চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ১৯+২০+২১

0
68

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১৯

আজকে সবচেয়ে বেশি খুশি বোধহয় সায়েন ছাড়া কেউ নয়। নিউ ইয়ারে যে এত বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে ওর জন্য তা ভাবতেই সায়েন শিহরিত হয়ে উঠছে। গায়ের চাদরটা ঠিক করে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল তার। সোফার রুমে পাড়াপড়শিদের দেখে অবাক হলো সে। মা’কে ও দেখলো। সবাই ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সায়েন ভাবলো হয়তো তারা কোন কাজে এসেছে। কিন্তু ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন??সবার দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজের রুমে যেতে নিলেই জয়নব বেগমের ডাক পড়লো। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,’ছেলেটা কে??’

পিলে চমকে উঠে সায়েনের। পিছনে ঘুরে সে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। এই মুহূর্তে মায়ের চোখে চোখ রাখতে পারবে না কিছুতেই না। বুকটা তার ধকধক করছে। জয়নব বেগম আবারও একই কন্ঠে বলে উঠলো,’এটা বলো না যে ছেলেটার সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই!! কারণ তোমাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তটা সবই আমি দেখেছি। এবার বলো ছেলেটা কে??’

সায়েনের মাথা তোলার সাহস নেই। চোখ থেকে তার পানি গড়িয়ে পড়ছে। শেষমেষ সবটা জেনেই গেল ওর মা??এবার কি হবে??
সায়েনের জবাব দিতে পারলো না। পাশের বাসার মহিলাটা বলে উঠলো,’তোমার মেয়ে আর কি বলবে??সব তো নিজের চোখেই দেখলে। ছিঃ ছিঃ,এই ছেলেকে তো আরো আগে থেকেই ওই চিলেকোঠার ঘরে রেখেছিল তোমার মেয়ে। তোমার চোখের আড়ালে যাওয়া আসা করতো। তুমি দেখতে পেলে না??কেমন মা তুমি?? নিজের মেয়েকে দেখে রাখতে পারো না??’

পাশে থেকে আরেকজন পিন্ঞ্চ মেরে বলে উঠলো,’মেয়েকে বেশি শিক্ষা দিতে চাইলে এরকমই হয়। আমি তো প্রায়ই দু’জনকে ছাদে দেখতাম। প্রথমে ভালো করে খেয়াল করিনি। ভেবেছিলাম শাফিন হবে হয়তো। কিন্তু কয়েকদিন যাবত ভালো করে দেখি এতো অন্য একটা ছেলে। কি ডেঞ্জারাস মেয়ে??ঘরে পুরুষ মানুষ এনে ফস্টিনস্টি করে।’

লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল সায়েন। এটাও শুনতে হচ্ছে!! নিজের মানসম্মান সব বিসর্জন হয়ে গেল সাথে পরিবারের ও। যে যা পারছে বলছে। পারলে ছয় কে নয় বানিয়ে ফেলছে। সায়েন জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছে। শাফিন এক কোণায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সায়েনের সম্পর্কে এসব সেও বিশ্বাস করেনি। তবে একটু আগে নিজের চোখে যা দেখলো তা তো অবিশ্বাস করা যায় না। মনে মনে সেও সায়েনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছে। ঘৃণা হচ্ছে সায়েনের প্রতি। জয়নব বেগম শক্ত হয়ে বসে আছেন। হঠাৎ একজন বলে উঠল,’এখন কি করবে এই মেয়েকে নিয়ে?? চরিত্র সম্পর্কে জানলে তো এই মেয়েকে কেউ বিয়ে করবে না। যে কাজ করেছে তাতে তো পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেছে। ওই ছেলেটার সাথেই বরং বিয়ে দিয়ে দাও তাহলেই হবে।’

সবাই একথা নিয়ে কানাঘুষা করতে লাগলো। সায়েনের ইচ্ছে করছে মরে যেতে। এত অপমান সহ্য করতে পারছে না সে। আরাদের জন্য ও ভয় হচ্ছে তার। যদি ওরা আরাদকে কিছু বলে??গায়েও তো হাত তুলতে পারে। কিছু বলার মুখও নেই তার। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো যে আরাদের সাথে সায়েনের বিয়ে দিয়ে দিবে। তখনই একটা পুরুষালি কন্ঠ শুনে সবাই দরজার দিকে তাকালো। সে পকেটে হাত গুজে হেঁটে ভেতরে আসলো। সামনের সিঙ্গেল সোফায় আয়েশ করে বসলো। তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এই মেয়েটাকে যার সাথে বিয়ে দেবেন তাকে পাবেন তো??’

সবাই অবাক হয়ে তাকালো ফাহিমের দিকে। ফাহিম বাঁকা হাসলো। সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’যে ছেলেটাকে বাড়িতে এনে রাখছো সে কে জানো??’
সায়েন উওর দিলো না। ঠোঁট দুটো তার কাঁপছে খুব। ফাহিম আবার বলল,’আরাদ ওয়াহেদ,যে নিজের কার্যসিদ্ধি করার জন্য তোমার কাছে এতদিন ছিলো। কিন্তু তার কাজ শেষ তাই এখন আবার চলে গেছে। তাকে খুঁজে আর লাভ নেই।’

ফাহিমের কথায় প্রতিবেশীরা সব ফুঁসে ওঠে। নেই মানে?? কয়েকজন ছাদে গিয়ে চিলেকোঠার ঘর খুঁজে ও আরাদকে পেলো না। একথা যখন সবাই জানতে পারলো তখন সবাই ফাহিমের কথা বিশ্বাস করলো। ফাহিম বলল,’দেশের অন্যতম বিজনেসম্যানের মধ্যে আরাদ একজন। এত বড় একজন বিজনেসম্যান কেন এরকম সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করবে??আপনারাই বলুন। তাই তো সে চলে গেছে। কত ভালো ভালো মেয়ে ওর জন্য দাঁড়িয়ে আছে জানেন আপনারা??’

কেউ কোন কথাই বলল না। সায়েনের বাড়িতে এরকম একটা ছেলে ছিলো??সবাই ভেবেই অবাক হচ্ছে। এতে সায়েনের চরিত্র নিয়ে আরো কথা বলছে সবাই। ফাহিম দাঁড়িয়ে সায়েনের সামনে গিয়ে বলে,’আরাদের স্মৃতি নষ্ট হয়নি। তোমাকে সব মিথ্যা বলেছে সে। কিন্তু আমার কথা হলো যে কেন সে তোমার মতো সাধারণ একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিলো??সো স্যাড। তোমার প্রশ্ন হতে পারে আমি এসব কেন বলছি?? কারণ আরাদ আমার খুব কাছের একজন মানুষ। ওর ভুলগুলো তো আমাকেই শোধরাতে হবে!!আরাদ অনেক বড় বিজনেস ম্যান। কত মেয়েদের সাথে ওর ওঠাবসা। সায়েনকে হঠাৎ মনে ধরেছে তাই কিছুদিন থেকে গেছে। এখন মন উঠে যাওয়াতে আবার চলে গেছে। ওর মতো ছেলের কাছে এটা সিম্পল। শুধু শুধু আপনারা এই মেয়েটাকে দোষ দিচ্ছেন। ওর কোন দোষই তো নেই।’

ফাহিম পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সায়েনের হাতে দিয়ে বলল,’আরাদকে তুমি সহজে পাবে না। তাই এই ঠিকানা দিলাম। কালকে বড় পার্টি আছে। সেখানে আরাদ ও থাকবে। দেখা করতে চাইলে করতে পারো নো প্রবলেম।’
ফাহিম আশেপাশে তাকিয়ে আরেকটু এগিয়ে ফিসফিস করে বলল,’মানতে হবে যে আরাদ খুব সুন্দর ভাবে গেইমটা সাজিয়েছে। কিন্তু তুমি তা ধরতে পারলে না কেন??আরাদ ঠিক কি জাদু করেছে যে ওর বলা প্রতিটা মিথ্যা তোমার কাছে সত্যি মনে হলো??’

