কুহকিনী পর্ব শেষ

0
180

#গল্প_কুহকিনী
#Tuhina pakira
পর্ব: ৪/last part

অষ্টমীর সকাল মানে সময়টা একটু অন্যরকম। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় মণ্ডপে মণ্ডপে লোকজনের সমাহার। ছোটো বড়ো প্রায় প্রত্যেক রমণী আজ নিজেকে শাড়ির ভাঁজে সাজাতে পছন্দ করে, অপর দিকে প্রতিটা ছেলে পাঞ্জাবি। সকাল সকাল অঞ্জলী সেরে সকলে হাতে হাত দিয়ে রওনা
দেয় নিজেদের পছন্দের স্থানে।

দেখতে দেখতে অষ্টমী যে কখন চলে এসেছে কে জানে। ভালো মুহূর্ত গুলো একটু তাড়াতাড়ি কেটে যায়। এই তো দুদিন আগে অহন আর কুহকিনী নিজেদের মধ্যে ছোটো খাটো দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিল, আর আজ একজন অপর জনের উপর অভিমান করে রয়েছে। আর অপর জন বুঝতেই পারছে না, বিষয়টা কি?

সকাল সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙলো অহনের, কুহকিনী তখন নিজের শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে ব্যস্ত। ঘুম ভেংগে মায়াবিনী কে দেখে ঘুমের রেশটাই কেটে গেল অহনের। তার বউকে এতো অপরূপ লাগে শাড়ি পড়লে, তাতো সে জানতো না।

হঠাৎই নিজের পায়ের কাছে কাউকে দেখে দু পা পিছিয়ে গেল কুহকিনী। ওকে পিছিয়ে যেতে দেখে অহন ওর হাত ধরে আটকালো, তারপর নিজেই শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দিতে লাগলো। অন্য সময় হলে কুহকিনী কিছু একটা অহনকে বললেও এই মুহূর্তে ও চুপ করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। মাঝে মাঝে আড়চোখে অহনের দিকেও তাকাচ্ছে।

শাড়ির কুঁচি ঠিক করে উঠে দাঁড়ালো অহন। নিজের দুই হাত ভাঁজ করে কিছুক্ষণ কুহকিনীকে দেখে ওয়াশরুমে চলে গেল। কুহকিনী ওর যাবার দিকে তাকিয়ে মুখ ফুলিয়ে ফেললো। বিরবির করে বললো, ” কথা বলবো না, কাল আমাকে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যায়নি।”

•••••••
রাত ১০,,

ঠাকুর দালানের সিঁড়িতে গালে হাত দিয়ে বসে আছে কুহকিনী। আর মাঝে মাঝে নিজের ফোনের হোয়াটস অ্যাপে বন্ধুদের স্ট্যাটাস পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। ইশ, সবাই কতো মজা করছে। আর ও কিনা এইখানে একা একা বসে রয়েছে। গতকাল সপ্তমীতে অহনকে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যেতে বললে , ও বলেছিল সবাই যাবে ওদের সঙ্গে চলে যেতে। কিন্তু কুহকিনীর ইচ্ছে ছিল অহনের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবার। তাই জন্যে এখনও পর্যন্ত অহনের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেনি। কিন্তু আজ অহন ওকে সকলের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যেতে বললে কুহকিনী অভিমান করে বলেছে, ও যাবেনা। আর অহনও ওকে রেখেই চলে গেছে।

কুহকিনীর রাগে দুঃখে কান্না পাচ্ছে। ওর ননদেরা, জা সকলেই নিজেদের মতো বেরিয়েছে, কেবল ওই এখানে একা বসে রয়েছে। বাড়ির বড়োরা সকলে ভিতরের ঘরে আড্ডা দিচ্ছে। চোখের জল মুছতে মুছতে কুহকিনী বললো,

