চন্দ্ররঙা_প্রেম_২ পর্বঃ২৪

0
131

চন্দ্ররঙা_প্রেম_২
পর্বঃ২৪
#আর্শিয়া_সেহের

অন্ধকার রুমের এক কোনে রায়হান আর রাশেদ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের সামনে বসে রাব্বির শরীরটা কেটে শত টুকরো করছে তনিম। পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী রায়হান-রাশেদ কেঁপে কেঁপে উঠছে তনিমের ছুড়ি চালানো দেখে। রুশান একদৃষ্টিতে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখতে দেখতে রাব্বির টুকরো টুকরো করা দেহটা বস্তায় ভরে ফেললো তনিম। রাশেদ ভয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। দীর্ঘক্ষণ পর রাশেদই মুখ খুললো। মিনমিন করে বললো,
-“আমাদেরকে ছেড়ে দাও প্লিজ। আমরা নিজেদেরকে শুধরে নিবো। আমাদেরকে মেরো না।”

তনিম বাঁকা হেঁসে বস্তাটা কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। রুশান উপরের দিকে চোখ রেখেই বললো,
-“পুনমের পিছু কেন নিয়েছিলি ,রায়হান?”
রায়হান ঢোক গিললো একটা। এখন শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়।এখান থেকে বেঁচে ফিরতে হবে। রুশান আবারও বললো,
-“পুনমকে কিভাবে চিনিস তুই? ওর পিছু কেন নিয়েছিলি?”

রায়হান ক্ষীণ কন্ঠে বললো,
-“একবছর আগে ওর মামাতো ভাইয়ের বাইকে দেখেছিলাম ওকে। ওর মামাতো ভাই আমাদের পাচারদলের সম্পর্কে জেনে গিয়েছিলো। তাকে ফলো করতে গিয়েই ওকে দেখেছিলাম।”

রুশান চুপ হয়ে গেলো। আর কোনো কথা নেই মুখে। হুট করেই রাশেদ নিজের পায়ের বাঁধন ছুটিয়ে ফেললো। রুশানের এদিকে খেয়াল নেই দেখে দেয়ালে হেলান দিয়ে উঠে পড়লো। দু’পা এগোতেই মৃদু চিৎকার করে উঠলো রাশেদ। বিদ্যুৎ এর গতিতে এসে রাশেদের পায়ের রগ কেটে দিলো রুশান। রাশেদ মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো মাটিতে। ওই একই ছুড়ি দিয়ে রায়হানের দুই গালে,হাতের রগে আর পায়ের হাঁটুর জয়েন্টে টান দিলো । মুখ চেপে ধরে রাখলো দেয়ালের সাথে যেন চিৎকার করতে না পারে। ছোট ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে মেঝেতে গুটিসুটি মেরে পড়ে রইলো রাশেদ।

রুশান টকটকে লাল চোখ দুটো নিয়ে রায়হানের মুখের কাছে এগিয়ে গেলো। রায়হানের মুখে চেপে রাখা হাতটা রক্তে ডুবে গেছে। রুশান ফিসফিসিয়ে বললো,
-“তোর জন্য আমার বোন কেঁদেছে। চিৎকার করে কেঁদেছে। একটা নির্দোষ মেয়েকে মরতে হয়েছে তোদের জন্য। একটা আড়াই বছরের নিষ্পাপ বাচ্চাকে মা হারা করেছিস তোরা। শতশত কচি প্রাণ কচকচ করে চিবিয়ে খেয়েছিস তোরা। খালি করেছিস শত মায়ের বুক।
কিভাবে ছেঁড়ে দেই তোদের? কিভাবে বল? বল বল বল।”
বলতে বলতেই রায়হানের ডান হাতের দুটো আঙ্গুল কেটে নিলো রুশান। ছেড়ে দিলো রায়হানের মুখ। গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠলো রায়হান। তার আর্তনাদ যেন ঘুমন্ত জঙ্গলকে জাগিয়ে তুলছে।

