চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ১৫+১৬

0
50

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১৫

স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে সূর্যকিরণ প্রবেশ করছে রুমের ভেতরে। আরাদ টেবিলে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। কিছুক্ষণের জন্য ব্রেক নিয়েছে সে। কাজের মধ্যে নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখতে চায় আরাদ যাতে সায়েনকে একটু কম মনে পড়ে। কিন্তু পারে না। এটা আরাদের কাছে অসম্ভব। টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গেল কাঁচের দেয়ালের দিকে। একহাত রাখলো দেয়ালের উপর। সূর্যের আলোয় উওপ্ত গরম কাঁচে হাত রেখেও ভাবান্তর নেই আরাদের। গরমে পুড়ে যাচ্ছে আরাদের হাত,আস্তে আস্তে লাল বর্ণ ধারণ করছে হাতের তালু। কিন্তু আরাদ স্বাভাবিক রয়েছে,এর থেকে বেশী পুড়ছে ওর হৃদয়। সেখানে সামান্য এই গরমে তার কিছুই না। বাইরের বড়বড় ভবনগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে সে। চোখে রশ্মি পড়া সত্ত্বেও চোখ মেলে তাকিয়ে আছে আরাদ। তখনই দরজায় নক পড়লো। ঘোর থেকে বের হয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলো। টেবিলের উপর থেকে ছোট রিমোট হাতে নিয়ে বাটন চাপতেই দরজা খুলে গেল। দরজা দিয়ে একজন নারী প্রবেশ করলো। ঠোঁটে তার মিষ্টি হাসি। হাঁটু পর্যন্ত একটা স্কার্ট পড়েছে সে। যার কারণে ফর্সা পাদুটো দেখা যাচ্ছে। টাইট শার্টের সাথে টাই পড়েছে। চুলগুলো উপরে ঝুটি করা। নিঃসন্দেহে তাকে সুন্দরী বলা যায়। শুধু এই মেয়েটা নয় এই অফিসে এরকম অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে। আমেরিকান মেয়েদের রূপের দিক দিয়ে সেরা বলতে গেলে। সায়েনের থেকে এসব মেয়েদের রূপ গুন সব দিক দিয়েই বেশি। কিন্তু আরাদ এইসব মেয়েদের দিকে ফিরেও তাকায় না। কথায় আছে না,যদি নির্দিষ্ট কারো মুগ্ধতায় আটকে যায় তাহলে আর কাউকে ভালো লাগে না। তেমনটাই হয়েছে আরাদের।

মেয়েটা হাসি মুখে এগিয়ে এসে আরাদের দিকে ফাইল এগিয়ে দিলো। আরাদ হাত বাড়িয়ে ফাইলটা হাতে নিয়ে টেবিলের উপর রাখলো। মেয়েটা মুখের হাসি বিদ্যমান রেখেই ইংরেজিতে বলল,’উই হ্যাভ টু গো টু টুমোরো’স সিরেমনি!!’

‘ইয়াহ, ইটস্ ভেরি ইম্পর্টান্ট ফর মি!!’

মেয়েটা হেসে চলে গেল। কালকে আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিজনেস পার্টি। সেখানে আরাদকে উপস্থিত থাকতে হবে।

অফিসের কাজ শেষে নিজের কঙ্খিত ফ্ল্যাটে পৌঁছে গেল আরাদ। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। বালিশের নিচে থেকে একটা ছবি বের করলো সে। নীল শাড়ি পরিহিতা সায়েন হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। হাতের নীল চুড়িগুলো চিকচিক করছে বিকালের রৌদ্রে। গোপায় গোঁজা সাদা ফুলের গাজরা। একহাতে গাজরা ধরে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন। ছবিটা সায়েনের ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে পেয়েছিল আরাদ। সায়েন তখন লিমার বিয়েতে গিয়েছিলো। ছবিটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো আরাদ। ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল পুরো ছবি জুড়ে বিচরণ করছে। একটা মিথ্যা ওদের জীবন এলোমেলো করে দিল। এই একটা মিথ্যা ওকে দিনের পর দিন শাস্তি দিয়েই যাচ্ছে।

পার্টিতে যাওয়ার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে আরাদ। আজকে পরনের ফুল পোশাক হলো ব্ল্যাক। চুল ব্রাশ করে আয়নায় একবার দেখে নিল সে। গালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি রেখেছে। কড়া পারফিউম স্প্রে করে ঘড়ি পরতে পরতে বের হয় সে। গাড়িতে উঠতেই গাড়ি স্টার্ট দিলো ড্রাইভার। বড় করে পার্টির আয়োজন করা হয়েছে বিশাল বড় কমিউনিটি সেন্টারে। বাংলাদেশের থেকে আরো উন্নত সব ডেকোরেশন। রঙ বেরঙের বাতিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। ওয়েস্টান ড্রেস পরিহিতা মেয়েরা এদিক ওদিক ঘুরছে। স্টাফরা ড্রিংকস নিয়ে ছুটোছুটি করছে। রুমের মধ্যে শতাধিক গোল গোল টেবিল পাতা। আরাদ গিয়ে একটা টেবিলে বসলো। ওর সাথে আরো কয়েকজন আমেরিকান বিজনেসম্যানরাও রয়েছে। মূলত পুরষ্কার বিতরণ করা হবে আমেরিকান বিজনেসম্যানদের। বিভিন্ন নিয়ম কানুনের মধ্যে দিয়ে পার্টি শুরু হলো। মোট দশজন কে পুরষ্কার দেওয়া হলো। তার মধ্যে আরাদ ও ছিল। বাংলাদেশি বিজনেসম্যান হিসেবে আরাদই পুরষ্কার পায়। কিন্তু এই পুরস্কার আরাদের কাছে সামান্য মাত্র। যাই হোক আরাদ পার্টি শেষ হওয়ার আগেই নিজ ফ্ল্যাটে ফিরে আসে। ওখানে থাকতে ভালো লাগছিল না ওর। ফ্ল্যাটে এসে ফ্রেশ হতে না হতেই ফোন বেজে উঠল। আরাদ বুঝে গেছে কার ফোন। একটু দেরিতেই সে ফোন রিসিভ করলো। অপর পাশে থেকে নিলিমার কন্ঠস্বর ভেসে এলো,’কেমন আছিস??’

