চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ৪+৫+৬

0
52

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৪

সায়েন কোনমতে নিজেকে সামলিয়ে খাচ্ছে।জয়নব বেগম খাওয়া বাদ দিয়ে শফিকুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি অনেকটা বিরক্ত হয়েই বলে,’তো কি হয়েছে?? কোথাও হয়তো রেখেছো!!পরে পেয়ে যাবে। এখন কি অন্য লুঙ্গি পরা যায় না??’

‘হ্যা যায়তো কিন্তু ওইটা আমার প্রিয় লুঙ্গি। পরেও শান্তি পাই।’

‘একদিন অশান্তিতে থাকলে কিছু হবে না।’

শফিক সাহেব বিড়বিড় করে বলল,’যে অশান্তি আমার ঘাড়ে চেপেছে তার কাছে লুঙ্গি তো সামান্য।’
বলতে বলতে তিনি রুমে চলে গেল। খাওয়া শেষে সায়েন রেডি হতে চলে গেছে। কলেজে যাবে সে। শাফিন আর শফিকুল ইসলাম গেইট পেরিয়ে রাস্তায় আসতেই পিছনে থেকে সায়েন বলে ওঠে,’আব্বু দাঁড়াও।’
দু’জনেই পিছনে ঘুরে তাকালো। সায়েন কাছে এগিয়ে এসে বলল,’আব্বু আমার টাকা লাগবে।’

‘ওহ দিচ্ছি।’ শফিকুল ইসলাম একশ টাকা বের করতেই সায়েন বলল,’উহু এক হাজার টাকা লাগবে।’
শাফিন এতে তেতে উঠল বলল,’তুই কালকে আমার থেকে টাকা নিলি আবার আজকে আব্বুর কাছে এসেছিস???’

সায়েন ধমকে উঠে বলে,’তুই চুপ থাক নাহলে তোকে জরিমানা করা হবে।’
শাফিন হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো। শফিকুল ইসলাম গম্ভীর কণ্ঠে বলল,’ভাইয়ার সাথে এভাবে কথা বলছো কেন??শাফিন যদি তোমাকে টাকা দিয়েই থাকে তাহলে এখন এতো টাকা দিয়ে তুমি কি করবে??’

সায়েন ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বলল,’তুমিও কৈফিয়ত চাইছো হুম!!টংয়ের দোকানে বসে সিগারেট খাওয়ার ছবিটা কি মা’কে দেখাব?? তাহলে তোমাদের ডিভোর্স কনফার্ম।’
সায়েন ব্ল্যাকমেইল করছে। শফিকুল সাহেব নিরুপায় হয়ে টাকা দিয়ে দিলো। চকচকে নোটে চুমু খেয়ে সায়েন দৌড়ে চলে গেল। শাফিন আর ওর বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেছে। শাফিন বলল,’মেয়ে হয়ে বাবা মায়ের ডিভোর্সের জন্য লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে।’

চিলেকোঠার জানালা দিয়ে আরাদ সবটাই দেখলো। কিন্তু ওদের কথাগুলো শুনতে পায়নি। তবে সে বুঝতে পেরেছে যে ওদের কথা কাটাকাটি হচ্ছে। আরাদ হেসে জানালা বন্ধ করে দিল।
শাফিন ভার্সিটি চলে গেছে আর সায়েন কলেজে। পরীক্ষার বেশি সময় নেই পাঁচমাস আছে। কলেজে যেতেই দিশার সাথে দেখা। সায়েন ওকে দেখেই বলে উঠলো,’ওরে দিশা আমি যে দিশাহারা!!একটা বুদ্ধি দে রে বইন।’

দিশার ভ্রু কুঁচকে এলো। সায়েন প্রায়ই এই ডায়লোগ দিবে ওকে দেখে। দিশা বলে উঠলো,’কি হয়েছে??কি বুদ্ধি নিবি।’
সায়েন দিশাকে টেনে নিয়ে ক্যান্টিনে ঢুকলো। দুজনে কফি অর্ডার করলো। তারপর সায়েন একে একে সব ঘটনা খুলে বলে। দিশার হাত আপনাআপনি গালে চলে গেছে। মুখটা হা হয়ে গেছে। সায়েন অসহায় ফেসে তাকিয়ে বলে,’কিছু একটা উপায় দে রে??আমি যে আর পারছি না।’

দিশা জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,’এসব কি সত্যি সায়ু?? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তোর মায়ের চোখে এতবড় সত্যি লুকালি কিভাবে??যেখানে তোর মা আমাকে তোদের বাড়িতে এলাও করে না সেখানে একটা অজানা অচেনা ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছিস কিভাবে??তোর মা তো সিআইডির অফিসার।এতো কিছু তার চোখে লুকাচ্ছিস কিভাবে?? আমার তো ভাবতেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।’

সায়েন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,’তাহলে ভাব আমি এতদিন কিভাবে সব সামাল দিয়েছি। আর এই ছেলেটার কিছু মনেই পড়ছে না। কিভাবে এর স্মৃতি ফেরাব??’

‘আমার মনে হয় ডক্টরের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।’

‘টাকা পাব কই?? আমার বাপের কি কারি কারি টাকা আছে নাকি?? তাছাড়া আরাদ বলেছে ও সুস্থ হলেই চলে যাবে।’

‘তাহলে চাপ নিস না কটা দিনই তো মাত্র। কোনরকমে চালিয়ে দে।’

সায়েন গালে হাত দিয়ে বলল,’সেটাই তো প্রবলেম!! কটা দিন চালাব কিভাবে?? মায়ের কাছে তো ধরা পরেই যাব। এজন্যই তো বুদ্ধি চাইছি। দে বুদ্ধি??’

দিশা মাথা নাড়িয়ে বলল,’তোর মায়ের কাছে আমি স্যালেন্ডার। আমার কাছে বুদ্ধি চাস না। তুই নিজেই বুদ্ধি খুঁজে নে। আমার মনে হয় তুই পারবি। আর অল দা বেস্ট।’

দুজনে কিছুক্ষণ কথা বলে ক্লাসে চলে গেল। ক্লাস শেষ করে প্রাইভেট পড়ে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে এলো। আসার পথে আরাদের জন্য টিশার্ট আর দুটো টাউজার কিনে এনেছে। ব্যাগ নিয়ে রুমে রাখতেই ওর বাবার আর্তনাদ শোনা গেল। সায়েন দৌড়ে গেল বাবা মায়ের রুমে। ওর বাবা উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। মা কোমড়ে আইসব্যাগ চেপে ধরে আছে। সায়েন কাছে গিয়ে বলল,’কি হয়েছে আব্বু??ব্যথা পেয়েছো কিভাবে??’

শফিকুল সাহেব হাত উঁচিয়ে বলল,’আমর লুঙ্গি!!!’
সায়েনের চোখদুটো বড়বড় হয়ে এলো। ওর বাবার হাতে লুঙ্গির ছেঁড়া অংশ। এটা তো আরাদকে পরতে দিয়েছিল তাহলে ওর বাবার হাতে কিভাবে এলো??তার মানে আরাদকে দেখে ফেলেছে?? বাবার চিন্তা রেখে এখন আরাদের চিন্তা হচ্ছে। এখন কি হবে??জয়নব বেগম ধমক দিয়ে বললেন,’চুপ থাকতে পারো না?? তখন থেকে বাড়াবাড়ি করেই যাচ্ছো।’

‘আমি নিশ্চিত চিলেকোঠার ঘরে আমার লুঙ্গি আছে।’
জয়নব বেগম বিরক্ত সূচক শব্দ বের করে বলল,’আরেকবার লুঙ্গি লুঙ্গি করলে জীবনেও লুঙ্গি পরতে দেব না বলে দিলাম কিন্তু। সায়েন যাও রুমে।’

সায়েন মাথা নাড়িয়ে চলে এলো কিন্তু রুমে গেলো না দৌড়ে ছাদে চলে গেল। চিলেকোঠার ঘরের দরজা টান দিলো কিন্তু খুলল না। সায়েন দরজা টানাটানি করতে করতে বলল,’আরাদ দরজা খুলুন। আমি সায়েন।’

সায়েনের গলার আওয়াজ শুনে আরাদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,’দরজা খোলা যাবে না আমার অবস্থা খারাপ। তোমার বাবা আমার লুঙ্গি ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।’

সায়েন অবাক হয়ে বলে,’কিন্তু কিভাবে??আব্বু আপনাকে দেখেনি তো??’

