চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ৪২+৪৩+শেষ

1
52

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৪২

বিয়ের পাঁচ মাসে নিলিমা বেগম কোন ক্ষণের জন্যও চিলেকোঠার ঘরটিতে পা রাখেনি। কিন্তু আজকে হঠাৎ আসায় সায়েন একটুখানি নয় বেশ অবাক হয়েছে। নিলিমা বেগমের গম্ভীর মুখটা ভাবাচ্ছে সায়েনকে সাথে ভয়ও পাচ্ছে সায়েন। কারণ,কালকেই সে জানতে পেরেছে যে নিলিমা বেগম আরাদ আর সায়েনের সম্পর্কের কথা জানতে পেরে গেছেন। এও জানেন সায়েন মা হতে চলেছে। এই ভেবেই সায়েনের ভয়টা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এসি অন থাকা সত্ত্বেও কুল কুল করে ঘামতে শুরু করেছে সায়েন। গলাটাও বেশ শুকিয়ে এসেছে। একা থাকার দরুন ভয়টা একটু বেশি পাচ্ছে সায়েন। আরাদ থাকলে একটু ভালো লাগতো। সায়েনকে এভাবে হাঁসফাঁস করতে দেখে নিলিমা বেগম এগিয়ে গেলেন সায়েনের দিকে। খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসা ছিল সায়েন। নিলিমা বেগমকে আসতে দেখে উঠতে নিলেই তিনি ইশারায় সায়েনকে ওভাবেই বসে থাকতে বললেন। সায়েনও তার কথার নড়চড় করলো না। নিলিমা বেগম এগিয়ে গিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে সায়েনের পাশে বসে বাড়িয়ে দিলো পানির গ্লাসটা। কাঁপা কাঁপা হাতে পানির গ্লাস নিয়ে পানি খেলো সে। নিলিমা বেগম গম্ভীর মুখে বললেন,’আরাদ বললো তুমি নাকি আমাকে খুব ভয় পাও??আমি কি কখনো তোমাকে বকেছি না খারাপ ব্যবহার করেছি?’

হালকা কেঁপে উঠলো সায়েন। নম্র নয়নে তাকালো সামনে বসা মধ্যবয়সী মহিলাটির দিকে। কাল বিলম্ব না করে অকপটে সে জবাব দিলো,’আসলে আমার মাকেও ভয় পেতাম আমি। কখনো মায়ের মুখের উপর কথা বলতাম না। তবে মা কিন্তু খারাপ ছিল না। আমাকে বোঝার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। তবুও একটা ভয় কাজ করতো আমার মাঝে। সেখান থেকেই এই ভয়টা। কাটিয়ে উঠতে পারছি না।’
মুচকি হাসলেন নিলিমা বেগম তারপর বললেন,’তোমাদের বিয়ের কথা আরাদ জানাতে বারণ করেছিল তাই তো?’
হ্যা বোধক মাথা নাড়ে সায়েন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিলিমা বেগম মনের কথা অভিব্যক্ত করতে শুরু করলেন,’আরাদের মুখে যেদিন প্রথম তোমার কথা শুনি আপত্তি করিনি। ওর খুশিতেই আমরা খুশি। কিন্তু যখন তুমি চলে গেলে তখন থেকে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল ও। কিছুতেই বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারছিলাম না। তুমি ওর কপালে ছিলে বোধয় এতো কিছু। যখন জানতে পারি তোমার ব্যাপারে তখন আমি আরাদকে বলি তোমাকে যেন নিজের জীবনে ফের না জড়ায়। আরাদ কিছু বলেনি, শুধু বলেছিল তুমি নিজেই নাকি আরাদকে চাও না। এতে সন্তুষ্ট হয়েছিলাম আমি। তোমাকে যেদিন এই বাড়িতে নিয়ে আনা হলো ওইদিনও আমার আপত্তি ছিল। মায়ের মন তো। ভেবেছিলাম তুমি থাকলে হয়তো আরাদের কোন বিপদ হয়ে যাবে। আরাদ আমাকে বলেছিল তোমাকে বোঝার চেষ্টা করতে। আমি তাও করিনি। কিন্তু যদি আরো আগে সেটা করতাম তাহলে হয়তো ভালো হতো। এতে দোষটা আমারই তাই না?’

সায়েনের চোখে ছলকে উঠলো পানি। এতকিছুর পরও কত শান্তভাবে কথাগুলো বলছেন নিলিমা বেগম। একদম সায়েনের মায়ের মতোই। এক ধ্যানে সে তাকিয়ে রইল শ্বাশুড়ির দিকে। সায়েন মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই নিলিমা বেগম বলে উঠলেন,’এখন থেকে পিছনের সব কথাই আমি ভুলে গেছি। তুমিও ভুলে যাও। চেয়েছিলাম ছেলের বিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে দেব। তা আর হলো কই। তোমার এই অবস্থায় তো এত ধকল নেওয়া সম্ভব না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে বড় অনুষ্ঠান করবো না। তবে কিছু আত্মীয় আছে ওনারা আসবে তোমাকে দেখে যাবে এই আরকি। তবে আজকে নয় তুমি সুস্থ হও তারপর।’
বাধ্য মেয়ের মতোই মাথা নাড়ায় সায়েন। নিলিমা বেগম কথা বাড়ান না। উঠে চলে গেলেন। তিনি চলে যেতেই হাসলো সায়েন। মহিলাটি একদম ভিন্ন। মুখ দেখে বোঝাই যায় না যে তার ভেতরে নমনীয়তা আছে। এসব ভাবতে ভাবতেই আরাদ এসে ঢুকলো রুমের ভেতর সাথে কবিতাও এলো। আরাদের কিছু জিনিস পত্র এনে রাখলো সে। সায়েন অবাক হয়ে বলে,’এসব কেন এনেছেন??’

আরাদ ল্যাপটপটা টেবিলের উপর রেখে বলল,’আজ থেকে তোমার সাথে এখানে থাকব আমি। তাই আমার কিছু কিছু জিনিস পত্র আনলাম।’

সায়েন আর কথা বলল না। কারণ সকালে সে আরাদের কাছে ধমক খেয়েছে একা বাথরুমে যাওয়ার জন্য। কাল থেকে সে সায়েনকে শুধু ধমকেই যাচ্ছে। কোন কিছুই একা করতে দিচ্ছে না। আরাদের মুখের উপর কথা বলা তো ঝাড়ি খাওয়া তাই সায়েন চুপ করে গেল। কবিতা একেক করে সব রেখে চলে গেল। সায়েনের পাশে বসে ল্যাপটপ ঘাটতে লাগলো আরাদ। সায়েন হতাশ হয়ে তাকালো আরাদের দিকে। কাল থেকে বিছানায় বসিয়ে রেখেছে সায়েনকে সে। একটুও নড়তে দিচ্ছে না। সায়েনকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরাদ ওকে বুকে টেনে নিল। সায়েনও মাথাটা এলিয়ে দিলো আরাদের বুকে। সায়েনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অন্যহাতে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙ্গুল চালাচ্ছে সে। শান্তি অনুভব করে সায়েন। ডানহাতটা আরাদের বুকের উপর রেখে চোখজোড়া বন্ধ করে দিলো। এই মানুষটার ভালোবাসা ছেড়ে যে কোথাও যেতে পারবে না সায়েন। হাজার বকা খেয়ে যদি এক চিমটি খাঁটি ভালোবাসা পায় তাহলে এরকম বকা খাওয়ার জন্য সে প্রস্তুত। আরাদ নিজের হাতের বাঁধন আরেকটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সায়েনকে।

_____________

সামিউক্তার বাড়িতে ফোর্স নিয়ে এসেছে আকাশ। যা দেখে সামিউক্তার বাবা অবাক হয়ে গিয়েছেন। দু’দিন আগেই তো সামিউক্তার জামিন হয়েছে। কিন্তু ওর ভাইয়ের জামিন নামঞ্জুর করেছে হাইকোর্ট। তবে সামিউক্তার কেস থেমে নেই চলছে। সাজা অনুযায়ী আবার ও সামিউক্তাকে জেলে যেতে হবে। পুলিশ দেখে সামিউক্তা দাঁড়িয়ে পড়লো। কিন্তু সে বেশি অবাক হলো আরাদকে দেখে। রক্তচক্ষু নিয়ে এগিয়ে আসছে সামিউক্তার দিকে যা সামিউক্তার মনে ভয় সৃষ্টি করছে। আরাদ গিয়েই থাপ্পড় বসিয়ে দিলো সামিউক্তার গালে। একটা নয় পরপর তিন টা। চড় মারা শেষে গলা চেপে ধরে সামিউক্তার। শ্বাস আটকে গেল ওর। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। সামিউক্তার বাবা মা দৌড়ে গেল আরাদকে ছাড়াতে কিন্তু পারছে না। অবস্থা খারাপ দিক এগোচ্ছে দেখে আকাশসহ দুজন পুলিশ মিলে আরাদকে ছাড়িয়ে নিল। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,’আমি ওকে জানে মেরে ফেলব। ওর সাহস কিভাবে হয় সায়েনের দিকে হাত বাড়াবার?? পুলিশের হাতে না দিয়ে ওকে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেললেই ভালো হতো।’
মা’কে জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সামিউক্তা। আরাদের বলা কথাগুলো আরো ভয় পাইয়ে দিচ্ছে সামিউক্তাকে। সামিউক্তার বাবা আরাদকে উদ্দেশ্য করে বলেন,’তুমি কিন্তু বেশি করছো আরাদ। আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস তোমার হয় কিভাবে?’

