কি আশায় বাঁধি খেলাঘর ৭+৮

0
66

কি আশায় বাঁধি খেলাঘর (০৭)

চন্দ্র নিজেকে সামলে নিলো খুব দ্রুত।কিন্তু সামলে নিলেও পরিবর্তন হলো কিছুটা চন্দ্রর স্বভাবে।আগের চাইতে বেশি গম্ভীর হয়ে গেছে।
সব ঠিকঠাক করে নতুন বাসায় উঠলো ১ সপ্তাহ পরে।
নিষাদ প্রতি রাতে একবার করে চন্দ্রর নাম্বার বের করে। তারপর চিন্তাভাবনা করে কল না দিয়েই ফোন রেখে দেয়।

চন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে তার রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায়। আকাশে আজ থালার মতো একটা চাঁদ উঠেছে। কুয়াশা ভেজা চারদিকে চাঁদের আলো মনে হচ্ছে যেনো কুয়াশার গায়ে চাদর জড়ানো।
চারদিক ভেসে যাচ্ছে জোছনায়।

এমনই এক কুয়াশা ভেজা ভোরে সোহানের সাথে চন্দ্রর দেখা হয়েছিলো।আজ আবার তেমন কুয়াশা ভেজা সন্ধ্যায় সোহানের সাথে বিচ্ছেদ হলো।
জীবন বড় রঙ বদলায়।যাকে একদিন মনে হয়েছে অক্সিজেন সেই এখন কার্বনডাইঅক্সাইড হয়ে গেলো।
চন্দ্রর হাসি পাচ্ছে এসব ভেবে।আফসোস হচ্ছে না মোটেও।
হাসতে হাসতে চন্দ্রর মনে হলো আচ্ছা সোহানের এই রূপ বদল যদি বিয়ের পরে হতো তবে কেমন হতো?
চন্দ্র কিভাবে মেনে নিতো তখন?
আদৌ কি মানতে পারতো?

না-কি বেছে নিতো মায়ের দেখানো পথ?
খুন করতো কি সোহান কে?

চন্দ্র বুঝতে পারলো ও উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে।এলোমেলো চিন্তা করছে।
বারান্দা থেকে গিয়ে নিজের রুমে শুয়ে পড়লো।
ঘুমিয়ে যাওয়ার আগ মুহুর্তে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো আগামীকাল নিজেদের পুরনো বাসায় যাবে।যে বাসায় বাবা মায়ের সাথে ছিলো,তারপর থেকে ফ্ল্যাটটা তালা মারা।

মাঝরাতে চন্দ্রর ঘুম ভেঙে গেলো ফোনের শব্দে।কল রিসিভ করতেই শুনতে পেলো ওপাশ থেকে কেউ গিটারে গান গাইছে,

“ও কারিগর,দয়ার সাগর
ওগো দয়াময়….
চান্নি-পসর রাইতে যেনো,আমার মরন হয়
চান্নি-পসর রাইতে যেনো আমার মরন হয়….

গান শুনতে শুনতে চন্দ্র আনমনা হয়ে গেলো। চোখের কোণ ভিজে উঠলো চন্দ্রর।কি দরদী গলায় গাইছে কেউ।
চন্দ্রর মনে হলো আজ যে জোছনা রাত,আজ যদি চন্দ্রর মরন হতো,কতোই না ভালো হতো।

গান বন্ধ হতেই চন্দ্র শুয়ে পড়লো। ফোনে যে কেউ কানেক্টেড সেই কথা মনে রইলো না চন্দ্রর।
নিষাদের রাত কাটলো চন্দ্রর নিশ্বাসের শব্দ শুনে।

সকালে ৮ টায় ঘুম থেকে উঠে ফোন চেক করতেই চন্দ্র চমকে উঠলো। ৭ ঘন্টা ১২ মিনিট ধরে কল চলছে।কে কল দিয়েছে চন্দ্র তাও জানে না।কল না রেখে এভাবে আছে কেনো কিছুই বুঝতে পারছে না চন্দ্র।
চন্দ্রর মনে হলো কল দেওয়া ব্যক্তি ও হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে তাই আর কল কাটে নি।
তবু শিওর হতে চন্দ্র ফোন কানে নিয়ে বললো,”হ্যালো…..”