‘না দেখেনি। তুমি আগে পরার জন্য কিছু দাও এভাবে কতক্ষন থাকব??’

‘আচ্ছা আমি আসছি।’ সায়েন দ্রুত রুম থেকে টাউজার এনে দিলো আরাদকে। টাউজার পরে আরাদ দরজা খুলে দিল। সায়েন দ্রুত ভেতরে ঢুকে বলল,’কি হয়েছে বলুন এবার।’

‘দরজা খোলাই ছিল। এখানে তেমন বাতাস না আসায় আমি দরজা খোলা রেখেছিলাম। হঠাৎ দেখি তোমার বাবা আসছে। তাড়াহুড়ো করে দরজা আটকাতে গিয়ে লুঙ্গির এক কোণা দরজার বাইরে রয়ে যায়। ব্যাস তোমার বাবা দেখে ফেলে। আমার লুঙ্গি আমার লুঙ্গি বলে টানতে লাগলো। আমিও টানলাম, শেষে ছিড়েই নিয়ে গেল। আর ধড়াস করে পড়ে গেল।’

আরাদের কথার ভঙ্গিমা দেখে সায়েন হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে এক প্রকার গড়াগড়ি খাচ্ছে সায়েন। সায়েনের হাসিতে মুগ্ধ আরাদ। মেয়েটা এতো চন্ঞ্চল কেন??আরাদ তা ভেবে পায় না। খুব করে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে ওর। পাছে সায়েন কিছু বলে যদি এই ভয়ে ছোঁয় না। না ছুঁলে কি ভালোবাসা হয় না?? অবশ্যই হয়। আর সেভাবেই সায়েনকে সে ভালোবাসবে। আরাদ বলল,’হাসি থামাও তোমার মা বাবা নিশ্চয়ই এখানে আসবে দেখতে। তখন কি হবে??’

সায়েনের মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল। সত্যি তো!!এটা তো সায়েন ভেবে দেখেনি। সে বলল,’এখন কি হবে??’
সায়েনের ভিতু চোখ দেখে আরাদ আবার হাসলো বলল,’চিন্তা করো না। আমি সামলে নেব। তুমি এখন যাও।’

‘কিভাবে সামলাবেন??’

আরাদ কলার টেনে ঠিক করে বলল,’তখনই বুঝতে পারবে। এখন তাড়াতাড়ি যাও।’

আরাদের কথায় সায়েন রুমে চলে আসলো। গরম লাগছে প্রচুর। শীত পড়তে শুরু করে দিয়েছে আর সায়েনের গরম লাগছে। ভয়ের কারণে ঘাম ছুটে গেছিলো সায়েনের তাই গোসল করে ঠান্ডা হলো সে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে ততক্ষণে। চুল ঝেড়ে টেবিলে বসে খাচ্ছে সায়েন। তখনই দেখলো জয়নব বেগম ধীর পায়ে ছাদে যাচ্ছেন। খাওয়া বাদ দিয়ে টেবিলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে দিল সায়েন। ওর মা যাচ্ছে তারমানে আজকে সে ধরা পড়ে যাবে। খাওয়া আর হলো না সায়েনের। কিছুক্ষণ বাদে জয়নব বেগম ফিরে এলেন। সায়েন নিচের দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু ওর দৃষ্টি জয়নব বেগমের দিকে। আড়চোখে সে মা’কে দেখছে। কিন্তু জয়নব বেগম সোজা রুমে চলে গেলেন। সায়েন চমকে উঠে। তারমানে সে আরাদকে দেখেনি?? গপাগপ করে খেয়ে নিল সায়েন তারপর দৌড়ে ছাদে চলে গেল। জয়নব বেগম আর বের হবেন না সায়েনের বাবাকে রেখে। তাই সায়েন চিলেকোঠার ঘরে গেল। আরাদ তোশকের উপর টান হয়ে শুয়ে আছে। সায়েন আরাদের পাশে বসে বলল,’আমার মা না এসেছিল?? আপনাকে দেখেছিল কি??’

আরাদ উঠে বসে সেই মন কাড়া হাসি দিয়ে বলল,’হ্যা এসেছিল। আমি বলেছি আন্টি আমার কিছু মনে পড়ছে না তাই আপনার মেয়ে আমাকে এখানে থাকতে দিয়েছে। ব্যাস উনি গলে গেলেন। তারপর বললেন তুমি এখানে থাকতে পারো কোন সমস্যা নেই।’

সায়েন চমকে বড়বড় চোখে তাকিয়ে বলল,’মা সত্যি এসব বলেছে??আই ক্যান্ট বিলিভ ইট।’

সায়েনের কথা শুনে আরাদ হাসলো বলল,’ধূর বোকা!! তোমার মা এসে আমাকে দেখেনি।’

‘তাহলে কোথায় ছিলেন আপনি??’

আরাদ উপরের দিকে ইশারা করে বললো,’এই ঘরের চালে ছিলাম। খুব কষ্ট করে উঠতে হয়েছে।’
সায়েন মন খারাপ করে বললো,’আমার জন্য আপনার কষ্ট করতে হয়েছে তাই না??’

‘নাহ বরং আমার জন্য তোমার কষ্ট হচ্ছে।’

‘আচ্ছা আপনার কি কিছু মনে পড়ছে না??’

আরাদ ঠোঁট উল্টে জবাব দিলো,’নাহ কিছু মনে পরছে না।’

সায়েন স্বর নিচু করে বলল,’ওহ।’

‘আজকেও কি তোমার ভাইয়ার টাউজার দিয়েছো আমাকে??’

‘নাহ এগুলো কিনে এনেছি। বাজারের মোড়ের ফুটপাতে অনেক পাওয়া যায়। তিনটা টিশার্ট তিনশ টাকা আর দুটো টাউজার পাঁচশত টাকা।’
আরাদের এবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম। টাউজারটা টেনে দেখলো সে। যেখানে ওর একেকটা টিশার্টের দাম দুই হাজার থেকে পঁচিশশ টাকা। বাকিগুলো নাহয় বাদই দিলো। সেখানে সে আড়াইশ টাকার টাউজার পরেছে!!এসব যদি আরাদের মা দেখতো তাহলে অজ্ঞান হয়ে যেত। আরাদ তবুও নিজেকে সামলিয়ে বলল,’অনেক টাকা খরচ করে ফেললাম তোমার তাই না??’

‘ওসব কিছু না। ভাইয়া আব্বুর কাছ থেকে টাকা নেওয়া কোন ব্যাপার না।’

‘কি বলে নাও টাকা??মানে কোন রিজন তো দেখাতে হবে??’