সায়েন কাগজটার দিকে বিষ্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। সাথে চোখের পানি তো পড়ছেই। আরাদ ওকে এতবড় মিথ্যা বলতে পারলো। কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না সায়েনের। ফাহিম বের হয়ে গেল। মনে তার তৃপ্তির হাসি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি তো কি হয়েছে??আরাদকে তো এতেই ঘায়েল করা সম্ভব। এওয়ার্ড না পেলে যতটা কষ্ট আরাদ পেতো তার থেকে হাজার গুণ বেশি কষ্ট পাবে যখন সায়েন ওকে ছেড়ে দেবে। এই আনন্দ টা সে কিছুতেই মিস করতে চায় না। তাই তো আরাদ আসার আগেই সায়েনকে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিল। যাতে আরাদ ওকে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ না করে। ফাহিম বেরিয়ে যেতেই একে একে সবাই বের হয়ে গেল। সাথে কটু কথা বলতেও ছাড়লো না। একেই বলে বাঙালি। ফ্রি নিতেও ছাড়ে না পারলে দিতেও ছাড়ে না।

সবাই বের হয়ে যেতেই সায়েন গুটিগুটি পায়ে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কিছু বলার আগেই জয়নব বেগম শাফিনের দিকে তাকিয়ে বলল,’শাফিন ওকে বারণ করো আমার সাথে কথা বলতে। যে মেয়ে পরিবারের মুখে চুনকালি মাখাতে পারে সে কখনোই মেয়ে হয়ে উঠতে পারে না।’

সায়েনের বুকটা ছ্যাত করে ওঠে। জয়নব বেগম আবারও মুখ খুললেন তবে তার দৃষ্টি শাফিনের দিকেই,’কি চেয়েছিলাম আমি??ছেলে মেয়ের একটা আদর্শ চরিত্র!! কিন্তু সেটা হলো কই??সব বাবা মা ই তো এটাই চায়। আমিও চেয়েছি। কিন্তু সেটা যদি তোমাদের পছন্দ না হয় তাহলে আমাকে বলতে!!বাধা দিতাম না। তাই বলে এভাবে বাইরের কাউকে!!!’
থেমে গেলেন জয়নব বেগম। এবার তার চোখের পানি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সায়েন। সত্যি তো প্রতিটা বাবা মা তো চায় তার সন্তানকে যেন কেউ কোন বাজে কথা না বলে। সন্তানের চরিত্র আদর্শবান হলে সবাই সেই বাবা মা’কে সমিহ করে। এতে বাবা মায়ের বুক গর্বে ভরে যায়। এই শান্তিটুকু তো সব বাবা মা’ই চায়। কিন্তু সব সন্তান কি তা করে??উল্টে তারা বাবা মায়ের গায়ে হাত তুলতে দ্বিধাবোধ করে না। জন্মদাতার কথা না ভেবে তাকে দিনের পর দিন বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রাখে। নিজের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে জায়গা হয় না সেই বাবা মায়ের। অথচ বাবা মা ঠিকই সন্তানের জন্য সবকিছু করে। পড়ালেখা থেকে শুরু করে সব ইচ্ছা পূরণ করে। বড় হয়ে সেই সন্তান বাবা মায়ের আত্মত্যাগ ভুলে তাদের ত্যাগ করে।

জয়নব বেগম ভাঙা গলায় বললেন,’আমি ভাবতাম আমার মেয়ে সবার থেকে আলাদা। যেভাবে আমি তাকে তৈরি করেছি সে সেভাবেই তৈরি হচ্ছে। কিন্তু না,সে আমার আড়ালে যে অনেক কিছু করে ফেলেছে। পাড়ার আর পাঁচটা মেয়ের থেকেও সে জঘন্য। আমি ভাবতেও পারছি না। এর আগে কেন আমার মৃত্যু হলো না।’

জয়নব বেগম কাঁদতে কাঁদতে নিজের রুমে চলে গেল। শফিকুল ইসলাম ও গেলেন সেদিকে। কারণ শ্বাসকষ্টের রোগী জয়নব বেগম। অতিরিক্ত কান্না করলে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। শাফিন সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’তোর থেকে এটা আশা করিনি আমি সায়েন। ছিঃ,,,,’

শাফিন ও মায়ের রুমে ছুটলো। সায়েন এক ছুটে রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিল। মেঝেতে বসে বিছানার চাদর আকড়ে ধরে কাঁদতে লাগলো সে। সায়েনের কাছে তার প্রতিটা নিঃশ্বাস বিষের মতো লাগছে। যা দেওয়ালে বারি খেয়ে আবার ওর কাছে ফিরে আসছে। একসাথে এতকিছু সে মানতে পারছে না। একদিকে পরিবার অন্যদিকে আরাদ। সবটা সামাল দিবে কিভাবে সে??আরাদ কেন মিথ্যা বলেছে??তা এখনও সায়েনের কাছে অস্পষ্ট। কিন্তু মিথ্যা তো বলেছে। আরাদের একটা মিথ্যার জন্য সব শেষ হয়ে গেলো। গায়ে কলঙ্কেল দাগ লাগলো। অথচ আরাদ তো ঠিকই নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। চলে গেছে সে। আর যাওয়ার আগে কি করেছে?? অনুভুতির খেলা খেলে গেছে সায়েনের সাথে। ভালোবাসা,এই কথাটাও কি মিথ্যা বলেছে আরাদ??হ্যা তাই হবে। আর কোন সত্যি সে আরাদের থেকে আশা করবে??এই মুহূর্তে সায়েনের মরে যেতে ইচ্ছা করছে। তবে মরে গেলে নতুন করে আঙ্গুল তোলা হবে সায়েনের দিকে। তাই সে মরার চিন্তা বাদ দিয়ে দিলো। সারারাত কাঁদতে কাঁদতে সে পার করে দিলো।

সকালে বের হতেই কাউকে পেল না সায়েন। সমস্ত বাড়ি খুঁজেও যখন কাউকে পেল না তখন বাইরে এসে খুঁজলো। বেশি দূর গেল না সে। এই মুখ মানুষকে দেখিয়ে আর কি হবে??তাই সে আবার বাড়িতে ফিরে এসেছে। আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া তার উপায় নেই। কিছুক্ষণ পরেই দেখল সবাই ফিরে এসেছে। শফিকুল ইসলাম আর শাফিন ধরে আনছে জয়নব বেগমকে। সায়েন তা দেখে দৌড়ে সেদিকে গিয়ে বলল,’মা কি হয়েছে তোমার??ভাইয়া মায়ের,,,,’
জয়নব বেগম থামিয়ে দিলেন সায়েনকে বললেন,’আমাকে নিয়ে কাউকে ভাবতে হবে না। তোমাকে তো নয়ই।’

থেমে গেল সায়েন। চোখ থেকে আপনাআপনি পানি গড়িয়ে পড়লো তার। সরে দাঁড়ালো সামনে থেকে। শাফিন মা’কে রুমে দিয়ে এসে সায়েনকে বলল,’কেন করলি এটা??তোর জন্য রাস্তায় বের হতে পারছি না আমরা। কিভাবে থাকব এখানে??’

