চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ২৫+২৬+২৭

0
41

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২৫

‘ভালোবাসা হলো দিল্লিকা লাড্ডুর মতো যে খাবে সে পস্তাবে আর যে না খাবে সেও পস্তাবে।’

‘তাহলে লাড্ডু খেয়ে পস্তানোটাই ভালো।’

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সায়েন। আরাদ কিছুটা বাঁকা হয়ে পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে।আরাদকে দেখা মাত্রই আরশি আর তনয়া রুম থেকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। সায়েন ভ্রু কুচকালো,ওরা এভাবে চলে গেল কেন?? ওদের চলে যেতে দেখে সায়েন অবাক হয়ে গেল। ততক্ষণে আরাদ ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সায়েনকে ধ্যানে মগ্ন দেখে ওর চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলল,’কি ভাবছো??দিল্লিকা লাড্ডু,খেয়েছো কি??’

সায়েন আরাদের দিকে বিরক্তি চোখে তাকালো। আরাদ মেকি হাসি দিয়ে বলল, ‘ভালোই তো ভালোবাসার মিনিং বলতে পারো। তবে তা বুঝতে পারো না। যদি বুঝতে পারতে তাহলে আমাদের মধ্যে এত দূরত্ব হতো না।’

আরাদের কথা সায়েন কানেই নিলো না। উল্টে বলল,’আপনাকে দেখে ওরা এভাবে চলে গেল কেন??’
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো আরাদ। ও বলছে কি আর সায়েন বলছে কি??একটু আগে আরশি আর তনয়া এসে সায়েনের যাবতীয় জিনিসপত্র দিতে এসেছিল। বড় একটা ব্যাগে জামাকাপড় দিয়ে গেছে এছাড়া আরও সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তনয়া এসেই গল্প জমিয়েছে সায়েনের সাথে। কালকের মতো অস্বস্তি লাগেনি সায়েনের তাই টুকটাক উওর দিচ্ছিল। এর মধ্যেই তনয়া প্রশ্ন করে বসে ভালোবাসা মানে কি??সায়েন প্রথমে না বলতে চাইলে ও তনয়ার জোরাজুরিতে বলতে বাধ্য হলো। দিল্লির লাড্ডুর সাথে সে ভালোবাসার তুলনা করেছে সেই সাথে আরাদের কড়া জবাব ও পেয়ে গেছে। আরাদ সায়েনের হাত ধরে নিচে নিয়ে এলো। সায়েন হকচকিয়ে গেল বলে উঠলো, ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে??’

আরাদ পিছনে না তাকিয়ে জবাব দিলো, ‘ব্রেকফাস্ট করবে না??আমি তো অফিসে যাব। ভাবলাম একসাথে ব্রেকফাস্ট করি।’

ডাইনিংয়ে সায়েনকে বসিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসলো আরাদ। সায়েন মাথা নিচু করে বসে আছে ফলে কার মুখের ছাপ কেমন তা দেখতে পাচ্ছে না। নিলিমা বেগম চুপচাপ আরাদকে খাবার বেড়ে দিলো কিন্তু সায়েনকে দিলো না। আরাদ নিজেই সায়েনকে খাবার বেড়ে দিলো। সায়েনের ভালো লাগছে না। আনইজি ফিল করছে এত মানুষের সামনে খেতে। আরাদ সায়েনকে আস্বস্ত করে বলল, ‘সবাই আমার পরিবারের লোক। খেয়ে নাও,আস্তে আস্তে দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।’

সায়েন মাথা নেড়ে প্লেটে হাত রাখলো। আরাদ জলদি খেয়েই চলে গেল। সায়েনের তখনও খাওয়া শেষ হয়নি। আরাদ ওকে নিজের রুমে যেতে বলেই চলে গেছে। ওর অফিসে কাজ আছে। আরশি আর তনয়া ভার্সিটিতে চলে গেছে। সায়েন ভালো করে খেতে পারলো না। অর্ধেক খেয়েই উঠে পড়লো। উঠে দাড়াতেই ওর চোখ পড়লো হাসি বেগমের উপর। তিনি গভীর দৃষ্টিতে সায়েনকে দেখছে। সাথে সাথে সায়েন তার দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। চলে আসতে নিলেই হাসি বেগম বলে উঠলেন,’দাড়াও তোমার সাথে আমার কথা আছে।’
সায়েন দাঁড়িয়ে পড়লো। হাসি বেগম সায়েনকে সোফায় বসতে বললেন। সোফার এক কোণে আঁটসাঁট হয়ে বসলো সায়েন। হাসি বেগম বললেন,’শুনেছি তোমার স্বামীকে তুমি নিজেই খুন করেছো??’

সায়েনের বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। আবার সেই পুরোনো কথা!!যা ওর ভেতরটা শেষ করে দেয়। স্বামী নামক নরপিশাচের কথা সে শুনতেই চায় না। তবুও সে বলল,’ওটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল। আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি,,,,’
সায়েনকে থামিয়ে দিল হাসি বেগম বললেন, ‘ইচ্ছা করেছো বলেই মারতে পেরেছো নাহলে কি স্বামীকে কেউ মারতে পারে?যাই হোক কাজের কথায় আসি। আরাদ তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে তা আমরা কেউই মানতে পারছি না। আচ্ছা তুমিই বলো বাইরের কোন মেয়ে যদি তোমাদের বাড়িতে থাকতে চায় তুমি কি থাকতে দেবে??’
সায়েনের এবার কান্না আসছে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে সায়েন মাথা নাড়লো। হাসি বেগম আবার বললেন,’কিছু মনে করো না আমি সেরকম ভাবে বলনি। বলতে চাইছি তোমার মতো প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে। এটা আশেপাশের লোকজন কটু চোখে দেখে। আমি শুধু আমাদের মানসম্মান নিয়ে ভাবছি না। তোমার সম্মানের কথা ভেবেও বলছি। এমনিতেও তোমার সম্মান অনেকটাই ধুলোয় মাখানো। বাকিটাও কি তাই করতে চাও??তাই বলছি আরাদকে বলো তোমাকে যেন কোন মহিলা হোস্টেলে যেন রেখে আসে। তাহলেই তো হলো। খরচ যা হয় আমরা দেব এতে কোন সমস্যা নেই।’

হাসি বেগম যে ঠান্ডা মাথায় সায়েনকে অপমান করেছে তা বেশ বুঝতে পেরেছে সায়েন। এখানে কিছুই বলার নেই সায়েনের। চুপচাপ উঠে সে চিলেকোঠার ঘরেরে দিকে পা বাড়ালো। রুমে গিয়ে দরজা আটকে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠলো সায়েন। তবে হাসি বেগমের সব কথা মিথ্যা নয়। কিছু কথা তিনি সত্যি বলেছেন। আর আরাদ তো সব সত্যি কাউকে বলেনি। তাই ওনারা তো ভুলভাল বুঝবেই। তাই এসব না ভেবে কাঁদায় মন দিলো সায়েন। এখন থেকে তো এই চোখের জলই ওর প্রতিদিনের সঙ্গি। তাই অশ্রুকেই আপন করে নিলো সায়েন।
দুপুরে খাওয়ার জন্য নিচে নামলো না সায়েন। আরাদ বলে গেছে যাতে সায়েনের খাবারটা ওর নিজের রুমে দিয়ে আসে কিন্তু তা কেউ করেনি। সায়েন কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে বিধায় নাওয়া খাওয়া সব ভুলে গেছে। হাসি বেগম ও নিলিমা বেগম ও সায়েনকে নিয়ে মাথা ঘামালো না।
বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙল সায়েনের। আশেপাশের পরিস্থিতি বুঝতে ওর কিছুক্ষণ সময় লাগলো। আরো সময় লাগতো যদি না সে টেবিল ক্লকের দিকে না তাকাতো। অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। সায়েন আস্তে আস্তে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার নিলো। জামাকাপড় ছাদে মেলে দিয়ে এসে সিঙ্গেল সোফায় বসলো। রুমের একসাইডে কাঁচের দেয়াল। সেখান দিয়ে রাস্তা এবং বাড়ির বাগান স্পষ্ট দেখা যায়। এতো আলো ওর ভালো লাগছে না। এই তিন বছরে অন্ধকারকে বন্ধু করে ফেলেছে ও। শুভ্র রঙের পর্দা টেনে দিয়েছে সায়েন। তারপর চুপ করে বসে আছে। চুলগুলো খুলে দিয়েছে। সোফার কিছু অংশ চুলের পানিতে ভিজে গেছে। হঠাৎ একটা হাত সায়েনের চুলে আঙুল ডুবিয়ে দিলো। চমকে উঠলো সায়েন। চোখের পানি মুছে পিছনে তাকালো। আরাদকে এসময় দেখে অবাক হলো সায়েন। সায়েনের বিদ্ধস্ত মুখটা দেখে আরাদ বলে উঠলো,’কি হয়েছে কেদেছো কেন??’