‘ভালো তুমি কেমন আছো?? বাড়ির সবাই কেমন আছে??’

নিলিমা কটাক্ষ করে বলল,’তুই যেমন ফেলে গেছিস। আর কত এভাবে কাটাবি তুই?? আমাদের কথা কি একটুও ভাববি না??’

আরাদ বিরক্ত হলো। রোজ রোজ এক ঘ্যানঘ্যান শুনতে শুনতে অসহ্য হয়ে গেছে সে।
যার জন্য এত দূরে চলে এসেছে তারপরও সেই কথা। আরাদ বলল,’মা আমি বললাম তো আমার,,,,’

আরাদকে থামিয়ে নিলিমা বলে,’সময় চাই তাই তো??এই সময় সময় করে তিন বছর পার করে দিলি এরপরও তোর সময় চাই?? আমার কথার কোন দাম নেই তোর কাছে??যেদিন মরে যাব সেদিন বুঝবি!!’

বলতে বলতে তিনি কান্না করে দিয়েছেন।আরাদ ও এখন হাঁপিয়ে উঠেছে। সত্যি তো সময় আর অফিসের কাজের বাহানা দিয়ে তিনটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে সে। কিন্তু এই তিন বছরে সায়েনের কোন খোঁজ সে পায়নি। প্রতিদিন জোনায়েদকে কল করে খোজ নেয় আরাদ কিন্তু বরাবরের মতো জোনায়েদ কিছু জানতে পারে না। এবার আরাদ ঠিক করেছে সে নিজে খুঁজে দেখবে। এর জন্য তাকে বিডিতে ব্যাক করতে হবে। আরাদ বড় একটা শ্বাস ফেলে বলে,’এক সপ্তাহের মধ্যে আমি আসছি।’
বলেই ফোনটা কেটে দিলো সে। নিলিমা বেগম খুশিতে ছুটলো হাসি বেগমের কাছে। এবার তারা আরাদের বিয়ে দিয়েই ছাড়বে। মেয়ে দেখতে হবে তো??

………………..

আমেরিকার প্লেনটি এই মাত্র শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করলো। সব ফর্মালিটি পূরণ করে লাগেজ টেনে টেনে বাইরে এলো আরাদ। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বেলা দশটা বাজে। বাইরে ওর জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে ড্রাইভার সাথে দুজন গার্ড। আজ বহুদিন পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছে আরাদ। ঘনঘন কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে সামনে আগালো সে। চেনা কারো মুখ দেখতে না পেয়ে বেশ অবাক হয় আরাদ। আশ্চর্য!! এতদিন পর এসেছে অথচ কেউ ওকে রিসিভ করতে এলো না??এসব ভাবতে ভাবতে গাড়িতে উঠে বসলো আরাদ। গাড়ি এক ছুটে চলে এলো বাড়িতে। দরজায় দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপার আগেই দরজা খুলে গেল। নিলিমা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে আরাদের দিকে। আরাদ এগিয়ে গিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরল মা’কে। নিলিমা বেগম এবার শব্দ করেই কেঁদে উঠলো। আরাদ বুঝিয়ে মা’কে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ড্রয়িং রুমে বাড়ির সকলে উপস্থিত। আরাদ একে একে সবার সাথেই কথা বলল। তামিমের কাছে গিয়ে বলল,’কি খবর তোর??বড় হয়ে গেছিস খুব!!’

তামিম মাথা চুলকে বলে,’আর হয়েছি!! তুমি চলে যাওয়ার পর তো আমার শান্তি হারাম হয়ে গেছে। বছর যেতে না যেতেই অফিসে বসিয়ে দিলো। ব্যাস হয়ে গেল কেল্লাফতে।’

হাসল আরাদ। ও যাওয়ার পর অফিসের দায়িত্ব ওর বাবা কাকা আর জোনায়েদ নিয়েছে। অবশ্য আরাদ ও বিদেশে থেকেও কিছুটা হ্যান্ডেল করেছে। আরাদ বলল,’এখন আমি এসে গেছি তোর ছুটি।’

তামিম দাঁত কেলালো। আরশি আর তনয়ার কাছে গিয়ে বলল,’তোদের কি অবস্থা?? পড়াশোনার কি খবর??’
আরশি মুচকি হেসে বলল,’ সাইকোলজি বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করছি আমি আর তনয়া।’

আরাদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। এক মুহুর্তের জন্য সায়েনের কথা মনে পড়ে গেলো। সায়েন ও তো সাইকোলজি নিয়ে পড়তে চেয়েছিল। নাহ সায়েন না,সায়েনের মা চেয়েছিল। সায়েন কি পড়াশোনা এখন করছে??করছে হয়তো। আরাদ আর কথা বাড়ালো না নিজের রুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে লম্বা ঘুম দিয়ে বিকেলে উঠলো সে। ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখলো তনয়া আর আরশি কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে। আরাদ সোফায় বসতে বসতে বলল,’কি হয়েছে তোরা কি নিয়ে আলোচনা করছিস??’

