চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ২৮+২৯

0
110

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২৮

প্রিয় মানুষটির কাছাকাছি আসার প্রথম অনুভূতি কতখানি ভালোলাগা কাজ করে তা বোঝানো সম্ভব নয়। এই অনুভূতি সে’ই বোঝে যে তার প্রিয় মানুষের কাছাকাছি প্রথম আসে। যা আজকে আরশি হারে হারে টের পাচ্ছে। আকাশের পেছনে বসে আছে সে। আর আকাশ বাইক চালাচ্ছে। আকাশের কাঁধে হাত রাখতে সংকোচবোধ করছিল আকাশ তা বুঝতে পেরে নিজেই আরশিকে বলেছে ওর কাঁধে হাত রাখতে যেন পড়ে না যায়। আরশি তখন খুশিতে চকচক করছিল। চোখেমুখে খুশি উপচে পড়ছিল। আকাশের কাঁধে হাত রেখে চুপচাপ সামনে থেকে আসা গাড়িগুলো দেখতেছে। কিছু কিছু খুশির মুহুর্ত গুলো ক্ষণিকের জন্য হয়। তাড়াতাড়ি ভার্সিটিতে চলে এলো ওরা। কিন্তু আরশি আরো সময় চাইছিল। পথটা যদি তাড়াতাড়ি না ফুরাতো কি এমন ক্ষতি হতো??মুখটা গোমড়া করেই সে বাইক থেকে নেমে পড়লো। আকাশ কোন কথা না বলেই চলে গেল। আরশি ভেবেছিল কিছু হয়তো বলবে আকাশ কিন্তু ওর আশায় এক বালতি পানি ঢেলে চলে গেল সে। আরশি ভাবছে কবে এই মানুষটা ওর মনের কথা বুঝবে?মনের কথা মনে চেপে রাখার যে কষ্ট যার হয় শুধুমাত্র সে’ই জানে।
আকাশ চলে যেতেই আরশি অপেক্ষা করতে লাগল তনয়ার জন্য। কার বাইকে চড়ে বসেছে কে জানে??একটু পরেই বাইকটা এসে থামলো আরশির সামনে। তনয়া বাইক থেকে নেমে মুচকি হেসে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,’থ্যাঙ্কস’

আরশিকে ইশারায় যেতে বলে নিজেও যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ওড়নায় টান পড়তেই পিছন ফিরে তাকালো। এবার সে ছেলেটার মুখটা দেখতে পাচ্ছে কারণ সে হেলমেট খুলে ফেলেছে। ছেলেটার এহেম কাজে ভারি অবাক হলো তনয়া। ছেলেটা ওড়না হাতে পেঁচিয়ে একটানে তনয়াকে কাছে টেনে নিলো। রেগে গেল তনয়া বলল,’কি অসভ্যতামি করছেন??ওড়না ধরছেন কেন??’
ছেলেটা হাত মুচড়ে ধরলো তনয়ার। ব্যথায় তনয়া ‘আহ্’ শব্দ করে উঠলো। ছেলেটা রাগি কন্ঠে বলল,’তোর সাহস কি করে হলো আমার বাইকে ওঠার?? আবার তখন অর্ডার করছিলি??’

আরশি আর তনয় অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে।

‘আপনি তুই তুকারি করছেন কেন??ভদ্রতা সভ্যতা কি জানেন না?? মেয়েদের রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলতে শিখুন!!’

দমে গেল ছেলেটা তবে তা বুঝতে দিলো না। সে বলল,’রেসপেক্ট হাহ,শালার মেয়ে বলতেই ঝামেলা। কোন সাহসে আমার বাইকে বসলে??’

‘আপনি তখন বারন করতে পারলেন না?? এখন বলছেন??’

‘হুম!!তখন কিছু বলি আর ওই পুলিশ বেটা আমাকে ধরে নিয়ে যাক। ভালোই তো পেয়েছো তোমরা। তোমার জন্য আমার কাজের দেরি হয়ে গেছে। এখন টাকা বের করো।’

তনয়ার মাথা ঘুরছে কি বলছে ছেলেটা??টাকা বের করবে মানে কি??তনয়া রাগি গলায় বলে,’টাকা দেব কেন?? অসভ্য ছেলে কোথাকার!!আমি কোন টাকা দেব না। বাইকে করে নিয়ে এসেছেন বলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে নাকি??’

ছেলেটা কোন কথা না বলেই তনয়ার ব্যাগ টেনে নিয়ে চেক করতে লাগলো। তনয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ়,কি করবে বুঝতে পারছে না। ছেলেটা ব্যাগ হাতরে পনেরশো টাকা পেলো। সে ব্যাগটা তনয়ার হাতে দিয়ে বলল,’ফকিন্নি, মাত্র পনেরশো টাকা নিয়ে ঘুরছো??তবে চলবে এতে। এরপর যদি আমার সামনে দেখি তো নাক ফাটিয়ে দেব।’

