চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ৭+৮

1
49

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৭

সকালের হালকা বাতাস সারা ছাদ জুড়ে খেলা করছে। শীত উঁকি দিচ্ছে আস্তে আস্তে। কয়েকদিনের মধ্যেই ঘন কুয়াশায় দেখা দিবে ধরার বুকে। এই বাতাস সেই আভাস দিচ্ছে। বাতাসে হালকা কেঁপে উঠেছে সায়েনের পুরো শরীর। তিরতির করে কাঁপছে সে। কিন্তু এই সামান্য বাতাসে তো এতো ঠান্ডা লাগার কথা নয় তবুও কেন এমনভাবে কাঁপছে সায়েন??সেটা কি আরাদ ওর হাত ধরেছে সেজন্য?! বুঝতে পারছে না সায়েন। আরাদ সায়েনের অবস্থা বুঝে হাত ছেড়ে দিলো। আরাদ ডাকার পর একপলক তাকিয়েছিল সায়েন। কিন্তু তারপর পুনরায় চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে সে। শ্বাস ফেলে চলে যেতে নিলে আবার আরাদ ডাকলো। সায়েন আবার থমকে দাঁড়াল। আরাদ গুটিগুটি পায়ে সায়েনের সামনে এসে দাঁড়ায় কিন্তু সায়েনের দৃষ্টি মেঝের দিকে। ঘাড় কাত করে সায়েনের মুখশ্রী ভালো করে পর্যবেক্ষন করে হাসলো আরাদ। সে সায়েনের গোমড়া মুখের কারণ কিছুটা হলেও ধরতে পেরেছে। সাহসী হাসিখুশি সায়েনের মুখটা হঠাৎ এরকম গোমড়া হয়ে আছে কেন তাও আন্দাজ করতে পারছে আরাদ। কালকে জোনায়েদ ফোন করে জানিয়েছিল সায়েন আর ওর বান্ধবীর কর্মকাণ্ড গুলো। ওদের সাহস আছে বটে। লোকগুলো আরাদের ছিল। তারা সবসময় সায়েনের উপর নজর রাখে। যাতে সায়েনের কোন বিপদ আপদ না হয় সেজন্য। কিন্তু ওর গার্ডদের দিকে এভাবে ছুরি ধরবে তা শুনে আরাদ হেসেছিল। কিন্তু সেই মেয়ের মুখটা তো শুধু শুধু গোমড়া থাকতে পারে না।
আরাদ সোজাসুজি সায়েনের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ল,’মন খারাপ কেন তোমার??’

সায়েন দৃষ্টি নত করেই বলল,’কিছু না।’

‘তোমার মুখ দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। নিশ্চয়ই তোমার কোন কিছু হয়েছে!!আচ্ছা কালকে আমার কোন কথায় কি মন খারাপ হয়েছে তোমার তাহলে আ’ম সরি।’

‘নাহ তেমন কিছু না। আসলে মাথাটা একটু ব্যথা করছে তো তাই ভালো লাগছে না। আমি আসি মা ডাকবে।’

সায়েন হনহনিয়ে ছাদ থেকে নেমে এলো। আরাদ ঘুরে দাঁড়িয়ে সায়েনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সে যে সায়েনের মনে কিছুটা হলেও যায়গা করে নিচ্ছে তা বুঝে গেছে। এতে আরাদের খুশি লাগছে খুব। কিন্তু পরক্ষণে কিছু একটা ভেবে মুখটা মলিন হয়ে গেল আরাদের। যেদিন সায়েন সত্যিটা জানতে পারবে সেদিন কিরকম রিয়েক্ট করবে??তবে ততদিনে আরাদ তার ভালোবাসার জালে আটকে ফেলবে সায়েনকে যাতে সায়েন সে জাল ছিঁড়ে কখনোই বের হতে না পারে। হয়তো প্রথমে অভিমান করবে কিন্তু পরে তো ঠিকই টেনে নেবে আরাদকে। চিলেকোঠার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব একমনে ভেবে চলছে আরাদ। তখনই ছাদের দরজা খোলার শব্দ হলো। ঘোরের মধ্যে ছিল বিধায় আরাদ সাথে সাথে টের পেল না।
শফিকুল ইসলাম এসেছেন। সামনের দিকে এগিয়ে আসতেই আরাদের চোখ সেদিকে গেল। এখন কি হবে?? শফিকুল ইসলাম চোখ তুলে আরাদের দিকে তাকাতেই আরাদ মেকি হেসে বলল,’গুড মর্নিং আঙ্কেল।’

শফিকুল ইসলাম মাথা নাড়িয়ে বলল,’গুড মর্নিং।’
বলেই তিনি অন্যদিকে ঘুরলেন। কিন্তু থমকে গেলেন শফিকুল ইসলাম। কাকে দেখলেন??চোখ ঘুরিয়ে আবার তাকালো চিলেকোঠার ঘরের দিকে। ততক্ষণে আরাদ ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিয়েছে। শফিকুল সাহেব চশমা খুলে চোখ ঘষে ভালো করে তাকালো। নাহ কেউ নেই। তাহলে এই মাত্র তাকে গুড মর্নিং বলল কে??সায়েন খাবার নিয়ে সবে ছাদে এসেছে। আরাদের কান্ড দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু শফিকুল ইসলাম কে চিলেকোঠার ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে দরজার পাশে খাবার লুকিয়ে দৌড়ে গিয়ে তাকে আটকে বলল,’আব্বু তুমি এখানে!!মা ডাকছে চলো চলো।’

