চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ১৩+১৪

0
106

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১৩

হলরুমের সমস্ত মানুষ গুলো ব্যস্ত। কেউ ছবি তুলছে কেউ খাচ্ছে তো কেউ কথা বলছে। এত কিছুর মধ্যে হলরুমের শেষ প্রান্তে কি হচ্ছে তা কারোর চোখে পড়ছে না। আরাদ তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় রমনির দিকে। যার চোখজোড়া অসম্ভব লাল হয়ে আছে। নাকের ডগা আর গাল দুটোও লাল। মানুষ যখন অতিরিক্ত কান্না করে তখন তাদের চোখ মুখে লাল আভা ছেয়ে যায়। ঠিক তেমনটাই সায়েনের মুখ। কন্ঠস্বর টাও ভাঙা ভাঙা। তবে কি সায়েন খুব বেশি কেঁদেছে??তাই হবে!! কিন্তু সবটা জানলো কিভাবে সায়েন??আর এখানেই বা কিভাবে এলো??আরাদ তো চেয়েছিল আজকে সবটা জানাতে। এখানের অনুষ্ঠান শেষ করে সে সায়েনের বাড়িতে যেতো। তার আগেই সায়েন এখানে এসে পড়েছে। আরাদ শুকনো ঢোক গিলে সায়েনের দিকে দু’কদম এগিয়ে যেতেই সায়েন পিছিয়ে গেল। আরাদ বলল,’সায়েন আমি,,,’
সায়েন হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো আরাদকে বলল,’অনেক তো বললেন, আর আমিও অনেক শুনেছি। আজকে নাহয় আমি একটু বলি??’
আরাদ থমকে গেল সায়েনের কথায়। এই কথাটার মধ্যে যে পাহাড়সম রাগ অভিমান আর কষ্ট জড়ানো তা আরাদ ঠিকই বুঝতে পেরেছে। বিশেষ করে সায়েনের কোমল হাসিটা। জোর করে যে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলেছে সায়েন এটাও বুঝেছে আরাদ।
হাসির পেছনে থাকা যন্ত্রণা সায়েনের মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েনের লাল আভা জড়ানো মুখটা দেখে আরাদের বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। ও জানে না যে আজ এই মুহূর্তে কি হতে চলেছে সায়েন কি বলতে চাইছে?? তখনই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো সায়েনের। ডানহাতের উল্টোপিঠে চোখের পানি মুছে নিয়ে বলল,’ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য। নতুন বছরের প্রথম দিনে আমাকে এতো বড় সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার অবস্থানটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। নাহলে আমি বুঝতামই না যে আমার জায়গাটা ঠিক কোথায়?? আপনার আর আমার মধ্যাকার তফাৎটাও ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন আপনি। আর আমিও বুঝে নিয়েছি। ভালোই হয়েছে!!তবে এরপর থেকে যা হবে সব ভালোই হবে। বিশেষ করে আমার জীবনের সবকিছু!!আসি ভালো থাকবেন।’
সায়েন কথা শেষ করে ফিরে যেতে নিয়েও থেমে আরাদের দিকে ঘুরে তাকালো বলল, ‘আর কংগ্রাচুলেশন নতুন জীবনের জন্য।’

সায়েন চলে গেল। আরাদ এখনও থম মেরে সায়েনের চলে যাওয়া দেখছে। নড়তে চেয়েও পারছে না। আরাদ জানতো সব জানলে সায়েন রাগ করবে কিন্তু এতোটা অভিমান জমবে ওর মনে তা বুঝতেও পারেনি। দেখতে দেখতে সায়েন দরজা পার করে চলে গেছে। তখনই আরাদের হুস ফিরল। সায়েনকে আটকানোর জন্য দৌড়ে গেল সে। বাইরে এসে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। সায়েন সবেমাত্র স্কুটারে বসেছে। আরাদ দৌড়ে গিয়ে সায়ের সামনে দাঁড়াল। একহাতে স্কুটারের হ্যান্ডেল ধরে বলল,’সায়েন চলে যাওয়ার আগে একবার আমার কথা শুনে যাও প্লিজ??’
সায়েন চোখ তুলে আরাদের দিকে তাকিয়ে বলল,’অনেক তো শুনেছি আপনার কথা। আর শুনতে ইচ্ছে করছে না।’

‘সায়েন আমি তোমাকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। এজন্য আমি এসব করেছি। এছাড়া আর কোন খারাপ উদ্দেশ্য আমার ছিলো না। আমি তোমাকে আজকেই সবটা বলে দিতাম। কিন্তু,,,,,,’

সায়েন মুখে মিথ্যা বিরক্তিভাব ফুটিয়ে তুলে বলে,’প্লিজ আমাকে আর এসব বলবেন না। আমি শুনতে বাধ্য নই। আর মিথ্যা দিয়ে যে সম্পর্কের শুরু হয় সে সম্পর্ক কখনোই ভালো হয় না। এসব সম্পর্কের কোন মানেই হয় না।’

‘কিন্তু আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয় সায়েন। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো। আমাকে ভুল বুঝো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