সায়েন হাসলো বললো,’ভাইয়া একবার তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে ফুচকা খাচ্ছিল। দেখেই কয়েকটা ছবি তুললাম। তারপর আর কি?? শুরু হলো ব্ল্যাকমেইল। টাকা না দিয়ে যাবে কোথায়??আর আব্বুর সিগারেট খাওয়ার ছবি তুলে রেখেছি। দুজনকেই ব্ল্যাকমেইল করি।’

বলেই সায়েন হাসতে লাগলো। আরাদ সায়েনের এই পাগলামি গুলো উপভোগ করতে লাগল। বেশিক্ষণ থাকলো না সায়েন চলে গেল রুমে। চুপিসারে খাবার দিয়েও গেলো আরাদকে। তবে আজকে আরাদ খেয়ে নিলো। তারপর ফোন হাতে নিয়ে জোনায়েদ কে কল করে বলল সে যেন আরাদকে পিক করতে আসে। পাইপ বেয়ে নেমে এলো আরাদ। জোনায়েদ গাড়ি নিয়ে হাজির। আজকে প্রজেক্ট নিয়ে বড় একটা মিটিং হবে। কয়েকজন ফরেনার এসেছে আরাদের সাথে মিটিং করতে। রাত ছাড়া সে এখান থেকে বের হতে পারবে না বলে মিটিং টা রাতেই করবে সে। আরাদ গাড়িতে উঠে বলল,’আগে আমার ফ্ল্যাটে চল। রেডি হয়ে তারপর যাব। বাই দা ওয়ে মা’কে কি বলেছিস??’

জোনায়েদ ড্রাইভিংয়ে মন দিয়ে বলল,’বলেছি নতুন প্রজেক্ট টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তোকে কয়েকদিন ব্যস্ত থাকতে হবে। এজন্য তুই বাড়িতে ফিরতে পারছিস না। তারপর আন্টি কিছু বলেনি।’

‘হুম। আর সায়েন!!!’

‘ভাবির পিছনে লোক লাগিয়ে দিয়েছি। সবসময় তারা ভাবির উপর নজর রাখছে।’

আরাদ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,’গুড।’

সাতাশ তলা ভবনের দশতম তলায় আরাদের নিজস্ব ফ্ল্যাট। সেখানে আরাদের যাবতীয় জিনিস পত্র আছে। দামি পোশাক,হাতে ব্রান্ডের ঘড়ি,পায়ে নিউ সু পড়ে তৈরি হয় আরাদ। এখন যদি এইরকম অবস্থায় সায়েন ওকে দেখতো তাহলে নিশ্চয়ই হ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতো। এটা ভেবেই হাসলো আরাদ। কড়া পারফিউম লাগিয়ে জোনায়েদের সাথে বের হলো আরাদ। মিটিং এ সবাই এসে পড়েছে। আরাদ গিয়ে নিজের আসনে বসলো। ফরেনারদের মধ্যে একজন মেয়ে আছে। বয়স তাঁর ত্রিশের কোঠায়। অথচ তাকে দেখলে আঠারো বছরের যুবতী মনে হবে। মেয়েটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আরাদকে দেখছে আর হাতের কলম নাড়াচ্ছে। আরাদ তা দেখে হাসলো। এরকম কত মেয়েই ওকে এভাবে দেখেছে তার হিসাব নেই। তবে এই দৃষ্টি আরাদ উপেক্ষা করলো না। সে ঝুকে কলমটা নিয়ে নিলো। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কলমটা দেখে বলল,’দা পেন ইজ ভেরি বিউটিফুল। আই লাইক ইট। ক্যান আই হ্যাভ ইট??’

মুহূর্তেই মেয়েটার মুখে ভয়ের ছাপ দেখা দিলো। আরাদ তা দেখে ঘাড় কাত করে হাসলো। এবং সাথে সাথে কলমটা ভেঙে দুটুকরো করে ফেলল। কলমের ভেতর থেকে ছোট ক্যামেরাটা বের করে গুড়িয়ে দিলো। তারপর মেয়েটার দিকে ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে বলল,’ইউ প্রোবাবলি ডোন্ট নো মি!!বাট ফাহিম নোওস মি!!ইউর প্ল্যান হ্যাজ নট বিন সাবমিটেড।’

বলেই আরাদ হাসলো। মেয়েটা ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়লো। কোমড়ে হাত দেওয়ার আগেই সাতটা রিভালবার মেয়েটার চারিদিকে ঘিরে ধরলো। আরাদের ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি বিদ্যমান। মেয়েটা ভাবতেও পারেনি যে ওর প্ল্যান ধরে ফেলবে আরাদ। কার মনে কি চলছে সেটা সহজেই ধরে ফেলে!!কি ধাতুর তৈরি ছেলেটা??আরাদ মেয়েটার ব্যবস্থা করতে বলে জোনায়েদ কে। মিটিং ক্যান্সেল করে সে চলে আসে। প্রয়োজনে কালকে আবার মিটিং করবে সে।

আগের পোশাক পরে সে সায়েনের চিলেকোঠার ঘরে হাজির হয়। তবে এখন সায়েনকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। ঘর থেকে বের হয়ে ছাদে এসে দেখলো ছাদের দরজা খোলা। দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল আরাদের মাথায়। আস্তে আস্তে সে সায়েনের রুমে চলে এলো। দরজা খোলাই ছিল। গায়ে কাথা জড়িয়ে সায়েন ঘুমাচ্ছে। ঘুমের প্রখরতা অনেক সায়েনের। আরাদ হাঁটু গেড়ে বসলো সায়েনের সামনে। ড্রিম লাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সায়েনের মায়াবী চেহারা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরেই হুট করে চোখ খুলে তাকালো সায়েন। চিৎকার দেওয়ার আগেই আরাদ মুখ চেপে ধরে আস্তে করে বলল,’আমি আরাদ!!চুপ থাকো প্লিজ।’

সায়েন ছোটাছুটি বন্ধ করে বলল,’আপনি এতো রাতে এখানে কি করছেন??’

আরাদ ভেবাচেকা খেয়ে গেল। কি বলবে এখন??একটু ভেবে সে বলল,’ওয়াশরুমে যেতে এসেছি।’
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৫

নিশুতি রাত, কোথাও কারো সাড়া শব্দ নেই।সবাই ঘুমে বিভোর। থেকে থেকে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। সায়েনের ঘনঘন নিশ্বাস এর শব্দ শুনতে পারছে আরাদ। খুব কাছে থেকে দুজন দুজনের শ্বাস প্রশ্বাস শুনতে পারছে। আরাদের বুকের একদম কাছে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন। তার ঘনঘন নিশ্বাস আরাদের বুকে গিয়ে আঘাত হানছে। আরাদের একহাত সায়েনের কোমড়ে আরেকহাতে সায়েনের হাত ধরে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে রেখেছে। সায়েনের দৃষ্টি আরাদের চোখের উপর। ড্রিম লাইটের আলোয় আরাদের চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। অদ্ভুত মায়া ছড়াচ্ছে চোখ দুটো। এভাবে তাকিয়ে থাকলে সে মায়ায় ফেসে যাবে সায়েন। কিন্তু সে তার দৃষ্টি নামাতে পারছে না। বেহায়া হয়ে গেছে চোখ দুটো তার। সায়েনের সমস্ত শরীরের শক্তির চেয়ে চোখের শক্তি যেন হাজার গুণ বেশি। চোখ সে ফেরাতে পারছে না। সায়েন এভাবে তাকিয়ে থাকলেও আরাদ তাকাচ্ছে না। তার দৃষ্টি দরজার ওপাশে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আরাদ। একটু আগেই সায়েনের মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। সায়েনকে ছেড়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয় সে। কিন্তু ততক্ষণে সায়েন পানি খেতে গিয়েছিল। আরাদ ও বের হয়। দরজার কাছে আসতেই আবার সায়েনের সাথে দেখা। কিন্তু কিছু বলার আগেই সায়েনের মা লাইট জ্বালিয়ে দিল। ঝড়ের গতিতে সায়েনকে নিয়ে দরজার ওপাশে লুকিয়ে পড়ে আরাদ। একটুর জন্য সায়েনের মা দেখে ফেলেনি ওদের। জয়নব বেগম পানি খেয়ে লাইট অফ করে চলে গেলেন। আরাদ এবার চোখ তুলে তাকালো সায়েনের দিকে। সায়েন এখনো আগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরাদের দিকে। আরাদ সায়েনের হাত ছাড়লেও কোমড় ছাড়লো না। সায়েন আরাদের চাহনি দেখে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তখনই একটা সুঘ্রাণ নাকে এলো সায়েনের। সে আরাদের শার্ট টেনে ঘ্রাণ শুঁকে বলল,’এটা কিসের ঘ্রান??’

