চাদর Subhra Roy পর্ব ১১(শেষ

চাদর
Subhra Roy
পর্ব ১১(শেষ)

ঘুমিয়ে গেছলাম না জেগে ছিলাম মনে নেই। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না কিছু । একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম । দীপের বুকের ভেতর দুহাতের মধ্যে ঢুকে ছিলাম আমি । আদরে ডুবে ছিলাম । আজ এই মুহুর্তটা শুধু আমার । আজ থেকে দীপ আমার, শুধু আমার । ভাবতেই বুকটা শিরশির করে উঠেছিল ।

এই……..

হুমম………

একে তো কাল থেকে কথা বলেনি । এখন আবার কথা বলছে না । এই……. চুল গুলোতে হাত বোলাতে বোলাতে বলেছিল দীপ।

হুমম……. বল…….

আচ্ছা মেয়ে তো । কথা ও বলছে না আর নিজের মনে হাসছে। এই তাকা……… আমার গালে টোকা দিয়ে বলেছিল।

উফ। চুপ করে থাক না । একটু খানি এমনই করে তোর কাছে থাকতে দে না। একটু খানি তোর মধ্যে মিশে থাকি।

সে তুই থাক না । তোর জায়গায় তুই থাকবি তাতে আমার বলার কি থাকতে পারে । কিন্তু কথাটা হল যে কতক্ষণ ধরে আমরা এখানে আছি তোর খেয়াল আছে । কেউ খুঁজতে এলে কি বলবি শুধু সেটা ভেবে রাখ।

কথাটা শুনেই চোখ খুলেছিলাম আমি ।রাগ অভিমান করার মাঝে বাকি সবার কথা ভুলেই মেরে দিয়েছি।হড়বড় করে উঠে দীপ কে বলেছিলাম, এই যা এই কথাটা তো মাথা থেকে পুরো বেরিয়ে গেছল। তোর পাঞ্জাবীটা তো ভিজে গেছে রে। তুই চটপট গিয়ে জামা ছেড়ে রেডি হয়ে নিচে নেমে যা । আমি একটু পরে যাচ্ছি ।তুই আগে যা । আমার শাড়িটা তো এক্কেবারে ভিজে গেছে । আমি অন্য কিছু একটা পরে নেব,খাট থেকে নামতে নামতে বলেছিলাম আমি।

কেন একসাথে গেলে কি হবে?

দুর কে কি ভাববে কে জানে ।

যে যার মতো ভাববে । আমি তো আর অন্য কারো সাথে থাকিনি । নিজের বৌ এর সাথে আছি । আজ আমি জানি, কাল সবাই জানবে ।

তুই বড্ড বেশি বাঁদরামি করছিস।

বেশ করছি । বলে আমার হাতটা ধরে এক টানে নিজের কাছে নিয়ে চলে এসেছিল ।বুকে চেপে ধরে বলেছিল, বেশ করছি ।
মার খাবি এবার ।

তাই…….
আবার একবার ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে দিয়েছিল আদরে ।
চটপট রেডি হয়ে নেমে আয় । দেরি করিস না । আর যদি আবার আমাকে ডাকতে আসতে হয় তবে তুই এবার খাবি ।তবে মার নয় অন্যকিছু ।

তুই তো আগে ভদ্র ছিলি রে । এমন বদমাশ হলি কবে থেকে ।

যখন থেকে তোকে চেয়েছি তখন থেকে ।

তাই ।এখন আর দেরি হচ্ছে না বল। যা এখন বলে ঠেলে বাইরে পাঠিয়ে ছিলাম ।

তাড়াতাড়ি আয় । আমি অপেক্ষা করছি । বলে চলে গেছল পাগলটা ।

আগের শাড়িটা পুরো ভিজে গেছে । চটপট ফ্রেশ হয়ে এসে অন্য একটা শাড়ি পরেছিলাম । হলুদ রঙের । পছন্দের রং বাঁদর টার। চুল বাঁধার আর সময় নেই । এমনই অনেক দেরি হয়ে গেছে । চুলটাকে একটা হাত খোপা করে বেঁধে নিয়েছিলাম । হড়বড় করে নামছিলাম নিচে । হঠাৎ আঁচলে টান পড়ায় হয়তো পড়েই যেতাম । কিন্তু দুটো হাত পড়তে দেয়নি । দু হাত দিয়ে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়েছিল। শয়তান ছেলে সিঁড়িতে ধরবে বলে লুকিয়ে ছিল।