‘আপনার বলা শেষ??’ সায়েনের তাচ্ছিল্য করে বলা কথাটা শুনে আরাদ শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো সায়েনের দিকে। সায়েন ও আরাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাদের বলার কোন ভাষা নেই। কি বলবে আর??সায়েন তো কিছুই বুঝতে চাইছে না। আরাদ স্কুটির সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। সায়েন স্কুটি নিয়ে চলে গেল। আরাদ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখলো। সায়েনকে এখন মানানো খুবই কষ্টকর হয়ে উঠবে। নিজের উপর রাগ হচ্ছে আরাদের কেন সেদিন সব বলল না?? তাহলে সায়েন এতো রাগ করতো না।

‘বলেছিলাম না দুটো পুরষ্কার একসাথে পাওয়া যায় না। একটা পেতে হলে আরেকটা হারাতে হয়।’
পেছনে ফিরে তাকালো আরাদ। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ঝুলিয়ে তাকিয়ে আছে ফাহিম। মাথায় রক্ত উঠে গেল আরাদের। চোখ বন্ধ করে রাগ দমন করার চেষ্টা করলো আরাদ। চোখ দিয়ে ততক্ষণে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে। ফাহিম হেসে বলে,’একি!!আরাদ ওয়াহেদ কাঁদছে!! আজকে তো আরাদ ওয়াহেদের খুশির দিন। ওহ বুঝেছি,সুখেও তো মানুষ কাঁদে এটা বুঝি সুখের কান্না??’

রেগে ফাহিমের কলার ধরতে চেয়েও ধরলো না আরাদ। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সেন্টারের ভেতরে চলে এলো। রাগে মাথা ঘুরছে। ইচ্ছে করছে ফাহিমকে ওখানে ফেলে খুন করতে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে এসেছে। ভেতরে গিয়ে আরাদের গরম মাথা আরো গরম হয়ে গেল। চিল্লাচিল্লি,হইহুল্লোড়, কথাবার্তা মানতে পারলো না আরাদ। তখনই চোখ গেল আরশির হাতে থাকা এওয়ার্ড এর দিকে। যেটাতে আরাদের নামটা জ্বলজ্বল করছে। আরাদ দ্রুত গিয়ে কেড়ে নিলো এওয়ার্ড টা। এক সেকেন্ড দেরি না করেই ফ্লোরে ছুঁড়ে মারে। সাথে সাথে দুখন্ডিত হয়ে যায় আরাদের এত সাধনায় পাওয়া পুরষ্কার। ভয়ে আরশি পিছিয়ে তামিমের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। আরাদের রক্তচক্ষু দেখে ভয় পেয়ে গেছে আরশি। তনয়া ও একপাশে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে পুরো নিস্তব্ধ হলরুম। আরাদের এরকম কাজে সবাই অবাক। একটু আগেও তো কত হাসিখুশি ছিল ছেলেটা। অল্প সময়ের ব্যবধানে কি এমন হয়ে গেল যে আরাদ এতটা রেগে গেল??আরাদকে এরকম উত্তেজিত হতে দেখে জোনায়েদ ছুটে গেল। আরাদকে ধরতে যেতেই হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো আরাদ।কাপালে দু আঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করে রাগ দমনের চেষ্টায় আছে আরাদ কিন্তু পারছে না। কপাল থেকে থেকে হাত নামিয়ে সামনে থাকা টেবিলটায় সজোরে লাথি মারতেই উল্টে গেল সেটা। পাশের টেবিল থেকে হুইস্কির বোতলটা হাতে নিয়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল আরাদ। জোনায়েদ ও ছুটলো আরাদের পিছু পিছু কি হয়েছে তা জানার জন্য। ইমজাত ওয়াহেদ আর কোন উপায়ন্তর না দেখে পরিবার সহ বাড়িতে ফিরে গেলেন। ওনারা আরাদের রাগের সাথে পরিচিত। আরাদ যখন রেগে যায় তখন জোনায়েদ ব্যতীত কেউই আরাদের সাথে কথা বলে না। কিন্তু আজকে একটু বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছেন আরাদ। সবার সামনে এওয়ার্ড ভেঙে ভালো কাজ কেরনি সে।

……………….

রাস্তার সাইডে ছোট্ট একটা লেক। লেকের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে বসে হুইস্কির বোতলে চুমুক দিচ্ছে আরাদ। চোখ থেকে তার রক্ত ঝরছে। একটু পর পর চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়িয়ে পরছে। চোখ মুছে ফেলল আরাদ তারপর আবার চুমুক দিলো বোতলে। এতক্ষণ ধরে বসে বসে সবটাই বলেছে সে জোনায়েদকে। সব শুনে জোনায়েদ ও চুপ করে আছে। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে জোনায়েদ বলল,’তোর মনে হয় না যে তুই আজকে ওভাররিয়্যাক্ট করে ফেলেছিস??মানছি সায়েন সব জেনে গেছে তার জন্য সবার সামনে ওসব করার মানে হয়??’

‘আমার কাছে যেটা ভালো মনে হয়েছে তাই করেছি আমি।’

‘হুম সবকিছুই তো তোর ভালো মনে হয়। আচ্ছা বাদ দে এসব। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি নিজে কালকে গিয়ে সায়েনকে বোঝাব এবং ওর ফ্যামিলেকেও। তারপর না হয় তোর পরিবারের সবাই যাবে। জাস্ট রিল্যাক্স।’

আরাদ ঘাড় ঘুরিয়ে জোনায়েদের দিকে তাকিয়ে বলে,’এত সহজে সবকিছু ঠিক হবে না জোনায়েদ। সায়েন এত সহজে মানবে না। আর ওর মা তো!!!’

