কি আশায় বাঁধি খেলাঘর ৫+৬

0
69

কি আশায় বাঁধি খেলাঘর (০৫)

রাতে বিছানায় শুয়ে চন্দ্র এপাশ ওপাশ করছিলো।মাথায় হাজারো ভাবনা।
সন্ধ্যায় প্রভার সাথে কথা বলেছে।প্রভার ভীষণ মন খারাপ। প্রভাকে আশ্বাস দিয়েছে খুব শীঘ্রই একসাথে থাকার ব্যবস্থা করবে।

ছোট খালামনির লোভের ব্যাপারটা চন্দ্র জানতে পেরেছে মাস ছয়েক আগে যখন খালামনির সাথে কথা হয়েছে তখন।
চন্দ্রর ১৮ বছর হতেই চন্দ্র উকিলের থেকে সব জানতে পারে।কিন্তু সব কথা নিজের মধ্যে রাখে চন্দ্র কাউকে জানায় না।
চন্দ্র জানে যারা ওকে দূরে ঠেলে দিয়েছে তারাই ওর টাকাপয়সার লোভে পড়ে ওকে কাছে টেনে নিতে চাইবে তাই কাউকে জানায় নি।
এমনকি সোহান কে ও জানায় নি।

উকিলের সাথে চন্দ্রর ছোট খালুর বন্ধুত্ব থাকায় তার থেকে তিনি জানতে পেরে চন্দ্রর ছোট খালামনিকে জানায়।
ছোট খালামনির থেকে নানার বাড়ির সবাই জানে।

চন্দ্র চেয়েছিলো হোস্টেল থেকে বের হয়ে আসতে কিন্তু অভিভাবক ছাড়া হোস্টেল থেকে ছাড়ে না তাই চন্দ্র ও অমত করে নি খালা যখন বলেছে খালু যাবে চন্দ্রকে নিয়ে আসতে।

ঘড়ির কাঁটা ১২টার ঘরে চলে গেছে।

বাহিরে উত্তরের হাওয়া,চন্দ্র জানালা খুলে দিয়ে জানালার সামনে দাঁড়ালো।
ঠান্ডা বাতাস চন্দ্রকে আপাদমস্তক কাঁপিয়ে দিলো।চন্দ্রর পরনে একটা দেশি শাল,পায়ে মোজা,গলায় উলের একটা নীল মাফলার।

ফোন হাতে নিয়ে চন্দ্র সোহান কে কল দিলো। হোস্টেল থেকে আসার এই একটা ভালো দিক।সোহানের সাথে কথা বলতে পারবে যেকোনো সময়।
সোহানের নাম্বার বিজি!

চন্দ্র কিছুটা অবাক হলো। এর আগে কখনো সোহানের সাথে কথা হয় নি রাতে।শুক্রবার সকাল ৭টায় শুধু কথা হতো তাই চন্দ্রর ধারণা নেই সোহানের ফোন রাতে সবসময় এরকম বিজি থাকে কি-না।
একরাশ অস্বস্তি নিয়ে চন্দ্র বিছানায় গেলো ঘুমাতে।এবং প্রায় সাথেসাথে ঘুমিয়ে গেলো।

চন্দ্রর ঘুম ভাঙ্গলো শেষ রাতের দিকে।
ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠে বসলো চন্দ্র বিছানায়।
বুকের ভিতর কেমন ভারী হয়ে আছে।ফোন নিয়ে আবারও কল দিলো সোহান কে।
এবার সুইচ অফ পাচ্ছে।