‘আমি এইমাত্র এখানে একটা ছেলেকে দেখলাম।’
সায়েনের গলা শুকিয়ে এসেছে। সে কাটকাট গলায় বলল,’কই?? এখানে কেউ নেই তো??ত তুমি ভুল দেখেছো।’

‘আমি ভুল দেখব কেন??এই দেখ চশমা পড়েই এসেছি। ভুল দেখার কোন চান্সই নেই।’

সায়েন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,’তাহলে হ্যালুসিনেশন। তুমি ভুল দেখেছো আব্বু। মা যদি এটা জানতে পারে তাহলে কি হবে??আমি গিয়ে বলে আসি।’
শফিকুল ইসলাম সায়েনকে আটকে দিয়ে বলে,’সবসময় মা মা করিস কেন বলতো?? জানিসই তো তোর মা’কে একটু ভয় পাই। তারপরও কেন বলিস।’

বাবার এরকম ফ্যাকাশে মুখ দেখে সায়েন ঠোঁট চেপে হাসলো বলল,’আচ্ছা বলব না এখন নিচে যাও।’

‘যাচ্ছি যাচ্ছি,তুইও চলে আয়।’ বাবা চলে যেতেই সায়েন দরজার আড়াল থেকে খাবারের প্লেট বের করে চিলেকোঠার ঘরে গেল। দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাদ। সায়েন চোখমুখ খিচে বলল, ‘এটা কি করলেন আপনি??’

আরাদ নির্দিধায় জবাব দিলো,’কি করলাম?? ওহ্ আঙ্কেলকে গুড মর্নিং জানালাম। আমি আবার ভালো ছেলে তো!!’

‘হুম!! কিন্তু ধরা তো খেয়েই যাচ্ছিলেন। আমি না আসলে ধরা পড়তেন নির্ঘাত।’

‘তুমি তো বাঁচিয়ে নিয়েছো। নো টেনশন।’

সায়েনের রাগটা আরো বেড়ে গেল। কালকের রাগের সাথে এখন নতুন রাগ যোগ হয়েছে। খাবার রেখে সে চলে গেল। আরাদ বুঝলো যে যতক্ষন পর্যন্ত না সে সায়েনের রাগ ভাঙাবে ততক্ষণ পর্যন্ত সায়েনের রাগ ভাঙবে না। কিন্তু সময়ের দরকার। রাত ছাড়া তো সায়েনের সাথে দেখা করার উপায় নেই।

সায়েন রেডি হয়েছে কলেজে যাওয়ার জন্য। চাবি হাতে নিয়ে বাইরে আসতেই দেখলো শফিকুল ইসলাম কি যেন ভাবছে। সায়েন সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,’কি ভাবছো আব্বু??’

‘ভাবছি তখন সত্যিই একটা ছেলেকে দেখেছি আমি। স্পষ্ট মনে আছে আমার।’

সায়েন খানিকটা চেঁচিয়ে উঠে বলল,’মা আব্বুর হ্যালুসিনেশন হয়েছে। চারিদিকে শুধু,,,’

শফিকুল ইসলাম অস্থির হয়ে বললেন,’থাম থাম আমি আর কখনো এসব বলব না। আমি যাচ্ছি।’
সায়েন স্বস্তির শ্বাস ফেলল। স্কুটিতে বসে সে স্টার্ট দিলো।

_______________

চেয়ারের উপর দুপা তুলে বসে আছে ফাহিম। আশেপাশে তার পনেরো থেকে বিশ জন গার্ড। তাদের মধ্যে সেই পাঁচজন ও আছে যাদের আরাদ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। গালে হাত রেখে ভাবছে ফাহিম,হঠাৎ করে আরাদের কি হলো??ওর লোকদের বিরিয়ানী খাইয়ে ছেড়ে দিলো!! সবকিছু কেমন যেন বিরিয়ানী হয়ে যাচ্ছে। তরুণ বিজনেসম্যান দের মধ্যে আরাদ আর ফাহিম নতুন। এজন্য বড় একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে তারা। কিন্তু আরাদের প্রজেক্ট টা যে সফল হবে তা ফাহিম নিশ্চিত। কারণ সব দিক দিয়েই আরাদ তার থেকে এগিয়ে। তাই আরাদকে পিছনে ফেলার জন্য তার প্রজেক্ট হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু সে সফল হচ্ছে না। এনিয়ে দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব হচ্ছে। ফাহিম বারবার হামলা চালানোর চেষ্টা করছে কিন্তু আরাদের বুদ্ধির কাছে সে অসফল হয়ে যাচ্ছে বারবার। এজন্য গম্ভীর ভাবনায় ডুবে আছে ফাহিম। তখনই ওদের মধ্যে একজন মুখ খুলল,’স্যার আমার মনে হচ্ছে আরাদের মাথায় বড় কোন প্ল্যান চলছে!! নাহলে আমাদের লোকদের বিরিয়ানী খাইয়ে ছেড়ে দিলো??এমন লোক তো আরাদ নয়??’

ফাহিম মাথা নাড়লো কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের করলো না। আরেকজন বলল, ‘আরেকটা খবর আছে স্যার। ওই দিনের পর থেকে আরাদ বাড়িতে ফেরেনি আর না ফিরেছে নিজের ফ্ল্যাটে। কোথাও আত্মগোপন করে আছে।’

ফাহিম চকিতে তাকালো। এটা তো ভাববার বিষয়। সে বলল,’আরাদ বাড়ি ফেরেনি?? তাহলে এখন কোথায় আছে?? কিন্তু ও তো ভিতু না যে আত্মগোপন করবে??তাহলে?? সেদিন মিটিং এ আমার লোককে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিল। সব কিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। আরাদকে ফলো করলেই সব জানতে পারা যাবে।’

‘কিন্তু স্যার আরাদ কখন কোথায় থাকে সেটাও তো জানতে পারছি না হুট করে চলে আসে তো হুট করে চলে যায়।’

ফাহিম থুতনিতে হাত বুলিয়ে বলল,’হুম!! ওর প্রজেক্ট কম্পিলিট। তাই বেশি আসে না। ওর একটা চামচা আছে না??কি যেন নাম??হুম, জোনায়েদ ওটাকেই ফলো কর। আরাদের সব খবরাখবর আমার চাই। যেকোন মূল্যে!!’