আরাদ চুপ করে গেল। সবকিছু ভাবা সহজ হলেও আদৌও তা করা সহজলভ্য হবে না। সায়েনের মা অদ্ভুত একজন মহিলা যার প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাগ। আরাদ এখন কিছুই ভাবতে পারছে না। টান হয়ে শুয়ে পড়লো ঘাসের উপর। শিশির ভেজা ঘাসগুলো যেন আঁকড়ে ধরেছে। পরনের সুট আগেই খুলে ফেলেছে আরাদ। ঠান্ডা ওকে কাবু করতে চেয়েও পারছে না। তারাও হার মেনে যাচ্ছে আরাদের কাছে। চোখ বন্ধ করে রইল আরাদ। কয়েক মুহূর্ত ওভাবেই কাটালো সে।

গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে আরাদ। ওর সামনে জোনায়েদ কোমড়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ঘটনা কি ঘটছে তা বুঝতে দুজনেরই বেগ পেতে হচ্ছে। সকাল হওয়ার পর পরই জোনায়েদকে নিয়ে বের হয়েছে আরাদ। উদ্দেশ্য সায়েনের বাড়ি। কিন্তু এসে ওরা দুজনেই অবাক হয়ে গেছে। ইয়া বড় তালা ঝুলছে সায়েনদের বাড়িতে। কিন্তু সায়েনরা কোথায় গেল??আরাদের অস্থির লাগছে। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। সায়েন কোথায় গেল?? গাড়ির দরজায় পান্ঞ্চ মেরে মুখ দিয়ে বিরক্তি সূচক শব্দ বের করলো আরাদ। রাস্তার পাশ দিয়ে মধ্যবয়স্ক একজন লোক যাচ্ছিল জোনায়েদ দেখা মাত্রই থামিয়ে দিয়ে বলল,’শুনুন, এই বাড়ির সবাই কোথায় গেছে বলতে পারেন??’
ইশারায় সায়েনের বাড়িটা দেখালো জোনায়েদ। লোকটা কিছুক্ষণ ধরে ভালোভাবে পরখ করলো আরাদ আর জোনায়েদকে তারপর বলল,’শফিকুল ইসলাম তো পুরো পরিবার সহ চলে গেছেন।’
আরাদ জোনায়েদকে একটানে সরিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,’চলে গেছে মানে??কখন??’

লোকটা কিছু একটা চিন্তা করে বলল,’এইতো কালকে রাতের ট্রেন ধরেছে মনে হয়।’

‘রাতের ট্রেন ধরেছে!! কোথায় গেছেন বলতে পারবেন কি??’

‘নাহ তা বলতে পারব না। আপনারা কারা আর ওনাদের খুঁজছেন কেন??’

আরাদ বিনীত কন্ঠে বলল,’প্লিজ একটু বলুন কেন আর কোথায় গিয়েছে ওরা??’
লোকটা বিরক্ত বোধ কররো তবে প্রকাশ করলো না। বলল,’জানি না আমি বললাম তো। আর ওরা যাবে না তো কি করবে শুনি?? শফিকুল ইসলামের মেয়ে তো ওনার মুখে চুনকালি মাখিয়েছে। তাই তো মুখ দেখাতে না পেরে পালিয়েছে এখান থেকে।’

আরাদ হতবাক হয়ে গেল লোকটার কথায়। কিসব বলছে এসব??কি করেছে সায়েন??জোনায়েদ বলে উঠলো,’কি করেছে সায়েন??’

‘কি করেনি সেটা বলুন। ওদের ওই চিলেকোঠার ঘরে একটা ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছে দুমাস ধরে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ,এসব সবাইকে বলা যায় নাকি??তবে পুরো মহল্লা জানে এব্যাপারে। শফিকুল সাহেবের বউ খুব গর্ব করতেন ছেলেমেয়েকে নিয়ে কিন্তু মেয়েটা দিলো সব শেষ করে। এমন চরিত্রহীন মেয়ে জীবনেও দেখিনি। ছেলে ঘরে এনে ফুর্তি,,,,,’

কথা শেষ করার আগেই লোকটার গলা চেপে ধরে আরাদ। তেজি কন্ঠে বলে,’সায়েনের নামে একটা বাজে কথা বলবি তো এখানেই মেরে
পুতে রেখে দেব। সায়েন চরিত্রহীন নয় শুনেছিস তুই??’

পরিস্থিতি খারাপ দেখে জোনায়েদ আরাদকে ছাড়িয়ে নিলো। লোকটা ছাড়া পেয়ে হাঁপাতে লাগলো। ভয় পেয়েছে লোকটা তাই দ্রুত প্রস্থান করলো। জোনায়েদ আরাদকে টেনে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। আরাদ রেগে আছে। জোনায়েদ না ছাড়ালে ওখানেই লোকটার কেল্লাফতে করে দিতো। জোনায়েদ ড্রাইভ করতে করতে বলে উঠলো,’সবকিছু কিভাবে জানাজানি হলো??’