বলে সে বাইক স্টার্ট দেয়। ছেলেটা চলে যেতেই তনয়ার হুস ফিরলো। অনেকটা চেঁচিয়ে বলে উঠলো,’তোকে আরেকবার যদি সামনে পাই তাহলে খুন করে ফেলব বেয়াদব ছেলে।’
রাগে ফোস ফোস করছে তনয়া। আরশি ক্যাবলাকান্তের মতো দাঁড়িয়ে ছিল এবার সে মুখ খুলল,’দেখলি তো কি হলো??তুই যদি আকাশ ভাইয়ার সাথে আমাকে না পাঠাতি তাহলে এরকমটা হতো না। তুইও অপমান হতি না।’
তনয়া মুখ বাঁকিয়ে বলে,’হুম!!যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর!!এরজন্যই বলে কারো ভালো করতে নেই। আর ওই ব্যাটাকে আরেকবার পাই বাপের নাম ভুলিয়ে দেব।’

রাগে গজগজ করতে করতে ক্লাসে চলে গেল তনয়া ওর পিছু পিছু আরশিও দৌড় দিলো।

ফুরফুরে মেজাজে রেস্টুরেন্টে ঢুকলো ইফতি।ওর কয়েকজন ফ্রেন্ড আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। কঙ্খিত চেয়ারে বসে টেডি স্মাইল দিলো সে।

‘কি রে এরকম হাসছিস কেন??আজকে কাকে বোকা বানালি??’

টেবিলের উপর হাত রেখে ইফতি হেসে বলে উঠলো,’একটি মেয়েকে!! পনেরশো টাকা মেরে দিয়েছি। তবে এতে আমার আজকের দিনটাও চলবে না। দেখি কি করতে পারি। আম্মুর কাছ থেকে আনতে হবে। রাতের প্ল্যান কি?? আজকে আমার ডাবল ডোজ লাগবে কিন্তু??’

‘মামা,টাকা দিলে সব পাবে। দুনিয়া সে’ই রাজ করে যার টাকা বেশি।’

স্পিরিটের ক্যানে চুমুক দিয়ে হাসলো ইফতি।বড়লোক বাবার ছেলে সে। বড় ভাই ভাবি আর বাবা মায়ের সাথে থাকে সে। ভাইয়া বাবার বিজনেস দেখছে। আর ইফতি!!নাইট ক্লাব আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা ছাড়া কিছুই করে না সে। বাজে নেশাও করে। এরজন্য কয়েক বার থানায়ও গিয়েছে সে। আকাশের সাথে সে খুব ভালো ভাবেই পরিচিত। তাই তখন তনয়াকে কিছু বলেনি। হেলমেট পরা থাকায় আকাশ ও ইফতিকে চিনতে পারেনি। ছেলে উচ্ছন্নে উঠেছে দেখে ইফতির বাবা ওকে কোনরকম হাতখরচ দেয়না। এমনকি ইফতির ভাইও ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এতে যদি ইফতি ঠিক হয়। কিন্তু হচ্ছে উল্টো!!এতে ইফতি বিন্দুমাত্র বদলায়নি। নতুন ধান্দা শুরু করেছে। মানুষকে বোকা বানিয়ে টাকা নেওয়ার ধান্দা। সেরকমই আজকে সে তনয়াকে পেয়েছে। তাই তনয়ার টাকা মেরে দিয়েছে সে। অবশ্য ইফতি ওর মায়ের থেকে টাকা নেয়। আর যে যাই করুক মা কখনো সন্তানের প্রতি কঠোর হতে পারে না। ইফতির মুখের দিকে তাকালেই তিনি পানির মতো গলে যায়। ছোট সন্তানকে তিনি আদরে আদরে বাঁদরে পরিণত করেছেন।

____________

গাড়ির জানালা দিয়ে সপ্তবর্নে আকাশ দেখে চলেছে সায়েন। বাসন্তি রঙের সুতি শাড়ি গায়ে জড়ানো তার। চুলগুলো খোপা করে রেখেছে। চুল খুলে রাখতে বলার কেউ যে নেই তার। যে সায়েনকে রাগি কন্ঠে বলবে তোমাকে খোলা চুলেই দারুন মানায়। অতঃপর সে আদুরে স্বরে বলবে চুলগুলো খুলে দিতে। আর সায়েন তার কথায় বাধ্য হবে খোপা খুলতে। কিন্তু একথা বলার কেউ নেই সায়েনের।এমনকি আরাদও নয়। সে কখনোই সায়েনের সাজগোজ নিয়ে কথা বলে না। সবসময় চুপচাপ থাকতেই দেখা যায় আরাদকে। আজকেও যখন বের হচ্ছিল সায়েন তখন আরাদের সামনে একবার পড়েছিল। বার কয়েক চোখের পলক ফেলে আরাদ সায়েনকে যাওয়ার অনুমতি দেয়। নিজের পরিবারের সাথে দেখ করতে গিয়েছিল সায়েন। শাফিন রুহি আর ওর বাবার সাথে দেখা করে। শাফিন কিছুতেই সায়েনকে আসতে দিচ্ছিল না। অবশেষে ডিনার করেই আসতে দিলো সায়েনকে। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সায়েন আসতেই সে সায়েনকে নিয়ে গন্তব্যস্থলে রওনা হয়। আজকে বাবাকে দেখে খুব অবাক হয়েছে সায়েন। স্বাভাবিক ভাবেই আছেন তিনি। কিন্তু শাফিনকে অনেকটা উত্তেজিত হতে দেখেছে সায়েন। আরাদের সাথে কিছুতেই সে তার বোনকে মানতে পারছে না। মনের ভেতর ক্ষোভ জন্মেছে শাফিনের। কিন্তু শাফিন আর রুহিকে সুখি দেখে সায়েন মনে মনে খুশি হয়। তবে পরক্ষনেই সায়েনের মনটা খারাপ হয়ে যায়। কারণ বিয়ের পর থেকে শাফিন ওর শ্বশুর বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক ছেদ করেছে। কিন্তু রুহিকে ওর বাড়ি যেতে অনুমতি দিয়েছে। রুহি যায়নি,নিজের পরিবারের এরকম কাজে রুহি নিজেই লজ্জিত। তাই সেও ওই পরিবারের কারো সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় না। হয়তো পরে ঠিকই সবাই একদিন মিলে যাবে তবে সময়ের প্রয়োজন। সায়েন এবিষয়ে কোন কথাই বলেনি। ওদের ব্যাপার ওরাই ঠিক করুক।
গাড়ি থেমে গেছে অনেকক্ষণ কিন্তু সায়েন এখনও অতীতের কিছু স্মৃতি বিচরণ করছে। ড্রাইভারের কথায় ধ্যান ভাঙল সায়েনের। শাড়ির আঁচল ভালো করে গায়ে জড়িয়ে গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়লো সে। দরজায় সে কবিতাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো। কবিতা এখনও বাড়িতে যায়নি!!সায়েন বলল,’তুমি এখনও যাওনি??’