তনয়া মুখ খুলল,’একটা বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত আমরা দুজনেই।’

আরাদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,’কোন বিষয়ে??’
নড়েচড়ে বসল তনয়া তারপর বলল,’আচ্ছা ভাইয়া কেউ কি জেলে বসে পড়াশোনা করতে পারে???’
চমকালো আরাদ,প্রশ্নটা যুক্তিযত। কিন্তু এই সম্পর্কে আরাদের কোন ধারণা নেই। তাই সে বলল,’আমি জানি না। কেন বলতো??’

এবার আরশি বলে উঠলো,’আসলে আমাদের ক্লাসে একটা মেয়ে পড়াশোনা করছে। মেয়েটা ক্রিমিনাল। মার্ডার কেসের আসামি। কিন্তু তবুও হাইকোর্ট তাকে জেলে থেকেও পড়াশোনার জন্য অনুমতি দিয়েছে। এজন্য সব স্টুডেন্টরা ঘাবড়ে গেছে এতে। আমি আকাশ ভাইয়াকে কত জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু সে কিছুতেই বলছে না এসব বিষয়ে।’

আরাদ আরশির কথার গুরুত্ব দিলো না কিন্তু আকাশের নাম শুনে চমকে গেছে।

‘আকাশ!!! আকাশের পোস্টিং এখানে!!’

আরশি অকপটে জবাব দিলো,’হ্যা তো!! দু’বছর ধরে ঢকায় জয়েন করেছে। আমাদের ভার্সিটিতে তো প্রায়ই যায়। আসলে ওই ক্রিমিনাল মেয়েটাকে দেখার দায়িত্ব ভাইয়ার। মেয়েটা ভার্সিটিতে শুধু পরীক্ষার সময়টাতেই আসে। আর বাকি সময়টা জেলে বসে পড়াশোনা করে কাটায়। আমার তো মেয়েটাকে দেখলেই ভয় লাগে। না জানি আবার আমাকে খুন করে দেয়ে।’

আরাদ বিরক্ত হলো কি সব ক্রিমিনাল নিয়ে পড়েছে ওরা। আরাদ এক ধমক দিতেই দু’জনে দৌড়ে পালালো। এতদিন পর এসেই ধমকাধমকি শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যে নিলিমা বেগম এসে কফিও দিয়ে গেছে আরাদকে। কফি খেতে খেতে দেখলো জোনায়েদ আসছে। সাথে আরো কয়েকজন চেনা মুখ দেখে অবাক হয় আরাদ। আকাশ, নিয়াজ,রাফিনকে দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠল আরাদের। কলেজ ভার্সিটিতে একসাথে পড়েছে সবাই। তারপর পড়াশোনা আর কাজের তাড়নায় সবাই আলাদা হয়ে গেল। আরাদ ওদের দেখে বলল,’হয়াট আ সারপ্রাইজ!!! তোরা!!’
আকাশ আরাদের পাশে বসে ওর পেটে গুঁতো মেরে বলল,’শালা কতদিন পর এলি!! আমি বেটা দু’বছর ধরে ঢাকায় এসেছি আর তুই লাপাত্তা!!’

রাফিন পিন্ঞ্চ মেরে বলে,’বিদেশে কোন সাদা ফড়িং জুটিয়েছে মনে হয় যার জন্য দেশে আসতেই চায় না।’

রাফিনের কথায় আরাদ হাসলো তারপর বললো,’ওসব ছাড় আগে বল তোদের কি খবর?? এতদিন পর সবার দেখা।’

নিয়াজ চট করে বলে,’তো পার্টি হয়ে যাক??’
সবার জোড়াজুড়িতে রাজি হয়ে গেল আরাদ।রাতে আরাদদের ছাদে বসে আড্ডা দেবে সবাই। তাই কেউ বাড়িতে গেলো না। সোফায় বসেই কথা বলতে লাগলো।

পর্দার আড়ালে থেকে একজোড়া চোখ ওদের দেখছে। মূলত চোখজোড়া আকাশের দিকে। আকাশের কথা বলার ধরন হাসি সবটাই চোখের মালিককে মুগ্ধ করে তোলে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন ধাক্কা দিতেই পড়তে পড়তে সে নিজেকে সামলে নিলো। আরশি বিষ্ফোরিত চোখে তনয়ার দিকে তাকাতেই তনয়া মেকি হেসে বলল,’আর কতো লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবি। মনের কথাটা নাহয় এসবার বলে ফেল। আকাশের বুকে তো অনেক জায়গা তোর ঠাই হলেও হতে পারে।’
ভেংচি কেটে চলে গেল তনয়া। আরশি ভেবে দেখলো যে তনয়া ঠিকই বলেছে। আকাশ কে যে সে ভালোবাসে সেটা এবার বলতেই হবে। কিন্তু কিভাবে বলবে?? বুদ্ধি নিতে সে আবার তনয়ার কাছে ছুট লাগালো।

খোলা আকাশের নিচে পাটি বিছিয়ে বসেছে সবাই। আরাদ,জোনায়েদ,আকাশ,রাফিন আর নিয়াজ গোল হয়ে বসেছে। সামনে ড্রিংকসের বোতল। আজকে সারারাত আড্ডা দেবে বলে সবাই বসেছে। বোতলে চুমুক দিয়ে আরাদ আকাশকে উদ্দেশ্য করে বলল,’তোর কথা আগে বল। কতবার বলেছি ঢাকায় চলে আয় তা না করে তুই রংপুর পড়ে রইলি কিন্তু দু’বছর ধরে ঢাকায়!!এটা তো সহজ কথা নয়।’

আকাশ কিছু বলল না। তার কাঙ্খিত বোতলে চুমুক দিলো। নিয়াজ ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল,’আরে পুলিশ অফিসার প্রেমে পরেছেন। সেই টানেই এখানে আসা।’

চোখ কুঁচকে আরাদ বলল,’মানে??’

