চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ১০+১১

0
47

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১০

বিয়ে বাড়ির খাওয়া দাওয়া ফেলে পালাচ্ছে আরাদ আর জোনায়েদ। ভাগ্য ভালো আরাদ তখনই টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়েছিল। নাহলে নির্ঘাত সায়েনের সামনে পড়তো। কোনরকমে দু’জনে পালিয়ে বেঁচে গেছে। জোনায়েদ স্টেয়ারিং এ হাত দিয়ে বাড়ি মেরে বলল,’ধ্যাত তোকে আনাই আমার ভুল হয়েছে। আমি একা আসলেই ভালো হতো। শুধু শুধু আমার খাওয়া নষ্ট হয়ে গেলো।’

আরাদ বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বলে,’এমনভাবে বলছিস যেন জীবনে ভালো মন্দ খাসনি।’

‘আমি কি সেটা বলেছি??এতো কষ্ট করে টাইম লস করে গেলাম আর খেতেই পারলাম না।’

আরাদ জোনায়েদের সাথে কথা বাড়ালো না। কথায় কথা বাড়ে তাই সে চুপ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। সায়েনকে ঠিকমতো দেখতেই পেলো না। শুধু এক পলক দেখেছিল। আরাদ ভাবছে,যেদিন সায়েনকে সে নিজের করে নেবে সেদিন থেকে আর চোখের আড়াল করবে না সায়েনকে। অনেক হয়েছে। জোনায়েদ ড্রাইভিং এ মন দিয়ে বলে,’সায়েনকে কবে সত্যিটা বলবি??’

আরাদ দৃষ্টি জোনায়েদের দিকে ঘুরিয়ে বলল,’কেন??’

জোনায়েদ খানিকটা হেসে বলে,’এভাবে আর কতদিন??সায়েনকে যদি তুই নিজে থেকে সত্যিটা বলিস তাহলে ও কষ্ট বেশি পাবে না। আর যদি ও নিজে থেকে সবটা জানে তাহলে কি হবে?? একবার ভেবে দেখেছিস কি??সায়েন অত্যন্ত নরম মনের মেয়ে। আঘাত যত ছোট করে দিস না কেন??ক্ষতটা কিন্তু বড় করেই হবে।’

জোনায়েদের কথাটা ভাবাচ্ছে আরাদকে। সায়েন যদি সব জানার পর ওকে মেনে না নেয়??আর জয়নব বেগম ব্যপারটা কিভাবে নেবে??এভাবে তো আর চলা যাবে না। ভালোবাসা টা তো মিথ্যা দিয়ে শুরু হয়েছে। এটা সায়েন কিছুতেই মেনে নেবে না। এতদিন একসাথে থেকে এটা আরাদ খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে। এবার আরাদের সত্যি চিন্তা হচ্ছে। একটা মিথ্যা ওদের সম্পর্কটাকে কোথায় নিয়ে দাড় করায় কে জানে??

জোনায়েদ গাড়ি থামাতেই আরাদের ধ্যান ভাঙল। গাড়ি থেকে নামতেই জোনায়েদ বলল,’যা করার তাড়াতাড়ি করবি। আমাদের হাতে সময় খুব কম। নিউ ইয়ারের দিন বড় পার্টি আছে। তার আগে আমাদের সব কাজ শেষ করতে হবে। নাহলে এবার তোর হাতে সেরা বিজনেসম্যানের পুরষ্কার উঠবে না আরাদ!!’
আরাদ মাথা নাড়িয়ে বলল,’হুম!!দুটো একসাথে হবে। নিউ ইয়ারের দিন সায়েনকে সবই বলব আমি। জানি না সেদিন কি হবে?? তবুও সত্যি আমি সেদিনই বলে দেব।’

আরাদ নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেল। চেঞ্জ করে আবার ফিরে এলো সায়েনের বাড়ি। কারণ বিকেলে সায়েনের আসার কথা। যদি সময় মতো সায়েন এসে আরাদকে না পায়??তাই তাড়াতাড়ি চলে এসেছে আরাদ।

লিমার বিয়ে পড়ানো শেষ। এখন আরো কিছু নিয়ম মেনে লিমাকে বিদায় দেওয়া হবে। জয়নব বেগম তার বোনের সাথে কাজে ব্যস্ত। এদিক ওদিক ছোটাছুটির তালে আছেন। সায়েনের দিকে নজর দেওয়ার সময় তার নেই। তাইতো সায়েনকে সে শাফিনের হাতে দিয়েছেন। কিন্তু শাফিন কে কিছু না বলে সায়েন স্কুটি নিয়ে বের হয়ে পড়লো। ছোট টিফিন বক্সে খাবার নিলো আরাদের জন্য। আজকে ধরা পরার ভয় নেই সায়েনের। ধরা পরলে বলবে বাড়িতে এসেছিল কাজে। এতে জয়নব বেগম বকলে বকুক। কিন্তু আরাদের কাছে যাওয়াটা খুবই জরুরি। সায়েন বাড়িতে এসে দরজা খুলল। টিফিন বক্স নিয়ে টেবিলের উপর রাখলো। খোলা চুলগুলো হাত খোঁপা করে করতে করতে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। আরাদ বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে বই পড়তেছে। সায়েনকে দেখে সে সোজা হয়ে বসে বইটা পাশে রাখলো। সায়েন আরাদের সামনাসামনি বসে বলল,’বোর হচ্ছিলেন??’