এরকম কেউ করে? যদি পড়ে যেতাম ।

পড়ে যাওয়া এত সোজা । আমি থাকতে তুই পড়ে যাবি বলে মনে হয় তোর।

আচ্ছা ঠিক আছে । ছাড় এবার ।কেউ এলে মুস্কিল হয়ে যাবে ।

কিচ্ছু হবে না । আমার জিনিস সব চেয়ে আগে আমি দেখব। তাতে কারো অসুবিধা থাকলে সেটা তার ব্যপার ।তাতে আমি কি করব।

যা ইচ্ছে কর। তোর সাথে কথায় কে পারবে বল।

এই শাড়িটা পরে তোকে ব্যাপক লাগছে । তবে সকালে লাল শাড়িটা পরে আরও সেক্সি লাগছিল । অথচ একটা যে ছবি তুলব সে উপায় ছিল না । এত রেগে ছিলি ।

তুই দেখেছিলি কি শাড়ি পরেছিলাম?

কেন দেখব না । আমার দেওয়া শাড়ি পরে তোকে কেমন লাগছে , না দেখে থাকতে পারতাম আমি?

ওটা তুই পাঠিয়েছিলি ? পরি যে বলল মামনি পরতে বলেছে ।

ওটা আমি বলতে বলেছিলাম । নইলে তুই পরতি?

শাড়িটা খুব সুন্দর । কিন্তু আমি পুরো ভিজিয়ে ফেলেছি ।

অত রাগ করলে তো এমনই হবে ।

সরি । এবার ছাড়। দুঃখী গলায় বলেছিলাম আমি।

আচ্ছা যা ।বলে গালে আলতো করে ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল ।

আমাকে দেখে মামনি, পরি তনুরা সবাই জিজ্ঞেস করছিল কোথায় ছিলাম আমি । মাথা ব্যাথা করছিল বলে ঘরে গেছলাম বলে কোন মতে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছলাম । তার ওপর এতো লোকজন থাকার কারণে কেউ সেভাবে কিছু লক্ষ্য করেনি ।নইলে যে কি বলতাম।

সবাইকে চামুণ্ডার প্রসাদ দেওয়া হয়ে গেছল।এবার খেতে দেওয়া হচ্ছিল । অনেকেই শুধু অষ্টমীর পূজো দেখতে এখানে আসে । তারা খেয়ে ফিরে যাবে । তাই যাদের যাওয়ার আছে তাদের খেতে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল । বাকিরা পরে খাবে। কাজ প্রায় সব শেষ হয়ে গেছল। তাই সবাই এদিকে ওদিকে বসে গল্প করছিল । আমিও বসে বসে দেখছিলাম এই বিরাট আয়োজন । এত দিন ধরে কি নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে এখানের মানুষ গুলো । নইলে পাড়ার পুজোয় এত আয়োজন কোথায় ।

এই পুরোনো দিনের পূজো গুলোর মধ্যেই মিশে থাকে আমাদের আসল ঐতিহ্য । নইলে এখন তো শুধু থিম পূজোর দেখনদারি । ভেতরের প্রানটাই নেই। এই পূজো গুলো তো শুধু পূজো নয় মিলনমেলা হয়ে যায় । সারা বছর যে বাড়িটাকে ভুলে থাকা যায় সেখানে আসতেই বুকের ভেতর টা ছটফট করে । যে মানুষ গুলোর মুখ সারা বছর মনে পড়ে না কি অবলীলায় তাদের সাথে গল্প হয়। কতকিছু ফিরে আসে আমাদের কাছে । কত হারানো জিনিস, হারানো সম্পর্ক জোড়া লাগে আবার । যে আমি টা ঘুমিয়ে থাকে সারা বছর মনের গহীনে কোন এক জাদু স্পর্শে জেগে ওঠে সে। যে ইচ্ছেগুলো বুকের পাঁজরে প্রতিদিন মরে দমচাপা হয়ে তারা আবার বেঁচে ওঠে এক ঘুমিয়ে যাওয়া আমি কে খুঁজতে ।প্রান খুলে বাঁচে প্রতিটা মানুষ ।বুক ভরে প্রান ভরে নেয় সারা বছর বেঁচে থাকার জন্য । আবার বাঁচার জন্য আরো একটা বছর আরো একটা পূজোর অপেক্ষায় ।