বাকিটা সময় কাটলো চন্দ্রর অস্থিরতায়।

সকালে চন্দ্র বের হলো ফ্ল্যাট খোঁজার উদ্দেশ্যে। খালামনির বাসায় যে চন্দ্র থাকবে না সে-তো চন্দ্রর আগেই ভেবে রেখেছে।চন্দ্রর বাবার রেখে যাওয়া অনেকগুলো বাড়ি আছে,সেগুলোতেও চন্দ্র এখন উঠতে চায় না।কাউকে জানতে দিতে চায় না চন্দ্র এখনই তার অর্থ সম্পদের কথা।চন্দ্র একটা অসহায় মেয়ে,চন্দ্র চায় সবাই সেটাই জানুক।যারা এটা জেনেও চন্দ্রকে ভালোবেসে কাছে টানবে তারাই তো প্রকৃত ওর শুভাকাঙ্ক্ষী,আপন মানুষ,প্রিয় মানুষ।

এখন বাসা খোঁজার পালা।
ঢাকা শহরে একা একটা মেয়ের জন্য বাসা খুঁজে পাওয়া অনেকটা সোনার হরিণ পাওয়ার মতো ব্যাপার।
কিন্তু তাই বলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না চন্দ্রর।
ভাগ্যে যখন আছে এই বেহাল দশা,না মেনে উপায় কি!
চন্দ্র ঘুরতে লাগলো ধানমন্ডির আশেপাশে বাসার উদ্দেশ্যে।

জীবন তাকে নিয়ে কোন খেলা খেলতে যাচ্ছে তা নিয়ে চন্দ্রর কোনো ধারণা ও ছিলো না।

.
.

নিষাদ প্রতিদিন নিয়ম করে ৩ বার চন্দ্রর ছবি দেখে।ছবিতে চন্দ্রর মুখটা স্পষ্ট না হলেও নিষাদের কাছে মনে হয় এই মুখটির মতো স্বচ্ছ আর কিছু নেই যেনো।

নাশতা সেরে নিষাদ বের হলো সেলুনের উদ্দেশ্যে চুল কাটার জন্য,২ দিন পরে ওর একটা বন্ধুর বিয়ে।বিয়েতে যেতেই হবে।সব বন্ধুদের একটা মিলনমেলা হবে সেখানে।
যদিও নিষাদের মোটেও যেতে ইচ্ছে করছে না বিয়েতে,কিন্তু অনুরোধে ঢেঁকি গেলা বলে একটা কথা আছে।
তেমনই হচ্ছে বিষয়টা। সবার অনুরোধ রক্ষার্থে যেতে হচ্ছে নিষাদকে।

চুল কেটে নিষাদ বাসায় চলে গেলো আবার।গোসল সেরে বের হলো আবার শপিংয়ে। বন্ধুরা সবাই কালার ম্যাচ করে পাঞ্জাবি পরবে বলে ঠিক করেছে।

গায়ে হলুদে বর পরবে হলুদ পাঞ্জাবি,বাকি সব বন্ধু পরবে আকাশি কালার পাঞ্জাবি।
বিয়েতে বরের মেরুন শেরওয়ানি অন্যদের সাদা পাঞ্জাবি।রিসিপশনের দিন বর পরবে নীল পাঞ্জাবি বাকীরা সবাই পরবে চকলেট কালার পাঞ্জাবি।

সেই মতোই শপিং করতে হবে নিষাদের।

.
.

বাসা খুঁজতে খুঁজতে চন্দ্রর যখন বেহাল অবস্থা তখনই ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো।এক মধ্যবয়স্ক মহিলাকে দেখলো চন্দ্র হাতে করে অনেকগুলো ফুলের তোড়া নিয়ে ফিরছে।পোশাক দেখে সাধারণ পরিবারের কোনো মধ্যবয়স্ক গৃহিণী মনে হলো চন্দ্রর।
রাস্তা পার হবার সময় মহিলা বিপাকে পড়ে গেলো। যতোবারই রাস্তা পার হতে চায় একটা না একটা গাড়ি এসে যায়,আর মহিলা যেতে পারে না।৩-৪ বার এরকম করতে করতে একবার মাঝরাস্তায় গিয়ে মহিলার হাত থেকে সবগুলো ফুলের তোড়া পড়ে গেলো রাস্তায়।
মহিলা কিছুটা দিশেহারা হয়ে গেলো,ফুল তুলে নিবে না-কি নিজে মাঝরাস্তা থেকে সরে আসবে।