সবাই মাথা নুইয়ে সায় দিলো তাতে। ফাহিমের মুখে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠলো। সে আরাদের ধ্বংস দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। শুধু সময়ের অপেক্ষায় আছে সে। ঝোপ বুঝে কোপ মারার অপেক্ষায়।

সায়েন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এসেছে। ভালো লাগছে না তার একটুও। গোসল শেষে মায়ের সাথে লাঞ্চ করে নিলো। জয়নব বেগম ঘুমাতে চলে গেছেন। সায়েন ভাবলো সে কি যাবে আরাদের কাছে??খাবার দিতে তো যেতেই হবে। সায়েন গুটি গুটি পায়ে চিলেকোঠার দরজার সামনে এসে দাড়ালো। ভাবলো দরজা নক করবে কি না??এসব ভাবতে ভাবতেই দরজা খুলে গেল। হঠাৎ দরজা খোলায় চমকে ওঠে সায়েন। আরাদ দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,’কি ম্যাম রাগ পরেছে আপনার??এতো রাগ কেন করছেন তা তো বুঝতেই পারছি না আমি??’

সায়েন কিছু বলল না। কিছুক্ষণ আরাদের দিকে তাকিয়ে ওর হাতে খাবারের প্লেট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। কেন জানি সায়েনের ভিশন রাগ হচ্ছে আরাদের উপর। রাগের উৎস সায়েন নিজেও বুঝতে পারছে না। কলেজে গিয়ে দিশার সাথেও তেমন কথা বলেনি সায়েন। ছাদ থেকে রুমে গিয়ে আরো রেগে গেল সায়েন। কারণ শাফিনের বিড়াল সল্টু ওর খাটের উপর আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সায়েন রেগে গিয়ে একটা ঝাড়ু দিয়ে ঠাসঠুস পেটাতে লাগলো। সল্টু হুড়মুড়িয়ে উঠে প্রান নিয়ে পালালো। সায়েনকে যমের মতো ভয় পায় সে। এর আগেও অনেকবার মার খেয়েছে সায়েনের হাতে। সায়েন বিছানা ঝেড়ে শুয়ে পড়লো।
সল্টু এক দৌড়ে চিলেকোঠার ঘরে চলে গেছে। মাছের কাঁটার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে চলে গেছে। আরাদ খাচ্ছিল, হঠাৎ সল্টুকে দেখে মাছের কাঁটা দিলো সে। কিন্তু পরক্ষণে সায়েনের কথা মনে পড়তেই কাটা নিয়ে গিয়ে বলল,’নাহ তোমাকে আর খাওয়ানো যাবে না। সায়েন তোমাকে পছন্দ করে না তাই আমিও তোমাকে পছন্দ করি না। যাও এখান থেকে।’

সল্টু মিয়াও মিয়াও করতে লাগলো। আরাদ কপালে ভাঁজ ফেলে বলে উঠলো,’উহু তোমাকে দেওয়া যাবে না। কি করবে তুমি??সায়েনের মায়ের কাছে বিচার দিবে দাও।নো প্রবলেম এখন যাও এখান থেকে।’

সল্টু ধীরে ধীরে চলে আসলো। আসার সময় পেছনে ফিরেও তাকিয়েছিল কিন্তু আরাদ তাকে ডাকেনি। এই বাড়িতে কেউ তাকে ভালো বাসে না। শুধু মাত্র শাফিন ছাড়া। তাই শাফিনের জন্য সে রয়ে গেছে নাহলে কবেই চলে যেতো। কালো লেজটা নাড়াতে নাড়াতে সে চলে গেল।

সন্ধ্যায় শাফিন ফিরলো। খুব ক্লান্ত সে। ভার্সিটি অফিস সবমিলিয়ে ক্লান্তির শেষ নেই তার। বাসে করে যেতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু ওর এই সমস্যা তাড়াতাড়ি ঘুচবে। শফিকুল সাহেব বলেছেন এবার শাফিনকে বাইক কিনে দেবে। এজন্য শাফিন বেশ খুশি। শাওয়ার শেষ হতে না হতেই মায়ের ডাক এলো। শাফিন সায়েন দু’জনেই বাবা মায়ের রুমে গেল। জয়নব বেগম খাটের উপর বসে আছেন। শফিকুল ইসলাম টেবিলে বসে কিসব লিখছেন। ওদের দেখেই জয়নব বেগম বললেন,’লিমার বিয়ে এটা নিশ্চয়ই তোমরা শুনেছো??’
সায়েন শাফিন দু’জনেই মাথা নাড়লো। জয়নব বেগম আবার বললেন,’আগামী পরশু লিমার গায়ে হলুদ। আমরা সেদিনই যাবো। তবে কথা হল যে,শাফিন সবসময় সায়েনের সাথে থাকবে। এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করবে না। বিয়ে বাড়ীতে যাচ্ছি। চোখ কান খোলা রাখবে। নিজেদের জিনিসপত্র সব নিজেদের দায়িত্বে রাখবে। মোট চারদিন থাকব আমরা। তাই সবকিছু সাবধানে রাখবে। কি বলেছি বুঝতে পেরেছো??’

