চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ৩২+৩৩

0
62

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩২

পরিবেশটা পুরো শান্ত হয়ে গেছে। শ’খানেক মানুষের উপস্থিতিতেও কেমন গুমোট ভাব। শুধু মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সামনেই আকাশ দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ ফোর্স নিয়ে। অনুষ্ঠানে পুলিশ দেখে সবাই নিশ্চুপ। এরকম একটা অনুষ্ঠানে কেউ এটা আশা করনেনি। আকাশ এগিয়ে আসলো সামিউক্তার বাবার দিকে। তিনি কোন প্রশ্ন করার আগেই আকাশ বলে উঠলো,’আপনার মেয়ে এবং ছেলেকে ড্রাগস সাপ্লাই আর নেশাদ্রব্য গ্রহণ করার জন্য এরেস্ট করা হলো। আপনার মেয়ে আর ছেলেকে ভালোয় ভালোয় আমাদের সাথে যেতে বলবেন নাকি জোর করে নিয়ে যেতে হবে।’

আকাশের কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে সামিউক্তার বাবা। উপস্থিত জনগন ও অবাক। ইতিমধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। সামিউক্তা কে ভয় পেতে দেখা গেল। ভাইয়ের পিছনে গিয়ে লুকালো সামিউক্তা। কিন্তু ওর ভাইয়ের অবস্থাও নাজেহাল। সামিউক্তার বাবা বললেন,’এসব মিথ্যা কথা!! আমার সন্তানরা এসব করে না। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।’
স্মিত হাসলো আকাশ বলল,’পুলিশ কখনো প্রমাণ ছাড়া আসেনা আঙ্কেল। এ্যারেস্ট ওয়ারেন্টি নিয়েই এসেছিল আমরা। বাকিটা আদালতে জানবেন। আর হ্যাঁ জামিনের চিন্তা ভুলে যান। কেসটা জটিল ভাবেই হয়েছে। যা হবে সরাসরি আদালতে।’
আকাশ ইশারা করতেই সামিউক্তা আর ওর ভাইকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু সামিউক্তা নাছোড়বান্দা। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,’আব্বু আমি কিছু করিনি। আমাকে বাঁচাও প্লিজ!!আমি যাবো না।’
সামিউক্তা এবার গেল আরাদের কাছে। আরাদের হাত ধরে বলল,’প্লিজ আরাদ তুমি কিছু করো??আমি এসব কিছুই জানি না। আমার উপর মিথ্যা দোষ চাপাচ্ছে।’

সামিউক্তার হাত ছাড়িয়ে হাসলো আরাদ।‌তারপর বলে,’ওহ আচ্ছা সেদিন রাতে কি তাহলে আমি ভুল দেখেছিলাম??আর ওই ছবিগুলো কি ভুল ছিল??’

কান্না থেমে গেল সামিউক্তার। বিষ্মিত কন্ঠে বলল,’কোন ছবি??’

‘ওসব আদালতে গিয়েই দেখতে পাবে তুমি। তবে একটা কথা শুনে রাখো তোমাকে বিয়ে করার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না। এটা তো ড্রামা ছিল তোমাকে সবার সামনে আনার।’

সামিউক্তা শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরাদের দিকে। সে বুঝে গেল যে আরাদকে বুঝিয়ে লাভ নেই। আর চেষ্টা করেও সে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। আকাশ ওর ক্রিমিনাল নিয়ে চলে গেল। স্তব্দ করে দিলো অনুষ্ঠানে আসা প্রতিটা মানুষকে। একে একে অর্ধেক আত্মীয়রা চলে গেল। সামিউক্তার বাবা মা সহ তাদের আত্মীয়রা মাথা নিচু করে চলে গেল। নিলিমা বেগমের মাথা ঘোরাচ্ছে। সামিউক্তাকে তিনি ভালো ভেবেছিলেন। কিন্তু এটা কি করলো ও। তিনি ধপ করে বসে পড়লেন। হাসি বেগম এগিয়ে গেলেন আরাদের দিকে কিন্তু আরাদ দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল। এখন ওকে সায়েনের কাছে যেতে হবে। সবটা বলতে হবে নাহলে দেরি হয়ে যাবে। আগের মতো ভুল সে করবেই না। হাসি বেগম চেয়েছিলেন আরাদকে এসব ব্যাপারে প্রশ্ন করতে কিন্তু আরাদ সেই সুযোগ দিলো না। মায়ের কৌতূহল দেখে তামিম এগিয়ে এসে বলল,’ভাইয়া এখন কোন প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না মা!!যা জিজ্ঞেস করার আমাকে করো সব উওর পেয়ে যাবে।’

এবার কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারলো না হাসি বেগম বললেন,’তুই ও সব জানতি?? তাহলে আগেই বলতি এতো কিছু করার দরকার কি ছিল??আমরা তো কেউ ভাবতেও পারিনি যে মেয়েটার ভেতরে ভেতরে এত কিছু রয়েছে।’

‘কিন্তু আমরা জানতাম। তুমি কাকিমনি আরশি আর তনয়া কিছু জানতে না। ভাইয়া জানাতে বারণ করেছে। আব্বু কাকা ওনারা সব জানতো।’

হাসি বেগম এক পলক স্বামীর দিকে তাকালেন। তার পর আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের জানালি না কেন??’