নিষাদ জবাব দিলো, “জ্বি বলুন।রাত ভরে তো নিশ্চিন্তে ঘুমালেন।পাহারাদার হিসেবে জেগে জেগে ফোনের এপাশ থেকে পাহারা দিয়ে গেলাম আমি শুধু।
আমার ডিউটি শেষ,এবার আমি ঘুমাই ম্যাডাম।পরে কথা হবে।”

চন্দ্র কিছুই বুঝতে পারলো না। কল দিলো কিন্তু নিষাদ কু রিসিভ করলো না।
চন্দ্র খুব অবাক হলো এই ঘটনায়।

ধানমন্ডি থেকে তেজগাঁও যেতে যেতে চন্দ্রর বুকের ভিতর কেমন ঢিপঢিপ করতে লাগলো।
বারবার মনে হতে লাগলো বাসায় গেলেই যেনো আব্বা আম্মা দুজনেকেই দেখবে।
হয়তো দেখবে দুজনের মধ্যে ভীষণ ভাব।অথবা দেখবে আম্মা ওর জন্য নাশতা রেডি করে বসে আছে।আব্বা বসে বসে চা খাচ্ছে।
কি হতো যদি জীবনটা এরকম হতো চন্দ্রর?
বাবা মা দুজনেই বেঁচে থাকতো।সবার বাবা মায়ের মতো আদর স্নেহ দিয়ে ওকে বড় করতো।
একটা জীবন যাবে চন্দ্রর বাবা মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আক্ষেপ করে করেই।

বাস থেকে নেমে চন্দ্র কিছুটা অবাক হলো। কতো বছর পরে এলো এখানে।সব কিছুই কেমন অচেনা হয়ে গেছে। কিছুই চেনা যাচ্ছে না। চন্দ্রদের বাসা কোনটা সেটাও চন্দ্রর মনে নেই।
কোন দিকে যাবে চন্দ্র বুঝতে পারছে না।
কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে তাও পারছে না।কি বলে জিজ্ঞেস করবে?

চন্দ্র একই জায়গায় ঘুরতে লাগলো।
বয়স্ক এক লোক চন্দ্রকে অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করলেন।তারপর চন্দ্রর কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,”কই যাইবেন আপনি?
কার কাছে আসছেন?”

ইতস্তত করে চন্দ্র বললো,”আমি একটা বাসা খুঁজছি,কিন্তু পাচ্ছি না।বাসার ঠিকানা ও জানা নেই আমার।”

লোকটা জিজ্ঞেস করলো,”কার বাসা?
বাড়িওয়ালার নাম কী?”

চন্দ্র ভাবলো একবার বাবার নাম বলবে।পরে মনে হলো,বাবা মা তো বেঁচে নেই।কে চিনবে তাদের।
একটু ভেবে চন্দ্র জবাব দিলো,”কয়েকবছর আগে এক মহিলা তার স্বামীকে খুন করেছিলেন গলা কেটে,তারপর নিজেও গলায় দড়ি দিয়ে মারা যান।ওনারা আমার বাবা মা ছিলেন।আমি আমাদের পুরনো বাসাটা খুঁজছি।”
লোকটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো চন্দ্রর দিকে। তারপর বললো,”আসেন আমার সাথে।”

চন্দ্রকে নিয়ে লোকটা হাটতে শুরু করলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে চন্দ্র লোকটার পিছু নিলো।

৫ মিনিটের মতো হাটার পর চন্দ্র নিজেই থমকে দাঁড়ালো একটা ৬ তলা বিল্ডিং এর সামনে এসে।লোকটার আর কিছু বলতে হলো না।বিল্ডিংয়ের গেইটের পাশে লিখা আছে,”চন্দ্রমহল”