সায়েন কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিলো,’বিশ্বাস কর ভাইয়া আমি ওরকম কিছুই করিনি। সবটা জানলে তুইও সব বুঝতেও পারবি।’

‘নিজের চোখে দেখা সত্যিকে কিভাবে অবিশ্বাস করি। তুই কি জানিস যে আজ কত কথা শুনতে হয়েছে আমাদের। মায়ের অসুস্থ শরীর দেখেও কেউ এতটুকু ছাড় দেয়নি কেউ।’
শাফিন নিজের রুমে চলে গেল। শফিকুল ইসলাম এখন পর্যন্ত সায়েনের সাথে কোন কথাই বলেননি। যা সায়েনের মনকে ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে। সে আবার রুমে ফিরে গেল।
সারাদিনে কেউ কারো সাথে কোন কথা বলেনি। বিকেলে শাফিন এসে বলে গেছে জামাকাপড় গোছাতে। কয়েকদিনের জন্য তারা রংপুর যাচ্ছে তার মেজ মামার বাড়িতে। সবকিছু স্বাভাবিক হলে আবার ফিরে আসবে। সায়েন শুধু নিরবে সবটা শুনেছে। সেও দেরি করেনি। সব জামাকাপড় গুছিয়ে ফেলেছে। রাত এগারোটায় ট্রেন,তাই সায়েন ভাবলো শেষ দেখা করবে সে আরাদের সাথে। তখন আরাদকে চিলেকোঠার ঘরে খুঁজতে গিয়ে ওর ফেলে যাওয়া ফোন আর পাওয়ার ব্যাঙ্ক পেয়েছে সেটা সায়েনের কাছেই রেখে গিয়েছে। তাই সেগুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। বাড়ির কাউকে কিছু না বলে ফাহিমের দেওয়া ঠিকানায় সে পৌঁছে যায়। আরাদের সাথে দেখা করে সে বাড়িতে ফেরে। এবিষয়ে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি সায়েনকে।

সেদিন রাতেই ওরা রংপুরের উদ্দেশ্য চলে যায়। সকাল সাতটায় রংপুর পৌঁছে যায় সবাই। কিছু না বলে আসাতে বেশ চমকে যায় সায়েনের মামা মামী। তবে তারা একটু খুশিও হয়। কারণ অনেক দিন ধরে ওনারা সায়েনদের আসতে বলেছেন কিন্তু ওরা যায়নি। তাই এখন দেখে খুশি হয়েছে। খুশিমনে ওনারা সবাইকে ভেতরে নিয়ে গেল।

_________________

কেটে গেছে দুই মাস। ঢাকা থেকে রংপুর এসে নতুন বাসা ভাড়া নিয়েছে শফিকুল ইসলাম। শাফিন তার চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানকার একটা শপিং মলে কাজ নিয়েছে। শফিকুল ইসলাম ছোট ফার্মেসির দোকান খুলে বসেছেন। ঢাকার দোকানটা তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন। ভালো ভাবেই চলেছেন তারা। কিন্তু সায়েনের বাইরে যাওয়া একদম বন্ধ করে দিয়েছেন জয়নাব বেগম। যতোই দোষ করুক নিজের মেয়ে তো??ফেলে দিতে তো পারেন না। এখানকার একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়েছে সায়েনকে। এখন থেকে সায়েনের সবসময় এর সাথি বোরখা। বোরখা ছাড়া তার বের হওয়া নিষেধ। সায়েন নিজেকে সবসময় গুটিয়ে রাখে। পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখে যাতে পুরোনো কথা কি ভুলে থাকা যায়??কখনোই না।

পরীক্ষার সময় এগিয়ে এসেছে সায়েনের। জয়নব বেগম সায়েনকে সাথে নিয়ে আসে ঢাকায়। শাফিন আর ওর বাবাকে সায়েনের মামা মামীর বাসায় রেখে এসেছেন।ঢাকায় এসে নিজ বাড়িতে না গিয়ে সায়েনকে নিয়ে জয়নব বেগম ভাড়া বাড়িতে উঠলেন। সবকিছু থেকে তিনি সরে গেলেন। সামনে আগাতে চান তিনি। পিছু ফিরবেন না সে কিছুতেই। সায়েনের পরীক্ষা চলাকালীন জয়নব বেগম সাথে ছিলেন সায়েনের। শেষ পরীক্ষার দিন সায়েন দিশার সাথে কথা বলার একটু সুযোগ পেলো। সব শুনে দিশাও হ্যাং হয়ে গেছে। দিশা অবাক হয়ে বলে,’কিন্তু তুই তো বললি ছেলেটা স্মৃতি হারিয়েছে। তাহলে এসব কি করে হলো??’

‘জানি না!!উনি কেন এমন করলো আমার সাথে?? আমার বাবা আমার সাথে কথা বলে না। মা তো!!’

বলেই বড় একটা শ্বাস ফেলল সায়েন। দিশা বলল,’তুই সব বলছিস না কেন??’

‘কেউ শুনতে চাচ্ছে না আমার কথা। আর শুনলেও কি বিশ্বাস করবে?’

‘আমাদের কি আর দেখা হবে না??’

‘ভাগ্যে থাকলে হবে। তোর সাথে এর আগে কথা বলতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি। একটা খবর দিতে পারবি??’

দিশা মাথা নাড়িয়ে বলে,’বল??’
গলা কাঁপছে সায়েনের তবুও সে বলল, ‘কোথায় থাকে আরাদ??বলতে পারবি??শেষ দেখায় অনেক কথা বলেছিলাম ওনাকে। কিন্তু মন মানতে চাইছে না। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। তবুও কেন এমনটা হয়ে গেল।’

সায়েনের কান্নারত মুখ দেখে দিশা বলল, ‘ভালোবাসিস??’
দিশার হাত দুটো চেপে ধরে সায়েন,’না চাইতেও ওই লোকটাকে কিভাবে ভালোবাসলাম আমি??আমি আর পারছি না।ওই খারাপ লোকটাকে ভুলতে পারছি না রে।’

দিশা কিছু বলার আগেই জয়নব বেগম চলে এলেন। সায়েন দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো। মায়ের সাথে চলে যেতে যেতে একবার ফিরে তাকিয়ে শেষবারের মতো দিশাকে দেখে নিল। এরপর হয়তো আর কোনদিন দেখা হবে না দিশার সাথে। আর আরাদ তো বহুদূর।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২০

চার দেয়ালের ভেতরে থেকে কেটে গেছে একটা মাস। নিজের রুম থেকে বের হওয়ার অনুমতি সায়েন পায়নি। তার সব কিছুই রুমের ভেতরে। শফিকুল ইসলাম খুব একটা কথা বলে না সায়েনের সাথে। রুম থেকে বের না হওয়ার জন্য কারো সাথেই তেমন কথা হয়না সায়েনের। আশেপাশের ভাড়াটিয়ারা জানেই না যে এই বাসায় একটা মেয়ে থাকে। সায়েন আগের থেকে একটু স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু ধাক্কাটা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সবসময় শুধু আরাদ নামক মানুষটার কথা মনে পড়ছে তার। আরাদের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ছে। শুধু এই স্মৃতিটুকু কষ্ট দিচ্ছে সায়েনকে। কাছে থাকলে ভালোবাসা তাড়াতাড়ি হয়ে যায় তাই না?? সেজন্য হয়তো অল্পদিনেই সায়েন ভালোবেসে ফেলেছে আরাদকে। স্বল্প সময়ে কাছে থেকে গভীর ভাবে ভালোবাসে ফেলেছে আরাদকে। কিন্তু মনের কোন এক স্থানে ঘৃণা জমে আছে এই ব্যক্তিটির উপর। সেদিনের পর থেকে সায়েন পণ করেছে যে আর কখনোই আরাদের সামনে যাবে না। আরাদের মিথ্যা ভালোবাসার কাছে মাথা নত করবে না সে। তাই আরাদকে ভোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু যতোই চেষ্টা করছে ততই বেশি মনে পড়ছে আরাদকে। দিনের বেলায় কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকলেও রাত পাড়ি দিতে কষ্ট হয় সায়েনের।