জোনায়েদ নিজের বোতল হাতে নিয়ে বলল, ‘আমাদের আকাশ প্রেমে পরেছে। যেনতেন প্রেমে নয় রে,একেবারে ক্রিমিনাল এর প্রেমে।’

আরাদ এবার বেশ অবাক হয়। আরাদ যে কিছু বুঝতে পারছে না সেটা ওরা বেশ বুঝতে পেরেছে। আরাদ এবার সরাসরি আকাশকে প্রশ্ন করল,’কাহিনী কি গোড়া থেকে বল। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

নিয়াজ দুষ্টুমির সুরে বলল,’ওকে ছাড়। ওর লজ্জা করে না বুঝি??আমি বলি সেটা শোন।একটা মেয়ে যে কি না মার্ডার কেসের আসামি। চার বছরের জেল হয়েছে তার। অলরেডি তিনবছর পার হয়ে গেছে। আর এক বছর পর ছাড়া পাবে মেয়েটা। তো ওই মেয়ের প্রেমে পড়েছেন আকাশ। মেয়েটাকে রংপুর থানা থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে বিধায় আমাদের আকাশ ও তার পোস্টিং চেঞ্জ করে ঢাকায় এসেছেন। তাহলে বোঝ কত ভালোবাসা।’

এবার আরাদ পুরো বিষয়টি বুঝতে পারলো বলল,’তার মানে এই মেয়েটার কথা আরশি আর তনয়া তখন বলেছিল।’

আকাশ উদাস ভঙ্গিতে বলল,’এই ব্যাপারে তোর বোন দুটো আমার মাথা খায়। ভার্সিটিতে গেলেই আমাকে জেঁকে ধরে।’

‘আচ্ছা এটা বল যে মেয়েটা ক্রিমিনাল হওয়া সত্ত্বেও পড়াশোনা করছে কিভাবে??’

আকাশ বড় একটা শ্বাস ছাড়লো বলল, ‘মেয়েটা নিজের ইচ্ছায় খুন করেনি। এটা একটা এক্সিডেন্ট বলতে পারিস। যেহেতু খুনটা অনিচ্ছা সত্ত্বে হয়েছে তবুও ওকে দোষী সাব্যস্ত করে চার বছরের সাজা দিয়েছে। ওর পরিবার আর উকিল ওর ভবিষ্যৎ এর কথা ভেবে আদালতে ওর পড়াশোনার জন্য আবেদন করা হয়। মেধা আর সার্টিফিকেট এর নম্বর দেখে আদালত তাকে জেলে থাকা অবস্থায় পড়াশোনা করার নির্দেশ দেয়। যদি সে সিরিয়াল কিলার হতো তাহলে দিতো না। যথেষ্ট ভদ্র ঘরের মেয়ে বলে ওকে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য রাষ্ট্রেও এরকম নিয়ম চালু আছে। তবে বাংলাদেশে মনে হয় প্রথম। আদালত ওকে শুধু এক্সাম দিতেই বলেছে বাকি পড়াশোনা জেলের ভেতরে বসেই করে। তাছাড়া ওর পরিবার মোটা অংকের টাকা দিচ্ছে যার জন্য ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে।’

সবাই হা হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। রাফিন হাততালি দিয়ে বলল, ‘এক্সিলেন্ট ব্রো। চোর পুলিশের পিরিত ভালো ভাবে বুঝিয়ে দিলি তুই। আই স্যালুট ইউ।’

সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো। ওদের কথাবার্তা ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল আরশি। চোখ দুটো তার ভরে গেছে পানিতে। ওর ভালোবাসার মানুষটা অন্য কাউকে ভালোবাসে!!এটা যেন মানতে পারছে না আরশি। এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল আরশি।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১৬

ভালোবাসার মানুষটি যখন অন্য কাউকে ভালোবাসে বলে স্বীকারোক্তি দেয় তখন মনের ভেতরের কষ্টটা বোঝানো দায়। ভেতরে যে উথাল পাথাল বা ঝড়ের সৃষ্টি হয় তা যদি এই পৃথিবীতে দেখা দেখা যেতো তাহলে নির্ঘাত পৃথিবীর অর্ধেক ধ্বংস হয়ে যেতো। এরকমই ঝড় সৃষ্টি হয়েছে এক রমনির মনে। সে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছে। মন উজাড় করে কাঁদছে। ঝর্ণাধারার মতো পানি চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে তার। ঝর্ণার জল যেমন শক্ত পাথরের বুকে আঘাত হানে তেমনি এই রমনির চোখের পানি নরম বালিশের বুকে আঘাত হানছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে পুরো বালিশের গা। পানির কলস ভরে গেলে যেমন পানি উপচে পড়ে তেমনি আরশির কষ্টগুলো উপচে পড়ছে। আকাশকে সে যুবতীকাল থেকেই পছন্দ করতো। ভালো লাগতো খুব। যখন আরাদের সাথে আকাশ ওদের বাড়িতে আসতো তখন আরশি দৌড়ে ছুটে যেতো তাকে এক পলক দেখার জন্য। কাছে যেতে পারতো না দুদন্ড বসে কথাও বলতে পারতো না। কারণ আকাশ খুব রাগি অনেকটাই আরাদের মতো। তাই আরাদের পাশাপাশি আকাশকেও আরশি ভিশন ভয় পায়। তবুও পড়াশোনার বাহানায় এটা ওটা জিজ্ঞেস করতো যাতে আকাশের কাছে ওকে বকা খেতে না হয়। এই মানুষটাকে সে দূর থেকেই দেখতো। ওর ভালোলাগা আস্তে আস্তে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। তবে বলতে পারেনি। আকাশের পোস্টিং ঢাকায় হওয়ায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল আরশি কারণ এখন থেকে দেখা পাবে সে আকাশের। সেটাই হলো,আকাশ প্রায়ই ওদের ভার্সিটিতে যায়। আর আরশি ও দেখা পায় আকাশের। কিন্তু এই মানুষটা ওকে ভালোবাসে না। এটা ভেবে আরশির ভিশন কষ্ট হচ্ছে। কষ্টগুলো পানিতে পরিণত হয়ে চোখ দিয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে। অনেকক্ষণ যাবত ধরে তনয়া আরশিকে খেয়াল করছে। হঠাৎ কি হলো মেয়েটার?? এভাবে কাঁদছেই বা কেন??একটু আগেই তো কত হাসিখুশি ছিলো!!পড়ার টেবিলে বসে পড়ছিল তনয়া তখনই আরশি দৌড়ে এসে বিছানায় উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো। এটা দেখে তনয়া চমকে যায়। তবে টেবিল ছেড়ে উঠলো না। সে আরশিকে মন খুলে কাঁদতে দিলো। একটু হালকা হলে সে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু আরশির কাঁদার থামাথামি নেই সে কেঁদেই চলেছে। তনয়া এবার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর দরজাটা আটকে দিলো কারণ কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে জবাবদিহি করতে হবে।
তনয়া আরশির পাশে গিয়ে বসে। ওর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,’কি হয়েছে আরশি??এভাবে কাদছিস কেন আমাকে বল??’
আরশি চোখ মুছতে মুছতে বালিশ থেকে মাথা তুলে বসলো। তনয়া আবার বলল,’কি হয়েছে বল আমাকে??এভাবে কাদছিস কেন??’