সেই মুহুর্তেই চন্দ্র হ্যাঁচকা টান দিয়ে মহিলাকে সরিয়ে নিয়ে এলো মাঝ রাস্তা থেকে।তারপর মহিলাকে দাঁড় করিয়ে নিজে গিয়ে ৩ টা ফুলের তোড়া তুলে নিলো,বাকি ২ টা গাড়ির চাকার নিচে পড়ে থেতলে গেছে।
একহাতে ফুল নিয়ে অন্য হাতে মহিলা কে ধরে রাস্তা পার হলো চন্দ্র।
টের পেলো মহিলার পুরো শরীর কাঁপছে ভয়ে।

চন্দ্রর ভীষণ মায়া হলো।চন্দ্র হেসে জিজ্ঞেস করলো,”একা বের হলেন কেনো চাচী?
মেয়ে নেই আপনার,মেয়েকে সাথে নিয়ে বের হতেন।”
মহিলা কাঁপাকাঁপা গলায় বললো,”না রে মা,আমার মেয়ে নেই।”

চন্দ্র বললো,”এভাবে কেনো বের হয়েছেন চাচী,এতো ফুল কি করবেন?”

মহিলা জবাব দিলো,”তোমার চাচার এই জারবেরা আর রজনীগন্ধা ফুল অনেক পছন্দের মা।মাঝেমধ্যেই আমি এভাবে ফুল কিনে রুমে রাখি তারে সারপ্রাইজ দিতে।”

মহিলার কথা শুনে চন্দ্র অভিভূত হলো।এই বয়সে এসেও কি মহব্বত তাদের মধ্যে।
চন্দ্রর মনে পড়লো মায়ের কথা।ও কখনো দেখে নি বাবা-মাকে একসাথে বসে কথা বলতে,সবসময়ই দেখেছে দুজনকে দু মেরুর বাসিন্দা।
কেউ কারো সাথে কথা বলতো না।

মহিলা জিজ্ঞেস করলো চন্দ্রকে,”কি নাম তোমার মা?
আমার সাথে বাসায় কিন্তু যেতেই হবে তোমার,এতো বড় উপকার করলে আর বাসায় চা খেয়ে যাবে না তা হবে না মা।”

চন্দ্র হেসে দিলো।কখনো তো আপনজন কেউ এরকম আদর করে চন্দ্রর সাথে কথা বললো না।অথচ এই অচেনা মহিলা কি আদরমাখা কণ্ঠে তাকে মা বলে ডাকলো।

চন্দ্র জবাব দিলো,”আমার নাম চন্দ্র চাচী।”

মহিলা মুগ্ধ হয়ে বললো,”খুব সুন্দর নাম তোমার মা,একেবারে তোমার মতো তোমার নাম।আসলেই তুমি একটা চন্দ্র মা।”

মহিলার বাসার সামনে গিয়ে চন্দ্র ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেলো। ধানমন্ডির মতো এরকম একটা জায়গায়,এতো বড় একটা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়ালো মহিলা,অথচ দেখে মনে হয় যেনো নিতান্তই সাধারণ পরিবারের মানুষ তিনি।

বাসার ভিতরে ঢুকে চন্দ্র অবাক হলো ভীষণ রকমের। এতো বড় বাসা চন্দ্র ভাবতে পারে নি।ড্রয়িং রুমের ইন্টেরিয়র ডিজাইন দেখলে যেকোনো মানুষের চক্ষু কপালে উঠে যাবে।দেয়ালে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের আঁকা মাস্টারপিস কিছু আর্ট।

চন্দ্রকে বসতে বলে মহিলা কিচেনে গেলো একবার। তারপর নিজেদের রুমে ঢুকে ফুল রেখে আসলো চন্দ্রর কাছে।
বোরকা ছাড়া সুতি শাড়িতে মহিলাকে দেখতে কেমন কোমল,স্নিগ্ধ মনে হচ্ছে।
চন্দ্রকে জিজ্ঞেস করলেন,”তুমি যাচ্ছিলে কোথায়?”