চন্দ্রর কান্না পেলো ভীষণ। আহারে!
এই তো সেই বিল্ডিং। বিল্ডিংয়ের নীল রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
গেইট জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। বিল্ডিংয়ের সামনে একগলা সমান কচু গাছ জন্মেছে।
গেইটের পাশের বাগানবিলাস গাছটি দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।চারদিকে আগাছা জন্মেছে।কয়েকটি রুমে আলো দেখা যাচ্ছে।
চন্দ্র কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেলো ভিতরের দিকে।
সিঁড়ি ভেঙে চন্দ্র ৩ তলায় উঠলো।বাসার চাবি চন্দ্রর ব্যাগের মধ্যে। চন্দ্র অভ্যস্ত হাতে তালা খুলে নিলো।যেনো বহুদিন ধরে এই বাসার তালা সে খুলছে।
ভিতরে ঢুকতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধে চন্দ্রর বমি পেয়ে গান। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সুইচ টিপে বাতি জ্বালানো।
সদর দরজা বন্ধ করে দিয়ে তাকালো বসার ঘরের দেয়ালের দিকে।
এই ঘরে কেটেছে জীবনের ৮ টা বছর।
ধুলোমাখা ঘরের সব আসবাবপত্র। চন্দ্র সোজা বাবা মায়ের রুমে গেলো।
চন্দ্রর মনে পড়ে গেলো সেই রাতের কথা।বিছানা বালিশ সব আগের মতো আছে।শুধু মানুষ নেই।
বুকের ভিতর কেমন খাঁখাঁ মরুভূমির মতো লাগছে।তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেছে,অথচ এক ফোঁটা পানি দেয়ার মতো কেউ নেই এখানে।
চন্দ্র ঘুরে ফিরে সব দেখলো।

নিজের রুমে গেলো।রুমটা আগের মতো আছে।বিছানা বালিশ সব ঠিকঠাক করে পাতা আছে।জেমেছে শুধু ধুলোর আস্তরণ।

আবারও আব্বার রুমে গেলো।এই রুমটা পুরোপুরি আব্বার দখলে থাকতো।চন্দ্র তার আম্মাকে কখনো দেখে নি এই রুমে ঢুকতে কোনো প্রয়োজনে। যেনো রুমটা অচেনা কোনো মানুষের।
এমনকি ঝাড়ুও চন্দ্রর বাবা নিজে দিতো নিজের রুমে।

চন্দ্র বাবার আলমারি খুললো।আলমারিতে দেখলো বাবার কতো জামাকাপড় রয়েছে।ইঁদুর কেটে শতচ্ছিন্ন করে রেখেছে সব।
আলমারি থেকে কেমন পঁচা একটা উৎকট গন্ধ আসছে।
চন্দ্র সব কাপড় বের করলো আলমারি থেকে।কাপড়ের ভাজ থেকে একটা নীল রঙের রুমাল পড়লো।
চন্দ্র রুমালটা তুলে নিলো।রুমালের কোণে ছোট অক্ষরে লিখা আছে “আপনার জন্য ভালোবাসা ”

চন্দ্রর বুকের ভিতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠলো লিখাটা পড়ে।
তবে কি আব্বা কোনো পরকীয়ায় জড়িয়েছিলেন?

চন্দ্রর স্পষ্ট মনে আছে মা এসব সুই সুতো দিয়ে কিছু বানাতে বা লিখতে পারতো না।
একটা বালিশের কাভারে একবার ফুল তুলতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে রেখে দিয়েছিলো।চন্দ্র তখন হাতে নিতেই আম্মা চিৎকার করে বলেছিলো,”ছুঁবি না খবরদার। আমার জীবনের প্রথম সুই সুতোর কাজ এটা,আমি চেষ্টা করবো। হাত ও লাগাবি না এটাতে।”