আরশির হিচকি উঠে গেছে। সে কম্পিত কন্ঠে তনয়াকে সব বলতেই তনয়া অবাক হয়ে যায় বলে,’কি যা তা বলছিস??আকাশ ভাইয়া অন্য কাউকে ভালোবাসলে হয়তো মানতাম। কিন্তু ওই ক্রিমিনাল মেয়েটাকে!!না না না,এটা আমার পক্ষে মানা অসম্ভব।’
আরশি কাঁদতে কাঁদতে বলে,’আমারও বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু আকাশ ভাইয়া তো নিজেই সবটা স্বীকার করেছে।’
তনয়া আরশির মাথাটা ধরে নিজের কাঁধে রেখে বলে,’কাদিস না!! পুলিশরা এমনিতেই ভালো হয় না। তোকে রাজপুত্র ধরে এনে দেব।’
তনয়ার দুষ্টমি কথা শুনে আরশি ওকে ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে বলল,’মজা করবি না একদম।’

‘দেখ কাউকে ভালোবাসার রাইট সবার আছে। কিন্তু কারো ভালোবাসার মাঝে যাওয়ার রাইট তুই কেন আমাদের কারোর নেই। তুই যদি জোর করে আকাশের ভালোবাসা পেতে চাস পাবি কি??পাবি না। জোর জবস্তি করে যদি তাকে বিয়েও করিস তাহলে দুজনের কেউই সুখি হতে পারবি না। তাহলে ওদের মাঝখানে গিয়ে কি লাভ!! এরচেয়ে তোর একতরফা ভালোবাসাটা একতরফাই থাক। নতুন করে পরিকল্পনা কর। যে তোকে ভালোবাসে শুধু তার ডাকেই সাড়া দে। দেখবি লাইফে একদিন না একদিন ঠিকই সুখি হবি।’
আরশি বিষ্মিত চোখে তাকিয়ে রইল তনয়ার দিকে। কি সুন্দর করে সবটা বুঝিয়ে দিলো তনয়া। কিন্তু ও তো ভালোবাসে আকাশকে। ভুলবে কিভাবে এতো দিনের ভালোবাসা?? আকাশকে ভোলার কথা মনে পড়তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো আরশির। তনয়া যত্নে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,’জানি কষ্ট হবে তোর আকাশ ভাইয়াকে ভুলতে। কিন্তু সময় নিয়ে হলেও ভুলে যা। এতে তোরই ভালো। জাস্ট চিল সিস্টার। লাইফ মানেই আনন্দ। দুঃখ তো আসবেই,তাকে সাইডে রেখে চিল কর। আমি আছি তোর সাথে।’

কান্নার মাঝেও আরশি হেসে দিলো। তনয়ার মতো বোন হয়না। সবসময় আরশির সাথে থাকে। দুজনের মধ্যে বন্ডিং ভালো। আরশির মন খারাপ হলেই তনয়া নানাভাবে ওর মন ভালো করে তোলে। তনয়া আরশিকে টেনে খাবার টেবিলে নিয়ে গেল।

__________________

দু’দিন কেটে গেছে। আরাদ নিজ অফিসে বসেছে। তামিমের ছুটি,তাই সে সুতো কাটা ঘুড়ির মতোই উড়ে বেড়াচ্ছে। অনেক দিন পর যেন সে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। সকালে খাওয়ার টেবিলে আসতেই নিলিমা বেগমের মুখোমুখি হয় আরাদ। তিনি আরাদকে একটা মেয়ের ছবি দেখাতেই বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে ফেলে আরাদ। নিলিমা বেগম বুঝেও না বোঝার ভান করে বললেন,’মেয়েটার নাম সামিউক্তা। ওর বাবার খুব নামডাক। মেয়ে যথেষ্ট সুন্দরী আর ভদ্র। অফিস শেষে বিকেলে দেখা করতে বলেছে তোকে। আমি তোর ফোন নাম্বার মেয়েটাকে দিয়ে দিয়েছি তোকে কল করবে। তুই গিয়ে দেখা করে নিস তাহলেই হবে।’

