চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ৩০+৩১

0
95

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩০

শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রুমটায় গুটিসুটি মের বসে আছে সায়েন। ড্রিম লাইট এখনও জ্বলছে। ওড়নাটা নিজের সাথে ভালো করে পেঁচিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে সায়েন। এসির টেম্পারেচার বাড়ানো তাই সায়েনের শীত লাগছে। ওর রুমে টেম্পারেচার লো তে থাকে সবসময়। কারণ এসির নিচে থাকার অভ্যাস নেই ওর। হাত দিয়ে নিজের বাহু আঁকড়ে ধরে বসে আছে সায়েন। প্রায় ঘন্টার বেশি সময় পার হয়ে গেছে এখনও আরাদের দেখা নেই। সেই কখন বেরিয়েছে আরাদ। কি করছে কে জানে??সায়েন আপন মনে অতীতে স্মৃতিচারণ করতে লাগলো। সেই সময়গুলো মধুর ছিল। সময় করে আরাদের সাথে দেখা করা। মা’কে ফাঁকি দিয়ে খাবার নিয়ে চিলেকোঠার ঘরে যাওয়া। মাঝেমধ্যে আরাদ সায়েনের রুমে চলে আসতো তখন ভয়ে সায়েন জমে যেতো। এসব ভাবতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল সায়েনের। সায়েনদের চিলেকোঠার ঘরটা ছিল অত্যন্ত নোংরা। অনেক বছর বন্ধ থাকায় সেখানে ভ্যাপসা গন্ধ পেতো সায়েন। কিন্তু আরাদ ওই নোংরা স্থানে থাকতো শুধু মাত্র সায়েনের জন্য। অথচ আরাদ বিরাট অট্টলিকায় থাকতে পছন্দ করে। এসি রুম ছাড়া সে থাকতেই পারে না। এতে কি বোঝা যায় না যে আরাদ সায়েনকে ঠিক কতখানি ভালোবাসে!!!সায়েন সবই বুঝতে পারছে। মনের অনুভূতি গুলো আবার নাড়া দিয়ে উঠছে। হাঁটু মুড়ে তারপর হাত রেখে মাথা এলিয়ে দিলো সায়েন। বারান্দার দিকে এক মনে তাকিয়ে আছে সে। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের টেবিলে থাকা ফটোফ্রেমের দিকে তাকালো সায়েন। আবছা আলোয় আরাদের ছবিটা জ্বলজ্বল করছে। ব্ল্যাক সুট আর সাদা শার্ট পরা আরাদ। ডান হাত দিয়ে বা হাতের ঘড়িটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়েছে। গভীর চাহনি তার,সায়েন কি যেন ভেবে হাত বাড়িয়ে ফটোফ্রেমটা হাতে নিতেই দরজা খুলে গেল। আচমকা দরজা খোলায় ভড়কে গেল সায়েন। এবং হাত থেকে ফটোফ্রেমটা পড়ে গেল তবে ভাঙলো না। কারণ মেঝেতে কার্পেট বিছানো আছে। সায়ন দ্রুত উবু হয়ে মেঝেতে থাকা ফটোফ্রেমটা হাতে নিয়ে চোখ তুলে সামনে তাকালো। আরাদ ঠিক ছবির মতোই গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে সায়েনের উপর। জোরপূর্বক হেসে সায়েন ফটো টা আগের জায়গায় রেখে দিলো। আরাদ এগিয়ে এসে সায়েনের মুখোমুখি বসলো। সায়েনের অবাক লাগছে আরাদকে দেখে। একটু আগেই কেমন হাসিখুশি ছিল আরাদ কিন্তু এখন কি হলো?? বাহিরে গিয়ে কি কোন ঝামেলা পাকিয়ে এসেছে??হবে হয়তো??সায়েন তাই প্রশ্ন করে বসলো,’কি হয়েছে??কোন সমস্যা??’

ম্লান হাসলো আরাদ। সায়েনের দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে বুকে টেনে নিলো সায়েনকে। আরাদের একহাত সায়েনের কোমড়ে গভীর ভাবে স্পর্শ করেছে আরেকহাত পিঠের উপর গলিয়ে সায়েনের বাহু ধরে রেখেছে।

‘জীবনে চলার পথে যদি কোন সমস্যা না থাকে তাহলে সেই জীবন কখনো সুন্দর হয় না।’

আরাদ সায়েনের জবাব পেল না শুধু সায়েনের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনলো। আরাদ আবারো বলে উঠলো,’মানব জীবনে চলার পথে সমস্যা আসবেই আসবে। এটা যেমন স্বাভাবিক তেমনি এই সমস্যাকে সমাধান ও করতে হবে। নিজেকে শক্ত রাখো সায়েন। আর শেষবারের মতো আমাকে বিশ্বাস করো। কথা দিলাম এবারের বিশ্বাসে ঠকবে না তুমি। শুধু ভালোবাসা পাবে।’