রুমে বসে থেকে মাথাটা বড্ড ধরেছে সায়েনের। এক কাপ চা হলে বেশ হতো। তাই সে রুম ছেড়ে বের হলো। মা তার রুমে আছে তাই সায়েন নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে পাতিলে পানি দিয়ে চা বসালো। কলিং বেল বাজতেই সায়েন চমকালো। ও খুলতে যাওয়ার আগেই জয়নব বেগম দরজা খুললেন। সায়েন আবার চুলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। জয়নব বেগম রান্নাঘরে এসে দেখলো সায়েন চা বানাচ্ছে। সায়েনকে আরেক কাপ চা বানাতে বলে জয়নব বেগম চা নিয়ে গেলেন। বাড়িওয়ালা এসেছে ভাড়া নিতে। তিনি সায়েনের মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে একটা ছেলের কথা বললেন। ছেলে ভালো চাকরি করে ভালো পরিবার। তার এক বন্ধুর বাড়িতে নতুন এসেছে ইত্যাদী ইত্যাদী। পাতিলে চা পাতা দিতে গিয়ে থেমে যায় সায়েন। ওর মন সম্পূর্ণ ড্রয়িং রুমে। সব কথাই শুনছিল সে। কোনরকমে চা বানিয়ে নিজের রুমে চলে গেল সায়েন। খারাপ লাগছে না ওর। এমনটা তো হতেই হতো। ওর জন্য পুরো পরিবার গুটিয়ে আছে। আগের মতো প্রাণবন্ত কেউ নেই। সবার মুখের হাসি কেমন হারিয়ে গেছে। তাই সবার মুখে হাসি ফোটাতে হলে যদি ওকে বিয়ে করতে হয় তাতেও সে রাজি।

শফিকুল ইসলাম বাড়িতে এলে সায়েনের মা তার সাথে আলোচনা করে। শেষে ছেলে দেখার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
বুকে পাথর চেপে ছেলেপক্ষের সামনে বসেছে সায়েন। কেন জানি খুব কষ্ট হচ্ছে সায়েনের। আরাদের কথা মনে পড়ছে খুব। ঘৃণা করলেও তো ভালোবাসে আরাদকে। সব ইচ্ছা দমিয়ে রেখে ছেলেপক্ষের সামনে সে গিয়েছে। যেহেতু বাড়িওয়ালা চেনেন ছেলেকে। সেহেতু কোন কথাই নেই। ছেলেপক্ষের পছন্দ হয়েছে সায়েনকে। তাই তারা চান এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলতে। জয়নব বেগম এতে দ্বিমত পোষণ করেন। উনি চান আগে ছেলে সম্পর্কে ভালো করে জানতে। কিন্তু বাড়িওয়ালা আশ্বস্ত করে বলেন তার বন্ধুর চেনাজানা ছেলে। খুব ভালো,সাথে এক গাদা ভাশন দিয়ে দিলেন ছেলে সম্পর্কে। এতে কারো কিছু বলার ছিল না। আর ছেলেও যথেষ্ট ভালো দেখতে। সায়েনের সাথে বেশ মানিয়েছে। তাই কেউ অমত করলো না।

যথারিতি নিয়ম মেনে ঘরোয়া ভাবে এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়েটা সম্পন্ন হয় সায়েনের। পরিবারের কাছে নিজেকে সত্য প্রমাণ করতে মাথা নুইয়েছে সায়েন। শুধু কি সায়েন?? আমাদের দেশে এরকম হাজারো সায়েন আছে যারা পরিবারের সুখ শান্তির জন্য নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে। ভালোবাসার মানুষের কাছে বেঈমান উপাধি নিয়ে অন্যের ঘরে পা বাড়ায়। সায়েন নিজের কাছেই বেঈমান উপাধি নিয়েছে। কবুল বলার সময় আরাদের মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। চোখ বন্ধ করে দুফোঁটা অশ্রু ফেলে সে কবুল বলে দেয়। সায়েন জানে না যে এতে ওর পরিবার ওকে কতটুকু বিশ্বাস করেছে।

একরাশ কষ্ট নিয়ে বাড়ি ছেড়েছে সায়েন। বারবার আরাদের কথা মনে পড়লেও ওকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ এখন সে অন্যের অর্ধাঙ্গিনী। পরপুরুষের কথা ভাবা ওকে মানায় না। তাই সায়েন আরাদ কে ভুলে সংসার করবে বলেই সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে কষ্ট হবে কিন্তু আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। অনুভূতি গুলো যে ভোলা খুবই কষ্টকর। কিভাবে ও অন্যের সাথে থাকবে?? সায়েনের শ্বশুর বাড়ির লোকজন খুবই ভালো। সবসময় সায়েনের খেয়াল রাখে। সায়েনের হাজবেন্ড এর নাম রাহাত। সেও যথেষ্ট খেয়াল রাখে সায়েনের। কোনরকম অভিযোগ করার উপায় রাখেনি তারা। শ্বাশুড়ি কখনোই সায়েনকে রান্নাঘরে যেতে দেননা। অবশ্য সায়েন কোন রান্না পারেও না। কিন্তু কথায় আছে না যে বেশি ভালো, ভালো নয়। যদি দেখো জিনিসটা অতিরিক্ত ভালো তাহলে ভাববে তার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন ঘাপলা আছে। কিন্তু সহজ সরল সায়েন সেটা বোঝে নি। বিয়ের মাত্র তিনদিন হয়েছে।
সেদিন বিকেলে বৃষ্টি পড়ছিল। সায়েন দৌড়ে ছাদে যায় জামাকাপড় আনতে। বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ায় সায়েন নিচে নামতে পারলো না। ছাদের কোণে একটা চিলেকোঠার ঘর ছিলো। দৌড়ে সেখানে গিয়ে দাড়াতেই অবাক হয়ে গেল সায়েন। কারণ রাহাত তখন ড্রাগ নিচ্ছিল। থরথর করে কেঁপে উঠলো সায়েনের শরীর। ঘৃণায় মুখ বিষিয়ে গেল তার। গলা ঝেড়ে বলল,’আপনি ড্রাগস নিচ্ছেন!! নেশা করেন আপনি?? ছিঃ, আগে এসব বললেন না কেন?? আপনি জানেন না যে এসব নেশা করা ভালো না??’
রাহাত আমতা আমতা করে বলল,’আমি ড্রাগস নিচ্ছি ন না,,,সায়েন।’
সায়েন রাহাতের কথা না শুনে এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল। শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে কাঁদতে কাঁদতে সব বলল। তিনি বললেন,’দেখ মা তোমাদের তো এখন বিয়ে হয়ে গেছে। আমার ছেলেটাকে তুমিই পারবে ঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। মা হয়ে আমি তোমার কাছে এটুকুই চাই।’

‘কিন্তু আপনারা মিথ্যা বলে এই বিয়েটা কেন দিয়েছেন?? আমার পরিবার ওরকম নয়। মা এটা জানতে পারলে তো এখুনি নিয়ে যাবে আমাকে।’

সায়েনের শ্বাশুড়ি অনেক আকুতি মিনতি করলেন যেন সায়েন কাউকে কিছু না বলে। বিয়ে তো হয়েই গেছে এখন তো আর কিছু করার নেই। সায়েন ও ভাবলো যে সে রাহাতকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু তা আর হলো না। সেদিন রাতেই রাহাত বাজে নেশা করে বাড়িতে ফিরলো। সায়েন সেদিনই জানতে পারলো যে রাহাত চাকরির পাশাপাশি ড্রাগস সাপ্লাইয়ের কাজও করে। সায়েন সেদিন খুব কেঁদেছিল। শেষে ওর ভাগ্যে এই ছিল??
আমাদের দেশে এরকম অনেক মানুষ আছে যারা মিথ্যা বলে একটা সম্পর্ক তৈরি করে। ছেলে যদি দশ হাজার টাকা বেতন পায় পরিবার বলবে বিশ হাজার। ছেলের সব দোষগুলো ঢেকে তারা মেয়ের দোষ খুঁজবে। এরকম মিথ্যা দিয়ে হাজারো বিয়ে হয়। মেয়েটা যখন সব জানতে পারে তখন সম্পর্কে বাঁধা পরে যায় তারা। সেখান থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। ভালো হোক খারাপ হোক,সংসারের টানে ঠিকই সব সয়ে যায়। এরকম একটা ঘটনার শিকার সায়েন।স্বামী সম্পর্কে সত্য জানতে পেরে খুবই খারাপ লাগছে সায়েনের। তবুও সে পরিবারকে কিছু বলে নি। বিয়ে হয়েছে মাত্র ক’দিন হলো। এর মধ্যে এসব বলা ঠিক হবে না ভেবে সায়েন চুপ করে গেল। রাহাতকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার জন্য তৈরি হচ্ছে সায়েন।