মায়ের কথাগুলো ভালো লাগছে না আরাদের। কিছু বলার আগেই নিলিমা বললেন,’তুই দেখা করবি আজকে। সামিউক্তার বাবা মা আজকে রাতে আসবেন এংগেজমেন্টের দিন ঠিক করতে। তার আগে দু’জন দু’জনকে সামনাসামনি দেখে নিবি।’

আরাদের আর খাওয়া হলো না। রাগ করতেও পারলো না। এখন রাগ করলেই নিলিমা কেঁদে ভাসাবে। মায়ের কথা শোনা ছাড়া আর কোন উপায় নেই তার। অর্ধেক খেয়েই উঠে পড়লো আরাদ। আরশি আর তনয়া আরাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। আরাদকে ভালো করে বুঝতে পারছে আরশি। ভালোবাসার কষ্টটা যে কি তা সে জানে। তনয়া আরশিকে তাড়া দিয়ে বলে,’তাড়াতাড়ি চল। কাল থেকে পরীক্ষা শুরু। সব নোটস কালেক্ট করতে হবে তো। আরশি তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো। তবে ভার্সিটি গিয়ে আকাশের সাথে দেখা। আকাশকে দেখে ক্ষতটা জাগ্রত হয় আরশির। তবে কথা বলে না আকাশের সাথে। তনয়া বলল,’ভাইয়া আপনি এখানে??’

আকাশ মুচকি হেসে বলল,’হ্যা, তোমাদের পরীক্ষা তো??তাই নোটস গুলো নিতে এসেছি।’
আরশি রেগে বোম হয়ে গেল। আকাশ ততক্ষণে চলে গেছে। আরশি রাগে গজগজ করতে করতে বলল,’ইশশশ কত দরদ দেখ??
একটা খুনির জন্য কতকিছু করছে। আমার থেকে ভালো মেয়ের কোথায় পাবে??টাকা পয়সা বাড়ি গাড়ি সবই আছে। এসব রেখে ওই মেয়েটার পিছনে পড়ে আছে।’
তনয়া হেসে বলে,’হুম,তবে তুই আকাশ ভাইয়ার থেকে আরো ভালো ছেলে ডিজার্ভ করিস।’

‘রাখ তোর ভালো ছেলে। কালকে তো পরীক্ষা, ওই মেয়েটাকে তো আমি খুন করেই জেলে যাব। তারপর মিস্টার পুলিশ অফিসার,দেখব আমার পড়াশোনার জন্য আপনি কি কি করেন??’

আরশির কথা শুনে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লো তনয়া। তারপর ওরা ক্লাসে চলে গেল।

নিজের কেবিনে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে আরাদ। এমন সময় জোনায়েদ ঢুকলো কেবিনে। মাথা তুলে তাকিয়ে জোনায়েদকে দেখেই মুচকি হাসলো আরাদ। জোনায়েদ চেয়ার টেনে বসে বলে,’আরএসএ কম্পানির সাথের ডিলটা তো আজকে ফাইনাল করার কথা তোর মনে নেই??’
ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে আরাদ বলল,’হুম!!’

‘তো বসে আছিস কেন??বেরোতে হবে তো!!’

‘জাস্ট টেন মিনিট। তুই গাড়ি রেডি কর বের হবো আমরা।’

জোনায়েদ চলে যেতেই আরাদের ফোন বেজে উঠলো। রিসিভ করে ফোন কানে ধরে বলল, ‘হ্যালো কে??’
উওর এলো না। আরাদ আবার একই প্রশ্ন করল। একটু পর মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসে সে বলে,’আমি সামিউক্তা, আপনি কি আরাদ বলছেন??’
মায়ের বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল আরাদের। কিন্তু এই মেয়ের সাথে সে কখনোই দেখা করবে না। আরাদ বলল,’সরি আমি আপনার সাথে দেখা করতে পারব না। আমার একটা জরুরী কাজ আছে রাখি।’

ফোনটা কেটে দিয়ে বেরিয়ে গেল আরাদ। আরএসএ কম্পানির মালিকের সাথে ডিল ফাইনাল করার জন্য তার অফিসে গেল জোনায়েদ আর আরাদ। মিটিং এর পর্ব শেষ করে বের হতে নিলেই একটা চেহারার মাঝে আরাদের চোখ আটকে গেল। চোখের চশমাটা খুলে ভালো করে তাকালো ব্যক্তিটির দিকে। একটু এগিয়ে গেল সামনে থাকা ডেস্কের। শাফিনকে দেখে চমকে গেছে আরাদ সাথে জোনায়েদ ও। আরাদ দ্রুত শাফিনের কাছে গিয়ে দাড়াতেই শাফিন আরাদের দিকে তাকালো। দাঁড়িয়ে পড়লো শাফিন ও। আরাদকে দেখে সেও চমকে গেছে। আরাদ জিজ্ঞেস করল,’তুমি শাফিন??সায়েনের ভাই??’
শাফিন উওর দিলো না। আরাদ আবার বলল,’সায়েন কোথায় শাফিন??আর তোমরা কোথায় ছিলে এতদিন?? আমি কত খুঁজেছি তোমাদের!!’
শাফিন এবারও জবাব দিলো না আশেপাশে তাকালো। সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।শাফিন বলল,’আপনি কার কথা জিজ্ঞেস করছেন??সায়েন নামের কাউকে আমি চিনি না। আপনি ভুল ভাবছেন স্যার!!’
শাফিনের কথা শুনে আরাদ অবাক। সে বলল,’তোমার বোন সায়েন। মিথ্যা বলছো কেন??আমার সায়েনের সাথে কথা বলতে হবে। প্লিজ আমাকে বলো সায়েন কোথায়??’

