চেরি_ব্লসমের_সাথে_এক_সন্ধ্যা পর্ব: ৪৮

0
163

চেরি_ব্লসমের_সাথে_এক_সন্ধ্যা পর্ব: ৪৮
#লেখা: ইফরাত মিলি

____________

দুই দিনের ট্রিপ শেষে এডমন্টনে ফিরছে ওরা। বানফ এবং ক্যালগারিকে পিছনে ফেলে গাড়ি এডমন্টনে প্রবেশ করেছে। মিতুল ড্রাইভিং সিটের পাশে বিবশ মুখ নিয়ে বসে আছে। একটু পর পর আবার পিছন ফিরে ক্যামিলাকে দেখছে একনজর। মিতুল ভাবতে পারেনি ক্যামিলার ওই সুন্দর মুখের পিছনে একটা বিষণ্নতার গল্প আছে! ঠকে যাওয়ার গল্প আছে! কালকে রাতেই ক্যামিলার জীবনের গল্প শুনেছে ও। ক্যামিলা অনাথ। কেউ নেই ওর এখন। ক্যামিলার যখন ছয় বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যায়। মায়ের সাথেই ছিল ক্যামিলা। কিন্তু মা’ও মারা যায় ক্যামিলার বিয়ের পর। উনিশ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল ক্যামিলার। লাভ ম্যারেজ। ক্যামিলার বিয়ের এক মাসের মাথাতেই মারা যায় তার মা। ক্যামিলা হাসব্যান্ডকে নিয়ে নিজ বাড়িতেই থাকতো। প্রথম দিকে কয়েক মাস দুজনের সংসার ভালোই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সংসারটা অন্যরকম হয়ে উঠেছিল। টুকিটাকি বিষয় নিয়েও অনেক ঝগড়া করতো ক্যামিলার হাসব্যান্ড। ক্যামিলাকে জোহানদের বাড়িতে কাজটাও ছেড়ে দিতে বলেছিল। ক্যামিলা ছাড়তে চায়নি কাজটা। কিন্তু তার হাসব্যান্ড বাধ্য করেছিল ছাড়তে। ক্যামিলা বাড়ির কাজ ছেড়ে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ নিয়েছিল হাসব্যান্ডের কথামতো।
বিয়ের নয় মাসের মাথায় ক্যামিলা প্রেগন্যান্ট হলো। ক্যামিলার ধারণা ছিল তার হাসব্যান্ড খুশি হবে। কিন্তু হলো না। তার হাসব্যান্ড বললো, বাচ্চাটা নষ্ট করে দিতে। ক্যামিলা রাজি ছিল না। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর দুজনের ভিতরের ঝামেলা আরও অনেক বেশি বেড়ে গেল। রোজ ঝগড়া-ঝাটি চলতেই লাগলো। প্রেগন্যান্সির যখন আট মাস চলে, তখন হঠাৎ ক্যামিলার হাসব্যান্ড উধাও হয়ে গেল। শুধু যে একা উধাও হলো তা নয়। ক্যামিলার জমানো সমস্ত ডলার নিয়ে ফেরারি হলো সে। ক্যামিলা ভেঙে পড়লো। নিঃস্ব হয়ে গেল। ক্যামিলার আপন বলতে কেউ ছিল না যে তাকে সাহায্য করবে। অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাচ্চাকে পৃথিবীর আলো দেখালো। কিন্তু ভাগ্য ছিল বড়ো নির্মম। বাচ্চাটার দুই মাস হতে চারদিন বাকি ছিল তখনই বাচ্চাটা মারা গেল। ক্যামিলা আরও বেশি ভেঙে পড়লো। নিজের এমন দুর অবস্থায় পাশে পেয়েছিল জোহানের ফ্যামিলিকে। জোহানের ফ্যামিলির অনুপ্রেরণাতেই নিজেকে সামলে নেয় ক্যামিলা। নতুন একটা জীবন শুরু করার জন্য উঠে দাঁড়ায় আবার। এর মাঝে একদিন খবর পায় তার হাসব্যান্ড ক্যুবেক সিটিতে আছে। সেখানে নিজের নতুন সংসার নিয়ে ব্যস্ত সে। ক্যামিলা আরও জানতে পারে, তাদের বিয়ের চার মাসের মধ্যেই তার হাসব্যান্ড অন্য একটা রিলেশনে জড়িয়ে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে ক্যামিলার হাসব্যান্ড সেই মেয়েটিকে নিয়েও থাকছে না। অন্য আরেকটি মেয়েকে নিয়ে সংসার পেতেছে সে।