সায়েন উওর দিলো না। বিনিময়ে চোখের পানি ফেলল। আরাদ সায়েনের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,’তোমাকে কাঁদার জন্য এখানে আনিনি সায়েন। তোমার ভাইয়া যদি জানতে পারে তাহলে তোমাকে নিয়ে যাবে। আমি তা চাই না।’
সায়েন কম্পিত কন্ঠে বলল,’আমি এখানে থাকতে চাই না। আমাকে খালামনির বাসায় দিয়ে আসুন না হয় কোন মহিলা হোস্টেলে।’

‘তুমি কি আবার আমার রাগ ওঠাতে চাও??এর পরিণাম কি হবে তা তো জানো নিশ্চয়ই।আর এখানে থাকার সম্পূর্ণ অধিকার তোমার আছে। তুমি আমার কাছেই থাকবে। তোমার চোখের পানির কারণ এখন আমি নই সায়েন। কিন্তু চোখের পানি মুছে দেওয়ার দায়িত্ব টা আমি নেব। তোমার পাশে সবসময় আমি আছি।’
কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে কথাগুলো বলল আরাদ।
কেন জানি ভয় হলো সায়েনের। আগে ভয় পেতো না আরাদকে। কিন্তু শাফিনের বিয়ের দিন আরাদের রাগ দেখে একটু ভয় পায় এখন সায়েন। আরাদ যে এক কথার মানুষ তা সায়েন বেশ বুঝেছে। সায়েনের ভাবনার মাঝেই আরাদ বলে উঠলো,’দুপুরে খাওনি কেন??’
ঈষৎ চমকালো সায়েন। আরাদ জানলো কিভাবে যে ও খায়নি?? তাছাড়া তেমন খিদেও পায়নি সায়েনের। আরাদ বলল, ‘এখানে চুপ করে বসে থাকবে আমি আসছি।’

আরাদ চলে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে আসলো। হাতে খাবারের প্লেট। বাথরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে সায়েনের সামনে বসে। এক লোকমা সায়েনের মুখের সামনে তুলে ধরতেই সায়েন বলে উঠলো,’আমি নিজে থেকেই খেতে পারব।’
বলেই সায়েন প্লেটটা নিতে গেলেই আরাদ সরিয়ে ফেলল। তারপর সায়েনের মুখে খাবার তুলে দিয়ে বলল,’জানি তুমি কেমন খাবে??কথা না বলে চুপচাপ খাও।’
সায়েন আপন মনে খাবার চিবুতে লাগলো। সে দ্বিতীয়বার বলতে চেয়েছিল চলে যাওয়ার কথা কিন্তু কেন যেন সাহস পেল না। চুপচাপ আরাদের হাতে খেতে লাগলো। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়লো। আরাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখল আকাশ দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসির রেখা টেনে আরাদ বলল,’ভেতরে আয়।’
আকাশ ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো। আরাদের হাতে সায়েনকে খেতে দেখে ভালো লাগলো না আকাশের তবুও মুখে হাসি টেনে বলল,’এই অবেলায় খাচ্ছে??’

আরাদ হতাশার শ্বাস ত্যাগ করে বলল,’কি করব বল??ম্যাডাম যে ইচ্ছে করে খায়নি। নিজের পরিবারের কাছে অস্বস্তি বোধ করে।’

আকাশ সোফায় বসতে বসতে বলল,’প্রথম প্রথম এরকম হবে পরে দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।’
আকাশের সামনেই পুরো খাবার খাইয়ে দিল সায়েনকে। হাত ধুয়ে সে উঠে দাঁড়ালো।নিজেই প্লেট নিয়ে চলে গেল নিচে। আকাশ আর সায়েনকে একা রেখে। মূলত আরাদ এটা ইচ্ছে করেই করেছে আকাশের যদি কিছু বলার থাকে সায়েনকে তো বলে দেবে। আরাদ চলে যেতেই আকাশ সায়েনের দিকে তাকালো। সায়েন মাথা নিচু করে বসে আছে। আকাশ বলে উঠলো,’আরাদকে ভুল বুঝো না সায়েন। ও যা করেছে সব তোমার ভালোর জন্য করেছে। সব মেনে নাও দেখবে সব কিছুই ঠিক হয়ে যাবে।’

সায়েন দৃষ্টি নত করেই বলল,’সবকিছু তো আপনি করেছেন। কেন ওনাকে ডাকতে গেলেন?? তাহলে তো এসব হতো না। আমার ভালো করে কাজটা মোটেও ঠিক করেননি আপনি!!’

‘আমি যা কিছু করেছি তোমার ভালোর জন্য করেছি। এতে তুমি যদি আমাকে দোষী ভাবো তাহলে শাস্তি দিতে পারো আমি মাথা পেতে নেব।’
মৃদু হাসলো সায়েন বলল,’আপনাকে শাস্তি দেওয়ার কোন অধিকার নেই আমার। তবে একটা অনুরোধ আপনার কাছে। আরাদকে বলুন যাতে আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসে আমি এখানে থাকতে চাই না।’

‘তুমি এখন নতুন বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছো সায়েন। এই বন্ধন ছেড়া এতো সহজ নয়। সরি আমি এটা আরাদকে বলতে পারব না।’

আকাশ নেমে চলে গেল। দরজার আড়ালে এতক্ষণ আরশি দাঁড়িয়ে ছিল। এখানে আসার কোন ইচ্ছা ছিল না ওর। আকাশকে দেখেই এসেছে। ওদের কথাগুলো শুনেছে সে। তবে রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে আরশি। কিসব বলে গেল আকাশ?কোন বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে সায়েন??আরশি চলে যেতে নিলেই সায়েনের ডাকে পেছনে ফিরে তাকাল সে। সায়েন আরশিকে ভেতরে আসতে বলল‌। আরশি ভেতরে আসতেই সায়েন বলল,’কিছু বলতে চাও??’
আরশি আমতা আমতা করতে লাগলো। ভয় পেয়ে গেছে আরশি। সায়েন খানিকটা হেসে বলল,’ভয় পাচ্ছো??একজন খুনিকে চোখের সামনে দেখে??ভাবছো আমি যদি তোমার উপর হামলা করি তাই তো??’
আরশি অবাক চোখে তাকালো সায়েনের দিকে। ততক্ষণে সায়েনের মুখের হাসি সরে গিয়ে চোখে পানি এসে গেছে। সায়েন আবার বলল,’তোমার ভাইয়াকে বলো না যে আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসতে?? আমার এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না একটুও।’

আরশি কম্পিত কন্ঠে বলল,’আমি আসি।’ বলেই এক ছুটে চলে গেল সে। সায়েন আকাশকেও একই কথা বলেছে। কিন্তু কেন??এসব ভাবতে ভাবতে রুমে ঢুকতেই ধাক্কা খেলো তনয়ার সাথে। তনয়া চোখ কুঁচকে নিজের বাহুতে হাত বুলিয়ে বলল,’অন্ধ নাকি তুই??দেখে চলতে পারিস না??’

বলতে বলতে তনয়া আরশির দিকে তাকালো। ওর ভয়ার্ত মুখটা দেখে বলল,’কি হয়েছে তোর ভয় পেয়েছিস??ভুত দেখেছিস??’

আরশি মাথা নেড়ে না বলল আর আকাশ সায়েনের সব কথা খুলে বলল। সব শুনে তনয়া বলল,’রহস্যের গন্ধ তো আমিও পাচ্ছি। ভাবি সত্যি সত্যি ভাবি হয়ে গেল না তো??’

আরশি বোকার মতো চেয়ে রইল তনয়ার দিকে। তনয়ার কথা বুঝতে কিছুক্ষণ সময় নিলো সে তারপর তনয়ার মাথায় চাটি মেরে বলল,’কি বলছিস?? সত্যি ভাবি মানে??’