আরাদ মুচকি হেসে বলল,’প্রথম দিন বোরিং লাগছিলো কিন্তু এখন তোমার এই বই পড়ছি তাই বোরিং লাগছে না। তোমরা কবে ফিরছো??ভালো লাগছে না আমার।’

সায়েন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’খাবার নিয়ে এসেছি খেতে চলুন। আর দু’দিন থাকব তারপর চলে আসবো। ওখানে একটুও ভালো লাগে না আমার।’

আরাদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’ওকে চলো।’

টেবিলে গিয়ে সুন্দর করে খাবার সাজিয়ে দিলো সায়েন। আরাদ খাচ্ছে আর সায়েন গালে হাত রেখে দেখছে। খাওয়া শেষে আরাদ হাত ধুয়ে নিলো। হাত মুছতে মুছতে বলল, ‘আজকেও তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।’

আরাদের কথায় নিজের দিকে চোখ বুলায় সায়েন। গাঢ় খয়েরী রঙের ল্যাহেঙ্গা পরেছে আজকে সে। জয়নব বেগম সাজিয়ে দিয়েছেন সায়েনকে। নিজেকে আজকে আয়নায় দেখার সুযোগ পায়নি সায়েন। রেডি হতে হতেই বর এসে গিয়েছিল। তাই দৌড়ে সেখানে চলে গিয়েছিল। সায়েন মুচকি হেসে বলল,’ধন্যবাদ। আপনি না বললে জানতাম না যে আজকে আমাকে সুন্দর লাগছে।’

আরাদের কপাল কিন্ঞ্চিৎ কুঁচকে এলো বলল, ‘কেন?? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হওনি??’

‘নাহ!!আসলে আমাকে সবসময় মা সাজিয়ে দেয় তো!! আজকেও দিয়েছে। তাই সময় পাইনি আয়না দেখতে।’
আরাদ সায়েনের একদম কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলে,’এখন দেখো!!’

সায়েন মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে নিলে আরাদ পথ আটকে দাঁড়ালো বলল,’কোথায় যাচ্ছো??’
‘আয়না দেখতে!!!এই মাত্র তো আপনি বললেন।’

‘আমার চোখের দিকে তাকাও।’

সায়েন ঘাবড়ে গেল। চোখের দিকে তাকাবে মানে। আরাদ আবারো বলল,’গভীর দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকাও তাহলে বুঝতে পারবে।’
আরাদ কিছুটা ঝুঁকে পড়লো সায়েনের দিকে। সায়েন চোখ তুলে আরাদের চোখের দিকে তাকালো। দৃষ্টির প্রখরতা বাড়িয়ে তাকালো আরাদের চোখের দিকে। আরাদ ও সায়েনের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রয়েছে। আরাদের চোখের কালো মনিতে সায়েনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সায়েনের পলক পরছে না। এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে আরাদের চোখের দিকে। দিক দিশা ভুলে গেছে সায়েন। আরাদের সমস্ত অনুভূতি চোখের মাঝে দেখা যাচ্ছে। সায়েন দেখতে পারছে। কেমন যেন অস্থির লাগছে সায়েনের। চেষ্টা করছে চোখ ফিরিয়ে নিতে কিন্তু পারছে না। ঠোঁট দুটো কাঁপছে অনবরত কাঁপছে সায়েনের। কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথাটাও ঘুরে গেল সায়েনের। পড়ে যেতে নিলে আরাদ সায়েনকে ধরে ফেলে। তাল সামলাতে না পেরে সায়েন দুহাতে আরাদের গলা জড়িয়ে ধরে। আরাদ একহাতে সায়েনের কোমড় জড়িয়ে ধরে আরেক হাত সায়েনের গালে রেখে বলল,’সায়েন!! এনিথিং রং??কি হয়েছে তোমার? খারাপ লাগছে, অসুস্থ তুমি?? কিছু বলো??’

সায়েন নিভু নিভু চোখে তাকাল আরাদের দিকে। হঠাৎ ওর হলো কি??সায়েন তা নিজেও বুঝতে পারছে না। কয়েক মুহূর্ত আরাদের দিকে তাকিয়ে রইল সায়েন। স্বাভাবিক হয়ে নিজেকে আরাদের বাহুডোরে দেখে ছিটকে দূরে সরে এলো সায়েন। আরাদ সায়েনের আরেকটু কাছে যেতে সায়েন দু’পা পিছিয়ে গেল। আরাদ বলল,’তুমি কি অসুস্থ??’
ইতিমধ্যে ঘাম ছুটে গেছে সায়েনের। চোখে পানি টলমল করছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,’আ আমি ঠিক আছি। আমার কিছু হয়নি। আমি যাই।’

সায়েন এক ছুটে চলে গেল। পেছন থেকে আরাদ বলে উঠলো,’সায়েন এই অবস্থায় যেও না। স্কুটার চালাতে পারবে না তুমি।’

