চাদর Subhra Roy পর্ব ৯+১০

চাদর
Subhra Roy
পর্ব ৯+১০

কত দিনের পুরনো এই পূজো । কাল থেকে পূজো শুরু । এই সন্ধ্যা বেলায় সেই পূজোর কাজ শুরু হয়ে গেছে । বাড়ির সবাই কি ভক্তি ভরে সেই কাজ করছে । মামনি, জ্যেঠিমা, কাকিমা রা সবাই নিষ্ঠা ভরে ঠাকুর মশাই এর কথা মত কাজ করছে। আমি ও বসে ছিলাম ওদের ওখানে । বাচ্চা গুলো কখনো বসছে কখনও ছোটাছুটি করছে । পাড়ার পূজো দেখলেও এভাবে সামনে থেকে পূজোর কাজ দেখা, তাতে সাহায্য করা কখনও করা হয় নি। ঠাকুর মশাই আরও কিছু দরকারি জিনিস আনতে বলেছিল। সব জিনিস ঠাকুর ঘরে আছে । তাই জ্যেঠিমা বললেন আমাকে আর পরি কে জিনিস গুলো নিয়ে আসতে । আমি বাসনের ঝুড়ি টা নিয়ে ছিলাম। আমার আগে আগে যাচ্ছিল পরি । হঠাৎ একটা কিসে পা লাগায় সোজা লাফিয়ে আমার কাছে । আর একটু হলেই দুজনেই ভোগে চলে যেতাম ।একজন এসে ঝটপট ধরে নিয়েছিল আমাকে ।নইলে যে কি হত। তাকিয়ে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে দেখি সকালের ছেলে টা ।দীপের বড় মাসির ছেলে । আমার হয়ে পরিই বলেছিল, ঠ্যাংস রাজদা । আজ তুমি না থাকলে কি যে হত। আর অনাদি কে ঠেলার জন্য মামনি আমার একটা হাড় ও আস্ত রাখত না ।প্লিজ মামনি কে বোলো না । আমি ইচ্ছে করে করি নি গো।
না বলব না । যা এবার নইলে পিসি রাগ করবে ।বলে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তোমার লাগেনি তো।
আমি মাথা নেড়ে বলেছিলাম, না লাগেনি । ঠ্যাংস ।
বলে পূজো র যায়গায় চলে গেছলাম । পেছনে তো আমার দুটো চোখ নেই নইলে দেখতে পেতাম রাজ আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর ওপরে বেলকনিতে দাড়িয়ে থাকা একটা ছেলে রাগে লাল হয়ে গেছে ।

এত কথা বলার কি আছে একটা বাইরের মেয়ের সাথে । না হয় পড়েই যাচ্ছিল তা না হয় যেত । খুব জোর জিনিস গুলো পড়ে যেত । তা পড়ত । তা বলে কেউ অচেনা একটা মেয়ে র হাত ধরে । সভ্যতা বলে কিছু শেখেনি । অনা কি ডেকেছিল তোকে ওকে ধরতে তা না যত সব আদিখ্যেতা । আর অনার ও খুব বাড় বেড়েছে । একটা আধ চেনা ছেলে র সাথে কেউ এত কথা বলে । এই জন্য বলি দেখে হাটবি ।না আকাশের দিকে মুখ করে চলবে । তা ঠিক আছে তোকে একটু সাহায্য করেছে ।তা বলে এত কথা কিসের । ভাবতে ভাবতে নীচে নেমে এসেছিল দীপ । দেখছিল সবাই বেশ আড্ডা মারছে । দেখেই মাথাটা খারাপ হয়ে গেছল আবার ।আবার উঠে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল নিজের ঘরে।

বেশ মজার মানুষ দীপের এই রাজ দা। আমাদের সবার সাথে বেশ মিশে গেছে । আমাদের থেকে বছর দুই তিনেক এর বড় হবে । রাজা আর সোম তো এক্কেবারে ফ্যান হয়ে গেছে । পূজোর কাজ চলছে এখনও । তার সাথে আমাদের আড্ডা ও । কিন্তু আমাদের আড্ডার মহারাজ কই ।অনেকক্ষন ধরে দেখিনি দীপ কে । এবার একটু কেমন যেন লাগছে । আসলে সকালের ঐ ঘটনাটার পর থেকে ইচ্ছে করেই অন্য কাজে ব্যাস্ত থাকার চেষ্টা করেছি ।কিন্তু মানুষের মন হচ্ছে তাই যেটা সহজ সেটা চাইবে না ।আর যেটা পাবে না সেটাই খুঁজে মরবে ।না উঠে দেখি একবার ।আমার ওপরেই আবার রাগ করে বসে নেই তো ।বড্ড জ্বালায় ছেলেটা আমাকে । ওর বিয়ে টা হলে বাঁচি । সত্যি ই কি বাঁচব । আর এই মূহুর্ত গুলো । তোকে ছাড়া বাঁচব কি করে রে। খুব কষ্ট হবে জানিস। শুধু মানির জন্য বেঁচে থাকা ।নইলে কবেই……. এই শুরু হল আবার । নিজেকেই নিজে বকি । আর কি কোন কাজ নেই দীপ ছাড়া, কোন কথা নেই দীপ কে বাদ দিয়ে । উঠে পড়েছিলাম আমি ।আর এভাবে বসে থাকতে পারব না । কোথায় গেল গাধা টা দেখি ।অন্য সময় হলে এতক্ষণ তো আমার মাথা খেয়ে নিত। উঠতে যাব এমন সময় রাজ দা বলল, কোথায় যাচ্ছ অনন্যা? বোর হচ্ছ আমার গল্পে । বাকিরা বুঝেছিল। আমার হয়ে উওর টা সোম ই দিয়েছিল, ওকে যেতে দাও রাজ দা । ওর গাধা কে খুঁজতে যাচ্ছে । এতক্ষন যে চুপ করে বসে ছিল সেটাই অনেক। দুটো তো এক মিনিট ও আলাদা থাকতে পারে না সেই স্কুল থেকে একসাথে । আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, যা নিয়ে আয় তো ওটাকে । সেই কখন থেকে পাত্তা নেই গাধার। বাড়ি টা যেন আমাদের আর ও অতিথি ।

ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে ছেলেটা । আবার কি হল । আমার ওপর রাগ করেছে না বিদিশার সাথে কিছু হয়েছে । উফ। শান্তিতে যে একটু রাগ করব সেই উপায় ও নেই । আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিলাম, কি হয়েছে রে । এরকম করে শুয়ে আছিস কেন?
তোর তাতে কি? আমার জন্য কারো কিছু এসে যায় না । তুই যা এখান থেকে । আমার কাউকে দরকার নেই । তোদের অনেক গল্প করার লোক আছে ।তাহলে আমার কাছে এসেছিস কেন? আমাকে একা একটু থাকতে দে ।

একা থাকতে দেব না ।কি করবি তুই ।ঝগড়া । ওটা ছাড়া আর পারিস কি। কখন থেকে খুঁজছি । চিন্তা হয় না । আর তুই আমাদের কাছে কি তুই জানিস না । ফালতু বলছিস কেন ।কি হয়েছে বল না ।

কিছু হয় নি । যা বললাম তো । আমি জানি তোর কোন দরকার নেই আমাকে বলে আবার বালিশে মুখ গুঁজে দিয়েছিল ।

হড়বড় করে ঢুকতে গিয়ে লাইট জ্বালাতেই ভুলে গেছি । ঘরটা আধা অন্ধকার ছিল । বাইরের আলো যেটুকু আসছিল তাতেই বুঝতে পারছিলাম উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছে পাগলটা । এত বড় হল অভ্যাস বদলালো না । আর একটু কাছে গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে আস্তে আস্তে বলেছিলাম, কে বলেছে তোকে, তোকে দরকার নেই আমার ।তুই সব জানিস বল। আর অন্য কারো সাথে কথা বললেই যদি ভুলে যেতাম তোকে তাহলে খুঁজতে এসেছি কাকে? ভুতকে । রাজদার সাথে কথা বলাটা পছন্দ হয় নি বোধ হয় তাতে আবার তখন পড়তে পড়তে ধরেছিল আমাকে । কেউ বলেছে বোধ হয়। যা রাগ ছেলের ।যত জোর জুলুম সব আমার ওপর। কি রে ওঠ।অবশ্য আমারও ভালো লাগেনি ।এমনি ভদ্র হলেও আমার সাথে একটু যেচেই কথা বলেছে কয়েক বার। হয়তোবা স্বাভাবিক ভাবেই বলেছে । তবু….
হঠাৎ করে উঠে বুকে মুখ গুঁজে জোরে জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে । কিচ্ছু বলেনি । ভাগ্যিস অন্ধকার ।নইলে কেউ দেখলে কিছু বলার জায়গা থাকত না । তার ওপর বিদিশা কখন আসবে সেটা ও ঠিক করে বলে নি ।সেই নিয়ে হয়তো মুড অফ ।
আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম ।কিসের যে এত অভিমান । মজা করতেই বলেছিলাম, এরকম করছিস দেখলে কিন্তু তোর বিয়ে টাই ভেস্তে যাবে ।তখন কি করবি ।
মুখটা আরও জোরে গুঁজে দিয়ে বলেছিল, গেলে যাবে ।মানে?
আর একটা কথাও বলেনি । আবার ছেলেমানুষ হয়ে গেছে । কোমর টা জড়িয়ে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে আমার বুকে । বিশ্বাস কর খুব ইচ্ছে করছে তোকে জড়িয়ে ধরে আদর করি, বলি, দেখ আমি তো আছি । কিন্তু তুই ই যে আমার নোস, তুই অন্যকারো । যেভাবে তুই আমার কাছে থাকিস মানুষ তাতে ভুল বুঝতে বাধ্য । কিন্তু প্রশ্রয় কি আমিও একটু দিই না অজান্তে । আসলে মন বড় বেইমান জিনিস জানিস। যে জিনিস আমার নয় তার ও কুড়িয়ে পাওয়া টুকরো গুলোও যত্ন করে রাখতে চায় । এই যে তুই আমার সাথে এরকম করিস অন্য কেউ হলে কি আমি সহ্য করতাম? করতাম না । কিন্তু তোর কাছে যখন থাকি মনে হয় এই মুহূর্ত টুকু আমার আর কারো নয় । আর কাউকে দেব না আমি। হয়তোবা ভেতরের কেউ অন্য কিছু চায় । সারা জীবনের বেঁচে থাকার রসদ টুকু জোগাড় করে নেয় পড়ে পাওয়া সময় টুকু থেকে ।

চল নীচে চল। সবাই তোর জন্য বসে আছে । আর একটু পরে খেতে ও ডাকবে ।
আস্তে আস্তে উঠে আমার সাথে নীচে এসেছিল।
একটু পরেই পূজোর কাজ শেষ করে খাওয়া দাওয়া করে সবাই শুয়ে পড়েছিল ।কাল সকাল সকাল উঠতে হবে ।পূজো শুরু তো।কাল বিদিশা ও আসবে । আশা করি আর কোন সমস্যা হবে না ।

স্নান সেরে সকাল সকাল নেমে এসেছিলাম ঘর থেকে ।
আজ সপ্তমী । সবার দেখে শাড়ি ই পরেছিলাম । নেমে আসতেই মামনির সাথে দেখা । নীচে নামতে যাব হঠাৎ মামনি বলল, তুই চলে এসেছিস। বাঁচা গেল কি? তোকেই ডাকতাম এবার ।আজ সবাই পাঞ্জাবী পরবে । দীপকে পরতে বললাম কিছুতেই পরবে না । দেখ তোরা সবাই রেডি হয়ে গেছিস আর ও বসে আছে । দেখ না মা যদি পরিয়ে আনতে পারিস ।কোন কথা শোনে না আজকাল । তোর বকা তেই যা ঠান্ডা ।আমার এত কাজ কোন দিকটা দেখব বলত। যা না মা।
কথা গুলো বলেই নীচে চলে গেছল মামনি । অগত্যা আমাকেই যুদ্ধে নামতে হল। একটু ঝগড়া হতে পারে ভেবে ই ওর ঘরের দিকে গেছলাম ।
ঘরে ঢুকে দেখি স্নান সেরে একটা কমিক্স নিয়ে বসেছে । মানে ঠিক কিছু চলছে মাথায় । এমন দিনে বই খুলে বসাটা তো খুব একটা স্বাভাবিক কিছু নয় ।
মাথাটাও ভালো করে মোছেনি । উফ এটাকে নিয়ে পারিনা আর। পাঞ্জাবী টা খাটে রেখেছিলাম । মাথাটা মুছিয়ে দিতে দিতে বলেছিলাম, চটপট এটা পরে রেডি হয়ে নে ।নীচে চল ।পূজো শুরু হয়ে যাবে ।
হুম দেখছি।
এতক্ষন মাথা তুলে আমাকে দেখার দরকার হয় নি বাবুর। এবার মাথাটা তুলে দেখে বলে, শাড়ি পরলি হঠাৎ।
সবাই পরেছে তাই পরেছি । আর আজ কি প্রথম শাড়ি পরলাম ।আগেও তো কতবার পরেছি।কই এরকম কিছু তো তুই বলিস নি আগে কখনও ।