“আমি বাসা খুঁজতে বের হয়েছি চাচী।”

“কে কে আছে বাসায় তোমার। ”

চন্দ্র একমুহূর্ত চুপ থেকে বললো,”আমার কেউ নেই চাচী,আমি একাই থাকি।বাবা মা মারা গেছেন।একটা বান্ধবীকে সাথে নিয়ে থাকবো একটা ফ্ল্যাটে।তাই ফ্ল্যাট খুঁজছি।এই শহরে একা মেয়েদের বাসা খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ”

মহিলার মুখ ঝলমল করে উঠলো চন্দ্রর কথা শুনে,হেসে বললেন,”তুমি চাইলে এই বিল্ডিং এ বাসা নিতে পারো মা।এই বিল্ডিং টা আমাদের। ৪ তলায় একটা ফ্ল্যাট খালি আছে।তুমি চাইলে আগামীকাল উঠতে পারো।”

এ যেনো মেঘ না চাইতেও জল।চন্দ্রর এতো আনন্দ হলো যে ওর ইচ্ছে করলো মহিলাকে জড়িয়ে ধরে।
কিন্তু লজ্জায় পারলো না।

নাশতা চলে এলো। নাশতার আইটেম দেখে চন্দ্র চমকে উঠলো। এতো আইটেম কে খাবে?
উনি কি চন্দ্রকে রাক্ষস ভেবেছে না-কি!

মহিলা চন্দ্রর মুখের ভাষা পড়তে পারলো।হেসে বললো,”তোমরা ইয়াং জেনারেশন এরকম কেনো,অতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে কিছুই খাও না তোমরা। আমার নিষাদ কে ও দেখি এরকম করে,কতো মেপে মেপে খায়।ডাক্তারি পড়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে আমার ছেলের,সব খাবার ক্যালরি মেপে খায় জানো।
এখন তো খাবার বয়স,ইচ্ছে মতো খাবে তোমরা।

তারপর একটা কার্ড দিয়ে বললো,এটা তোমার আংকেলের কার্ড।কোনো সমস্যা হলে সোজা কল দিবে।আমি বলে রাখবো তোমার কথা।যতো শীঘ্রই পারো বাসায় উঠে যেও।”

চন্দ্র কার্ডটির নামে চোখ বুলালো,”মো: হাসনাত চৌধুরী”
কি আশায় বাঁধি খেলাঘর (০৬)

চন্দ্র মনোয়ারা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা নিউমার্কেট চলে গেলো। নতুন বাসার জন্য সবকিছুই কিনতে হবে ওর।হাড়ি পাতিল থেকে শুরু করে বিছানা বালিশ পর্যন্ত। গাড়িতে বসে চন্দ্র প্রভা কে কল দিয়ে সব জানালো।
২ দিনের মধ্যে নতুন বাসায় উঠবে তারা সেই মতো প্রভাকে বললো হোস্টেল থেকে বের হতে।

নিজ হাতে বাছাই করে করে চন্দ্র গৃহস্থালির সব জিনিস কিনলো। ভাতের পাতিল,তরকারির পাতিল,কড়াই,ফ্রাইপ্যান,রাইস কুকার,প্রেসার কুকার,ওভেন,ফ্রিজ,ফিল্টার,ময়লার ঝুঁড়ি,বালতি,
প্লেট,গ্লাস,বাটি,বটি,ছুরি,কাটিং বোর্ড।