চন্দ্র অবশ্য কখনো আর দেখে নি আম্মাকে এসবে হাত দিতে।
সেই কাভারটা খুঁজতে চন্দ্র দৌড়ে নিজের রুমে গেলো।ওয়ারড্রব তন্নতন্ন করে খুঁজে অবশেষে পেলো কাভারটা।
হাতের লিখা মিলিয়ে দেখলো চন্দ্র।বালিশের কাভারে চন্দ্রর আম্মা লিখার চেষ্টা করেছিলো,”রঙিলা কষ্ট”
অন্যপাশে লিখতে চেয়েছিলো,”জীবনের গল্প”
রঙিলা কষ্ট লিখা হয়েছে কিন্তু জীবনের গল্প লিখা হয় নি।তার আগেই তার জীবন থেমে গেছে।

চন্দ্রর মাথায় ঘুরতে লাগলো একটা কথা।
বাবার আলমারির এই রুমাল তবে কে দিয়েছে বাবাকে?
এরকম করে লিখা কয়েকটা ওয়ালম্যাট চন্দ্র কোথায় যেনো দেখেছে বলে মনে হলো।
কিন্তু স্পষ্ট হলো না কোথায় দেখেছে।

ধুলোবালিতে মাখা ফ্লোরে চন্দ্র বসে গেলো ধপ করে।মাথার রগ দপদপ করছে।চন্দ্র মাথা চেপে ধরে বসে রইলো।
কে লিখেছে এই রুমাল তবে?কি আশায় বাঁধি খেলাঘর (০৮)

চন্দ্র বাসা থেকে বের হলো বিকেল বেলায় তীব্র মাথা ব্যথা নিয়ে।
মনের মধ্যে একটা কৌতুহল চন্দ্রর সবসময়ই ছিলো জানার যে কেনো চন্দ্রর আম্মা এরকম করেছে।জানার উপায় ও আছে চন্দ্রর।আম্মার রেখে যাওয়া ডায়েরি।
কিন্তু তবুও চন্দ্র এতোদিন ডায়েরিটা পড়ে নি।
প্রবল ইচ্ছে থাকার পরেও কোথায় যেনো একটা বাঁধা পায়।
কিসের সেই বাঁধা চন্দ্র জানতো না এতোদিন।আজ বুঝতে পারছে সেই বাঁধা কী।
আব্বার সাথে কখনো কথা না হলেও অবচেতন মন চায় না ডায়েরি পড়ে আব্বার সম্পর্কে চন্দ্রর খারাপ ধারণা জন্মাক,তাই এতোদিন বাঁধা পেতো চন্দ্র।
বাবার সাথে সম্পর্ক না থাকুক তবুও তো তিনি জন্মদাতা পিতা।
তিনি কখনো হয়তো কথা বলেন নি,আদর করেন নি।কিন্তু মাঝেমাঝে যে নীল দুচোখ মেলে গভীর ভালোবাসার দৃষ্টিতে চন্দ্রর দিকে তাকিয়ে থাকতেন অপলক সেই দৃষ্টিতে চন্দ্র খুঁজে পেতো তার জন্য
আবনার বুকের ভিতর জমে আছে এক বুক ভালোবাসা।
কিসের এতো প্রতিবন্ধকতা ছিলো আব্বার যে চন্দ্রকে কখনো তিনি ডাকেন নি,কথাও বলেন নি।
অথচ ঠিকই বাড়ির নাম রেখেছেন চন্দ্রমহল। শুধু এই বাড়িটা না।ঢাকা শহরে এরকম বেশ কয়েকটা বাড়ি আছে চন্দ্রর নামে,বাড়ির নেমপ্লেটেও লিখা সব বাড়িতে চন্দ্রমহল,চন্দ্রাবাস,চন্দ্রাবতীর আবাসস্থল এরকম নাম।
যে মানুষকে চন্দ্র কাগজে কলমেই শুধু আব্বা বলে জানতো তিনি কেনো সব কিছুতে এভাবে চন্দ্রর নাম দিয়ে যাবেন,অথচ কখনো কথা বলে নি চন্দ্রর সাথে তিনি।

আর পারছে না চন্দ্র ভাবতে। যতোই ভাবছে ততই বুঝতে পারছে বাবার জন্য ওর মনে ভীষণ ভালোবাসা জন্মে আছে।কবে এতো ভালোবাসা জন্মেছে চন্দ্র বুঝতে ও পারে নি।