‘আজকে ভাবিকে চেপে ধরব বুঝেছিস। চল এখন,গল্প করার নাম করে যাব।’

তনয়া একটা পিজা অর্ডার করেছিল। ডেলিভারি বয় পিজা দেওয়ার পর সেটা নিয়ে আরশি আর তনয়া ছাদে চলে গেল। চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে দেখল সায়েন নিজের সব জামাকাপড় গোছাচ্ছে। তনয়া আরশি ভেতরে ঢুকেই খাটের উপর বসালো। সাথে সায়েনকে টেনে বসালো। পিজার বক্স খুলে এক পিস নিয়ে সায়েনকে দিলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায়েন নিলো। তনয়া নিজের পিসে বাইট দিয়ে গমগম স্বরে বলল,’আচ্ছা ভাবি একটা কথা জিজ্ঞেস করব কিছু মনে করবে না তো??’

সায়েন অবাক হয়ে তাকালো। সায়েনকে উওর দিতে না দিয়েই তনয়া বলল,’ভাইয়া আর তোমার লাভ হিস্ট্রি টা বলো না??অবশ্য ভাইয়া বলেছিল কিন্তু পুরোটা নয়। তাই তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।’
সায়েন কি বলবে বুঝতে পারছে না। সবকিছু গুলিয়ে ফেলছে। তনয়া একটু বেশি ফটফট করে। তবে মিশুক, সহজেই সবার সাথে মিশতে পারে। আরশিকে কেমন গোমড়া মুখো লাগে। সবসময় চুপচাপ থাকে। সায়েন ভাবলো সবার স্বভাব তো আর এক হয়না।
তনয়া আবার বলল,’বলো না আমার লাভ স্টোরি খুব ভালো লাগে। আজকে আমরা অনেক গল্প করব।’

‘আর আমি কি ঢেউটিন নাকি?? আমিও শুনব।’
পুরুষালী কন্ঠ শুনে তিনজনই দরজার দিকে তাকালো। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর টিশার্ট পরিহিত একজন সুদর্শন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। সায়েন তাকে চেনে না কখনো দেখেনি। কিন্তু তনয়া আর আরশির মুখে হাসি ফুটে উঠল তামিমকে দেখে। তামিম সিঙ্গেল সোফায় দুপা তুলে তনয়ার হাত থেকে পিজার বক্স ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো। তারপর বলল,’পিজা খেতে খেতে লাভ স্টোরি নট ব্যাড।’
আরশি পিজার বক্স টেনে নিয়ে বলল,’তুমি কখন এলে??ট্যুর শেষ হয়ে গেল এতো তাড়াতাড়ি??যাওয়ার সময় তো বলেছিলে এক মাসের আগে বাড়িতে ফিরবে না তাহলে??’

তামিম আয়েশ করে বসে বলল,’এতো ভালো একট নিউজ শুনে তাড়াতাড়ি চলে এলাম।’

তামিম মুচকি হেসে সায়েনের দিকে তাকালো। পিজা হাতে সায়েন এখনও তামিমের দিকে তাকিয়ে আছে। সায়েনের দৃষ্টি দেখে তামিম সব বুঝে গেল। ও বলল,’আমি তামিম তনয় আর আরশির বড় ভাই। এতদিন বন্ধুদের সাথে ট্যুরে ছিলাম তাই আমাকে আপনি চিনেন না। তবে এখন পরিচিত হতে সমস্যা নেই।’
তামিম থামলো, কিছু একটা চিন্তা করে আবার বলল,’আপনি তো তনয়া আর আরশির ব্যাচমেট। তাহলে আপনি তো আমার ছোট। তো কি বলে সম্বোধন করি?? আপনি না তুমি??’

তামিমের মুখে গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
তখনই আরেকটি পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসলো,’ভাইয়ের বউকে তো ভাবি বলেই সম্বোধন করা উচিৎ। সে ছোট হোক কিংবা বড় হোক।’
সবাই আরাদের দিকে তাকালো। এক পকেটে হাত গুজে আরেক হাতে ফোন নিয়ে ভেতরে ঢুকলো আরাদ।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২৬

তিনজোড়া চোখ বিষ্ময়ে সামনের পুরুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু পুরুষটির কোন হেলদোল নেই। সে হাতের মুঠো ফোনটি চালাতে ব্যস্ত। এদিকে যে তিনজনকে সে অবাক করে দিয়েছে তার কোন খেয়ালই নেই যেন। আরাদ গিয়ে সায়েনের পাশে বসলো। কিছুটা কেঁপে উঠলো সায়েন। ঘা ঘেষেই বসেছে। মিষ্টি সুগন্ধ এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে সায়েনের নাকে। এই সুগন্ধির সাথে সে তিন বছর আগে পরিচিত হয়েছিল। এতদিনেও সে সুগন্ধি ঠিকই মনে আছে সায়েনের। নিজেকে মাতাল মাতাল লাগছে। ইচ্ছে করছে এই মিষ্টি গন্ধে হারিয়ে যেতে। এত গুলো দিন যেই রাগ অভিমান পুষে রেখেছিল মনের অন্তরালে তা প্রিয় মানুষটির সংস্পর্শে এসে মুহূর্তেই যেন মিলিয়ে গেছে। মাথা নিচু করে বসে আছে সায়েন। আরাদ নিজের ফোনটা পকেটে রেখে তামিমকে বলল,’তুই কখন এলি??’

তামিম নড়েচড়ে বসল। বিষ্মিত কন্ঠে বলল, ‘তোমাদের বিয়ে হয়ে গেছে??’

আরাদ বিরক্তিসূচক শব্দ বের করলো মুখ থেকে। হাত বাড়িয়ে বালিশ এনে কোলের উপর রেখে একটু বাঁকা হয়ে বসে বলল,’কানে শুনতে পাসনি কি বললাম??প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন আমার পছন্দ নয়।’
তামিম মিইয়ে গেল। আরাদ নামক প্রাণিটিকে যে খুব ভয় পায়। সে আমতা আমতা করেই জবাব দিলো,’কিছুক্ষন হলো এসেছি।’

তামিম আর কিছু বলল না দেখে তনয়া বলল, ‘প্লিজ ভাইয়া বলো না তোমাদের বিয়ে হলো কিভাবে??’
আরাদ দৃষ্টি তনয়ার দিকে ঘোরালো। তনয়া উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরশি আর তামিমের ও একই অবস্থা। তবে আরাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে না যে ও কিছু বলবে!!এটাই আরাদের প্রধান সমস্যা। প্রতিটা কথা সে অর্ধেক বলবে। কোন কথা সম্পূর্ণ শেষ করলে মনে হয় মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। আরাদ কিছু বলার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ফোন কানে নিয়ে সে কিছু কথা বলল তারপর ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালো। মনে হচ্ছে অফিসের কোন কাজ। আরাদ রুম থেকে বের হতে হতে বলল,’পেটের কথা কারো কাছে শেয়ার করলে মনটা হালকা হয়। সব প্রশ্ন অভিমানীনিকে জিজ্ঞেস কর।’

আরাদ চলে যেতেই তনয়া দাত কেলিয়ে তাকালো সায়েনের দিকে। সায়েন অবুঝের মতো তাকিয়ে আছে আরাদের যাওয়ার পানে। তনয়া বলল,’যাক বাবা ভাইয়া গেছে এখন একটু মন খুলে কথা বলা যাবে। ভাইয়াকে দেখলেই ভয়ে সব প্রশ্ন গুলিয়ে ফেলতাম। ভাবি প্লিজ বলো না যে সব কিভাবে হলো??’

তামিম চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,’কিন্তু ভাইয়া বাড়ির সবাইকে বিয়ের কথা জানায়নি কেন??আর আমাদেরই বা কেন বলল??’

তনয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলল,’তুমি আসলেই গাধা। মা আর কাকিমনি কেমন তা জানো না?? ওনাদের মানাতে তো একটু কষ্ট হবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন বিয়েটা হলো কিভাবে??’
তনয়া সায়েনের দিকে তাকালো। সায়েন চুপ করে গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে আছে। তনয়া হালকা ধাক্কা দিতেই হুস আসলো সায়েনের। সবার মুখের দিকে তাকালো সে। সবার মুখে প্রশ্নের ছাপ। সায়েন বুঝলো যে আজকে এরা সবটা না যেনে এখান থেকে এক পা ও নড়বে না। তামিম এগিয়ে গিয়ে দরজা আটকে দিলো যাতে হঠাৎ করেই কেউ চলে আসতে না পারে। নিঃশব্দে গভীর শ্বাস ফেলল সায়েন যা কেউ শুনতে পেলো না

_____________

রুহির মায়ের সাথে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে আকাশ আরো রেগে গেছে। মহিলাটির লাগামহীন কথাবার্তা যেন সূচের মতো বিঁধছে। ব্যথা হচ্ছে প্রচুর। ওদিকে সায়েনের অবস্থা তো বলা বাহুল্য। সে কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে এখানে না আসাই ভালো ছিল। ক্ষণিকের আনন্দ করতে এসে আরো অপমানিত হলো সে। লিলি বেগম দুহাতে শক্ত করে সায়েনকে ধরে আছে। সায়েন আস্তে আস্তে শরীরের সব ভর ছেড়ে দিচ্ছে। লিলি বেগম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। একসময় দু’জনে পড়ে যেতে নিলে একজোড়া বলিষ্ঠ হাত সায়েনকে আঁকড়ে ধরলো। সায়েন নিভু নিভু চোখে তাকালো হাতের মালিকের দিকে। আরাদের লাল আভা ছড়ানো রাগন্বিত মুখটা দেখে কিছুটা শিউরে উঠলো। শুকনো ঢোক গিলে তাকালো আরাদের দিকে। আরাদ সায়েনকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে একহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো। এতে যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ হলো। রুহির মা বিষ্ফোরিত চোখে তাকিয়ে বলল,’এটা আবার কে?এই মেয়ের আর ক’জন লাগে??’