সায়েন শুনলো না আরাদের কথা। দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল সায়েন। হঠাৎ করে সায়েন এরকম করলো কেন তা আরাদ বুঝতে পারলো না। সে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
সায়েনের অস্বস্তি হওয়া সত্ত্বেও স্কুটি চালাচ্ছে। হাত পা কাঁপছে সায়েনের। চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পরছে। কারণ সায়েন বেশ বুঝতে পেরেছে যে আরাদকে সে ভালোবেসে ফেলেছে এবং আরাদও। কিন্তু ওদের এই ভালোবাসা তো সায়েনের মা কোনদিন মেনে নেবে না। একটা অজানা অচেনা ছেলে,তার উপর স্মৃতি হারিয়েছে। আরাদের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব ঘোলাটে হয়ে আছে। এমন একটা ছেলের হাতে জয়নব বেগম কিছুতেই তার মেয়েকে তুলে দেবেন না। সায়েন তখন কাকে বেছে নেবে?? একদিকে আরাদ আরেকদিকে ওর মা। মাকেও যে সায়েন খুব ভালোবাসে। সায়েনের জীবনে ভালোবাসা কখনো আসেনি। আজকে কেন আসলো?? ভালোবাসা কেন হুট করে চলে আসে??এসব ভাবতে ভাবতে সায়েন বিয়ে বাড়িতে পৌঁছে গেছে। লিমাকে এখনও বিদায় দেওয়া হয়নি। যাক ঠিক সময়ে পৌঁছে গেছে সে।
এলোমেলো পায়ে সায়েন ভেতরে ঢুকলো। সারাবাড়ি খুঁজে মা’কে বের করলো সে। জয়নব বেগম এক এক করে অতিথি বিদায় দিচ্ছিলেন। হুট করে সায়েন এসেই ওর মা’কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। জয়নব বেগম
সায়েনের এহেম কাজে অবাক হয়ে গেল। সায়েন আচমকাই বলে উঠলো,’আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি মা। খুব ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না আমি।’

সায়েনের কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝলেন না তিনি। পাশে থেকে একজন মহিলা বলে উঠলো,’মনে হচ্ছে ওর নিজের বিয়ের দিনের কথা মনে পড়েছে। তাই এরকম করছে। বিয়ের পর সব মেয়েকেই বাবা মা ছেড়ে স্বামীর ঘরে যেতে হয় মা। স্বামীর সংসার সবাইকে করতে হয়।’

জয়নব বেগম সায়েনকে ছাড়িয়ে চোখ মুছে দিয়ে বললেন,’এভাবে কাঁদে না। ওসব কথা মনে করতে নেই। চলো এখন লিমাকে বিদায় দিতে হবে।’
মায়ের হাত ধরে সায়েন বাড়ির বাইরে এলো। ওর মনের কথাটা যে অন্য তা ধরতে পারেনি সায়েনের মা। বাড়ির গেইটের সামনে গাড়ি দাঁড় করানো। লিমা ওর বাবাকে ধরে কাদতেছে। সায়েন ওর মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। লিমার বাবা লিমাকে গাড়িতে তুলে দিলো। গাড়ি চলে গেল। সায়েন এখনো মায়ের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। চলে আসতে নিলে সায়েনের চোখ গেল রাস্তার অপরপাশে গোলাপের দোকান দেখে। লাল গোলাপ গুলো যেন ডাকছে সায়েনকে। স্মিত হেসে সায়েন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,’মা দেখো গোলাপ।’
সায়েনের দৃষ্টি অনুসরণ করে তিনি রাস্তার অপর পাশে তাকালেন। লাল গোলাপ জয়নব বেগম ও পছন্দ করেন। সায়েন বলল,’তুমি দাঁড়াও আমি কিনে আনছি।’

জয়নব বেগম সম্মতি দিলেন। সায়েন সাবধানে রাস্তা পার হয়ে গোলাপের দোকানে গেল। এক তোড়া গোলাপ হাতে নিয়ে তার গন্ধ শুঁকতে লাগল। ভালো লাগছে গোলাপ গুলো দেখতে। মায়ের জন্য নিচ্ছে সে গোলাপ গুলো। বাবাকে দেখতো প্রায়ই গোলাপ নিয়ে আসতে। তখন সায়েন ছোট ছিল। তবে এখনো আনে তবে খুব কম। সায়েন হাতে নিয়ে গোলাপ নেড়েচেড়ে দেখছে। হঠাৎ করেই ওর সামনে থাকা ফুলদানিটা ভেঙে গুরোগুরো হয়ে গেল। একটা দমকা হাওয়া যেন পাশ দিয়ে দ্রুত বয়ে গেল। ভয়ে সায়েনের হাত থেকে গোলাপ গুলো পড়ে গেল। পেছোতে গিয়ে সায়েন নিজেও রাস্তার পাশে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চার থেকে পাঁচজন লোক সায়েনকে ঘিরে দাঁড়ালো। সবার হাতে রিভালবার। লোকগুলো এদিক ওদিক তাকিয়ে রিভালবার ঘোরাতে লাগলো। জয়নব বেগম দৌড়ে গেলেন সায়েনের কাছে। মায়ের বুকে মাথা রেখে জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে সায়েন। হঠাৎ করে কি এমন হয়ে গেল?? একজন লোক সায়েনকে উদ্দেশ্য করে বলল,’কেউ আপনার দিকে গুলি ছুড়েছে ম্যাম। আপনি তাড়াতাড়ি চলে যান এখান থেকে। আমরা দেখছি।’