এরকম পরিস্থিতিতে সায়েন যে এরকম একটা প্রশ্ন করে বসবে তা আরাদ ভাবেনি। শার্ট পাল্টে ফেললেও পারফিউমের ঘ্রানটা ওর গায়ের সাথে লেগে আছে। আরাদ কথা ঘোরানোর জন্য বলল,’তোমার মা চলে গেছে। এবার আমি যাই। তা না হলে তোমার মা আবার চলে আসবে।’
সায়েনের কোমড় থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে আরাদ দ্রুত পায়ে ছাদে চলে গেল। সায়েন থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শ্বাস প্রশ্বাস জোরে জোরে উঠানামা করছে। অদ্ভুত শিহরণে রোমাঞ্চিত হয়ে গেছে সায়েন।শরীর কাঁপছে তার। আরাদ এতো কাছে আসার জন্য কি এসব হয়েছে??এমন তো ওর কখনোই হয়নি। চুল খামচে ধরে খাটের উপর বসে পড়ল সায়েন। এইসব কি হচ্ছে ওর সাথে?? এরকম অনুভুতি ওর কখনোই হয়নি। সায়েনের প্রতিটা অনুভূতি ছিল বইকে ঘিরে। বই ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। পড়াশোনাই ওর কাছে সব। ঠিক যেভাবে জয়নব বেগম ওদের দুই ভাইবোনকে চালাচ্ছে ওরা ঠিক সেভাবেই চলছে। সায়েন শুকনো ঢোক গিলল।গলাটা আবার শুকিয়ে এসেছে তার।

_____________

গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে সায়েন। সকাল থেকে চিলেকোঠার ঘরে যায়নি সে। শুধু একবার গিয়েছিল, খাবার দিতে। তখন সায়েন আরাদের চোখে চোখ রাখেনি। তাড়াতাড়ি চলে আসে। কাল থেকে কেমন যেন লাগছে সায়েনের। আরাদের কাছে গেলেই হার্টবিট বেড়ে যায়। সবকিছু ভুলে যায় সে। সূর্যমামা সবে উঁকি দিয়েছে। গাছে পানি দেওয়া শেষ করেই পিছনে ঘুরলো সায়েন। সাথে সাথে আরাদের বুকের সাথে জোরে ধাক্কা খেলো সে। সায়েন হকচকিয়ে ওঠে। আরাদকে দেখে আশেপাশে চোখ বুলায় সে। তারপর বলে,’আপনি এখানে?? তাড়াতাড়ি চলে যান। আশেপাশের ছাদগুলোতে কেউ চলে আসবে তো??’

আরাদ ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। যখনই সে সায়েনের চোখের দিকে তাকায় তখনই ভয় দেখতে পায়। কবে যে ওই চোখে সে ভালোবাসা দেখতে পাবে কে জানে??আরাদ বলল,’এতো ভয় পাও কেন তুমি??’

‘সেটা যদি জানতেন তাহলে তো হয়েই যেতো।’

আরাদ সায়েনের কথাটা বুঝলো না। সায়েন চলে যাচ্ছে আরাদ পিছন থেকে বলে ওঠে,’তাহলে কি হতো??’

সায়েন পিছনে ফিরে তাকালো বলল,’অনেক কিছু হতো।’

‘কি হতো বলে গেলে ভালো হতো।’

আরাদের কথায় ঠোঁট চেপে হাসলো সায়েন। কিছু বলার আগেই জয়নব বেগমের ডাক পড়লো। সায়েন ভো দৌড় দিল। সায়েনকে এভাবে দৌড়ে যেতে দেখে হাসলো আরাদ তারপর চিলেকোঠার ঘরে চলে গেল। আরাদ তোশকের ওপর টান হয়ে শুয়ে পড়লো। নিজে নিজে বলতে লাগলো,’তোমার মনের চিলেকোঠায় পৌঁছাতে হলে আমাকে যদি এরকম নোংরা চিলেকোঠায় যুগ যুগ ধরে থাকতে হয় তাতেই আমি রাজি। তবে তোমার মনের চিলেকোঠায় শুধু আমি থাকবো। হয় তোমার মনে চিলেকোঠায় আমি থাকব নয়তো তোমার মনে কোন চিলেকোঠা থাকবেই না। তোমাকে আমার হতেই হবে সায়েন। আমার কাছে আসতে একটাই পথ তোমার খোলা। বাকি পথগুলো সব আমি বন্ধ করে দেব।’

ফোন হাতে নিয়ে সায়েন জোনায়েদকে কল করলো।

স্কুটারে বসে হেলমেট পরছে সায়েন। হঠাৎ ওর চোখ গেল আরাদের দিকে। চিলেকোঠার জানালা খুলে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। সায়েন বাড়ির দিকে উঁকি দিয়ে দেখলো কেউ আসছে কি না?? তারপর আরাদকে ইশারা করে বললো চলে যেতে। কিন্তু আরাদ যাচ্ছে না দেখে হাত নাড়িয়ে যেতে বলছে বারবার। তখনই শাফিন বলে উঠলো,’হাত নেড়ে নেড়ে কি করছিস তুই??’

সায়েন হাত নামিয়ে ফেললো। চোখও অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। সে আমতা আমতা করে বলল,’ক কিছু না। ম মশা,মশা ছিল।’

শাফিন ভালো করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কোথাও মশা আছে কি না??সে বলল,’কোথায় মশা??আমি তো কোন মশা দেখতে পাচ্ছি না। কি ব্যাপার বলতো?? ক’দিন ধরে দেখছি তুই কিছু একটা নিয়ে ভয় পাচ্ছিস??কেন বলতো??’

শাফিন সন্দেহ করছে। সায়েন কথা ঘুরিয়ে বলল,’বাজে বকবক বন্ধ কর। আজকে তাড়াতাড়ি চলে আসবি। মা বাবা লিলি খালার বাসায় যাবে। লিমা আপুকে দেখতে আসবে। হয়তো বিয়ে ঠিক হয়েও যেতে পারে।’

শাফিন বুকে হাত দিয়ে জোরে শ্বাস ফেললো। খুশিতে তার চোখদুটো চকচক করছে। সায়েন ভ্রু কুঁচকে বলল,’লিমা আপু তোর পিছনে লাটিমের মতো ঘুরতো তাই না??’

‘হুম!!! ওর জন্য রুহির সাথে কতবার ঝগড়া হয়েছে!! গায়ে পড়া স্বভাবের মেয়েটা। ভালো হয়েছে বিয়ে হবে। ওর বিয়েতে হ্যাব্বি নাচব আমরা ঠিক আছে।’

সায়েন মাথা দুলিয়ে বলল,’ওকে ডান।’

‘আমাকে ভার্সিটি নামিয়ে দিয়ে তারপর কলেজ যাবি।’ শাফিন স্কুটিতে চড়ে বসতে বসতে বলল,’আজকে দুপুরের পর চলে আসব আমি। রেডি থাকিস তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে।’

সায়েন স্কুটি স্টার্ট দিলো। শাফিনকে ভার্সিটি নামিয়ে দিয়ে কলেজে যায় সায়েন। আজকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আসে সে। কারণ বাড়িতে কেউ নেই। মা বাবা সকালেই চলে গিয়েছে। চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে আসতেই সায়েন অবাক হয়ে গেল। কারণ আরাদ সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে বিস্কিট খাচ্ছে আর টিভি দেখছে। সায়েন দরজা বন্ধ করে দৌড়ে আরাদের সামনে এসে দাড়িয়ে বললো,’আপনি এখানে কেন??কখন এলেন??’
আরাদ টিভি দেখায় ব্যস্ত। সায়েন আবারো একই প্রশ্ন করতেই আরাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল,’আগে ফ্রেশ হয়ে নাও তারপর কথা হবে।’

সায়েন কিছুক্ষণ আরাদের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। লম্বা শাওয়ার নিয়ে বের হয় সায়েন। দেখলো আরাদ টেবিলে খাবার সাজিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে সায়েন। বিরিয়ানীর গন্ধে ম ম করছে চারিদিকে। সায়েন অবাক চোখে আরাদের দিকে তাকিয়ে বলল,’এসব কি??আর বিরিয়ানী কোথা থেকে আসলো??’