রুহির মায়ের কথায় আরাদের রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,’মুখ সামলে কথা বলবেন নাহলে আমি ভুলে যাব যে আপনি বয়সে আমার বড়ো। মনে রাখবেন ছোটরা ভুল করলে বড়রা বকাঝকা করে কিন্তু বড়রা ভুল করলে ছোটরা কিন্তু বকাঝকা করে না।’

আরাদের কথায় ফুঁসে উঠলেন রুহির মা। তিনি বলেন,’এই ছেলে কে তুমি??আর এখানে এসে আমাকে অপমান করার সাহস পেলে কোথায় তুমি??কি হয় এই মেয়েটা তোমার?’

আরাদ পা দিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ারটা টেনে এনে সায়েনকে বসিয়ে দিলো। তারপর রুহির মায়ের উদ্দেশ্য বলল,’সায়েন আমার কি হয় তা আপনার না জানলেও চলবে। কিন্তু এটা জেনে রাখেন যে ওর সব বিপদে আমি ওর পাশে আছি। আপনার মতো হাজার জন আসলে তাদের পায়ের নিচে পিষে দেব।’

রাগে কটমট করছে আরাদ। ইচ্ছে করছে সব কিছু জ্বালিয়ে দিতে। নিজেকে সামলাতে ও পারছে না আরাদ। শফিকুল ইসলাম আরাদের এরকম কথায় রেগে গেলেন। তিনি আরাদকে বললেন,’তুমি আমাদের মাঝে কেন এসেছো?? আমাদের পারিবারিক বিষয় আমরাই সামলে নিতে পারব।’

আরাদ আঙ্গুল দিয়ে সায়েনকে দেখিয়ে বলল, ‘এই আপনার সামলানোর নমুনা?? আপনার মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজের এই হাল করেছে আর আপনি চুপচাপ বসে আছেন??কেমন বাবা আপনি??’

শফিকুল ইসলাম কিছু বলার আগেই শাফিন এগিয়ে আসলো। আরাদ ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারলো যে শাফিন ও ওকে কিছু কড়া কথা বলার জন্য উদ্যত হচ্ছে। তাঁর আগেই আরাদ বলল,’কিপ ইউর ভয়েজ শাট। মুখ খুললে ভালো হবে না। এতদিন ভালো ভাবেই কথা বলে এসেছি বলে এই না যে আমি এখনো চুপ করেই থাকব??’

শাফিন দমে গেল আরাদের রাগন্বিত চেহারা দেখে। আরাদ শফিকুল ইসলামের দিকে আঙুল তুলতে চেয়েও হাত নামিয়ে ফেললো বলল,’সেদিন তো আপনাকে বিয়ের কথাটা বলেছিলাম। তখন সবটা মেনে নিলে এসব হতো না।’
আকাশ এতক্ষণ সব শুনছিল। ওই আরাদকে ফোন করে আসতে বলেছে। আরাদের সাথে ওর সব বন্ধুরাও এসেছে। আকাশ এগিয়ে এসে বলল,’আমিও এটাই বলছি। এখন এই মুহূর্তে সায়েনের বিয়ে দিয়ে এই মহিলার মুখ বন্ধ করব আমি।’

রুহির মা তেতে উঠলেন যেন। তিনি বললেন, ‘তো তোমরা দু’জন একসাথে বিয়ে করবে নাকি?? যেভাবে বলছো মনে তো হচ্ছে,,,,’

কথার মাঝেই সামনের টেবিলে সজোরে লাথি মারে আরাদ। উল্টে যায় টেবিল। এতে সায়েন কিছুটা কেঁপে উঠলো। ভয়ে আঁকড়ে ধরল লিলি বেগমকে। আরাদ তেড়ে যেতে নিলে রাফিন আর নিয়াজ ওকে টেনে ধরলো। আরাদ জোরেই বলল,’আর একটা কথা ওই মুখ দিয়ে যদি বের করেন তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।’

সবাই বিষ্ময়বিমূঢ় আরাদকে দেখে। বিশেষ করে সায়েন ভয় পেয়ে গেছে আরাদকে দেখে। এই আরাদ তো সবসময় ওর সামনে হাসিখুশি থাকতো। আজকেই প্রথম আরাদের এই রুপ দেখছে সে। আকাশ বলল,’আমি আমার কথা রাখব আজকে এই মুহূর্তে আরাদের সাথে সায়েনের বিয়ে হবে।’
আকাশ শাফিন আর ওর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,’অনেক তো করেছেন আপনারা সায়েনের জন্য। তাতে সায়েন কষ্ট বৈ কিছু পায়নি। আজকে নাহয় আমি কিছু করি?? তবে নিশ্চিত হোন যে এতে সায়েনের ভালো হবে।’

আরাদ আকাশের কথা শুনে বলল,’এটা পসিবল নয় আকাশ। তোকে আমি কি বলেছিলাম??’
‘তুই আমাকে না জানিয়ে সেদিন সায়েনের বাড়িতে গিয়ে ভুল করেছিস আরাদ!!আর সেদিন আমিও তোকে কিছু কথা বলেছিলাম।’
আকাশ অনেকটা কাছে এগিয়ে গেল আরাদের নিমজ্জিত কন্ঠে বলল,’সায়েন তোকে ভালোবাসে এখনও তা আমি জানি। ও আমার সাথে ভাল থাকবে না। হয়তো সায়েন এখন মুখ ফুটে কিছু বলছে না তবে শিঘ্রই বলবে। ততক্ষণে না দেরি হয়ে যায়??তাই তাড়াতাড়ি সায়েনকে কাগজে কলমে নিজের করে নে। পরে নাহয় মন থেকে নিজের করে নিস।’
আকাশের কথায় আরাদ বিষ্মিত চোখে তাকালো। মৃদু হেসে আকাশ কাজিকে ডাকলো। কিন্তু ফের বাঁধ সাধলো সায়েন নিজে। সে উঠে দাড়িয়ে বলল,’আমি কাউকে বিয়ে করতে পারব না।’
আকাশ বলল,’কেনো??’

‘জানি না তবে শুধু এটুকু জানি যে বিয়ে আমি করব না। তার থেকে চলে যাব আমি।’

আরাদ মাথা ঠান্ডা করতে চেয়েও পারলো না। সায়েন ভাবে কি নিজেকে??ওর পক্ষে একা কি সব করা সম্ভব??এই মেয়ে বেশি বাড় বেড়েছে। আকাশ বলল,’তোমার উপর সবাই আঙ্গুল তুলেছে সায়েন। সবাইকে কড়া জবাব দেবে না??’

‘দরকার নেই। আমি একা থাকতে পারব। কাউকে লাগবে না আমার। একা চলতে পারব আমি। কাউকে লাগবে না আমার। থাকব না আমি এখানে। যেদিকে দু’চোখ যায় চলে যাচ্ছি তাহলেই সবার শান্তি হবে।’

সায়েন পা বাড়ায় চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ওর হাতে টান খায়। পিছনে পুরোপুরি ঘোরার আগেই একটা থাপ্পর পড়লো ওর গালে। গালে হাত দিয়ে অবাক চাহনিতে তাকালো আরাদের দিকে। রাগে জ্বলজ্বল করতে আরাদের চোখ দুটো। সে বলল,’নিজেকে কি ভাবো তুমি??একাই সব পারবে??এতো ক্ষমতা তোমার??আর এদের কথা শুনে তুমি এই সিদ্ধান্ত নিলে কোন সাহসে??এরা কারো সুখ দেখতে পারে না জানো তুমি??আর এরা কারা যাদের জন্য এতো করছো??মাদার তেরেসা নাকি তুমি??’