তামিমের এখন বিশ্রামের দরকার। এই কয়দিন আরাদের সাথে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছে সে। কিন্তু এখন ওর বিশ্রামের বারোটা বাজবে। মা তো সব না জেনে কিছুতেই ওকে ছাড়বে না। অগত্যা সে বলতে শুরু করল, ‘তোমরা কি ভেবেছো সব বড়লোকের মেয়েরা ভালো হয়??হয় না। কেউ না কেউ ঠিকই বিগড়ে যায়। ঠিক তেমনটাই সামিউক্তা মেয়েটা। সাথে ওর ভাইও আছে। দু’জনে ড্রাগস নেয়। এছাড়া নেশাদ্রব্য সাপ্লাইও করে। ওদের দু’জনের একটা ফাউন্ডেশন আছে। একটা টিম,‌সামিউক্তা আর ওর ভাই টিমের লিডার। ওই টিম ধরার জন্য আকাশ ভাইয়া অনেক চেষ্টায় ছিল। কিন্তু প্রমাণের জন্য ধরতে পারছিল না। আকাশ ভাইয়া যেদিন সামিউক্তাকে প্রথম দেখে সেদিনই ভাইয়াকে সব বলে দেয়। তাইতো ভাইয়া এংগেজমেন্ট সাতদিন পিছিয়ে দেয়। সব প্রমাণ হাতে পাওয়ার জন্য ভাইয়া আর আমি আকাশ ভাইয়াকে সব রকমের সাহায্য করি। সামিউক্তাকে ধরা ওতো সহজ ছিল না কিন্তু ভাইয়া সব হ্যান্ডেল করে ফেলে। ওদের ড্রাগস নেওয়া এবং সাপ্লাই দেওয়া রেকর্ড করা হয়েছে। সময়মতো আদালতে পেশ করা হবে।
তোমারা এবিষয়ে কোন সাহায্য করতে পারতে না শুধু শুধু চিন্তা করতে তাই তোমাদের কিছু জানানো হয়নি। আর আজকে না জানিয়ে ভাইয়া অন্যভাবেও জানাতে পারতো কিন্তু ভাইয়া চেয়েছে সামিউক্তার আসল রূপ সবাইকে দেখাতে তাই এতো বড় ড্রামা সে নিজে সাজিয়েছে।’

তামিম থামলো,বড়সড় দম ফেলে বলে, ‘আমার আর ভালো লাগছে না। এই কয়দিন ধকল গেছে খুব। কালকে বিকালের আগে কেউ আমাকে ঘুম থেকে জাগাবে না। গেলাম আমি।’

তামিম সিঁড়ি ভেঙে নিজের রুমে চলে গেল। আরশি তনয়ার খুশি দেখে কে??মনের মধ্যে দু’জনেই নাচছে। এতক্ষন পর সবটা সবার কাছে ক্লিয়ার হলো। সবার আড়ালে লুকিয়ে দু’জনে হাইফাইভ দিলো। তনয়া এদিক ওদিক তাকিয়ে ইফতিকে খুঁজল কিন্তু পেল না কারণ সবাই চলে গেছে। তখনই তনয়ার মনে পড়ল যে সে নিজেই ঠেলে বের করে দিয়েছে ইফতিকে। ওর এখন ইফতির জন্য খারাপ লাগলো। শুধু শুধু কতগুলো কথা শোনালো ইফতিকে। পরে দেখা হলে ক্ষমা চেয়ে নেবে ভেবেছে।
নিলিমা বেগমের মাথায় আইস ব্যাগ চেপে ধরে আছে কাজের মেয়েটি। মাথা ঘোরাচ্ছে ওনার। হাসি বেগম গালে হাত দিয়ে বসে আছে। সব কিছুই গুলিয়ে গেছে ওনাদের। তাই এখন মাথা ঠান্ডা করতে ব্যস্ত ওনারা।

কাচের দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন। ঘন্টাখানেক ধরে সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। একটুও নড়চড় করছে না সে। চোখের পানি পড়তে পড়তে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে চোখদুটো। ইচ্ছে করেও চোখের পানি বের করতে পারছে না সায়েন। তবে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার দাগ রয়ে গেছে ওর গালে। নিজের চোখে দেখে এসেছে আরাদকে। সে তখন অন্য মেয়ের হাতে আংটি পরাবে। সায়েন কেন কোন মেয়েরই এটা সহ্য করার ক্ষমতা নেই। তবে ইফতিকে কিছু বলতেই হয়নি সায়েনকে। সায়েন আগে থেকেই সবটা জানতো। সন্ধ্যার পর সামিউক্তা নিজে এসেছিল সায়েনের কাছে। কিছুক্ষণ সে সায়েনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বলেছিল,’তোমাকে কি দেখে যে আরাদ ভালোবেসেছিল কে জানে??তেমন কিছুই নেই তোমার মধ্যে যা আমার মধ্যে আছে। হয়তো আরাদের মোহ ছিল সেটা। এখন তা কেটে গেছে বলেই আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

সামিউক্তার কথার মানে বুঝলো না। আর ও তো চেনেও না সামিউক্তাকে। তাই নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই সায়েনের। সামিউক্তা হেসেই বললো, ‘আমি সামিউক্তা আরাদের উডবি। আজকে আমাদের এংগেজমেন্ট। তুমি হয়তো জানো না। আরাদের জানানো উচিত ছিল। আফটার অল এক্স বলে কথা। কিন্তু আরাদ তোমাকে এখানে নিয়ে এলোই বা কেন তা আমি এখনো বুঝলাম না?? আমাদের সংসার করা দেখানোর জন্য কি??’

