চন্দ্ররঙা_প্রেম_২ পর্বঃ১২

0
131

চন্দ্ররঙা_প্রেম_২
পর্বঃ১২
#আর্শিয়া_সেহের

উর্বিন্তা স্কুলের মধ্যে একটা চক্কর মেরে বেরিয়ে এলো। শান্ত ফোন করে বলেছে সাঁঝকে একটু দেখে রাখতে। শানের আসতে এখনো দশ মিনিটের মতো লাগবে। উর্বিন্তা বাইরে এসে সাঁঝ আর সিনিমের কাছে দাঁড়ালো। মাহিম বেলুন‌ উড়াতে উড়াতে খানিকটা দূরে চলে গেছে।
সাঁঝ উর্বিন্তার দিকে মলিন মুখে তাকিয়ে বললো,
-“আমার খুব খিদে পেয়েছে উর্বি আন্টি।”
উর্বিন্তা হেঁসে বললো,
-“দাঁড়া এখানে। আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
উর্বিন্তা পেছনে তাকিয়ে মাহিমকে ডাক দিলো সে খাবে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করার জন্য। ঠিক তখনি মাহিমের একদম পাশ ঘেঁষে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে পড়লো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোঁ মেরে গাড়িতে তুলে নিলো মাহিমকে। মাহিমের হাতে থাকা গোলাপী রঙের বেলুনটা ফুটপাতে পড়ে গেলো।

চোখের সামনে কি হয়ে গেলো সেটা বুঝতে উর্বিন্তার কিছুক্ষণ সময় লেগে গেলো। হুঁশ ফিরলো দারোয়ানের চিৎকারে।‌ ততক্ষণে মাইক্রোবাস ছেড়ে দিয়েছে। উর্বিন্তা সাঁঝ আর সিনিমকে দারোয়ানের কাছে দিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে পড়লো । দারোয়ানকে চিৎকার করে বললো,
-“ওদের দু’জনের থেকে নাম্বার নিয়ে ওদের বাড়িতে ফোন দিন আর্জেন্টলি। আর ওদের খেয়াল রাখুন।”
উর্বিন্তা তার ড্রাইভারকে বললো মাইক্রোবাসটা ফলো করতে। নিজেও শান্তকে কল করলো। ফোনের লোকেশনও অন করে রাখলো উর্বিন্তা।

বিশ‌ বারের মতো কল করেও শান্তর কোনো রেসপন্স পেলো‌ না উর্বিন্তা। হয়তো গোসল করছে বা খাচ্ছে। উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপছে তার। মাইক্রোবাসটা তাদের থেকে অনেকটা দূরে। উর্বিন্তা বুঝতে পারছে না কি করবে। ওর কাছে সাহায্য চাওয়ার মতো তার বাবা ছাড়া আর কারো নাম্বার নেই। উর্বিন্তা অনেক ভেবে তার বাবাকে ফোন করলো। ততক্ষণে গাড়ি মেইন রাস্তা ছেড়ে একটা শুনশান রাস্তায় ঢুকে পড়েছে।‌ উর্বিন্তা আশেপাশে‌ তাকিয়ে ঢোক গিললো। ড্রাইভারটাও এখন ভয় পাচ্ছে।

বাবার থেকেও কোনো রেসপন্স পেলোনা উর্বিন্তা। বিপদে পড়লে চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে । হঠাৎ ড্রাইভার বলে উঠলো,
-“ছোট ম্যাডাম, ওদের গাড়ির গতি কমায় দিছে।”
উর্বিন্তা বড় বড় চোখ করে সামনের দিকে তাকালো।‌ আশেপাশের কয়েকটা ছবি উঠিয়ে শান্তর ইনবক্সে পাঠিয়ে দিলো যেন ও বিপদে পড়লেও ওরা জায়গাটা চিনে কাছাকাছি আসতে পারে।
উর্বিন্তা ফোনের দিকে নজর রাখা অবস্থাতেই কাঁচ ভাঙার আওয়াজ হলো।‌ সাথে সাথেই ব্রেক কষে থেমে গেলো মৃদু গতিতে চলতে থাকা গাড়িটি। ব্যাকসিট থেকে উঁকি মেরে দেখলো চারজন লোক তার গাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে।