‘ভাগ্য ভালো আপনার মেয়ে এখনো জীবিত আছে।’
সামিউক্তার বাবা কিছু কথা বলার জন্য উদ্যত হলে আকাশ বলে উঠলো,’আপনি আপনার মেয়েকে ছাড়িয়ে এনেছেন ঠিকই কিন্তু সামলে রাখতে পারেননি। আমরা ওকে আবার অ্যারেস্ট করতে এসেছি তবে অন্য কারণে। জেল থেকে বের হয়েই ক্রাইম করেছে আপনার মেয়ে। সায়েনকে মারার চেষ্টা করেছিল সে। ট্রাকের ড্রাইভার এবং তার জবানবন্দি সাপেক্ষে আপনার মেয়ের নাম আছে। অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টি নিয়েই এসেছি আমরা।’
সামিউক্তার বাবা অবাক হয়ে গেল। মেয়েটা এতো নিচে নেমে এসেছে ভাবতেই ওনার ঘৃণা হচ্ছে। ছেলেমেয়ে দুটোকে সঠিক শিক্ষা দিতে উনি ব্যর্থ ভেবেই মাথা নিচু করে ফেললেন। সামিউক্তা বলল,’আমি কিছু করিনি বাবা। ওরা মিথ্যা বলছে।’

‘মিস সামিউক্তা,একটা কেস অলরেডি খেয়ে বসে আছেন। এবার এই কেসটা আরো জটিল হবে। চলুন আমাদের সাথে।’

দুজন মহিলা পুলিশ টানতে টানতে সামিউক্তাকে নিয়ে গেলেন। ছাড়া পেয়ে যে এরকম জঘন্য কাজ করবে তা ভাবেনি আরাদ। তাহলে সায়েনকে সে কোথাও একা ছাড়তো না। তবে এবার আর কোন ভুল আরাদ করবে না। কঠোর শাস্তি যাতে সামিউক্তাকে দেওয়া হয় তার ব্যবস্থাই করবে সে।

আকাশ আর আরশির বিয়ের দিন এগিয়ে আসছে। মাত্র সপ্তাহ খানেক বাকি। শপিং এ ব্যস্ত তনয়া। সবটাই ওর ঘাড়েই পড়েছে। সায়েন এই অবস্থায় না থাকলে হয়তো ওকে হেল্প করতো। কিন্তু তা আর এখন সম্ভব নয়।আর আরশি তো বিয়ের কনে। ওকে দিয়ে তো এতো কাজ করানো যায় না। এই ক’দিনে সে ইফতির মুখোমুখি হয়নি। তবে কাল শপিং মলে দেখা হয়েছিল। তামিম ছিল বিধায় ইফতি কথা বলতে পারেনি। ইফতিকে তনয়া ভুলে যাবে ভেবেছে। তাই ওকে ভোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ইফতির মতো ছেলেকে ভালোবাসা যায় না। ইফতির কথা ওর এখন মনেও পড়ে না। বিয়ের এতো কাজের চাপে মাথা থেকে ঝেড়ে বের করে দিয়েছে ইফতিকে। কিন্তু ইফতি দমেনি, অনবরত ফোন করে তনয়াকে। নিজের মনের কথা বলার আগেই সে তনয়ার কাছে খারাপ প্রমাণিত হয়ে গেছে। রোজ না আসলেও প্রায়ই রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। নিষ্পলক চেয়ে থাকে বারান্দার দিকে। ভাবে এই হয়তো তনয়া আসবে কিন্তু না তনয়া আসে না। প্রতিবারই নিরাশ হয়ে ফিরে যায় সে। এই কয়দিনে ইফতির অবস্থাও বেগতিক। নিজের যত্ন নিতেও সে বেমালুম ভুলে গেছে। ইফতি ভাবছে ওর এরকম অবস্থা কি দেখেছে তনয়া?হয়তো খেয়াল করেনি। এখন তো সে ইফতিকে ঘৃণা করে। ওর দিকে তাকানোর সময়টুকুও তো তনয়ার নেই।
ইফতিকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরশি মনে মনে সব বুঝে নিয়েছে। কিন্তু তনয়া সেদিনের পর থেকে মুখ খোলেনি। আরশি বারান্দা থেকে রুমে আসলো। দেখলো তনয়া খাটের উপর বসে বসে সব হিসাব মিলাচ্ছে। খাটভর্তি শাড়ি আর গয়না ছড়ানো ছিটানো। আরশি আসতেই তনয়া বলে উঠলো,’শোন এই শাড়িগুলো মা’কে দিয়ে আয়। সব মধ্যবয়সী মহিলাদের দেওয়া হবে। তোর গাঁয়ে হলুদে সবাই পড়বে।’
আরশি শাড়িগুলো একপাশে ঠেলে দিয়ে বলে, ‘ইফতি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তনু। আমি শিওর তোর জন্যই অপেক্ষা করছে সে।’

তনয়া থেমে গেল। কিছু সময় চুপ থেকে বলে,’বাদ দে ওসব অনেক কাজ এখনো বাকি।’

‘তনু তুই আমার থেকে কথা লুকাচ্ছিস কেন?আমি জানি তোরা দুজন দুজনকে পছন্দ করিস ভালোবাসিস। কিন্তু তাহলে এরকম করছিস কেন? বেচারা কষ্ট পাচ্ছে প্লিজ এরকম করিস না।’

তনয়া বেশ রেগে গেল বলল,’তুই যদি কখনো জানতে পারিস তুই যাকে ভালোবাসিস সে একটা খারাপ ছেলে। ড্রাগস নেয়,বাজে নেশা করে তাহলে তাকে আর ভালোবাসবি?ইফতি আমাকে কখনো ভালোবাসেনি। এটা ড্রাগসের মতোই একটা নেশা। নেশা কেটে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করবি না আমাকে।’
শাড়িগুলো নিয়ে তনয়া রুম থেকে বের হয়ে গেল। আরশি তপ্ত শ্বাস ফেলল শুধু। পুরো বিষয়টা এখনও ওর অজানা। তার মানে আকাশ এসব বলতেই চেয়েছিল ওরা শোনেনি। আকাশ তাহলে সবটাই জানে। আরশি ফোন নিয়ে ডায়াল করলো আকাশের নাম্বারে।