‘জানি না। ওই লোকটাকে খুন করতে পারলে ভালো হতো। সায়েনের নামে বাজে কথা বলে!!সাহস কতো বড়।’

‘এসব এখন বলার সময় নয় আরাদ। তার আগে আমাদের জানতে হবে একরাতের মধ্যে ওরা কোথায় গেল??’

আরাদ একহাতে চুল টেনে ধরে বলল,’আমি কিচ্ছু জানি না। শুধু এটা জানি সায়েনকে চাই। যেভাবেই হোক সায়েনকে আমার চাই ই চাই। আমি পারব না ওকে ছাড়া থাকতে।’

রোডসাইডে গাড়ি থামায় জোনায়েদ। আরাদ গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল।আরাদকে এরকম অবস্থায় দেখতে মোটেও প্রস্তুত নয় জোনায়েদ। সে বলল,’ওরা বাংলাদেশ ছেড়ে তো কোথাও যাবে না। ঠিক পেয়ে যাব ওদের।’

‘সায়েনের মায়ের সম্পর্কে কোন ধারণা নেই তোর!উনি সায়েনকে লুকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। আমার মনে হয় না সায়েনকে খোঁজা সহজ হবে। যদি গার্ডদের বলে রাখতাম কালকে ওদের দেখে রাখার কথা তাহলে এসব হতো না। উফফ,সব ভুল আমার।’
গাড়ির চাকায় লাথি মারলো আরাদ। সায়েনকে খোঁজার জন্য অনেক মানুষ সে লাগাতে পারে কিন্তু সায়েন কি ফিরবে আরাদের কাছে?? শুধুমাত্র আরাদের জন্য এতবড় কলঙ্ক লাগলো সায়েনের গায়ে। নিজেকে দোষী মনে করছে আরাদ। সব দোষই তার। আরাদ চাইলে বাড়িতে ফিরতে পারতো সেদিন। বাড়িতে থেকেই সায়েনের সাথে যোগাযোগ করতে পারতো। ওভাবেও ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারতো কিন্তু আরাদের এই সামান্য ভুলের মাশুল আজকে সায়েনকে দিতে হচ্ছে। নিশ্চয়ই সায়েনের খুব কষ্ট হচ্ছে!!এই সব কিছুর জন্য আরাদ দায়ী। এতকিছুর পর সায়েন কি আরাদকে মেনে নেবে?? কখনোই না। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে রাস্তায় বসে পড়ে আরাদ।

__________________

শীত কেটে গেছে। বসন্ত দেখা দিয়েছে ধরার বুকে। বসন্তের ফুল ফুটেছে গাছে গাছে। সুবাসে মাতোয়ারা করছে চারিদিক। নানারকম অনুষ্ঠান পালন হচ্ছে কলেজ আর ভার্সিটিগুলোতে। এভাবে বসন্ত ও শেষ হয়ে গেছে। আরশি আর তনয়া এডমিশন নিতে এসেছে ভার্সিটিতে। দু’জনেই ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হবে। তাই খুব খুশি ওরা। তামিম চেয়েছিল ওর ভার্সিটিতে ওরা ভর্তি হোক। কিন্তু আরশি আর তনয়া ঘোর বিরোধী করেছে। তামিম ওদের পিছনে বডিগার্ড এর মতো লেগে থাকে। একই ভার্সিটিতে পড়লে তো ওরা স্বাধীন ভাবে চলতে পারবে না। তবে এই ব্যাপারে আরাদকে বলতেই সে বিনা বাক্যে রাজি হয়ে যায়। আরশি আর তনয়া এতে বেশ অবাক। গত ছ’মাস ধরে আরাদ কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। তেমন কথা বলে না কারো সাথে। অফিস টু বাড়ি,বাড়ি টু অফিস। এটাই প্রধান কাজ আরাদের। এই আরাদ আর আগের আরাদের মধ্যে হাজার গুন পার্থক্য। কারণটা যে সায়েন এটা আরশি তনয়া এমনকি বাড়ির সকলেই জানে। ভাইয়াকে মনমরা থাকতে দেখে আরশির একটুও ভালো লাগে না। তাইতো মাঝেমধ্যে বায়না ধরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার। আরাদ ও যায়। তেমনি আজকেও আরাদকে ধরে নিয়ে এসেছে এডমিশন নিতে। সাথে জোনায়েদ ও আছে। আরশি আর তনয়া কে ভর্তি করিয়ে বাইরে আসতেই জোনায়েদ বলে উঠলো, ‘আরাদ দিশা,,,,,’

ভ্রু কুঁচকে জোনায়েদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকিয়ে বলে,’দিশা!! কোন দিশা??’

‘আরে সায়েনের ফ্রেন্ড দিশা।’

আরাদ ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু সে দিশাকে চেনে না। জোনায়েদ চেনে। আরশি আর তনয়াকে গাড়িতে বসতে বলে ওরা দুজনে দৌড়ে গিয়ে দিশার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দিশা খানিকটা ভড়কে গেল। আরাদ বলল,’তুমি দিশা??সায়েনের ফ্রেন্ড??’

দিশা অবাক হলো। এরা কারা??ওকে চেনেই বা কিভাবে?? তবুও দিশা মাথা নাড়িয়ে বলল,’হ্যা। কিন্তু আপনারা কারা??’