-” আমি যেই যাবোনা বললাম, ওমনি নাচতে নাচতে চলে গেল। কেনো জোর করলে কি হতো? আমি তো তবে যেতাম। অষ্টমী শেষ, কাল নবমী মানে পুজোও প্রায় শেষ। এতো তাড়াতাড়ি কেনো যে বিয়ে হলো, আর কয়েকদিন পর হলেই তো ভালো হতো। আগের বছর সারারাত ঠাকুর দেখেছি, আর এই বছর,,,,” ভাবতেই আবারও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।

-” এই যে এটা দিয়ে চোখের জল গুলো মুছে নাও, নাহলে তোমাকে পুরো পেঁচার মতো লাগবে।”

পাশে অহনের গলা শুনে কুহকিনী চোখ দুটো ভালো করে মুছে ওর পাশে তাকালো।

-” কোথায়, কে কাঁদছে? আমি কাঁদিনি তো!”

অহন কুহকিনীর হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিল।

-” কে কাঁদছে, সে তো আমি দেখতেই পাচ্ছি। এখন চলো আমার সঙ্গে। আর বেশি কাঁদতে হবে না, আমরা দুজনে এখন ঘুরবো। ”

-” যাবো না আমি। ”

-” না গেলে কোলে করে নিয়ে যাবো বলে দিলাম। ”

অহন থামলো না,কুহকিনীর হাত ধরে বাইরে চলে গেল। কুহকিনী কে গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে কোথায় একটা গেল। অহন চলে যেতেই কুহকিনীর
মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পর অহন একটা বাইক নিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো।

-” উঠে পড়ো তাড়াতাড়ি।”

অহনের বলতে দেরি, কুহকিনী গাড়িতে উঠে অহনের কাঁধে হাত রেখে দিল। অহন বাইক স্টার্ট দিল। একে একে তারা কয়েকটা প্যান্ডেল ঘুরে ফেলেছে। অহন মন দিয়ে বাইক চালাচ্ছিল, হঠাৎ কুহকিনী ওর পিঠে নিজের মাথা এলিয়ে দিল।

-” কী হলো খারাপ লাগছে?”

অহনের কথায় কুহকিনী হেসে উঠলো, ” আমার খারাপ লাগছেনা, আমার তো খুব খুব ভালো লাগছে। মনটা যেনো আনন্দে লাফিয়ে উঠছে। ”

-” তো আমাকে কাল বললেই হতো তুমি আমার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যেতে চাও। আমি কী তোমাকে নিয়ে যেতাম না।”

-” আপনি না করতেন না, তারমানে? ”

-” কী মনে হয়?”

-” ইশ, বর টা আমার কি ভালো।”

পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে অহনের গাল দুটো টেনে দিলো কুহকিনী।

——

দেখতে দেখতে নবমী কেটে গিয়ে দশমী। বিকেল চারটে নাগাদ হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরলো কুহকিনী। কাল রাত 2টা নাগাদ একটা ইমারজেন্সি অপারেশনের জন্য ওকে হসপিটালে যেতে হয়েছিল। অহন তখন ঘুমে মগ্ন, ওকে ডাকতেও পারছিল না।
পড়ে ওর শ্বশুর মশাইয়ের সহযোগিতায় ও ওতো রাতে হসপিটালে পৌঁছায়।

নীচে সকলের সঙ্গে কথা বলে ঘরে ঢুকতেই কারো হাতের শক্ত বাঁধনে বন্দি হলো কুহকিনী। হ্যাঁ, অহন ওকে জড়িয়ে ধরেছে।

-” কী হলো আমাকে এই ভাবে জড়িয়ে ধরলেন কেনো? ”

অহন কুহকিনীকে আরেকটু নিজের সঙ্গে মিশিয়ে বললো, ” তুমি খুব খারাপ কুহু, তুমি জানো আজ সকালে তোমাকে না দেখে আমার কী কষ্ট হচ্ছিল। ”

এতক্ষণ অহন কুহকিনীকে জড়িয়ে ধরলেও কুহকিনী ধরেনি, কারণ ও প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনি। এবার অহনের কথায় ও অহনকে জড়িয়ে ধরলো,

-” আপনার তবে কষ্ট হয় অহন!”