তুই কবে থেকে সবার সাথে তাল দিচ্ছিস বল তো ।

এই তুই সকাল থেকে আজ ঘেটে আছিস কেন বলত । কোথায় কেউ একটু সাজলে লোকে কমপ্লিমেনট দেয় আর তুই ভাট বকছিস। মানলাম আমি বিদিশার মত সুন্দর নই তা বলে কি ভাল কিছুই বলা যায় না আমাকে দেখে । এবার কষ্ট হচ্ছিল আমার ।কেউ না জানুক আমি তো জানি কাকে একবার দেখাতে সেজেছি আমি ।

ভাল লাগছে ।এক কথায় শেষ করে ছিল দীপ।

তোর দয়ার কথা চাই না রে আমার । ইচ্ছে হলে নীচে আয় না হলে বসে থাক । আমি চললাম।

চলে যাচ্ছিলাম হাতটা ধরে এক টান মেরেছিল দীপ ।আমি সোজা গিয়ে ওর বুকে । বোঝার আগেই দুটো হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল আমাকে । মুখের উপর এসে পড়া চুল গুলোকে আস্তে আস্তে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, আমাকে বিয়ে করবি অনা।
থরথর করে কেঁপে উঠেছিলাম আমি । কি বলছে এটা ছেলেটা । ইয়ার্কি করছে আমার সাথে । কিন্তু গলা শুনে তো মজা করছে বলে মনে হচ্ছে না । তাহলে? নাকি ভাবছে আমার সাথে যা ইচ্ছা তাই করা যায়, যা খুশি আমাকে বলা যায় । এতটা ছোট ভাবে আমাকে দীপ । বিদিশা আসতে পারে নি বলে আমাকে দিয়ে শুধু মাত্র সেই জায়গাটা পূরন করতে চাইছে । এটাই ঠিক । আবেগ টাকে ধাক্কা মেরে ফেলে ওর হাত দুটো ছাড়িয়ে উঠে গেছলাম । রাগে চোখে জল চলে আসছিল । তুই আমার সাথে এরকম করতে পারলি দীপ? নিজের ভেতর থেকে কথাটা বেরিয়ে আসতে চাইছিল।

কোন রকমে বলেছিলাম, বিদিশার রিপ্লেসমেনট চাইছিস দীপ । ও এখনও আসেনি বলে ওর যায়গায় আমি তাই না । এটা বলতে পারলি তুই আমাকে । তোর একটুও আটকালো না বল।তুই, তুই আমাকে……….. কথাটা আর শেষ করতে পারিনি । ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম । বুকের ভেতর বাঁধ ভাঙলে কেমন করে জল আটকাতে হয় আমার জানা ছিল না ।

কিছু কথা বলার ছিল । পরে বলব ভেবেছিলাম । কিন্তু কেন জানিনা মনে হচ্ছে সময় চলে যাচ্ছে । যদি না চাওয়ার মত কিছু ঘটে যায় আমি থাকতে পারব না তোকে ছেড়ে অনা । দরজাটা লাগিয়ে পাগলি টাকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম। সাদার ওপর কমলা ফুল তোলা একটা শাড়ি পরেছে ।ভেজা চুল এলোমেলো করে পিঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ।মনে হচ্ছে যেন এক সাজি শিউলি ফুল দিয়েছে কেউ আমায়। আমার শিউলি ফুল । কেউ চোখ তুলে তাকালেও আমার সহ্য হবে না । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা আমার বুকের ভেতর ।

তোর মনে হয় তুই কারো রিপ্লেসমেনট হতে পারিস। কারো ক্ষমতা আছে আমার জীবনে তোর জায়গাটা নেওয়ার । বিদিশা কে তো বাদই দিলাম । তোর মনে হয় তুই ছাড়া আমার কোন অস্তিত্ব আছে ।

অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম দীপের দিকে । কি বলছে টা কি । আজ বিকেলে বিদিশা আসছে । আর এখন এসব কথা আমাকে বলছে । মাথাটা ঠিক আছে তো।
বিদিশার কি হবে? বলেছিলাম আমি ।

সেটা আমি বুঝব ।

পাগলামির একটা সীমা থাকে দীপ । ঐ মেয়ে টার কথা ভেবেছিস।

সব ভেবেই বলেছি।

তুই আবেগের বশে কথাগুলো বলছিস। বিদিশা এলে সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি যাচ্ছি ।তুই আয়।

আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবি তো অনা?

আর কোন উওর দিইনি । দরজাটা খুলে নীচে নেমে গেছলাম ।কারন প্রশ্ন গুলোর উত্তর আমার দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না ।

বিকেল বেলায় বিদিশা চলে এসেছিল । সকালের পর সেভাবে আর কোন কথা বলিনি দীপের সাথে । এখন তো বিদিশা ও চলে এসেছে । আর কোন দরকার নেই আমার । বাকিরা থাকলে থাকবে । আমি ঠিক করে নিয়েছি দশমীর পরেই চলে যাবো । ভাল লাগছে না আর এখানে থাকতে । চুপচাপ নিজের রুমেই বসেছিলাম । কাল অষ্টমী । কত কি প্ল্যান ছিল আমাদের । কিছুই হবে না জানি ।সেরকম ভাবে কোন পূজোতেই আমরা একসাথে থাকিনি । তবু মনে হত পূজো শেষ হলেই আবার সবাই একসাথে হব। কিন্তু এবার বোধ হয় সত্যিই সব শেষ । ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । পরি রাতে একবার খেতে ডাকতে এসেছিল । শরীর খারাপ বলে শুয়ে ছিলাম আর যাই নি । একটু পরে তনু এসেছিল । জিজ্ঞেস করেছিল, কষ্ট হচ্ছে অনা?