উর্বিন্তা মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়া শুরু করে দিয়েছে। ফোনটা সাইলেন্ট করে স্কুল ব্যাগে পুরে পিঠে নিয়ে নিলো।‌ ব্যাগের বেল্টটা পেছন থেকে এনে পেটের সাথে লক করে দিলো। তাকে যেখানেই নিয়ে যাক সাথে যেন ব্যাগটা থাকে এটাই মূল উদ্দেশ্য তার।
দুই সাইড দিয়ে দু’জন করে লোক এসে গাড়ির দরজা খুলে উর্বিন্তাকে বের হতে বললো। উর্বিন্তা কাঁপতে কাঁপতে গাড়ি থেকে নামলো। এই বিশালদেহী লোকগুলোর সামনে সে এক ছোট্ট পুঁটি মাছের মতো।
উর্বিন্তা একবার পেছনে তাকালো। ড্রাইভারের হাতে গুলি লেগেছে বোধহয়। রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। সাইলেন্সার লাগানো‌ ছিলো বলে শব্দ পায়নি।‌ এসবে উর্বিন্তা ভয় পায়না। ছোট থেকেই এসব দেখে অভ্যস্ত কিন্তু তাকে এভাবে নিয়ে যাচ্ছে কেন এই লোকগুলো?

উর্বিন্তা করুন স্বরে বললো,
-“আমাকে কেন নিয়ে যাচ্ছেন? আমি কি দোষ করেছি? আমি তো বাড়ি যাচ্ছি।”
একটা লোক গম্ভীর কন্ঠে বললো,
-“এদিকে আর কোনো বাড়ি নেই।”
উর্বিন্তা চোখ তুলে আশেপাশে তাকালো। আসলেই এখানে বাড়িঘর নেই। জঙ্গল আর ফাঁকা মাঠ চারিদিকে।
উর্বিন্তার শরীর শিউরে উঠলো। ভয়ার্ত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে বারবার।

গাড়ির কাছে আসতেই ভেতর থেকে একজন হেঁসে বললো,
-“শিকার এভাবেই নিজে থেকে জালে আটকে যায়। ওরে তোল গাড়িতে।”
উর্বিন্তা লোকটাকে ঠিকমতো না চিনলেও ওর কেমন জেনো চেনা চেনা লাগলো। গাড়ির মধ্যেই অচেতন হয়ে পড়ে আছে মাহিম। মাহিমের কাছে বসা লোকটা সামনের লোকটির দিকে তাকিয়ে বললো,
-“বাচ্চাটার পালস রেট কমে গেছে অনেক। ক্লোরোফর্ম বেশি স্প্রে করা হয়ে গেছে মনে হয়।”
লোকটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,
-“মাছ ধরার টোপটা কি জীবিত থাকে? ওগুলো মরাই হয় বা মরে যায়। এই ছেলেও টোপ ছিলো। বাঁচলে বাঁচুক,মরলে মরুক।”

উর্বিন্তা হাওয়ার বেগে গাড়িতে উঠে মাহিমের পাশে বসলো।‌ মাহিমকে তুলে তার কোলে নিলো। হাতের পালস খুবই কম। উর্বিন্তা কেঁদে উঠলো এবার। আল্লাহ ছাড়া এই বিপদ থেকে কেউ উদ্ধার করতে পারবে না তাদের।

..

রুশান আর জিহাদ সেই পুরোনো বাড়িটাতে ভালোভাবে তল্লাশি চালিয়েও কিছু পায়নি। বাড়িটা দেখে মনে হচ্ছে বহুদিন যাবৎ এখানে কারো আসাযাওয়া নেই। ধুলোবালিতে ডুবে আছে প্রতিটা রুম।
রুশানের ধারনা জিহাদের সেদিনের ব্যাপারটার পর থেকেই এই জায়গা ছেড়ে দিছে ওরা। পাছে জিহাদ কাউকে কিছু বলে দেয়। রুশান অনেক চেষ্টা করেও এখানে কোনো ধরনের সহিংসতার চিহ্ন পায়নি। ওরা জায়গাটা পুরোপুরি পরিষ্কার করে রেখে গেছে।