সায়েন শাফিন আবার মাথা দোলায়। মায়ের ভাষণ শুনে দুজনেই হাঁপিয়ে উঠেছে। জয়নব বেগমের অনুমতি নিয়ে দু’জনেই বের হয়ে গেল। বের হয়ে সায়েন বলল,’কি হুকুম করলো রে ভাই!! ওটাকে তো বিয়ে বাড়ি মনেই হবে না। চারদিন থাকব কিভাবে আমি??’

শাফিন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,’এর থেকে আমাকে যদি মুচিগিরি করতে বলে তাতেও আমি রাজি। ভালো লাগে না এসব।’

সায়েন শাফিনের পিঠ চাপড়ে বলল,’তুই আমার ভাই মুচিগিরি করবি কেন??তুই তো মেথরগিরি করবি ওটাই বেস্ট।’

শাফিন ক্ষেপে গেলো। সায়েনকে তাড়া করতেই সায়েন এক ছুটে রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। বাথরুম থেকে পানির শব্দ আসতেই চমকে উঠে সায়েন। ওর বাথরুমে কে গেল??তাও এই রাতের বেলা। সায়েন বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে বলল,’কে??কে আমার বাথরুমে??বের হও এখুনি।’

সাথে সাথে দরজাটা খুলে গেল। আরাদকে দেখে অবাক হয়ে গেলো সায়েন। সাথে লজ্জাও পেলো। কারণ আরাদ তোয়ালে পরে আছে শুধু। খালি গা বেয়ে পানি টপটপ করে পরছে। যা দেখে মুহূর্তেই সায়েনের গা কাটা দিয়ে উঠল। সায়েন ভরাট গলায় বলল, ‘আপনি এখানে আমার রুমে কি করছেন??আর এখানে এলেন কিভাবে??’
বলতে বলতে সায়েন চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। আরাদ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। সায়েন আরেকটু সরে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,’এগোবেন না। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে লজ্জা করছে না আপনার??’

আরাদ হাত দিয়ে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,’জামাকাপড় দাও পরে নেই তারপর বাকিটা বলছি।’
সায়েন দ্রুত পায়ে আলমারি থেকে টিশার্ট আর টাউজার বের করে দিল। আরাদ তা নিয়ে আবার বাথরুমে চলে গেল। সায়েন তো ভয়ে কাঁপছে এখন যদি ওর মা আসে তাহলে কি হবে??নখ কামড়াচ্ছে আর পায়চারি করছে সায়েন। সামনে এগিয়ে পেছনে ঘুরতেই আরাদের সাথে ধাক্কা খেলো সে। আরাদ চোখ কুঁচকে তাকিয়ে মাথা মুছতেছে। তবুও তার চুল বেয়ে পানি পড়ছে। তোয়ালে টা সায়েনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আরাদ বলল,’স্মেলটা খুব সুন্দর মন কাড়া।’

প্রশংসাতে সায়েন খুশি হলো না। সে বলল, ‘আপনি এখানে কিভাবে এলেন??’

‘ছাদের দরজা দিয়ে,সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে সোজা তোমার রুমে ঢুকে পড়েছি। তবে কেউ দেখেনি আমাকে।’
বলেই আরাদ তৃপ্তির হাসি দিলো। সায়েন বলল,’কেন এসেছেন??মা যদি দেখে ফেলে তাহলে কি হবে??’

আরাদ সায়েনের দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে বলল,’তো কি হবে??কিছুই হবে না। তুমি বলবে আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড হই।’
ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো সায়েনের। রাগান্বিত স্বরে বলল,’কি যা তা বলছেন??মাথা ঠিক আছে আপনার??’

আরাদ মাথা নাড়িয়ে বলল,’একটুও ঠিক নেই। কিছু মনে করতে পারছি না।’

‘গাছের সাথে জোরে একটা গুঁতো মারব তাহলেই সব মনে পড়ে যাবে বুঝেছেন?? এখন বের হন।’
সায়েন দরজা খুলতে নিলে আরাদ তার দুহাতে সায়েনের দুহাত আবদ্ধ করে নিলো। সায়েন ছুটোছুটি করতে লাগলো কিন্তু কোন ফল পেল না। আরাদ সায়েনের দুহাত চেপে ধরে বলল,’এতো রাগ কিসের তোমার??আমি কি এমন বলেছি যে এতো রাগ করেছো তুমি??’

সায়েন হাত মোচড়াতে মোচড়াতে বলল,’আমি রাগ করিনি। আমি কেন রাগ করব আপনার ওপর??কে হন আপনি আমার??’

‘সেটাই তো তাহলে রাগ করেছো কেন?? বলতেই হবে তোমাকে।’

‘আমি রাগ করিনি হাত ছাড়ুন আমার।’

আরাদ বাঁকা হেসে বলল,’না বললে তো হাত ছাড়বোই না। আর আজকে এখানেই থেকে যাব।’
সায়েনের চোখদুটো রসগোল্লার মতো বড়বড় হয়ে গেলো। সে বলল,’কি আজেবাজে কথা বলছেন আপনি??আমি চেচাবো কিন্তু??’

‘আচ্ছা চেচাও। আমিও দেখব তোমার গলার জোর কতো??’