কিন্তু তার পরেরদিন হলো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। বাড়িওয়ালার মেয়ের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে রাহাতকে। সেদিন আর চুপ থাকতে পারেনি সায়েন। কষে চড় মেরে দিয়েছে রাহাতের গালে। এতদিন নিজেকে সামলে রাখলেও এখন আর সামলাতে পারলো না রাহাত। শক্ত হাতে সায়েনের চুলের মুঠি ধরে বিশ্রি গালি দিয়ে বলল,’অনেক হয়েছে!! তোকে আর সহ্য হচ্ছে না আমার। আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন। মেয়ে মানুষ থাকবি চুপচাপ এতো হাইফাই হওয়ার কি দরকার??বিয়ের দু’দিন যেতে না যেতেই অধিকার খাটানো হচ্ছে??’
রাহাত টানতে টানতে সায়েনকে রুমে নিয়ে আসলো। কিন্তু মারতে পারলো না। তার আগেই সায়েনের শ্বশুর শাশুড়ি এসে ছাড়িয়ে নিলো। রাহাতকে ওর বাবা টেনে বাইরে নিয়ে গেল। সায়েন গলা উঁচিয়ে ওর শ্বাশুড়িকে বলল,’এসব কি মা??একটার পর একটা অপকর্ম দেখতে পাচ্ছি আপনার ছেলের আমি। আরও কত কি লুকিয়েছেন আপনারা বলবেন কি??আমি এবার পুলিশের কাছে কম্প্লেইন করব??’
সায়েনের শ্বাশুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘এরকম করো না মা!!আমরা ভেবেছিলাম বিয়ে করলে রাহাত ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ও তো ঠিক হচ্ছে না। আসলে এই বাড়িতে আসার পর বাড়িওয়ালার মেয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয় রাহাতের। কিন্তু বাড়িওয়ালা জানতে পারে যে রাহাত বাজে নেশা করে খারাপ কাজ করে তাই তিনি তার মেয়েকে সরিয়ে নেন। মেয়ের থেকে আমার ছেলেকে দূরে রাখার জন্য চাকরি দেয় এবং তার বন্ধুর সাথে কথা বলে তোমার সাথে বিয়ে ঠিক করিয়ে দেয়। কিন্তু এতেও তো আমার ছেলে ঠিক হলো না।’
সায়েনের এবার ভিশন রাগ হলো। চিৎকার করে বলল,’উনি বললেন আর আপনারা সব লুকিয়ে গেলেন?? একবার আমার কথা ভাবলেন না। আমিও তো আপনার মতোই একজন মেয়ে। আমাদের দেশে কিছু কিছু মায়েরা আছে যারা বিয়ের পর মেয়েদের বলে সব মানিয়ে নিতে। স্বামী শ্বাশুড়ি খারাপ হলেও সব মানিয়ে নিতে বলে। আর এভাবে মানিয়ে নিতে নিতে বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। কিন্তু আসলেই কি মানিয়ে নেওয়া যায়??নাহ বলতে পারেন সহ্য হয়ে যায়। কিন্তু আমার মা তা শেখায়নি। আমার মা আমাকে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন। আমি সেটাই করব। আপনারা সবাই মিলে আমাদের ঠকিয়েছেন।’

সায়েন ফোন হাতে নিয়ে ওর মা’কে ফোন করলো। কিছু বলার আগেই রাহাত এসে ফোনটা কেড়ে নিলো। এক আছাড়ে গুড়োগুড়ো করে দিলো ফোনটা। বিশ্রি গালি দিতে লাগল সায়েনকে। সায়েনও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। রাহাত ড্রয়ার থেকে সিরিঞ্জ বের করে এনেই পুশ করে দিলো সায়েনের হাতে। মাথা ঘুরছে সায়েনের। সিরিঞ্জে ড্রাগস ছিলো। তা সায়েনের শরীরে যেতেই শরীর খারাপ হতে লাগলো সায়েনের। অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত হসপিটালে ভর্তি করা হয় সায়েনকে। খবর পেয়ে ছুটে আসে সায়েনের পরিবার। সেদিন হসপিটাল থেকে সায়েন শ্বশুর বাড়িতে ফেরেনি। জয়নব বেগম নিয়ে যান সায়েনকে।

বেশ কিছুদিন সায়েন অসুস্থ থাকে। তবে সেটা সবকিছু বলে দেয় জয়নব বেগমের কাছে। সব শুনে সবাই অবাক হয় সেদিন। কারণ রাহাতকে দেখে কখনো এরকম মনে হয়নি। আর সেই রাহাত কি না এতোটা জঘন্য?? থেমে থাকেনি কেউ!!রাহাতের নামে কেস করা হয়।

ছোট একটা দূর্ঘটনা সারাজীবনের জন্য দুঃখ বয়ে আনে। সায়েনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।আরাদকে সে ভালোবেসেছে। তবে হারিয়ে ফেলেছে। আরাদ নিজে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। মাঝখানে সায়েনের সবকিছু ওলট পালট হয়ে গেছে। বিচ্ছেদ,এই জিনিসটা প্রত্যেকটা মেয়ের কাছে অতি ভয়ংকর। ইচ্ছাকৃত ভাবে বিচ্ছেদ না ঘটাতে চাইলেও তা ঘটে যায়। রাহাতের প্রতি অনুভূতি তৈরি হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। আর আরাদের প্রতি তৈরি হওয়া অনুভুতি গুলো এখনও মনের এক কোণে রয়ে গেছে তার।

কিন্তু এখন সায়েনের মনে হচ্ছে সবকিছুর জন্য আরাদ দায়ী। ওর একটা মিথ্যার জন্য এতকিছু। নিজের রুমে বসে অশ্রু ফেলছে সায়েন। এমন সময় সায়েনের বাবা মা ভাই এলো। সায়েন এক ছুটে গিয়ে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে বলল,’বিশ্বাস করো মা আমার সাথে আরাদের কোন অবৈধ সম্পর্ক ছিল না। আমি খারাপ কিছুই করিনি। তোমরা যা কিছু শুনেছো সব মিথ্যা। অন্তত এবার আমার কথা বিশ্বাস করো??’
কাঁদতে কাঁদতে সব বলে দিলো সায়েন। সবাই একটু অবাক হলো। কারণ রাহাতের কথা না বলে আরাদের কথা বলছে!!জয়নব বেগম সায়েনকে দাঁড় করিয়ে বললেন,’অনেক হয়েছে। আমার মেয়ে আমাদের জন্যই এত কষ্ট সহ্য করছে। তবে আর না। আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাব।’
বলে তিনি মেয়েকে জড়িয়ে নিলেন। শাফিন এসেও মা’কে জড়িয়ে ধরলো। সবার মুখে আগের মতোই হাসি ফুটে উঠলো।

অনেক দিন পর সায়েন হাসলো। কিন্তু ওর গায়ে যে আবার দাগ লাগতে চলেছে। শিঘ্রই রাহাতকে ডিভোর্স নোটিশ পাঠানো হবে। ডিভোর্স কোন নারীর কাছেই সুখবর নয়। একরাশ কষ্ট লুকিয়ে আছে এই শব্দটার মধ্যে। জয়নব বেগম প্রতিবাদী মহিলা। তাই তিনি কাউকে ছাড় দেননি। দুই বাড়িওয়ালার উপর ও কেস ফাইল করেছেন তিনি। এভাবে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার জন্য।