না রে সত্যি শরীর টা খারাপ ।

আমাদের কাছে লুকোতে পারবি অনা । আমরা কেউ কিন্তু কাউকে কম চিনিনা। এটুকু না চিনলে এতদিন আমরা একসাথে থাকতে পারতাম না রে । চল কাল ফিরে যাবি । বিদিশা আসার পর কারোর আর ভালো লাগছে না । সন্ধ্যার পর তো নীচে যাসনি তুই। তাই জানিস না । সবাই চলে যেতে চাইছে ।

না রে এভাবে যাওয়া টা খারাপ দেখায় । পূজোর কটা দিন কষ্ট করে হলেও থাকতে হবে । না হয় পূজো শেষ হলেই চলে যাব। তুই চিন্তা করিস না । কাল আমি সবাইকে বুঝিয়ে বলে দেব।

রাতে মামনি এসেছিল । কোন তুলনা হয় না মানুষটার । এত কাজের মাঝেও দরকার অসুবিধার কথা জানতে চেয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ঘুম যে আর আসবে না মামনি । দীপ একবার ও আসেনি আর । জানে আমি খাইনি । তবু । অবশ্য ওর আর দরকার কি আমাকে ।ওর আসল মানুষ তো চলে এসেছে । তবু মন চাইছিল যদি একবার আসে। সেই আগের মত। আগে তো না বলতেই সব বুঝতে পারত, খাইয়ে দিত নিজের হাতে । আর আজ…… আবার চোখ ছাপিয়ে বৃষ্টি নামছিল ।

সারাটা রাত কোথা দিয়ে যে কেটে গেছে বুঝতেও পারিনি । কাল সারাদিন তেমন কিছু খায়নি। রাতে তো খেলই না ।এত রাগ আমার ওপর । অথচ একটা কথাও মানবে না । কি ভাবলি রে তুই খাবি না আর আমি খেয়ে নেব। এবার পুজোয় মা এর কাছে তোকে চেয়েছি । তার জন্য এটুকু করব না । উপোস না করলে অঞ্জলি দেব কি করে । তুই যে আমার মানত রে খেপি । কাল রাতে আমি তোর কাছে গেলে হয়তো তোর রাগ ভেঙে যেত।কিন্তু তোকে তো পেতাম না । তুই সেই বিদিশার কথা তুলতি। তাই এটুকু কষ্ট তোকে দিতেই হত । পারলে ক্ষমা দিস। তোকে পাব বলে এত আয়োজন । কাল সকাল কখন হবে রে । রাত যে আর কাটে না ।……. “না পেয়ে তোমার দেখা একা একা দিনযে আমার কাটে না রে।ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে………” – – গুন গুন করতে করতে শুয়ে ছিল দীপ রাত শেষের অপেক্ষায় । নতুন দিনের অপেক্ষায় । অনা কে পাওয়ার অপেক্ষায় । খেপি টার হাত ধরে নতুন পথে চলার অপেক্ষায় । অন্তহীন প্রতীক্ষা শেষের অপেক্ষায়…………….

পর্ব ১০

রাত জাগা পাখির মতোই চুপিসারে পার হয়ে গেছল রাত টুকু । অষ্টমীর দিন । ভোর বেলা থেকে সবাই পূজোর কাজে লেগে গেছল। সকাল বেলা পূজো, অঞ্জলি হবে । তার পর আবার সন্ধি পূজোর জোগাড় করতে হবে । এবছর সন্ধি পূজোর সময় একটু তাড়াতাড়ি পড়েছে । এবাড়ির প্রায় সবাই উপোস করে । ছোট, খুব বয়স্ক আর অসুস্থ যারা তাদের ছাড়া । কাল রাত থেকে কিছু খাইনি । আজ ও খাওয়ার ঝামেলা নেই কোন । আজ তো উপোস । এক দিক থেকে বেঁচে গেছি । এমনি দিনে অকারণে না খাওয়া দাওয়া করলে কেউ না কেউ কিছু বলতই।
কাল বিদিশা চলে এসেছে । দীপের আর কোন প্রয়োজন নেই আমাকে । আমি ও ভোর বেলা উঠে স্নান সেরে নিয়েছিলাম ।পূজো তে হাজার কাজ থাকে । হাতে হাতে সবাই মিলে করলেই চটপট হয়ে যায় ।
এবাড়িতে প্রচুর মানুষ আসে পুজোর সময় ।সন্ধি পূজোর পর মা চামুণ্ডার খিচুড়ি প্রসাদ নিয়ে যায় সকলে । তা ছাড়া বাড়ির লোকেরা ছাড়াও বাইরের যারা এসে উপোস করে এখানে সন্ধি পূজো দেখে ও পুষ্পাঞ্জলি দেয় তারা এ বাড়িতেই খেয়ে যায় । সকাল থেকে বাইরে শুরু হয়ে গেছে ভোগ রান্নার তোড়জোড় ।
সাজতে আর ইচ্ছে করছে না এখন । আর সেজে করবই বা কি । আর কার জন্যই বা সাজব। সাজলে যে সব থেকে বেশি পেছনে লাগত, সাজ পছন্দ না হলে যে আবার নতুন করে সাজাতো সেই মানুষ টাই আজ আমার থেকে লক্ষ যোজন দূরে। কিন্তু বিকেলে এত্ত লোকজন আসবে তখন তো যা হোক ভালো কিছু একটা পরতেই হবে ।তাই এখন একটা সাদামাটা শাড়িই পরে নেব।কি মনে করে যে তখন শাড়ি গুলো মানির কথা শুনে নিয়েছিলাম। শাড়ি পরে নামতে যাব তখনই পরি এসে হাজির । শাড়ি পরিয়ে দিতে হবে । শাড়ি পরেই মেয়ে পুষ্পাঞ্জলি দেবে । ওকে দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল । কি সরস্বতী পূজো, কি নাচের অনুষ্ঠান আমার জন্য সব কিছুই কিনে আনত দীপ । শাড়ির কুচি ধরে দেওয়া, আঁচলে সেফটিপিন লাগিয়ে দেওয়া সব কিছুতে দীপ। মাথায় ফুল আটকে দেওয়া তো ছেড়েই দিলাম। আর আজ।আমাদের সব স্মৃতি টুকু ছিল । ছিল না শুধু পূজোর কোন গল্প । দেখ দীপ আজ সেই গল্পটাও পূর্ণ হচ্ছে শুধু আমি আর তোর জীবনে তখন কোথাও নেই । দেখ না দীপ শাড়িটা কেমন এলোমেলো হয়ে আছে । চুলটাও ভালো করে বাঁধিনি । ভেজা তো । আর কোন দিন শাড়ি ঠিক করে দিবি না বল। আর কখনও ভেজা চুল দেখে বকবি না । আর বলবি, অনা চুল টা মোছ । শাড়ি টা ভিজে যাচ্ছে, এবার ঠান্ডা লাগবে ।
অজান্তেই চোখ টা ভিজে যাচ্ছিল। শাড়ি ঠিক করার বাহানায় মাথা নীচু করে চোখটা মুছে নিয়েছিলাম।আর তো দু দিন পর চলেই যাব । তার আগে না চাওয়া কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না আমি ।