সায়েন ভাবলো সেও কি জড়িয়ে ধরবে আরাদকে?? হাত দুটো উঠিয়েও উঠালো না। ভালোবাসায় বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আরাদকে বিশ্বাস না করার কারণ নেই। সায়েন নিশ্চুপ হয়ে আরাদের হৃদস্পন্দন এর শব্দ শুনতে লাগলো। ‘কথা দিলাম এবারের বিশ্বাসে ঠকবে না তুমি’ এই কথাটা বারবার নিজের মনের মধ্যে আওড়াতে লাগলো। আরাদকে জড়িয়ে ধরার আকাঙ্ক্ষা তার বাড়তেই লাগলো কিন্তু সেই সাহস টুকু মনে সন্ঞ্চয় করতে পারলো না সায়েন। তবে আরাদের বুকে মাথা রাখতে বেশ লাগছে সায়েনের। যাকে মন থেকে বের করে দিয়ে অন্য পুরুষকে মনে বসাতে চেয়েছিল সেই পুরুষটাই চিরদিনের জন্য মনে মধ্যে গেঁথে গেছে। ভাগ্যের চাকা কখন কোনদিকে মোড় নেয় তা কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

আযানের ধ্বনি কানে আসতেই ঘুমটা ভেঙে গেল সায়েনের। কিছুক্ষণ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করলো সে। উঠার চেষ্টা করে পারলো না উঠতে। ভারি কিছুর অস্তিত্ব টের পেল নিজের শরীরে। পাশ ফিরে তাকাতেই আরাদের ঘুমন্ত মুখটা চোখে পড়লো ওর। সায়েন বুঝতে পারলো যে সে আরাদের রুমেই আছে। কাল রাতে আরাদ ওকে চিলেকোঠার ঘরে যেতে দেয়নি। নিজের পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছে। সায়েন খেয়াল করলো আরাদের একটা হাত ওর পেটের উপর রেখে ঘুমাচ্ছে। তবে ওতো শক্ত করে ধরে রাখে নি আরাদ। হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দিতেই ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়লো আরাদ। সায়েন কিছু পল আরাদের পিঠের দিকে তাকিয়ে থেকে বিছানায় ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। নিজেকে পরিপাটি করে রুম থেকে বেরিয়ে পড়লো। খুব ধীর পায়ে চিলেকোঠার ঘরে ফিরে গেল সে। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নিল। দু’দিন ধরে ফজরের নামাজ পড়তে পারে না সায়েন। তার ঘুমই ভাঙে না। তা আজকে ঘুম ভাঙাতে বেশ খুশি হলো সায়েন। নামাজ আদায় করে ছাদে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলো সে। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে চারদিক মুখরিত হলো পাখপাখালির কলকাকলিতে। পাখিদের গুঞ্জন ভালোই লাগে সায়েনের। সূর্যের প্রখর আলো চোখে আসার সাথে সাথে সায়েন তার কাঙ্খিত ঘরটিতে ফিরে আসলো। এবং তার কিছুক্ষণের মধ্যেই কবিতাকে দেখা গেল। খাবারের প্লেট হাতে কবিতা রুমে প্রবেশ করলো। সায়েনকে খাবার দিয়ে টুকটাক কথা বলে কবিতা নিজের কাজে চলে গেল সে।

___________

কাল রাত থেকে তনয়ার মনটা ভিশন খারাপ। আরশির ও সেইম অবস্থা। দু’জনে পরিপাটি হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হলো ওরা। বাড়ি থেকে বের হতেই আরাদের একগাদা ধমক খেল দু’জনেই। প্রশ্ন করা আরাদের একদম পছন্দ নয় আর তনয়া তা করেছে বলে ধমক খেয়েছে। কান্না কান্না ভাব দু’জনের মধ্যে এসে গেছে। তবুও ওরা আরাদের ভয়ে কাদলো না। ওদের ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে আরাদ নিজের গন্তব্যে চলে গেল। তনয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলে,’ধুর আজকে ক্লাস করব না আমি। তুই থাক আমি গেলাম।’

বলেই উল্টোদিকে হাঁটা ধরলো তনয়া। আরশি পিছু পিছু যেতে যেতে বলে উঠলো,’আরে আমি কি একা একা ক্লাস করব নাকি?? আমিও যাব।’

দু’জনে ভার্সিটি থেকে দূরের একটা পার্কে গেল। ইট সিমেন্টের তৈরি বসায় জায়গায় বসলো। তনয়া গালে হাত দিয়ে বলল,’ভাবি সবটা জানতে পারলে কি হবে আরশি??’

তনয়া আরশির দিকে তাকালো না। কিন্তু ও ঠিকই বুঝতে পারছে আরশিও চিন্তায় মরছে।
আরশি ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠে, ‘আমি জানি না তবে ভাবির জন্য আমারও কষ্ট হচ্ছে। ভাইয়া করতে চাইছে টা কি??যদি সামিউক্তাকেই বিয়ে করবে তাহলে ভাবিকে বিয়ে করার মানে কি??’