আরাদ থামলো তারপর পুনরায় বলল, ‘মেয়েরা কখনোই একা পথে হাঁটতে পারে না। চলার পথে শক্ত একটা বিশ্বাসী হাত দরকার হয়।’

এতক্ষণে চোখ তুলে তাকালো সায়েন। চোখ দিয়ে তার পানি পড়ছে অনবরত। আরাদের কথার পিঠে আর জবাব দিলো না ও। না জানি আবার থাপ্পর দিয়ে বসে??তাই মিইয়ে গেল সায়েন। সব কিছু মেনেই বিয়ে হলো আরাদ আর সায়েনের। আকাশ সায়েনের বাবা আর ভাইকে এগোতেই দিলো না। পেপারে সাইন করার আগে সায়েন বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর চোখের ইশারায় শফিকুল ইসলাম সম্মতি দিলেন। যা শাফিনের চোখে পড়লো না। বাবার সম্মতিতে সায়েন ও অবাক হয়। সায়েন ভেবেছিল সে সাইন করবে না। কিন্তু শফিকুল ইসলামের সম্মতি দেখে সায়েন সাইন করে দিল। নিজেকে আরাদের কাছে আত্মসমর্পণ করালো। নাম লেখালো কারো অর্ধাঙ্গিনীর খাতায়। সায়েন কখনোই ভাবেনি যে শেষমেষ সে আরাদের হবে। এটা তো ওর কল্পনা ছিল মাত্র। কিন্তু এই কল্পনা একদিন সে নিজের হাতেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সেই গুড়িয়ে যাওয়া কল্পনা নিজে থেকে জুড়ে গিয়ে বাস্তবে রুপ নিয়েছে। সায়েনের বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে দ্বিতীয় বার কারো জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে। এটা সমাজ আবার কোন চোখে দেখবে সেটাও অজানা সায়েনের। ওর ভাবনার মাঝেই আরাদ সায়েনের হাত ধরলো। সায়েন আরাদের দিকে তাকাতেই সে বলল,’এখন হাত ধরার অধিকার আছে আমার।’
আরাদ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,’আশা করি এখন আর কারো সমস্যা হবে না। সায়েনকে আমি নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা বিয়ে কন্টিনিউ করুন।’
সায়েনের হাত ধরে গাড়ির কাছে নিয়ে এলো আরাদ। গাড়ির দরজা খুলে সায়েনকে বসতে বলল। কিন্তু সায়েন বিয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। আরাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘আর কিছু খাওয়া বাকি আছে তোমার?কম অপমান তো হজম করলে না। এর বেশি নিলে পেট খারাপ করবে।’
আরাদের কথাটা সহ্য হলো না সায়েনের। এমনিতেই জোরে থাপ্পর মারার জন্য গাল জ্বলছে। এখন আবার গা জ্বালানি কথা ও বলছে। সায়েন আস্তে করেই বলল,’আব্বু,,,,,’

‘বাপ ভাইয়ের সাথে পরে কথা হবে। এখন আমার মাথা ঠিক নেই। কি বলতে কি বলে ফেলি কে জানে?? আমার মাথা ঠান্ডা হোক তারপর তোমার বাপ ভাইয়ের সাথে কথা বলো। এখন চলো!!’

রাফিন নিয়াজ আর জোনায়েদ চলে এসেছে। রাফিন বলল,’বাড়িতে গিয়ে কি বলবি?আন্টি তো সামিউ,,,,,’
আর বলল না রাফিন। আরাদ চোখের ইশারায় থামিয়ে দিয়েছে ওকে। মুখে বলল, ‘আপাতত সবটা চেপে যেতে হবে। পরে না হয় সবাইকে সবটা বলব। এখন চল সবাই।’

আকাশ আসতেই গাড়ি নিয়ে সবাই বেরিয়ে আসলো। গন্তব্য আরাদের বাড়ি।

______________

সায়েনের কথা শেষ হতেই তামিমের উল্লাসে মুখরিত হলো চারপাশ। খুশিতে সে জোরে শিস দিয়ে উঠল। তনয়ার মুখে হাসি ফুটলো।আরশি মনে মনে খুশি হলেও বাইরে তা প্রকাশ করলো না। তামিম হাত নাড়িয়ে বলে উঠলো, ‘এক্সিলেন্ট লাভ স্টোরি। আমার পছন্দ হয়েছে।’
সাথে তনয়া তাল মিলিয়ে বলল,’আমারও!কি প্রেম!! চিলেকোঠার ঘর থেকে শুরু আবার শেষেও এই চিলেকোঠার ঘর। কেয়া বাত কেয়া বাত!!’
শব্দ করে হাসলো ওরা। কিন্তু সায়েনের মুখে হাসি নেই। তনয়া তা বেশ বুঝতে পেরে বলল, ‘ভাইয়াকে ভুল বুঝো না ভাবি। তুমি হয়তো এই তিনটা বছর ভাইয়ার অনুভূতি বুঝতে পারো নি। আমরাও না। কিন্তু এবার একটু বোঝার চেষ্টা করো। এমন ভালোবাসা হয়তো কেউ কপাল করে পায়না। মানছি তুমি এর আগে অনেক কষ্ট পেয়েছো কিন্তু তাই বলে কি সুখ গ্রহন করবে না??সুখ আছে বলেই কষ্টের এতো দাম। তাই বলে যে শুধু কষ্টই গ্রহন করবে তা নয়। সুখটা উপভোগ করে দেখো। ভালোবাসার চেয়ে বড় সুখ আর কিছু হয় না। যা সবার ভাগ্যে জোটে না।’

তনয়ার কথায় ভ্রু কুচকালো তামিম। সে বলল,’এতো জ্ঞান দিচ্ছিস যে?বলি ছ্যাকা খেয়েছিস নাকি??’
আরশি তাল মিলিয়ে বলে উঠলো,’মনে হয় তাই হবে। আমি জিজ্ঞেস করলে তো কিছুই বলে না। মনে হয় বড়সড় ছ্যাকা খেয়েছে।’

তনয়া ভেংচি কেটে বলল,’ছ্যাকা না খেলে বুঝি জ্ঞান দেওয়া যায় না।’

‘না যায় না।’
তনয়া ক্ষেপে গিয়ে বালিশ দিয়ে দুজনকেই মারতে লাগলো। আরশি আর তামিম হাত দিয়ে আটকাতে লাগলো। ওদের খুনসুটি দেখে হাসলো সায়েন। ওরা দুই ভাইবোন ও তো এভাবেই মারামারি করতো। তনয়া ওদের দুজনকে তাড়া করলো। এভাবে তিনজনেই চলে গেল সায়েনকে একা করে।

স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালের উপর হাত রেখে রাতের রাস্তা দেখায় মগ্ন সায়েন। ল্যাম্পোস্টের আলোয় আলোকিত রাস্তা। তাছাড়া রং বেরঙের লাইট জ্বলছে বাড়ির বাগানে। নিস্তব্ধ রাস্তাটা দেখছে সায়েন। আস্তে আস্তে নিরবতা গ্রাস করছে শহরটাকে। এই নিরবতা সায়েনের খুব ভালো লাগে। আগে সে এক মুহুর্ত সে চুপ থাকতে পারত না আর এখন!!মনে মনে হাসলো সায়েন। সময়ের সাথে কতকিছু বদলে যায়। যেন চোখের পলকে সবটাই বদলে গেল। ভাবনার মাঝেই কারো স্পর্শ অনুভব করলো সায়েন। কিন্তু পেছনে ঘুরতে পারলো না সে। কারো বুকের সাথে ওর মাথার পেছনের দিক ঠেকে গেছে। একহাত ওর কোমড় ধরে আছে আরেক হাত ওর পাশে দেওয়ালের উপর রাখা। স্পর্শটা বড়ই চেনা সায়েনের। তাই সে আর ঘাটালো না লোকটির বিষয়ে। কাঁচের দেয়াল থেকে হাত সরাতে গিয়েও সায়েন পারলো না। আরাদ নিজের হাত দিয়ে ওর হাত দেয়ালের সাথে চেপে ধরেছে। তবে আলতো করে যাতে সায়েন ব্যথা না পায়।

‘আমি তোমার সামনে খুব কম আসি তার কারণ জানো সায়েন??’