বাদ পড়লো না কোনো কিছুই।

সবকিছু নিয়ে রেখে এলো নতুন বাসায়।বাসায় যখন ফিরলো তখন ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিলো চন্দ্রর।
তবুও মনে শান্তি ছিলো।বিছানায় শুয়ে পড়লো না খেয়েই,রশ্মি জিজ্ঞেস করতে ও এলো না খাবে কি-না বা খেয়েছে কি-না বাহিরে।
বিছানায় শুয়ে চন্দ্র ভাবতে লাগলো ভবিষ্যতের কথা।সোহানের সাথে যখন বিয়ে হবে তখনও তো এরকম একটা সংসার হবে চন্দ্রর।
অবশ্য সেই সংসারে শশুর শাশুড়ী ননদ সবাই থাকবে।চন্দ্রর খুব ইচ্ছে সবাইকে নিয়ে থাকার।সারাজীবন যে মেয়ে কাটিয়েছে আত্মীয় স্বজন ছাড়া,তারজন্য শশুর শাশুড়ী ছাড়া জীবন মানে আল্লাহর দেওয়া সেরা নিয়ামত।
চন্দ্র খুব চায় সবাইকে নিয়ে থাকতে।বাবা মায়ের অভাব যেনো কিছুটা হলেও ঘুচে যায় ওর।

ভাবতে ভাবতে সোহান কে কল দিলো।সোহান ফোন রিসিভ করেই জিজ্ঞেস করলো,”কেনো কল দিয়েছো?”

চন্দ্র হকচকিয়ে গেলো সোহানের প্রশ্ন শুনে। কি বলছে সোহান এটা?

চন্দ্র আমতাআমতা করে বললো,”তোমাকে কি আমি কল দিতে পারি না সোহান?
আমি খালামনির বাসায় আছি এখন,হোস্টেল থেকে চলে এসেছি,একটা বাসা…..”

চন্দ্রকে আর বলতে দিলো না কিছু সোহান।নিজেই বলে উঠলো,”দেখো চন্দ্র,আমার মনে হয় আমাদের আর কথা না বলাই ভালো। আমার বাবা মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।দুদিন পর আমার বিয়ে।আমি তোমার কথা জানিয়েছি বাবা মা’কে কিন্তু ওনার শুনে নি আমার কথা।বাবা মায়ের পছন্দেই আমার বিয়ে করতে হবে।আমি চাই না আর কথা বলো তুমি আমার সাথে,রাখছি আমি।”

চন্দ্র কিছু বুঝতে পারলো না সোহান কি বললো এসব।সোহানের বিয়ে মানে?
সোহান অন্য কাউকে বিয়ে করবে?
মানে কি এসবের?
কি বললো এসব সোহান?

চন্দ্র আবারও কল দিলো সোহানকে,কিন্তু ফোন অফ।
বাবা মায়ের মৃত্যুর পর চন্দ্রর মনে হলো এই প্রথম আবার ওর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের ভিতর। কিছুতেই বুঝতে পারছে না চন্দ্র কি হবে।
গলাকাটা মুরগির মতো তড়পাতে লাগলো চন্দ্র একা একা।

দুদিনে চন্দ্র অনেক চেষ্টা করলো সোহানের সাথে যোগাযোগ করার।না ফোনে পাচ্ছে,না ফেসবুকে না হোয়াটসঅ্যাপে।কোথাও নেই সোহান।
চন্দ্রর মনে হলো এর চাইতে ভালো ছিলো ওকে যদি সোহান গলা টিপে মেরে ফেলতো।সোহানের বাসার ঠিকানা চন্দ্র জানে না।
কিভাবে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না চন্দ্র।

উপায় মাথায় এলো চন্দ্রর সোহানের গায়ে হলুদের দিন।সন্ধ্যায় গায়ে হলুদ,বিকেলে চন্দ্রর মনে হলো সোহানের বিয়েতে নিশ্চয় সোহানের বন্ধুরা যাবে,ওর ফেসবুক আইডি থেকে ওর ফ্রেন্ডদের খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না।
সোহানের ফেসবুক আইডি থেকে সোহানের
৬ জন ফ্রেন্ড কে চন্দ্র মেসেজ দিলো।সবার কাছে একটা মেসেজই দিলো,সোহানের বাসার এড্রেসটা লাগবে ওর,সোহানের জন্য বিয়ের একটা গিফট পাঠাবে কিন্তু সঠিক ঠিকানা ভুলে গেছে চন্দ্র।