কবিতা মাথা নেড়ে বলল,’স্যার বলেছে আপনি না ফেরা পর্যন্ত থাকতে। চলুন আপনাকে রুমে দিয়ে আসি।’

কবিতার সাথে ছাদের চিলেকোঠার ঘরে এলো সায়েন। তারপর সে কবিতাকে বলল,’আমরা প্রায় সমবয়সী। তুমি আমাকে তুমি করে ডেকো। আর নাম ধরেও ডেকো।’

সায়েনের কথায় আতংকিত দেখা গেল কবিতাকে। সায়েন কবিতার এরকম করার মানে বুঝলো। সে বলল,’তোমার স্যার কিছুই বলবে না। আমি ওনাকে বলে দেব।’

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সায়েন চুড়িগুলো খুলতে লাগল। কিন্তু দুটো চুড়ি খুলেই সে থেমে গেল। ঘুরে কবিতাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তোমার ছেলের বয়স কতো??’

কবিতা মুচকি হেসে উওর দিলো,’দেড় বছর।’

‘আর তোমার হাজবেন্ড??’

‘গার্মেন্টসে চাকরি করেন উনি। আর আমার ছেলে শ্বাশুড়ির কাছে থাকেন।’

সায়েন ছোট্ট করে বলল,’ওহ’ তারপর সায়েন আবার নিজের কাজে মগ্ন হয়ে গেল। কানের দুল খুলতে খুলতে সায়েন বলল,’আমি জানি তুমি তোমার হাজব্যান্ড কে খুব ভালোবাসো। আচ্ছা তোমার হাজব্যান্ড তোমাকে কিরকম দেখতে পছন্দ করে??মানে কিরকম সাজে??শাড়ি না সালোয়ার, খোলা চুল নাকি খোপা,,,’

বলতে বলতেই সায়েনের চোখ যায় আয়নার দিকে। এতক্ষণ সে নিচের দিকে তাকিয়ে কানের দুল খুলছিল। হঠাৎ চোখ যায় আয়নার দিকে। থেমে যায় সায়েন। আয়নায় আরাদের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। সাথে সাথে পেছনে ঘুরে তাকালো সায়েন। উঁকি দিলো আরাদের পেছনে। সায়েনের দৃষ্টি অনুসরণ করে আরাদ একপলক পিছনে তাকিয়ে আবার সায়েনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসলো। আরাদ মৃদু হেসে বলল, ‘ভালোবাসার কোন সাজ হয়না সায়েন। ভালোবাসার ধরন হয়। সেই ধরন বোঝার ক্ষমতা সবার হয়না।’

সায়েন স্নিগ্ধ নয়নে তাকালো আরাদের দিকে। আরাদ আরেকটু কাছে এগিয়ে এলো সায়েনের। একহাত দিয়ে সায়েনের খোঁপায় লাগানো ক্লিপ গুলো খুলতে খুলতে বলতে লাগলো,’তোমার সাজ নিয়ে কখনোই কোন অভিযোগ নেই আমার। কারণ সব সাজেই তোমাকে আমার কাছে মোহনীয় লাগে। নতুন নতুন সাজে তোমার মধ্যে নতুনত্বের স্বাদ পাই আমি। প্রতিদিন নতুন তুমিতে পরিচিত হতে আমার যে খুবই ভালো লাগে। এতে তোমার প্রেমে প্রতিদিন পড়ি আমি। এটা যে কতটা সুখানুভূতি সৃষ্টি করে তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না সায়েন!!আমি যে তোমার মধ্যে প্রতিদিন নতুন সায়েনকে খুঁজে চলি। কিন্তু সেই আগের সায়েনকে খুঁজে পাই না। সময়ের সাথে সাথে সেই সায়েন হারিয়ে গেছে। তবুও হাল ছাড়িনি আমি। আমি আমার আগের সায়েনকে চাই।’