মায়ের ডায়েরিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ গন্ধ শুঁকলো চন্দ্র।পুরনো কাগজের গন্ধের বাহিরেও একটা মা মা গন্ধ লেগে আছে এই ডায়েরিতে।
চন্দ্রর ইচ্ছে হলো সারাজীবন এই গন্ধ মেখে বসে থাকার।যাতে মনে হয় মা সবসময় ওর সাথে আছে।

ডায়েরি খুলতেই ভালো করে খেয়াল করলো একটা বিষয়।
রুমালে লিখার সাথে মায়ের লিখার কোনো মিল নেই।
চন্দ্র পুরোপুরি নিশ্চিত হলো এই রুমাল অন্যকারো লিখা।
ডায়েরির তারিখ দেখে বুঝলো চন্দ্র এই ডায়েরি চন্দ্রর জন্মের আগে থেকে লিখতো চন্দ্রর আম্মা।

যখন থেকে আব্বার সাথে আম্মার ভালোবাসা ছিলো সেই সময়ের কথা থেকে সব কিছু লিখা ডায়েরিতে। চন্দ্র এক নাগাড়ে পড়তে লাগলো। পড়তে পড়তে কিছুক্ষণ পর পর চোখ মুছলো।
আহারে ভালোবাসা!
আম্মার জন্য আব্বার কি পরিমাণ ভালোবাসা ছিলো তা যতোই পড়ছে ততোই চন্দ্র মুগ্ধ হচ্ছে।

কতগুলো পৃষ্ঠা বিরতিহীনভাবে পড়ে ফেললো চন্দ্র।টের পেলো বুকের ভিতর এক ঝড় উঠেছে। সেই ঝড় লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে চন্দ্রর বুক।

কলিং বেলের শব্দ শুনে চন্দ্র হকচকিয়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কখন যে সন্ধ্যা নেমেছে বুঝতেই পারে নি চন্দ্র।ডায়েরিটা আগের জায়গায় রেখে দিলো।
এতোদিনে চন্দ্র বুঝতে পারলো কেনো আম্মা তাকে আব্বার কাছে যেতে দিতো না।আব্বার থেকে দূরে দূরে রাখতো।কেনো আম্মা তাকে এতো অবহেলা করতো।সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলো চন্দ্র।

দরজা খুলে দেখে মনোয়ারা বেগম দাঁড়িয়ে আছে,হাতে একটা টিফিনবাক্স। চন্দ্র ভেবেছে প্রভা এসেছে।পরে মনে হলো প্রভা তো এখন টিউশনিতে,তারপর কম্পিউটার ক্লাস করবে প্রভা।বাসায় ফিরবে নয়টার সময়।
মনোয়ারা বেগমের হাতের টিফিনবাক্স দেখে চন্দ্রর মনে পড়লো আজ সারা দিন চন্দ্র কোনো খাবার খায় নি।
খাবারের কথা মনে পড়তেই চন্দ্রর প্রচন্ড খিদে পেলো।

মনোয়ারা বেগম বললেন,” বুঝলে মা।আজ একটা আনন্দের দিন আমার সংসারে।তাই ভাবলাম তোমার জন্য ও বিরিয়ানি নিয়ে আসি।আমার ছেলেটা আজকে ভীষণ খুশি।আমার মনে হলো বিরিয়ানি হয়তো তোমার প্রিয় খাবার হবে।”

বক্সের ঢাকনা খুলতেই বিরিয়ানির সুঘ্রাণ চন্দ্রর নাকে এসে লাগলো।
লাজলজ্জা ভুলে গিয়ে চন্দ্র গপাগপ খাওয়া শুরু করলো মনোয়ারা বেগমের সামনে।
মুগ্ধ হয়ে মনোয়ারা বেগম তাকিয়ে রইলেন মেয়েটার দিকে।মেয়েটার নীল চোখ দুটো থেকে থেকে জলে টইটম্বুর হয়ে যাচ্ছে খেতে খেতে।

চন্দ্রর ভীষণ কান্না পাচ্ছে।এই অচেনা মহিলাটি এতো বেশি ভালো কেনো চন্দ্র জানে না।

খাওয়া শেষ করে চন্দ্র বক্সটা নিয়ে ফ্রিজে রেখে দিলো প্রভার জন্য।তারপর বললো,”বিরিয়ানি আমার প্রিয় আপনি কিভাবে জানলেন চাচী?”