জয়নব বেগম তাড়াতাড়ি সায়েনকে নিয়ে আসলেন। সায়েন ঘাড় ঘুরিয়ে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এরা কারা??সায়েনকে বাঁচাতে এভাবে ছুটে এসেছে??আর সায়েনের উপর গুলি চালালোই বা কে??ওর তো কোন শত্রু নেই। ওর মতো মেয়ের শত্রু থাকার তো কথাই না। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে সায়েনের। বারবার লোকগুলো কে দেখছে সে। কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে সায়েনের। তবে ভয়ের মাত্রাও বেড়েছে।

জয়নব বেগমের বুকে মাথা রেখে কাঁপছে সায়েন। খুব ভয় পেয়ে আছে সে। পুলিশ,গুন্ডা খুন খারাবি খুব ভয় পায় সায়েন। যদিও সে সাহসী বটে কিন্তু এসব খুন খারাবি সহ্য হয় না সায়েনের। থেকে থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছে সায়েন। শফিকুল ইসলাম চিন্তিত হয়ে বসে আছেন। তার একমাত্র মেয়ের উপর কে আক্রমণ করলো??জানা মতে তার কোন শত্রু নেই। তাই তিনি চিন্তায় আছেন খুব। শাফিন চিন্তিত অবস্থায় সায়েনের পাশে বসে আছে। বোনের জন্য চিন্তিত সেও। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শাফিন মুখ খুলল,’মা আমার মনে হয় আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। বিয়ে তো শেষ হয়ে গেছে। বৌভাতের অনুষ্ঠানে বাড়ি থেকেই যাব। এখানে থাকলে যদি সায়েনের উপর আবার হামলা হয়??’

ভয়ে কেঁপে উঠলেন জয়নব বেগম ও। তিনি বললেন,’আমি থাকতে আমার মেয়ের উপর কেউ নজর দিতেও পারবে না। শাফিনের আব্বু, কালকে সকালেই চলে যাব আমরা। এখানে থাকব না আর।’

সায়েন ওর মা’কে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,’মা তুমি আমার কাছ থেকে কোথাও যেও না আমার ভয় লাগছে খুব।’

‘আমি এখানেই আছি। কোথাও যাব না। কিন্তু আমার একটা বিষয়ে সন্দেহ হচ্ছে।’

শাফিন উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,’কোন বিষয়ে??’

‘কারা সায়ুর উপর হামলা করলো??আর ওই লোকগুলো কারা??সায়ুকে বাঁচাতে এভাবে এগিয়ে আসলোই বা কেন??’

সায়েন ও সাথে সাথে জবাব দিলো,’আমার ও সেটা মনে হচ্ছে। লোকগুলো কারা?? আমাকে এভাবে বাঁচাতে এলোই বা কেন??’

আর কেউ কোন কথা বলল না। সায়েন মা’কে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে দেয়। ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারছে না সায়েন।

পরের দিন সকালেই সবাই বাড়িতে ফিরে এলো।‌ সায়েন আগে গিয়ে নিজের রুম চেক করলো। আরাদ নেই ওর রুমে। তাহলে কোথায়??ছাদে চিলেকোঠার ঘরে হবে। সায়েন দ্রুত ছাদে চলে গেল। চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে অবাক হয় সায়েন। কারণ সেখানেও আরাদ নেই। তাহলে কোথায় গেল??সায়েন এবার ভাবনায় পড়ে গেল। আরাদ এভাবে কোথায় গেল??চলে গেল নাকি??সায়েনের অস্থির হতে লাগলো। আরাদ যদি চলে যেতো তাহলে তো সায়েনকে বলে যেতো তাহলে আরাদ কোথায় গেল??বুক ভেঙে কান্না আসছে সায়েনের। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না সায়েন। দ্রুত নিচে নেমে আসে।
সারাদিন পার হয়ে যায় আরাদের দেখা নেই। সারাদিনে অনেকবার চিলেকোঠার ঘরে গিয়েছে সায়েন কিন্তু আরাদ নেই। ওদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে তবুও আরাদ আসলো না। রাতেও চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে ঘুরে এসেছে সায়েন ‌তবুও আরাদের দেখা নেই। নিজের রুমে শুয়ে শুয়ে কাদতেছে সায়েন। নোনাজলে ভাসিয়ে দিচ্ছে বালিশের গা। মাঝেমাঝে নাক টানছে। নোনাজল বিসর্জন দিতে দিতে সায়েন ঘুমিয়ে পড়লো।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১১