মিতুল কালকে এতকিছু জানলো শুধু একটা ছবির কারণে। কালকে যখন লেক মিনেওয়াঙ্কা এবং পেটু লেক ঘুরতে গিয়েছিল, তখন মিতুল নিজের একটা পানির বোতল রেখেছিল ক্যামিলার ব্যাগে। হোটেলে ফিরে যখন সেই বোতল আবার ক্যামিলার ব্যাগ থেকে বের করতে গেল, তখন একটা ছবি দেখেছিল ক্যামিলার ব্যাগে। একটা ছোট বাচ্চার সাথে ক্যামিলার ছবি। বাচ্চাটি কে সেটা জিজ্ঞেস করতেই কথায় কথায় ক্যামিলার পুরো জীবন কাহিনী শুনে নিলো মিতুল। ক্যামিলার জন্য খুব খারাপ লাগছে ওর। এই খারাপ লাগাটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। মিতুল বড়ো করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ভালোবেসে কেন ঠকতে হবে?
মিতুল উইন্ডোর বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে আনলো। জোহানের দিকে তাকালো। জোহানের ওই মুখটা দেখেই ও বলে দিতে পারে, ও কোনোদিনও ঠকবে না। ওদের ভালোবাসার মাঝে কখনো বিশ্বাস ঘাতকতার স্থান থাকবে না।

_______________

মিতুলের বাংলাদেশ ফেরার সমস্ত বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। কাল বাদে পরশুই ফ্লাইট। সকাল নয়টার ফ্লাইটে ক্যালগারি থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবে ও। আর মাত্র দুই দিন আছে এই কানাডা। ভাবতেই হৃদয় কষ্টের খরস্রোতে ভেসে যাচ্ছে। কানাডা আসার আগে কি একবারও ভেবেছিল এমন হবে? ভাবেনি। জোহানকে ছাড়া থাকতে যে বড্ড কষ্ট হবে ওর!

“তুমি কি বোরিং ফিল করছো? সং প্লে করে দেবো?” পাশ থেকে জোহানের কণ্ঠস্বরে মিতুলের ভাবনায় ছেদ পড়লো। মিতুল নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো। বললো,
“না, আমি বোরিং ফিল করছি না।”

“তাহলে এত চুপচাপ কেন? পার্টিতে যাচ্ছ, খুশি থাকা উচিত তো তোমার।”

জোহানের ব্ল্যাক কারটি রিকার্ডোর ফ্ল্যাটের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। মিতুলের জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করা হয়েছে রিকার্ডোর ফ্ল্যাটে। এটাকে আসলে মিতুলের বিদায়কালীন পার্টি বলা চলে।

মিতুলকে চুপ দেখে জোহান নিজেই বললো,
“বাংলাদেশ গিয়ে আমাকে ছেড়ে কীভাবে থাকবে সেটাই ভাবছো তুমি, তাই না?”

মিতুল স্বীকার করলো না। বললো,
“আমি সেটা ভাবছি না। অন্যকিছু ভাবছি।”

“অন্যকিছু? কী সেটা?”

মিতুল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারলো না। একটু ভাবতে হলো। বললো,
“কানাডা থেকে যাওয়ার দিন কী পরে যাব সেটাই ভাবছি। স্কার্ট, টপ পরে গেলে ভালো হবে মনে হচ্ছে।”

“তাই? তুমি মনে মনে স্কার্ট, টপ নিয়ে ভাবনার আসর বসিয়েছিলে?”

“হুম।”

“মিথ্যা কথা।”

“মোটেই মিথ্যা নয়। আমি এটাই ভাবছিলাম।”

“আমাকে বোকা মনে করো? আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি তুমি আমাকে ভাবছিলে। আমাকে ছাড়া কীভাবে থাকবে সেটাই ভাবছিলে।”

জোহানের মুখ থেকে সহজ ভাবে এই কথাগুলো শুনে মিতুলের মনের এক কোণে কষ্ট মেঘেরা জড়ো হয়ে আঁধার করে ফেলেছে। কান্না পেয়ে গেল ওর। মিতুল জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। চোখের পাতা ভিজে উঠছে। মিতুল মনের ভিতরের কথাটা আর চেপে রাখতে পারল না। বলেই দিলো,
“বাংলাদেশ চলে যাওয়ার পর তোমাকে আমি খুবই মিস করবো জোহান। ভীষণ মনে পড়বে তোমায়।”