২ ঘন্টার মধ্যে ২ জন রিপ্লে দিলো,সোহানের বাসার ফুল এড্রেস জানিয়ে দিলো।
চন্দ্রর চেহারা আনন্দিত হয়ে উঠলো ঠিকানা পেয়ে।চন্দ্রর স্থির বিশ্বাস চন্দ্রকে সামনে পেলে সোহান সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে।

তড়িঘড়ি করে চন্দ্র জামা পালটে একটা সঙ্গে সবুজ সেলোয়ার-কামিজ পরে নিলো।
সাজগোজের সময় নেই এখন চন্দ্র,মনে মনে আল্লাহ কে ডাকতে ডাকতে চন্দ্র বাসা থেকে বের হলো।
এই দু’দিন পানি ছাড়া এক দানা খাবার চন্দ্রর গলা দিয়ে নামে নি।

সোহানদের বাসায় পৌছালো চন্দ্র সন্ধ্যা ৭ টায়।ইতোমধ্যে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। চন্দ্র দেখলো অনেক দূর থেকে মরিচ বাতি দিয়ে বাসার রাস্তা সাজানো হয়েছে।
সোহানদের পুরো বিল্ডিং মরিচ বাতি দিয়ে যেনো মুড়িয়ে রেখেছে। ছাদে দেখা যাচ্ছে অনেক মানুষ। ছোট একতলা বাসাটা আজ যেনো প্রাণ ফিরর পেয়েছে,অনেক মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠলো বাসা।
চন্দ্র দৌড়ে বাসার ভিতরে ঢুকে চিৎকার করে ডাকলো সোহানকে।
বাসা ভর্তি মেহমান গিজগিজ করছে। সোহান পরিবারের বড় ছেলে,তাই সব আত্মীয় কে দাওয়াত করা হয়েছে।
ছাদে বক্সে গান বাজছে।

চন্দ্রর চিৎকার শুনে কয়েকজন ছুটে এলো।
সোহান নিজের রুমে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে।১৫ জন বন্ধু আজ আবার এক হয়েছে।

চন্দ্রর চিৎকার শুনে ওরাও বের হয়ে এলো।
দরজার সামনে এসে নিষাদ থমকে দাঁড়ালো। নিষাদের মনে হলো ওর পুরো শরীর যেনো জমে গেছে বরফের মতো।
এ কাকে দেখছে সে সামনে!
সেই মেয়েটা!
যাকে একবার দেখেই নিষাদ পাগল হয়েছে।

চন্দ্র সোহানকে দেখে দৌড়ে কাছে গিয়ে বললো,”এসব কী সোহান?”

চন্দ্রকে দেখে সোহান নিজেও হতভম্ব হয়ে গেলো। চন্দ্রর তো বাসার ঠিকানা জানার কথা না তবে কিভাবে এলো সোহান ভেবে পেলো না।
চন্দ্র সোহানের হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে বললো,”বলো আমাকে সোহান,এসব কি হচ্ছে?
তুমি আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিবে?
আমার কি হবে তাহলে সোহান?”

বিরক্তিতে সোহানের ভ্রু কুঁচকে গেলো। সোহান যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে তার নাম রেবা।রেবার বাবা বিয়েতে রেবাকে একটা ফ্ল্যাট দিচ্ছে,সোহানকে একটা বাইক দিচ্ছে,ঘর সাজানোর সব কিছু দিচ্ছে।
অথচ চন্দ্রর কে আছে?
বাবা মা কেউ নেই।একটা সিকি পয়সা ও কেউ দিবে না চন্দ্রকে বিয়ে করলে।তার উপর চন্দ্রর মা বাবা নেই।
এরকম একটা মেয়ে প্রেমিকা হিসেবেই মানায়,বউ হিসেবে নয়।তাই সোহান চন্দ্র ছাড়া ও রেবার সাথে সম্পর্ক গড়েছে।
চন্দ্রর কথা শুনে সোহান ঠান্ডা মাথায় বললো,”দেখো চন্দ্র,সোজা কথা শুনে রাখো।আমার বাবা মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে,আমি বিয়ে করতে বাধ্য তাই।”