বসে বসে দেখছিলাম সব কিছু ।হঠাৎ জ্যেঠিমা এসে বলেছিল, জবাকে দেখেছিস রে। মিষ্টি গুলো আনতে হত।
বয়স হয়েছে মানুষটার । তবু চারদিকে নজর । বাইরে যতটা রাশভারী, ভেতরে সবার জন্য ততটাই মায়া ।আমি হাত ধরে পাশে টেনে বসিয়েছিলাম । সারাদিনের উপোস ।তার ওপর এত দায়িত্ব । হাপিয়ে গেছল মানুষটা । আমি রাগি মুখ করে বলেছিলাম, এখানে চুপ করে বসে থাক । আমি একটু আগে প্রসাদ রাখা ঘরের পাশের ভাড়ার ঘরে দেখেছিলাম । তুমি বোসো । আমি ডেকে দিচ্ছি ।

পাকা বুড়ি একটা । যা ডেকে দে, হেসে বলেছিল জ্যেঠিমা ।

ভাড়ার ঘরে গিয়ে দেখি জবাদি মিষ্টিই গোছাচছে। আমাকে দেখে বলল, বড় মা পাঠিয়েছে তো । বল আমি মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছি ।

জবাদি এবাড়ির কাজের লোক হলেও বাড়ির মেয়েই হয়ে গেছে ।সেই কোন ছোটবেলায় এসেছিল । তখন দীপ ও হয়নি । আজ এতগুলো বছর দীপদের দিদি হয়েই রয়ে গেছে । বিয়ের পর অন্য যায়গায় চলে যেতে হবে বলে বিয়েই করতে চায়নি । শেষে এবাড়ির থেকে এক কর্মচারীর সাথে বিয়ে দেওয়া হয় । তার ও কেউ ছিলনা বলে এবাড়িতেই রয়ে গেছে দুজনে । দীপ তো বলে ওর কি খেতে ইচ্ছে করছে, কি করতে ইচ্ছে করছে সব ওর মুখ দেখেই বলে দিতে পারে ওর জবাদি । ওর নিজের দিদিদের থেকে দীপ জবাদি কে কম ভালো বাসে না ।

আচ্ছা, বলে বেরোতে গিয়ে দেখি দীপ দরজার পাশ থেকে ডাকছে । জবাদি দেখে ফেললে কি হবে একবার ও ভাবল না ছেলেটা । আস্তে আস্তে দরজার পাশে এসে বলেছিলাম, বল কি বলছিস? এখানে এলি কেন?

আয় একবার?

কেন?

আয় না ।বড্ড প্রশ্ন করিস তুই।

যাও অনা দিদি তোমার কেষ্ট ঠাকুর তোমাকে ডাকছে । ওদিকটা আমি সামলে নেব, হঠাৎ পেছনে এসে বলেছিল জবা দি।

আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না । দীপ আনন্দে লাফিয়ে জবাদি কে জড়িয়ে ধরে বলল, ঠ্যানক ইউ দিভাই ।

নে অনেক হয়েছে । নিজের রাধিকাকে নিয়ে যা তো এবার । আমার অনেক কাজ বাকি আছে ।

আমার হাত ধরে বাড়ির উল্টো দিকের দালানে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে ছিল দীপ । এদিকে সব সময় সবাই আসে না । আর আজ তো আসবেই না ।আমাকে বসিয়ে দিয়ে কোথায় গেল কে জানে? ভাবতে ভাবতে দেখি একটা থালায় করে খাবার নিয়ে এসেছে ।এক টুকরো লুচি ছিড়ে আমার মুখের সামনে ধরে বলেছিল, নিন মহারানি খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন । কাল থেকে কিছু খাসনি । এবার ঠিক মাথা ঘুরবে, শরীর খারাপ লাগবে । আমাকে কষ্ট না দিলে তোর হয় না বল?

হাতটা ধরে বলেছিলাম, আমি খাব না ।

কেন?