শাফিন অবাক হওয়ার ভান করে বলে,’দেখুন স্যার আপনি এসব কি বলছেন!!আমি বুঝতে পারছি না। সরি, আমার কাজ আছে আপনারা আসুন।’

আরাদ কিছু বলতে গেলে জোনায়েদ থামিয়ে দিল আরাদকে। একপ্রকার টেনে বাইরে নিয়ে এলো আরাদকে। শাফিন আশেপাশে তাকালো। সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। এতবড় একজন বিজনেসম্যান শাফিনের সাথে এমনভাবে কথা বলছে যেন তার পূর্বচেনা। শাফিন কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলো শাফিন। শাওয়ার নিয়ে বের হতেই রুহির মুখোমুখি পড়লো। কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,’তুমি এখানে??কখন এলে??দরজা খুলল কে??’

‘এতো কথা বলো কেন??খাবার নিয়ে এসেছি।
তুমি খেতে আসো আমি আঙ্কেলকে ডাকছি।’

রুহি চলে যেতেই হাসলো শাফিন। মেয়েটা এই তিন বছরে ওদের জন্য অনেক কিছুই করেছে। চুল মুছে সে খাবার টেবিলে এসে বসতেই কলিং বেল বেজে উঠল। শাফিন রুহির দিকে তাকাতেই রুহি গিয়ে দরজা খুলল। আরাদ কে দেখে চিনতে পারল না রুহি। আরাদ রুহিকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলো। শাফিন বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। সাথে শফিকুল ইসলাম ও। আরাদ বিলম্ব না করে শফিকুল ইসলামের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শফিকুল ইসলাম কিছুটা রেগে গেলেন আরাদকে দেখে। নিজেকে সংযত করে তিনি বলেন,’তুমি এখানে??কি জন্য এসেছো??’
আরাদ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো। ইতস্তত করে বলেই ফেলল,’আঙ্কেল আমি সায়েনের সাথে দেখা করতে চাই!! কোথায় ও??’

‘কেন সায়েনকে তোমার কি দরকার??যা করার তা তো করেই ফেলেছো এখন এসেছো কেন??আর এতদিন পর সায়েনের খোঁজে কেন এসেছো??’

‘আমি জানি ভুলটা আমার তাই আমি সায়েনের সাথে কথা বলতে চাই। আমি এতদিন অনেক খুঁজেছি আপনাদের কিন্তু পাইনি। প্লিজ একবার সায়েনের সাথে দেখা করতে দিন। আমি শুধু ওর সাথে একবার কথা বলেই চলে যাব।’

শাফিন এবার তেড়ে এলো। বেশ রাগি কন্ঠে বলল,’আর কি বলবেন আপনি?আর কি বলার আছে??সায়েন আপনার মুখ দেখতে চায় না। আপনি আমার বোনের জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আপনার জন্য সায়েন,,,,,!!’

থেমে গেল শাফিন। আরাদের দৃষ্টি শাফিনের দিকে। সে বলল,’কি হয়েছে সায়েনের???’
ধরে যাওয়া কন্ঠ আরাদের। শাফিন বলল, ‘মরে নি, বেঁচে আছে। তবে মরে গেলে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম।’

আরাদ বিষ্মিত হয়ে গেল। যে শাফিন এতো ভালোবাসতো ওর বোনকে সেই শাফিন ওর বোনের মৃত্যু কামনা করছে। শফিকুল ইসলাম শাফিনকে বললেন,’এসব কি বলছিস শাফিন??’
শাফিন এবার চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘ঠিকই বলছি আমি। এভাবে জ্যান্ত মরা হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। এই লোকটার জন্য সব হয়েছে। তুমি কষ্ট পাচ্ছ। আমি আমার মা’কে হারিয়েছি চিরদিনের জন্য। আর সায়েন!!সেতো বেঁচে থেকেও মরে গেছে। এর থেকে সেদিন মায়ের সাথে সায়েন মরে গেলেও ভালো হতো।’
শাফিনের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। শফিকুল ইসলাম চেয়ারে বসে পড়লেন। আরাদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সায়েনের মা মারা গেছে?? কিন্তু কিভাবে??আর এসব হলোই বা কবে??মাথা ঘুরছে আরাদের। কিন্তু সায়েন কোথায় এখন??এই বাড়িতে নেই তা বেশ বুঝেছে আরাদ। সে বলে,’আমি,,,,’

শাফিন আরাদকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনার জন্য আমাদের সুখের সংসার শেষ হয়ে গেছে। সব হারিয়েছি আমরা তারপরও এখন কেন এসেছেন??আর কি চাই আপনার??’

আরাদ কোন উওর দিতে পারলো না। রুহি ওর চোখের পানি মুছে বলল,’আপনি চলে যান। এখানে যতক্ষণ থাকবেন সবার পুরোনো কথা মনে পড়বে। প্লিজ চলে যান।’

এলোমেলো পায়ে বেরিয়ে এলো আরাদ। মাথায় আগুন জ্বলে গেছে তার। সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। সায়েনের মা মারা গেছে কিভাবে??এখন সায়েন কোথায়?? নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে আরাদের। ওর অবর্তমানে কি হয়ে গেল তা না জানা পর্যন্ত শান্তি হবে না আরাদের। দপদপ করে জ্বলছে ওর হৃদয়। সায়েনকে এক পলক দেখার জন্য বুকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। কোনরকমে গাড়ি চালিয়ে বাড়িতে ফিরলো আরাদ। রাত খুব একটা বেশি নয়। বাড়িতে ঢুকতেই মানুষের কলরবের আওয়াজ শুনতে পেল সে। বেশ সাজ সাজ রব বাড়িতে। আরাদ ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে যেতেই নিলিমা বেগমের ডাক পড়লো। আরাদ দাঁড়িয়ে পড়তেই নিলিমা বললেন,’কি রে তুই??সামিউক্তার সাথে দেখা করলি না কেন?? এখানে আয়। দেখ ওরা সবাই এসেছে। তোদের এংগেজমেন্ট সামনের সপ্তাহে,,,,,,’

কথা শেষ করতে পারলেন না নিলিমা বেগম। তার আগেই আরাদ এসে টি টেবিলটা উল্টে ফেলে দিয়েছে। টেবিলে থাকা প্লেটগুলো মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। হরেক রকমের সাজানো খাবার গুলোও পড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে পড়লো। রাগে আরাদ ফুঁসছে। এই মুহূর্তে যে সামনে আসবে তাকে যেন গিলে খাবে সে।ইমজাদ ওয়াহেদ বললেন,’আরাদ কি হচ্ছে?? এসব কি করছিস??’