উওর দিলো না সায়েন। আরাদের এরকম নেশাক্ত কন্ঠে সে মাতোয়ারা হতে চায় না। দূরত্ব বজায় রাখতে চায় আরাদের থেকে। কিন্তু বিশেষ লাভ হলো না। আরাদ আবার বলল,’তোমার সান্নিধ্য পাওয়ার বড্ড লোভ জন্মেছে আমার। নিজেকে সামলানো বড় দায় সায়েন। তোমার ভালোবাসার প্রতি খুব লোভ আমার। এই লোভি ব্যক্তিকে কি এক চিমটি ভালবাসা দেওয়া যায় না??’

এবারও কথা বলল না সায়েন। চোখ বন্ধ করতেই অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়লো চোখের কার্ণিশ বেয়ে। আচমকাই এক অদ্ভুত শিহরণ আন্দোলিত হলো সায়েনের শরীর জুড়ে। কম্পিত হলো সায়েন। নিজের ওষ্ঠজোড়া সায়েনের ঘাড়ে ছুইয়েছে আরাদ। চোখ বন্ধ করে আছে সায়েন। তখনই নিজেকে হালকা অনুভব করলো সে। পিছনে ঘুরে তাকালো। আরাদ ওকে ছেড়ে চলে গেছে। নিস্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সায়েন তারপর আস্তে আস্তে গিয়ে দরজা আটকে দিলো।

সকাল বেলা ফ্রেশ হয়ে আসতেই একজন নতুন মুখের আগমন ঘটলো। বাইশ কি তেইশ বছরের একটা মেয়ে এসেছে ওর খাবার নিয়ে।‌ সায়েনকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা বলে উঠলো,’গুড মর্নিং ম্যাম। আমাকে আপনার দেখাশোনা করার জন্য আনা হয়েছে। স্যার বলেছেন যেন আজ থেকে আপনার সব কাজ আমি করে দেই। এখন খাবার নিয়ে এসেছি।’

বলেই এক গাল হাসলো মেয়েটা। সায়েঞ বুঝলো মেয়েটা স্যার বলতে আরাদকে বুঝিয়েছে। সে মাথা নাড়িয়ে খেয়ে নিলো। সায়েনের খাওয়া শেষ হতেই মেয়েটা প্লেট নিয়ে নিচে নেমে এলো। মেয়েটা রান্নাঘরে আসতেই নিলিমা এবং হাসি বেগম চেপে ধরলো তাকে। নিলিমা বেগম বললেন,’এই মেয়ে নাম কি তোমার??’

মেয়েটা এক গাল হেসে বলল,’কবিতা!!’

কপাল কুচকালো হাসি বেগম। তিনি কটাক্ষ করে বললেন,’কবিতা!! তো একটা কবিতা শোনাও দেখি??’
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২৭

এই মুহূর্তে কোন কবিতাই মনে পড়ছে না কবিতা নামের মেয়েটির। কিন্তু হাসি আর নিলিমা বেগম যেভাবে ওকে চেপে ধরেছে সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না। আমতা আমতা করছে কবিতা। হাসি বেগম সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,’আচ্ছা থাক তোমাকে কবিতা বলতে হবে না। তবে একটা শর্ত আছে। সেটা মানতেই হবে তোমাকে।’

কবিতা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। নিজের নামের চক্করে সব কবিতাই গুলিয়ে ফেলেছে সে। এমনকি ছোটদের চার লাইনের ছড়াও মনে পড়ছে না তার। হাসি বেগম আবার বললেন, ‘তোমাকে যেই মেয়েটাকে দেখাশোনা করার জন্য আনা হয়েছে তার সব খবর আমাদের চাই। আরাদ কখন ওই রুমে যাচ্ছে কতক্ষণ থাকছে কি করছে সব!!বুঝেছো??’
শুকনো ঢোক গিলে মাথা নাড়লো কবিতা। কিন্তু আরাদ যে এর আগে হাজার খানেক কথা বুঝিয়েছে ওকে। এও বলেছে যে এবাড়ির কারো সাথে যেন তেমন কথা সে না বলে। ওর কাজ শুধু সায়েনের দেখভাল করা।

নিলিমা এব হাসি বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সোফায় গিয়ে বসে। কবিতা রান্না ঘরের সব দেখতে লাগল। কবিতাকে আরাদ এনেছে সায়েনের জন্য। মূলত সায়েনের সব খবরাখবর সে আরাদকে দেবে। আরাদ খুব ভালো করেই জানে যে এবাড়ির দুজন মানুষ সায়েনকে মানতে পারছে না। সেটা হলো ওর মা আর কাকিমা। ওনারা যে সায়েনকে কিছু বলেছে তা আরাদ বেশ বুঝতে পেরেছে। কিন্তু ওর পক্ষে বাড়ি অফিস আর সায়েন এতকিছু সামাল দেওয়া তো সম্ভব নয়। আর তাছাড়া সায়েন আর ওর সম্পর্কের কথা তো সবাই জানে না। নিলিমা বেগম তো সামিউক্তাকে নিয়ে পড়ে আছে। এখন ও এটা নিয়ে ফিসফিসানি চলে তাদের মাঝে। আরাদ আগে সামিউক্তার ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করতে চায় তারপর নাহয় আস্তে আস্তে সবাইকে সব সত্যিটা বলা যাবে!! কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত তো সায়েনকে ঠিক রাখতে হবে। আরাদ জানে যে সায়েনকে একা পেলে ওর মা আর কাকিমনি সায়েনের ব্রেন ওয়াশ করে ছাড়বে। তাই সায়েন যাতে একা না থাকে সেজন্য কবিতাকে এনেছে। এখন আরাদ নিশ্চিন্তে ওর কাজে মন দিতে পারবে।

নিলিমা বেগম ছেলেকে নিয়ে ভিশন চিন্তিত। সে কাতর কন্ঠে বলল,’কি করি বলতো??সবাই যদি জানতে পারে যে একটা খুনি মেয়েকে আরাদ বাড়িতে এনে তুলেছে তাহলে মান সম্মান কিছুই থাকবে না।’

হাসি বেগম তাল মিলিয়ে বলল,’হুম ভাবি। আমার বাপের বাড়ির লোকজন কি বলবে??জানোই তো আমার ভাইয়েরা সব কত বড় ব্যবসায়ী। সব বড়বড় লোকেদের সাথে ওঠাবসা। সবাই জানলে তো!!!’

‘তুই তো ওই মেয়েটাকে কি যেন বললি??তা কি বলেছিল মেয়েটা??’

‘ওই মেয়েটা আর কিই বা বলবে!! তাছাড়া তোমার ছেলে যেরকম এতো সহজে যেতে দেবে নাকি মেয়েটাকে??’

‘আমি তো ভাবতেই পারছি না এমন ছেলে পেটে ধরেছি আমি!!’

বিলাপ করতে লাগলেন নিলিমা বেগম। হাসি বেগম পুনরায় বললেন,’এর একটাই সমাধান আছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সামিউক্তার সাথে আরাদের এংগেজমেন্টটা সেরে ফেল। অন্তত ওই মেয়েটার থেকে ফিরিয়ে তো আনা যাবে। পরে দেখবে সামিউক্তাই আরাদকে দিয়ে ওই মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে।’
নিলিমা বেগম যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। তিনি হাসি মুখে বললেন,’সেটাই বরং করি!!আমি আজই আরাদের বাবার সাথে কথা বলব। তারপর সামিউক্তার বাবার সাথে কথা বলে এক সপ্তাহের মধ্যে এংগেজমেন্টের ডেট ফাইনাল করব।’

ওনাদের দুজনের আলাপ আলোচনা সবই কবিতার কানে চলে গেছে। এবং সাথে সাথেই কবিতা কথাগুলো আরাদের কাছে পাচার করে দিয়েছে। সব শুনে আরাদ হতাশ হলো। তার মানে ওর কাকিমনি সায়েনকে কিছু বলেছে। এমনিতেই অনেক কিছু করার পর সায়েনকে নিজের করে পেয়েছে। আর এখন সে সায়েনকে আর হারাতে চায় না। আরাদের এখন কিছু করতেই হবে। ও ফোন হাতে আকাশকে কল করলো। কিছুক্ষণ কথা বলার পর ফোনটা কেটে দিলো সে।

চিলেকোঠার ঘর থেকে সায়েন একটুও বের হয় না। বের হবেই বা কি করে?? সাথে তো কাউকে লাগবেই। বাড়িটা ঘুরে দেখার খুব ইচ্ছে করছে সায়েনের। আপাতত সেই ইচ্ছা বালিশের নিচে চাপা দিয়ে ফোন বের করে শাফিনকে কল করলো। শাফিন রুহি আর ওর বাবার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দিলো সে। সময় যেন কিছুতেই কাটছ না ওর। তনয়া আর আরশির সাথে ভার্সিটি যেতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু আরাদের অনুমতি ছাড়া যাবেই বা কিভাবে??আরাদকে জিজ্ঞেস করবে ভাবলো সায়েন। তাই সে চুপচাপ বসে রইল। এমন সময় কবিতা এলো ওর রুমে। কবিতা ওর হাতের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বোঝালো যে আরাদ ফোন করেছে। সায়েন ফোন কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই আরাদ বলল,’সকালের খাবার খেয়েছো??’