‘সেটাই তো ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করতে গেলাম আর দেখলি না কি ধমক দিলো। ভাবি অনেক কষ্ট করেছে আরশি। আমার কান্না পাচ্ছে খুব। ভাইয়ার এংগেজমেন্টের দিন কি হবে আরশি??’
তনয়ার চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়লো। বিষন্ন মুখে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে দু’জনেই।

‘রংধনুতে ওতো রং নেই যত রং মেয়েদের মধ্যে থাকে।’

পুরুষালী কন্ঠে দু’জনেই চকিতে তাকালো। ইফতি পকেটে হাত গুজে শয়তানি হাসি দিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। তনয়ার কান্না উবে গিয়ে রাগে পরিণত হলো। খানিকটা চেঁচিয়ে সে বলল,’আপনি ফলো করছেন কেন আমাকে??অসভ্য ছেলে একটা। আপনাকে আমি পুলিশে দেব। আকাশ ভাইয়াকে ফোন করলে এখনই করলে চলে আসবে।’

ইফতির মনে সংশয় দেখা দিলো। আকাশের সাথে ওর ঘোর শত্রুতা। তাই সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,’দিতে পারো নো প্রবলেম। তবে পুলিশ ও মেয়েদের এই রং ধরতে ব্যর্থ তাই তো প্রতিনিয়ত পুরুষ নির্যাতিত হয়েও কিছু করতে পারে না।’

‘বেশি কথা বলেন আপনি। দেখুন আমাদের এক থাকতে দিন। এমনিতেই মন ভালো নেই আমাদের। আপনার সাথে ঝগড়া করার মুডে নেই আমরা।’
ইফতি যেন প্রাণ ফিরে পেল। এই দূর্বলতাকেই সে কাজে লাগাবে। সেদিনের পর থেকে ইফতি ভেবে নিয়েছে আর ঝগড়া করবে না সে। কারণ ঝগড়া করে তনয়ার সাথে পেরে ওঠ যাবে না। তাই বুদ্ধি দিয়ে কাজ করতে হবে। ইফতি গিয়ে তনয়া আর আরশির মাঝে বসে পড়লো। ইফতির হঠাৎ এরকম করায় দু’জনেই সরে বসলো। হাতের তালুতে অন্য হাত ঘষতে ঘষতে বলল,’মেয়েদের মুড সুয়িং অহরহ ঘটে। কিন্তু তোমাদের মুড সুয়িং কি জন্য হয়েছে?? বয়ফ্রেন্ড ধোঁকা দিয়েছে??’

আরশি তনয়া কটমট চোখে তাকালো ইফতির দিকে। ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে ইফতি বলল,’জাস্ট রিল্যাক্স!!আমি ভেবে নিয়েছি।’

তনয়া রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, ‘আপনাকে কেন এতোসব বলতে যাবো??চলে যান এখান থেকে??’

‘উফফ তুমি বুঝতে চাইছো না!!মানছি আমাদের মাঝে একটু ঝগড়া হয়েছে তাই বলে কি সবসময় ঝগড়াই করব নাকি??ফ্রেন্ড তো হতেই পারি??যদি তোমাদের আপত্তি না থাকে। তাই তোমাদের মন খারাপের বিষয়টা আমাকে বলতে পারো?? ভালো লাগবে।’

‘আপনার ধান্দা কি বলুন তো?? আবার কোন মতলব আটছেন??’

বোকা হাসি দিয়ে ইফতি বলল,’ধান্দা থাকলে এতক্ষণ ঝগড়া করতাম ভালোভাবে কথা বলতাম না।’
আরশি তনয়াকে থামিয়ে দিয়ে বলল,’তনয়া তুই চুপ থাক তো??উনি হয়তো অনুতপ্ত তাই এসেছেন।’
ইফতি তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,’তোমার নাম তনয়া??আমি ইফতি??আর তুমি??’

মুচকি হেসে আরশি নিজের নাম বলে দিলো। ইফতি আবার ওদের মন খারাপের কথা জানতে চাইলে আরশি সবটা খুলে বলল। ইফতি গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে আরশির কথা শুনলো। তার পর বলল,’এরকম প্রেম আমি জীবনেও শুনিনি। সিনেমায় তো কতই কাহিনী দেখি। কিন্তু বাস্তবে এই প্রথম। লাভ স্টোরিটা একদম অন্যরকম। চিলেকোঠার প্রেম দিয়ে শুরু আবার শেষমেষ সেই চিলেকোঠা!!এক্সিলেন্ট। কিন্তু তারপর কি হলো??’
এবার তনয়া মুখ খুলল,’ভাইয়ার এংগেজমেন্ট ঠিক হয়েছে সপ্তাহ খানেক পর। এতে ভাইয়ার ও সম্মতি আছে। আর সে সবকিছু ভাবির থেকে লুকিয়ে রাখতে বলেছে। আমি বুঝতে পারছি না যে হঠাৎ ভাইয়া এই সিদ্ধান্ত কেন নিলো??’