আমি খাইনি আর তুই পেট ভরে খেয়েছিস বল। তোকে তোর থেকে একটু হলেও বেশি চিনি আমি । খেলে দুজনে এক সাথে খাব।

আচ্ছা ঠিক আছে ।পাগলি একটা । আজ সকাল পর্যন্ত একবার ও আমার কথা মনে পড়েনি । আর এখন জোর দেখ।

জোর আগেও ছিল, শুধু তুই কি চাস সেটা জানতাম না ।

আচ্ছা অনেক হয়েছে । এবার খা তো।

অনেক দিন পর সেই আগের মতোই দুজন দুজনকে খাইয়ে দিয়েছিলাম । খাওয়ার পর যত্ন করে আমার মুখ মুছিয়ে দিয়েছিল । এত ভাল কি করে বাসিস রে । কেন বাসিস এত ভালো । আর আমাকে দেখ শুধু কষ্টই দিয়েছি তোকে ।

আমার পাশের একটা থামে হেলান দিয়ে বসে ছিল দীপ । আমার হাতটা ধরে বুকে টেনে নিয়েছিল। খোপা খুলে সব চুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গেছল ওর বুকের ওপর । আস্তে আস্তে আমার খোলা চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল । কোন কোন মুহূর্ত আসে যখন কথা বলার দরকার হয় না । নিরব চোখের শব্দরাই গল্প বলে ।আর মনে হয় এভাবেই কেটে যাক সারা জীবন ।

ওরা কেউ পেছন ফিরে তাকায়নি । তাকালে হয়তো বুঝতেও পারত না একজন দূর অন্ধকারে মিশে দেখছে ওদের ।বিদিশা র মনে আজ আর কোন দুঃখ নেই । হিংসার জ্বালা নেই । আছে শুধু ভাললাগা আর একটু চাওয়া ।আজ মনে হচ্ছে অনেক সময় পরিপূর্ণতা অসম্পূর্ণতার মধ্যে দিয়েই আসে । ভাবছে কেউ কি করে এতটা ভালোবাসতে পারে কাউকে? কেউ কি করে আর একজনের এত ভাল বন্ধু হয় যে আরেক জনের জন্য নিজের সবটুকু ছেড়ে দিতে পারে, দিয়ে দিতে পারে এক কথায় । শুধু অন্য মানুষটা ভালো থাকবে বলে । আজ ও মা দুর্গার কাছে চেয়েছে, এত ভালবাসা না পাই অন্তত এমন একটা বন্ধু যেন এ জন্মে পাই । যার কাছে যেতে কোন কারণ লাগবে না । যার সাথে কথা বলার জন্য কোন টপিক লাগবে না । শুধু কান্না পাচ্ছে কাঁদব বলে যার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা যায় ।
সবচেয়ে বড় কথা আমরা কিছুতেই যেটা মানতে চাই না, আমরা সারা জীবন ধরে শুধু একটা বন্ধু খুঁজি। আমাদের কাছে দূরে থাকা প্রতিটা সম্পর্কের মধ্যে একটা বন্ধু খুঁজে বেড়াই ।একটা বেস্ট ফ্রেন্ড । আমাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ।কেউ পাই, কেউ পাইনা । কেউ বা পেয়েও হারিয়ে ফেলি।

এই । চল ভেতরে চল ।শিশির পড়ছে । ঠান্ডা লেগে যাবে । আর বাকি গুলো কোথায় আছে চল দেখি । এবার না আমাদের খুন করে ফেলে ।

আচ্ছা চল।

ওঠ । আমার হাত ধরে তুলে আর একবার আদর করে বলেছিল, চল।

তোদের কি ব্যাপার বলতো ।দুজনেই এতক্ষণ কোথায় ছিলি, রাজা বলেছিল।

আমি একটু বাইরে গেছলাম । অনা কোথায় ছিল জানিনা তো ।এই তুই কোথায় গেছলি রে? ভালোমানুষের মত মুখ করে বলেছিল দীপ ।

কি শয়তান এতক্ষণ আমাকে জ্বালাতন করে এখন আমাকেই ফাঁসিয়ে দিল । আবার মুচকি হাসছে । দাড়া তোকে পরে মজা দেখাচ্ছি ।কোন রকমে বলেছিলাম, মাথা ব্যাথা করছিল তাই একটু শুয়ে ছিলাম।
কেউ খুব একটা বিশ্বাস করল বলে তো মনে হল না । ভাগ্যিস মামনি খেতে ডেকেছিল নইলে কি যে উওর দিতাম কে জানে ।

একটু আগেই খেয়েছি । আর খেতে পারছিলাম না । তবু ঢোকাতেই হচ্ছিল ।নইলে আরও কত প্রশ্ন করতো সবাই কে জানে?