কয়েকদিন পেরিয়ে গেল দেখতে দেখতেই। আজকে আরশির গাঁয়ে হলুদ। পুরো বাড়ি সেজেছে সেজন্য। রঙ বেরঙের বাতি জ্বলছে চারিদিকে। বাড়ির বাগানটাও সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। হলুদের স্টেজ বাগানেই সাজানো হয়েছে। সবাই রেডি হচ্ছে যার যার নিজের মতো। বাড়িতে আরাদের আত্মীয় স্বজনে গিজগিজ করছে। একটুও ফুসরত নেই কারো। বিয়ে বাড়িতে এরকম অহরহ ঘটে। চিলেকোঠার ঘরে তৈরি হচ্ছে সায়েন। কবিতা সায়েনকে সাহায্য করছে। শাড়ি নয়, বাসন্তি রঙের ল্যাহেঙ্গা পড়ছে। বাসন্তি রং টা দেখতে অনেকটা হলুদ রঙের মতোই লাগে। ভারি নয়,হালাকাই ল্যাহেঙ্গাটা। তনয়া পছন্দ করে কিনে এনেছে। ভালোই লেগেছে সায়েনের। হালকা সাজগোজ করে তৈরি হলো সায়েন। আরাদের আত্মিয়রা দেখবে সায়েনকে। অসুস্থ থাকায় নিলিমা বেগম কাউকে আনেননি। শেষে ঠিক করলেন আরশির বিয়েতে তো সবাই আসবে তখন না হয় সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। কবিতার সাথেই বাইরে এলো সায়েন। অস্থির নয়নে চারিদিকে কঙ্খিত মানুষটিকে খুঁজে বেড়ালো কিন্তু পেলো না। তাই বাধ্য হয়েই গেল নিলিমা বেগমের কাছে। সবার সাথে পরিচিত হলো সায়েন। তবে কারো মুখে কোন অযৌক্তিক কথা শুনতে হলো না সায়েনকে। আগেই সবার মুখ আরাদ বন্ধ করে রেখেছে যাতে সায়েনকে কেউ কথা শোনাতে না পারে। তবুও সায়েন আর আরাদের অগোচরে নিলিমা বেগমকে অনেকেই অনেক কথা বলেছে। নিলিমা বেগম তাতে কান দেননি উল্টে তাদের কথা শুনিয়ে দিয়েছেন। আর এই সব কিছুই হয়েছে সায়েনের অগোচরে। কারণ এসব শুনলে সায়েন কষ্ট পাবে যা কেউই চায় না। তাই কবিতাকে সবসময় সায়েনের পাশে থাকতে বলেছে যাতে কেউ সায়েনকে কটু কথা শোনাতে না পারে।
আরাদকে খুঁজে চলছে সায়েনের চোখ জোড়া। বোনের বিয়ের সব আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে নিজের অর্ধাঙ্গিনীর কথাই ভুলে গেছে। একটু কি ওকে সময় দেওয়া যেতো না বা এক বার চোখের দেখা?? ভেবেই ফুঁসে ওঠে সায়েন। তবে তা ভেতরেই রয়ে গেল বাইরে প্রকাশ করলো না। সবার সাথে হেসে হেসেই কথা বলছে সে।
আরশিকে সাজানো হয়েছে খুব সুন্দর করে। হলুদের সাজে সে বসে আছে স্টেজে। একে একে সবাই হলুদ লাগাতে ব্যস্ত আরশিকে। তনয়াও সায়েনের মতো ল্যাহেঙ্গা পড়ে নিজেকে কৃত্রিম সাজে সাজিয়েছে। হলুদ মাখানো হয়েছে আরশিকে সেভাবেই সেলফি তুলছে ওরা। কোথা থেকে যেন তামিম এসেও যোগ দিলো তাতে। তনয়া গিয়ে সায়েনকেও ডেকে আনলো। ফ্যামিলি ফটো তুলবে,সবাই উপস্থিত থাকলেও আরাদ লাপাত্তা। এতে সবার মনক্ষুন্ন হলেও কিছু করার নেই। কারণ আরাদ বাড়িতেই নেই। কোথায় যেন চলে গেছে সে। এমনকি আরশিকে হলুদ মাখাতেও পারেনি।
হলুদের অনুষ্ঠান শেষে চিলেকোঠার ঘরে ফিরে গেল। চেঞ্জ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। কিন্তু ঘুমালো না,চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না কিছুতেই। আরাদের উপর একরাশ অভিমান জমেছে ওর। আজকে এতো সুন্দর একটা দিনে কোথায় চলে গেল?? আকাশ কুসুম ভাবতে ভাবতে রাত আরো গভীরে চলে গেছে তা সায়েন টেরও পেলো না। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে কেঁপে উঠলো তবে ফিরে তাকালো না। তবে সায়েন বুঝলো যে আরাদ এসেছে। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান ধরলো সায়েন।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৪৩

শুভ্র রঙের পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে রুমে ঢুকলো আরাদ। সায়েনকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে হাতঘড়ির দিকে তাকালো সে। আড়াইটা বাজে,ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে সায়েনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো আরাদ। সায়েনকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসলো। এই ঘুমন্ত মুখটা দেখেই তো সে প্রথম এই সাধারণ রমনিটির মায়ার পরেছিল। পরে তা ভালোবাসায় রুপ নেয়। সেদিনের কথা মনে পড়তেই হাসিটা আরো গাঢ়ো হলো আরাদের। ঠোঁট জোড়া স্পর্শ করলো সায়েনের বন্ধ চোখের পাতায়। সায়েন তবুও চোখ খুলল না। বুঝতে চাইলো যে আরাদ কি করছে?? এরপর আরাদ সায়েনের ঠোঁট স্পর্শ করতেই ঝটকা মেরে উঠে বসলো সায়েন। আচমকা সায়েনকে উঠতে দেখেও আরাদের কোন ভাবান্তর হলো না। সে বসে রইল আগের ন্যায়। মুখের হাসিটা এখনও আগের মতোই বিদ্যমান। সায়েন রাগন্বিত কন্ঠে বলে,’রাত বিরেতে কি শুরু করেছেন?ঘুমাতে দেবেন না নাকি? আপনার ঘুম নাই বা পেতে পারে কিন্তু আমার ঘুম পেয়েছে।’

আরাদ বসা থেকেই জবাব দিলো,’ওহ আচ্ছা, তুমি ঘুমাচ্ছিলে বুঝি??’
সায়েন মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে বলল,’তা দিয়ে আপনি কি করবেন শুনি? এতক্ষণ যেখানে ছিলেন সেখানেই যান।’

আরাদ উঠে গিয়ে সায়েনের পাশে বসলো। পাঞ্জাবির বোতাম গুলো খুলে দিয়ে বলল, ‘রাগ করেছো??’
কথাটা সায়েনের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিলো অনেকটা আগুনে ঘি ঢালার মতো। সে জবাব দিলো না। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলো।আরাদ আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সায়েনকে কাছে টেনে নিলো। মুখ ডুবালো সায়েনের ঘন কেশে। সে বুঝতে পেরেছে তার অভিমানীনির এক রাশ অভিমান হয়েছে। তাই সে অভিমান ভাঙাতে বলল,’আমাদের প্রিন্সেস কি আমার মতো হবে নাকি তোমার মতো??’

আরাদকে দূরে সরাতে চেয়েও সায়েন পারলো না। শক্ত বাঁধন খোলা ওর পক্ষে সম্ভব নয় তাই সে উওর দিলো,’মায়ের মতো হবে।’

সায়েনকে ছেড়ে চমকিত নয়নে তাকালো আরাদ। অব্যক্ত গলায় বলল,’শ্বাশুড়ি মা!!ওহ মাই গড!!’
সায়েন ক্রোধ দৃষ্টি মেলে তাকালো আরাদের দিকে। আরাদ মেকি হেসে বলল,’নাহ,ঠিক আছে। সেরকমই হবে আমার কোন সমস্যা নেই। তবে দেখো তখন যেন আমাকে আবার চিলেকোঠার ঘরে লুকিয়ে না থাকতে হয়।’

সায়েন হাসলো না। রাগটা ওর এখনো কাটেনি। আরাদ ওর হাত দুটো ধরে আদুরে গলায় বলল,’প্লিজ রাগ করো না সায়েন। আসলে জোনায়েদ কে আনতে ইয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। এতো দিন দেশের বাইরে ছিল ও। আরশির বিয়ের জন্য এসেছে। আবার চলে যাবে। তুমি তো জানো ও আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। তাই দেরি হয়ে গেছে।’

সায়েনের রাগ একটু হলেও কমলো। কন্ঠস্বর নমর করে বলল,’আগে ফ্রেশ হয়ে আসুন তারপর কথা বলবেন না হয়।’

আরাদ আর কি করবে চলে গেল ফ্রেশ হতে।টাউজার আর গেঞ্জি পরে সে বের হলো। সায়েন বিছানায় হাঁটু মুড়ে বসে আছে। আরাদ এসে ওর পাশে টান হয়ে শুয়ে পড়ল। সায়েন একপলক আরাদকে দেখে নিয়ে সেও শুয়ে পড়লো। সায়েনের হাতটা আরাদ মুঠোয় নিল। সায়েনের দিকে ফিরে তাকাতেই সায়েন বলল,’আপনি কিভাবে জানেন আমাদের মেয়ে হবে??’

আরাদ হেসে জবাব দিলো,’ওটা সিক্রেট, তুমি দেখে নিও আমাদের কিউট প্রিন্সেস হবে ঠিক তোমার মতোই। তোমার মতো করে হাসবে কথা বলবে। রাগ করলে ঠিক তোমার মতোই ঠোঁট ফোলাবে। আর আমি দেখব।’

‘নাহ, আমার বেবি আমার মতো হবে না,ওর বাবার মতো হবে।’

‘উহু, আমার মতো হবে না তোমার মতো হবে।’

সায়েন অবাক হওয়ার ভান করে বলল,’আমি কি বলেছি আমার বেবি আপনার মতো হবে? আমি বলেছি ওর বাবার মতো হবে।’

‘তাহলে আমি কে??’