গর্জন তুলে আরাদ বলে উঠলো,’নেক্সক টাইম কেউ যদি আমার বিয়ে নিয়ে একটা কথা বলে তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। সব শেষ করে দেব আমি মাইন্ড ইট‌।’

আরাদ গটগট পায়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। ড্রয়িং রুম পুরো নিস্তব্ধ, কারো মুখে কোন কথা নেই। ছেলের কথার পিঠে নিলিমা ও কিছু বলতে পারলো না। মনে হচ্ছে আজকে একটু বেশি রেগে আছে আরাদ। কিন্তু কি কারণে সেটা কেউ জানে না। ইমজাদ ওয়াহেদ ব্যাপারটা জানার জন্য জোনায়েদ কে ফোন করতে চলে গেলেন। সামিউক্তার বাবা মা এবং সামিউক্তা চলে গেল। সবাই যার যার রুমে চলে গেল। কারো মুখ থেকে টু শব্দটি পর্যন্ত বের হলো না।

সেদিনের পর আরাদকে বিয়ের বিষয়ে কেউ কিছু বলেনি। পুরো পরিবার গুটিয়ে গিয়েছে। এমনকি হাসি বেগমও। দরকার কি যেচে অপমান হতে যাওয়ার।

আরশি তনয়া পরীক্ষা দিচ্ছে। আরাদের মুখোমুখি ওরাও যায় না। কারণ সেদিনের পর থেকে আরাদের মুখে কেউ এতটুকু হাসি দেখেনি। সবসময় মুখটা গম্ভীর করে রাখে আর কিছু নিয়ে চিন্তা করে।
সাড়ে দশটার সময় তনয়া আর আরশির পরীক্ষা। তামিমের সাথে ওরা দুজনে বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু ওদের অবাক করে দিয়ে আরাদ আজকে ওদের রিসিভ করতে এসেছে। গেটের সামনে আরাদের গাড়ি দেখে তনয়া আর আরশি দু’জনেই অবাক। আরাদ গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আরশি এগিয়ে গিয়ে বলে,’ভাইয়া তুমি!!’

আরাদ সোজা হয়ে দাঁড়ালো বলল,’আমাকে তো বললি না যে তোদের পরীক্ষা চলছে??যখন জানতে পারলাম তখন ভাবলাম একটু ঘুরে আসি। কেমন হলো পরীক্ষা??’

আরশি হাসলো,কারণ ওর পরীক্ষার সময় আরাদ প্রতিদিন ওকে নিয়ে যেতো আবার বাড়িতেও নিয়ে আসতো। কিন্তু আরশি ভেবেছিল এবার বোধহয় তা হবে না। আরাদকে দেখে সে অবাক হয় খুশিও হয়। আরাদ ওদের গাড়িতে বসতে বলে। গাড়িতে বসার জন্য দরজায় হাত দিতেই কিছু শোরগোলে আরাদ আটকে যায়। চোখ তুলে ভার্সিটির ভেতরের দিকে তাকালো। পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে ভার্সিটি গেইটে। আরাদ তা দেখে আবারও ভেতরে তাকালো। আরশির কথা মনে পড়ে গেল। হয়তো সেই মেয়েটাকে নিতে এসেছে পুলিশ। আরাদ মেয়েটাকে দেখার জন্য উৎসুক দৃষ্টিতে ভার্সিটির দিকে তাকালো।

সাদা রঙের সেলোয়ার কামিজ পরিহিত মেয়েটাকে ঘিরে রাখছে কিছু মানুষ। চুলগুলো তার বেনুনি করে সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে। মাথা নিচু করে ছোট ছোট পা ফেলে সে এদিকেই এগিয়ে আসছে। চোখ থেমে গেছে আরাদের। আশেপাশে কি হচ্ছে তা কিছুই খেয়াল করছে না সে। মেয়েটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরাদ। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এলো সায়েনের নাম। খুশিতে আরাদের চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠলো। কিন্তু ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল আরাদের। পুলিশের গাড়ি থেকে আকাশ নামলো। সায়েন আকাশের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার দুহাত বাড়িয়ে দিল। আকাশ সায়েনের হাত থেকে কলম নিয়ে পকেটে রেখে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলো সায়েনের দুহাতে। আরাদের এতক্ষণে হুস এলো। ভালো করে তাকিয়ে দেখলো সায়েনের আশেপাশে তিনজন মহিলা পুলিশ। আরাদ এগোনোর আগেই গাড়িদুটো সায়েনকে নিয়ে চলে গেল। গাড়ি চলে যেতেই আরাদ দৌড়ে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসলো। গাড়ি নিয়ে ছুট লাগালো পুলিশের গাড়ির পিছনে। আরশি আর তনয়া তো অবাক। বাড়ির রাস্তা বাদ দিয়ে কোন রাস্তায় যাচ্ছে আরাদ?? জিজ্ঞেস করতেও ওরা ভয় পাচ্ছে। না জানি কিছু বললে গাড়ি থেকেই ফেলে না দেয়?তাই ওরা দুজন চুপ করে বসে আছে।

#চলবে,,,,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here