ইফতি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,’ডালমে কুছ কালা হেয়। আচ্ছা আমাকে ইনভাইট করো কেমন??আমি গিয়ে সব রহস্যের উদঘাটন করে দেব।’

ইফতির কথায় বেশ বিরক্ত বোধ করলো তনয়া। মুখ বাঁকিয়ে বলল,’এংগেজমেন্টের দিন গিয়ে কোন মহাভারত শুদ্ধ করবেন আপনি??যতসব ফাউল লোক।’

‘আমার বুদ্ধিকে অপমান করো না। এই ইফতি যা বলে তাই করে ছাড়ে।’

তনয়া দুহাত জোর করে বলল,’অনেক করেছেন আপনি দয়া করে আর কিছু করবেন না। এই আরশি চল। এর বকবক শোনার থেকে ক্লাস করা ঢের ভালো।’
তনয়া আরশির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। ইফতি হেসে জোরে চেঁচিয়ে বলল, ‘ওই লাভ বার্ডস দেখার জন্য বিনা দাওয়াতে তোমাদের বাড়িতে যাব আমি। মিলিয়ে নিও।’

বাড়িতে এসে আরো বিরক্তিতে পড়লো তনয়া আর আরশি। নিলিমা এবং হাসি বেগম আত্মীয়দের লিস্ট বানাচ্ছে। এখন থেকেই ওনার আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। যা দেখে ওরা দুজনেই বিরক্ত। নিজের রুমে গিয়ে ওর আর বের হলো না।
সন্ধ্যার পর দুজনেই খাটের উপর বসে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। দরজায় টোকা পড়ার শব্দে দুইজনেই বই ছেড়ে দরজার দিকে তাকালো। এসময়ে সায়েনকে দেখে ওরা দুজনেই চমকে গেল। সাথে একরাশ বিষন্নতা এসে ভর করলো ওদের মুখে। সায়েন এগিয়ে এসে মুচকি হাসলো। তনয়া নিজের পাশে জায়গা করে দিয়ে বলে,’এখানে বসো!!তুমি এসময়ে??’

‘বিরক্ত করলাম তোমাদের??আসলে একা একা ভালো লাগছিল না তাই??’

‘আরে ভাবি তেমন কিছু না। হঠাৎ এলে তাই তনয়া বলেছে!!ভালো করেছো এসেছো।’

আরশির মুখপানে অবাক হয়ে তাকালো সায়েন। এই প্রথম ভাবি বলে ডাকলো সে সায়েনকে। সায়েন মুখে হাসির রেখা টানলো বলল,’নেক্সট এক্সাম কোন মাসে?? আমার বইগুলো বাড়িতে ফেলে এসেছি। পড়তে বসার কোন চান্সই নেই। আর ভার্সিটি তো!!’

তিনজনে এসব নিয়েই কথা বলতে লাগলো। কিন্তু সায়েন খেয়াল করলো আজকে তনয়া আর আরশির মন ভালো নেই। একটা কথা বলেই ওরা চুপ করে যায়। পরের কথা সায়েনই শুরু করে। জিজ্ঞেস করলে ওরা কিছুই বলে না। কথা বলার মাঝেই দরজা দিয়ে আরাদকে যেতে দেখলো সায়েন। আরাদ ব্যস্ত পায়ে চলে গেল কোনদিকে না তাকিয়ে। আরাদ কি দেখেছে সায়েনকে?? বোধহয় না,যেভাবে চলে গেল!!সায়েন ঘাড় ঘুরিয়ে আবার ওদের সাথে কথা বলায় মন দিলো।

নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো আরাদ। দু’দিন ধরে বেশ পরিশ্রম করতে হচ্ছে ওর। এর সাথে আবার নতুন একটা যোগ হয়েছে। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে আকাশকে ফোন করলো সে। আকাশ ফোন রিসিভ করেই কিছু বলল সে আরাদকে। মুচকি হেসে আরাদ বলল,’গুড, ছয়দিনের মধ্যে সব খবর চাই আমার। উক্ত দিনটার জন্য অপেক্ষায় আছি আমি।’

ফোন কেটে চোখ বন্ধ করে ফেলে আরাদ। সায়েনের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। যা আরাদের ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলল। এই একটা মুখ আরাদকে প্রশান্তি দেয়। তাই চোখ বন্ধ করে কল্পনায় সেই মুখখানা দেখতে ব্যস্ত আরাদ।

রাত্রি বেশ গভীর,ছিমছাম পুরো বাড়ি। কেমন ভুতুড়ে পরিবেশ। চিলেকোঠার ঘরে শুয়ে আছে সায়েন। কিন্তু ঘুম আসছে না। মনটা আরাদের কাছে চলে গেছে। আজকে একবারে জন্য ও আরাদ এলো না বলে বেশ অভিমান হয়েছে সায়েনের। কিন্তু হঠাৎ দরজার কড়াঘাতে উঠে বসে সায়েন।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩১