সায়েন অপর পাশ ফিরে শুয়ে মুচকি হেসে বলল,’কি জানি??’

আরাদ এবার বোকা বনে গেলো। পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সায়েনকে। কোমড়ে হাত দিয়ে শুড়শুড়ি দিতে দিতে বলল,’কি জানি?তাই না!!দেখাচ্ছি মজা।’

সায়েন হাসতে হাসতে আরাদের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। রাতটা দুষ্টুমি করেই কাটিয়ে দিলো দু’জনে।

আজকে আরশির বিয়ে,বহু প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজকে সে নিজের প্রিয় মানুষটির অর্ধাঙ্গিনী হতে চলেছে তার সাথে কষ্টও হচ্ছে। এতদিন এই বাড়ির সাথে অনেক স্মৃতি গড়ে উঠেছে ওর। তনয়ার সাথে কাটানো সময় আর দুষ্টুমি গুলো খুব মিস করবে সে। নিজের রুমে বসে হাতের মেহেদির গাঢ় রঙের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশের নামটা স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো নামটার উপর। তখনই একটা নারী কন্ঠস্বর ভেসে এলো,’আর কাঁদতে হবে না বিয়ের কনে। আপনাকে সাজাতে হবে এখন। কান্না করে সাজ নষ্ট করলে মাইর হবে শুধু।’

তনয়ার কথায় চোখ তুলে তাকালো আরশি। চোখের কোনে তখনও জলরাশি বিদ্যমান। তনয়া ওর পাশে এসে বসতেই জড়িয়ে ধরে তনয়াকে। অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে বলে, ‘আই উইল মিস ইউ!!’

এবার তনয়ার চোখেও পানি চলে আসে। কোনরকমে নিজেকে সামলিয়ে সে বলে,’মি টু। কিন্তু এখন তো সাজতে হবে তাই না। আর ভার্সিটিতে তো রোজ দেখা হবে। নো টেনশন ডু ফুর্তি।’
কান্নার মধ্য দিয়ে হেসে ফেলে আরশি। পার্লারের মেয়েরা আরশিকে সাজাতে শুরু করে দিল। তনয়াও রেডি হয়ে নিলো। সন্ধ্যার পর বিয়ে বাড়ি আরেকটু জমজমাট হয়ে উঠলো। এরপর তো সব ঠান্ডা করে দিয়ে চলে যাবে বরপক্ষ তাই এখন এতো জমজমাট হয়ে উঠছে। তনয়া গোল্ডেন কালারের ল্যাহেঙ্গা পড়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাজতে হয়েছে। আরশির জন্যও খুব খারাপ লাগছে ওর। যতই আরশির সামনে হেসে উড়িয়ে দেয় মনের কোন এক কোণে খারাপ লাগাটা বিরাজ করছে ঠিকই। এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে সব কিছুর তদারকি করছে তনয়া। ভার্সিটির কিছু ফ্রেন্ডদের ইনভাইট করেছে। তাদেরকেই আপ্যায়ন করছে। ভিড়ের মাঝে হাঁটার সময় হাতে টান পড়তেই ঘুরে তাকালো সে। তবে ইফতিকে দেখে সে মোটেও অবাক হলো না। তাই সে শান্ত ভাবেই বলল,’হাত ছাড়ুন, এখানে অনেক মানুষ আছে দেখলে খারাপ ভাববে। আপনাকে কে খারাপ ভাববে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমার সম্মানে আমি এতটুকু দাগ লাগতে দিতে পারব না।’

তনয়ার হাত ছেড়ে দিলো ইফতি। অনুনয় করে বলল,’তাহলে একান্ত কথা বলি??না করো না প্লিজ। আমি সত্যি তোমাকে কিছু বলতে চাই। এরপর নাহয় আর কথা বলো না। তবে লাস্ট বার আমার কথাটা শোনো??’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বড় শ্বাস ফেলে তনয়া বলল,’ঠিক আছে, চলুন আমার সাথে।’

তনয়া বাড়ির বাগানের অপর পাশে নিয়ে গেল ইফতিকে। ওখানটায় এখন কেউ নেই। তাই ওখানেই কথা বলা যাবে। তনয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে ইফতির দিকে প্রশ্ন ছুড়লো,’কি বলবেন??আর হ্যা আমার কাছে বেশি সময় নেই যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন।’

মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো ইফতি। তারপর তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,’সত্যি কি তোমার সময় নেই আমার জন্য?নাকি সবই বাহানা মাত্র?’
উওর দিলো না তনয়া। তবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ওর অজানা। তাই কথা ঘোরাতে বলল, ‘এটাই কি আপনার কথা??’

‘নাহ কথা তো এটা না। আমি অন্যকিছু বলতে চাই। এর পর হয়তো তোমার সাথে আর দেখা নাও হতে পারে তাই ভাবলাম কথাগুলো বলে যাওয়াই ভালো।’

তনয়ার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। অজানা ভয় জেঁকে ধরলো মনের ভেতর। কিন্তু চেহারায় তা প্রকাশ পেলো না। ইফতি তার কথা শুরু করল,’জানো তনয়া আমার লাইফটা সম্পূর্ণ আলাদা। তোমরা যেমন বাবা অথবা মা কিংবা ভাইবোনের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারো আমি তেমন পারি না। বাবার সাথে কথা বলতে চাই তো তার সময় হয় না। অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মায়ের সাথে খোলাখুলি কথা বলতে চেয়েও পারিনি। কেমন যেন লাগতো। তাই ঠিক করি অন্তত ভাইয়ার সাথে সব কথা শেয়ার করাই যায়। কিন্তু না,ভাইয়া পড়াশোনায় ব্যতিব্যস্ত। তার কথা বলার টাইম নেই। আর এটাই আমার অসম্পূর্ণ জীবনের গল্প। ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা ঘোরাঘুরি বাজে নেশায় জড়িয়ে ফেলি। কিন্তু ওদের সাথেও মন খুলে কোন কথাই শেয়ার করতে পারি না। কিন্তু লাইফে ফার্স্ট টাইম তোমার সাথে মনের কথাগুলো শেয়ার করতে পেরেছি। আমার পছন্দের রং কি আমি কি খাই?? কি আমি অপছন্দ করি!
কোথায় ঘুরতে যেতে পছন্দ করি!!এসব কিছু আমার পরিবারের কেউই জানে না। শুধু মাত্র তুমি জানো। আমাকে পরিবর্তন করতে আমার পরিবার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু ফলাফল জিরো। আর তুমি না চাইতেও আমাকে বদলে দিয়েছো। এজন্য ধন্যবাদ তোমাকে!! কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছো যে এতকিছুর পর তুমি আমাকে ছেড়ে যাও তাহলে আমার এই পরিবর্তনের কি দরকার ছিল??’

এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো ইফতি। এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে তাকালো তনয়ার দিকে। স্তব্ধতা বিরাজ করছে তনয়ার মধ্যে। চোখে পানি টলমল করছে। ইফতি আবার বলে উঠলো,’খুব বেশি ভালোবাসি তোমাকে। এই কথটা বলতে আমি বেশি সময় নিয়ে ফেললাম বলে সরি। আমার মনে হয়েছিল তোমার উওরটা দেওয়া জরুরি তাই দিলাম। কিন্তু দেরি করে ফেলেছি বলে তোমার প্রশ্নটা তুমি তুলে নিয়েছো!! তারপর ও থ্যাঙ্কস আমাকে পরিবর্তন করার জন্য। ভালো থেকো আসি!!!’

কথা শেষ হওয়া মাত্র ইফতি সেখানে এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না। ঘুরে হাটা শুরু করে দিল। পেছন ফিরে তাকালো না তনয়ার দিকে। ওর জন্য যে তনয়া অশ্রু ঝরাচ্ছে তা কি সে জানে? শুধু নিজের কথাগুলো চটপট বলে এলো কিন্তু তনয়ার যে কিছু বলার ছিল তা কি ইফতি জানতে চেয়েছে??ইফতি চলে যাচ্ছে কিন্তু তনয়া আটকাতে পারছে না। কিন্তু ওর ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে ইফতিকে আটকাতে। জোর করে অধিকার খাটাতে,”চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে,আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। তুমি আমার জন্য বদলেছো তাই আমার কাছেই থাকবে। আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি।” কিন্তু কথাগুলো তনয়ার মনের ভেতরেই রয়ে গেল। হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়েই চমকে উঠে তনয়া। পেছনে না ফিরেই চোখ মুছে ঘুরে তাকালো সে। সায়েনকে দেখে ঘাবড়ে গেল। আমতা আমতা করেই বলে উঠলো,’ভাবি তুমি এখানে??’