বিশাল বড় হলরুমে সামনাসামনি দুটো সোফা পাতা। সামনাসামনি বসে আছে আরাদ আর ফাহিম। দুজনের দুপাশে দশ থেকে পনের জন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে আরাদ। পরনে তার হোয়াইট শার্ট আর ব্ল্যাক সুট। হাতে ব্ল্যাক ঘড়ি। সামনের টেবিলের উপর সানগ্লাস টা খুলে রেখেছে সে।যার ফলে আরাদের রাগটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ফাহিম। চোখদুটো লাল হয়ে আছে আরাদের যেন রক্ত ঝরছে। কিন্তু ফাহিমের কোন হেলদোল নেই। সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে। যেন কিছুই হয়নি। আরাদ রুদ্ধ কন্ঠে বলল,’আমাকে মারার চেষ্টা করেছো আমি কিছু বলিনি। আমার প্রজেক্টের বিষয়ে নাক গলিয়েছো তবুও কিছু বলিনি। কিন্তু আমার কাছের মানুষের উপর হামলা করার সাহস হলো কিভাবে??লড়াইটা আমাদের মাঝে। তাহলে আমাকে হারানোর জন্য আমার কাছের মানুষের উপর আঘাত করছো কেন?? একে পুরুষত্ব বলে না।’

আরাদের ক্ষোভে ভরা মুখটা দেখে হাসলো ফাহিম। এতে আরাদের রাগটা আরো বেড়ে গেল। কিন্তু এখানে কোনরকম মারামারি করতে চায় না আরাদ তাই দাঁতে দাঁত চেপে সে সহ্য করছে। ফাহিম তার গায়ের সুট টা টেনে ঠিক করে বলল,’ওই মেয়েটা তোমার কাছের মানুষ??তো কবে থেকে হলো??’

‘কে কখন কার কাছের মানুষ হয়ে যায় তা কেউ জানে না। কিন্তু আজকে আমার কাছের মানুষের উপর হামলা করে বহুত বড় ভুল করেছো তুমি যার মাশুল তোমাকে দিতে হবে। আমার উপর করা আক্রমণ এর জন্য তোমাকে কিছু বলতাম না। তবে আজকে সায়েনের উপর আক্রমণ করে সবচেয়ে বড় ভুল করেছো তুমি।’

ফাহিম ঠোঁট এলিয়ে আবার হাসলো বলল, ‘তোমার কি মনে হয় আমার মধ্যে পুরষত্ব নেই?? পেছন থেকে ছুরি বসানোর মতো কাপুরুষ আমি নই। সামনে থেকে লড়াই করার ক্ষমতা আর সাহস দুটোই আছে আমার।’

‘তাহলে সায়েনের উপর কেন আক্রমণ করলে। কেন ওকে মারতে চাইছো??’

‘ওই মেয়েটাকে চাইলে তখনই মেরে ফেলতে পারতাম। তোমার লোকেরা হাজার চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারতো না। আমি বলেছি বলেই মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। নইলে মেয়েটা এতক্ষণে,,,,’

আরাদ দাঁতে দাঁত চেপে ফাহিমের কলার চেপে ধরলো। সাথে সাথে আরাদের চারিদিকে
রিভালবার তাক করলো ফাহিমের গার্ডরা। আরাদের তাতে কোন ভাবান্তর নেই। এসবে সে ভয় পায় না। রক্তচক্ষু নিয়ে সে বলল, ‘সায়েনের গায়ে যদি এতটুকু আঁচড় লাগে তাহলে তুই তোর অস্তিত্ব খুঁজে পাবি না। আমার হিংস্রতার সম্পর্কে তোর কোন ধারণা নেই। তোর মতো ছুঁচো কে মারতে আমার একটুও সময় লাগবে না।’

ফাহিম হতবাক হয়ে গেল আরাদের কাজে। হাত উঁচিয়ে সে তার গার্ডদের থামতে বলল। সবাই যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লো। ফাহিম আলতো হাতে আরাদের হাত ছাড়িয়ে নিলো। আরাদ পুনরায় সোফায় বসে নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে লাগলো। ফাহিম কলার ঠিক করে বলল,’তোমার হিংস্রতা সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই কম। কিন্তু আমার সম্পর্কে ও জানো তুমি। ওই মেয়ের উপর আর কেউ হামলা করবে না। কিন্তু সাবধানে থেকো,সামনে নিজের সবচেয়ে বড় পুরস্কার যেন হারাতে বসো না?? একসাথে দুটো পুরষ্কার কখনোই পাওয়া যায় না। একটা পেতে হলে আরেকটা হারাতে হয় মাইন্ড ইট।’

বলেই ফাহিম শয়তানির হাসি দিলো। আরাদ রেগে ওখান থেকে চলে আসলো। রাগে ঝলসে যাচ্ছে ওর পুরো শরীর। ফাহিমের একটা ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত ওর শান্তি হবে না। বাইরে জোনায়েদ দাঁড়িয়ে ছিল। আরাদ জোনায়েদ কে ভেতরে যেতে বারণ করেছিল। আরাদ গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসে পড়লো আর জোনায়েদ ড্রাইভিং সিটে। জোনায়েদ জিজ্ঞেস করল,’কি হয়েছে আরাদ??ফাহিম কি বললো??’