-” হয়তো, খুব কষ্ট হয়। তোমাকে চোখের সামনে না দেখলে সব কিছু কেমন যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়। তুমি জানো মা যদি না বলতো তুমি হসপিটালে গিয়েছো, তাহলে আমি তো, ”

-” তুমি তো কি অহন?”

অহন কিছু বললো না, চুপ করে কুহকিনীকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

-” কী হলো বললেন না যে!”

-” আচ্ছা বলতে হবে না, এখন আমাকে ছাড়ুন। কেউ এসে আমাদের এই ভাবে দেখলে কি বলবে বলুনতো!”

-” না ছাড়বোনা, আমার এই ভাবে থাকতে ভালো লাগছে। আর এটা তোমার শাস্তি আমাকে না বলে যাওয়ার।”

-” বাহ্ শাস্তিটা আমার বেশ ভালো লেগেছে।”

দুই জনে ওই ভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো, সময়ের কোনো হিসেব নেই। কিছুক্ষণ পর কুহকিনী বললো,

-” ভালোবাসেন আমাকে?”

কথাটা শুনে অহন কুহকিনীকে নিজের বাহু বন্ধন থেকে মুক্ত করে কিছুক্ষণ পলকহীন ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আচমকা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু কুহকিনী হতভম্বের মতো ওর দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষনেই মনে পড়লো, অহন ওকে কুহু বলে ডাকছিল।

——

দেখতে দেখতে দেবী দুর্গার বিসর্জন লগ্ন চলে এলো। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই গঙ্গা। রাত তিনটার দিকে দেবী মাকে জলে বিসর্জন দেওয়া হতেই একে একে সকলে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। কাল থেকে সকলকে আবার নিজের নিজের আগের জীবনে চলে যেতে হবে। পুজোর কটা দিন আনন্দ উল্লাসে কাটলেও শেষ বেলাটা কেনো যেনো দুঃখ লাগে। আবার পরের বছরের অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু হয়।

সকলে চলে গেলেও নদীর তীরে শান বাঁধানো ঘাটে জলে পা ডুবিয়ে বসে রয়েছে অহন ও কুহকিনী।

-” আজ সারাটা দিন তোমাকে না দেখে কোথাও একটা হারানোর ব্যথা উপলব্ধি করেছি ঠিকই। তবে, আমি যদি বলি তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি তবে সেটা ভুল বলা হবে কুহু। আমি তো সবে তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি। তবে এই পবিত্র ভালবাসা তো চিরকাল থাকবে। দিন শেষে ভালোবাসা হয়ে তুমিই থাকবে। ”

অহনের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো কুহকিনী। দেখতে দেখতে কতোটা সময় পেরিয়ে গেছে হিসেব নেই। আস্তে আস্তে সকাল হয়ে এসেছে। গঙ্গার ঘাটে লোকজন আসতে শুরু করেছে। অহন, কুহকিনী উঠে দাঁড়ালো। চোখে এসে পড়লো সূর্য কিরণের প্রথম রশ্মি। অহন হেসে কুহকিনীর হাত ধরলো। হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। সকালের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় কুহকিনীকে বারবার কেঁপে উঠতে দেখে কুহকিনীর শাড়ির আঁচলটা ওর গায়ে জড়িয়ে দিলো অহন। তারপর নিজের বউয়ের হাতটা যত্ন করে ধরে বললো,

-” সূর্যের প্রথম রশ্নির মায়াবিনী হয়ে সারাটা জীবন থেকে যেও প্রিয়। কখনো হারাতে পারবো না।”

(সমাপ্ত)
{ বিঃ : গল্পটি ছোটো গল্পঃ বলেছি, যদিও বা আর কয়েক পর্ব পর শেষ করতাম। কিন্তু এখনই শেষ করলাম। কয়েকদিন যাবৎ মাথা ব্যথা করছে, চেয়েও লিখে ওঠা হচ্ছে না। তার জন্যে দুঃখিত। আর এখন কিছুদিন ধারাবাহিক গল্পঃ দেবো না। নিজেকে একটু সময় দিতে চাই। ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। হ্যাপি রিডিং }

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here