খেয়ে বেরিয়ে ঠাকুর দালানের দিকে যাচ্ছিলাম । কাল নবমি পূজো । যদি কিছু করতে হয় তাই জানতে । চুল বাঁধতে বাঁধতে যেতে গিয়ে আর একটু হলেই ধাক্কা লাগছিল বিদিশার সাথে । আসার পর থেকে একটাও কথা হয়নি ওর সাথে । খারাপ লাগছিল খুব আমার । যে জন্য মেয়েটা আমাকে অপছন্দ করত সেই ঘটনাটাই ঘটে গেছল। খুব ইচ্ছে করছিল বলতে, আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি রে ।নিজেকে কষ্ট দিয়েছি, দীপকে কষ্ট দিয়েছি তবু ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি । তবু শেষ রক্ষা করতে পারিনি রে । হেরে গেছি তোর কাছে ।

সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল বিদিশা । কষ্ট হচ্ছিল খুব আমার । আবার মনে হচ্ছিল ঠকিয়েছি ওকে ।আঁচলটা হাতে প্যাঁচিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম । কি বলব, কিভাবে শুরু করব বুঝতেই পারছিলাম না ।

কোনদিন ক্ষমা করতে পারবি আমায় । বিশ্বাস কর জেনে বুঝে কখনো তোর আর দীপের মাঝে আসতে চাইনি আমি ।তবু কেন যে……..

তবু তো এসেছিলি বল………… বিদিশার কথা শুনে কষ্টটা চোখ দিয়ে ঝরে পড়েছিল ।

আমার চোখটা মেয়েটা দুহাত দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছিল। তাতে এতটুকু রাগের স্পর্শ থাকেনি । অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম ।

আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল, আমি এই কদিনে দীপকে যতটুকু চিনেছি তুই তার সিকি ভাগ ও চিনিসনি ।

আমি আবার মাথাটা নিচু করে নিয়েছিলাম।

জানিস দীপের অনা অন্ধকারে ভয় পায় ।ভূতের ভয় পায় অথচ দীপের হাত জড়িয়ে ধরে ভুতের গল্প বই পড়ে । জানিস দীপের অনা শুধু আলুর জন্য বিরিয়ানি খায় । দীপের অনা ঝাল একদম খেতে পারে না । দীপের অনা নাচ খুব ভালবাসে । দীপের অনার সব জিনিস দীপ নিজে কেনে । দীপের অনার জ্বর হলে দীপ ওর হাত ধরে বসে থাকে, ছাড়তে ভয় পায় ।দীপ ভাবে ও ওর অনার হাত ধরে থাকলে ও কোথাও যেতে পারবে না । যে বিয়ে বাড়িতে দীপের নেমন্তন্ন থাকে না, দীপের অনা সেখানে যায় না । দীপ না শাড়ি ধরে দিলে দীপের অনার শাড়ি পরা হয় না । দুরকম ফ্লেভার ছাড়া দীপের অনা আইসক্রিম খায় না,,,,,,,,,, আর কত কি জানতে চাস দীপের ব্যাপারে বল। আমি সব জানি । কিন্তু তুই জানিস না । এত বোকা তুই । অনা তো দীপের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে । আমি শুধু দীপকে পাব কি করে বল। দীপ কে চাইলে যে অনাকেও নিতে হবে । তাই বলছি তুই মাঝে আসিসনি । তুই বরং বড্ড বেশি করে মিশে ছিলি । শুধু আমরা কেউ বুঝিনি।

অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ওর মুখের দিকে । খুব ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে দীপের বুকের ভেতর ঢুকে যেতে।

ভাল থাকিস তোরা ।পারলে আমাকেও তোদের বন্ধু করে নিস । আর মা কে বলিস তোদের মত একটা বন্ধু যেন এজীবনে পাই। বলে জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে বিদিশা ।

ঠিক ওরকম একটা বন্ধু পাবি দেখিস। আর আমরা তো বন্ধু ছিলাম ই রে । আমরা সবাই তোর বন্ধু হয়ে আজও আছি । চল অনেক রাত হল ।শুয়ে পড়বি চল, বলেছিলাম আমি ।

গুড নাইট বলে চলে গেছল বিদিশা । আর আমি ছুট লাগিয়েছিলাম দীপ কে খুঁজতে । ওর ঘরে এসে দেখি সেই জামা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে বসেছে । ছুটটে এসে জড়িয়ে ধরেছিলাম । এতদিন ওকে বলতাম । আর আজ নিজেই পাগলের মত কেউ আছে না নেই সে সব না দেখেই জড়িয়ে ধরে ছিলাম ওকে ।

এই পাগলি কি হয়েছে? এরকম করছিস কেন?