__________

অনেকদিন পর মায়ের সান্নিধ্য পেয়েছে সায়েন। বাবা আগের মতই সায়েনের সাথে কথা বলে। শাফিনের সাথে খুনসুটি করে বেড়ায় আগের মতোই। মাঝেমাঝে সায়েন ভাবে কি হতো যদি বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ না হতো??এক সপ্তাহ ওর জীবন থেকে সারাজীবন কেড়ে নিলো!! স্বাভাবিক থাকতে চাইলেও তা পারছে না সায়েন। পরপর দুটো ধাক্কা খেয়েছে সে। একটা ভালোবাসার মানুষের থেকে আরেকটা স্বামীর থেকে।

বাড়িতে সায়েন আর ওর মা আছে। শাফিন ফেরেনি। শফিকুল ইসলাম দোকানে। কলিং বেল বাজতেই জয়নব বেগম দরজা খুলে দিলেন। রাহাতকে অসময় দেখে তিনি অবাক হলো। রাহাতের চোখদুটো লাল হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে নেশা করে এসেছে। জয়নব বেগম ফুঁসে ওঠে বললেন,’তুমি এখানে কেন এসেছো??চলে যাও।’

রাহাত রুমে ঢুকে সায়েনকে ডাকতে লাগলো। রাহাতের গলার স্বর শুনে দ্রুত রুম থেকে বের হয় সায়েন। রাহাত সায়েনের হাত ধরে বলল, ‘এতো সাহস তোর?? আমার নামে কেস ফাইল করিস!! আবার ডিভোর্স নোটিশ পাঠাস??চল বাড়িতে??তোকে আমি ছাড়বো না। বিয়ে হয়েছে তো হয়েছেই। চল!!!’

‘আমি যাব না। আপনার মতো জঘন্য ব্যক্তির সাথে সংসার করা যায় না বুঝেছেন।’

‘কি বললি?? আমার সাথেই তোকে সংসার করতে হবে বুঝেছিস??’

জয়নব বেগম এসে রাহাতকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। রাহাত রাগন্বিত হয়ে জয়নব বেগমকে বলল,’আমাকে ছাড়ুন, আমার রাগ উঠাবেন না। তাহলে আপনি কে তা আমি ভুলে যাব।’
জয়নব বেগম ঠাঁটিয়ে চড় মেরে দিলো রাহাতের গালে। চেঁচিয়ে বলল,’তোমার সাহস তো কম নয় আমাকে হুমকি দাও!! তোমার পুরো পরিবারকে জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ব আমি বেয়াদব কোথাকার। ছাড়ো আমার মেয়েকে??’

রাগে রাহাত হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। এমনিতেই সে প্রচুর নেশা করে এসেছে। মাথাও ঠিক নেই। তার উপর সায়েনের মায়ের কথাগুলো হজম হলো না ওর। রাগের বশেই একহাতে গলা চেপে ধরে সায়েনের মায়ের।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২১

রাহাতের এরকম আচরণে অবাক হয় সায়েন। নেশার ঘোরে এসব করছে কি??সায়েন দুহাতে রাহাতকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেছে। কিন্তু রাহাত ছাড়ছে না। সায়েন চিৎকার করে বলল,’কি করছেন ছাড়ুন আমার মা’কে?? এতটা নিচে নেমে গেছেন যে কাউকে মারতেও হাত কাঁপছে না আপনার?? ছাড়ুন মা’কে??’

রাহাতের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। সায়েনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দুহাতে চেপে ধরল জয়নব বেগমের গলা। চোখ উল্টে আসছে জয়নব বেগমের। শ্বাসকষ্ট ও শুরু হয়ে গেছে। মা’কে এমতাবস্থায় দেখে সায়েনের মাথা ঘুরে গেল। চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে লাগল। আশেপাশের মানুষ আসতে আসতে হয়তো জয়নব বেগম মরেও যেতে পারে। এসব চিন্তা করে সায়েন দৌড়ে রান্নাঘর থেকে ছুরি নিয়ে এলো। ভাবলো ভয় দেখিয়ে রাহাতকে সরাবে। সায়েন রাহাতের হাত টানতে টানতে বলল, ‘ছাড়ুন নাহলে কিন্তু আমি ছুরি চালিয়ে দেব??মায়ের জন্য আপনাকে আঘাত করতে আমার এতটুকুও হাত কাঁপবে না।’

রাহাত এতে আরও রেগে গেল। একহাত দিয়ে সায়েনের গলাও চেপে ধরল। গর্জে উঠে বলল,’আমাকে মারবি তুই?এতো সাহস তোর?? আজকে মা মেয়ে দু’টোকেই শেষ করে দেব।’
সায়েনের শক্তি লোপ পেয়ে গেল। এখন সে নিজেকে বাঁচাবে নাকি মা’কে বাঁচাবে??এসব ভাবতে ভাবতে হাত নাড়াতে লাগলো সে। হাতাহাতির এক পর্যায়ে সায়েন ছুরি চালিয়ে দিলো রাহাতের গলায়। ধারালো ছুরি পুরোই গেথে গেছে রাহাতের গলায়। ঝর্ণার মতো রক্ত পড়তে লাগলো রাহাতের গলা দিয়ে। শরীরের সব ভর ছেড়ে দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল রাহাত। জয়নব বেগমও ততক্ষণে মেঝেতে পড়ে গেছে।
হাত-পা ছুড়াছুড়ি করতেছে রাহাত। ছুরি হাতে নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে সায়েন। আকাশি রঙের শার্ট টা মুহূর্তেই রক্তলাল হয়ে গেল। সায়েন পারছে না নড়তে। পাদুটো জমে গেছে যেন। জয়নব বেগমের স্থির দেহের দিকে এক পলক তাকিয়ে সায়েন ও মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। খুন খারাবি রক্ত সে দেখতেই পারে না। তারউপর নিজেই খুন করে ফেলেছে। মাথা চক্কর দিয়ে উঠে সায়েনের তাই সে জ্ঞান হারায়।

যখন সায়েনের জ্ঞান ফিরলো নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলো। পাশে শাফিনকে বসা দেখে উঠে বসেই জাপটে ধরে শাফিন কে। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সায়েন। শাফিনের চোখেও পানি। সায়েন বলল,’ভাইয়া আমি খুন করে ফেলেছি। ওই খারাপ লোকটাকে মেরে ফেলেছি আমি। বিশ্বাস কর ইচ্ছে করে মারিনি। ও তো মা’কে,,,,,’

মায়ের কথা মনে পড়তেই সায়েন সোজা হয়ে বসলো বলল,’ভাইয়া মা কোথায়??মা ঠিক আছে তো??’
শাফিন চুপ করে আছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে শাফিনের। সায়েন শাফিনকে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে কিন্তু শাফিন উওর দিচ্ছে না। সায়েন অস্থির হয়ে হয়ে গেল। উঠে দৌড়ে বাইরে যাওয়ার আগেই শাফিন ওকে টেনে ধরল বলল,’কোথায় যাচ্ছিস??’