সায়েনের চোখ থেকে সাথে সাথে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। হাসলো সামিউক্তা,এটাই চেয়েছিল সে। তাই তো সবার চোখের আড়ালে এসেছে সায়েনের সাথে দেখা করতে। সামিউক্তা যাওয়ার আগে ফিরে তাকিয়ে বলল,’তিনবছর জেলে থেকে কেমন লাগলো তোমার??এখন এটা শুনব না আমি। প্রশ্নটা আজকে করে রাখলাম অন্যদিন উওর শুনব না হয়।’

দরজা ঠেলে বের হয়ে গেল সামিউক্তা।সায়েনের মনে হচ্ছে সামিউক্তা কতগুলো তীর মেরে গেল ওর বুকে। যা ওর বুক ভেদ করে অপরপাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। ক্ষত থেকে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। এখন ও বুঝতে পারছে কেন বাড়ি সাজানো হয়েছে!!এজন্যই বুঝি সায়েনের বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে আরাদ!!যাতে সায়েন কিছু জানতে না পারে। খাটের উপর বসে চাদর খামচে ধরে সায়েন বলল,’আবার সেই ড্রামা। আমি আপনাকে দ্বিতীয় বার বিশ্বাস করে আবার ঠকেছি আরাদ। আমাকে কেন এভাবে ঠকান তার কৈফিয়ত আজকে আপনাকে দিতেই হবে।’

দরজা খোলার শব্দে অতীত থেকে ফিরে এলো সায়েন। ওর দৃষ্টি সম্পূর্ণ শান্ত কিন্তু ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেছে। নিচু দৃষ্টিতে ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো আরাদ। সায়েন তাকালো না আরাদের দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে হাতের ডানদিকে থাকা ফুলদানিটার দিকে চোখ দিলো সে। চোখদুটো এতক্ষণ মরুভূমি ছিল, কিন্তু মুহূর্তেই তা সাগরে পরিণত হলো। জোয়ার এসে সাগর উতলে পানি পড়তে লাগলো। চোখের জলে বক্ষ ভেসে যাচ্ছে সায়েনের। তবুও মুখ দিয়ে টু শব্দটি পর্যন্ত করলো না। আরাদ গিয়ে সায়েনের সামনে দাঁড়াল। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে সায়েন। আরাদ সায়েনের হাত ধরে টেনে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বলল, ‘আমার চোখের দিকে তাকাও সায়েন।’

সায়েন তাকালো না কথাও বলল না। আরাদ দ্বিতীয় বারও একই কথা বলতেই সায়েন বলল,’বিষাদময় চোখের দিকে তাকানোর সাধ্যি আমার নেই মিস্টার আরাদ। যে চোখে ভালোবাসা নেই সেই চোখে তাকানোর কোন দরকার ও নেই।’

‘তুমি কি কোনদিনও আমার চোখে ভালোবাসা দেখোনি সায়েন??’

অশ্রুসিক্ত নয়নে আরাদের চোখে চোখ রাখলো সায়েন। বলল,’আমি বুঝতে পারি না। আপনার চোখে আদৌ ভালোবাসা আছে নাকি অন্যকিছু আমি বুঝতে পারি না। কেন বারবার আমার সাথেই এরকম হয় বলতে পারেন??সব হারিয়ে নিশ্ব হয়ে গেছি আমি। আপনি বলেছিলেন এবারের বিশ্বাসে আমি ঠকবো না। কিন্তু আমি তো ঠকে গেছি। তাহলে ভালোবাসার প্রতিদান কি আমার জন্য এটাই প্রাপ্য ছিল??ভেবেছিলাম বিয়ের পর আপনাকে মন থেকে মুছে দেব। অন্যপুরুষকে সেখানে স্থান দেব। কিন্তু সে তো আমাকেই নিজের জীবন থেকে বের করে দিয়েছে। তাকে বসানোর আগেই সে চলে গেল। তারপর আবার আপনি চলে এলেন। পারলামনা আপনার জায়গা থেকে আপনাকে দূরে সরাতে। ভালোবেসে আবারও আপনাকে সেখানেই স্থান দিলাম। কিন্তু আমার ভাগ্য দেখুন আবারও আমাকে আমার আসল স্থান দেখিয়ে দিয়েছে। এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে আমার??’

সায়েনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরাদ। সায়েনকে কথার মাঝে আটকায়নি। আজকে ও বলবে, নিজের মনটা হাল্কা করার জন্য হলেও বলবে। সেজন্য আরাদ বাধা দিলো না। সায়েনের কথা শেষ হতেই আরাদ আরেকটু এগিয়ে গেল সায়েনের দিকে। সায়েনের একদম কাছে চলে গেল। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন। আরাদ সোজাসুজি প্রশ্ন ছুড়লো,’ভালোবাসো আমাকে??’

ক্রোধভরা চোখে তাকিয়ে সায়েন বলল,’কেন শুনবেন??এই কথাটা শোনার কোন প্রয়োজন নেই আপনার এখন। যে কাজ করছিলেন তাই করুন গিয়ে!!’

‘আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি সায়েন??প্রশ্নের উত্তর এর বদলে প্রশ্ন করা আমি পছন্দ করি না। তাই আমার প্রশ্নের উত্তর দাও আগে??’