আরাদের প্রতিটা কথার ভাজে কিছু অব্যক্ত অনুভূতি লুকিয়ে আছে যা ধরতে সায়েন অক্ষম। হয়তো ওর বোঝার ক্ষমতা নেই যেমনটা আরাদ বলেছিল। কিন্তু এই কথাগুলো যে সায়েনের বোঝা দরকার!! নাহলে আরাদের সাথে ওর দূরত্ব বাড়বে বৈ কমবে না। আরাদ ক্লিপগুলো নিয়ে পকেটে রেখে দিলো। সায়েন এতক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে আরাদকে দেখলেও আরাদের শেষের কাজে কপাল কুঁচকে এলো সায়েনের। ক্লিপগুলো পকেটে রাখার কারণ কি হতে পারে??সায়েন তাই মুখ ফুটে প্রশ্ন করেই ফেলে,’ওগুলো পকেটে রাখলেন কেন??’

পকেটে হাত গুজে বাঁকা হয়ে দাড়িয়ে আরাদ বলল,’তোমার খোপা থেকে খসে পড়া গোলাপের পাপড়ি গুলো যত্নে রেখে দিয়েছি। তোমার খোলা চুলে আটকে থাকা কাঠগোলাপও সযত্নে ডায়রির ভাজে চাপা পড়ে আছে। এমনকি শুকনো বেশি ফুলের গাজরাটাও। তাহলে এগুলো নেওয়া নিছকই সারাধারন নয় কি??’

আরাদের প্রতিটা কথা সায়েনকে মুগ্ধ করে। এবারও তার বিপরীত হলো না। শান্ত দৃষ্টিতে সেই তাকিয়ে রইল আরাদের হাসিমাখা মুখটার দিকে। কেন সে দূরে ঠেলে দিতে চাইলেও পারছে না??কি এমন শক্তি আছে আরাদের??যা সায়েনকে এভাবে টানছে??নেশাক্ত সেই আকর্ষণ শক্তি। সায়েনের এরকম চাহনি দেখে হাসলো আরাদ। হালকা ঝুঁকে মাটিতে লুটিয়ে থাকা সায়েনের শাড়ির আঁচল উঠিয়ে বলল,’শাড়ির আঁচল এতো বড়ো রাখো কেন যদি সেই আঁচলে আমাকে বাঁধতেই না চাও??’

চমকে উঠলো সায়েন। আরাদের হাতের মুঠোয় থাকা শাড়ির আঁচলের দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও আরাদের মুখের দিকে তাকালো। এতো মাদকতা কেন আরাদের কথায়?? পাগল করে দেয় সায়েনকে। মাঝেমধ্যে সায়েনের মনে হয় সুই সুতো দিয়ে আরাদের মুখটা সেলাই করে দিতে। যাতে এরকম নেশাক্ত গলায় কথা না বলতে পারে। সায়েন ঘোরের মধ্যে পড়ার আগেই কাবার্ড থেকে ড্রেস নিয়ে বাথরুমে চলে যায়। ইচ্ছে করেই দেরি করে বের হয় সে। কিন্তু আরাদকে কোথাও দেখতে পায় না। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয় সায়েনের। বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সে।

পরেরদিন রেডি হয়ে বের হতেই নিলিমা বেগমের সাথে দেখা আরাদের। সবার সামনেই নিলিমা বেগম আরাদ আর সামিউক্তার এংগেজমেন্টের প্রস্তাব রাখেন। তবে আরাদের ভাবগতি কারো সুবিধার ঠেকলো না। আরাদ জবাব না দিয়েই বের হয়ে যায়। রাতে এসে ওর সিদ্ধান্ত জানাবে বলে যায় সে। সে আগ্রহেই ছেলের আসায় বসে থাকেন নিলিমা বেগম।

ভার্সিটির ক্লাস শেষে রেস্টুরেন্টে যায় আরশি তনয়া। দু’জনেই সামিউক্তাকে নিয়ে কথা বলছে। আরাদ এবার কি করবে তা নিয়ে আলোচনা করছে ওরা। সায়েনকে নিয়েও কথা বলছে দু’জনে। হঠাৎ কারো চিৎকারে সেদিকে তাকালো দুজে। রেস্টুরেন্টে বেশি মানুষ নেই। নেই বললেই চলে। তবে একটু পরেই মানুষের আনাগোনা বাড়বে। একটা ছেলে সার্ভেন্টের সাথে তুমুল ঝগড়া বাধিয়েছে। কি নিয়ে ঝগড়া করছে তা জানার জন্য দু’জনেই ভালো করে মনোযোগ দিলো। তনয়া তো রিতিমত অবাক। এতো কালকের সেই বজ্জাত ছেলেটা। এখানেও ঝগড়া করছে দেখে মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল তনয়ার। ভাবলো আজকে ছেলেটাকে উচিত শিক্ষা দিবে। তাই সে রেগেমেগে উঠে দাঁড়ালো ছেলেটাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২৯