‘মানুষ সত্যিকারের ভালোবাসা পায়না আর তুমি ফিরিয়ে দিচ্ছো?? এবার যদি ইফতিকে তুমি হারিয়ে ফেলো তাহলে হয়তো আর ফিরে নাও পেতে পারো। দেখ আমি কিন্তু ভাবিনি যে তোমার ভাইয়ার সাথে আদৌ আমার দেখা হবে কি না?তিনটা বছর তো কম সময় নয়। কিন্তু আমার ভাগ্য চেয়েছিল বলেই তোমার ভাইয়াকে পেয়েছি আমি। কিন্তু সবার ভাগ্য কি এক হয়?? তোমার ভাগ্যে হয়তো নাও থাকতে পারে। তাই ইফতিকে আটকাও। আমার থেকে তুমি বেশি ভালো চেনো ইফতিকে। তোমার জন্য যেহেতু ও বদলেছে সেহেতু ওকে তুমি নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পারবে। একটা ভালো সুন্দর জীবন দিতে পারবে ওকে। তাই দেরি করো না। আটকাও গিয়ে, নাহলে দেরি হয়ে যাবে।’

সায়েনের কথাগুলো ভেতরে নাড়া দিয়ে উঠলো তনয়ার। সম্পূর্ণ হুঁশ ফিরলো যেন। ছুট লাগালো ভিড়ের মধ্যে দিয়ে। খুঁজতে লাগল একটু আগে হারিয়ে যাওয়া চেনা মুখটাকে।
সায়েন তা দেখে মুচকি হাসলো। একটু আগে শাফিন আর রুহি এসেছে। বিয়েতে ওদের ইনভাইট করা হয়েছে। শফিকুল ইসলাম আসেননি। সায়েন ওদের সাথেই কথা বলছিল। হঠাৎ ইফতিকে তনয়ার হাত টেনে ধরাতে কিছু আন্দাজ করেছে সে। সায়েন আগে থেকেই সব জানতো। আরশি সব জানিয়েছে ওকে। তাই ওদের পিছু নিয়ে সব কথোপকথন শুনেছে। সায়েন মনে হচ্ছে ইফতি সত্যি ভালো হয়ে গেছে। শেষ বারের মতো একটা সুযোগ ওকে দেওয়াই যায়।

ফোনের শব্দে ধ্যান ভাঙে সায়েনের। তাকিয়ে দেখলো আরাদের ফোন। কালকে রাগ করার দরুন আজকে সারাদিন জ্বালিয়েছে সায়েনকে। কাজের ফাঁকে সময় পেলে এসে এটা ওটা বকবক করেছে আর দূরে গেলে ফোন দিয়ে। সায়েন ফোন রিসিভ করলো না। সে জানে আরাদকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে। তাই সে সেদিকেই গেল।

বিয়ের পড়ানো শেষ হয়ে গেছে। সব নিয়ম কানুন মেনে আরশির বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। বাবা কাকাকে ঝাপটে ধরে কেঁদে চলছে। ইমজাদ ওহায়েদ ও আড়ালে অশ্রু ফেলেন তবে মেয়েকে বুঝতে দেন না। বাবা মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে শেষে ভাইদের কাছে গেল সে। তামিম আর আরাদ একসাথেই ছিল। আরাদ আরশিকে সামলে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিলো। অপর পাশের দরজা খুলে আকাশ ও বসে পড়লো। হঠাৎ করেই গাড়ির দরজা খুলল তামিম। আরশি তখনও কেঁদে যাচ্ছে। তামিম মাথা নত করে আরশিকে বলল,’তোর জন্য বড্ড আফসোস হচ্ছে, শেষমেষ পুলিশকে বিয়ে করলি!! তোকে তো ঠিকমতো সময়ই দিতে পারবে না। দেখ এখন বাড়িতে গিয়ে আবার চোর ধরতে বেরিয়ে পড়ে কি না?আমি তো ভাইয়াকে বারন করেছিলাম। তোর জন্য একটা সুন্দর রিকশাওয়ালা ঠিক করে রেখেছিলাম। যে তোকে সারাদিন রিকশায় করে ঘোরাবে আর সময় ও দিতে পারবে।’
কাঁদার মধ্যে ও হেসে দিল আরশি। তামিমের পিঠে চাপড় মেরে বলে,’তুই সত্যি অসভ্য!!’

তামিম মুচকি হাসলো তারপর আরশির হাতে চকলেট গুঁজে দিয়ে বলল,’ভালো থাকিস। তোকে জ্বালেতে হুটহাট করে চলে যাব কিন্তু।’

আরশি মাথা নেড়ে বলল,’তনু কোথায় ওকে তো দেখছি না??’

তামিম আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,’দেখছি না তো। দেখ তোর বিয়ে হয়ে গেছে তাই বোধহয় নিজের জন্য এই ভিড়ে পাত্র খুঁজছে।’

আরশি আবারো হেসে দিলো। বধু নিয়ে চলে গেল বরের গাড়ি। সবাই গাড়ি যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। আস্তে আস্তে কয়েকজন আত্মীয় ছাড়া সবাই চলে গেল।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৪৪ (অন্তিম পর্ব)

সবাই যখন আরশিকে বিদায় দিতে ব্যস্ত তনয়া তখন ইফতিকে খুঁজতে ব্যস্ত। কিন্তু কোথাও ইফতিকে সে খুঁজে পাচ্ছে না। এতো মানুষের ভিড়ে কি আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে?তনয়া ছুটতে ছুটতে বাইরে চলে গেল তবুও পাচ্ছে না। অবশেষে ফোন করলো ইফতিকে।ফোন রিসিভ করতেই তনয়া বলে উঠলো, ‘কোথায় তুমি??’
কিন্তু ইফতি জবাব দিলো না। তনয়া ধমকে উঠলো বলল,’মুখে কুলুপ এঁটেছো কেন? কোথায় তুমি??’

‘পেছনে তাকাও!!!’
ফোন কানে নিয়েই পিছন ফিরে তাকালো তনয়া। ইফতি ফোন কানে ধরে তনয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। তনয়া ফোন রেখে ইফতির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এতক্ষণ দৌড়ে হাঁপিয়ে উঠেছে ও। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে সে বলল,’কোথায় যাচ্ছো??’

ইফতি কথা বলে না। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তনয়ার দিকে তাকিয়ে রয়। তনয়া রেগে সজোরে ধাক্কা মারে ইফতির বুকে তারপর বলে,’একটু আগেও তো কত বকবক করছিলে এখন কথা বলছো না কেন??’

‘আগের থেকে চেন্জ হয়ে গেছি তো তাই।’

‘চেন্জ হওয়া লাগবে না আমার সেই আগের ইফতিকেই চাই। শুধু ওই বাজে নেশা করা ছাড়তে হবে।’

হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ইফতি বলে উঠলো, ‘হঠাৎ মত ঘুরলো কেন তোমার? আমার কথায় এতো ইমোশনাল হয়ে গেলে!!আমি তো জানতাম ই না তুমি এতো ইমোশনাল??’

‘কি বলতে চাইছো তুমি??’

ইফতি কথা ঘুরিয়ে বলল,’ভালোবাসো??’

চোখ কুঁচকে তাকালো তনয়া বলল,’আমি নিজে তোমাকে প্রপোজ করেছি এরপরও জিজ্ঞেস করছো ভালোবাসি কি না??’

‘তাহলে কি প্রপোজটা আমার করা উচিৎ ছিল??’

ইফতির এরকম বিহেভে অবাক না হয়ে পারছে না তনয়া। একটু আগেই কত সুন্দর কথা বলছিল ইফতি। এখন হঠাৎ করে কি হয়ে গেলো??সে বলল,’কি বলতে চাইছো তুমি? আমার ফিরে আসাটা কি তুমি নিতে পারছো না??’

‘পারছি!! কিন্তু তুমি পারবে বাড়ির সবার সামনে আমার কথা বলতে?পারবে বলতে যে তুমি আমাকে ভালোবাসো??’