নয়ন জুড়ে বিষ্ময় খেলা করছে সায়েনের। এতটাই বিষ্মিত যে চোখের পলক ফেলতে সে ভুলে গেছে। দরজার কপাটে হাত রেখে সায়েনের দিকে হালকা ঝুকলো আরাদ সায়েন সাথে সাথে পিছনে ঝুঁকে গেল। একটা বোটকা গন্ধে নাক কুঁচকে সে ওড়না মুখে ধরলো। গন্ধটা সহ্য হচ্ছে না সায়েনের। ও বুঝতে পারলো যে আরাদ ড্রিংক করেছে। মদের গন্ধের সাথে পরিচিত নয় সায়েন। তবে আরাদের চাহনি আর চালচলন দেখে সায়েন তা বুঝেছে। দরজায় কড়াঘাতের শব্দে সায়েন উঠে দরজা খুলতেই ঢুলুঢুলু অবস্থায় আরাদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো সে। অবস্থা তার নাজেহাল। টলমল পায়ে ভেতরে ঢুকলো আরাদ। সায়েন আরাদের দিকে ফিরেই উল্টোপায়ে ভেতরে ঢুকলো। গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সায়েন প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘ড্রিংক করেছেন কেন আপনি??’

ঘাড় কাত করে মুচকি হাসলো আরাদ। হাসিটা অত্যন্ত স্নিগ্ধ কিন্তু সায়েনের কেন জানি হাসিটা সুবিধার ঠেকলো না!!আরাদ নেশাক্ত কন্ঠে বলল,’তোমার জন্য ড্রিংক করেছি। তোমার জন্য আমি দেবদাস হয়েছি তা কি দেখো না তুমি??’

‘কি আজেবাজে কথা বলছেন আপনি??মদ খেয়ে রাত দুপুরে কি শুরু করেছেন বলুন তো??আর দেবদাস হলেন কবে থেকে??’

আরাদ আরেকটু কাছে এগিয়ে আসলো সায়েনের স্ফুটস্বরে বলল,’যবে থেকে তুমি আমার পারু।’ পরক্ষণে কিছু চিন্তা করে আরাদ বলল,’নাহ আমি কেন দেবদাস হবো? আমাদের তো বিয়ে হয়েছে তাই না। তাহলে আমরা কি হতে পারি??’

‘আপনি নিজের রুমে যান। ওখানে গিয়ে সব মাতলামি করুন।’
আরাদ দুহাতে সায়েনের বাহু চেপে ধরে কাছে টেনে আনলো। আরাদের দিকে বড়বড় চোখে
তাকালো সায়েন। সায়েনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,’আমার ভালোবাসার পরিপূর্ণ নাম কি দেওয়া যায় বলতে পারো??’

সায়েন চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলেছে।আরাদের থেকে গন্ধটা আরো তীব্র হয়েছে। আর নিতে পারছে না সায়েন। আরাদ সপ্তপর্ণে সায়েনের কানের পেছন দিকটায় শব্দ করে চুম্বন করতেই কেঁপে উঠলো সায়েন। এই মুহূর্তে ওর রোমান্সের মুড নেই। বমি উগ্রে আসছে ওর। হালকা ধাক্কা দিতেই আরাদ সরে যায়। আরাদ সায়েনের দিকে এগোতে এগোতে বলল,’আমাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দেবে। তোমার কথা ভেবে ঘুম আসছে না।’

আরাদকে এগিয়ে আসতে দেখে সায়েন এক লাফে খাটের উপর উঠে দাঁড়ালো। বালিশটা আঁকড়ে ধরে বলল,’চলে যান আপনি। আপনার থেকে মদের গন্ধ আসছে। আমার সহ্য হচ্ছে না।’

‘স্বামীর সবকিছু বউয়ের সহ্য করতে হয়। জানো না তুমি??’
আরাদ খাটের উপর উঠতেই অপরদিক দিয়ে সায়েন নেমে পড়লো। কি ঝামেলায় পড়লো? হঠাৎ এতটা ড্রিংক কেন করলো আরাদ??সায়েন বুঝতে পারছে না ও কি করবে??আর একা ওর পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। সায়েন কোনরকমে বাইরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আরাদকে ভেতরে রেখেই সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নামলো সায়েন। দিক দিশা না পেয়ে তনয়ার রুমে গিয়ে দরজায় নক করলো। কিছুক্ষণ পর চোখ কচলাতে কচলাতে বের হলো তনয়া। সায়েনকে দেখে অবাক চোখে তাকালো তনয়া বলল,’ভাবি এতো রাতে তুমি!!কোন সমস্যা??’