কেন এরকম তুই? কেন এত ভালবাসিস আমাকে ।

কেন বাসি তা তো জানিনা ।শুধু জানি তুই নেই তো আমিও নেই ।

অনেক সময় আর একটা মানুষের অস্তিত্বও এমন করে জড়িয়ে থাকে আমাদের ভেতরে যে আমরা তাদের আলাদা করে খোঁজার কথা ভাবতেও পারিনা । বুঝি তখন যখন আলগা মুঠো থেকে বালির মত ঝরে পড়তে দেখি আজন্ম অস্তিত্বে জড়ানো মানুষটাকে ।

বুকের ভেতর সবার কিছু নুড়ি পাথর জমা হয়ে থাকে ।টোকা দিলেই রিমঝিমিয়ে গড়িয়ে পড়ে । প্রতিধ্বনি দিয়ে যায় তোমার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা মানুষটার নামের ।
দীপের বুকে জড়িয়ে ছিল অনা, না বলা শব্দরা তৈরী করছিল ওদের কবিতা,,,
রাত কাটছিল রাতের মতো
তোর বুকের গভীরে
রাঙা হয়েছিল আমার জীবন
তোর ছোঁয়ার আবিরে ।

নবমীর দিন ।পূজো হয়ে গেছে । মন খারাপ সবার ।কাল দশমি । কটা দিন কিভাবেই না পেরিয়ে গেল । দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে আমরা ছ মূর্তি ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছি ।সেই আগের মতোই সব আছে ।শুধু মন সবার খারাপ ।আবার কবে এমন করে মিলব আমরা ।আবার কবে এমন করে আড্ডা বসবে কে জানে । জানি আরো কিছু দিন আছে হাতের মুঠোয় ।কিন্তু সে তো নদীর মত বয়ে যাবেই। মুঠো বন্ধ করলেই কি আর মূহুর্ত দের বেঁধে রাখা যায় ।তারা শুধু থেকে যায় মনের অ্যালবামে।দশমির কষ্ট যে আজ আমাদের মনেও । কোথায় যেন তার কাটছে ছন্নছাড়া দলের ।

যে গল্পই শুরু করা হচ্ছে সেটাতেই ঘুরে ফিরে আসছে সবার আলাদা হয়ে যাওয়ার কষ্ট ।জানি সবাই তবু মন বড় অবুঝ বান্দা ।কিছুতেই মানতে চায় না সবেরই বিরতি আছে ।তবে বিরতি মানে কিন্তু শেষ নয় ।তার পরেই গল্পের নতুন মোড় আসে । আজ রাগ ভুলে রাজা আর সোমেরো মন খারাপ । দীপ টাই যে এত দূর চলে যাবে ।

হ্যাঁ রে আমার যেতে এখনও দেরি আছে ।তোরা এখন থেকেই শোক সভা পালন করবি? হেসে বলেছিল দীপ। প্রসঙ্গ পাল্টে অন্যের মুড ঠিক করতে ওর জুড়ি মেলা ভার। আমি ভাবলাম তোদের সাথে বসে একটা প্ল্যান করব, আবার বলেছিল।

রাতে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার ব্যাপারে তো । সে তো ঠিক হয়েই আছে । ওতে আবার প্ল্যান করার কি আছে, বলেছিল রিমি ।

না ওটা নয় ।অন্য একটা কথা ।

কি? রাজা জিজ্ঞেস করেছিল।

যাওয়ার আগে ভাবছি বিয়েটা করেই ফেলব ।

কিইইইইইইইইইইইইইইইইই? সবকটা একসাথে চিৎকার করে উঠেছিল । মুখ গুলোতে এতবড় হাঁ হয়েছিল যে দশটাকা দামের রসগোল্লা একবারে ভরে দেওয়া যাবে ।