তনয়া রেগেমেগে নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। আরশি চেয়েও বাঁধা দিতে পারলো না। এখন না জানি আবার কোন ঝামেলায় জড়ায় তনয়া?? পরিস্থিতি সামাল দিতে আরশিও সেদিকে ছুট লাগালো। তনয়া গিয়ে ইফতির সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,’এই যে মিস্টার,আপনি এখানেও ঝগড়া বাঁধিয়েছেন?
আপনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কি ঝগড়া ছড়িয়ে আছে?? আমার পনেরশো টাকা মেরে দিব্যি চিল করছেন তাই না??আমার টাকা ফেরত দিন তাড়াতাড়ি??’

ইফতি অবাক হলো তনয়াকে দেখে। কিন্তু সে বিরক্ত ও হলো খুব। এমনিতেই এক ঝামেলায় পড়েছে আবার আরেক ঝামেলা এসে হাজির। ইফতি বিরক্ত স্বরে বলল,’তুমি এখান থেকে যাও। কোন কথা বলতে চাই তা তোমার সাথে।’

‘আমার ও সেই ইচ্ছা নেই। আমার টাকা ফেরত না দিয়ে কোথাও যেতে পারবেন না আপনি।’

ইফতি তনয়ার কথায় কান না দিয়ে সার্ভেন্টকে ঝাড়তে ব্যস্ত হয়ে গেল। সে বলল, ‘এই রেস্টুরেন্ট আমি বন্ধ করে দেব। জাস্ট দেখবে শুধু। খাবারের মধ্যে টিকটিকির লেজ!!ম্যানেজারকে ডাকো তাড়াতাড়ি!!’

ভয়ে কাচুমাচু হয়ে যাওয়া সার্ভেন্ট জবাব দিলো,’স্যার এরকম তো কখনোই হয় না। কিন্তু আজ কিভাবে হলো বুঝতে পারছি না। আপনার হয়তো কোন ভুল হচ্ছে।’

এতে গর্জে উঠলো ইফতি বলল,’তোমার সাহস হলো কিভাবে আমার মুখের উপর কথা বলার?? তোমার চাকরিও আমি নিয়ে নেব।’

তনয়া এবার হিসাব মেলাতে পারলো যে কেন ঝগড়া হচ্ছে। নিশ্চয়ই এই ছেলের কারসাজি এসব। তাই সে বলল,’কোন টিকটিকির লেজ ফেজ নেই খাবারে। এই ছেলটা ধান্দা করছে। আমার টাকা নিয়েছে এখন বিন টাকায় এখানে খেতে চাইছে। আ’ম সিওর এই ছেলেটার কাছে টাকা নেই।’

তনয়ার কথায় বারবার বিরক্ত হচ্ছে। সে গলা খেকিয়ে বলে,’বেশি বোঝ তুমি?? আমার কাছে টাকা আছে কি না নেই তা তুমি জানো কিভাবে??’

‘তাহলে ওয়ালেট দেখান আমরাও দেখি??’

ইফতি পকেটে হাত দিয়ে ওয়ালেট বের করে তনয়ার হাতে দিলো। মনে মনে বিশ্বজয়ের হাসি দিল তনয়া। এটাই তো ও চাইছিল। ইফতি ততক্ষণে বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তনয়া ওয়ালেট চেক করে বলল, ‘ঠিক আছে!! আপনি যথেষ্ট ধনী ব্যক্তি। আপনার ওয়ালেট।’

থাবা মেরে ওয়ালেট নিয়ে পকেটে পুরো ফেললো ইফতি। সে তনয়ার দিকে না তাকিয়ে আবার সার্ভেন্টকে বকতে লাগলো। তনয়া আরশিকে নিয়ে বের হয়ে আসলো। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তনয়া বারবার রেস্টুরেন্টের দিকে উঁকি দিতে লাগল। আরশি জিজ্ঞেস করল,’কি রে গাড়িতে ওঠ?? এভাবে উঁকি দিচ্ছিস কেন?? আবার ঝগড় করার সাধ জেগেছে তোর??’

‘তুই গাড়িতে ওঠ আমি পরে উঠব।’

‘পরে উঠবি মানে??বাড়িতে যাবি না??’

‘উফফ কথা বলিস না তো চুপচাপ গাড়িতে ওঠ।’
আরশি গাড়িতে উঠে বসলো আর তনয়া ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। অবশেষে তনয়ার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইফতি বের হলো। সে তনয়ার দিকেই তেড়ে আসছে। তনয় চট জলদি গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলল। ইফতি গাড়ি ধরতে পারলো না সে চেঁচিয়ে বলল,’বেয়াদব মেয়ে!! আমার টাকা নিয়ে পার পাবে তুমি??’
গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করলো তনয়া। ডেভিল হাসি দিয়ে বলে,’যেমন কুকুর তেমন মুগুর। আমার টাকা নিয়েছিলেন না??তাই আমি আমার টাকা ফেরত নিলাম।’

রাগে গজগজ করছে ইফতি। এতদিন ও সবাইকে বোকা বানিয়েছে আর আজকে একটা মেয়ে ওকে বোকা বানালো!!রাগে সে নিজের বাইকে লাথি মারলো। গাড়িতে বসে বসে তনয়া মন খুলে হাসছে। আর আরশি অবাক হয়ে দেখছে। তনয়ার হাসি থামছেই না দেখে আরশি জিজ্ঞেস করে,’পাগলের মতো হাসছিস কেন??কি হয়েছে বলবি তো??’