আরাদ রেগে গর্জে উঠে বলল,’বাস্টার্ড,ওকে তো আমি ছাড়বো না। ওকে খুন করা না পর্যন্ত আমার শান্তি হবে না। আমার ঘুমন্ত হিংস্রতাকে জাগিয়ে তোলার পরিনাম কি হতে পারে তা ও জানে না।’

‘রিলাক্স আরাদ। আমাদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফাহিমের কোন ক্ষতি করা সম্ভব নয়। কারণ আঙ্গুলটা তোর উপরে প্রথম উঠবে।’

আরাদ চুপ করে গেল। মেজাজ গরম হচ্ছে ওর। জোনায়েদ আবার বলল,’সায়েনের বাড়িতে যাবি??ওরা কিন্তু ফিরে এসেছে। সায়েন তোকে না পেলে কি করবে??আর তুই এখন গিয়ে কি জবাব দিবি??’

‘ম্যানেজ করে নেব আমি তোকে ভাবতে হবে না। আমাকে ড্রপ করে দে।’

আরাদকে সায়েনের বাড়িতে নামিয়ে দিলো জোনায়েদ। পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে পড়লো আরাদ। দরজার কাছে গিয়ে দেখল দরজা খোলা। সায়েন হয়তো খুলে রেখেছে আরাদের অপেক্ষায়। আরাদ দেরি না করেই সায়েনের রুমে চলে গেল।
রাত গভীর, সায়েন ঘুমাচ্ছে। চোখের কোণে পানি জমে আছে। বালিশটাও অনেকখানি ভিজে গেছে। আরাদ মুচকি হাসলো,সায়েন নিশ্চয়ই ওকে না পেয়ে কেঁদেছে। কিন্তু ওর সামনে কখনোই কাঁদেনি সায়েন। আরাদ হাঁটু গেড়ে সায়েনের সামনে বসে পড়লো। সায়েনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেলো। হাত ধরেই বসে রইল আরাদ।
হঠাৎ করেই চোখ মেলে তাকালো সায়েন। বুঝতে পারলো যে সামনে বসে থাকা ব্যক্তিটা আর কেউ নয় স্বয়ং আরাদ। ড্রিম লাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পারছে সায়েন। হুট করেই কেঁদে উঠলো সায়েন। কাঁদতে কাঁদতে আরাদের গলা জড়িয়ে ধরলো সে। আরাদ হতবাক হয়ে গেছে। সায়েন এভাবে কাঁদছে কেন??আরাদ সায়েনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওকে আস্বস্ত করে বলল,’কান্না থামাও!!আমি এসে গেছি। কি হয়েছে বলো?
কান্না থামাও নাহলে তোমার মা চলে আসবে তখন আমাকে দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।’

সায়েন কান্না থামালো তবে আরাদকে ছাড়লো না। আরাদকে সে শক্ত করে ধরে আছে। সায়েনকে ধরেই উঠে খাটের উপর বসে একহাতে সায়েনকে জড়িয়ে ধরে বলল,’কি হয়েছে সায়েন??’
সায়েন এক ঝটকায় আরাদকে ছেড়ে দিল। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘কোথায় গিয়েছিলেন আপনি??কতো খুঁজেছি আপনাকে!!আজ কতবার ছাদে গিয়েছি জানেন আপনি?? আমার চিন্তা হয় আপনি জানেন না??’
বলতে বলতে চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো সায়েনের। আরাদ মুচকি হেসে সায়েনের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,’আর কাঁদতে হবে না আমি এসে গেছি। আর কোথাও যাব না। তুমি যদি এভাবে কাঁদতে থাকো তাহলে আমি সত্যি সত্যি চলে যাব আর কখনো ফিরে আসব না।’

সায়েন আরাদের হাত টেনে ধরলো বলল, ‘আমি আর কাঁদব না। কোন প্রশ্ন ও করব না। শুধু আপনি এখানে থাকুন আমার ভয় করছে খুব।’

আরাদ বুঝল যে কালকের বিষয়টা নিয়ে আপসেট সায়েন। তাই কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
‘আমি তোমার পাশে আছি। তুমি শুয়ে পড়ো ভালো লাগবে।’

‘নাহ আপনি আবার চলে যাবেন।’

‘আমি কোথাও যাব না সায়েন। তোমার পাশেই বসে থাকব।’