কি বললি? কাকে ।কবে? কখন? কেন? সবকটা একসাথে প্রশ্ন গুলো করেছিল ঝড়ের বেগে ।

আস্তে আস্তে করে বল। যাওয়ার আগে করব । তোদের প্রথম বললাম ।ডেট এখনও ঠিক হয়নি তাই সেটা বলতে পারলাম না ।আর কাকেই বা বিয়ে করব, একটা বাঁদরি আছে তাকে ছাড়া – – বলে আঙুলটা আমার দিকে তুলে ছিল ।

ওদের সাথে আমিও এবার হাঁ হয়ে গেছলাম পাগলের কান্ড শুনে । আর বাকিগুলো তো একটুর জন্য হার্ট ফেল করল না ।

রাজা একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, সত্যি বলছিস? ইয়ার্কি করছিস না তো?

না রে । দীপ বলতেই সবকটা হইহই করে দীপের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তনু তো রেগে বলেই দিল, আমরা নামেই বেস্ট ফ্রেন্ড ।ভেতরে ভেতরে ওদের সব ঠিক হয়ে গেল আর এতক্ষণে আমাদের বলছে । বলে ঠোঁট ফুলিয়েছিল ।

তুই কবে থেকে অনার মত হয়ে যাচ্ছিস রে । নে তোদের জন্য একটা এক্সট্রা ট্রিট দেব একটু দেরীতে বলার জন্য । এবার তো আর রাগ করে থাকিস না । আমার কুচু বন্ধু টা!, বলে ওর মাথাটা আদর করে ঘেঁটে দিয়েছিল দীপ।

জানিস এই দিনটার জন্য কত অপেক্ষা করেছি আমরা, বলেছিল রিমি ।

সবকটা সবকটাকে জড়িয়ে ধরে হইহই করছিল ।রাজ আর সোম তো বলেই দিল, আমাদের দোস্তি কেউ ভাঙতে পারবে না । দীপ ফিরে এলেই আমাদের ছজনের বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করে দেব।

সেদিন সারা রাত দেদার মজা করে ঘুরেছিলাম আমরা আমাদের ছোটবেলা বড়বেলার মতো । এবারের পূজোর গল্পটা আর খাপছাড়া থাকেনি ।বন্ধুত্বের মোড়কে বরং রঙিন হয়ে উঠৈছিল।

দশমীর পূজোর শেষ।ঘট বিসর্জন ও হয়ে গেছে । সারা বাড়ি মেতে উঠেছে সিঁদুর খেলায় ।সবকটা বাঁদর লাল রংএ রাঙা হয়ে গেছে ।এক ফাঁকে আমার হাত ধরে ভেতরে টেনে নিয়ে গেছল দীপ । গালে, কপালে, সিঁথি তে ভালোবেসে ছুইয়ে দিয়েছিল সিঁদুরের রং। আজ ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের রং এক হয়ে গেছল এক ছোঁয়ায় ।আমি সিঁদুর লাগাতে গেলে হাত দুটো ধরে নিজের গাল দুটো আমার গালের সাথে ঘসে সিঁদুর লাগিয়ে নিয়েছিল।
তোর গায়ে রং লাগলে আমার জন্যে আর রং লাগে না রে । আমি তো তোর রং এই রঙিন হয়ে থাকি, ফিসফিস করে আমার কানে কানে বলেছিল দীপ।

ধ্যাত । তুই এখন খুব বদমাশ হয়ে যাচ্ছিস গাধা ।

তাআআআআআআআই।কি বদমাইশি করলাম বল, মুখটা আমার আরও কাছে এনে বলেছিল ।

আমার কাছে ধরা পড়ে গেছ অনা দিদি, শুনে পেছনে চমকে তাকিয়ে দেখি সই।
সেই আমার সতিন ই হলে অনা দিদি । আমার ছোট কর্তা কে ছেড়ে থাকতে পারলে না শেষ পর্যন্ত ।তাইতো ।

ছুটটে গিয়ে কোলে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরেছিলাম আমি
দীপ এসে জড়িয়ে ধরে ছিল আমাদের দুজনকে ।

ভাল থাকিস দাদা দিদি ।এই বুড়ি র সারা জীবনের সই হয়ে জড়িয়ে থাকিস চাদরের মতো আমার এই ছোট কর্তা কে ।কি রে থাকবি তো?

