন বার বললেন,
আহারে!
আহারে!
আহারে!

চলবে……?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here