আরাদ ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো। বলল,’আমি রান্না করেছি??’ ডাহা মিথ্যা কথা। বাইরে থেকে এনেছে আরাদ। তাও জোনায়েদ কে দিয়ে। আরাদের কথায় আরেকদফা অবাক হলো সায়েন। আরাদ রান্না করেছে মানে!!সায়েন অবাক দৃষ্টিতে বিরিয়ানীর প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ তুলে তাকালো আরাদের দিকে তারপর বলে,’আপনি রান্না করলেন কিভাবে?? আপনাকে দেখলে তো মনে হয় বড় ঘরের ছেলে। এসব রান্নাবান্না কার থেকে শিখলেন??’

আরাদ মাথা চুলকে ভাবলো কিছুক্ষণ তারপর বলল,’বিরিয়ানী কিভাবে রান্না করে সেটা মনে আছে কিন্তু কে শিখিয়েছিল সেটা মনে নেই। তবে আস্তে আস্তে মনে পড়ে যাবে সব।’

সায়েনের ভ্রু যুগল আপনাআপনি কুঁচকে এলো। এরকম মেমোরি লস হয় তা ওর আগে জানা ছিল না। আরাদ বলল,’তাহলে শুরু করা যাক??’

সায়েন মাথা নেড়ে খেতে লাগল। একটু মুখে দিয়ে কি যেন ভাবতে লাগলো সায়েন। আরাদ সায়েনকে পরখ করে দেখে বলল,’ভালো হয়নি বুঝি??’

সায়েন খাওয়া রেখে আরাদের দিকে তাকিয়ে বলল,’ভালো হয়েছে!! কিন্তু এই বিরিয়ানী টা মাজিদ কাকার দোকানের বিরিয়ানীর মতো খেতে। কেন বলুন তো?? স্মৃতি হারানোর আগে কি আপনি মাজিদ কাকার দোকানের কর্মচারী ছিলেন??’

সায়েনের অদ্ভুত প্রশ্নে চমকে গেল আরাদ। এই মাজিদ কাকা টা আবার কে??এর দোকান থেকেই বোধহয় খাবার এনেছে জোনায়েদ। কিন্তু কথা তো সেটা না। কথা হলো আরাদ ওই দোকানের কর্মচারী ছিলো মানে??যে ছেলে জীবনে এক গ্লাস পানি ঢেলে খায়নি সেই ছেলে দোকানের কর্মচারী হবে??আরাদ হতাশ হয়ে বলল,’কি জানি??মনে তো পড়ছে না কিছুই।’

সায়েন একটু ভেবে আবার জিজ্ঞেস করল,’রান্নাঘরে কোথায় কি থাকে তা তো আমি নিজেই জানি না আপনি কিভাবে জানলেন??’

আরাদ পড়েছে এবার বিপদে। সে তো রান্নাঘরের কিছুই চেনে না। কিন্তু সায়েন যেভাবে প্রশ্ন করছে মনে হচ্ছে ধরা পড়েই যাবে। আরাদ সায়েনের দিকে হালকা ঝুঁকে বলল,’বিরিয়ানী পছন্দ হয়নি তোমার??’

‘হুম হয়েছে।’

‘তাহলে এতো কিছু না বলে চুপচাপ খাও। খাওয়ার সময় কথা বলতে হয় না।’

সায়েন বাধ্য মেয়ের মত মাথা নাড়িয়ে খেতে লাগল। খাওয়া শেষে সে প্লেট ধুতে চলে যায়। আরাদ সোফায় আয়েশ করে বসেছে। প্লেট ধুয়ে এসে সায়েনও বসলো। তখনই কলিং বেলের শব্দ এলো। সায়েন চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’ভাইয়া চলে এসেছে বোধহয়। আপনি তাড়াতাড়ি চলে যান।’

আরাদ উঠে দাঁড়ালো। ভেবেছিল একটু গল্প করবে সায়েনের সাথে। কিন্তু তা আর হলো কই??আরাদ ছাদের সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল। সায়েন হাসি মুখে দরজা খুলে দিল। শাফিনের হাতে বড় একটা ব্যাগ। সেখান থেকে আরেকটা ব্যাগ বের করে সায়েনের হাতে দিয়ে সে নিজের রুমে চলে গেল। সায়েন ব্যাগটা ওলটপালট করে দেখতে দেখতে নিজের রুমে চলে আসে। ব্যাগ খুলে সে অবাক। আসমানী রঙের একটা মশৃন শাড়ি। খোঁপায় দেওয়ার জন্য গাজরা ও এনেছে। সাথে দুমুঠো চুড়ি। সায়েন ভিশন অবাক হয়। এগুলো শাফিন কি ওকে দিলো??নাকি রুহির জন্য এনেছে?? কিছুক্ষণ বসে থেকে সায়েন শাফিনের রুমে গেল। শাফিন শাওয়ার শেষ করে গলায় তোয়ালে ঝুলিয়ে খাটে বসে ক্যামেরা ঠিক করছে। সায়েন অবাক হয়ে শাফিনের পাশে বসে বলল,’ভাইয়া তুই কি করছিস??ক্যামেরা এনেছিস কেন??’

শাফিনের চোখজোড়া ক্যামেরাতে আবদ্ধ। সে বলল,’মা বাড়িতে নেই আজকে ফটোশুট করব তাও তোর। শাড়ি পরে রেডি হয়ে নিস।’

সায়েন অবাক হলো না। কারণ এর আগেও অনেক বার শাফিন ওর ছবি তুলেছে। শাফিনের একটা পেইজ আছে। যেখানে সে ছবি তুলে পোস্ট করে। ফলোয়ার ও অনেক। তবে এসবই জয়নব বেগমের চোখের আড়ালে হচ্ছে। সায়েনের ফেস হাইড করে অনেক ছবি আপলোড দিয়েছে শাফিন। সায়েন তাই রেডি হতে চলে গেল। আসমানী রঙের শাড়ি জড়িয়ে সুন্দর করে সাজলো সে। খোপা করে তাতে গাজরা পড়লো। দুহাত ভর্তি চুড়ি পরে রেডি হলো সে। সায়েন জানে শাফিন এখন খাবে না। ফটোশুটের চিন্তা ঘাড়ে চাপলে খাওয়া দাওয়া সব ভুলে যায় শাফিন।

শাফিন আর সায়েন দু’জনেই ছাদে গেল। সায়েন চিলেকোঠার ঘরে উঁকি দিলো। নাহ দরজা বন্ধ আছে। অনেক বছর পর এই প্রথম শাফিন ছাদে এসেছে। সায়েনকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছবি তুলছে শাফিন। সায়েনের মাথা ভনভন করছে। এতো ছবি মানুষ তোলে??সায়েন হাঁপিয়ে গেলেও শাফিন থামলো না। সায়েন শাড়ির আঁচলে বাতাস করতে করতে বলল,’ভাইয়া অনেক হয়েছে আর পারছি না। পরে আবার তুলিস।’

শাফিন মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ বের করে বলল,’এরকম করছিস কেন??ঠিকমতো দাঁড়া।’
ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলল শাফিন। সায়েন বলল,’ফটোশুট করতে তোর খুব ভালো লাগে তাইনা ভাইয়া??কষ্ট হয়না তোর??’