ছোট ভাইয়ের এমন করুন আর্তনাদ সহ্য হলো না রাশেদের। খুব কষ্টে বললো,
-“ওকে কষ্ট দিও না এভাবে। মেরে ফেলো তবুও কষ্ট দিও না।”
রুশান ধপ করে রাশেদের সামনে বসে পড়লো। মুখের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে জিহ্বা বের করেই কেটে ফেললো। জঘন্য একটা গালি দিয়ে বললো,
-“ভাইয়ের জন্য দরদ দেখাস কুত্তা*বাচ্চা। তোদের দুটোকেই জানোয়ারের মতো মারবো।”

দু’জনকে অর্ধমৃত অবস্থায় রেখে রুশান আগের জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো। বিথীর মৃত্যুর খবর শোনার পরেই সে স্থির করে নিয়েছিলো এদেরকে কিভাবে,কোথায় মারবে। তাকে এক কথাতেই সাহায্য করেছে রাফিন আর ডিআইজি স্যার। তাদের মতেও এমন নরপশুদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।

প্রায় পঁচিশ মিনিটের মাথায় ফিরে এলো তনিম। রাশেদ আর রায়হানের অবস্থা দেখলো একবার। রুশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“আর পনেরো-বিশ মিনিটের মধ্যেই আজান দিবে। এর আগেই কাজ শেষ করতে হবে স্যার।”

রুশান বাইরে তাকালো। অন্ধকার কাটেনি এখনো। রায়হান আর রাশেদ স্থির হয়ে পড়ে আছে। পুরো ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। রুশান তনিমের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“ফিনিশিং টাচ দিয়ে দাও। মুখ সহ পুরো বডিতে ছুড়ির আঁচড় বসিয়ে দাও । ওদের মতো মানুষ রুপি জানোয়াররা ওদের লাশ দেখেই যেনো কেঁপে ওঠে।

তনিম দক্ষ হাতে ছুড়ি দিয়ে আঁকিবুঁকি করা শুরু করলো রাশেদের শরীরে। তার মনে হচ্ছে এটা একটা শৌখিন কাজ। পুরো রুম জুড়ে শুধু রক্তের গন্ধ।
দশ মিনিটের মধ্যেই তনিম দু’টো লাশই ক্ষত বিক্ষত করে দিলো। এর মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হলো শান আর রাফিন। লাশ দু’টো দেখে কেঁপে উঠলো দু’জনই। কি ভয়ংকর অবস্থা করেছে লাশ দুটোর। নিকট আত্মীয় ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না এই লাশ আসলে কাদের। রাফিন আর শান কোনো কথা বললো না এ সম্পর্কে। শানের আফসোস হচ্ছে আরো আগে কেনো আসতে পারলো না সে। নিজ হাতে একটু শাস্তি দিতে পারতো জানোয়ারদের।

রুশান, তনিম, রাফিন আর শান মিলে খুব দ্রুত লাশ দুটোকে পলিথিনে মুড়ে ফেললো। লাশ দুটো গাড়িতে তুলে ফেলে গেলো মেইন রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে।
ভোরের আলো সবে ফোঁটা শুরু করেছে। মানুষের আনাগোনা শুরু হয়নি এখনো। ধীরে সুস্থে বাড়ি ফিরে এলো চারজন।‌ পেছনের ডাস্টবিনে পড়ে রইলো মানুষের মাঝে বসবাসকারী মানুষের মতো দেখতে দুটো আবর্জনা। তারা নিজেকে যতই ক্ষমতাবান মনে করুক, দিনশেষে তারা কীটতুল্যই থেকে যায়।