আরাদ জোর করে শুইয়ে দিলো সায়েনকে। তারপর ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। সায়েন চোখ বন্ধ করে আরাদের একহাত ধরে রেখেছে। কালকের বিষয়ে আরাদকে কিছু জানাল না সায়েন। যদি আরাদ চিন্তা করে এজন্য। সায়েনের এইরকম অবস্থা দেখে আরাদের রাগটা বেড়ে গেল। ফাহিমকে খুন করতে ইচ্ছে করছে আরাদের। কিন্তু নিজেকে এখন সংযত রাখার দরকার। ফাহিমকে সে কিছুতেই ছাড়বে না। সবার আগে সায়েনকে সেফ রাখতে হবে। তারজন্য সায়েনকে ওর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া দরকার। সেখানে সায়েন সম্পূর্ণ সেফ থাকবে। কিন্তু তার জন্য আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। আরাদ সায়েনের দিকে তাকালো। ঘুমিয়ে পড়েছে সায়েন। কপালে উষ্ণ পরশ এঁকে দিয়ে উঠে পড়ে আরাদ। কঙ্খিত চিলেকোঠার ঘরে পৌঁছে যায় সে। খুব ক্লান্ত আরাদ। কালকে থেকে দৌড়ের উপর ছিল সে। কাল যখন জানতে পারলো যে সায়েনের উপর হামলা করা হয়েছে তখন রাগে ফায়ার হয়ে গিয়েছিল সে। সবকিছু ভুলে ছুটে গিয়েছিল।রাগের মাথায় কাকে কি বলেছে তাও জানে না আরাদ। পরে জোনায়েদ এসে আরাদকে শান্ত করে। ফাহিমের সাথে দেখা করানোর ব্যবস্থা জোনায়েদ করে দেয়।
মেঝেতে পাতা তোশকের উপর গা এলিয়ে দিলো আরাদ। চোখ জুড়ে ঘুমেরা দৌড়াদৌড়ি করছে। শুয়ে পড়তেই ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল সে।

______________

সকালে ভোরেই ঘুম ভাঙ্গল সায়েনের। উঠে ফ্রেশ হয়ে মায়ের রুমে উঁকি দিলো। জয়নব বেগম এখনও ঘুমাচ্ছেন। সায়েন তাই রান্না ঘরে চলে গেল। চুলা জ্বালিয়ে পাতিলে পানি বসালো চা বানাবে বলে। শীত পড়েছে খুব। ডিসেম্বরের শুরু মাত্র। শীত এলেই সায়েন প্রতিদিন চা খাবে। চা বানিয়ে বড় একটা মগে নিলো। তারপর আস্তে আস্তে ছাদে চলে গেল সে। এদিক ওদিক তাকিয়ে চারপাশ টা দেখে নিলো। কেউ এখনও ছাদে আসেনি তাই ওকে দেখতেও পারবে না। নিঃশব্দে চিলেকোঠার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখ পড়লো আরাদের দিকে। উপুড় হয়ে শুয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে আরাদ। যেন কতকাল সে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। তাই আজকে শান্তি মতো ঘুমাচ্ছে। সায়েন আরাদের পাশে গিয়ে বসে আস্তে করে ডাকলো। আরাদ একটু নড়েচড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। সায়েন মুচকি হাসলো আরাদকে এভাবে ঘুমাতে দেখে। অদ্ভুত ছেলেটা,আচ্ছা আরাদের কবে সবকিছু মনে পড়বে?? মাথার মধ্যে এই প্রশ্নটা সবসময় ঘুরপাক খায় সায়েনের। মুখ ফুটে কখনো আরাদকে জিজ্ঞেস করেও না। কেমন যেন আনইজি ফিল হয় সায়েনের। এসব ভাবতে ভাবতেই হাতের মগটা আরাদের হাতের সাথে লেগে যায়। গরম অনুভব করায় লাফিয়ে উঠলো আরাদ। সায়েন হকচকিয়ে পিছিয়ে গেল। ঘুমঘুম চোখে সায়েনের দিকে তাকিয়ে আরাদ বলল,’তুমি এতো সকালে??’
বলতে বলতে আরাদ বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। মানে সে আরো ঘুমাতে চাইছে। সায়েন বলল,’সকাল তো সেই কখন হয়েছে!! আপনি এখনও ঘুমাচ্ছেন কেন??’
‘আরেকটু ঘুমাই?? খুব ঘুম পাচ্ছে।’ ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল আরাদ। সায়েন চোখ কুঁচকে তাকালো আরাদের দিকে বলল, ‘কালকে কোথায় গিয়েছিলেন আপনি??’

‘ফাহিমের সাথে দেখা করতে!!’

সায়েন অবাক হয়ে বলল,’ফাহিম!!কে ফাহিম??’
লাফ মেরে উঠে বসে আরাদ। ঘুমের ঘোরে এসব কি বলে ফেলল?? এখন সায়েনকে কি বলবে সে??সায়েন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,’সত্যি বলুন। কে এই ফাহিম??’

আরাদ ঘাবড়ে গেল। কি বলবে?? ঠোঁটজোড়া জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিলো বলল,’মেইন রাস্তার পাশে একটা ছোট ছেলে থাকে। কাগজ কুড়ায়। ওর সাথেই দেখা করতে গিয়েছিলাম। বাসায় ভালো লাগছিলো না তাই বের হয়েছিলাম। ওই ফাহিম আমাকে সারাদিন ঘুরিয়েছে। রাতের বেলা তো আসতে দিতেই চাইছিল না। তবুও চলে এসেছি। আমি কি করে জানবো যে তোমরা কালকেই চলে আসবে?? তোমাদের তো আজকে আসার কথা ছিল তাই না?? তাহলে কাল এলে কেন??’
সায়েন চুপ হয়ে গেল। ওই ঘটনাটা কিছুতেই আরাদকে জানানো যাবে না। তাহলে চিন্তা করবে। সায়েন বলল,’এমনি চলে এসেছি। বিয়ে বাড়ি মানুষজন ভালো লাগছিল না। তাই চলে এসেছি। আপনি ঘুমান আমি যাই। পরে একসময় খাবার নিয়ে আসব।’