আরাদ সায়েনের চোখের ভাষায় ওর ভালোবাসা পরিমাপ করে ফেলেছে তবুও সে সায়েনের মুখ থেকে শুনতে চায়। কিন্তু সায়েন বলল না উল্টে সে বলল,’এই কথাটা ওতো সস্তা নয় যে,,,,,’

আকস্মিক সায়েনকে চুপ করিয়ে দিলো আরাদ। একহাতে সায়েনের কোমড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে সে। আরেকহাত সায়েনের পিঠের উপর। হতভম্ব হয়ে সায়েন নড়চড় করা ভুলে গেছে। ওষ্ঠচুমু গভীর থেকে গভীরতর করছে আরাদ। সে তার প্রেয়সীর অধরে ডুবে গেছে দিক দিশা ভুলেই। সায়েন পারছে না নিজেকে আরাদের বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন থেকে মুক্ত করতে। কাঁদতে কাঁদতে এমনিতেই সে সর্বশক্তি হারিয়ে বসে আছে। মনের শক্তি ফুরিয়ে গেলে শরীরের শক্তি কোন কাজ করে না। মন চাইলে তবেই শরীরের শক্তি কাজে লাগানো যায়। হাতের ভর টুকুও ছেড়ে দিয়েছে সায়েন। আরাদ সায়েনের কোমড় থেকে হাত সরিয়ে সায়েনের হাত ধরে নিজের ঘাড় গলিয়ে গলার উপর রাখলো। তারপর হাতটা আগের স্থানে সরিয়ে নিলো সে। কিছুক্ষণ পর সায়েনকে ছেড়ে দিলো আরাদ। তবে পুরোপুরি ছাড়লো না। হাত দুটো এখনো কোমড় আর পিঠে বিদ্যমান। চোখ বন্ধ করেই হাপাচ্ছে সায়েন। দম বন্ধ হয়ে আসছিল এতক্ষণ ওর। তাই ছাড়া পেতেই বড়বড় নিঃশ্বাস ফেলছে সায়েন। বন্ধ চোখের পাতার ফাঁক দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আরাদ নিজের ওষ্ঠজোড়া সায়েনের ভেজা আখিপল্লবে ছোঁয়ায় কপালে গভীর চুমু এঁকে দিয়ে সায়েনের দিকে তাকালো সে। মাত্রই চোখ খুলে তাকিয়েছে সায়েন। আরাদের চক্ষু জোড়া লাল বর্ণ ধারণ করেছে। খুব কি রেগে আছে সে??
আরাদ সায়েনের কোমড়ে হাল্কা চাপ দিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করে,’ভালোবাসো??সত্যি জানতে চাই আমি!!’
সায়েনের সাথে সাথে আরাদের নিঃশ্বাসের পাল্লা ও ভারি হয়ে উঠেছে। সেও ঘনঘন শ্বাস ফেলছে। আরাদ প্রশ্নের জবাব শোনার জন্য চেয়ে রইল সায়েনের দিকে। এই চাহনি আর উপেক্ষা করতে পারলো না সায়েন। পারলো না অভিমানের পাল্লা ভারী করে আরাদকে আবার দূরে সরিয়ে দিতে। কারণ অভিমানের পাল্লার থেকে ভালোবাসার পাল্লাটা যে আজ বেশি ভারি। আরাদের গলা জড়িয়ে ধরে শব্দ করেই কেঁদে উঠলো। আরাদের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠলো,’খুব ভালোবাসি আপনাকে। অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। আপনি কেন আমার সাথে এরকম করছেন?? আমার কি দোষ বলতে পারেন??যার জন্য এত শাস্তি দিচ্ছেন আমাকে??আমি পারবোনা অন্য কারো সাথে আপনাকে দেখতে। তবুও কেন আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন আমাকে??’

আরাদের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল প্রশান্তির সেই হাসি। এতদিনে সায়েন নিজের মুখে সবটা স্বীকার করলো!!আরাদ দুহাতের বন্ধন আরো শক্ত করলো। হেসে বলল,’তোমার একটাই দোষ সায়েন। সেটা হলো আমাকে ভালোবাসি না বলা। এরজন্যই শাস্তি পাচ্ছো তুমি। তাহলে শেষমেষ আমার ড্রামা সফল‌ হলো!! আমার সায়েন আমাকে ভালোবাসি বলল।’

সায়েন ছেড়ে দিলো আরাদকে। ভ্রু যুগল হালকা কুঁচকে বলল,’হুমম, আপনি তো সবসময়ই ড্রামা’ই করেন আমার সাথে। আপনাকে দ্বিতীয় বার বিশ্বাস করে আবারো ঠকেছি আমি। বারবার আমার ভালোবাসা তুচ্ছ করে চলে যান। আজও তাই করেছেন। এখানে এখন কেন এসেছেন। ওই মেয়েটার কাছেই যান। আংটি তো পরিয়ে দিয়েছেন তাই না??’

সায়েন চেয়েও আরাদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারলো না। আরাদ তার গায়ের জোরে ধরে রেখেছে। সে বলল,’যাকে আংটি পরাবো সে’ই তো আমার সামনে তাহলে আমি যাব কোথায়??’