‘কি আর করার আছে??মা তো চায়না আমি ফটোশুট করি। বাদ দে চল,,,’

শাফিন চলে যায়। সায়েন এখনও ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। সায়েন ও তো চায় ফ্যাশন ডিজাইনার হতে কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। মায়ের কথা ছাড়া সে এক পাও চলতে পারে না। সায়েন চলে আসতে নিলে তার আঁচলে টান খায়। পেছন ফিরে দেখে আরাদ ওর শাড়ির আঁচল ধরে আছে। সায়েন তাকাতেই আরাদ ওর শাড়ির আঁচলটা ছেড়ে দিল। মাথা নিচু করে সায়েনের দিকে এগিয়ে এসে বলল,’শাড়িতে তোমাকে সুন্দর লাগছে।’
কথাটা শুনে সায়েনের বুকটা ধক করে উঠল।আরাদের প্রতিটা কথা সায়েনের কাছে রোমান্ঞ্চকর লাগে। মনে হয় এভাবে অন্য কারো মুখে সায়েনের সৌন্দর্য কথা মানায় না। সায়েনের সৌন্দর্যের বর্ণনা শুধুমাত্র আরাদই দেবে আর সায়েন তা মুগ্ধ হয়ে শুনবে। সায়েন ছোট্ট করে বলল,’থ্যাঙ্কস।’

বলেই সায়েন চলে আসতে নিলে আরাদ পেছন থেকে বলে উঠলো,’আরেকটু থেকে যাও না??’
সায়েন থমকে দাঁড়ায়। আরাদের কন্ঠে একরাশ আকুলতা। যা উপেক্ষা করার ক্ষমতা সায়েনের নেই। সায়েনের পা আটকে গেছে। না পারছে চলে যেতে না পারছে আরাদের দিকে ঘুরতে। কথাটাও মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। অস্বস্তিতে ঘামছে সায়েন। আরাদ মুচকি হেসে সেদিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু সায়েনের পাশ কাটিয়ে চিলেকোঠার ঘরে চলে যায় সে। সায়েন অবাক হলো। হয়তো আরাদ সায়েনের অস্থিরতা বুঝতে পেরেছে যার জন্য সে চলে গেছে। সায়েন আর দাঁড়াল না। দৌড়ে নিজের রুমে চলে। তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নিল সে।
সন্ধ্যায় সায়েনের বাবা মা চলে এলো। মায়ের থেকে সায়েন জানতে পারল যে লিমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। একসপ্তাহ পর বিয়ে। সায়েন খুশিতে এক দৌড়ে শাফিনের রুমে চলে গেছে। শাফিন রুহির সাথে কথা বলছিল। সায়েন দৌড়ে গিয়ে বলল,’ভাইয়া লিমা আপুর বিয়ে কনফার্ম,একসপ্তাহ পর। দে হাই ফাইভ।’

সায়েন তার হাত দুটো উঁচু করে হাই ফাইভ দিলো শাফিনের সাথে। সায়েন বলল,’তুই আর আমি গায়ে হলুদে ম্যাচিং ড্রেস পরব কিন্তু?? কালকে শপিং এ নিয়ে যাবি নইলে খবর আছে।’

বলতে বলতে সায়েন চলে গেছে। শাফিন হাসলো। সায়েন কখন যে কি করে বসে তা শাফিন আজ পর্যন্ত বুঝতে পারে না। এটাই হয়তো ভাই বোনের ভালোবাসা। যতোই ঝগড়া হোক না কেন দিন শেষে দু’জনে আবার এক হয়ে যায়। একে অপরের সাথে যতোই মারামারি করুক তাতে কিছু হবে না। যদি অন্য কেউ এসে ওর ভাইয়ার গায়ে হাত দেয় তো তার খবর আছে।

আজকে খুশি মনে কলেজে এসেছে সায়েন। ক্লাস শেষে দুজনে একসাথে বাড়িতে ফিরছে। দিশা জিজ্ঞেস করল,’তোর লুঙ্গিওয়ালার কি খবর??’
সায়েন চোখ কুঁচকে জবাব দেয়,’এটা কোন ধরনের ভাষা?? ভালোভাবে কথা বল।’

‘আমি আবার কি বললাম??এতো লাগছে কেন তোর??কিছুমিছু চলছে নাকি??’

‘মারব তোকে ওসব কিছু না।’

‘এখন তো বলবিই কিছু না। পরে দেখা যাবে অনেক কিছু।’

সায়েন কিছু বলার আগেই দুটো কালো রঙের গাড়ি এসে ওদের পথ রোধ করে। সায়েন দ্রুত স্কুটি থামিয়ে দিল। অবাক হলো দু’জনেই। কারা ওদের পথ আটকালো??
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৬

স্কুটি থামিয়ে একে অপরের দিকে তাকালো দুজনে। গাড়িদুটোর রং কুচকুচে কালো। গ্লাসগুলো তোলা। সায়েন চট করে ভেবে নিলো এরা কিডন্যাপার। দিশাকে চোখের ইশারায় বোঝালো তা। দুজনে মাথা নেড়ে প্রস্তুতি নিলো। দিশা ব্যাগ থেকে ছোট ছুরিটা বের করলো। এসব বিষয়ে তারা আগে থেকেই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। সায়েন ফিসফিস করে বলল,’দিশু আজ যা হয় হোক একটাকে খুন করেই ছাড়বো। কিডন্যাপ হলে হলাম তবুও একজনকে খুন করে ছাড়বোই ছাড়বো।’

দিশাও মাথা নাড়িয়ে বলল,’একটাকে কেন??দুইটা হবে। তুই একটা আর আমি একটা বুঝলি??’
‘হুম‌।’

গাড়ি থেকে দুজন কালো পোশাক পরিহিত লোক বের হলো। দুজনের কানে ব্লুটুথ ডিভাইস লাগানো। আর চোখে কালো সানগ্লাস। এটা দেখে ওরা দুজনে কনফার্ম হলো এরা কিডন্যাপার। লোকদুটো ওদের কাছে আসতেই সায়েন ছুরি উঁচিয়ে বলল,’কাছে আসলে একদম মেরে দেব। খবরদার কাছে আসবেন না কেউ??’

সায়েনের সাথে দিশাও গলা মেলালো। কিন্তু লোকদুটো আচানক মাথা নিচু করে ফেলল। একজন খুব নিচু কন্ঠে বলল,’ম্যাম আপনার ওড়না ঝুলে গেছে। যেকোন সময় চাকার সাথে পেচাতে পারে।’

চমকে উঠে সায়েন দিশার ও সেইম অবস্থা। সায়েন ওড়নার দিকে তাকালো। সত্যি অনেক খানি ঝুলে আছে। তাড়াতাড়ি সে ওড়না ঠিক করলো। লোকদুটো গাড়িতে উঠে বসলো। একজন জানালা দিয়ে তাকিয়ে বলল,’এবার আপনি যেতে পারেন।’
গাড়িটা এক ছুটে চলে গেল। সায়েন এখনও ঘোরের মধ্যে আছে। এসব কি হচ্ছে ওর সাথে??এই লোক দুটোই বা কে??দিশা অবাক কন্ঠে বলে,’ওড়না ঝুলে আছে এটা স্কুটি থামিয়ে এতো ঘটা করে বলার কি দরকার ছিল?? চলতি গাড়িতে থাকতেই তো বলতে পারতো?? কিন্তু কেন?? কিছু বুঝলি সায়েন??’
সায়েন মাথা নাড়িয়ে বলল,’নাহ!! কিন্তু গোলমাল কিছু তো একটা আছে!!:

‘এতো ভাবা বাদ দে। এখন চল তো??’