চন্দ্রর ভীষণ কান্না পেলো,কিন্তু কাঁদলো না।কখনো কাউকে সে চোখের পানি দেখায় নি আজও দেখাবে না।

নিজেকে সামলে চন্দ্র বললো,”তবে কেনো আমাকে ভালোবাসলে সোহান,তুমি তো জানতে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমার আপনজন। কেনো এরকম করে ধোঁকা দিলে আমায়?এতো বড় প্রতারক তুমি সোহান!
তোমার বাবা মা কে ডাকো সোহান,আমি তাদের পায়ে ধরবো সোহান,আমাকে ছেড়ে যেও না তুমি।আমি সারাজীবন ওনাদের সেবা করবো সোহান,আমি থাকতে পারবো না তোমাকে ছাড়া। ”

নিজেকে সামলাতে পারলো না আর সোহান,রেগে গিয়ে বললো “চন্দ্র,সোজাসাপটা বলছি এবার,তোমার বাবা মা নেই,বিয়ের পর আমি শশুর বাড়িতে যেতে পারবো না।শশুর বাড়ি মধুর হাড়ি সবাই বলে তা আমার ভাগ্যে জুটবে না।কোনো বিপদে তাদের থেকে এক পয়সা সাহায্য পাবো না।এরকম একটা মেয়েকে কেউই জেনেশুনে বউ বানিয়ে আনতে চায় না।আশা করছি আর কিছু বলতে হবে না তোমায়।”

চন্দ্র অবাক হলো সোহানের কথা শুনে।মনে মনে নিজের উপর নিজে খুব খুশি হলো এই ভেবে যে সোহান কে কখনো জানায় নি ও ওর নামে কি পরিমাণ অর্থসম্পদ রেখে গেছে ওর বাবা মা।
এসব জানালে তো সোহানের আসল রূপ দেখতে পেতো না।
মায়ের কথা মনে পড়লো ভীষণ চন্দ্রর।মা মারা যাবার আগে বলেছিলো,” কখনো পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করবি না।এরা গিরগিটি,ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়।কোনো পুরুষকে কাছে ঘেঁষতে দিবি না,কিছুতেই না,কিছুতেই না।”
আজ চন্দ্রর মনে হলো মা ঠিক কথাই বলেছে।
এই সোহান কে তো চন্দ্র চিনতো না।আজ তার অন্য রূপ দেখছে সে।

আর কথা না বাড়িয়ে চন্দ্র সবার সামনে সোহানের গালে এক চড় দিলো।তারপর থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বের হয়ে এলো সোহানদের বাসা থেকে।

সোহান হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কি ঘটলো কিছুই বুঝতে পারলো না।
লাভ হলো একটাই নিষাদের,মেয়েটার নাম জানতে পারলো আজ।সোহানের ফোন নিষাদের হাতেই ছিলো।ফোন থেকে চন্দ্রর নাম্বারটা নিয়ে নিলো নিজের ফোনে।

মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো,যেভাবেই হোক এই মেয়েকে নিষাদ বিয়ে করবেই।যে মেয়েটা জীবনে বাবা মায়ের আদর পায় নি,অসহায় হয়ে বড় হয়েছে তাকে নিষাদ বউ করে তার সব দুঃখ দূর করে দিবে নিজের ভালোবাসা দিয়ে।

গাড়িতে বসে চন্দ্র সিদ্ধান্ত নিলো,বাকি জীবনে আর কাউকে ভালোবাসবে না।ভালোবাসার দাম কেউই দিতে জানে না।সবাই স্বার্থ খোঁজে,অর্থবিত্তের জন্য ভালোবাসে।

চলবে…..?

লিখা: জাহান আরা
চলবে…..???

লিখা: জাহান আরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here