হতাশ হয়ে রুশান আর জিহাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। গেট পেরোতেই রুশানের ফোনে রাফিনের কল এলো। রিসিভ করতেই রাফিন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,
-“ডিআইজি স্যার ফোন করেছিলো। উনার মেয়ে অপহরণ হয়েছে।”
রুশান চেঁচিয়ে বললো,
-“হোয়াট? উদয় স্যারের মেয়ে মানে উর্বিন্তা ? কখন, কিভাবে?”
-“জানি না আমি। শুধু স্যারের কাছে ফোন এসেছে যেন তুমি এই মিশন থামিয়ে দাও। নাহলে উনার মেয়েকে দু’খন্ড করে ফেলবে।”

রুশানের হঠাৎ করে শান্তর কথা মাথায় এলো। রুশান তড়িঘড়ি করে বললো,
-“স্যার আপনি ভাববেন না। আমি দেখছি। আই উইল হ্যান্ডেল ইট।”
-“ডিআইজি স্যারের মেয়ের ব্যাপার। একটু সাবধানে করো যা করবা।”
-“ওকে স্যার।”
রুশান কল কেটে শান্তর নাম্বারে কল করলো। শান্ত ফোন হাতে নিয়েই বসে ছিলো।‌ উর্বিন্তার পাঠানো মেসেজ আর ছবি দেখে সে হ্যাং হয়ে গেছে। রুশান কল করার সাথে সাথেই শান্ত রিসিভ করে কেঁদে উঠলো। কেঁদে কেঁদে বললো,
-“রুশান ভাইয়া, উর্বিন্তা আমাকে অনেক মেসেজ দিয়েছে। অনেক ছবি দিয়েছে। ওকে অনেকবার কল করেছি আমি। ফোন বাজছে কিন্তু ও রিসিভ করছে না। ওই লোকগুলো মাহিমকে নিয়ে গেছে। ওদের পিছু পিছু উর্বি গিয়েছিলো। তারপর ,তারপর আর উর্বিকে পাচ্ছি না ভাইয়া।”

‘মাহিমকে নিয়ে গেছে’ কথাটা রুশানের কানে ধাক্কা খেলো। ওরা পাঁচ বছরের উপরে কোনো বাচ্চাকে তুলে নেয় না। মাহিমের সেখানে ছয়ের কাছাকাছি। আবার মাহিমকে এমনভাবে নিয়েছে যেন সেটা উর্বিন্তার চোখে পড়ে। তার মানে ওদের টার্গেট উর্বিন্তা ছিলো যাকে পাওয়ার জন্য মাহিমকে ব্যবহার করেছে। মাহিমকে ওদের কোনো প্রয়োজন নেই। তাহলে ওকে বাঁচিয়ে রাখার বা ওদের কাছে রাখার পসিবিলিটি কতটুকু?
রুশান কেঁপে উঠলো। মাহিম ছেলেটা সবার আদরের। ছোট থেকেই দেখে আসছে ওকে রুশান। এই ছেলের কিছু হলে ওদের‌ পরিবারটা শেষ হয়ে যাবে।

রুশান জিহাদকে বাড়ি যেতে বলে নিজেও শানদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। মাথায় একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘ডিআইজি স্যার এই কেসের জন্য তাকে সাহায্য করেছে এটা কিভাবে জানাজানি হলো? কে জানালো এই কথা?’