মিতুলের কথা শুনে জোহানের বুকের মাঝটাতে চিনচিনে এক ব্যথায় ছেয়ে গেল। মিতুল চলে যাবে সেজন্য এমনিতেই মন খারাপ ওর। অস্থিরতায় সময় পার করছে কিছু দিন ধরে। এবার মন খারাপের পাল্লাটা আরও ভারী হলো। যদিও সেটা ধরা দিতে চায় না মিতুলের কাছে। মিতুল যখন চলে যাবে তখন মিতুলের সাথে থাকতেও পারবে না ও। মিতুলকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ছাড়তে পারবে না। কারণ, মিতুলের আগে নিজেকেই টরন্টো যাওয়ার ফ্লাইট ধরতে হবে। কয়েকদিন পরই টরোন্টোতে এক বিশাল ফেস্টিবলের আয়োজন করা হচ্ছে। এটা সত্যিই খুব বিশাল আয়োজন। সেখানে অংশগ্রহণ করার জন্য আগে ভাগেই যেতে হবে ওর। ওখানে অংশগ্রহণ করলে ওর গানের ব্যাপারটার ভালো উন্নতি হবে বলেই ধারণা জোহানের। সেজন্য এই বিষয়টিকে হালকা করে দেখছে না। মিতুলের যেদিন ফ্লাইট সেদিন সকাল ছয়টার ফ্লাইটে টরন্টো চলে যাবে ও।

জোহান মন খারাপের ব্যাপারটা মিতুলের কাছে ধরা না দিয়ে উল্টো মিতুলের সাথে মজা করে বললো,
“একটা কাজ করা যায় তুলতুল। বাংলাদেশ চলে যাওয়ার পর যখন তুমি আমাকে এতই মিস করবে, তখন তোমার যাওয়ারই দরকার নেই বাংলাদেশ। অবৈধ উপায়ে এখানেই থেকে যাও। বানফের লেক লুইসের নিচে আমরা ছোট্ট একটা ঘর বানাবো। ঠিক আমার টাইম হাউজের মতো। ওটার ভিতরেই দুজনে আত্মগোপন করে থাকবো। আমাদের যখন খিদে লাগবে তখন আমরা একটু পানি খাবো। তোমার যদি পানি ছাড়া আরও কিছু খেতে ইচ্ছা করে, তাহলে ক্যামিলাকে বলবো কিছু খাবার এনে ঠিক আমাদের ঘর বরাবর ছুঁড়ে মারতে। আমরা টুকিটাকি খাবার এবং অফুরন্ত পানি খেয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেবো লেক লুইসের নিচে। কেউ কোনোদিন জানতেও পারবে না মিতুল নামের একজন বাংলাদেশি অবৈধ ভাবে কানাডা রয়ে গেছে জো নামের এক কানাডিয়ান এবং বেঙ্গলি ছেলের জন্য।”

জোহানের বলা প্রতিটি শব্দ মিতুলের মাঝে রাগ ছড়িয়ে দিলো। ও এত সিরিয়াস ভাবে বললো কথাটা, আর জোহান মজা করছে সেটা নিয়ে? মিতুল রাগে ফুঁসে উঠলো।
“গাড়ি থামাও।”

“গাড়ি থামাবো কেন? আমার দেওয়া আইডিয়াটা তোমার পছন্দ হয়েছে কি না সেটা বলো তুমি। মুখ দিয়ে শুধু হ্যাঁ অথবা না বলো। এরপর কী করে ওখানে ঘর ওঠাতে হবে সেটা আমি বুঝে নেবো। আচ্ছা, ওই ঘরের নাম কী দেওয়া যায় বলো তো? এই নামটা কেমন? ‘মানুষ থেকে মারমেইড হতে চাওয়া বৃথা চেষ্টাকারী জো, তুলতুলের সিক্রেট হাউজ’! এটা সুন্দর হবে না?”

মিতুলের রাগ এখন গুরুতর অবস্থায়। মিতুল হুংকার দিয়ে বললো,
“গাড়ি থামাও।”

“কেন? আমরা তো ডিনার পার্টিতে যাচ্ছি। সেখানে না গিয়ে এখানে গাড়ি থামবো কেন? এই মাঝপথে গাড়ি থাম…”

“আমি কোথাও যাব না তোমার সাথে। তুমি এখানেই গাড়ি থামাও।” মিতুল জোহানের কথা শেষ না করতে দিয়েই বলে উঠলো।

“গাড়ি থামানো সম্ভব নয়। কানাডায় যেখানে সেখানে গাড়ি থামানো যায় না। পুলিশ দেখতে পেলে জরিমানার বিশাল এমাউন্ট হাতে ধরিয়ে দেবে। আমি এই বিশাল এমাউন্টের জরিমানার ভার সামলাতে পারবো না। আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো আজকের ডিনার পার্টি আমার জন্য নয়। তোমার জন্য। আমার ফ্রেন্ডসরা এত কষ্ট করে তোমার জন্য ডিনার পার্টির আয়োজন করলো, আর তুমি সেখানে যাবে না? আমার ফ্রেন্ডসরা তোমার সম্পর্কে কী ভাববে বলো তো?”