সায়েন কিছু বলতে গেলেই জয়নব বেগমের কন্ঠস্বর ভেসে আসে। জয়নব বেগম দরজা ধাক্কা দিচ্ছেন আর সায়েনকে ডাকছেন। মায়ের গলার আওয়াজ শুনে ভয়ে সায়েনের গলা শুকিয়ে এসেছে। এখন কি হবে?????
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৮

জয়নব বেগম অনবরত দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। আরাদ এখনও সায়েনের হাত দুটো ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সায়েন ভয়ে কাঁপছে, চোখে মুখে তার ভয় স্পষ্ট। আরাদ ভেবে পায় না যে এতো ভয় কেন পায় ওর মা’কে??সায়েন হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,’হাত ছাড়ুন মা ডাকছে।’

আরাদ হেসে বলল,’তুমি তো চেঁচাবে বলেছিলে। তো এখন চেঁচাও??আমি দেখি!!’

‘দেখুন ফাজলামি করবেন না। আপনি তাড়াতাড়ি লুকিয়ে পড়ুন মা দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে প্লিজ!!!’

আরাদ সায়েনের হাত ছেড়ে দিলো। তারপর বলল,’কোথায় লুকাব আমি??’
সায়েন এদিক ওদিক তাকালো উপায়ন্তর না দেখে বলল,’খাটের নিচে লুকান।’

‘কি!!!এই মাত্র গোসল করেছি ধুলোবালি মাখতে পারব না। অন্য জায়গা খোজো!!’

সায়েনের এবার রাগ হচ্ছে। একে তো মায়ের কাছে জবাবদিহি করতে হবে আর এই লোকটা অসভ্যতামি শুরু করে দিয়েছে। সায়েন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,’তাহলে আলমারি তে লুকান। তাড়াতাড়ি চলুন।’

সায়েন আলমারি খুলে দিল আরাদ ঢুকে পড়লো। নিজেকে ঠিকঠাক করে দ্রুত দরজা খুলে দিল সায়েন। জয়নব বেগম রুমে ঢুকতে ঢুকতে ভ্রু কুটি করে তাকালো সায়েনের দিকে। সায়েন বারবার ঢোক গিলছে। জয়নব বেগম গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,’দরজা খুলতে এতো দেরি হলো কেন??কি করছিলে রুমে বসে??’
সায়েন আমতা আমতা করতে লাগলো কোনরকমে নিজেকে সামলে উওর দিলো,’ব বাথরুমে ছিলাম,গোসল করতে গিয়ে ছিলাম।’

বলেই জিভ কামড় দিলো সায়েন। কি বলতে কি বলে ফেললো??গোসল করতে তো আরাদ ঢুকেছিল!! ভুলভাল বলে ফেলার জন্য আরও ভয় হচ্ছে সায়েনের। জয়নব বেগম বড়বড় চোখে তাকালেন। তার চোখে বিষ্ময় তিনি বললেন,’এতো রাতে গোসল করছিলে??’

‘ন না মা মুখ ফসকে বের হয়ে গেছে। বাথরুমে ছিলাম আমি। আসলে লিমা আপুর বিয়েতে কিভাবে সাজবো গোসল করব সেটা নিয়ে ভাবছিলাম তো তাই মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে।’
জয়নব বেগম কিছুক্ষণ সায়েনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,’তোমার আলমারিতে আমার জলপাই রঙের একটা শাড়ি আছে ওটাই নিতে এসেছি।’

সায়েনের হাত আপনাআপনি বুকে চলে গেল। ছোটখাটো হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে ওর। এখন ওর মা আলমারি খুলবে নাকি?? তাহলে তো সব শেষ। আজকে বাড়ি থেকে বের করেই দেবে। সায়েন নিচু স্বরে বলল,’আমি দিচ্ছি তুমি বরং রুমে যাও।’

‘নাহ এখন দাও আমি লাগেজ গোছাচ্ছি। আমি দাঁড়িয়েছি জলদি করো।’

সায়েন কি করবে বুঝতে পারছে না। মায়ের সামনে আলমারি খুললে তো আরাদকে দেখে ফেলবে। সায়েনের এবার কান্না পাচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু জয়নব বেগম হঠাৎ সায়েনকে অবাক করে দিয়ে খাটের উপর বসলো। এতে সায়েন যেন দ্বিতীয় বার প্রাণ ফিরে পেল। কারণ খাট থেকে আলমারি বেশ দূরে। ওখান থেকে আলমারিতে কে আছে দেখা যাবে না। সায়েন গুটি গুটি পায়ে আলমারির কাছে গেল। দরজা হালকা করে খুলল। যাতে ওর মা আরাদকে দেখতে না পায়। আলমারি খুলে সায়েন অবাক। আরাদ শাড়িটা হাতে নিয়ে দাঁত কেলিয়ে সায়েনের দিকে তাকিয়ে আছে। সায়েন মাথা ঘুরিয়ে একবার মা’কে দেখে নিলো। সায়েন আরাদের থেকে শাড়ি নিতে চাইলো। কিন্তু আরাদ শক্ত করে শাড়িটা ধরে আছে। সায়েন শাড়ি ধরে টানছে কিন্তু আরাদ ছাড়ছে না। সায়েন চোখের ইশারায় আকুতি করছে কিন্তু আরাদ ছাড়ছে না। ঠোঁটে তার দুষ্টু হাসি ঝুলে আছে। সায়েনের রাগ তরতর করে বাড়ছে। এই ছেলের কি ধরা পরার ভয় নেই??ধরা পরলেই বা কি হবে??যা হওয়ার তা তো সায়েনের হবে। হঠাৎ জয়নব বেগম বলে উঠলেন,’শাড়ি পাচ্ছো না??’