সায়েন স্কুটিতে উঠে বসে। দিশাও পেছনে চেপে বসলো। দিশাকে ওর বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে এলো সায়েন। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে শাফিন ও চলে এসেছে। কিন্তু ওদের দুজনের মন খারাপ হয়ে গেল কারণ শপিং এ ওদের মা ও যাবে। গেল দুজনের মুড খারাপ হয়ে। নিজেদের পছন্দমত তো কিছুই কেনা হবে না তাদের। তবুও সায়েন ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিলো। আজকে চিলেকোঠার ঘরে যাওয়া হয়নি সায়েনের। মনটা খচখচ করছে। জয়নব বেগমের রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো তিনি এখনো তৈরি হচ্ছেন। সায়েন চট জলদি খাবার নিয়ে ছাদে চলে যায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আরাদ উঠে বসল। মুখটা গোমড়া করে বলে উঠলো,’আজকে না আসলেও পারতে।’

সায়েন বসতে বসতে বলল,’সেকি?? তাহলে আপনার খাবার দিতো কে??না খেয়ে থাকতেন নাকি??’

সায়েন যে তার রাগ ধরতে পারেনি সেটা বুঝে গেছে আরাদ। মেয়েটা এমন কেন??আরাদ যে রাগ করেছে সায়েনের উপর তা কি বুঝে না??এতো ছোট নাকি যে কারো রাগ ধরতে পারছে না?? আজকে সকালে ও আসেনি খাবার দিতে। খাওয়া নিয়ে আরাদের কিছু যায় আসে না। সে শুধু একপলক সায়েনকে দেখতে চায়। কিন্তু সেসব কবে বুঝবে সায়েন।এই বদ্ধ চিলেকোঠার ঘরে আর কতদিন থাকবে সে??আরাদকে এসব ভাবতে দেখে সায়েন বলল,’কি ভাবছেন??আমাকে যেতে হবে। শপিং এ যাবো। মা রেডি হচ্ছে আমাকে না পেলে বকাবকি করবে।’
সায়েন আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে চলে গেল। আরাদ কিছু বলতে চেয়েও পারলো না।রাগ হচ্ছে খুব সায়েনের উপর। একটু সময়ও দিলো না। খাবার টাও দূরে ঠেলে সরিয়ে দিলো। খাবে না যে আজকে। যার জন্য এত কষ্ট করে এখানে থাকছে সেখানে সায়েন একটুও বুঝলো না আরাদকে।
সায়েন নিচে নেমে এলো। সে বুঝতে পারছে যে আরাদ রাগ করেছে। কিন্তু কি করবে সে?? সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। তাই আর ছাদে আসতে পারেনি। পানি দেওয়ার জন্য আসতে চাইলে ওর মা বারন করে দেয়। নিরুপায় সায়েন ছাদে যেতে পারলো না। তাই সায়েনের ও মনটা খারাপ ছিলো। সেটাও তো আরাদ বুঝলো না।

শপিং এ গিয়ে বোর হচ্ছে শাফিন আর সায়েন। কারণ ওরা কি পরবে না পরবে সব ঠিক করছেন জয়নব বেগম। বেছে বেছে তিনি একটা হলুদ শাড়ি আরেকটা হলুদ পাঞ্জাবী কিনলো যা দেখে সায়েন শাফিন দু’জনেই নাক সিঁটকায়। কারণ ওরা দুজনে হলুদ রঙ পছন্দ করে না। তবুও কিছু করার নেই। সায়েন শাফিনের কানে ফিসফিস করে বলল,’ভাবির কথা মা’কে কিভাবে বলবি ভাইয়া??’
শাফিন অসহায় মুখে বলল,’বোধহয় এজীবনে পারব না রে।’
‘আচ্ছা শফিকুল ইসলাম কে বলে দেখব।’

‘আব্বু রাজি হবে??আব্বু তো আম্মুর কথায় চলে।’
‘সিগারেট খাওয়া ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করলেই হবে।’
খুশিতে শাফিনেল চোখদুটো চকচক করে উঠলো সে বলল,’থ্যাঙ্কস বনু আমার।’

‘থ্যাঙ্কসে পেট ভরবে না আমার। বুদ্ধি দেওয়ার জন্য হাজার টাকা চাই।’

‘আমার ভাগের সব সম্পত্তি তোকে দিয়ে দেব।’

সায়েন মুখ ভেংচিয়ে বলল,’তোর বাপের আছে কি আর তুই দিবিই বা কি???’

শাফিন কিছু বলার আগেই জয়নব বেগম ডাক দিলেন। দু’জনে চুপ হয়ে গেল। কেনাকাটা শেষে বাড়িতে ফিরল ওরা। রাত হয়ে গেছে সবাই ক্লান্ত। শাফিন আর জয়নব বেগম রুমে চলে গেলেন। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। শুধু সায়েন খেল না। সে ব্যাগে করে চাইনিজ খাবার কিনে এনেছে। শপিং মলের একটা রেস্টুরেন্ট থেকে। ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে কিনে এনেছে সে। সবাই ঘুমিয়ে পড়তেই সায়েন ছাদে চলে আসে। আজকে একটা মোমবাতি নিয়ে এসেছে। আরাদ ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে। শীত শীত পরেছে তাই একটা চাদর এনে দিয়েছে সায়েন। সেটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে আরাদ। সায়েন মোমবাতি রেখে আরাদকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল,’এই যে শুনছেন?? আপনার খাবার এনেছি। খেয়ে নিন??’

আরাদ জেগে ছিল কিন্তু সাড়া দিলো না। সায়েন আবার ডাকলো আরাদ এবারও সাড়া দিলো না দেখে সায়েন বলল,’আমি কিন্তু কিছু খাইনি। দুপুরে অল্প খেয়েছিলাম। এখন ভিশন খিদে পেয়েছে। আপনি না খেলে তো আমারও খাওয়া হবে না।’

আরাদ চট করে উঠে বসে। সায়েন এতে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পিছিয়ে যায়। আরাদ বলে ওঠে,’তুমি খাওনি কেন??’

‘আপনিও তো খাননি তাহলে আমি কিভাবে খাই?? আপনি এখন আমার দায়িত্বে। তাই আপনি না খেলে আমিও খাব না।’

আরাদ কিছু বলল না। সায়েন মুচকি হেসে পেছনে থাকা হাতটা সামনে আনলো। তাতে একটা লাল গোলাপ। আরাদ কপাল কুঁচকে তাকাতেই সায়েন বলল,’সরি।’

‘কি জন্য??’

‘আজকে সারাদিন আপনার কাছে না আসার জন্য। আসলে একদম সময় পাইনি। নাহলে তো আসতাম।’
এতক্ষণে আরাদের মুখে হাসি ফুটলো। মুচকি হেসে গোলাপটা হাতে নিয়ে বলল,’গোলাপ কোথায় পেলে??’

‘শপিং শেষে আসার পথে নিয়ে এসেছি।’

‘গোলাপ দিয়ে সরি বলার কারণ??’

সায়েন মৃদু হেসে বলল,’কারণ গোলাপ হলো অতি সুন্দর ফুল। মন খারাপ থাকলেও গোলাপ দেখে মন ভালো হয়ে যায়। গোলাপকে কেউ অপছন্দ করে না। তাই রাগ ভাঙানোর উওম উপায় গোলাপ। কেউ সহজে গোলাপকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। সেটা প্রপোজ হোক বা সরি। কিন্তু ছেলেরা তা বোঝে না। বউ বা গার্লফ্রেন্ড এর উপর রাগ করে বারো টাকার সিগারেট খেতে পারে কিন্তু দশ টাকার গোলাপ যে সব সমস্যার সমাধান তা বোঝে না।’

আরাদ হাসলো সায়েনের কথায়। সায়েনের কথার মুক্তি আছে। সায়েন চাইনিজের প্যাকেট খুলে আরাদের দিকে এগিয়ে দিল। আরাদ ও খেতে লাগল। সায়েন নিজের প্যাকেট খুলে খেতে খেতে বলল, ‘দুপুরে নিশ্চয়ই খাননি রাগ করে??’