সায়েন চুপ করে গেল। আরাদের কথার মানে সে বুঝতেই পারলো না। শুধু তাকিয়ে রইল।আরাদ পকেট থেকে একটা ছোট্ট বক্স বের করে হাঁটু মুড়ে বসলো সায়েনের সামনে। বক্স খুলে আংটিটা সযত্নে পরিয়ে দিলো সায়েনের হাতে। হাতের পিঠে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,’বলেছিলাম না এইবারের বিশ্বাসে তুমি ঠকবে না সায়েন। আমি আমার কথা রেখেছি। একটু আগে কি হয়েছিল,তুমি কি দেখেছো সবটাই তোমার চোখের ভ্রম। ভুলে যাও সবকিছু। আমার সাথে নতুন জগতে ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নাও সায়েন। যেখানে ভালোবাসা ছাড়া তুমি কিছুই পাবে না।’

আবার কেঁদে ফেলল সায়েন। আরাদের কথা ওর বিশ্বাস হচ্ছে কিন্তু একটু আগের ঘটনা সে ভুলতে পারছে না। সত্যি কি আরাদ ওই মেয়েটাকে আংটি পরিয়েছে?? সবকিছু কেন এতো বিষাদময় লাগছে??অসহ্য কেন লাগছে এতো???
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩৩

মধ্য রজনী,এই সময়টাতে শব্দগুলোও যেনো ঘুমিয়ে যায়। হয়তো ওরাও মানুষের মতো ক্লান্ত হয়ে পড়ে বলে রাতের মাঝামাঝি ঘুমিয়ে যায়!! সকাল হতেই আবার শুরু করবে মানুষকে জ্বালানো। এই সময়টাতে ঘুমটাও ভালো হয়। এইরকম মধুময় সময়টাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সাদা শার্ট পরিহিতা মেয়েটি। ফুলহাতা শার্টের গলা পর্যন্ত বোতাম লাগিয়ে মাথার নিচে দুহাত গুঁজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সে। সায়েনকে এভাবে ঘুমাতে দেখে হেসে ফেললো আরাদ।‌ সবে ঘুম ভাঙল ওর। এক ঘন্টা ঘুমিয়েছে কি সন্দেহ। বালিশের নিচে হাতরে মুঠোফোনটি বের করে সময় দেখে নিলো। তিনটা পঁচিশ। মনে করার চেষ্টা করলো যে কখন ও এখানে এসেছিলো!!সাড়ে দশটার বেশি তো হবেই। আর তারপর সায়েনকে মানাতে মানাতেই আরো সময় কেটে গেছে। ওইটুকু শুনেই ক্ষান্ত হয়নি সায়েন। অবশেষে সামিউক্তার সম্পর্কে সব জানিয়ে শান্ত করতে হয়েছে সায়েনকে। সব শুনে সায়েন আরো একবার নিজে থেকে আলিঙ্গন করেছিল আরাদকে। ওই মুহূর্তটা আরাদ কখনোই ভুলবে না। নিজের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত ছিল ওটা। সায়েন নিজে থেকেই আরাদের বুকে ধরা দিয়েছে। ভেবেই মুচকি হাসিটা আরো গাঢ় হয় আরাদের। ঘুমন্ত সায়েনের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো সে। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখটা সায়েনের। নিশ্চয়ই এই কয়দিন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেনি। ঘরবন্দি থেকে চিন্তায় চিন্তায় নাওয়া খাওয়া ভুলে গিয়েছিল। তাই তো এখন আরামে ঘুমাচ্ছে। মাথায় নিচে হাত গুজে কেমন বাচ্চাদের মতোই ঘুমিয়ে আছে সায়েন। আরাদের চোখের ঘুম ইতিমধ্যে পালিয়ে গেছে বহুদূর। আরাদ সায়েনের একহাত ওর মাথার নিচ থেকে টেনে বের করে হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। কিন্তু অপরহাত মাথার নিচেই রয়ে গেল। এভাবে কি কেউ ঘুমায়??আরাদ সায়েনকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে ডাকলো, ‘সায়েন,সায়েননননন,,,,’

নড়েচড়ে উঠলো সায়েন তবে জাগলো না। ঘুমিয়ে থাকা অবস্থাতেই গমগমে কন্ঠে জবাব দিলো,’হুমমমমমম।’

চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকালো আরাদ। আজকে বোধহয় ঘুমটা বেশি হয়েছে সায়েনের। কালবিলম্ব না করে আরাদ বলে ওঠে,’ঠিক হয়ে ঘুমাও। নাহলে ঘাড় ব্যথা করবে।’

‘উহু,করবে না ব্যাথা। আমার অভ্যাস আছে।’

‘এরকম অভ্যাস বানানোর মানে কি??আর এভাবে ঘুমাবে না। আমি থাকতে তো নয়ই।’

আরাদের থেকে কিন্ঞ্চিৎ দূরে ছিলো সায়েন।হাত ধরে টেনে সায়েনকে নিজের কাছে নিয়ে এলো আরাদ। জড়িয়ে ধরে বলল,’স্বামী স্ত্রীকে এভাবে ঘুমাতে হয় না। একে অপরকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমাতে হয়।’
চোখ মেলে তাকালো সায়েন। বিরক্তির দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সে আরাদের দিকে। মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ বের হলো আপনাআপনিই।

‘এভাবে কথা বলে বিরক্ত করছেন কেন?? অনেক দিন পর একটু শান্তিতে ঘুমাচ্ছি। ঘুমাতে দিন??’