সায়েন ছোট্ট করে উওর দিলো,’হুম।’

‘আমি না আসা পর্যন্ত রুম থেকে বের হবে না। যদি খুব প্রয়োজন হয় তাহলে কবিতাকে নিয়ে বের হবে। আর কারো কথায় কান দেবে না ওকে??

সায়েনের জবাব ‘হুম’ হলো এবারো!!আরাদ বলল,’একটা সিক্রেট কথা শুনবে??’

কপালে ভাঁজ পড়লো সায়েনের। সে আস্তে করেই বলল,’কি??’

‘আই লাভ ইউ!!’
মুহূর্তেই সায়েন বড়বড় চোখে তাকালো কবিতার দিকে। ও কি রিয়েক্ট করবে বুঝতে পারছে না। ঠোঁট কামড়ে শব্দ করে হাসলো আরাদ। আবারও সেই সিক্রেট কথাটা বলে ফোনটা কেটে দিলো সে। সায়েন ফোন এগিয়ে দিলো কবিতার দিকে। কবিতা ফোন নিয়ে বলল,’ম্যাম আপনার ফোন নাম্বারটা স্যারকে দিয়ে দিয়েন। তাহলে আমাকে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না।’

সায়েন মৃদু হেসে বলল,’তোমার স্যার তো ইচ্ছে করলে আমার ফোন নাম্বার নিতে পারে তাহলে কেন নিচ্ছে না??’

‘সেটাও কথা!!!তবে আমি এবিষয়ে স্যারকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারব না। আমাকে স্যার আগেই বলে দিয়েছে যে প্রশ্ন করা নিষেধ। আমি যাই!!’

কবিতা চলে গেল। সায়েন ভেবে পায়না যে সবাই এতো ভয় কেন??আরাদ কি বাঘ না ভাল্লুক যে খেয়ে ফেলবে?? কিন্তু সায়েন তো নিজেই এখন আরাদকে ভয় পায়।

সন্ধ্যার পর তনয়া এলো সায়েনের সাথে দেখা করতে। সায়েন যে রুমে থেকে বোর হচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছে তনয়া তাই সে সায়েনকে নিয়ে বের হয়। পুরো বাড়ি ঘুরে দেখাবে বলে। এই সন্ধ্যা বেলায় সবাই এখন যার যার রুমে। সায়েনকে নিয়ে নিচে নেমে এলো তনয়া। নিচে ওর বাবা আর কাকার রুম। সায়েনকে বাইরে থেকেই দেখালো। তারপর রান্নাঘর দেখালো। এরপর তনয়া সায়েনকে নিয়ে নিজের রুমে গেল। আরশি এই সন্ধ্যায় ঘুমাচ্ছে দেখে মুচকি হাসলো সায়েন। তনয়া বলল,’আরশি আজকে একটু বেশি টায়ার্ড। বন্ধুদের সাথে আজকে অনেক সময় আড্ডা দিয়েছি তো। চলো তোমাকে আমার ভাইয়ার রুমে নিয়ে যাই।’

এরপর ওরা গেল তামিমের রুমে। ল্যাপটপ কোলে নিয়ে কানে ইয়ারফোন গুজে বসে আছে তামিম। পরনে থ্রি কোয়াটার প্যান্ট টিশার্ট। সায়েনকে দেখেই তামিম নড়েচড়ে বসলো। কানের ইয়ারফোন খুলে বলল,’আরে ভাবি তুমি???’

তনয়া মুখে আঙ্গুল দিয়ে বলল,’হিসসস,আস্তে বলো কেউ শুনতে পেলে খবর আছে।’
তামিম মাথা নাড়িয়ে বলল,’ওপপস সরি। আচ্ছা বসো তোমরা।’
সায়েন তনয়া দু’জনেই বসলো। তামিমের সাথে টুকটাক কথা বলে সায়েনকে নিয়ে বেরিয়ে এলো তনয়া। বেশ ভালোই লাগছে সায়েনের। হাত পা ধরে এসেছিল অনেকটা মরিচা ধরার মতো। তামিমের রুম থেকে বের হয়ে একটু সামনে যেতেই একটা রুম চোখে পড়লো সায়েনের। সায়েন তনয়াকে বলল,’এই রুমটা কার??’

মিটমিট করে হাসলো তনয়া। সায়েন এই হাসির অর্থ বুঝতে পারলো না। তনয়া বলে, ‘ভেতরে গেলেই বুঝতে পারবে চলো।’

সায়েন ছোট ছোট চোখে তাকালো তনয়ার দিকে। তনয়া এক গাল হেসে বলে,’তুমি গিয়ে রুমটা দেখে আসো ততক্ষণে আমি আমার ফোনটা নিয়ে আসি হ্যা??’

‘তুমি চলো তোমার সাথেই যাই।’

‘আমি তো যাবো। আগে ফোনটা আনি তারপর।’

একপ্রকার জোর করেই সায়েনকে ভেতরে পাঠিয়ে চলে গেল তনয়া। সায়েন ভেবে পাচ্ছে না হঠাৎ করে ফোনের কি এতো দরকার পড়লো তনয়ার। এসব ভাবতে ভাবতে পুরো রুমে চোখ বুলায় সায়েন। বিশাল বড় রুম, খাটটাও অনেক বড়। দেয়ালে নীল রং করা সাথে সাদা সাদা মেঘ ও আঁকা। বেশ ভালো লাগলো সায়েনের। বারান্দায় চোখ গেল সায়েনের সেদিকে এগিয়ে গেল। বারান্দাটাও বেশ বড় আর সুন্দর। বারান্দায় কিছু কিছু গাছ ও আছে। তবে একটাও ফুলের গাছ নয়। পাতাবাহার গাছ। যেগুলোতে শুধু পাতা ফুল হয় না। সায়েন গাছ গুলোয় হাত বুলালো। হঠাৎ করেই ওর মনে পড়লো তনয়া তো এখনও এলো না। তাই সে তাড়াতাড়ি বের হতে নিলো। সায়েন দরজা খোলার আগেই দরজা খুলে গেল। তাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে গেল সায়েন। এসময়ে আরাদকে দেখে হকচকিয়ে গেল সায়েন। আরাদ ও অবাক হয়ে গেছে সায়েনকে দেখে তবে ওর মুখে হাসি ফুটেছে। আরাদ বলল,’আমাকে মিস করছিলে বুঝি??’

আমতা আমতা করতে লাগলো সায়েন বলল, ‘ন না মানে তনয়া,,,,’
কথার মাঝেই অনেকটা কাছে চলে এসেছে আরাদ। সায়েনের কথা না শুনে সে বলল, ‘চুপচাপ বসো এখানে আমি আগে ফ্রেশ হই তারপর দেখছি।’
শার্ট টাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। সায়েনকে আর পায় কে?? তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেল। এক দৌড়ে চিলেকোঠার ঘরে পৌঁছে গেল সে। তনয়া ইচ্ছে করেই এসব করেছে। ইচ্ছে করেই আরাদের ঘরে ওকে পাঠিয়েছে।

মাত্রি আরশির ঘুম ভাঙলো। মাথাটা এখনো ব্যথা করছে। কফি হলে ভালো হতো কিন্তু আশেপাশে তনয়াকে সে দেখতে পাচ্ছে না। থাকলে ওকে দিয়ে কফি আনতো। অগত্যা বিছানা ছেড়ে উঠতে হলো আরশিকে। ঘুমে সে ঢুলুঢুলু করে হাটছে। রুম থেকে বের হতেই কারো সাথে ধাক্কা লাগলো আরশির। পড়তে গিয়েও পড়লো না। সামনে থাকা ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরলো বলল,’তনু এক কাপ কফি আন তো??মাথাটা খুব ধরেছে।’

‘সরি!!!’ পুরুষালী কন্ঠস্বর শুনে চমকে তাকালো আরশি। চোখ খুলে তাকালো। আকাশকে দেখে ঝড়ের গতিতে ছেড়ে দিলো আকাশকে। আরশির এরকম কাজে ভড়কে গেল আকাশ। এতো রিয়্যাক্ট করার কি দরকার??আরশি বলল,’সরি আসলে দেখতে পাইনি। আমি ভেবেছিলাম তনয়া। এই বাড়িতে ধাক্কা লাগার মতো তনয়াই আছে যার সাথে দিনে তিনবার ধাক্কা না খেলে আমার ঘুমই হয় না।’
চোখ কুঁচকে তাকালো আকাশ। একসাথে কতগুলো কথা বলে দিলো আরশি। তবে আকাশ বেশি কিছু বলল না শুধু এটুকুই বলল,’ইটস্ ওকে।’
বলেই সে আরাদের রুমের দিকে চলে গেল। আরশ বুকে হাত দিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। বড়সড় হার্ট অ্যাটাক থেকে বেঁচে গেল যেন। তনয়ার কথায় সেদিন থেকে আকাশকে ভোলার চেষ্টা করছে আরশি কিন্তু কিছুতেই পারছে না। উল্টে বারবার আকাশের সামনেই এসে পড়ছে সে।

আকাশ সোজা আরাদের রুমে ঢুকলো। আরাদকে বাথরুমে দেখে খাটের উপর বসলো। কিছুক্ষণ পর আরাদ বের হলো। আকাশকে দেখে আরাদ বিষ্ময়ে বলে উঠলো, ‘তুই???’