সায়েন সবকিছু বলে দিলো। তনয়াও বেশ অবাক হয়েছে। সায়েন বলল,’আমি বুঝতে পারছি না যে কি করব??একটু সাহায্য করো।’

‘আমরা দুজন মেয়ে কি করবো??আরশি তো ঘুম কাতুরে। এখন ওর কানের কাছে বোম ফাটালেও উঠবে না। এক কাজ করি ভাইয়াকে ডেকে আনি।’

দু’জন গিয়ে তামিমকে ডেকে তুলল। বেশ বিরক্তি নিয়ে বের হলো তামিম। কিন্তু যখন আরাদের অবস্থার কথা শুনলো তামিম ও অবাক হলো। দ্রুত ওরা তিনজনে চিলেকোঠার ঘরে গেল। আরাদ বিছানায় টান হয়ে শুয়ে আছে। দরজা খোলার শব্দে সেদিকে ফিরে তাকালো আরাদ। তিনজন আরাদের কাছে আসতেই সে ভ্রু কুচকালো। তামিম বলল,’ভাইয়া তুমি ড্রিংক করেছো বুঝলাম। কিন্তু এতটা মাতাল হলে কেন??আগে তো কখনো এরকম হতো না তাহলে???’
আরাদ হাত উঁচিয়ে তর্জনী আঙ্গুল সায়েনের দিকে তাক করে মৃদু হেসে বলল,’ওর জন্য মাতাল হয়ে গেছি। কি জানি কি খাওয়ালো আমাকে?? তারপর থেকেই এই অবস্থা আমার।’
কথাগুলো আরাদ এলোমেলো ভাবে বলল। সায়েনের কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। উদ্ভট কথা বলছে আরাদ। এরকম লজ্জায় ফেলার মানে কি?? তামিম আর তনয়া ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। সায়েন গমগমে কন্ঠে বলল,’বাজে কথা বলছেন কেন?আমি আপনাকে কি খাওয়ালাম??নিজেই তো মদ খেয়ে এসেছেন??’

আরাদ হাতে ভর দিয়ে উঠে বসে বলল,’তুমি আমাকে নেশাক্ত পানিয় খাইয়েছো। যার কারণে আমার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে গেছে।’
বলেই দুহাত বুকে গুজলো। সায়েনের এবার লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। এক ছুটে রুম থেকে বের হতে পারলে ভালো হতো। মাথা নুইয়ে ফেলে সায়েন। তনয়া আর তামিম এবার শব্দ করেই হেসে ফেলল। সায়েনের এবার আরো লজ্জা লাগছে। আর রাগও হচ্ছে আরাদের উপর। সারাদিন কোন খবর না নিয়ে রাতে এসেছে মাতাল হয়ে। তামিম তনয়াকে বলল,’লেবুর শরবত নিয়ে আয়। খাইয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। মনে হয় আজকে ডাবল ডোজ নিয়েছে।’

তনয়া মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ফিরলো শরবতের গ্লাস নিয়ে। ওরা তিনজন জোর করে আরাদকে লেবুর শরবত খাইয়ে দিল। তামিম বলল,’এখন কি করবো??ভাইয়া কি এখানে থাকবে নাকি??’

সায়েন চটজলদি বলে উঠলো,’নাহ ওনাকে নিজের রুমে দিয়ে আসুন।’

হাসলো তামিম আবারও। তারপর আরাদকে ধরে উঠিয়ে নিয়ে গেল। সায়েন বুকে হাত দিয়ে বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। আরাদকে এভাবে দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সায়েন। দিলো সবার সামনে মাথা নত করিয়ে। এরপর তামিম আর তনয়াকে কিভাবে মুখ দেখাবে??ভাবতেই লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কোনভাবে বিনা নিদ্রায় সেই রাত্রি যাপন করলো সায়েন।

পরেরদিন আরাদ এলোমেলো ভাবে নিজেকে খাটের উপর আবিস্কার করলো। মাথা ধরে উঠে বসলো সে। মেঝেতে বোতলগুলো পড়ে থাকতে দেখে হুস ফিরল ওর। কাল রাতে এতো ড্রিংক করে ফেলেছে!! ভাবতেই আরাদ বিষ্মিত। কিন্তু তারপর কি হয়েছিল তা মনে করার চেষ্টা করছে। আধো আধো মনে পড়লেও পুরোটা মনে পড়ছে না। শুধু এটুকু মনে আছে যে ও সায়েনের কাছে গিয়েছিল। ফ্রেশ হয়ে আর সায়েনের কাছে যাওয়া হলো না আরাদের। ড্রিংক করার কারণে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। তাই তাড়াহুড়ো করেই অফিসে চলে গেল আরাদ।