‘আমি আরাদ।’

আরাদ নামটা শুনে থমকালো দিশা। অবাক হয়ে বলে,’আপনি আরাদ??মানে আপনি সেই ব্যক্তি যে স্মৃতি হারানোর মিথ্যা নাটক করেছিলেন???’
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১৪

‘আপনি কি জানেন সায়েনের জীবনের একটা কালো অধ্যায় আপনি শুরু করেছেন?? আপনি না আসলে ওর লাইফটা এভাবে শেষ হতো না। এভাবে মুখ লুকিয়ে দূরে সরে যেতে হতো না। আর ওর গায়ে কলঙ্কের দাগ লাগতো!!জানতে চান তো সায়েন কোথায় আছে কেমন আছে আর কি করছে?? তাহলে এটা জেনে রাখুন যে আমি এর কিছুই জানি না। এই মুহূর্তে সায়েন কোথায় আছে তা আমি কেন ওর কোন আত্মীয় স্বজন ও জানে না আর সেখানে আমি কিভাবে জানব??’
দিশা একটু দম ছাড়লো। তারপর পুনরায় বলতে লাগলো,’জানেন সেদিন রাতে কি হয়েছিল যেদিন আপনি চলে এসেছিলেন ওই চিলেকোঠার ঘর থেকে??ছাদ থেকে নামতেই অপ্রত্যাশিত ঘটনার শিকার হয় সায়েন। পুরো মহল্লার মানুষ এসে হাজির হয় সায়েনের বাড়িতে। কারণ তারা প্রায়শই আপনাকে আর সায়েনকে একসাথে ছাদে দেখেছে। এমনকি চিলেকোঠার ঘরে যেতেও। সবচেয়ে বড় কথা হলো সেদিন সন্ধ্যায় আন্টি নিজেও আপনাদের দুজনকে একসাথে দেখেছে। ভাবতে পারছেন সেদিন কোন পরিস্থিতিতে ছিল সায়েন?? নিজের মায়ের কাছে বাবা ভাইয়ের কাছে আর পুরো এলাকাবাসীর কাছে ছোট হয়ে গেছে ও। যে মা ওর গায়ে ফুলের টোকাও দেয়নি সেই মা সেদিন সায়েনের গায়ে হাত তুলেছিল। সবার তিক্ত কথার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আর সেই কথাগুলো যে কি পরিমান নোংরা হতে পারে তা আপনাকে নিশ্চয়ই বলতে হবে না!! আপনি এসবের মধ্যে সায়েনকে ফেলে চলে এসেছিলেন। সায়েনের মা সায়েন আর শাফিন ভাইয়াকে অনেক বেশি শাসন করে রাখে। ছেলেমেয়েকে তিনি আদর্শ ও চরিত্রবান করতে চায়। আর সেখানে এতোবড় আঘাত তিনি কিভাবে সহ্য করবেন। আর এলাকার মানুষ তো আছেই। রাস্তায় দেখা হলেই জিজ্ঞেস করবে “আপনার মেয়ে তো চিলেকোঠার ঘরে একটা ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছিল তাই না??” এসব কথা ক’জন বাবা মা মানতে পারে??তাই আন্টি আঙ্কেল ও নিতে পারেনি। সেজন্য এই শহর ছেড়ে চলে গেছে দূরে কোথাও। আমি জানি না ওরা কোথায়
আছে ওরা!!কোন যোগাযোগ ও নেই ওর সাথে।’
দিশা কাঁদছে,সায়েনের কষ্টটা সেও মানতে পারছে না। আরাদ দুহাতে মুখ ঢেকে বসে আছে। দিশার প্রতিটা কথা তীরের মতো আঘাত হানছে তার বুকে। সত্যি সায়েনের জীবনের কালো অধ্যায় সে নিজেই। কেন এরকম নাটক করে সেদিন সায়েনের বাড়িতে থেকে গেল?? তাহলে তো এতো কিছু হতো না। সব দোষ আরাদের। এই আঘাত তো সায়েন কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারবে না। নিশ্চয়ই সে সবকিছুর জন্য আরাদকে দায়ী করছে। করবেই তো কারণ দায়ী তো আরাদই। নিজের উপর রাগ বাড়ছে আরাদের। ছয়টা মাস সে সায়েনের জন্য ছটফট করে কাটিয়েছে। এক নজর সায়েনকে দেখার জন্য তির্থের কাকের মত বসে আছে। কত জায়গায় খোঁজ করেছে সায়েনের তবুও পায়নি। সায়েনের আত্মীয় বলতে লিমাকে চেনে আরাদ। সেখানে খোঁজ করেও কিছু জানতে পারেনি আরাদ। বিষন্ন মন নিয়ে দিনের পর দিন যাপন করছে সে।
দিশা নিজের চোখের পানি মুছে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এতক্ষণ ধরে বসে বসে অনেক কথাই বলেছে সে। চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই আরাদ বলে উঠলো,’দিশা যদি কখনো সায়েনের খোঁজ পাও বা সায়েন যদি তোমার সাথে কোনদিন যোগাযোগ করে তাহলে প্লিজ আমাকে জানিও।’

পিছনে ফিরে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো দিশা তারপর বলল,’সেটা কোনদিন ও হবে না। আমার সাথে ও কখনোই দেখা করবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো আপনি চাইলেও কোনদিন ওর সাথে দেখা করতে পারবেন না। যদি না সায়েন চায়।’

আরাদ কোন কথা বলল না। স্থির দৃষ্টিতে দিশার দিকে তাকিয়ে আছে। দিশা আবার বলল,’আমার এতোটা কনফিডেন্ট কেন তাই তো?? কারণ সায়েন ওর মায়ের সাথে পরীক্ষা দিতে এসেছিল সেটা কি জানেন আপনি??’