‘আমি বুঝি প্রতিদিন শান্তিতে ঘুমিয়েছি?? আমার চোখের ঘুম তো সব সঙ্গে করেই নিয়ে গিয়েছিলে। তারপর থেকে আর ঘুম হলো কই?’

প্রতুত্যর করলো না সায়েন। এই ছেলের সাথে সে কখনোই কথায় পারেনি আর পারবেও না। তাই এই মুহূর্তে চুপ থাকাটাই ভালো। সায়েনকে চুপ থাকতে দেখে আলাদা ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে?মাথা নাড়লো সায়েন,মানে কিছু না। মুচকি হেসে আরাদ বলল,’নিজেকে একবার দেখেছো??’

‘কি দেখবো??’

‘ভালো‌ করে তাকিয়ে দেখো নিজের জামাকাপড় ছেড়ে আমার শার্ট পরে ঘুমাচ্ছো।’

সায়েন নিজের দিকে তাকালো। সত্যি সে আরাদের শার্ট পড়ে আছে। আর আরাদ উদাম গায়ে শুয়ে রয়েছে। গায়ে অবশ্য চাদর রয়েছে।

‘মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে পড়ে ফেলেছি। ঘুম ধরেছিল বিধায় নিজের জামাকাপড় ঘাটার সময় পাইনি। এখানে সমস্যা কোথায়?’

‘উহু এতে সমস্যা নেই। সমস্যা অন্য জায়গায়। এভাবে কেউ শার্ট পড়ে??গলা পর্যন্ত বোতামগুলো লাগিয়ে??আর হাতা কি করেছো??’

আরাদ সযত্নে শার্টের হাতা গুটিয়ে দিয়ে শার্টের গলার নিচের দুটো বোতাম খুলে দিলো। মুচকি হেসে বলল,’এবার ঠিক আছে।’

শার্টের খোলা বোতাম সমেত কলার চেপে ধরে বড়বড় চোখে সায়েন আরাদের দিকে তাকালো। আরাদের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘দিনদিন আপনি আরো বেশি অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন।’
বুকের উপর হাত চেপে ধরে চাপা আর্তনাদ করে উঠলো আরাদ। হঠাৎ এরকম কেন করলো তা সায়েন বুঝলো না। শুধু তাকিয়ে রইল আরাদের দিকে। বুক থেকে হাত সরিয়ে আরাদ সেদিকে নজর দিলো। লাল দাগ হয়ে গেছে বুকে। বেশ কয়েক স্থানে ছড়ে গেছে। আরাদ তার দৃষ্টি সায়েনের দিকে ঘোরালো। সায়েন এখনও নির্লিপ্ত দৃষ্টি মেলে আরাদের লোমশহীন লাল বর্ণ ধারণ করা বুকের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাদ তার তর্জনী আঙ্গুল দ্বারা সায়েনের ঠোঁট সরিয়ে দাঁত দেখে বলল,’এতো ধারালো দাঁত কিভাবে বানালে??কি করেছো দেখতে পেয়েছো??’
সায়েন ঝাড়া দিয়ে আরাদের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,’চোখের মাথা খেয়েছেন??আমি কি কুকুর নাকি যে আপনাকে কামড়াতে যাবো??আর এটা কামেড়ের দাগও নয়। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন ওটা কিসের দাগ।’

আরাদ ভালো করে তাকিয়ে দেখেও বুঝলো না তবুও সে বলল,’তোমার নখের আঁচড়???’

সায়েন চাদর টেনে ওপাশ ফিরতে ফিরতে বলল,’নাহ,আপনি যেই আংটি পরিয়ে দিয়েছিলেন ওটারই দাগ। এখন বলুন দোষ কি আমার নাকি আপনার??আমি কি আপনাকে বলেছি আংটি আনতে আমার জন্য??’
হতাশ হলো আরাদ। সে পেছন থেকে জড়িয়ে নিলো সায়েনকে। তারপর পুনরায় বলল,’তা বলোনি তবে ঘুমানোর আগে খুলে ঘুমাতেই তো পারতে??’

সায়েন আরাদের দিকে না ফিরে দুহাত জোর করে বলল,’মাফ চাই আপনার কাছে। কথায় পারা যাবে না আপনার সাথে। তাই আমি স্যালেন্ডার,এবার ঘুমাতে দিন।’

বলেই চোখ বন্ধ করে ফেলল সায়েন। এবার শব্দ করেই হেসে উঠলো আরাদ। আরেকটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো সায়েনের বাহু। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘আমার ভালোবাসার কাছে স্যালেন্ডার করতে বড্ড বেশি দেরি করে ফেলেছো তুমি সায়েন। তবে একবার যখন আমার জেলখানায় বন্দী হয়েছো আর ছাড়া পাবে না এখান থেকে।’

আরাদের এই উক্তিটির জবাব পেলো না সে। চোখ বন্ধ করেই মুচকি হাসলো সায়েন। এভাবে শেষ কবে হেসেছে তা সায়েনের নিজেরই মনে নেই। তবে এতো দিন পর সে হাসছে সেটা যদি শাফিন আর ওর বাবা দেখে নিশ্চয়ই ওরা খুশিতে পাগল হয়ে যাবে। কম কষ্ট তো করেনি সায়েন। এতগুলো দিন ধরে একটার পর একটা ঝড় বয়েই গেছে। আর আজকে সেই ঝড়ের ইতি টেনেছে আরাদ। সায়েন আরাদের হাত ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। আরাদও ঘুমালো তবে ক্ষণিকের জন্য। ভোরের আলো ফোটার আগেই সে নিজ কক্ষে চলে গেল তা সায়েন টেরও পেলনা। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল সে তখন।