মিতুল একটু শান্ত হলো। কিন্তু ভিতরে রাগ, অভিমান রয়ে গেল।
মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশাল এপার্টমেন্টে পৌঁছে গেল ওরা। মিতুল এর মাঝে জোহানের সাথে আর একবারের জন্যও মুখ খোলেনি। প্রথম মুখ খুললো লিফটে উঠে। জোহান নয় নম্বর ফ্লোরের বাটন চাপতেই মিতুল তীব্র রাগ-অভিমান নিয়ে বললো,
“আমি যখন যাই বলি তাই তোমার কাছে মজা মনে হয়, তাই না? আমি তোমাকে মিস করবো বললাম, সেটা নিয়েও তুমি মজা করলে! তোমার কি মন নেই? হার্টলেস তুমি?”

মিতুলের কথা শেষ হতেই জোহান মিতুলের ডান হাত এনে বুকের বাম পাশে রাখলো। হঠাৎ এমন করায় মিতুল একটু চমকালো।
জোহান শান্ত কণ্ঠে বললো,
“মন আছে কি না নিজেই দেখো সেটা। উপলব্ধি করতে পারছো কিছু? কী মনে হয়? মন আছে আমার? হৃদয়ের কী খবর? কী চলছে আমার হৃদয়ে? নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছ এখানটায়?”

জোহানের শান্ত চোখের চাহনিতে দুর্বল হয়ে পড়ছে মিতুল। ভিতরের রাগটা কমে গিয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। জোহানের ওই বাদামি চোখে যতই চেয়ে থাকছে ততই দুর্বল হচ্ছে ও। দৃষ্টি এলোমেলো হয়ে আসছে। মিতুল দ্রুত চোখ সরিয়ে ফেললো। জোহানের হৃদয়ের চলন উপলব্ধি করতে পারছে ও। মিতুল আরও ভালো করে উপলব্ধি করার চেষ্টা করলো। ওর মনে হচ্ছে জোহানের হৃদয়ের সবটা জুড়েই ও। জোহানের হৃদয়ের চলন উপলব্ধি করতে করতে হঠাৎ ওর হৃদয়ও তাল হারিয়ে ফেললো। হৃদস্পন্দন বাড়তে লাগলো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ওর। মিতুল নিজের হাতটা জোহানের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতে চাইলেই জোহান আরও শক্ত করে হাতটা বুকে চেপে ধরলো। বললো,
“হেই মিতুল, এমন কেন করছো তুমি! একটু স্থির হয়ে থাকো না।”

জোহানের কথায় একেবারে স্ট্যাচুর মতো হয়ে গেল মিতুল।
জোহান বললো,
“কী আছে আমার হৃদয়ে? উপলব্ধি করতে পারছো সেটা? যদি পারো, বলো তাহলে।”

মিতুলের দৃষ্টি আবারও জোহানের বাদামি চোখ জোড়ার উপর পড়লো। নিঃশ্বাস বোধহয় সত্যিই বন্ধ হয়ে যাবে। কী বলবে ও জোহানকে? গলাটাও যে ভীষণ কাঁপছে। মিতুল কাঁপা কাঁপা গলাতেই কোনো রকম উচ্চারণ করলো,
“আমি কিছু উপলব্ধি করতে পারছি না।”

“পারছো না, না কি পেরেও সেটা বলতে চাইছো না? কোনটা? সত্যি করে বলো, কী উপলব্ধি করতে পারছো তুমি?”