আরাদ অবাক চোখে তাকাল দিশার দিকে বলে,’সায়েন এসেছিল??’

‘হ্যা এসেছিল!! পরীক্ষা দিয়ে আবার চলে গেছে। আপনার এতো পাওয়ার এতো লোকজন থাকতে কেন সেটা ধরতে পারলেন না??আসলে যে নিজে থেকে ধরা দিতে চায় না তাকে কেউ ধরতে পারে না। তাই আপনিও পারেননি। তবে শেষ পরীক্ষার দিন সায়েন আমার সাথে কথা বলেছিল। কিন্তু আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছিল। আমি বুঝলাম না যে এতকিছুর পরেও কেন সায়েন আপনার কথা জিজ্ঞেস করলো??বলতে পারেন??’

আরাদ আবার চুপ করে আছে। এতকিছু শোনার পর কি বলার আছে ওর?? চোখের পানি ও আসছে না তারাও কঠিন হয়ে গেছে। মাথা নিচু করে বসে আছে আরাদ। দিশা ততক্ষনে চলে গেছে। জোনায়েদ আরাদের কাঁধে হাত রেখে বলে,’বাড়িতে যাবি না??’

আরাদ চট করে উঠে দাড়ালো বলল,’আরশি তনয়া কে নিয়ে বাড়িতে যা আমি পরে যাব।’

আরাদ সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। জোনায়েদ আজকে আর আটকালো না আরাদকে। সে আরশি আর তনয়াকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেল।

রাস্তার ফুটপাত ধরে হেঁটে চলেছে আরাদ। আর আশেপাশের ব্যস্ত মানুষের চলাচল দেখছে। আচ্ছা মানুষগুলো এরকম কেন??কেন সবসময় নিজেদের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকে??কারো মন খারাপ দেখলে শান্তনা না দিয়ে কেন আরো ভেঙে দিয়ে চলে যায়??যেমনটা সায়েনকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সেসময় আরাদের প্রয়োজন ছিল সায়েনের কিন্তু তখন আরাদ ছিল নিজ কাজের ব্যস্ততায়। সেদিন আরাদের উপস্থিতি সায়েনকে পুরোপুরি ভেঙ্গে দিতো না। আরাদ ঠিক কোন না কোন ভাবে সামলে নিতো সায়েনকে। তাহলে এই ছয়টা মাস এভাবে আলাদা থাকতো না দুজনে। না জানি এতগুলো দিন কিভাবে কাটিয়েছে সায়েন??আর পরবর্তী দিনগুলো কিভাবে কাটাবে সে?
তর্জনি আঙ্গুল দিয়ে চোখের কোণের পানিটুকু মুছে বড় একটা শ্বাস ফেলল আরাদ। হাঁটতে লাগলো কোন এক অজানার পথে।

ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছাড়িয়ে গেছে। এখনও আরাদের আসার নাম নেই। নিলিমা বেগম উদাস হয়ে খাবার টেবিলে বসে আছে। তিনি আরাদের জন্য অপেক্ষা করছে। হাসি বেগম পানি খাওয়ার জন্য আসতেই নিলিমাকে দেখে বলল,’ভাবি তুমি ঘুমাও নি??রাত তো অনেক হলো!!’

নিলিমা সেদিকে তাকালো উদাস হয়েই বললো,’কি করব আরাদ তো এখনও ফিরলো না।’
হাসি চেয়ার টেনে বসে বলল,’কি করবে এখন আর?? তোমার ছেলে যেভাবে ওই মেয়ের পিছনে পরেছে মনে হয় তো আজীবন ওই মেয়ের পিছনেই দৌড়াবে। এভাবে তো চলবে না। মেয়েটা চলে গেছে ফিরবে কি ফিরবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই। আরাদের জীবনটা নষ্ট হতে দিও না ভাবী। আমি বলি কি আরাদকে বিয়ে দিয়ে দাও। দেখবে ভালো হবে। প্রথমে আরাদ অমত করবে কিন্তু পরে ঠিকই মেনে নেবে।’

নিলিমা ভেবে দেখল যে হাসি ঠিক কথাই বলেছে। এভাবে নিজের একমাত্র ছেলের জীবন কিছুতেই উচ্ছন্নে যেতে দেবে না তিনি একদমই না। যেকরেই হোক আরাদকে বিয়ে দিতেই হবে। ওনাদের কথার মধ্যেই আরাদ ফিরে আসলো। চোখদুটো তার অসম্ভব লাল।নাকটাও লাল হয়ে আছে। এলোমেলো পায়ে হেঁটে কয়েক সিঁড়ি উঠতেই নিলিমা বলে উঠলেন,’দাড়া,এতো রাত করলি কেন??’