কষ্টে হাসি থামালো তনয়া বলল,’বদমাইশ ছেলেদের কিভাবে টাইট দিতে হয় তা আমার ভালো করেই জানা আছে। সেদিন আমার টাকা নিয়েছে আর আজ আমি সিম্পল।’

‘ওয়ালেট চেক করার নামে টাকা নিয়েছিস তুই??’

মাথা ঝাকালো তনয়া,আরশিও হেসে ফেলে। দু’জনে খুনসুটির মধ্যে দিয়েই বাড়িতে ফেরে।

আজ সারাদিন একটুর জন্যও আরাদের মুখটা দেখেনি সায়েন। ছটফট করছে কঙ্খিত মানুষটার মুখটা এক পলক দেখার জন্য। অথচ সে মানুষটা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকগুলো দিন সে আরাদকে দেখেনি। অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল সায়েনের। এতদিন পর সে অভ্যাসটা ভেঙে নতুন অভ্যাস গড়ে তুলেছে আরাদ। রুমে বসেই দিন কাটিয়েছে সায়েন। বিকেলের দিকে একটু ছাদে গিয়েছেল। সূর্যাস্তের পর আবার ফিরে এসেছে নিজের রুমে। সন্ধ্যায় ও আরাদের দেখা নেই। কিন্তু সন্ধ্যার পর তো আরাদ ফিরে আসে। তাহলে কি আজকে আসেনি?? কিছু একটা ভেবে সায়েন গুটিগুটি পায়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে এলো। উপর থেকে ড্রয়িং রুমে চোখ বুলায় সে। নাহ কেউ নেই। তাহলে আরাদের রুমে একবার যাওয়াই যায়। কিন্তু যাওয়ার জন্য যেই না সায়েন পিছনে ঘুরেছে অমনি সে চমকে উঠে। বুকটা ওর ধকধক করছে। বুকে হাত দিয়ে সে নিলিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্দিহান চোখে নিলিমা বেগম প্রশ্ন করলেন,’তুমি এখানে কি করছো??তাও এই সন্ধ্যাবেলায়??’

শুকনো ঢোক গিলে তাকালো সায়েন। মনের মধ্যে নিলিমা বেগমের করা প্রশ্নের জবাব খুঁজতে লাগল। কিন্তু ভাগ্য ওর সহায় নেই। মনের মধ্যে হাতরে কোন উওর সে খুঁজে পেল না। ভয়ে সে সব কথাই ভুলে গেছে। সায়েন এখনও এবাড়ির কারো পরিচয় ঠিকমতো জানে না। শুধু তামিম তনয়া আর আরশিকেই চেনে। তাই নিলিমা বেগমকে দেখে ঠিক চিনতে না পারলেও সে ঠিক বুঝে গেছে যে এটা আরাদের মা। যদিও নিলিমা বেগমের সাথে আরাদের চেহারার কোন মিল নেই। আরাদ দেখতে ওর বাবার মতোই হয়েছে। কিন্তু আরশি দেখতে ওর মায়ের মতো। তাই সায়েন বুঝতে পারলো যে এই ভদ্রমহিলাই আরাদের গর্ভধারিনী মা। এজন্য সায়েন একটু বেশি ভয় পাচ্ছে। কথা বের কতে গিয়ে বারবার ঢোক গিলছে। কিন্তু কথা কিছুতেই বের হচ্ছে না। সায়েনের এরকম অবস্থা দেখে নিলিমা বেগম প্রশ্ন ছুঁড়লেন,’আরাদের রুমের সামনে কি করছো তুমি??’

সায়েনের অবস্থা এখন আরো নাজেহাল। দু’হাতে ওড়নার প্রান্ত মুঠো করে ধরে রেখেছে। শরীরের সব ভর সে ওড়নার উপর চালাচ্ছে। নিলিমা বেগম বেশ বিরক্ত হলেন। তিনি ফের কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই পেছন থেকে এক নারী কন্ঠ ভেসে আসে,’ম্যাম আমার খোঁজেই এসেছেন।’

পিছন ফিরে তাকালেন নিলিমা বেগম। কবিতা কফির কাপ হাতে সামনের দাতকপাটি বের করে হাসছে। এই মেয়েটাকে যেন পছন্দই করে না নিলিমা বেগম। তিনি কিছু না বলেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন। কি যেন ভেবে থমকে দাড়িয়ে সায়েনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন, ‘চিলেকোঠার ঘর থেকে যেন কখনো বের হতে না দেখি তোমাকে??কথাটা মনে রেখো??’