‘এসব বলার মানে কি ইফতি??আমি বুঝতে পারছি না যে তুমি এরকম করছ কেন? ওকে ফাইন আমি যদি না বলতে পারি তাহলে কি করবে তুমি? আমাকে ছেড়ে চলে যাবে??’

‘নাহ, তোমাকে তুলে নিয়ে যাব।’
ইফতি তনয়ার হাত চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে এনে বলল,’তোমাকে আমি কিছুতেই ছাড়তে পারব না অন্তত এরপর তো নয়ই। কিন্তু তোমার ওই পুলিশ ভাইয়ার জন্য সেটা সম্ভব হবে না। সে তোমার ভাইয়াকে সব বলে দেবে তনয়া। তখন তোমার ভাইয়া তোমার আর আমার সম্পর্কটা মেনে নেবে না তনয়া।’

তনয়া ওপর হাত ইফতির হাতের উপর রেখে বলল,’ভয় পাচ্ছো আমাকে হারানোর??’

মাথা নাড়লো ইফতি। তনয়া আবার বলল, ‘তুমি ভাইয়া আর ভাবির লাভ স্টোরি শোননি?কত ঝড় ঝাপটা কাটিয়ে দু’জনে আবার এক হয়েছে। ভাবি মার্ডার কেসের আসামি তার উপর বিয়ে হয়েছিল। যা সমাজ খারাপ চোখে দেখে। ভাইয়া সেই সবকিছু পায়ের নিচে ঠেলে দিয়ে ভাবিকে আবার নিজের করে নিয়েছে। কিসের জোরে?? ভালোবাসার জোরে। ভালোবাসা যদি সত্যি হয় তাহলে এই সব সিম্পল ইস্যু কে গুরুত্ব না দিয়ে ভালোবাসাটাকে সবার উপরে রাখতে হবে। তাহলেই সব কিছু মানিয়ে নেওয়া যাবে। আমার বিশ্বাস ভাইয়া অমত করবে না। ভাবি আর আরশি আমার সাথে আছে।’

ইফতি তনয়াকে জড়িয়ে নিলো নিজের বাহুডোরে। বুক ভরে প্রশান্তির শ্বাস নিলো। আরশি যখন আকাশের সাথে ইফতি আর তনয়ার বিষয়টা আলোচনা করলো তখন আকাশ অবাক হয়েছিল। আরশি নিজেই ওকে সত্যটা বলেছিল। তারপর আকাশ নিজে গিয়েছিল ইফতির বাড়িতে। শাসিয়ে এসেছিল ইফতিকে যেন ও কখনো তনয়ার পিছনে না ঘোরে। তাহলে ও সবটা আরাদকে বলতে বাধ্য হবে। আরাদ যদি একবার সব জেনে যায় তাহলে তনয়াকে কিছুতেই ইফতির কাছে ঘেঁষতে দেবে না। তনয়া আরাদের প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। সেজন্য ভয় পেয়ে গিয়েছিলো ইফতি। কিন্তু তনয়ার কথা গুলো ওর ভয়টা কিছু হলেও দূর করতে পেরেছে।

__________

নতুন পরিবেশে পা রেখেছে আরশি। আকাশের সেই ফ্ল্যাটেই এসেছে। মা আর বোন নিয়েই আকাশের পরিবার। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বিয়ে উপলক্ষে সেও এসেছে। আত্মীয় স্বজন খুবই কম। বাড়িতে এসে সব নিয়ম কানুন মেনে ঘরে তোলা হয়েছে আরশিকে। ভারি গয়না মেকআপ রেখে সুতি শাড়ি পড়ানো হলো আরশিকে। অতঃপর ফুলে ফুলে সাজানো রুমটায় বসিয়ে দিলো। সারা রুমে চোখ বুলিয়ে নিলো আরশি। এই ফ্ল্যাটে যখন প্রথম এসেছিলো এই রুমটাতে ঢুকেনি সে। কেমন জড়তা কাজ করছিল কিন্তু আজ এই রুমটা ওর নিজেরই। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ভাবনার জগৎ থেকে বের হয়ে এলো আরশি। আকাশ কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। কোন উপায়ন্তর না পেয়ে ফোন স্ক্রোল করতে লাগল সে। আকাশ তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে এসে দেখলো আরশি ফোন হাতে নিয়ে কিছু দেখছে। হাতের তোয়ালে রেখে আকাশ বলে উঠলো,’কিছু শেখোনি দেখছি!!বাসর রাতে কেউ ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে?’

আকাশের কথায় চোখ তুলে তাকালো আরশি। মুখের ভাবভঙ্গি তার স্বাভাবিক। ফোন রেখে সে বলল,’তো আমার এখন কিছু করা উচিৎ? আপনার সাথে রোমান্স করা?হাউ ফানি!! আপনার থেকে তো এটা একদমই আশা করা যায় না। আপনার কি মনে আছে সেদিনের কথা??’

আকাশ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,’আমার মনে থাকলেও তোমার নেই বোধহয়।’

‘আমার সবটাই মনে আছে। আপনি আপনার কথাগুলো বাস্তবায়ন করতে টাইম নেবেন তাই আমি ও টাইম দিচ্ছি আপনাকে।’

হতাশাগ্রস্থ হলো আকাশ। এই মেয়েটা দিনদিন বেশি কথা বলছে। তাই সে কথা না বাড়িয়ে আরশির পাশে শুয়ে পড়লো। হাঁটু মুড়ে বসে আকাশের ভাবগতিক বোঝার চেষ্টা করছে আরশি। ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে আকাশ। আরশি উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো আকাশ ঘুমিয়েছে কি না??আরেকটু ঝুকতেই আকাশ ঘুরে তাকালো। তাল সামলাতে না পেরে আরশির পতন হলো আকাশের বুকের উপর। ঝটপট উঠে বসলো আরশি। আকাশ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,’কি হয়েছে?’

‘না মানে আপনি কি সারারাত ঘুমিয়ে থাকবেন??’

‘তো রাতের বেলা কে জেগে থাকে? পুলিশের চাকরিতে বহুরাত নির্ঘুমে কাটিয়েছি আজকে সুযোগ পেয়েছি তাই এই সুবর্ণ সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাই না।’

আরশি বিড়বিড় করে বলল,’তামিম ভাইয়া তাহলে ঠিকই বলেছিল এর থেকে রিকশাওয়ালা বেটার ছিল। অন্তত আমাকে সময় তো দিতো।’

আরশিকে বিড়বিড় করতে দেখে আকাশ বলল,’কি বিড়বিড় করছো??’
আরশি মাথা নেড়ে না বলল। আকাশ ওপাশে ফিরতে নিলে আরশি আবার বলে উঠলো, ‘শুনুন??’

‘হুম বলো!!’

আরশি খানিকটা লজ্জামিশ্রিত সংকোচ নিয়ে বলল,’আপনার বুকের উপর মাথা রেখে ঘুমাবো।’

ভ্রু কুচকালো আকাশ,নির্দিধায় যে আরশি কথাটা বলে ফেলবে তা মোটেও ভাবেনি আকাশ। তবে মেয়েটা যে ওর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ছটফট করছে তা বেশ বুঝতে পারছে। কথা না বলে আরশি দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো সে। মুহূর্তেই আরশির মুখে হাসি ফুটে উঠল। ফোনটা বালিশের পাশে রেখে আকাশের হাতে হাত রাখলো সে। মাথাটা এলিয়ে দিলো আকাশের চওড়া বুকের উপর। আরশির পাগলামো দেখে মুচকি হাসলো আকাশ। দুহাতে আকাশকে জড়িয়ে ধরে আরশি বলে,’আমি কিন্তু জড়িয়ে ধরেই ঘুমাবো। তনয়াকেও এভাবেই জড়িয়ে ধরেই ঘুমাতাম। আপনার সমস্যা হবে কি??’