সময় বহমান। তাইতো স্রোতের অনুকূলে ভেসে ভেসে কেটে গেলো সাড়ে পাঁচ মাস। আজ তিহান , অ্যামিলিয়া আর বিন্দু বাংলাদেশ ছাড়বে। এই চারমাস তারা শানদের সাথেই ছিলো। আড়াই বছরের বিন্দু আজ তিন বছরের মেয়ে। আগের থেকেও চঞ্চল হয়েছে মেয়েটা। অ্যামিলিয়া তাকে মায়ের মতন করেই আগলে রাখে। বিন্দুর পাসপোর্ট করার জন্যই তাদের দেশ ছাড়তে এতো দেরি হলো।

অ্যামিলিয়াকে এই সাড়ে পাঁচ মাস রুমঝুম সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি বার বলেছে ,যদি বিন্দুকে সে নিজের মেয়ে ভাবতে না পারে তাহলে যেন রুমঝুমের কাছে দিয়ে দেয়। তবুও যেন মেয়েটাকে না কাঁদায়। অ্যামিলিয়া জোর গলায় প্রতিবার বলেছে,
-“ঝুম আপু, বিন্দু আমার প্রথম বেবি। ওকে ওর মা আমায় গিফট করেছে। আমি এই গিফটকে যত্ন করে রাখবো। আই প্রমিস। বিশ্বাস রাখো আমার উপর।”

অ্যামিলিয়ার কথায় আশ্বস্ত হয় রুমঝুম। মেয়েটার দায়িত্ব দিয়ে দেয় তিহান আর অ্যামিলিয়াকে। বিন্দু এখন তিহানকে বাব্বা আর অ্যামিলিয়াকে মাম্মা ডাকে। তবে আজও সে কোথাও না কোথাও খুঁজে ফেরে নিজের মা কে যে শত বাঁধা ডিঙিয়ে আগলে বাঁচিয়ে রেখেছিলো তাকে।

বিয়ের পর প্রায় বিশ দিন রুশান আর পুনম শানদের বাড়িতেই ছিলো। রেজাউল‌ সাহেব বিশ দিন পর ছোট ছেলে আর ছোট বৌমাকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিলেন। এই সময়টার মাঝে পুনমেরও বেশ টান জন্মে বিন্দুর উপর। তাই রুশান মাঝে মাঝেই পুনমকে নিয়ে আসতো বিন্দুকে জেখার জন্য। আজ বিন্দুর চলে যাওয়ার দিন। রুশান গতকালকেই পুনমকে নিয়ে এসেছে বিন্দুর কাছে। রাত আটটা পর্যন্ত পুনম বিন্দু আর সাঁঝকে নিয়ে গল্প করলো। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে দু’জনকে খাবার খাইয়ে দিলো।

নয়টার মধ্যেই সব গোছগাছ করে বেরিয়ে পড়লো তিহান, অ্যামিলিয়া আর বিন্দু। শান যাচ্ছে ওদেরকে এয়ার পোর্টে ছাড়তে। পুনম বেলকনি দিয়ে দেখলো তাদের চলে যাওয়া। তার খুব ইচ্ছে করছিলো বিন্দুকে নিজের কাছে রেখে দিতে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারলো না। কারনটা আসলে অ্যামিলিয়া। সে কখনো মা হতে পারবে না যে কথাটা সে নিজেই জানে না। তিহান এই কথাটা শানকে বলছিলো একদিন তখন‌ পুনম শুনেছিলো। তখন থেকেই পুনমের মনে হয় বিন্দু সবচেয়ে বেশি ভালো থাকবে অ্যামিলিয়ার কাছেই।

-“এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? নিচে গিয়ে বিদায় জানিয়ে আসতে পারতে তো।”
রুশানের কন্ঠ পেয়ে পিছনে ফিরলো পুনম। পুনমের দুই চোখে পানি টলমল করছে। রুশানের দিকে তাকানোর সাথে সাথেই ঝুপ করে পড়ে গেলো দুই ফোঁটা পানি। রুশান ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এলো পুনমের কাছে। পুনমের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো,
-“এই পাগলি, কাঁদছো কেন? কি হয়েছে আমাকে বলো? বিন্দুর জন্য মন খারাপ লাগছে?”