সায়েন মাথা ঘুরিয়ে মেকি হেসে বলল,’খ খুঁজছি!!’
জয়নব বেগম উঠে দাঁড়ালেন। সায়েনের কলিজা শুকিয়ে গেছে তা দেখে। মা’কে কাছে আসতে দেখে সে একটানে আরাদের থেকে শাড়িটা নিয়ে সশব্দে আলমারি বন্ধ করে দিলো। তাড়াতাড়ি জয়নব বেগমকে শাড়ি দিয়ে বলল,’এ এই নাও তোমার শাড়ি!! আর কিছু লাগবে??’
জয়নব বেগম শাড়িটা ওলটপালট করে দেখে বললেন,’নাহ!!’
তিনি সায়েনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে গেলেন। সায়েন বুকে হাত দিয়ে খাটের উপর শুয়ে পড়লো।
‘উফ্ বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। আর ওটাকে বের করতে হবে তাড়াতাড়ি।’
সায়েন উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। তারপর আলমারির দরজা খুলল। আরাদ হাসতে হাসতে বের হলো। এতে সায়েনের গা যেন জ্বলে উঠলো। এতক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে ছিল সে আর এই ছেলেকে দেখো হেসেই কুল পাচ্ছে না। সায়েন রাগি স্বরে বলল,’আপনার আক্কেল জ্ঞান নেই নাকি??কি করতে যাচ্ছিলেন??আরেকটু হলেই তো ধরা পরে যাচ্ছিলাম।’
আরাদ খাটের উপর দু’পা তুলে বসে বলল, ‘ধরা তো পড়িনি!! রিল্যাক্স!!’
সায়েন কটমট করে আরাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,’আপনি রিল্যাক্স এ থাকুন কিন্তু আমি পারছি না তাড়াতাড়ি ছাদে চলে যান।’

আরাদ একটা বালিশ কোলে নিয়ে বসে বলল,’যাব তো আগে আমার মাথার ব্যান্ডেজ চেন্ঞ্জ করে দাও।’
সায়েন দেখলো আরাদের মাথার ব্যান্ডেজ ভিজে গেছে। সে অকপটে জবাব দিলো,’এখন গোসল করার কি দরকার ছিলো??’

‘ছিলো তা তুমি বুঝবে না।’

সায়েন এইড বক্স এনে আরাদের মাথার ব্যান্ডেজ খুলে দিল। ঘা অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। তাই সে অনটাইম ব্যান্ডেজ করে দিলো। পুরোটা সময় আরাদ সায়েনের দিকে তাকিয়ে ছিল। সায়েন কিছুটা বুঝলেও পাত্তা দিলো না। ব্যান্ডেজ শেষ করে সায়েন বলল,’এখন যান।’
‘তুমি খুব বোকা এটা কি তুমি জানো??’

‘কি বললেন??’ সরু চোখে তাকালো সায়েন।আরাদ ঠোঁট চেপে হেসে বলল,’হুম!! এই যে তুমি আমাকে বাথরুমে লুকাতে পারতে তা না করে আলমারিতে ঢুকালে।’

সায়েন অবাক হয়ে গেল। সত্যি তো!!ইশশ তখন কেন মনে হয়নি??সায়েন নিজেই বোকা বনে গেল। কি বলবে এখন??সায়েন বলল,’মা যদি বাথরুম চেক করতো?? সেজন্য আপনাকে আলমারিতে লুকিয়েছি। আলামারিতে মানিয়ে নিয়েছি কিন্তু বাথরুমে মানাতে পারতাম না।’

আরাদ মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝার ভান করে বলল,’ওহ বুঝলাম।’

‘আ আপনি তাড়াতাড়ি যান এখান থেকে।’

বলতে বলতে আরাদ সটান হয়ে শুয়ে পড়লো। সায়েন ঘাবড়ে গেল, দু’পা তুলে বিছানায় বসে উবু হয়ে বলল,’আপনি শুয়ে পড়লেন কেন??প্লিজ চলে যান!!’

আরাদ ওর হাত ধরে হ্যাচকা টান দিতেই সায়েন আরাদের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সায়েন উঠতে চাইলে আরাদ আটকে দিলো। কাত হয়ে হাতের উপর ভর দিয়ে সায়েনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,’অনেক তো রাগ দেখিয়েছো এবার তো একটু হাসতেই পারো??’
আরাদের কথায় সায়েন ভ্রু কুঁচকে তাকালো বলল,’মানে???’

আরাদ আবার টান হয়ে শুয়ে পড়ল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,’জানো সায়েন,আমার তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। মানে আমি এই বাড়ির প্রতিটি কোণে কোণে ভালোবাসা আদান প্রদান করেছি। ছাদ,ঘর,আর সবচেয়ে বেশি ভালো বাসা দিয়েছে ওই চিলেকোঠা। আমি কখনো ভাবতেই পারিনি ওইরকম নোংরা চিলেকোঠায় আমি থাকব!!’
আরাদ থামলো তারপর সায়েনের দিকে ফিরে তাকাল। সায়েন অদ্ভুত নয়নে আরাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাদ নিঃশব্দে হাসলো বললো,’আচ্ছা সব চিলেকোঠার ঘর তো নোংরা হয় না। কিছু কিছু মানুষ সুন্দর করে একটা চিলেকোঠার ঘর সাজায়। বসবাসের যোগ্য করে তোলে। কেন জানো?? কারণ নোংরা চিলেকোঠাকে কজন ভালোবাসে?? সেখানে যে থাকতে পারবে সেটাই তার প্রকৃত ভালোবাসা। যেমন ধরো দুজন ছেলেমেয়ে একে অপরকে খুব ভালোবাসে। তারা দুজন দুজনের খারাপ দিকগুলো জেনেই একে অপরকে ভালোবাসে। তাদের ভালোবাসা দিয়ে খারাপ দিকগুলো শুধরে নেয়। কিন্তু কজন পারে এটা?তাই সত্যিকারের ভালবাসা টা অনেক টা ওই নোংরা চিলেকোঠার মতোই। তাকে মন দিয়ে দেখতে হয়। সাজাতে হয়।চোখ দিয়ে নয়। আমিও ঠিক ওইরকম একটা চিলেকোঠার ঘর সাজাতে চাই। আমার তাকে নিয়ে থাকতে চাই। সেখানে শুরু হবে আমাদের “চিলেকোঠার প্রেম”!!’
বলে আরাদ আবার সায়েনের দিকে তাকালো। সায়েন আগের দৃষ্টি নিয়ে আরাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাদ ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় বুঝালো কি হয়েছে??সায়েন সন্দেহ ভরা চোখে তাকিয়ে বলল,’তা আপনার সে টা কে??’