মনোয়ারা বেগম হেসে দিলেন চন্দ্রর প্রশ্ন শুনে। তারপর বললেন,”তুমি এখানে আসার পর এই নিয়ে দুদিন রেস্টুরেন্ট থেকে বিরিয়ানি অর্ডার করে এনেছো,দারোয়ান থেকে জানতে পারলাম আমি।তাই বুঝতে পারলাম বিরিয়ানি তোমার প্রিয় খাবার।আমার নিষাদের ও প্রিয়। স্পেশাল কোনো দিন হলে ও বিরিয়ানি করতে বলে,যেদিন ও অত্যধিক খুশি থাকে সেদিন ও বিরিয়ানি করতে বলে। ”

চন্দ্র জিজ্ঞেস করলো,”আজকে কি স্পেশাল কোনো দিন চাচী?”

মনোয়ারা বেগম বললেন,”আজকে স্পেশাল না শুধু একটা অত্যন্ত খুশির দিন আমার ছেলের। জানো আমার নিষাদ একটা মেয়েকে পছন্দ করেছে।প্রথম দেখায় একেবারে ছেলে ভালোবেসেই ফেলেছে।এখন না-কি বৌমার নাম আর ফোন নাম্বার কালেক্ট করতে পেরেছে,গতরাতে বৌমা’কে কল দিয়েছে নিষাদ।কথা ও হয়েছে নাকি অল্প একটু।
তাই তো আজকে আমরা ভীষণ খুশি।”

চন্দ্রর হেঁচকি উঠে গেলো মনোয়ারা বেগমের কথা শুনে।
পানি খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো,”বৌমা বলছেন যে চাচী,বিয়ে ও হয়েছে না-কি? ”

“আরে না,বিয়ে এখনো হয় নি।কিন্তু হবে তো একদিন।পরে হলেও বৌমা বলবো তাই এখন থেকেই বলছি। নিষাদ আমাকে মেয়েটার নাম বলে নি বুঝলে,ও বলে যেদিন তোমাদের সামনে নিয়ে আসবো সেদিন তার থেকেই শুনবে ওর নাম।তখন বুঝবে নামের সাথে একজন মানুষের কি পরিমাণ মিল থাকে।”

চন্দ্র অবাক হলো শুনে।পৃথিবীতে এতো ভালো মানুষ ও আছে?
ছেলে এখনো প্রেম ও করতে পারে নি,বিয়ে তো পরের কথা তবুও তারা কী সুন্দর করে মেয়েটাকে আপন করে ফেলেছে।
চন্দ্রর কিছুটা হিংসে হলো।তার ভাগ্য এরকম হলে কী ক্ষতি হতো?
এভাবে যদি সোহানের বাবা মা মেনে নিতো!

সেই অচেনা মেয়েটা যে অসম্ভব ভাগ্যবতী একটা মেয়ে চন্দ্র নির্দ্বিধায় মেনে নিলো।
মনোয়ারা বেগম চন্দ্রর দিকে এগিয়ে এসে বললেন,”তোমার যদি কাজ না থাকে আমার সাথে একটু শপিং এ যাবে মা?”