তারপর থেকে আরাদ নামক মানুষটির দেখা মিলল না সায়েনের। সেদিন রাতভর সায়েন মাত্র একটা কথাই চিন্তা করেছিল যে ও কিভাবে আরাদকে মুখ দেখাবে। লজ্জায় তো শেষ হয়েই যাবে। কিন্তু ওর কথা যে সত্যি হবে তা ভাবতেই পারেনি সায়েন। অনেক বার চেষ্টা করেও আরাদের সাক্ষাত পায়নি সায়েন। ওর চিলেকোঠার ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু কে বারণ করছে তা জানতে পারেনি সায়েন। কবিতা শুধু বলেছে ওর এই ঘর থেকে বের হওয়া বারণ। শুধু আরাদ নয়, আরশি তনয়া তামিম কারো দেখাই নেই। ভেতরে ছটফট করে দিন কাটাচ্ছে সায়েন।আরাদের সান্নিধ্য পেতে আঁকুপাঁকু করছে সায়েন। তাহলে কি ও ভালোবাসি না বলে ভুল কাজ করলো??যদি আরাদ ওর থেকে দূরে সরে যায়??এই জন্য কি আরাদ ওর কাছে আসছে না??
এসব উদ্ভট চিন্তা সায়েন যত করছে ততই ছটফট করছে। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা ওর। বাইরে যেতে চেয়েও পারছে না। চিলেকোঠার ঘরের দরজা খোলা থাকলেও ছাদের দরজা ওপাশ থেকে বন্ধ।
নিজের রুমে দাড়িয়ে পায়চারি করছে সায়েন। হঠাৎ কাচের দেয়াল দিয়ে বাইরে চোখ গেল ওর। দুটো পিকআপ ভ্যান ঢুকছে গেইট দিয়ে। উৎফুল্ল সায়েন এগিয়ে গিয়ে কাচের দেয়ালের উপর হাত রাখলো। গাড়ি থেকে কতগুলো লোক নামলো। তার পর গাড়ি থেকে মালপত্র নামাতে লাগলো। কাগজের ফুলের তোড়া গুলো দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো সায়েনের। তাছাড়া লাইটিং এর সব জিনিস পত্র দেখে অবাক হলো। তাহলে কি বাড়ি সাজাবে এরা? বাড়িতে কি কোন অনুষ্ঠান আছে??কি হচ্ছে এসব কিছুই বুঝতে পারছে না সায়েন। কৌতূহল হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল সায়েন। এরপর কতগুলো মাইক্রো গাড়ি ঢুকলো। কতগুলো ছেলে মেয়ে ও বয়স্করা এসেছে। এতো মানুষ দেখে সায়েন নিশ্চিত হলো যে আজকে কোন অনুষ্ঠান আছে।
দুপুরে কবিতা এসে খাবার দিয়ে গেল। সায়েন কিছু জিজ্ঞেস করলে কবিতা কিছুই বলল না।

পুরো বাড়ি চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। রং বেরঙের বাতিতে পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেদের পরিপাটি করে সাজালো তনয়া আর আরশি। ড্রয়িংরুম সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। ওদের ড্রয়িংরুমটা বিশাল বড়ো তাই বাড়ির প্রাঙ্গণ দরকার পড়েনি। আরাদ এখনও আসেনি। নিজেকে সাজাতে সে ব্যস্ত। এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে আরশি তনয়া। সামিউক্তার পুরো পরিবার এসেছে। সামিউক্তার একটা ভাই আছে। আসার পর থেকেই কেমন চোখে তাকাচ্ছে তনয়া আর আরশির দিকে। দুজনে এবিষয়ে কথা বলতেছে।

‘হ্যালো লেডিস!!!!!’

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো তনয়া। ইফতিকে দেখে সে অবাক। ইফতি যে সত্যি সত্যি এসে পড়বে তা ওর ধারনার বাইরে ছিল। ইফতি নিজেকে ব্লু রঙে সাজিয়েছে। বেশ মানিয়েছে এই রং টা। চোখে ঝটকা লাগলো তনয়ার। ইফতি এগিয়ে এসে বলল,’বলেছিলাম না যে আসবো। ঠিকই চলে এসেছি।’
চারিদিকে চোখ বুলিয়ে ইফতি বলে উঠলো, ‘তা লাভ বার্ডস কই??এখন ও আসেনি?’

তনয়া অবাক চাহনিতে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার লজ্জা কম মনে হয়!! এরপরও চলে এলেন??”

‘অবশ্যই এই সিনটা মিস করা যায় না। বম ফাটাব বলেই তো এসেছি শোন আমার একটা প্ল্যান আছে!!’

‘কি প্ল্যান???’

‘এংগেজমেন্ট যখন শুরু হবে মানে যখন রিং পরানো হবে ঠিক তখনই তোমার ভাবি এসে দেখে ফেলবে। কি রিয়্যাকসন হবে তখন?? একদম সিনেমাটিক। আর এই কাজটা আমি করব!! ভাবতেও অবাক লাগছে।’

তনয়া বিরক্ত হলো সাথে রেগেও গেল। বলল, ‘ফালতু কথা বাদ দিন চলে যান এখান থেকে।’

ইফতি আঙ্গুল নাড়িয়ে বলল,’ওয় হ্যালো বিনা দাওয়াতে এই ইফতি কোথাও যায় না বুঝেছো??ইফতিকে সবাই টেনে নেয়। পরিবারের সাথে এসেছি বুঝেছো। প্লিজ এখন আবার এটা জিজ্ঞাসা করো না যে আমার পরিবারকে কেন ইনভাইট করা হলো ইত্যাদি ইত্যাদি। কাজের কথা বলো।’