আরাদ চোখ তুলে সায়েনের দিকে তাকালো বলল,’হুম, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তারপর উঠে দেখি কালো বিড়ালটা সব খেয়ে ফেলেছে। এখন সে আরামে ঘুমাচ্ছে।’
পাশেই সল্টু ঘুমাচ্ছে। এতক্ষণ সায়েন না দেখলেও আরাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো সায়েন। সল্টুকে দেখে চোখ বড়বড় করে বলল,’সর্বনাশা বিড়ালটা এখানে কেন আসে??ওর জন্য ধরা পড়ে যাব নিশ্চিত।’

‘কেন??’

‘এটা ভাইয়ার বিড়াল। দিনরাত ভাইয়ার সাথেই থাকে। বিরক্ত লাগে আমার। বিড়ালে এলার্জি আছে আমার। তাই এর ধারে কাছেও যাই না আমি।’

‘আমার তো ভালোই লেগেছে। আচ্ছা তুমি তখন চাও না তখন এটাকে আর এখানে আসতে দেব না হ্যাপি??’

সায়েন দুদিকে মাথা দুলিয়ে বলল,’হ্যাপি।’

খাওয়া শেষে সায়েন বলল,’ছাদে যাবেন?? আজকে চাঁদ ওঠেনি তবে তারা আছে।’

আরাদ একটু ভেবে বলল,’যাওয়া তো যাবে কিন্তু, তোমার মা??’

সায়েন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’সবাই ঘুমিয়ে আছে। কেউ উঠবে না চলুন।’

আরাদ উঠে দাঁড়ালো। এসুযোগ কিছুতেই মিস করা যাবে না। আজকের রাতটা সায়েনের সাথেই কাটাবে সে। সায়েনের সাথে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ায় আরাদ। সায়েনের দৃষ্টি আকাশের দিকে। মুগ্ধ হয়ে সে তারা দেখছে। আশেপাশের বিল্ডিং এ লাইট জ্বলছে
সেই আলোতে সায়েনের মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছে। আরাদের কাছে এটাই অনেক। সায়েন তারা দেখছে আর আরাদ সায়েনকে। আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সায়েন আরাদের দিকে তাকিয়ে বলল,’আজকের আকাশটা খুব সুন্দর লাগছে। আমি এভাবে কখনো আকাশ দেখিনি।’

আরাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,’কেন??’

‘ছাদ তো বন্ধ থাকতো। আপনার জন্য খোলা। কখনো ছাদে আসিনি চন্দ্র বিলাস করতে। বা বিকেলের বাতাস অনুভব করতে। তাই রুচিটাও নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য যে মনোমুগ্ধকর তা আজ দেখলাম। ভালো লাগলো।’

আরাদ বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সায়েনের আরেকটু কাছে এসে দাঁড়ায় সে। তারপর আকাশের দিকে দৃষ্টি মেলে বলল,’জীবনটা তোমার তাই নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করো। বাবা মায়ের দায়িত্ব আছে তবে সেটা সন্তানদের ইচ্ছে অনুযায়ী। তাদের দায়িত্ব সন্তানদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে তা শুধরে দেওয়া। কিন্তু তোমার মা বোধহয় একটু বেশি করছে। তোমাদের দুই ভাইবোন এর মতামত তার নেওয়া উচিৎ।’

সায়েন মাথাটা নীচু করে ফেলল। ও জানে যে ওর মা’কে যতোই বোঝাক না কেন সে বুঝবে না। জয়নব বেগম চান ওরা দুজন যেন তার ইচ্ছায় মানুষ হোক। এজন্য সবসময় চাপে রাখে ওদের। সায়েন ঘাড় ঘুরিয়ে আরাদের দিকে তাকিয়ে বলল,’এসব বাদ দিন। ওসব বিষয়ে কথা না বলে আজকের ওয়েদার টা উপভোগ করুন। আমি তো খুব এক্সাইটেড।’

আরাদ প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,’আচ্ছা আমার যদি সব মনে পড়ে যায় তখন তো আমি এখান থেকে চলে যাব। আমাকে মিস্ করবে তখন??’

আরাদের এহেম কথা শুনে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো সায়েন। কেন জানি আরাদের কথাটা ভালো লাগলো না সায়েনের। তাই সে চুপ করে রইলো। আরাদ আবার বলতে লাগলো,’তখন তুমি আর কারো জন্য খাবার নিয়ে আসবে না। চিলেকোঠার এই ঘরে তো কখনোই না। তখন ভালো লাগবে তোমার?? আচ্ছা যদি আমার সব মনে পড়ে যায় তখন যদি তোমাকে ভুলে যাই আমি??তখন কি হবে??’

সায়েনের এবার কান্না পাচ্ছে আরাদের কথায়। আরাদ কি সত্যি সায়েনকে ভুলে যাবে?? এতদিন ধরে দুজনে একসাথে কথা বলছে কত স্মৃতি ওদের এই চিলেকোঠা আর ছাদ ঘিরে। সব ভুলে যাবে আরাদ??কেন ভুলবে??সায়েনের এবার সত্যি খারাপ লাগছে। আরাদ ওকে ভুলে যাবে এটা সে মেনে নিতে পারছেই না। বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট অনুভব হচ্ছে যা সায়েন আরাদকে দেখাতে চাইছে না। এত সহজেই কি সব ভোলা যায়??আরাদ ভুলে গেলেও সায়েন তো ভুলতে পারবে না। আরাদ যে ওর প্রতিটা শিরায় শিরায় মিশে গেছে। সায়েন আর আরাদের দিকে তাকালো না। ক্ষোভে ফেটে যাচ্ছে সায়েন। তাই আরাদকে কিছু না বলে দৌড়ে চলে এলো। সায়েনের হঠাৎ এরকম করার মানে আরাদ বুঝলো না। তবুও আরাদ সায়েনের পিছু নিলো। কিন্তু সায়েন ছাদের দরজা বন্ধ করে চলে গেছে তাই আরাদ যেতে পারলো না। হতাশ হয়ে সে চিলেকোঠার ঘরে ফিরে গেল।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে চোখের পানি ফেলছে সায়েন। কিন্তু কেন কাঁদছে তা সায়েন নিজেও বুঝতে পারছে না। আরাদের কথায় এতো কষ্ট হচ্ছে কেন ওর??আরাদ চলে গেলে ওর কি তাতে?? কিন্তু সায়েনের মন যে কিছুতেই মানছে না। চোখের পানি যেন বাঁধ মানছে না। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে সায়েন ঘুমিয়ে পড়লো।

ভোরেই ঘুম ভাঙল সায়েনের। ফ্রেশ হয়ে গাছে পানি দিতে গেল সে। মনটা তার এখনও খারাপ। বারবার রাতে বলা আরাদের কথাগুলো মনে পড়ছে। আরাদ চলে যাবে খুব শীঘ্রই এটা মাথায় আসতেই সায়েনের মন আরো খারাপ হয়ে গেল। গাছে পানি দিতেও ভালো লাগছেনা সায়েনের। সায়েন বুঝল যে আজকে ওর সারাদিন খারাপ যাবে।

‘মন খারাপ কেন ম্যাডাম??’

আরাদের কন্ঠস্বর শুনে চকিতে তাকালো সায়েন। টাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হালকা বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাদ। ঠোঁটের কোণে তার মৃদু হাসি ঝুলানো। যা দেখে সায়েনের কষ্টটা আরেকটু বাড়লো। চলে গিয়ে তো সে ভালোই থাকবে তাই না?? এরজন্য এতো হাসছে। সায়েন আরাদের কথার জবাব না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে আসতে নিলেই আরাদ সায়েনের হাতটা ধরে ফেলে।

#চলবে,,,,,,,,,,,,,,,
#চলবে,,,,,,,,,,,,
#চলবে,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here