‘আমি মায়ের কাছে যাব।’

শাফিন ক্রন্দনরত কন্ঠে বলল,’মাকে পোস্টমর্টেম এর জন্য নিয়ে গেছে সায়েন।’

সায়েন ঢলে পড়ল শাফিনের গায়ে কিন্তু জ্ঞান হারালো না। শাফিনের শার্ট আঁকড়ে ধরলো সায়েন। মায়ের মৃত্যু টা মানতে পারলো না সে।শাফিন বলল,’হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলাম মা’কে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। আমাদের আসতে দেরি হয়ে গেছে।’

সায়েন আর টু শব্দটি করতে পারলো না। গলায় যেন কেউ পাথর বসিয়েছে। তাই সায়েন কথা বলতে পারছে না শুধু চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরছে। সায়েনকে সামলিয়ে বাইরে নিয়ে আসে শাফিন। পুলিশ এসেছে বাড়িতে। ঘাবড়ালো না সায়েন কারণ সে জানতো যে এমনটাই হবে। আশেপাশে তাকিয়ে সে বাবাকে খুঁজলো কিন্তু পেল না। শাফিনের থেকে জানতে পারল যে শফিকুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি হসপিটালে ভর্তি। এতবছর একসাথে থেকে নিজের স্ত্রীর মৃত্যু তিনিও মেনে নিতে পারেননি।
পুলিশ নিয়ে যায় সায়েনকে। যাওয়ার আগে সে অশ্রুসিক্ত নয়নে শাফিনের দিকে তাকিয়ে ছিল শুধু।
মায়ের লাশ দেখাতে আনা হয় সায়েনকে। সেদিন সায়েন কাঁদেনি অধিক শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিল সেদিন। দুচোখ ভরে মা’কে সেদিন শেষ দেখা দেখেছিল সায়েন। সেই মুখটা আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে সায়েনের। এখনও নিজের শরীরে মায়ের গন্ধ পায় সে।
কোর্টে দু’পক্ষের লড়াই হয়। খুনের দায়ে চার বছরের জেল দেওয়া হয় সায়েনকে। খুনটা ইচ্ছাকৃত হয়নি তবুও খুন তো হয়েছে তাই সায়েন একজন দোষী। সেজন্য শাস্তি হয় সায়েনের। রাহাতও দোষী সাব্যস্ত হয়। কিন্তু সে তো আর বেঁচে নেই। তার শাস্তি এমনিতেও পেয়ে গেছে সে। সায়েনের বাবা উকিলের সাথে কথা বলে জেলে থেকেই পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেন। কারণ চারবছর পর তার মেয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে??এই দায় তো আদালতকেই নিতে হবে। তাই উপর থেকে অনুমতি নিয়েই সায়েন পড়াশোনা শুরু করে। প্রথমে সায়েন অমত করলেও মায়ের ইচ্ছার কথা ভেবে পড়াশোনা শুরু করে সায়েন।

একবছর পর সায়েনকে রংপুর থানা থেকে ঢাকা থানায় ট্রান্সফার করা হয় এবং সেখানে আবার পড়াশোনা করতে দেওয়া হয়। সায়েন কে ঢাকা আনাতে শাফিনও বাবাকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি দেয়। কিন্তু নিজের বাড়িতে ফেরেনি। বাসা ভাড়া নিয়েছে সে। আগের বাড়িতে তো মা’কে নিয়েই থাকত। মা ছাড়া এখন থাকবে কিভাবে?? বাবাকে নিয়ে সে একাই থাকে। সাথে নতুন চাকরি ও পেয়েছে সে। এই ভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল আরো দু’বছর।

_________________

টেবিলের উপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বসে আছে সায়েন। ওর সামনেই চেয়ারে আকাশ বসে আছে। এতক্ষণ সে পুরো ঘটনাটা শুনেছে সায়েনের থেকে। যদিও অনেকবার জানার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। তবে আজকে হয়েছে। সায়েনের পরীক্ষা শেষ হতেই আকাশ সায়েনের থেকে সবটা জানার চেষ্টা করতে থাকে। ফলস্বরূপ আজকে সব বলেছে সায়েন। আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল,’তো তুমি এসব কিছুর জন্য আরাদকে দায়ী করছো তাই তো??’

মাথা তুলে তাকালো সায়েন। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না যে সায়েন এতক্ষণ কষ্টের কথা বলেছে। চোখের পানিও পড়ছে না সায়েনের। মৃদু হেসে সায়েন বলল,’নাহ,সব দোষ আমার ভাগ্যের। ভাগ্যে লেখা ছিল এসব তাই হয়েছে।’

আকাশ এবার সরাসরি প্রশ্ন করে,’ভালোবাসো আরাদকে??’

‘ভালোবাসতাম, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ভালোবাসা চলে গেছে। এখন শুধু ওই লোকটার প্রতি একরাশ ঘৃণা আছে।’

আকাশ পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। তারপর সায়েনের সামনে রেখে বলল,’সেদিন যেই লোকটা আরাদের নামে বাজে কথা বলেছিল এটা কি সে??’
ফোনের স্ক্রিনে চোখ দিলো সায়েন। দেখা মাত্রই ফাহিমকে চিনতে তার অসুবিধা হলো না। মাথা নাড়ল সায়েন,মানে এটাই সে। আকাশ ফোনটা আবার পকেটে রেখে বলল, ‘তুমি জানো এই লোকটা কে??ফাহিম,যার সাথে আরাদের কঠিন শত্রুতা। তুমি না জেনেই আরাদকে ভুল বুঝেছো।’

সায়েন হাসলো বলল,’মানলাম ওনার শত্রু। কিন্তু স্মৃতি হারানোর নাটকটা কি মিথ্যা??’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আকাশ বলল,’নাহ,আরাদ তোমাকে ভালোবাসে বলেই এই নাটকটা করেছে। এর মধ্যে ওর কোন খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। তোমারা ভুল করেছিলে। সেদিন যদি আরাদের থেকে সবটা জানতে তাহলে এসব হতো না।’

সায়েন কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে কাঠের টেবিলটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ক্লাস টপারদের মধ্যে জনম জনমের শত্রুতা থাকে এটা কি জানেন??’
ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো আকাশের। কি কথা হচ্ছে আর সায়েন কি বলছে??

‘বুঝতে পারলেন না তাই তো?? যখন পরীক্ষা শেষ হওয়ার দশ মিনিট সময় থাকে তখন পুরো হলের কেউ শেষের প্রশ্নের উত্তর করতে পারে না। সবাই শুধু এদিকে ওদিকে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায়। তখন যে যা বলে তাই খাতায় লেখা শুরু করে সবাই। সত্যতা যাচাই করার সময় তখন কারো থাকে না। এমনকি ক্লাস টপাররাও একে অপরের বন্ধু হয়ে ওঠে তখন। তখন কেউ এটা দেখে না যে আদৌ উওর গুলো কি সঠিক??এরকমই একটা পরিস্থিতি তখন হলের ভেতরে তৈরি হয়। সেরকমই মানুষের জীবনেও এরকম একটা পরিস্থিতি আসে,তখন শত্রুর বলা কথাগুলো ও সত্যি মনে হয়। আমাদের ও সেরকম হয়েছিল। ওই পরিস্থিতিতে কোনটা সঠিক কোনটা ভুল তা বোঝাই মুশকিল ছিল। সত্যি জেনেই বা কি হতো?? আমার গায়ে লাগা কলঙ্কের দাগটা তো উঠতো না।’

আকাশ খুব মনোযোগ দিয়ে সায়েনের কথাগুলো শুনলো। ঠিকই বলেছে সায়েন। মানুষ মাঝেমাঝে এরকম পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। তখন সত্য মিথ্যা যাচাই করার মন মানসিকতা থাকে না। তখন শত্রুদের কেও মিত্র মনে হয়। ওইসব পরিস্থিতিতে খুব কম মানুষই বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে। সবার মধ্যে এই ধৈর্য টা থাকে না।

আকাশ আবারো বলল,’হুম বুঝলাম। কিন্তু তুমি এতে আরাদকে কেন দোষী ভাবছো??’

‘দোষী তো বলিনি আমি!!আমি শুধু বলেছি আমি তাকে ঘৃণা করি। কারণ জানতে চাইবেন না। এটা আমি বলতে পারছি না। আমার ব্যক্তিগত বিষয় এটা।’

‘তোমার কথাগুলো এটাই বলছে সায়েন। তুমি আরাদকে দোষী ভাবছো। হ্যা এটা ঠিক যে আরাদের কারণে তোমাকে অপমানিত হতে হয়েছে। যদি তুমি আরেকটা দিন অপেক্ষা করতে তাহলে কিছুটা হলেও ঠিক হতো। কিন্তু সেটা হয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো তোমার পরিবার না জেনে শুনে ওইরকম একটা খারাপ ছেলের হাতে তোমাকে কিভাবে তুলে দিলো?? তাদের একবার দেখা উচিত ছিল।’

‘ভালো করে দেখেনি বলে এই না যে আমার পরিবার আমার ভালো চায় না!!তারা আমার ভালো চায়। সব পরিবারই তাদের মেয়েদের ভালো ঘরে বিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সবাই কি পারে??শত দেখার পরও এক প্রতারকের খপ্পরে ঠিকই পড়ে যায়। আশেপাশে তাকালে এরকম অনেক মেয়েকেই দেখবেন। মেয়ের নামে ঠিকই সঠিক তথ্য নেবে কিন্তু ছেলের বিষয়ে সম্পূর্ণ জানাবে না। কেউ যদি নিজের সম্পর্কে জানাতে না চায় তাহলে তার থেকে কি আদৌ সবকিছু জানা সম্ভব??আপনার মনে কি আছে তা কি আমি জানি??’