‘কেন অন্য কাউকে আশা করেছিলি বুঝি??’

‘উহু,সায়েন ছিলো এখানে!! কিন্তু গেল কোথায়??’

‘আমি তো এসে কাউকে দেখলাম না।’

আরাদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ব্রাশ করতে করতে বলল,’বোধহয় পালিয়েছে। বাদ দে,কি খবর বল??’

‘সবকিছু ঠিকঠাক এখন শুধু বোম ফাটানো বাকি!!’ বলেই হাসলো আকাশ। আরাদ ও হেসে বলে,’হুম,তবে বোমটা আমার মা আর কাকিমনির মাথায় ফাটাবো ভাবছি।’

আকাশ ফের হাসলো বলল,’বেশ হবে তাহলে। তোর ম মনে হয় এংগেজমেন্টের তারিখ ঠিক করে ফেলেছে।’

আরাদ পকেটে হাত গুজে আকাশের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,’হুম,বাবাকেও বলেছি মায়ের কথামতো কাজ করতে পরে সব আমি ঠিক করে নেব। আর হ্যা ডিনার করে যাবি।’

‘সায়েনকে সবটা বলবি না??’

‘এখনো সময় আসেনি। সময় হলে সব বলব।’

নিজের রুমে বসে আছে সায়েন। একটু আগেই শাফিনের সাথে কথা হলো ওর। শাফিন বলছে কবে যাবে ওবাড়িতে। সায়েন কিছু একটা বলে কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একথা তো আরাদকে কিভাবে জানাবে সেটা ভেবে পাচ্ছে না। কবিতা এসে ওকে খাইয়ে চলে গেছে। আর সকালে আসবে সে। সায়েন এপাশ ফিরে শুয়ে আছে। দরজা খোলার শব্দে উঠে বসলো সায়েন। কিন্তু কে এসেছে তা সায়েন বুঝতে পারছে। ড্রিম লাইট ব্যততী আর কোন আলো নেই রুমে। এই আলোতেই সায়েনকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে আরাদ। খাটের উপর সটান হয়ে শুয়ে পড়লো আরাদ। সায়েন ততক্ষণে ওড়না গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে। হাঁটু মুড়ে বসে সে আরাদের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ বন্ধ করে আছে আরাদ। সায়েন আরাদের ভাবগতি বোঝার চেষ্টা করলো কিন্তু সে ব্যর্থ হলো। আরাদ সায়েনকে এক টানে নিজের পাশে শোয়ালো। একহাতে ভর দিয়ে সায়েনের দিকে ফিরে বলল,’তখন চলে আসার জন্য কি পানিশমেন্ট দেওয়া যায় তোমাকে বলো তো??’

‘আমি আর কখনোই আপনার রুমে যাব না। আমি জানতাম না যে ওটা আপনার রুম। তনয়া আমাকে,,,,’

আরাদ তার তর্জনী আঙ্গুল দ্বারা সায়েনের ঠোঁটজোড়া আটকে দিলো। তারপর কন্ঠে কোমলতা এনে বলল,’ওটা তো তোমারও রুম।
সমস্যা কোথায় তাতে?? আমার কথা হলো তুমি আমার কথা অমান্য করে চলে এসেছো সেজন্য শাস্তি পেতে হবে তোমাকে।’

সায়েন এবার ভয় পেলো। কি শাস্তি দেবে আরাদ??সায়েনকে এভাবে ভয় পেতে দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো আরাদ। বলল,’যতক্ষন পর্যন্ত আমার ঘুম না আসছে ততক্ষন পর্যন্ত আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে তুমি এটাই তোমার শাস্তি। ইউর টাইম স্টার্ট নাউ।’

বলেই সায়েনের একহাত নিয়ে নিজের চুলে ডোবায় আরাদ। সায়েন ও বাধ্য মেয়ের মতো আরাদের চুল নিয়ে খেলতে লাগলো। একসময় সায়েন খেয়াল করলো যে আরাদ ঘুমিয়ে পড়েছে। একহাত দিয়ে সায়েনের কোমড় আলতো করে জড়িয়ে রেখেছে। আরাদের হাত ছাড়িয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। ঘুমন্ত অবস্থায় আরাদকে একটা নিঃষ্পাপ শিশুর মতোই লাগছে। আসলে ঘুমালে প্রতিটা মানুষকেই নিঃষ্পাপ লাগে। কিন্তু আরাদকে একটু বেশি স্নিগ্ধ লাগছে সায়েনের কাছে। সে আরাদের কাছে এগোতে গিয়েও থেমে গেল। কেন যেন অদৃশ্য এক পিছুটান আটকে দেয় সায়েনকে। এভাবে যে কখন ঘুম পরীরা এসে সায়েনকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গেল তা খেয়াল করলো না সায়েন। ঘুম থেকে উঠে আরাদকে দেখতে পেল না সায়েন। কখন উঠে চলে গেছে তা টের পায়নি। আড়মোড়া ভেঙে সায়েন ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়।

আরশ আর তনয়া বসে থাকতে থাকতে বেশ বিরক্ত হচ্ছে। পঁচিশ মিনিট যাবত গাড়িতে বসে আছে দু’জন। ঘামে দু’জনেই অস্থির। ড্রাইভার তখন থেকে গাড়ি ঠিক করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু পারছে না। হয়তো কঠিন কোন রোগ হয়েছে গাড়িটার। তনয়া গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভারকে বলল,’চাচা আর দেখতে হবে না। গাড়িকে বড় কোন ডক্টর দেখান গিয়ে। আমি দেখছি কোন গাড়ি ম্যানেজ করা যায় কিনা!!’
আরশিও ততক্ষনে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। তখনই একটা বাইক এসে থামলো ওদের সামনে। বাইকের মালিক হেলমেট খুলে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,’তোমরা এখানে??কোন সমস্যা??’
তনয়া হেসে বলল,’আসলে আকাশ ভাইয়া আমাদের গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে। একটু ড্রপ করে দেবে আমাদের??’

আকাশ দু’জনকে একবার পরখ করে দেখে বলল,’আচ্ছা চলো!!’

‘তুমি বরং আরশিকে নিয়ে যাও। দু’জন একসাথে বসলে সমস্যা হবে। আমি আমার এক বন্ধুকে আসতে বলেছি ও এখনই চলে আসবে।’

‘আচ্ছা তোমার বন্ধু আসুক তারপর নাহয় একসাথে যাব।’

তনয় পড়লো বিপদে। ও তো কোন বন্ধুকেই আসতে বলেনি। এখন কি হবে??আরশি তো অবাক হয়ে গেছে। কি হচ্ছে ওর মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ একটা বাইক আসতেই তনয় সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থামিয়ে দিলো বাইকটাকে। বাইকের মালিক কিছু বলার আগেই তনয়া বাইকে উঠে বসে আকাশকে উদ্দেশ্য করে বলল,’এইতো আমার বন্ধু এসে গেছে। তোমর যাও আমরাও যাচ্ছি। এই চল চল।’

বাইকের মালিক হেলমেট পরা তাই তনয়া ছেলেটাকে দেখতে পেল না। তনয়া ছেলেটাকে কিছু বলতে দিলো না। বারবার বাইক স্টার্ট দেওয়ার জন্য তাড়া দিতে লাগলো। অগত্যা ছেলেটা বাইক স্টার্ট দিলো।

#চলবে,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here