‘সমস্যা হলেও মানিয়ে নিতে হবে। আমি তোমাকে আগেই বলেছি তোমাকে আমি সবসময় খুশি রাখবো।’

‘আমার একমাত্র খুশির কারণ আপনার ভালোবাসা। ওতেই হবে আর কিছু চাই না আমার।’

আকাশ আর কোন কথা বলল না। চুপচাপ আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। পরম আবেশে চোখ বন্ধ করে রইল আরশি। এভাবেই সে তলিয়ে গেলো গভীর ঘুমে।

সময় বহমান,তাকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। কেউ যদি ভালোবাসার চাদরে এই সময়কে ঢেকেও রাখে তবুও সময় সেই চাদরের ফাঁক গলিয়ে বের হয়ে যায়। এই সময়ের সাথে সাথে কিছু মানুষ জড়িয়ে পরে অনৈতিক কাজে আর কিছু মানুষ ভালোর পথে এগিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। সৃষ্টিকর্তা তার পথে চলা মানুষদের পরীক্ষা করতে খুব ভালোবাসে। তাই তাদের কষ্ট দেন। কিন্তু কিছু কিছু পাপিদেরকে ইহকালে শাস্তি দেন নিজেকে শোধরানোর জন্য। অনেকে শোধরাতে পারে আবার অনেকে পারে না। সামিউক্তাকে সেই সুযগটা তিনি দিয়েছিলেন কিন্তু সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি বিধায় আবার শাস্তি পেয়েছে। কঠোর দন্ডে দন্ডিত হয়েছে সামিউক্তা ও তার ভাই। পাপের শাস্তি ইহকালেই সৃষ্টিকর্তা ওদের পাইয়ে দিয়েছে। এবার যদি ওরা নিজেকে শোধরায় তবে ভালো।

_____________

কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন। ছুটি হয়ে গেছে কিন্তু আরোভিকে সে দেখছে না। এতক্ষণ লাগার কথা না তো? নিশ্চয়ই কারো সাথে মারামারি শুরু করে দিয়েছে!!মেয়েকে নিয়ে আর পারেনা সায়েন। প্রতিদিন একটা না একটা অভিযোগ সে শুনবেই মেয়ের নামে। এজন্য সে আরাদকে মনে মনে শখানেক বকা অলরেডি দিয়ে ফেলেছে। হন্তদন্ত হয়ে সে স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করলো। এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলো। গাছের নিচে শান বাঁধানো বসার জায়গায় বসে আছে আরোভি। ওর আশেপাশে চার পাঁচ জন বসা। সায়েন ভাবলো আজকে কি আবার ভাষন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে নাকি ওর মেয়ে??শব্দ না করেই সেদিকে এগোলো সায়েন। গাছের আড়ালে লুকিয়ে শুনতে লাগলো ওদের কথা। একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে হতাশ হয়ে বলে উঠলো,’আমার বাড়িতে যেতে ভালো লাগে না। আম্মু আব্বু শুধু ঝগড়া করে। আম্মু রাগ করে কালকে না খেয়েই ঘুমিয়ে পরেছে। আমাকে হোমওয়ার্ক করতে হেল্প করেনি তাই তো টিচারের কাছে আজকে বকা খেলাম।’

আরোভি মাথা নেড়ে বলল,’কিন্তু আমার মাম্মাম পাপার সাথে একটুও ঝগড়া করে না। সবসময় মাম্মামকে ভালোবাসে। মাম্মাম আর পাপার ভালোবাসা হচ্ছে ‘চিলেকোঠার প্রেম’।

সব বাচ্চারাই অবাক হয়ে গেল আরোভির কথা শুনে। সায়েন তো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এতো পাকা পাকা কথা কোথা থেকে শিখলো পিচ্চি মেয়েটা। অপর বাচ্চাটা বিষ্মিত কন্ঠে বলে উঠলো, ‘চিলেকোঠার প্রেম সেটা কি আরু??’

আরোভি গর্বের সহিত বলল,’পাপা বলেছে আমাকে,মাম্মামের সাথে নাকি চিলেকোঠার ঘরে থেকে প্রেম করেছে তাই ওদের প্রেম চিলেকোঠার প্রেম!! আমার পাপা বেস্ট পাপা। আমাকে অনেক আদর করে আর মাম্মামকেও। তাই আমি ভাবছি পাপার মতো আমিও চিলেকোঠার প্রেম করব। আমাদের চিলেকোঠার ঘরটা পাপা মাম্মামের জন্য বানিয়েছে। কিন্তু এখন তো মাম্মাম ওখানে থাকে না খালি পরে থাকে রুমটা। তাই আমি ওই চিলেকোঠার ঘরে থেকে প্রেম করব।’

বলেই হাসতে লাগলো আরোভি। পাশে থেকে আরেকজন বলে উঠলো,’খুব ইন্টারেস্টিং তো! এই আমিও চিলেকোঠার প্রেম করব।’

আরোভি শার্টের কলার টেনে ভাব নিয়ে বলল,’ওকে তাহলে নেক্সট ফ্রাইডেতে সবাই আমার বাড়িতে আসবি। পাপার থেকে সবটা জেনে নেব তারপর নাহয় প্রেম শুরু করলাম।’

মাথা ঘুরছে সায়েনের। সাত বছরের মেয়ে এতো হাইপার হয়ে গেছে!!এসব কিছুর জন্য একমাত্র আরাদ দায়ী। প্রতিদিন এই গল্প শোনাবে আরোভিকে।বাচ্চারা সেটাই শেখে যা বড়রা তাদের শেখায়। এইসব কিছুই আরাদ শিখিয়েছে আরোভিকে। মেয়েকে লাই দিতে দিতে মাথায় তুলেছে। সায়েন রেগে গিয়ে কান টেনে ধরলো আরোভির সাথে সাথে সব বাচ্চারা দৌড়ে পালালো। সায়েন রাগি মুখে বলল,’খুব বার বেরেছো তুমি!!চলো বাড়িতে তোমার পাকা কথা বের করছি আমি।’

আরোভির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গাড়িতে বসলো। গাড়িতে বসে আরোভি বলল,’তুমি তো দেখছি নানুর মতো। নানু যেমন পাপাকে দেখে রাগ করেছিল তুমিও সেরকম,,,’

সায়েন আর বলতে দিলো না ধমকের সুরে বলল,’চুপ একটা কথাও বলবে না তুমি। এতো পাকা কথা শিখেছো কোথা থেকে? সবসময় পাপার কাছ থেকে এটা ওটা শিখে আমাকে জ্বালাও কেন?? আজকে আসুক তোমার পাপা তার একদিন কি আমার একদিন।’

আরোভি মুখ চেপে হেসে বলল,’সেগুড়ো বালি পাপা তোমাকে হাগ করলেই তোমার সব রাগ চলে যায় আমি দেখেছি।’

সায়েন কপাল চাপড়ে বলল,’আল্লাহ এ কেমন মেয়ে দিয়েছো আমাকে??’

সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরলো আরাদ। আরোভি ড্রয়িং রুমে বসে বসে হোমওয়ার্ক করছে। পাশেই নিলিমা বেগম আর হাসি বেগম বসে আছেন। আরাদকে দেখামাত্র ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিলো আরোভি। সাথে সাথে ক্যাচ নিলো আরাদ। মুচকি হেসে সে সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি মেয়ের কাছে চলে এলো। আরোভির পাশে বসে দেখতে লাগল ওর হোমওয়ার্ক। এমন সময় সায়েন এলো হাতে চায়ের কাপ নিয়ে। নিলামা আর হাসি বেগমকে চা দিয়ে কড়া চোখে আরাদের দিকে তাকিয়ে আবার রান্নাঘরে চলে গেলো। আরাদ চোখের ইশারায় মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে। আরোভি মুখ ফুলিয়ে মা’কে নকল করে দেখালো। মানে সায়েন রাগ করেছে। আরাদ মাথা নেড়ে আস্তে করে বলল,’আমি গিয়ে দেখে আসি??’

আরোভি মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল, ‘মাম্মাম বলেছে এইবার তুমি হাগ করলেও মাম্মামের রাগ ভাঙবে না।’

‘তাই নাকি??’

‘হুমমম!!’

‘সিরিয়াস কেস তো তাহলে। ওকে আমি গিয়ে চেষ্টা করে দেখি।’

আরাদ উঠে গিয়ে গুটিগুটি পায়ে রান্নাঘরে উপস্থিত হলো। সায়েন গাজরে ছুরি চালিয়ে যাচ্ছে অনবরত। চুলায় মেয়ের জন্য নুডুলস সিদ্ধ করতে দিয়েছে। এই কয় বছরে পাকা গিন্নি হয়ে উঠেছে সায়েন। আরাদ সায়েনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরার আগেই সায়েন বলে উঠলো,’ডোন্ট টাচ মি!! আমাকে টাচ করলে গরম পানি ছুঁড়ে মারব।’

‘এতো রাগ কিসের জন্য জানতে পারি??’

সায়েন ছুরি উঁচিয়ে পেছন ফিরে তাকালো বলল,’জেনেও না জানার ভান করছেন কেন? আমার রাগের কারন সবসময় যে আপনার গুনবতি মেয়ে তা তো জানেনই। আবার জিজ্ঞেস করছেন কেন??’