আরাদ পিছনে না তাকিয়েই জবাব দিলো, ‘তুমি জেগে আছো কেন??আমি খাবো না। তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।’

আরাদ সিঁড়ি ভেঙে উপরে গিয়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। নিলিমা হতাশার শ্বাস ফেললো। হাসি এগিয়ে এসে বলল, ‘দেখলে আরাদকে?? এভাবে আর কতদিন চলবে??ভাবি নিজের ছেলের ভালো চাও তো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দাও।’

নিলিমা মাথা নেড়ে চলে গেল। হাসি বেগম ও নিজের রুমে চলে গেছে।
রুমে ঢুকেই গায়ের শার্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেলল আরাদ। আজকে অনেক ড্রিংক করেছে সে। কিন্তু নেশা কিছুতেই ধরছে না তার। বারবার সায়েনের মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। সায়েকে একটু দেখার জন্য ছটফট বাড়ছে আরাদের। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো সে। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল,’কোথায় তুমি সায়েন??প্লিজ একটিবার দেখা দাও?ফিরে আসো প্লিজ??’
চোখজোড়া টানছে আরাদের। এভাবে সায়েনের নাম যপ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো সে।

ভার্সিটির প্রথম দিন আজকে। আরশি আর তনয়া বেশ উৎফুল্ল। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে খাবার টেবিলে বসেছে দুজন। আরশি মা’কে জিজ্ঞেস করল,’ভাইয়া কোথায় মা??বলো না আজকে যেন আমাদের ড্রপ করে দেয়??’

নিলিমা গম্ভীর মুখে বললেন,’আরাদ অফিসে চলে গেছে।’

আরশি মুখটা ছোট করে বলল,’ওহ।’

আরশি আর কোন কথা বলল না। আরাদের মনের অবস্থা সেও বুঝতে পারছে। বোন হয়ে ভাইয়ের মনের অবস্থা তাকে তো বুঝতেই হতো। খাওয়া দাওয়া শেষ করে করে ওরা বেড়িয়ে গেল। তামিম ও ওদের সাথেই বের হয়েছে। তনয়া বলে উঠলো,’ভাইয়া ইদানিং বেশি আপসেট থাকে। ভাবী এমন করলো কেন বল তো??একটু ভাইয়ার কথা ভাবলেও তো পারতো।’

আরশি বিরক্তসূচক শব্দ বের করলো মুখ দিয়ে তারপর বলল,’এখন এসব নিয়ে ভাবছিস কেন?? ভাইয়া সব সামলে নেবে।’

‘আর কিভাবে সামলাবে?? এতগুলো দিন তো পার হয়ে গেলো। ভাইয়া আর আগের মতো নেই রে!!কথায় কথায় বকে না,ধমকায় না, শাসনও করে না।’

‘শাসন করলে বুঝি ভালো লাগতো তোর??’

‘তা লাগতো না। তবে এমন দেখেও তো ভালো লাগছে না।’
আরশি একটু নড়েচড়ে বসল বলল,’এক কাজ করলে কেমন হয়??আমরা ভাবিকে খুঁজে বের করি আর ভাইয়াকে সারপ্রাইজ দেই।’

তনয়া মুখ ভেঙিয়ে বলল,’হুহ!!এতোই সহজ??যেখানে ভাইয়া পারলো না সেখানে আমরা?? তাছাড়া আমরা তো কখনো দেখিনি ভাবিকে খুঁজব কিভাবে??’

তামিম ওদের দুজনের কথায় বিরক্ত। মেয়ে মানুষ খুব বেশি কথা বলে। কথার ঝুড়ি খুলে নেয়। সেখান থেকে একটার পর একটা কথা বের করতেই থাকে। তবে সে ঝুড়ি কোন সাধারণ ঝুড়ি নয়। কখনোই খালি হয়না সে ঝুড়ি। সবসময় ভর্তি থাকে। তামিম একটা ধমক দিয়ে বলল,’আলাদিনের যাদুর চেরাগ দিয়ে খুজবি তাহলেই পেয়ে যাবি।’
আরশি ভ্রু যুগল কুঁচকে বলে,’তোমাকে বেশি কথা বলতে হবে না। চুপ থাকো,নিজে তো খুজবে না তাই আমাদের ভাবি আমরাই খুঁজব।’

তারপর আর কেউ কোন কথা বলল না। তামিম ওদের ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে নিজেও চলে গেল।

অফিসের কাজ শেষে বেশ রাত করেই বাড়িতে ফিরল আরাদ। কাজে সে কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। অনেক ভুল করে ফেলেছে আজকে। জোনায়েদ তা বারবার সংশোধন করেছে। বাড়ি ফিরতেই বেশ অবাক হয় আরাদ। আজকে সবাই জেগে আছে। দেখে মনে হচ্ছে সবাই আরাদের জন্য অপেক্ষা করছে। শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে এগিয়ে গেল সে বলল,’সবাই জেগে আছো যে??কোন সমস্যা??’