নীচে নেমে এসেছিলাম আমি । পূজোর জোগাড় চলছে । একটু পরেই পূজো শুরু হবে । বিদিশাও নেমে এসেছে । এই সকালেও কি সুন্দর সেজেছে । ভারি মিষ্টি লাগছে । দীপ একদম ঠিক কাজ করেছে । এমন মেয়ে ই দীপের জন্য উপযুক্ত । ওর সাথে আরও দুজন এসেছে ।কি একটা ফটো সুট হবে । পুরনো দিনের পূজোর ওপর। এ বাড়িটা আজ বাদে কাল যখন ওরই হবে তখন আর বাইরে যাওয়া কেন । ভাবতে ভাবতে বুকের ভেতর টা কেমন যেন খালি হয়ে যাচ্ছিল ।
রাজা, সোম আর দীপ বাইরে গেছে কিছু জিনিস আনতে। আমি তনু আর রিমি মামনি জ্যেঠিমা দের সাথে জুটে গেছলাম ।সবার সাথে সাথে আমরাও কাজ করছিলাম। জানিনা কিছুই তবে চেষ্টা করছিলাম হাতে হাতে পূজোর জোগাড় করতে ।
ফল তখনও কাটা হয়নি । তাই দেখে মামনি আমাকে বলেছিল, চাথালে রাখা পূজোর ফল গুলো কাটা শুরু কর না মা । আমি আরও কাউকে পাঠাচ্ছি । সব কটা কোথায় যে কি করছে কে জানে ।
হাজার কাজে ব্যস্ত সবাই । কখন কে আসবে তার ভরসায় বসে না থেকে ফল কাটা শুরু করে দিয়েছিলাম। ফল কাটতে কাটতে বুঝতে পারলাম কেউ এসে বসে ফল কাটছে । ভাবলাম হয়তো জবাদি কে পাঠিয়েছে মামনি । কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম । পেছন ফিরে দেখা হয় নি কে বসেছে ।হঠাৎ করেই একটা প্রশ্ন শুনে পেছন তাকিয়ে দেখি রাজদা বলছে, আমি বুঝি এত খারাপ দেখতে যে একবার চোখ তুলে তাকানো হয় না ম্যাডামের । নাকি আমি মিস্টার ইন্ডিয়ার মত অদৃশ্য হয়ে গেছি বলতো । সেটা হলে কিন্তু চাপের ব্যাপার হয়ে যাবে।
না না তেমন কিছু নয় । আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি । ভাবলাম জবাদি এসেছে ।তাই ।

যাক বাবা । আমি তো ভাবলাম এত সুন্দর মিষ্টি একটা মেয়ে আমার দিকে একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না । একটু তো টেনশন হয়েই যায় বল। বলে হেসে ফেলেছিল রাজ দা ।

হেসে আবার ফল কাটায় মন দিয়েছিলাম আমি । ভাল মানুষ রাজদা । অন্য সময় হলে হয়তো আমিও একটু মজা করতাম । কিন্তু কথা বলার ইচ্ছেটাই হারিয়ে গেছে । ফল কাটা শেষ করে একটা বড় একটা থালায় ফলগুলো কেটে সাজিয়ে রেখে ছিলাম। একা অতবড় থালাটা তুলতে গিয়ে দেখি একা নিয়ে যেতে গেলে পড়েও যেতে পারে । আমাকে থালা নিতে গিয়ে বিব্রত হতে দেখে নিজেই এসে থালার আর একটা দিক ধরে পূজোর জায়গায় এসেছিল রাজ দা । না সত্যি ই ভাল মানুষ । নইলে পূজোর কাজে ছেলেদের টিকি খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যায় । আর এ তো দস্তুর মত কাজ করছে ।
থালাটা রেখে ঠ্যাংস বলে ঘুরতেই দেখি দীপ দাড়িয়ে আছে । মুখ টা কেমন লাগছে । ইচ্ছে করছে এক ছুট্টে গিয়ে জিজ্ঞেস করি কি হয়েছে । কিন্তু না কেন আমি এরকম করব । ওর দরকার বুঝতে বিদিশা আছে । আমাকে যখন ওর দরকার নেই তখন আমি ও কথা না বলে থাকতে পারব ।