আরাদের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়লো বলল, ‘সেটাই তো বড় প্রবলেম!!এখনও আমার তাকে খুঁজে পেলাম না। তবে শিঘ্রই পেয়ে যাব।’

সায়েন সন্দেহের সৃষ্টি আরো গাঢ় করে বলল, ‘আপনার কি সত্যি কিছু মনে পড়ছে না??নাকি নাটক করছেন আপনি??’

‘তোমার কি মনে হয়??যদি মনে হয় আমি নাটক করছি তাহলে আমি চলে যাব এই মুহূর্তে।’

সায়েনের বুকটা ধক করে উঠলো। আরাদ চলে যাবে সেটা এখনো মানতে পারছে না সে। কষ্টগুলো আবার দলা পাকিয়ে আসছে সায়েনের। এখন মনে হচ্ছে সন্দেহ না করাই ভালো। তাহলে অন্তত আরাদ থাকবে ওর সাথে। সায়েন কিছু বলছে না দেখে আরাদ বলল,’যাবো আমি??’
সায়েন চোখ ফিরিয়ে নিলো বলল,’আমার কেমন জানি মনে হচ্ছিল। আচ্ছা আর বলব না।’
আরাদ হাসলো যা সায়েন দেখতে পেল না। সে অন্যদিকে ফিরে আছে। এমনিতেই সায়েনের অস্বস্তি হচ্ছে আরাদের পাশে শুয়ে থাকার জন্য। আরাদ উঠে বসে বলল,’ঘুরতে যাবে??’
সায়েনও উঠে বসে বললো,’কোথায়??আর এই রাতের বেলা??মা জানতে পারলে আমাকে শেষ করে ফেলবে!!’

‘এতো ভয় কেন পাও তুমি??আমি বুদ্ধি বের করছি দাঁড়াও!!’

আরাদ কোলবালিশ বিছানার উপর রেখে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলো। তারপর হাসিমুখে সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’এবার তোমার মা তোমাকে সন্দেহ করবে না। আর বাইরে থেকে চাবি দিয়ে লক করে যাবে ব্যস হয়ে গেল।’
সায়েন অবাক আরাদের বুদ্ধি দেখে। সে দাঁত কেলিয়ে হাসার অভিনয় করে বলল,’তাহলে বের হবো কিভাবে?? মেইন দরজা তো খুলতে হবে। মা তো পানি খেতে এসেই দরজা চেক করে।’
আরাদ খানিকটা চিন্তা করে বলল,’তোমাদের রান্নাঘরের জানালার তো গ্রিল নেই!!রাইট,ওখান দিয়ে বের হবো চলো!!’

সায়েন ঘুরতে যাওয়ার কথাটা ফেলতে পারলো না। ওর মা কখনো রাতের বেলা ঘুরতে যেতে দেয়নি এমনকি শাফিনের সাথেও না। দুজনে দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিলো। সব রুমের লাইট অফ। পা টিপে টিপে দুজনে রান্নাঘরের জানালা খুলে বের হয়ে গেল। আগে আরাদ নামলো তারপর সায়েনকে সাবধানে নামালো। সায়েন মাথায় ভালো করে ওড়না পেঁচিয়ে নিয়েছে যাতে কেউ চিনতে না পারে!! মেইনরোডে এসে পড়েছে দু’জনে। হেডলাইটের আলোতে দুজনে হাটছে। হালকা শীত পড়েছে। সায়েনের শীত লাগছে খুব। ওড়নাটা ভালো করে পেঁচিয়ে নিলো সে। আরাদ দেখে সব বুঝে গিয়েছে কিন্তু তার কিছু করার নেই। আরাদ নিজেই পাতলা একটা টিশার্ট পরেছে।

সায়েনের ভালো লাগছে রাতের শহর দেখে। মানুষজন খুবই কম। আকাশে চাঁদ নেই হাজার তারা দেখা যাচ্ছে। তবুও আকাশের এই সৌন্দর্য চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সায়েন মুগ্ধ হয়ে চারিদিক দেখছে। এভাবে সে কখনোই দেখেনি!!এতে সায়েনের রাগ পরে গেছে। আরাদ এটাই চেয়েছিল তাই তো সায়েনকে ঘুরতে নিয়ে এসেছে। আরাদ সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’ভালো লাগছে তোমার??’
সায়েন মাথা নাড়িয়ে বলল,’খুব!!তবে রাতের বেলা নাকি লং ড্রাইভে যাওয়া অনেক মজা।’

‘তুমি যাবে??’