আকাশের বুকটা ধক করে উঠল। সত্যি তো ওর মনে যে সায়েনের প্রতি ভালোবাসা আছে তা কি সায়েন জানে??সবাই সবার মনের কথা পড়তে পারে না। তাইতো আকাশের মনের বদ্ধ অনুভূতি গুলো প্রকাশ করতে পারেনি। সব কথা বদ্ধই থেকে গেছে। আকাশ নিজেকে সামলিয়ে বলল,’তাহলে তুমি মানছো যে এতে সম্পূর্ণ দোষ আরাদের নয়।’

সায়েন এবার বেশ রেগে গেল। বারবার আরাদের নামটা শুনতে ওর ভালো লাগছে না। বেশ রেগেই সায়েন বলল,’বারবার এক কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?আমি তো বলছি যে ওই লোকটাকে আমি ঘৃণা করি। তারপরও এতো কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন??আমি আর কিছু বলতে ইচ্ছুক নই।’

আকাশ বুঝলো যে সায়েন এর থেকে বেশী কিছু বলবে না। তাই সে বেরিয়ে আসলো। সায়েনকে নিজের কক্ষে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের কেবিনে এসে বসলো আকাশ। সামনের চেয়ারে আরাদ বসা। এতক্ষণ মাইক্রোফোনে সবটাই শুনেছে। ওর প্রতি সায়েনের এতটা ঘৃণা তা জেনে অবাক হয়নি আরাদ। এটা তো হওয়ার ছিল। কিন্তু সায়েনের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যে ভোলার নয়। সায়েন কিভাবে এসব ভুলবে??মনের মধ্যে যে আঠার মতো লেগে আছে। বারবার পুরোনো স্মৃতির মধ্যে বিচরণ করছে সায়েন। আকাশের কথায় ধ্যান ভাঙল আরাদের।

‘তুই চিন্তা করিস না আরাদ। আমার বিশ্বাস সায়েন তোকে এখনও ভালোবাসে। ওর ঘৃণা তোর ভালোবাসা দিয়ে মুছে ফেল আরাদ। মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। শুধুমাত্র তুই পারবি ওর কষ্টগুলো ধুলিসাৎ করতে।’

আরাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,’আমার উকিলের সাথে কথা হয়েছে। কোর্টে খুব শিগগিরই কেস উঠবে। তবে আমি যে এসব করেছি সেটা যেন সায়েন ও তার পরিবারের কেউ জানতে না পারে। সেদিকে খেয়াল রাখিস। আই হোপ খুব তাড়াতাড়ি সায়েন ছাড়া পাবে। আমি আসছি।’

আরাদ উঠে দাড়াতেই আকাশ বলে উঠলো, ‘এরপর কি করবি??মানে ফাহিম,,,,,’

মুখে লাল আভা ফুটিয়ে আরাদ বলল,’জ্যান্ত পুঁতে ফেলব ওকে। ও হাত বাড়িয়েছে কার দিকে সেটা একবার ওর ভেবে দেখা উচিৎ ছিল ওর।’

আকাশ চুপ করে গেল। আরাদ অনেকটাই জেদি তা ভালো করেই জানে সে। এজন্য আকাশ প্রায়ই বলত তার জায়গায় আরাদ পুলিশ হলে ভালো হতো। একদিনেই ক্রিমিনালদের পিটিয়ে দফা রফা করে দিতো। যদিও মারামারি আরাদের পছন্দ নয়। এর আগেও অনেকবার ফাহিমকে ছেড়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু এবার আর ছাড়বে না। বিজনেস নিয়ে কোন সমস্যা করলে কিছুই বলতো না আরাদ। কিন্তু সায়েনের সঙ্গে ও যা করছে তার শাস্তি সে ফাহিমকে দেবেই। কেবিন থেকে বের হওয়ার আগে পেছনে না ঘুরেই আরাদ বলল,’সায়েন আমার কাছে ফিরে আসুক এটা আমি খুব করে চাই। কিন্তু আমি জানি এটা কখনো হবে না। আমি সায়েনকে হ্যাপি দেখতে চাই। এমন একটা মানুষের সাথে দেখতে চাই যে সে সায়েনকে একদম আমার মতো করে আগলে রাখবে। ভালোবাসবে আমার থেকে বেশি। আর সেই মানুষটি তুই।’

বলতে বলতে আরাদ কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। আকাশ মৃদু হাসলো। কলেজ লাইফ থেকেই বন্ধুদের জন্য নিজেকে উগ্রে দিতো আরাদ। শার্ট থেকে খাতা কলম সবকিছু শেয়ার করতো আরাদ। বিশেষ করে রাফিন, যার সবসময় আরাদের সানগ্লাস পছন্দ হতো। যখনই আরাদ নতুন কোন সানগ্লাস কিনেছে তো রাফিনের পছন্দ হয়ে গেছে। সেটা ওর চাই ই চাই। আরাদ হাসিমুখে দিয়ে দিত। কিন্তু আকাশ ওরকম ছিলো না। এমন নয় যে সে আরাদের জিনিসপত্র পছন্দ হতো না। পছন্দ হতো তবে ও হুবুহু সেরকম একটা কিনে নিতো। শুধু আকাশ নয় সব বন্ধু্রাই একই ড্রেস পড়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। কিন্তু ভালোবাসার মানুষের ক্ষেত্রেও যে দুজনে এক হয়ে যাবে তা ভাবতে পারেনি আকাশ। কিন্তু অবাকের বিষয় যে এবারও নিজের অদম্য ইচ্ছা কে কোরবানি করে দিয়েছে। আকাশ নিজে নিজেই বলে উঠলো,’সায়েনকে মানাবি কিভাবে তুই??ও যে এখনও তোকে ভালোবাসে। ওর চোখের ঘৃণার আড়ালে থাকা ভালোবাসা যে স্পষ্ট দেখেছি আমি।’

পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়েই আরাদ ফোন দিলো জোনায়েদকে। ফাহিমের ব্যাপারে সব খোঁজ লাগাতে বলল আরাদ। জোনায়েদ সব আগে থেকেই জানতো। তাই ও সব জায়গায় খোঁজ পাঠিয়ে দিলো। আরাদ কড়া গলায় বলল,’চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ফাহিমকে আমার গোডাউনে চাই। ওকে বোঝাব যে ভালোবাসলে মানুষ যেমন দূর্বল হয়ে যায় তেমনি কঠোর ও হতে পারে। আরাদের হিংস্রতা ওকে আজ ভালো ভাবেই বুঝিয়ে দেব আমি।’

ফোন কেটে গাড়ি স্টার্ট দিলো আরাদ। সোজা বাড়িতে গেলো। রাগ হচ্ছে ওর খুব। কোনমতে নিজেকে সামলিয়ে নিজের রুমে গেল। কিন্তু রুমে গিয়ে ওর রাগটা চড়ে গেল। কারণ সামিউক্তা ওর খাটের উপর বসে বসে ফোন চালাচ্ছে। যেখানে আরাদ নিজের রুমে ওর বোনদের ও এলাও করে না সেখানে সামিউক্তা!!শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে তেড়ে গেল আরাদ।

#চলবে,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here