চন্দ্র ভেবে দেখলো এখন ওর কিছু করার নেই আসলে।তাই রাজি হয়ে গেলো।

ফ্ল্যাটের চাবি একটা প্রভার কাছে আছে।চন্দ্র মেইন দরজার সাথে একটা নোট লিখলো প্রভার জন্য,”ফ্রিজে বিরিয়ানি আছে,গরম করে খেয়ে নিস।রান্না করতে যাস না।রাতে আমি এলে আবার কিছু বানিয়ে নিবো।”

মনোয়ারা বেগম মুগ্ধ হলেন চন্দ্রর কাজে।প্রভা মেয়েটার সাথে চন্দ্রর রক্তে কোনো সম্পর্ক নেই তবুও কি টান চন্দ্রর প্রভার জন্য।কতো চিন্তা ওর জন্য।
এই মেয়েটাকে মনোয়ারা বেগমের ভীষণ ভালো লাগলো এই ছোট্ট কাজটার জন্য।

মনোয়ারা বেগম আজকে গাড়ি নিয়ে বের হলেন।নিজেই ড্রাইভ করলেন।চন্দ্র পাশে বসলো।

যেতে যেতে চন্দ্র জিজ্ঞেস করলো,”এখন কী কেনাকাটা করবেন চাচী?”

“আর বলো না মা আমার গাঁধা ছেলেটা দেখা যাবে হুট করে একদিন বৌমা কে নিয়ে আসবে বাসায়।তখন আমি বৌমার মুখ দেখে কী দিব হাতে বলো?
তাই আগেই একটা শাড়ি,একটা থ্রি-পিস,একটা নাকফুল,একটা রিং কিনে রাখবো।”

চন্দ্র মুগ্ধ হলো মনোয়ারা বেগমের কথা শুনে।

চন্দ্র নিজে পছন্দ করে দিলো একটা ল্যাভেন্ডার কালারের জামদানী শাড়ি,একটা পাকিস্তানি থ্রিপিস,একটা ডায়মন্ডের নাকফুল আর রিং।

মনোয়ারা বেগম ও পছন্দ করে একটা রিং নিলেন।

পথে এসে গাড়ি থামিয়ে মনোয়ারা বেগম ফুল নিলেন।
সব কেনাকাটা করে বাসায় ফিরতে রাত ১০ টা বাজলো।

চন্দ্র লিফটের দিকে এগিয়ে যেতেই মনোয়ারা বেগম ডাক দিলেন।তারপর এসে নিজে পছন্দ করে নেওয়া রিং টা চন্দ্রর হাতে দিয়ে বললেন,”সেদিন তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ,সেই উপকারের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই রিংটা দিলাম। জানি যে উপকার করেছ এই সামান্য রিং এ তার প্রতিদান দেওয়া যাবে না।এটা শুধুই আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চিহ্ন।তোমার হাতে বেশ মানাবে।”

তারপর সোজা চলে গেলেন নিজেদের ফ্ল্যাটের দিকে।
চন্দ্রর চোখের কোণ ভিজে গেলো।কখনো কেউ এভাবে নরম স্বরে চন্দ্রর সাথে কথা বলে নি।
আজ মনে হচ্ছে চন্দ্রর জীবন খারাপ না,জীবন সুন্দর।

বাসায় গিয়ে দেখে প্রভা পড়ছে সোফায় বসে বসে।চন্দ্র প্রভাকে বললো,”আমি আমার রুমে যাচ্ছি।খাবার অর্ডার করেছি পার্সেল আসলে রিসিভ করিস,পেমেন্ট করা আছে।আমাকে ডাকবি না।আমার সময় হলে আমি রুম থেকে বের হবো।”

প্রভা কিছুই বুঝতে পারলো না কি হয়েছে চন্দ্রর হঠাৎ করে। চন্দ্র কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
আবারও বসলো ডায়েরি নিয়ে।

ডায়েরি পড়া শেষ হলো চন্দ্রর রাত দু’টো বাজে।বসা থেকে উঠলো চন্দ্র প্রচন্ড মাথা ব্যথা নিয়ে।সেই সাথে আব্বার সম্পর্কে জানতে পারলো অনেক তথ্য। চন্দ্র জানে না কেনো যেনো চন্দ্রর মনে হচ্ছে চন্দ্রর আম্মা যা লিখেছে তা হয়তো তিনি মিথ্যে লিখেছেন অথবা তিনি আসল সত্য জানতে পারেন নি।
কেনো যেনো একটা স্থির বিশ্বাস জন্মালো চন্দ্রর যে চন্দ্রর আব্বা এরকম খারাপ লোক ছিলেন না।
আম্মা সত্যিটা না জেনেই তিনটি জীবন নষ্ট করেছে।