যখন ঘুম ভাঙ্গল নিজেকে একাই বিছানার উপর দেখলো সায়েন। পাশ ফিরে তাকিয়ে আরাদকে দেখতে না পেয়ে সে উঠে বসল। আপনাআপনি সায়েনের হাত ঘাড়ে চলে গেল। ঘাড়ে একটু ব্যাথা অনুভব করছে সে। হাত দিয়ে ঘাড় মাসাজ করতে করতে উঠে দাঁড়ালো সায়েন। কাবার্ড থেকে থ্রিপিস বের করে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। টানা এক ঘন্টা শাওয়ার নিলো সে। এতদিনের কষ্ট, ঝামেলা,অভিমান সব নিমিষেই ঠান্ডা পানির সাথে মিশিয়ে ঝেড়ে ফেলল। অদ্ভুত শান্তি লাগছে সায়েনের আজ। শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। তাই জামাকাপড় ছাদে মেলে দিয়ে আবার রুমে ফিরে এলো। এখন সায়েন আরেকটু শুয়ে থাকবে। মাথাটাও ধরেছে কেমন জানি। চুল ঝেড়ে তোয়ালে চেয়ারের উপর মেলে দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে চোখ গেল ড্রেসিং টেবিলের উপর থাকা ভাজ করা কাগজের উপর। হাতটা থেমে যায় সায়েনের। চিরুনি রেখে কাগজটা হাতে নিলো সে। চারভাজের কাগজখানা খুলতেই দেখলো তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা সুন্দর মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্য।’

লেখাটা পড়েই ঠোঁটজোড়া প্রস্বস্ত করে হাসলো সায়েন। কাগজটা রেখে আবারো নিজের কাজে মন দিলো সে। আবারো বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সায়েন। অদ্ভুত,সে আবারো ঘুমিয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পরেই কবিতা এসেছিল খাবার নিয়ে সায়েন ঘুমিয়েছিল বিধায় আর ডাকেনি সে।

আরাদের গাড়ি এসে থামলো পুলিশ স্টেশনে। গাড়ি থেকে নেমে পরনের শার্টটা আলতো করে টেনে ঠিক কররো আরাদ। তারপর দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকলো। আকাশের কেবিনে যেতেই আকাশ ওকে বসতে বললো। চেয়ার টেনে হেলান দিয়ে বসলো আরাদ। আকাশ প্রশ্ন করলো, ‘কফি??’
কপালে দুই আঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে আরাদ বলে,’নাহ,সামিউক্তার সাথে দেখা করতে এসেছি??হয়ার ইজ সি??’

‘আছে!!ওর বাবা জামিনের চেষ্টা করছে। আমিও এমন ব্যবস্থা করেছি যে তাও সে করতে পারবে না। এরপর তিনি ছেলে মেয়েকে অন্য থানায় ট্রান্সফার করার চেষ্টাও করেছে কিন্তু তাও সফল হয়নি। কারণ তার আগেই কোর্টে নোটিশ চলে গেছে। কালকে কোর্টে চালান করা হবে দুইজনকেই।’

আরাদ এক ধ্যানে আকাশের কথা শুনে গেল। তারপর চট করে উঠে দাঁড়িয়ে হাতঘড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল,’আমার বেশি সময় নেই আকাশ!!’

আকাশ উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে চলল। পেছন পেছন আরাদও। সামিউক্তাকে যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে গিয়ে থামলো ওরা। কিন্তু আকাশ চলে গেল আরাদকে একা রেখে। এইসময় আরাদকে দেখে চমকালো সামিউক্তা। তবে সে বেশ খুশি হলো যে আরাদ ওর সাথে দেখা করতে এসেছে। হয়তো আরাদের মন গলেছে এই ভেবে সে এগিয়ে আসলো। বলল,’আমার মন বলছিল যে তুমি আসবে আরাদ। প্লিজ আমাকে বাঁচাও আমি জানি তুমিই পারবে আমাকে বাঁচাতে।’

ফিক করে হেসে উঠলো আরাদ। সামিউক্তা বোকার মত তাকিয়ে রইল আরাদের দিকে। দেখে মনে হচ্ছে সে কোন মজার কথা বলেছে যার জন্য হাসছে আরাদ।

‘হাসছো যে??’

সামিউক্তার প্রশ্নে হাসি সংযত করলো আরাদ। সামিউক্তার দিকে তাকিয়ে তিক্ত হেসে বলল,’তোমাকে ছাড়াবো বলে তো জেলে পাঠাইনি??’