থাকব সই ।সারা জীবন থাকব ।জীবনের ওপারেও থাকব।বলে আরো জোরে আঁকড়ে ধরে ছিলাম আমার জীবনের সেরা দুজন মানুষকে ।ঢেকে রাখতে চেষ্টা করছিলাম চাদরের মতো ।

সমাপ্ত……..

আমাদের সবার জীবনে রোদ, ছায়া, আলো, বৃষ্টি, ঠান্ডা সব আসে । আর সব কিছু থেকে আড়াল করে রাখে একটা চাদর।শীতের ঠান্ডায় একটু ওম দিয়ে আমাদের ঢেকে রাখে একটা পশমের চাদর। জীবনে যখন আমরা হেরে যেতে থাকি তখন, আমি আছি তো চিন্তা কি, জয় তোর একদিন হবেই বলে মেরুদন্ড সোজা করে বারবার হাটতে শেখায় বাবার ভালবাসার চাদর। হাজার বড় হয়ে গেলেও যার কোলে মাথা রেখে কষ্টে কাঁদা যায়, ঘুমানো যায় সেই মায়ের ভালবাসার চাদর । আকারনে ঝগড়া অভিমান করা পাবলিক যারা হাজার কষ্টের মাঝেও আমাদের হাসাতে পারে, ফাঁকা পকেট নিয়ে আমাদের পৃথিবীর সব খুশি দিতে পারে, ভালবাসতে পারে ।যে কোন সময় যে কোন পরিস্থিতিতে বলতে পারে, আমি আছি চিন্তা কি তোর, সেই বন্ধুদের ভালবাসা খুনসুটির চাদর সারা জীবন জড়িয়ে থাকে আমাদের ।আর আমরা কিন্তু আজানতেই সেই চাদরের ওমে অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারি আমাদের জীবনে আসা শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কে।

কখনও ভেবে দেখবেন মানতে চাই বা না চাই, পাই বা না পাই আমরা সবাই সারাজীবন ধরে শুধু ভালো বন্ধু খুঁজে যাই ।বন্ধুত্বের চাদর আর তার ওম খুঁজে বেড়াই । পাই না হারিয়ে ফেলি সেটা অন্য গলপ।

এই পর্ব টা হয়তো না লিখলেও চলতো ।তবু পূজো, ভালবাসা, বন্ধুত্ব আমার কাছে সমার্থক শব্দ । এই পূজোতেই তো আমরা ছুঁয়ে যাই ছোটবেলা, ফেলেআসা বন্ধুত্ব প্রেম।
সারা বছরের কাজের শেষে মায়ের মণ্ডপে মায়ের মুখের সাথে আমাদের চোখ গুলো খুঁজে বেড়ায় ছোট বেলার বন্ধু নামের চেনা কিছু মুখ। ছেলেটা ছুটি পড়লেই এক মূহুর্ত নষ্ট না করে বাড়ি র পথে পা বাড়ায় বাড়ির লোকের সাথে তার মনের মানুষ কে কাছে পাওয়ার জন্য । মেয়ে টা অপেক্ষা করে থাকে এই ছুটিতে প্রানের মানুষটাকে আর একবার কাছে পাওয়ার অপেক্ষায় ।

তাই হয়তো লিখে ফেললাম ।

(জানি থেকে যাবে রেশ, তবু এখানেই শেষ………….. জানি ওদের কথা মনে পড়বে ।তবু……. আজ এই টুকু থাক । আবার একদিন দেখা হবে আপনাদের সাথে হয় তো ওদের বা অন্য কারো বন্ধুত্ব, ভালবাসার গল্প বলতে গিয়ে । ভাল থাকবেন সবাই । জানাবেন কেমন লাগল ।আর বন্ধুত্ব করতে ভুলে যাবেন না ।ওরাই কিন্তু আমাদের বাঁচিয়ে রাখে ।অপেক্ষায় রইলাম আপনাদের উওরের অপেক্ষায়). ।

(গল্প টি ভালো লাগলে প্রিয় গল্পের আসর পেজ টা কে ফলো করতে পারেন আরো সুন্দর সুন্দর গল্প পড়ার জন্য)

গল্পের শহরhttps://golpershohor.com
গল্পের শহরে আপনাকে স্বাগতম.........গল্পপোকা ডট কম কতৃক সৃষ্ট গল্পের অনলাইন প্লাটফরম

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

error: ©গল্পেরশহর ডট কম