আরাদ টান দিয়ে সায়েনের হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে নিলো। ছুরিটা পাশে রেখে কাছে টানলো সায়েনকে। খোপা থেকে বেরিয়ে আসা এলোমেলো চুলগুলো কানের পিছনে যত্নে গুজে দিয়ে বলল,’যেদিন আমার প্রিন্সেস প্রথম দুনিয়াতে এলো আমি অধির আগ্রহে হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। নার্স বাইরে এসে আমার কোলেই ওকে প্রথম তুলে দিলো। এর থেকে শান্তি পৃথিবীতে যেন আর কিছু নেই আমার কাছে।ওর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলাম পৃথিবীর সব সুখ ওকে দেব আমি। একজন বাবার কাছে তার মেয়ের শত দুষ্টুমি অতি নগন্য। তাই আমি আমার প্রিন্সেসকে কিভাবে বকা দেই বলোতো??’

সায়েন কথা বাড়ালো না। ছুরিটা নিয়ে আবার গাজর কাটায় মন দিলো। যখনি সে আরাদকে বকবে তখনই এরকম কথা বলেই সায়েনের মনে আঘাত করে ওর সব রাগ গলিয়ে দেবে। মুহূর্তেই সায়েনের অতীতের সব মনে পড়ে গেল। সেদিনের পর থেকে সাতটা বছর পার হয়ে গেছে। আর সায়েন আরাদের সম্পর্কের প্রায় দশ বছর অতিক্রম করেছে। আরোভি গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় আরাদ আর ওর পরিবার যথেষ্ট খেয়াল রেখেছে। যার কারণে সায়েনের ভেলিভারি ভালোভাবেই হয়েছে। সবাই আরোভিকে পেয়ে খুশি। কারণ একটা বাচ্চাই একটা বাড়ি মাতিয়ে রাখতে সক্ষম। ইমজাদ ও ইমাম ওয়াহেদ নাতনি বলতে পাগল। ওনাদের দেখলেই গলায় ঝুলে পড়বে আরোভি। আর দাদিদের কাছ থেকে কতশত গল্প শোনা হয়ে গেছে তবুও তাদের গল্পের ঝুড়ি কখনো খালি হয় না। তামিম বলতেও পাগল আরোভি। মাঝে মাঝে তামিমের কাছে বায়না ধরে ঘুরতে যাওয়ার। অগত্যা তামিমকে তাই করতে হয়। আরোভি দেখতে একদম সায়েনের মতো হয়েছে কিন্তু স্বভাব আরাদের পেয়েছে। আরোভিকে দেখে কেউ না ভালোবেসে থাকতেই পারে না। পিছনের কথা ভেবে সায়েন চুপ করে গেল। আরাদ দেখলো যে বরফ কিছুটা হলেও গলেছে। তাই কফি চেয়ে ওখান থেকে চলে এলো আরোভির কাছে। বুরো আঙ্গুল উঁচিয়ে বোঝালো যে সব ঠিক আছে। বিনিময়ে আরোভি মুচকি হাসলো। তখনই আরাদের ফোন এলো। তনয়া আর আরশি গ্রুপে ভিডিও কল দিয়েছে। হাসি মুখে সে ফোন রিসিভ করতেই আরোভি টেনে নিলো। ফুপি বলতেও সে পাগল। ফোন করলে ওদেরকেও কথার ঝুড়ি শুনিয়ে দেয়।
আকাশের পোস্টিং হয়েছে সিলেটে। আরশি আর ওর মাকে নিয়ে সেখানেই থাকে এখন। আর তনয়াকে নিয়ে ইফতি আমেরিকায় সেটেল হয়েছে। আরশির বিয়ের ঠিক দুই বছর পর ইফতি আর তনয়ার বিয়ে হয়। আকাশ মানতে নারাজ ছিল কিন্তু আরশি আর সায়েন ওকে বুঝিয়েছে যাতে আরাদকে বিষয়টা না জানানো হয়। তাছাড়া ইফতির পরিবর্তন আকাশ লক্ষ্য করেই চুপ ছিল। তবে ইফতি যে এতো তাড়াতাড়ি নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলবে সেটা হয়তো কখনোই ভাবেনি। সবাই এখন দূর দূরান্তে। ইন্টারনেট যোগাযোগ মাধ্যমে সবাই ভাব বিনিময় করে। আরশির চার বছরের একটা ছেলে আছে। ও ভেবেছিল আকাশ হয়তো পিছুটান ভুলতে পারবে না। কিন্তু আরশির ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো। আরিশর সাথে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছে আকাশ। যে ভালবাসা আরশি আকাশের থেকে আশা করেছিল তার থেকে বেশি ভালোবাসা আকাশ দিয়েছে ওকে। এজন্য আরশি সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে।

দু’দিন পর ওরা সবাই সিলেটের উদ্দেশ্য রওনা হলো। আকাশ অনেক বার বলার পর রাজি হয়েছে আরাদ। বাড়ির সকলে মিলে যাবে। আরোভি খুব এক্সাইটেড। তামিমের হাত ধরে সে গাড়িতে বসলো। সায়েন আরোভিকে ডেকে বলল,’চাচ্চুর পাশে বসেছো ভালো কথা। বমি করোনা যেনো??’

‘নো মাম্মাম আ’ম ওকে।’

সায়েন হেসে বলল,’ভাবছি সিলেট গিয়ে তোমার চাচ্চুর জন্য একটা কাকিমনি ধরে আনব কেমন হবে বলোতো??’

আরোভি গালে হাত দিয়ে বলল,’ওমা তারমানে চাচ্চু চিলেকোঠার প্রেম করা ছাড়াই কাকিমনি আনবে??’

সায়েনের মুখের ভঙ্গি বদলে গেল। মেয়েটা এসব ছাড়া কথাই বলতে পারে না। তামিম হেসে বলল,’না মামুনি আমি চিলেকোঠার প্রেম করেই তোমার কাকিমনি আনব হ্যাপি??’

আরোভি মাথা নাড়ল খুশিতে। সায়েন গিয়ে আরাদের পাশে বসে পড়লো। গাড়ি ছুটছে আপন গতিতে। সামনের ফ্রন্ট সিটে বসে আরোভি তামিম কথায় মগ্ন। সায়েন আরাদের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখায় মগ্ন হয়ে গেছে। আরাদ সায়েনের হাত মুঠো করে ধরে আছে। সুন্দর মুহূর্ত গুলো যেন তাড়াতাড়ি চলে যায়। যেমন করে ওদের বিয়ের প্রায় সাড়ে সাত বছরের বেশি পার হয়ে গেছে। সামনের সময়গুলো বোধহয় এভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু এই সময়গুলো আরাদের সাথে যেন সে কাটাতে পারে এটাই ওর চাওয়া। জীবনে যত দুঃখ কষ্ট আসুক না কেন প্রিয় মানুষটির হাত শক্ত করে ধরতে হয়। তাহলে কষ্ট দুঃখ চলে গেলেও প্রিয় মানুষটা থেকে যায়। জীবনে অনেক মানুষ আসবে যাবে শত কষ্টও আসবে যাবে কিন্তু প্রিয় মানুষ জীবনে একবারই আসে। তাই প্রিয় মানুষের হাত কখনোই ছাড়া যাবে না। সেজন্যই হয়তো আরাদ আর সায়েনের ভালোবাসা টিকে আছে। দুজনে মিলে ছুটে চলছে নতুন গন্তব্যে। সেখানে হতে চলেছে ভালোবাসার নতুন সৃষ্টি।

________________সমাপ্ত_________________

অবশেষে শেষ হলো গল্পটা। জানি না শেষটা সবার মনমতো হয়েছে কি না তবুও রিভিউ আশা করছি। প্লিজ কষ্ট করে হলেও রিভিউ দিয়ে যাবে। ভালো মন্দ দুটো নিতেই আমি প্রস্তুত আছি। এবার লম্বা ব্রেক নিবো। কারণ ডিসেম্বরে আমার পরীক্ষা। নিজেকে সেরকম ভাবে তৈরি করতে হবে। পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হবে। তাই এবার লম্বা সময়ের জন্য থেমে যাবো। হয়তো মাঝে মাঝে অনুগল্প নিয়ে হাজির হতে পারি কিন্তু ধারাবাহিক গল্প লিখতে অনেক দেরি। ততক্ষন পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন আর আমার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখে তাহলে আবার নতুন চমক নিয়ে সবার সামনে হাজির হবো।

খোদা হাফেজ,,,,,,,,,,❤️❤️

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here