মাথা নাড়লো সায়েন। নিলিমা বেগম সায়েনকে অপছন্দ করে সেটা সায়েন জানে। নাহলে প্রায় পনের দিন পার হয়ে গেছে একটা দিন ও নিলিমা বেগম সায়েনের সাথে কথা বলেনি। ব্যস্ত পায়ে নিলিমা বেগম সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেলেন। কবিতা বুকে হাত রেখে জোরে শ্বাস নিলো বলল,’এই দু’জন মহিলা আমার সামনে থাকলে আমার শ্বশন ক্রিয়া কাজ করে না।’
বলেই কবিতা সায়েনের দিকে এগিয়ে গেল। কফির ট্রে সায়েনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আরাদের রুমের দিকে ইশারা করলো। এর মানে কবিতা কফিটা আরাদের জন্যই এনেছে। নিলিমা বেগমের হাত থেকে সায়েনকে বাঁচাতে সে মিথ্যা বলেছে।

‘স্যার তোমাকে ভেতরে যেতে বলেছে।’

আর কথা বাড়ালো না সায়েন। দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকলো সে। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে চোখ পড়লো আরাদের দিকে। টাউজার পরে উদাম গায়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে ব্যস্ত আরাদ। চুলের পানিকণাগুলো ছিটকে পড়ছে আয়নার উপর। মাথা নিচু করে ফেলল সায়েন। আরাদ না তাকিয়েই সায়েনের অস্তিত্ব টের পেয়ে বলে,’দরজা আটকে দাও।’

কেঁপে উঠলো সায়েন। এই ছেলে আবার দরজা আটকাতে বলছে কেন??মতলব সুবিধার ঠেকছে না সায়েনের। কিছু তো ঘাপলা নিশ্চয়ই আছে। সায়েন দরজা আটকালো না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই রইল। তোয়ালেটা রেখে আরাদ নিজেই এসে দরজা আটকে দিলো। তারপর বিছানার উপর থেকে শার্ট নিয়ে পরলো। কিন্তু এতে কোন লাভ হলো না। কারণ শার্টটা সম্পূর্ণ নেটের। পুরো শরীর দেখা যাচ্ছে আরাদের। আরাদ যখন শার্টের বোতামগুলো লাগাতে ব্যস্ত তখন সামনে দাঁড়ানো রমনির আখিপল্লব আরাদকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ব্যস্ত। সে আরাদের সবকিছু অবলোকন করে চলেছে ছোট্ট দুটো চোখের দ্বারা। কিন্তু আরাদ সায়েনের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই সায়েন তার দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। লজ্জার লাল রঙে ছেয়ে গেল সায়েনের গাল। চোখজোড়া আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল তার‌।
গাঁয়ের কম্পন আরো বেড়ে গেল ঠান্ডা অধরের স্পর্শে। সে চোখ মেলে তাকালো। আরাদ মাত্রই সায়েনের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে সরে দাঁড়িয়েছে। সায়েন তাকানো মাত্রই সে কফির কাপ টেনে নিলো সায়েনের হাত থেকে। কফির কাপে শব্দ করে চুমুক দিয়ে হাসি সমেত তাকালো সায়েনের দিকে। সায়েন এখনও আগের দৃষ্টিতে আরাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাদ দ্বিতীয় বার কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,’তোমার লাজে রাঙা গালে চুমু না খেয়ে পারলাম না। তবে এরজন্য সরি আমি বলব না। তোমার দোষেই চুমু খেয়েছো তুমি।’

সায়েনের চোখ দুটো আগের থেকে কিন্ঞ্চিৎ বেশি প্রসারিত হলো। লজ্জা পেলে যে চুমু নামক শাস্তি পেতে হয় তা আজ সে প্রথম জানলো। লজ্জা পাওয়া বুঝি দোষের কাজ??মনের মধ্যে প্রশ্নটা আওড়াতে লাগলো সে। অনেকটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেছে সায়েন। হঠাৎ কোমড়ে ঠান্ডা হাতের স্পর্শে হুস ফিরল সায়েনের। চকিতে তাকালো আরাদের দিকে। নিজের কাছে সায়েনকে টেনে নিয়ে আরাদ বলল,’খুব মিস করছিলে বুঝি??’

সায়েনের ঠোঁট দুটো নড়ে উঠলো। তবে কথা বের হলো না। আরাদ আবার বলে উঠলো, ‘জবাব খুজে পাচ্ছো না তাই তো?? সত্যি বলো না সায়েন??এখনও ভালোবাসো তুমি আমাকে!! তোমার এই একটা কথা শোনার জন্য চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করছি আমি।’

সায়েন এবার কিছুটা শক্ত হলো। আগে ভালোবাসা শব্দটা শুনলে নরম হয়ে যেতো সে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন এই শব্দটা ওকে শক্ত করে দেয়।

‘কাকে ভালোবাসি বলব আপনাকে??হুহ,হাসালেন যার শুরটা মিথ্যা দিয়ে ছিল তার ভালোবাসা কিভাবে সত্যি হয়??’