-“আমার ভাই ব্রেভ। খুব সাহসী ও। সবাইকে ঢিসুম ঢিসুম করে মেরে ঠিক চলে আসবে দেখিস,সাঁঝ। আমাকে যেভাবে মারে ওদেরও মারবে।”
মেইন দরজা দিয়ে ঢুকতেই সিনিমের কথাগুলো কানে এলো রুশানের। সোফায় সিনিম,সাঁঝ আর তাহমিদ বসে আছে। সিনিমের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে। তার বিশ্বাস তার ভাই খারাপ লোকদেরকে মেরে চলে আসবে। রুশানের বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। সাঁঝ একবার রুশানের দিকে তাকালো। দৌড়ে এসে রুশানের হাত ধরে শুকনো মুখে বললো,
-“মাহিম ভাইয়াকে এনে দাও না, মামা। উর্বিন্তা আন্টিও গেছে মাহিম ভাইয়াকে আনতে। তুমিও যাও মামা। ওদের সাথে উর্বিন্তা আন্টি একা পারবে নাকি বলো?”
রুশান হাঁটু গেড়ে সাঁঝের সামনে বসলো। মাথা নিচু করে বললো,
-“আমাকে দোয়া কর মা,আমি যেন মাহিম আর উর্বিন্তাকে নিয়ে আসতে পারি।”
সাঁঝ হেঁসে বললো,
-“পারবে পারবে। তুমি আমার সাহসী মামা না?”

রুশান ঝিম মেরে বসে রইলো। হুট করেই কানে এলো সিন্থিয়ার চিৎকার । রুশান উঠে সেদিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই উপর থেকে শান্ত নেমে এলো। রুশানের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
-“সিন্থিয়া আপু মাহিম হারানোর খবর শোনার পর থেকেই ওভাবে কাঁদছে। ভাইয়া, রাফিন ভাইয়া আর মেহেদী ভাইয়া পুলিশের কাছে গেছে। তুমি আমার সাথে এসো।”
শান্ত রুশানকে টেনে নিয়ে গেস্ট রুমে ঢুকলো। তারপর ফোন বের করে উর্বিন্তার ইনবক্স দেখালো। রুশান মনোযোগ সহকারে সব টেক্সট দেখলো। তারপর মুচকি হেঁসে বললো,
-“বাপ কা বেটি। মেয়েটা সাহসী বটে।”

রুশান উর্বিন্তার সব টেক্সট আর মেসেজ নিজের ফোনে ফরোয়ার্ড করে নিলো। তনিমকে কল‌ করতে গিয়েও থেমে গেলো। ছেলেটার নতুন বিয়ে হয়েছে। ওকে নাহয় এই ডেঞ্জারাস মিশন থেকে দূরেই রাখা হোক।
রুশান ধীর পায়ে হেঁটে রুমঝুমের রুমের সামনে দাঁড়ালো। সিন্থিয়া রুমঝুমের বুকে হেলে পড়ে আছে। একটু সময়ের মধ্যেই কি অবস্থা হয়ে গেছে। মেহেদী ভাইয়ার আকাশপরীটা এখন তার সামনে বিদ্ধস্ত হয়ে পড়ে আছে। সন্তানের কিছু হয়ে যাবে এই ভয়ে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে সে।

রুশান সরে এলো।‌ সে মনে মনে ছক কষে ফেলেছে। রাফিন আর শানকে কল করে সবকিছু বলে দিলো। রাফিনকে উর্বিন্তার নাম্বার সেন্ড করে লোকেশন জানতে বললো।‌ উর্বিন্তা শান্তকে টেক্সটে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে সে ফোনে লোকেশন‌ অন করে রেখেছে।
রুশান ডিআইজি স্যারের সাথেও কিছু কথা বললো। তার একটা কথায় রুশান ভীষণ মুগ্ধ হলো। তিনি নিজের মেয়ের জীবনের চেয়েও ওই কুচক্রী দলের বিনাশটাকেই বড় করে দেখছেন।

রুশান ফোন রেখে বের হয়ে এলো বাড়ি থেকে। পেছনে রয়ে গেলো শান্ত। এখন মনে হচ্ছে আজ উর্বিন্তার সাথে না গিয়ে সে জীবনের অনেক বড় একটা ভুল করেছে। শান্তর মন আজ অশান্ত হয়ে উঠেছে। ভালোবাসার মানুষটিকে না দেখা অবধি মনের এই অশান্তি হয়তো কমবে না।

চলবে……

(রি-চেক দেইনি। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
আজ ছোট হয়েছে তবুও ১৩০০+ শব্দ আছে। মাঝে মাঝে এরকম ছোট হয়ে যেতে পারে।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here