লিফট এসে নয় নাম্বার ফ্লোরে থামলো। দরজা খুলে যেতেই মিতুল কোনো কথা ছাড়াই হাতটা দ্রুত ছাড়িয়ে নিলো। আগে আগে বেরিয়ে গেল লিফট থেকে। একেবারে রিকার্ডোর ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। জোহান এসে নক করলো ডোরে। লেনি দরজা খুলে দিলো। লেনিকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মিতুল। লেনি স্বাভাবিক ভাবে হেসে ভিতরে প্রবেশ করতে বললো ওদের।
লেনির হাসি দেখে মিতুলের অপ্রস্তুত ভাবটা কেটে গেল।

রিকার্ডোর ফ্ল্যাটে ঢুকেই মিতুলের মন একদম ভালো হয়ে গেল। প্রথম যেদিন জোহান ওকে নিজের ফ্রেন্ডসদের মাঝে নিয়ে এসেছিল, সেই দিনের মতো ফিল হচ্ছে ওর। সেদিন যারা উপস্থিত ছিল, আজও তারা সবাই আছে এখানে।

খাওয়া দাওয়া শেষে একটা গিফট বক্স দেওয়া হলো মিতুলকে। মিতুল যেহেতু কানাডা থেকে চলে যাচ্ছে সেজন্য জোহানের সব ফ্রেন্ডসরা মিলে এই গিফট দিলো মিতুলকে।
গিফট বক্সটা বড়ো এবং একটু ভারী। কী আছে ভিতরে জানা নেই মিতুলের। বাড়িতে গিয়ে খুলে দেখতে বলা হয়েছে। জোহানের ফ্রেন্ডসগুলোও বেশ আপন হয়ে গেছে মিতুলের। জোহানকে মনে মনে অনেকবার থ্যাঙ্কস জানিয়েছে এই মানুষগুলোর সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। মিতুলের এটা ভেবে শান্তি লাগে যে, জোহান বাড়িতে যেমন সময়ই কাটাক না কেন, ওর ফ্রেন্ডসদের সাথে খুব ভালো সময় কাটাবে ও। ওর ফ্রেন্ডসরা ওকে খুব ভালোবাসে।

পার্টির অনেকটা সময়ই মিতুল জোহানকে দেখেছে চুপিচুপি। ওর দু চোখ শুধু জোহানের দিকেই ছুটে গেছে। জোহানকে দেখার তৃষ্ণা যেন ওর মিটছে না। মনে হচ্ছে জোহানকে সামনে বসিয়ে রেখে সারাদিন দেখলেও এই তৃষ্ণা মিটবে না। এমন কেন হচ্ছে? কানাডা থেকে চলে যাবে বলে?

জোহান, মিতুল রিকার্ডোর ফ্ল্যাট থেকে বের হলো। লিফটে ঢুকে এক কোণে চুপচাপ দাঁড়ালো মিতুল। জোহান ঢুকে বাটন চাপলো। মিতুলের থেকে একটু দূরে দাঁড়ালো জোহান।
মিতুল জোহানের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই কানাডা থেকে চলে যেতে অনেক কষ্ট হবে ওর। জোহানকে না দেখে থাকবে কীভাবে? জোহানকে প্রতিটা মুহূর্তে মিস করবে। একটা মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারবে না জোহানকে। জোহানের হাস্যজ্জ্বল মুখটা সবসময় মনে গেঁথে থাকবে। মিতুল জোহানের দিকে তাকিয়ে থেকেই এগিয়ে এলো জোহানের দিকে। জোহানের সামনে এসে দাঁড়ালো।
জোহান বললো,
“কী?”

মিতুল কিছু না বলে নিজের ডান হাত রাখলো জোহানের বুকের বাঁ পাশে। ঠিক হৃদয় বরাবর। বললো,
“আমি উপলব্ধি করতে পারি তোমার হৃদয়ে কী আছে। তোমার হৃদয়ে আমি আছি। আমার প্রতি ভালোবাসার বিস্তীর্ণ অনুভূতি আছে তোমার মনে। তোমার হৃদয়ের সব জায়গায় তোমার লিটল এঞ্জেলের অস্তিত্ব স্পষ্টতর ছড়িয়ে আছে। আমি উপলব্ধি করতে পারি সেটা। খুব সহজে টের পাই।”

জোহান কিছুটা বিস্ময়াভিভূত। খানিক সময় গভীর চোখে তাকিয়ে রইল মিতুলের দিকে। তারপর বললো,
“আর তুমি? তোমার হৃদয়ের খবর কী?”

মিতুল একটু হাসলো। বললো,
“আমার হৃদয়? আমার হৃদয় তো সবসময় বলে, ‘ভালোবাসি’। জোহানকে খুব ভালোবাসে সেটাই বলে আমার হৃদয়। কেন তুমি টের পাচ্ছ না?”

জোহান মিতুলের হাতটা ধরে বললো,
“শুধু এখন নয়, অনেক আগে থেকেই টের পাই আমি। তোমারও আগে থেকে।”

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here