‘তুমি জেলে পাঠিয়েছো??আরাদ তুমি,,,,?’
বিষ্মিত কন্ঠে বলল সামিউক্তা।

‘হ্যা আমি!!!জানো আমি আরো একবার এই জেলখানায় এসেছিলাম একজনের সাথে দেখা করতে রাতের বেলা,কিন্তু সে তো আমার সাথে দুদন্ড কথাও বলেনি যার জন্য সারারাত এই মেঝেতে বসে কাটিয়েছিলাম। কষ্ট হলেও মানিয়ে নিয়েছি। শুধু তাই নয়,তার জন্য দিনের পর দিন নোংরা চিলেকোঠার ঘরে থাকতেও আমার কোন কষ্টও হয়নি। তুমি কি ভেবেছো??আমি এতকষ্ট করে যাকে পেলাম তাকে ছেড়ে তোমায় বিয়ে করবো??হাউ ফানি।’

সামিউক্তা কিছু বলল না। শুধু বিষ্মিত চোখে চেয়ে রইল আরাদের মুখপানে। আরাদ আবারো বলল,’সায়েনকে জিজ্ঞেস করেছিলে না যে ও কিভাবে জেলে থেকেছে??সেই অভিজ্ঞতা তুমি নিজেই পাবে। এই জেলখানায় থেকে। ভেবো না যে তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে যাবে?? তোমার বিরুদ্ধে কেসটা আমি করেছি এতো সহজ নয় বের হওয়া। ওহ আরেকটা কথা,ধন্যবাদ!!’

বলেই হাসলো আরাদ। সামিউক্তা বলল, ‘ধন্যবাদ কিসের জন্য??’

‘তোমার জন্যই তো সব হলো। তোমার সাথে এংগেজমেন্টের কথা না হলে আর তুমি সায়েনকে গিয়ে সবটা না জানালে সায়েন আমাকে এত তাড়াতাড়ি নিজের মনের কথাটা জানাতো না। সবকিছুর জন্য কিছুটা হলেও তুমি আছো। তাই ধন্যবাদ,আসি!!জেলে থাকতে কেমন লাগে তা আমাকে বলো কিন্তু??’

সামিউক্তাকে কোন কথা বলতে না দিয়েই আরাদ চলে আসলো ওখান থেকে। কাল অবধি অনেক রাগ হচ্ছিল সামিউক্তার ওপর। কবিতাকে ও আগেই বলেছিল সামিউক্তার উপর নজর রাখতে। কবিতা সেটাই করেছিল।সামিউক্তার সমস্ত কথাই সে আরাদকে জানিয়ে দিয়েছিল। আরাদ সব প্ল্যান মাফিক করছিল। মাঝখানে সামিউক্তা সায়েনের সাথে দেখা করে সব গন্ডগোল পাকিয়ে দিলো। সামিউক্তাকে সবার সামনে খারাপ প্রমাণ করে সায়েনকে সবার সামনে আনার পরিকল্পনা ছিল আরাদের। সবার সামনে সায়েনের পরিচয় তুলে ধরতো আরাদ। সায়েন সব জেনে যাওয়ায় তা আর হলো না। তখন সায়েনকে সামলাতেই সময় পেরিয়ে গেল আরাদের। তবে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে এটাই অনেক।

একটা কাজের জন্য বেরোতে হয়েছে আকাশকে। বাইক নিয়ে সে বের হয়েছে। ভার্সিটির সামনে দিয়েই যেতে হয় আকাশকে। হঠাৎ করেই আকাশের চোখ গেল রাস্তার পাশের ফুসকার দোকানের দিকে। তনয়া আর আরশি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুসকা একটার পর একটা মুখে পুরতে ব্যস্ত যেন ওরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। কিন্তু আকাশ বেশি অবাক হলো ইফতিকে দেখে। ফুসকার প্লেট হাতে নিয়ে ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইফতি তবে ফুসকা খাচ্ছে না। তনয়া আর আরশি ওদের ফুসকা চিবোতে চিবোতে ইশারায় ইফতিকে ফুচকা খেতে বলল। ইফতি মাথা এপাশ ওপাশ দুলিয়ে না করতেই তনয়া ইফতির মাথায় গাট্টা মারলো। সাথে আরশিও ইফতির পিঠে কিল বসিয়ে দিল। লেডিস বাহিনীর আক্রমনে ইফতি একটা ফুসকা মুখে দিয়েই লাফাতে শুরু করে দিয়েছে। ঝালে ওর প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তনয়া আরশি দু’জনেই হাসতে লাগলো। পানির বোতল এগিয়ে দিলো তনয়া। ইফতি পানি খেয়ে হাঁপাতে লাগলো। তনয়া আরশি হেসেই কুটিকুটি হচ্ছে।

রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে আকাশের। ইফতির সাথে ওরা কি করছে??ইফতিকে তো আকাশ ভালো করেই চেনে। অনেক গুলো কেস এখনও ইফতির নামে পড়ে রয়েছে। ছোটখাটো প্রমাণ থাকায় বেশিদিন ইফতিকে আটকে রাখা সম্ভব হয় না। ইফতি ছেলেটা ভিশন চালাক। প্রমাণ লোপাট করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সে। লুকিয়ে ও ফেলে সব প্রমাণ। আকাশের ইচ্ছে করছে ইফতিকে গিয়ে উওম মাধ্যম দিতে। কিন্তু ওর কাজটা আর্জেন্ট। পরে তনয়া আরশিকে বোঝানো যাবে ভেবে সে চলে গেল। তবে মনের মধ্যে সে রাগ পুষে রাখলো সে।

সাতটার পরেই বাড়িতে ফিরলো আরাদ। ক্লান্ত শরীরটাকে আগে চাঙ্গা করে নিলো বড় একটা শাওয়ার নিয়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে টিশার্ট পরে নিল সে। তখনই চোখ গেল চারভাজের চিরকুটের উপর। ভ্রু যুগল কুঁচকে চিরকুটটা হাতে নিলো সে।

#চলবে,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here