‘কিভাবে যাব??স্কুটি তো বাড়িতে!!না যাওয়াটাই ভালো। কখন কি হয়ে যায়। তার থেকে বরং হাঁটি।’

আরাদ কিছু বলল না। হাঁটতে লাগলো। একটু এগিয়ে আরাদ বলল,’তুমি একটু দাঁড়াও আমি আসছি।’

সায়েন চটজলদি বলল,’কোথায় যাচ্ছেন??’

আরাদ দুষ্টু হেসে বলে,’এমারজেন্সি।’
সায়েন নাক সিটিয়ে অন্যদিকে ঘুরে তাকায়। আরাদ ততক্ষণে আড়ালে চলে গেছে। কিছুক্ষণ পর আরাদ এলো ওরা আবার হাঁটতে লাগলো। সায়েন বারবার মুখ ঢাকছে যদি চেনা কেউ দেখে নেয় তাহলে??আরো কিছু দূরে যেতেই ওরা দেখলো একটা লোক স্কুটির উপর বসে বসে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে। লোকটার কাছাকাছি গিয়ে আরাদ সায়েনকে বলল,’যাবে লং ড্রাইভে??’
সায়েন অবাক হয়ে বলল,’কিভাবে??’
আরাদ লোকটার কাছে গিয়ে বলল, ‘এক্সকিউজ মি!! আপনার স্কুটিটা দেওয়া যাবে কিছুক্ষণের জন্য??আমরা আবার ফিরে আসবো।’
লোকটা কাল বিলম্ব না করে চাবি দিলো আরাদের হাতে। সায়েন তো অবাক। লোকটা এতো সহজে চাবি দিয়ে দিলো। শুধু চাবি নয় সাথে দুটো চাদর দিয়ে বলল,’এটা পরে নিয়েন। শীত পরছে তো ঠান্ডা লাগতে পারে। আমি এখানে অপেক্ষা করব আপনাদের জন্য।’
আরাদ চাবি আর চাদর নিলো। চাদরটা সায়েনের হাতে দিয়ে বলল,’লেটস গো।’
সায়েন এখনো ঘোরের মধ্যে আছে। সবকিছু মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে ওর। আরাদ বলল, ‘তাড়াতাড়ি চলো। রাত বাড়ছে তো??’

সায়েনের হুঁশ ফিরে এলো। চাদর নিয়ে গায়ে পেচাতেই আরাদ ওর হাতে চাবি দিলো। সায়েন হেলমেট পরে নিলো আরাদও পরলো।
তারপর সায়েন স্কুটি স্টার্ট দিলো। আরাদ পেছনে চেপে বসেছে।
সায়েন স্কুটি চালাচ্ছে। এতক্ষণ অবাক হলে এখন ভালো লাগছে। লাইফে প্রথম লং ড্রাইভে এসেছে সে। উপভোগ করছে খুব। খুশিগুলো বারবার দোলা দিয়ে যাচ্ছে। আর আরাদ সায়েনের খুশি দেখে শান্তি পাচ্ছে। ঘন্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে আবার সেই জায়গায় ফিরে আসলো ওরা। লোকটাকে চাদর আর তার স্কুটি বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরলো। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সায়েন বলল, ‘ওই লোকটা বিনা দ্বিধায় আমাদের স্কুটি দিলো কেন??সে কি আপনাকে চেনে??’

আরাদ পড়লো বিপাকে। সায়েনকে খুশি করার জন্য জোনায়েদ কে দিয়ে এতো রাতে স্কুটির ব্যবস্থা করালো আর এখন জবাবদিহি করতে হবে।

‘আসলে পৃথিবীতে এখনও এমন ভালো মানুষ আছে তা আমি দেখে সত্যি অবাক হয়েছি। সত্যি তো আমার এক বলাতেই লোকটা তার স্কুটি দিয়ে দিলো!!’
আরাদও অবাক হওয়ার ভান ধরলো। সায়েন আর এই সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,’পরশু চলে যাব খালামনির মেয়ের বিয়ে খেতে।’

আরাদের মনটাও খারাপ হয়ে গেল। ক’দিন সায়েনের থেকে দূরে থাকবে কে জানে??

‘কতদিন থাকবে???’

‘চারদিন।’

‘ওহ!!!’

‘চিন্তা করবেন না। আমি সকাল বিকাল আসব আপনার কাছে। ছাদের দরজা খুলে দিয়ে যাব। রাতে আমার রুমে এসে ঘুমাইয়েন এই চারদিন না হয় আরামে ঘুমালেন!!’

আরাদ কিছু বলল না। সায়েনকে না দেখে থাকতে হবে এই চারদিন। সারারাস্তা আরাদ চুপ করে ছিল। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সাবধানে ঢুকলো দুজন। আরাদ ছাদে চলে গেল আর সায়েন তার নিজের রুমে। সায়েনের ও একটু খারাপ লাগছে।

অবশেষে সেই কাঙ্খিত দিন চলে আসলো। বাড়ির সবাই রেডি হয়ে নিয়েছে। সায়েন আর ওর মা স্কুটিতে যাবে। শাফিন আর ওর বাবা অটোতে করে যাবে সব ব্যাগপত্র নিয়ে। সায়েন স্কুটিতে বসে চিলেকোঠার ঘরের দিকে তাকালো। জানালা খুলে তাকিয়ে আছে আরাদ। মুখটা তার শুকনো শুকনো লাগছে। জয়নব বেগম আসতেই সায়েন চোখ ফিরিয়ে নিলো। আর তাকালো না আরাদের দিকে। স্কুটি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। আরাদ সায়েনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। না জানি আবার কখন দেখা হয় দু’জনের???

#চলবে,,,,,,,,,,,,
#চলবে,,,,,,,,,,,

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here