পুনম রুশানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে নাক টেনে টেনে বললো,
-“আমারও একটা বিন্দু লাগবে, রুশান। আমাকে একটা ছোট্ট বিন্দু এনে দাওনা।”
রুশান দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো,
-“সত্যিই এনে দিবো?”
-“হু, সত্যিই এনে দাও।”
রুশান পুনমকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। কানের কাছে মুখ এনে বললো,
-“ছোট্ট বিন্দুর আম্মু কি পুরোপুরি প্রস্তুত?”
পুনমের পুরো শরীরে শিহরণ খেলে গেলো। লজ্জায় গরম হয়ে গেলো কান দু’টো। মুখটা রুশানের বুকে চেপে বললো,
-“মজা করছো কেন? আমি সিরিয়াসলি বলেছি।”

রুশান ঝটপট কোলে তুলে নিলো পুনমকে। বেলকনি থেকে রুমের মধ্যে যেতে যেতে বললো,
-“মজা করেছি কি না এখনি বুঝাচ্ছি আপনাকে।”
পুনমকে খাটে শুইয়ে দিয়ে দরজা আটকে দিলো রুশান। বেলকনির দরজা টাও চাপিয়ে দিলো পুরোপুরি। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে গেলো খাটের দিকে। তখনি দরজায় কেউ নক করলো। রুশান ভ্রু কুঁচকে তাকালো দরজার দিকে। পুনম তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে উঠে বসলো। রুশান একবার পুনমের দিকে তাকিয়ে শার্টের বোতাম আবার আটকে নিলো।

বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখলো জ্ঞানী ছেলে শান্ত আলাভোলা চোখে তাকিয়ে আছে। রুশানের হুট করেই মনে পড়লো‌ তার বোন দুলাভাইয়ের বাসরের কথা যেটা তার বিয়ের দিন শিরীন শুনিয়েছিলো। রুশান অসহায় চোখে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
-“কাহিনী রিপিট হলো বোধহয়।”

শান্ত ভেতরের দিকে উঁকি মেরে বললো,
-“তোমরা ব্যাস্ত নাকি?”
-“ব্যাস্ত আর হতে দিলি কই? কি বলবি বল।”
শান্ত ফোন নিয়ে ঢুকে পড়লো ঘরের মধ্যে। এক সাইডে রাখা সিঙ্গেল সোফায় বসে পড়লো আরাম করে। পুনম খাটে পা ঝুলিয়ে বসে বললো,
-“কি রে শান্ত? আজকে এই ঘরে কেন?”

শান্ত দুই কানে ইয়ারফোন ঢুকিয়ে বললো,
-“একটা হরর মুভি দেখবো পুনম আপু। তুমি দেখবা নাকি?”
রুশান ক্ষেপে উঠে বললো,
-“হরর মুভি দেখবি তো নিজের ঘরে বসে দেখ না। এখানে আসছিস কেন ভাই?”
শান্ত ফোনের স্ক্রিনে নজর রেখে বললো,
-“একা থাকলে গা ছমছম করে রুশান ভাই। তাই তোমাদের সঙ্গ পেতে এসেছি।”
রুশান মনে মনে বললো,
-“এতো মানুষের রোমান্সের বারোটা বাজাতে আসিস তুই। তোর কপালে যে কি আছে ছোট ভাই তা কে জানে?”

চলবে………

(অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ক্লাস শুরু। সপ্তাহে ছয়দিনই ক্লাস। পড়াশোনার পাশাপাশি গল্প লিখবো তাই পর্ব ছোট হবে আগের তুলনায়। রি-চেক করাও হচ্ছে না। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন সবাই। এখন থেকে নিয়মিত গল্প পাবেন ইনশাআল্লাহ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here