নিলিমা বলে উঠলো,’দেখ আরাদ অনেক হয়েছে। মানছি তুই ওই মেয়েটাকে ভালোবাসিস। কিন্তু মেয়েটা তো চলে গেছে তাই না??সে আর ফিরবেও না। তাহলে তুই কেন এভাবে থাকবি??’
কপালে ভাঁজ পড়লো আরাদের বলল,’কি বলতে চাও তুমি??’
এবার হাসি বেগম মুখ খুললেন,’আমরা চাই তুই বিয়ে কর। নতুন জীবন শুরু কর। আমরা তোর ভালো চাই আরাদ তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি,,,’

কথা শেষ করার আগেই হুংকার ছাড়লো আরাদ। ত্যাজি কন্ঠে বলল,’এসব বলার মানে কি??তোমরা বলবে আর আমি বিয়ে করবো? তোমরা কিছু জানো না??সবই তো বলেছি আমি। এমন তো নয় যে আমার সম্পর্কে তোমরা কিছুই জানো না??আমি ক্লিয়ার করে বলে দিচ্ছি যে আমি বিয়ে করব না। আমার শুধু সায়েনকেই চাই। ও যদি না আসে তাহলে ও ওকেই চাই আমার। সবচেয়ে বড় কথা হলো আজকে সায়েন যেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তার জন্য আমি দায়ী। তাই বলছি এই বিষয়ে আমাকে আর টেনে এনো না।’

গটগট করে নিজের রুমে চলে গেল আরাদ। ওর কথার পিঠে কেউ টু শব্দ করতে পারলো না। নিলিমা বেগম অলরেডি কেঁদে ফেলেছেন। হাসি বেগম শান্তনা দিচ্ছে। ইমজাদ আগে থেকেই ছেলে সম্পর্কে অবগত। আরাদকে সেও কিছু বলতে পারবে না। যদি আবার কিছু করে বসে?? একমাত্র ছেলে তার। হতাশ হয়ে তিনি রুমের দিকে পা বাড়ালেন। নিলিমা বেগম কেঁদেই চলেছেন। হাসি বেগম বোঝাচ্ছেন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে হলেও আরাদকে রাজি করাতে।

নিজের রুমে গিয়ে হাতঘড়িটা খুলে মেঝেতে ফেলে দিলো আরাদ। ঘড়িটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল। রাগ মাথায় চড়ে বসেছে ওর। বাড়ির লোকগুলো কেমন ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এদের সামলানো কষ্টকর হয়ে যাবে। একে তো সায়েনকে খুঁজছে আরাদ আরেকদিকে মা আবার উঠে পড়ে লেগেছে বিয়ের জন্য। আরাদ বুঝেছে কাকিমনি ছাড়া এটা কেউ করতে পারে না। এখন দু’জনে মিলে ব্লাকমেইল করা শুরু করবে আরাদকে।

ঠিক তাই হলো। পরেরদিন থেকে শুরু হলো নিলিমা বেগমের ব্লাকমেইল। খাওয়া দাওয়া তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন। রুমে দরজা আটকে বসে আছে। বাইরে থেকে সবাই ধাক্কাধাক্কি করছে কিন্তু সে দরজা খুলছে না। তনয়া বিরক্ত হয়ে আরশিকে বলল,’তোর মা একটু বেশি বেশি করছে। কোথায় ভাইয়াকে একটু বুঝবে তা না??’

‘তোর মা’ই তো নষ্টের মূল। বিয়ের কথা বলার দরকার কি ছিল?? এখন নতুন ড্রামা শুরু হবে।’

‘দুজনই একই রকম। দেখি কি হয়??’

আরাদ দরজা ধাক্কাচ্ছে কিন্তু ওর মা খুলছে না। শেষে আরাদ রাজি হলো বিয়ে করতে। খুশিতে নিলিমা বেগম দরজা খুললেন সাথে একগাদা মেয়েদের ছবি হাতে। ছবিগুলো আরাদের হাতে দিয়ে বললেন,’এর মধ্যে থেকে একটাকে চয়েজ কর তাহলেই হবে।’

আরাদ শান্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,’বিয়ে আমি করব!! কিন্তু আমার সময় প্রয়োজন। তাছাড়া আমাকে কিছুদিনের জন্য আমেরিকা যেতে হবে। নেক্সট ডিল ওখানে ফাইনাল হবে। তাই আমাকে সেখানে যেতে হবে। তাই আমার সময় চাই মা।’

নিলিমা বেগমের খুশী হারিয়ে গেল। কিন্তু কিছু বলারও নেই। তবে আরাদ রাজি হয়েছে এটাই অনেক। সময় নিক তাতে কোন সমস্যা নেই।
আরাদ চলে গেল।

একসপ্তাহ পর ওর ফ্লাইট। বাংলাদেশ ছাড়বে সে। মা’কে আটকানোর জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আরাদের তখন মাথায় আসছিলো না। কিন্তু সায়েনকে খুঁজে পেতে হলে তো ওকে বাংলাদেশ ছাড়লে চলবে না!!! এ নিয়ে দোটানায় পড়ে গেছে আরাদ। অবশেষে সব দায়িত্ব জোনায়েদের ঘাড়েই পড়লো। জোনায়েদ আরাদকে আস্বস্ত করলো,সে সায়েনকে খোঁজার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। সায়েন নাই বা ফিরলো আরাদের কাছে। অনন্ত ওর পরিবারের সবার কাছে ক্ষমা তো চাইতে পারবে আরাদ। যদিও এতে সবকিছু ঠিক হবে না তবুও ক্ষমা চাইবে আরাদ। নাহলে জীবনেও শান্তি পাবে না সে।

#চলবে,,,,,,,,,,,,,,
#চলবে,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here