‘আপনি বড্ড বাঁচাল। অনেক বেশি কথা বলেন। অসহ্য লাগে আমার।’

ওদের কথার মাঝেই আরাদ নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। সবার চোখ গেল সেদিকে। সাদা শার্টের উপর ব্ল্যাক কোটি। হাতে ব্ল্যাক ঘড়ি,চুলগুলো ব্রাশ করা। সব মেয়েরা হা করে তাকিয়ে আছে সেদিকে। তারা এখন সামিউক্তাকে হিংসা করছে। আরাদ আসতেই সামিউক্তা গিয়ে আরাদের হাত ধরলো। মুচকি হেসে আরাদ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বাবার সাথে কথা বলতে চলে গেল। ইগোতে লাগলেও সামিউক্তা চুপ করেই থাকলো। সামিউক্তাও নজর কাড়া সাজ দিয়েছে। পার্টি ড্রেসে তাকেও কম লাগছে না। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছে সে। কাউকে তাই পাত্তাও দিচ্ছে না। নিলিমা বেগম আর হাসি বেগম দু’জনেই সামিউক্তার পাশে দাঁড়িয়েছে। সামিউক্তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ওনারা। আত্মীয়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ওনারা।

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। নিলিমা বেগম তাড়া দিচ্ছেন রিং পরানোর জন্য। কিন্তু আরাদ আরেকটু সময় নিয়েছে। সে কাউকে কল করছে বারবার। নিলিমা বেগম আর চুপ থাকলেন না। আরাদকে টেনে সামিউক্তার পাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন। সবার সামনে কিছু বলতে পারলো না আরাদ। রিং এনে ধরিয়ে দিলেন আরাদের হাতে।

এই মুহূর্ত দেখে কষ্টে ফেটে যাচ্ছে আরশি আর তনয়া। ওদের খুব কান্না পাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে ওরা।

‘এক্সকিউজ মি লেডিস। আমি কি একটা কথা বলতে পারি??’

এই মুহূর্তে ইফতির সাথে কথা বলার মুডে ওরা নেই। তাই দু’জনেই ঝারি মারলো। ইফতি ফিসফিস করে বলল,’জারা উপার দেখো??’

দু’জনেই অবাক হয়ে উপরে তাকালো। সায়েনকে দেখে দু’জনেই আতকে উঠলো। তার পর চোখ ঘুরিয়ে ইফতির দিকে তাকালো। দুষ্টু হাসছে সে।

‘কেমন দিলাম??তবে চিলেকোঠার ঘরটা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছে আমার।’

দুম করে কিল পড়লো ইফতির পিঠে। তনয়া কটমট করে বলল,’ভাইয়া বারণ করেছিল এটা করতে আর আপনি তাই করে দিলেন?? এবার কি হবে??’

‘মারছো কেন??কি আর হবে তোমার ভাবি নিচে নেমে সবার সামনে সব সত্যি বলে দেবে। তার পর তো মজা হবে।’

‘ভাবি কিছু বলবে না। উফফ কেন যে আপনাকে সব বলতে গেলাম??’

ইফতি ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,’জাস্ট রিল্যাক্স। এখন তোমাকে একটা কাজ করলেই হবে। সেটা হলো তোমার ভাইয়াকে গিয়ে বলবে যে তোমার ভাবি সব জেনে গেছে। তোমার ভাইয়া যে এটিটিউড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাতে মনে হয় না যে তোমার ভাইয়া উপরে চোখ তুলে দেখবে। তাহলে তো সব প্ল্যান মাটি। তাড়াতাড়ি যাও,,,’

ইফতি ধাক্কা দিয়ে তনয়াকে পাঠালো। তনয়া ইতস্তত করতে করতে আরাদের কাছে গেল। আরাদ রিং টা হাতে নিয়ে বিরক্তবোধ করছে। তনয়া আরাদের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,’ভাইয়া ভাবি!!!’

চকিতে তাকালো আরাদ। কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তনয়ার দিকে। আরাদের দৃষ্টির মানে বুঝে গেল তনয়া। মাথা নাড়িয়ে বোঝালো যে সে কিছু বলেনি। তনয়া উপরের দিকে ইশারা করতেই আরাদ সেদিকে তাকালো। সিঁড়ি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন। চোখে মুখে বিষ্ময়ের ছাপ সায়েনের সাথে চোখ ভর্তি পানি। আরাদের সাথে চোখাচোখি হতেই সায়েন চলে গেল। নিচের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল আরাদ। সায়েনের থেকে সে সবকিছু লুকাতে পারলো না। তবে এখন সে যেতেও পারবে না। এখানকার কাজ শেষ না করে যাওয়ার উপায় নেই। রাগ হচ্ছে আরাদের খুব। সব রাগ ঝারছে হাতের রিং টার উপর। মুহূর্তেই সেটা বাঁকা হয়ে গেল।

#চলবে,,,,,,,,,,,

থাকুন ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here