একটু আগে পুষ্পাঞ্জলি হল । উপোস যারা করেছে তারা এখন কিছু খাবে না সরবত ছাড়া । একে কাল রাত থেকে কিছু খায়নি । এখনও ছুটে বেড়াচ্ছে বাচ্চা গুলোর সাথে । শরীর খারাপ না করে এবার ছাড়বেও না ।পরিকে একবার বলেছিলাম যেন অনা কে একটু সরবত খেতে বলে ।একটু পরে এসে বলে গেল, পরে খাবে বলেছে ।কেন একটা কথা ও বুঝিস না অনা । রাগ আমার ওপর নিজের ওপর তো নয় । কষ্ট আমাকে দিচ্ছিস দে নিজেকে দিচ্ছিস কেন। আবার সবার সাথে হেসে হেসে কথাও বলছিস বল। অথচ আমার সাথে একটা কথা ও বললি না । মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলি । একটা দু দিনের ছেলের সাথে এত বন্ধুত্ব হয়ে গেল তোর। ভাবতে ভাবতে রাগ অভিমানে কষ্টে ভেতরটা তালগোল পাকিয়ে গেছল। ঠিক তখনই দীপের পাশে এসে বসেছিল রাজ।

কি রে কেমন আছিস । এবার বন্ধুরা আছে বলে তো আমার সাথে কথা বলার ই টাইম পাচ্ছিস না ।বলেছিল রাজ।

না রে তেমন কিছু নয় । এবার ওরা প্রথম এলো তো তাই একটু সাথে থাকতেই হচ্ছে । তোর কি খবর বল।

এই চলছে ভাই ।অফিস বাড়ি । এত চাপ । এই ফাঁকা সময় গুলো থেকেই অক্সিজেন নিয়ে নিতে হয় । অন্য সময় তো গাধা আর নিজের মধ্যে কোন তফাৎ পাই না ।

গাধা শব্দটা শুনেই আবার অসহ্য লাগছিল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ওটা বলবি না । ওটা আমার নাম । আমার অনা বলে । এই প্রথম ছোট বেলার সবচেয়ে ভালো দাদা বন্ধুকে এত অসহ্য লাগছিল । মাথাটা আবার দপদপ করছিল যখনই মনে পড়ছিল রাজ অনার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে । আস্তে করে বলেছিলাম, তোকে একটা কথা বলার আছে আমার।

তার আগে আমি কিছু বলতে চাই? সত্যি কি বিদিশা তোর তেমন কেউ হয়? অনার সাথে তোর অন্য কোন সম্পর্ক নেই?

অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম আমি । কোনমতে বলেছিলাম, বিদিশা আমার বন্ধু । অনার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক সেটা ভাবিই নি কোনদিন ।

না মানে আমি সেভাবে বলতে চাইনি । আসলে ওরকম একটা মেয়ে । দেখলেই অদ্ভুত একটা টান আসে । তোরা এত ভালো বন্ধু তাই জিজ্ঞেস করলাম । আসলে, আসলে আমার ওকে ভালো লাগে । মানে……… কথাটা শেষ করতে পারেনি রাজ । দেখেছিল চোখের সামনে বসে থাকা শান্ত চেনা ছেলেটার মুখটা কেমন বদলে গেছে নিমেষে । রাগে লাল হয়ে গেছে ।

অনার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক সেটা তোর না জানলেও চলবে । শুধু ওর ব্যাপারে তোকে কিছু ভাবতে হবে না । ভাল কাউকে লাগতে পারে । তবে তার মানে সব সময় অন্য কিছু ভাবতে হবে তার কোন মানে নেই । অনার কথা মাথা থেকে বের করে দে ।

আর যদি না দিই।

তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না ।

উওরের অপেক্ষায় থাকে নি দীপ । শেষ উওর টা নিজেই দিয়ে চলে গেছল।

এভাবে কাউকে ভোলা যায় না কি । অনন্যা র মনে কি আছে না জেনে তোর কথায় আমি কোন কাজ করব না দীপ, মনে মনে ভেবে নিয়েছিল রাজ।

দেখতে দেখতে বিকেল নামছিল। সন্ধি পূজোর সময় হয়ে যাবে একটু পরেই । যারা উপোস করেনি তাদের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে । দীপকে অনেকক্ষন ধরে দেখিনি । খেতেও আসেনি ।হয়তো বিদিশা র সাথে কোথাও গেছে । খেয়ে ফিরবে । আর ভাবিনি কিছু । স্নান করতে চলে গেছলাম ।পুষ্পাঞ্জলি দেব । স্নান সেরে এসে কোন শাড়িটা পরব ভাবছি এমন সময় পরি দেবীর আবার আগমন ঘটল । হাতে একটা প্যাকেট । বলল, মামনি দিয়েছে ।এটা যেন অবশ্যই এখন পরে নীচে যাই। বলেই হড়বড় করে চলে গেল । খুলে দেখি একটা লাল ঢাকাই । খুব সুন্দর । আর খুব নরম ঠিক যেমন আমার পছন্দ । দীপের ও খুব পছন্দ ঢাকাই শাড়ি । এ ব্যাপারে মা ছেলের পছন্দ এক। মামনি কে একটা ধন্যবাদ দিতে হবে এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য । এত কাজের মাঝেও যে আমার কথা মনে রেখেছে সেটাই না অনেক । শাড়ি পরে অল্প সেজে নিয়েছিলাম ।সাজতে তেমন একটা আমার ভালো লাগে না । তবু যে টুকু না করলেই নয় সেটুকু রেডি হতেই হল।আজ তো মনটাও ভালো নেই।পূজোর সময় সবাই আলাদা আলাদা থাকলেও ফোনে কথা হতই। আর দীপের সাথে তো ঘন্টায় ঘন্টায় । মনেই হত না ও কাছে নেই। মানি বলতো, লাইভ রেডিও । অথচ আজ চোখের সামনে থেকেও একটা কথা বলার সময় নেই । এমন পূজো আমি চাইনি রে যেখানে তুই নেই ।তোর আবদার নেই । তোর ঝগড়া নেই। এ মন খারাপের মেঘ এত সহজে সরবে না জানি । তাই আর দেরী না করে ঠাকুর দালানে চলে গেছলাম ।ভিজে চুল খোলাই ছিল । নীচে নামতেই মানির সাথে দেখা । এখন আবার স্নান করেছি দেখে একচোট বকুনি দিল। মন টা আবার খারাপ হচ্ছে । মাথা ঘুরছে সেটা বলা যাবে না কাউকে । ভালো লাগছে না আর। কবে পূজো শেষ হবে । কবে তোমার কাছে যাব মানি । খুব ইচ্ছে করছে তোমায় ধরে একটু কাঁদতে । খুব মনে পড়ছে তোমার কথা মানি । খুব কষ্ট হচ্ছে আমার । চোখের জল কোন রকমে মুছে বেরোতে যাচ্ছি এমন সময় হাতটা ধরেছিল সুইট হার্ট । সোফায় যে বসে আছে আমি লক্ষই করিনি । আমার হাতটা ধরে বলেছিল, আমাকে একটু দালানে নিয়ে যাবি।আজ তোর সাথে যেতে ইচ্ছে করছে সই।