আরাদ কাতর কন্ঠে বলল,’একবার শুধু ভালোবাসি বলেই দেখো,মিথ্যা কি তা তুমি নিজেই ভুলে যাবে। সব ভালোবাসা কিন্তু সত্যি দিয়ে হয় না। একবার ভেবেই দেখো, সত্যি দিয়ে ভালোবাসা শুরু হলেও কিন্তু সে ভালোবাসা সবক্ষেত্রে টিকে না?? আবার অনেক সময় মিথ্যা দিয়ে শুরু ভালোবাসা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে ধরার বুকে। ধরে নাও ওর মধ্যে আমার ভালোবাসা ও আছে। কিন্তু আমার ভালোবাসা সম্পূর্ণ পিওর। সেটা আমার থেকে তুমি বেশি জানো কিন্তু মুখে স্বীকার করছো না।’

দমে গেল সায়েন। আরাদের সাথে কথায় সে কখনও পেরে ওঠেনি এবং ভবিষ্যতে পারবে বলে মনে হয় না। আরাদ নিজের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে সায়েনের মুখের উপর আছড়ে পড়া চুলগুলো সরিয়ে দিলো। কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ রেখে আবার চোখ খুলল সায়েন। বেশ কড়া গলায় সে বলল,’তাহলে আমাদের বিয়ের কথাটা বলতে পারছেন না কেন??কেন বলছেন না?? আবার নতুন মিথ্যা খেলায় কেন মেতেছেন?? আমার মতো মেয়েকে বিয়ে করেছেন জানতে পারলে সবাই আপনাকে ছিঃ ছিঃ করবে তাই??বলবে একটা বিধবা তার উপর ক্রিমিনাল মেয়েকে আরাদ ওয়াদের বিয়ে করেছে?? আপনি তো আমার থেকে ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করেন??’

সায়েনের ঠোঁটে আঙুল চেপে সায়েনকে চুপ করিয়ে দিলো আরাদ। ফিচেল গলায় বলল, ‘তোমাকে সবার সামনে আনার সাহস আছে আমার। কিন্তু তোমাকে সবার সামনে এনে কি হবে যদি তুমি আমার না হও। তুমি তো আমার হয়েও নেই। মন থেকে সম্পর্কের মান দিতে না পারলে বাইরের মানুষকে জানিয়ে কি লাভ??তাই বলে এই না যে তোমাকে সবার সামনে আনবো না!! অবশ্যই সবাই জানবে মিসেস ওয়াহেদের কথা। কিন্তু তার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন। ততক্ষণে আমার উপর একটু বিশ্বাস রাখো সায়েন। এই আরাদকে দ্বিতীয় বার ভুল বুঝো না।’

পর পর কয়েকবার ঢোক গিলে সায়েন আরাদের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। সচরাচর সে খুব কম কথাই বলে। তাই চলে যেতে উদ্যত হলেই আরাদ এক টানে সায়েনের ওড়না টেনে নিয়ে নিজের গলায় পেঁচিয়ে নিলো। সায়েন কে কিছু বলতে না দিয়েই সে পা বাড়ালো সুইচ বোর্ডের দিকে। সায়েন মুখ খোলার আগেই সাদা বাতিটি নিভে গেল। এবং সাথে সাথে নীলাভ ড্রিম লাইটটা জ্বলে উঠলো। সায়েন কিছু বলার আগেই সায়েনকে টেনে বিছানায় শুইয়ে দিলো আরাদ। দুহাতে জড়িয়ে ধরলো নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে। হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছে না সায়েন। ওর এখন কি করা উচিত তাও বুঝতে পারছে না সায়েন। আরাদ সায়েনের ঘাড়ে কপাল ঠেকিয়ে বলল,’আমাদের বিয়ের পনেরো দিন পার হয়ে গেছে সায়েন অথচ দেখো এখন পর্যন্ত বাসর হলো না। অবশ্য দোষটা আমারই। সবকিছু হুটহাট করে করে ফেললাম। তবে একদিন আমাদের বাসর ঠিকই হবে।’

আরাদের কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই চো বন্ধ করে ফেলে সায়েন। লাগামহীন কথা বলতে আরাদ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বোধহয়। সবসময় এরকম কথ বলবেই বলবে। সায়েন চুপ করে আরাদের স্পর্শ আর নিশ্বাস অনুভব করছে। ঘাড়ে আরাদের তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে আরাদের। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালালো না। মুখে না মানলেও মনে মনে আরাদের বাহুডোরে নিজেকে রাখতে ইচ্ছে করছিল সায়েনের। তাই সে চুপ করে আছে। কিন্তু তা বুঝি আর হবে না। দরজায় কড়াঘাতের শব্দে উঠে বসলো দু’জনে। সায়েন কিছু না বুঝলেও আরাদ বুঝলো কে এসেছে!!গলা থেকে সায়েনের ওড়না খুলে সায়েনকে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আরাদ। ড্রিম লাইটের আলোয় পাতলা শার্ট খুলে টিশার্ট পড়ে নিলো সে। দরজা খোলার আগে বিছানায় বসা সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলে,’ফিরে এসে যেন তোমাকে পাই!!এবার যদি না পাই তাহলে খবর আছে।’
বলেই আরাদ বের হয়ে চলে গেল। সায়েনও হাঁটু মুড়ে চুপচাপ বসে আরাদের অপেক্ষা করতে লাগলো

#চলবে,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here