চন্দ্র ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করলো।রুমালের লিখাটা এখন আর চন্দ্রর অচেনা লাগছে না।বরং চন্দ্র জানে এই রুমালটা খালামনি লিখেছে।

চন্দ্রর তাৎক্ষণিক মনে হলো,খালামনি কি তবে আব্বার প্রেমে পড়েছিলেন?
নয়তো কেনো আব্বাকে এই রুমাল দিবেন খালামনি?
কেনো বাবার বাড়ির সবাই আম্মার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরেও খালামনি আম্মার সাথে যোগাযোগ রেখেছেন,নিয়মিত চন্দ্রদের বাসায় ও যেতেন বেড়াতে?

ঘুমাতে গেলো প্রচন্ড মাথা ব্যথা নিয়ে। বিছানায় শুয়ে ফোন চেক করে দেখলো গতরাতের সেই নাম্বার থেকে কল এসেছে কখন যেনো।ডায়েরি পড়াই মগ্ন থাকায় চন্দ্র খেয়াল করে নি।

চন্দ্র আর কল দিলো না।শুয়ে পড়লো।কাল থেকে তার অনেক কাজ।

.

চন্দ্র খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলো। মাথা ব্যথা এখনো কমে নি।উপরন্তু বেড়েছে।
ফোন চেক করতেই দেখলো সেই নাম্বার থেকে একটা টেক্সট এসেছে,

“ব্যর্থ হয়ে থাকে যদি প্রণয়ের এতো আয়োজন,
আগামী মিছিলে এসো
স্লোগানে স্লোগানে হবে কথোপকথন।

আকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো,
ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি
লাল শাড়িটা তোমার পড়ে এসো। ”

চন্দ্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ফোনের স্ক্রিনের দিকে।তারপর চন্দ্রর মনে পড়ে গেলো সোহানের কথা।দাঁত কিড়মিড় করে চন্দ্র রিপ্লে দিলো,”ছ্যাচড়ামি অন্য কারো সাথে করেন।এসব পুতুপুতু কথা শুনিয়ে অন্য কাউকে পটানোর চেষ্টা করেন।আমার সাথে এসব করে লাভ নেই।”

নিষাদ মেসেজটা দেখলো সকালে নাশতার টেবিলে। চন্দ্র তখন বাসে,খালামনির বাসায় যাচ্ছে।
নিষাদ মেসেজ দিলো আবার,
“তোমার জন্য সকাল, দুপুর
তোমার জন্য সন্ধ্যা
তোমার জন্য সকল গোলাপ
এবং রজনীগন্ধা।”

মেসেজটা পড়ে চন্দ্রর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।

চন্দ্র রিপ্লে দিলো,”আপনি একটা ফালতু লোক।”

নিষাদ সাথে সাথে মেসেজ দিলো আবার,”ভালোবেসেই নাম দিয়েছি ‘তনা’
মন না দিলে
ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা।”

মেসেজটা পড়ে চন্দ্র হাহাহা করে হেসে উঠলো ভরা বাসের মধ্যে। বাসের সব মানুষ চন্দ্রর দিকে তাকিয়ে রইলো হাসি শুনে।
চন্দ্র কিছুটা লজ্জা পেলো।মনে মনে বললো,”এই লোক তো বেশ পাজি!”
আর রিপ্লে দেয়ার রিস্ক নিলো না চন্দ্র।কে জানে আবার কি মেসেজ দেয় আর চন্দ্র হয়তো খালামনির সাথে সিরিয়াস কথা মাঝখানে তখন হেসে উঠবে।

চলবে……?

কবিতা:(কবি হেলাল হাফিজ)

লিখা:জাহান আরা

চলবে??

লিখা: জাহান আরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here