সায়েন উঠে চলে যেতেই আরাদ প্রশান্তির শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়লো। সায়েন ছাদের বর্ডার ঘেষে দাঁড়াল। চায়ের মগে চুমুক দিয়ে সে আকাশের দিকে তাকালো। হালকা কুয়াশায় ছেয়ে গেছে চারিদিক। মগে এখনও অনেক খানি চা রয়েছে। আরাদের জন্যও এনেছিল। কিন্তু তা দেওয়া হলো কই??চা শেষ করতে করতে সায়েন ভাবলো যে, আরাদের কোন অজানা শত্রু ওর উপর আক্রমণ করেনি তো??প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গেল। আরাদকে তো আক্রমণ করা হয়েছিল। সায়েন ওকে বাঁচিয়েছে। সেদিন আরাদও ওর শত্রুদের কথা বলেছিল। কোনভাবে সেই শত্রুরা জেনে যায়নি তো যে আরাদ ওর কাছে আছে!!সেজন্যই কি সায়েনের উপর হামলা করেছিল। কিন্তু তারা যদি জানে আরাদ এখানে তাহলে তো সবার আগে আরাদকে আক্রমণ করার কথা। তা না করে সায়েনকে আক্রমণ কেন করলো??আর সবচেয়ে বড় কথা ওই লোকগুলো কারা??যারা সায়েনকে বাঁচাতে ছুটে এসেছে??মাথাটা বন বন করে ঘুরছে সায়েনের। প্রশ্নগুলো জটলা পাকিয়ে গেছে। ওর মনে হচ্ছে এতগুলো প্রশ্নের উত্তর এক। আর সেটা হলো আরাদ। কিন্তু আরাদের যে কিছুই মনে নেই। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
আর ভাবলো না সায়েন। এভাবে ভাবলে সে পাগল হয়ে যাবে। চা টাও পুরো শেষ করতে পারলো না। ছাদের উপর ফেলে চলে এলো।

সময় বহমান, সবকিছু ধরে রাখা গেলেও সময়কে কেউ কখনোই ধরে রাখতে পারবে না। সে তার নিজের গতিতে এগিয়ে চলছে। আর মানুষ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। জয়নব বেগম সেদিনের পর থেকে সায়েনকে কোথাও একা ছাড়েনি। সবসময় সায়েনের সাথে সাথে থেকেছে। এমনকি কলেজেও ওর সাথে গিয়েছে আবার সায়েনকে নিয়েই ফিরেছে। আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে সায়েনের পরিবার। ডিসেম্বর এর শেষ হতে চলল। শীতের প্রখরতা বাড়ছে। সকাল বেলা চারিদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে। সূর্যের আলোয় আবার তা কেটে যায়। রোদ পোহাতে অনেকেই ছাদে আসে। তবে সায়েনের এতে খুব ভালো হয়েছে। রোদ পোহানোর নাম করে বই হাতে সে ছাদে চলে আসে। মাঝে মাঝে আরাদের সাথে গল্প জমায় আবার পড়াশোনার দিকেও নজর দেয়। সামনে পরীক্ষা, পড়াশোনা তো করতেই হবে। আরাদ ও সায়েনকে পড়ার জন্য বেশ সময় দেয়। এখন প্রতিদিন রাতেই আরাদকে বের হতে হয়। জোনায়েদ একা আর কত সামলাবে??তাই রাতের বেলা আরাদ গিয়ে উপস্থিত হয়। সমস্ত কাজ করে রেখে তারপর ফেরে সে। এভাবেই দিনগুলো কেমন কেটে গেল।
৩০শে ডিসেম্বর,নিউ ইয়ারের আনন্দ সবদিকে ছড়িয়ে পড়ছে!!!সন্ধ্যায় গুটিগুটি পায়ে ছাদে আসে সায়েন। গায়ে শাল জড়ানো। নিচে অবশ্য সোয়েটার পড়েছে। আরাদ ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আরাদের গায়েও চাদর জড়ানো। সায়েন কিনে এনে দিয়েছিল। সায়েন আরাদের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,’ছাদে দাঁড়িয়ে কি করছেন??’

আরাদের দৃষ্টি কুয়াশা মাখা আকাশের দিকে। না তাকিয়েই বলল,’তোমাকে কিছু কথা বলার আছে সায়েন।’

সায়েন আশ্চর্য হয়ে তাকালো আরাদের মুখ পানে। কেমন যেন উদাস উদাস লাগছে আরাদকে। কি এমন বলবে সে যে এরকম পেঁচার মতো মুখ করে রেখেছে??সায়েন কথা বলল না। আরাদ চোখ ঘুরিয়ে সায়েনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। সায়েনের চোখ দেখে বুঝলো যে সে শুনতে চায় আরাদের কথা।

#চলবে,,,,,,,,,,,,,
#চলবে,,,,,,,,,,,

গল্পে নতুন মোড় আসতে চলেছে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here