কেন নিয়ে যাব না ।চল।

একটা কথা বলব সই।

বল না ।

নিজের জিনিস এমন করে কেউ ছাড়ে । আমার সতিন নাই বা হতি । বোন ই হয়ে থাকতিস। তবে এত কষ্ট পেতিস না দিদি । বুড়ো সই তোর কম কিছু দেখিনি ।

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সই এর কোলে মুখ ঢুকিয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। অনেকক্ষন এর আটকে থাকা বৃষ্টি ।শুধু টোকা দেওয়া টুকু র অপেক্ষায় ছিল । আস্তে আস্তে উঠে চোখ মুছে বলেছিলাম, চল। এবার পূজো শুরু হয়ে যাবে ।
দুই অসম বয়সি সই হাত ধরে এগিয়েছিল হাজার যুগের রক্ষাকারী মায়ের পূজোর পথে ।

সন্ধি পূজো সবে শেষ হয়েছে ।পুষ্পাঞ্জলি হবে এবার । পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে নেমে আসতেই রাজদা ডাকল।একটু সরে এসে বলেছিলাম, কি বলবে বল। মামনির সাথে প্রসাদ দেব তো।

একটা কথা বলার ছিল ।

হ্যাঁ বল।

দীপ তো শুধু বন্ধু তোমার । আর তো কিছু নয় ।

উওর দিতে পারিনি আমি । উওর যে আমার কাছেও নেই । মাথাটা নিচু করে দাড়িয়ে ছিলাম ।

আমার তোমাকে ভালো লাগে অনন্যা । এই কদিনেই ভালো বেসে ফেলেছি তোমাকে । আমাকে বিয়ে করবে । আই প্রমিস , তোমার দীপের কথা মনেও পড়বে না তোমায় এত ভালবাসবো আমি।

আচ্ছা আগুনে পুড়লে ঠিক কতটা জ্বালা যন্ত্রণা হয়? আমার এখন ঠিক তেমনি লাগছিল । মনে হচ্ছে কেউ গায়ে আগুন দিয়ে দিয়েছে । কি ভেবেছে কি ছেলেটা । দুটো কথা বলেছি বলেই…….. ছি । দীপ ঠিকই বলে আমি একটা আস্ত বোকা । রাগে গা জ্বলে উঠছিল । দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলাম, দীপ আমার কে? দীপ আমার কাছে কতটা সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই । আর তুমি বুঝবে ও না । তাই পরের বার থেকে দীপের ব্যাপারে আমার সাথে কথা বলতে এলে দু বার ভেবে আসবে। সে ক্ষেত্রে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না ।

ঐ দিকে তাকিয়ে দেখ । তার পর ও যদি একই কথা তোমার মনে থাকে আমি আর কিছু বলব না ।

রাজদার তোলা আঙুলের ওপারে তাকিয়ে দেখেছিলাম দীপ বিদিশার আঁচল ঠিক করে গায়ে দিয়ে দিচ্ছে । দুজনের হাসি গুলোই বলছে ভালো আছে ওরা । ভাল আছে আমার দীপ। আবার অসময়ে চোখ দুটো অসময়ে ভরে গেছল।

এর পর ও তুমি একই কথা বলবে অনন্যা ।

এবার হাসি পেয়েছিল আমার । ভেজা চোখ মেলে হেসেই বলেছিলাম, আবার একই কথা বলব আমি । কারন তুমি যেটা দেখালে সেটা হল আমি ওর কতটা । ও আমার কি, কতটা সেটা সত্যি তুমি বুঝবে না । হয়তোবা না বুঝে অপমান করেছি তোমায় । কিন্তু সত্যি আমার কাছে কাউকে দেওয়ার মত কিছু নেই ।

অবাক চোখে মেয়েটাকে দেখছিল রাজ । এমন দুটো চোখ এমন একটা রাগ মাখা মুখ মূহুর্তে মনে পড়ে গেছল। এভাবেও ভালবাসা যায় । না বলা কথার এত জোর থাকে । নাম ছাড়া সম্পর্ক গুলো এত নিজের হয় কি করে? বুঝতে পারেনি রাজ। আমরাই কি বুঝতে পারি সব সময় ।বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা কোন মানুষ টা হঠাৎ করে আমাদের এত আপনার হয়ে যায় । বুঝিনা । শুধু থেকে যায় অভিমান ।

আর দাঁড়াতে পারিনি । ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম সাওয়ারের তলায় । সাওয়ারের জল আর চোখের জল এক হয়ে গেছল। নতুন শাড়ি টা ভিজছিল, আমি ভিজছিলাম । আর চাইছিলাম এত জলে ভিজে যদি একটু শান্তি পায় মন।

কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ভিজে ছিলাম মনে নেই । শুধু একটা ঘোরের মধ্যে এসে নিজেকে এলিয়ে দিয়েছিলাম জানালার পাশে থাকা আরাম কেদারায়। চার দিক অন্ধকার হয়ে গেছল। কাঁদব সেই ক্ষমতা টুকুও ছিল না । আমি কি মরে যাব ঠাকুর । তাহলে বেশ হয় । আর কষ্ট পেতে হবে না আমাকে ।কিন্তু মানি? না আর কারো কথা ভাববো না । আমি জানি আমি না থাকলে দীপ ঠিক মানিকে দেখবে । বড্ড ভালবাসে যে দীপ মানিকে । শান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করে ছিলাম আমি ।

দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম মনে হল। ঐ তো দীপ ঢুকছে । এত বছর পর ওকে চিনতে আর চোখ খুলতে হয় না । ওর গন্ধ ওর পায়ে র শব্দ বলে দেয় কে এসেছে । কিন্তু ও এখানে কেন আসবে? ও তো নিচে বিদিশার সাথে আছে । আমি কি স্বপ্ন দেখছি? মারা যাওয়ার আগে কেউ কি স্বপ্ন দেখে? কিন্তু সপ্নে কি কেউ লাইট জ্বালায় ।

আলোটা জ্বালাস না প্লিজ ।

আলোটা জ্বালাতে গিয়ে ও নিভিয়ে দিয়েছিল দীপ। আস্তে আস্তে কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল আমার ।

এত অভিমান আমার ওপর।তাও কথা বলবি না বল।

আস্তে আস্তে উঠে এসেছিলাম আমি ওর কাছে । আজ শেষ কথাটুকু বলতেই হবে আমাকে ।

আরও কাছে এগিয়ে এসেছিল দীপ । ওর পারফিউম, আফটার সেভ লোশনের গন্ধে আবার জড়িয়ে ধরছিল আমাকে । আমার মাথা গায়ে হাত দিয়ে বলেছিল,
আবার ভিজেছিস তুই। আর ভেজা অবস্থায় ওভাবে বসেছিলি বল। কষ্ট পাচ্ছিস নিজে আর আমাকেও দিচ্ছিস বল।

তোকে কেন কষ্ট দেব। আমার কিছু হলে তোর তাতে কি?

আমার কি তুই জানিস না । তোর কিছু হলে তোর মনে হয় আমি বাঁচব।বন্ধুত্ব করেছি । এপারে হাত ছাড়িনি, ওপারেও ছাড়ব না । আমাকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয় সেটা তুই খুব ভালো করে জানিস। আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবি তো তুই। আজ আমি চলে গেলে আর কিন্তু খুঁজে পাবি না আমাকে।

আর থাকতে পারি নি । ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম। জড়িয়ে ধরেছিলাম দীপ কে । ফিসফিস করে বলেছিলাম, একদম বাজে বকবি না ।

নিজে বাজে বকবি তাতে কিছু নেই। আমি বললেই দোষ।

এত জোর কিসের তোর আমার ওপর। কিসের অধিকারে তুই এত কথা বলিস আমাকে । তুই বিদিশা কে………… কথা শেষ হয়নি । দুটো ঠোঁট বন্ধ করে দিয়েছিল কথা । দুটো হাত বুকে জড়িয়ে ধরে মুছে দিচ্ছিল সব অভিমান । শরীরটা ছেড়ে দিয়েছিলাম ওর বুকে যেখানে আমি সব চেয়ে বেশি নিশ্চিন্তে থাকি ।তবু মন থেকে প্রশ্ন গুলো মুছে যায়নি । কথা বলতে পারছিলাম না তবু জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিদিশা কে কি বলব। একটু আগেও তো তুই ওর সাথে ছিলি ।ওর শাড়ি ঠিক করে দিচ্ছিলি।

আমাকে আরো একটু জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ও অনেক দিন আগেই সব জানে ।শুধু তুই বুঝতে চাসনি । ভেবেছিস আমি ইয়ার্কি করছি । এতটুকু বিশ্বাস করিস নি আমার কথায় ।তাই ওকে আসতে বলেছিলাম ওর সামনেই সব বলব ভেবে যাতে তুই আমাকে ভুল না বুঝিস। কিন্তু দেখ সেই ভুল ই বুঝলি আমাকে । কপালে ঠোঁট দুটো ছুইয়ে রেখেছিল দীপ।
আস্তে আস্তে বলেছিল, তোকে একটা জিনিস দিতে খুব ইচ্ছে করছে । দেব ।তুই রাগ করবি না তো।

তোর কথায় রাগ করে কবে থাকতে পেরেছি বল। মুখ টা ওর বুক থেকে তুলে বলেছিলাম আমি।

একটা কৌটো বার করে একটু সিঁদুর নিয়ে আলতো করে সিঁথিতে পরিয়ে দিয়েছিল। এবাড়ির নিয়ম অষ্টমীর পূজোর পর মায়ের পায়ে ছোঁয়ানো সিঁদুর সব ছেলেরা তাদের স্ত্রী দের পরিয়ে দেয় । মামনি আমাকে বলেছিল ।

একটু আগেও ভাবছিলাম এত কষ্ট নিয়ে যেতে হবে । এখন মনে হচ্ছে যাব কেমন করে ।কেন যাব আমার সব কিছু ছেড়ে ।
মাথাটা আবার ঘুরছিল । চোখ টা অন্ধকার হয়ে আসছিল । টাল খেয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই ধরে নিয়েছিল আমাকে দুটো হাত।

অনেক দূর থেকে ভেসে আসছিল আওয়াজ টা ।অনা, এই অনা । আমার নাম ধরে ডাকছে কেউ । দীপ ডাকছে । বিছানায় শুয়ে আছি আমি । ভিজে শাড়ি আমার । দীপ আমাকে জড়িয়ে ধরে ডাকছে । ভিজে যাবে তো ও। চোখ দুটো খুলতেই পাগলের মত করছিল ছেলেটা । টুকরো টুকরো আদর ঝরে পড়ছিল আমার সারা শরীরে । দীপের আরো কাছে এসে মুখ গুঁজে দিয়েছিলাম ওর বুকে। বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছিল আদর। আমি ভিজছিলাম আদরে আদরে ।
কবে যেন কে একটা বলেছিল, ভালবাসা নদীর স্রোতের মত । যখন আসে বলে আসে না । ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায় । আর তুমি তাতে ভাসবেই। আটকাতে পারবে না স্রোতের টান। বুঝবে যখন দেখবে তুমি ভেসে গেছ।ভিজে গেছ প্রেমের আদরে।জড়িয়ে আছে ভালোবাসার চাদরে।

চলবে….

গল্পের শহরhttps://golpershohor.com
গল্পের শহরে আপনাকে স্বাগতম.........গল্পপোকা ডট কম কতৃক সৃষ্ট গল্পের অনলাইন প্লাটফরম

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

error: ©গল্পেরশহর ডট কম