ছদ্মবেশে লুকানো ভালোবাসা পর্ব ১৮+১৯

0
177

#ছদ্মবেশে_লুকানো_ভালোবাসা
#মৌমি_দত্ত
#পর্ব_১৮

আফরা আর স্পন্দন জুটি যেখানে সব শেষে একে অপরের মনের কথা জেনে এক হলো। ওখানে ইনায়াত কান্না করে দেওয়ার যোগাড়। আফিমের কোন কাজ,, কোন কথা তার মাথায় ঢুকছে না। কফি বানিয়ে যখন কফি নিয়ে গেছিলো ইনায়াত। তখন আফিম চিনি কমের গল্প ফাঁদলো। আর ইনায়াতকে দিয়ে জোড় করে হাফ কফি শেষ করালো। এরপর অবশিষ্ট কফি নিজে খেলো। অফিসের কোন কাজ করলো না নিজে। আর না ইনায়াতকে করতে দিলো। ইনায়াতের ছবি আঁকার চেষ্টা করলো। ইনায়াতের চুল খুলে তা দিয়ে হেয়ার স্টাইলের চেষ্টা করলো। এক কথায় সন্ধ্যা পর্যন্ত আফিমের দুষ্টামি সহ্য করতে করতে ইনায়াতের অবস্থা প্লাস্টিক!! এখন একটু আগেই অফিস শেষ হয়েছে। সব স্টাফরা এক এক করে বের হচ্ছে। ইনায়াত আফিমকে আফিমের বাসায় নামিয়ে দিয়ে নিজের বাসায় যাওয়ার অপেক্ষায় অস্থির।
– স্যার!! বাসায় যাবেন না??
– না তো!! তুমি আর আমি ডিনারে যাবো।
– কিইইইই??
– জ্বীইইই।
ইনায়াতের হাত ধরে আফিম নিয়ে আসলো গাড়ির কাছে। এরপর ইনায়াতকে গাড়িতে উঠতে ইশারা করলো। ইনায়াত উঠে বসলো কাঁদো কাঁদো মুখ করে। পরক্ষনেই ইনায়াতের মাথায় ঘন্টা বাজলো। কি ব্যাপার?? আফিম আজকে এমন করছে কেন?? আর গতকালকে আমার বাসায় কেন গিয়েছিলো?? গিয়েছিলো যখন কিছু বললো না কেন?? হাজারটা ভাবনার পর গাড়ি ব্রেইক কষাতে হুশ ফিরলো ইনায়াতের। গাড়ির জানলা দিয়ে দেখলো নদীর পাড়ে এসে গাড়ি থামানো। আফিমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আফিম মিষ্টি করে হাসলো। কিন্তু আজকে আফিমের এই ভদ্র ব্যবহার আর মিষ্টি হাসিই যেন ভয়ের কারণ। ইনায়াতের মন বলছে ” আফিম কোনভাবে আমাকে অন্য নজরে দেখছে না তো?? ”
– স্যার!! আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। আমাকে ফিরতে হবে।
কাঁপা স্বরে তোতলিয়ে বললো ইনায়াত। আফিমের ভ্রু কুঁচকে এলো।
– কি হয়েছে ইনায়াত?? শরীর খারাপ লাগছে?? ডাক্তারের কাছে যাবে?? কেমন লাগছে তোমার??
ইনায়াত ক্রমশ ভয়ে সিটিয়ে যেতে লাগলো গাড়ির সিটেই।
– না স্যার!! আমি ঠিক আছি। চলুন নামি।
ইনায়াত দ্রুত নেমে এলো গাড়ি থেকে। আফিমের আশপাশে থাকা ইদানীং তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। আফিমের হাবভাব স্পষ্ট জানান দিচ্ছে তার মনের কথা। তবে তা ভুল হতে পারে বলে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে ইনায়াত। আফিম নেমে এলো নিজেকে শান্ত করে। আজকে সে জোসেফের সাহায্য নিয়ে,, লাবিবার প্ল্যানিং মতো ইনায়াতকে বুঝাবে নিজের ভালোবাসার কথা। কিন্তু ভয়ও হচ্ছে। কোনভাবে যদি ইনায়াত তাকে না বলে দেয়?? সমস্যা নেই!! ইনায়াত রিজেক্ট করলে সে অপেক্ষা করবে,, ইনায়াতের মন জয় করে নেবে বলে নিজেকে সাহস দিলো আফিম। ইনায়াত নদীর দিকে স্থির দৃষ্টি দিয়ে ভাবছে আজকেই সে আফিমকে জানিয়ে দেবে যে এই চাকরি আর করবে না। আর আফিম মনে মনে একবার আউড়ে নিচ্ছে কি বলবে ইনায়াতকে।
– স্যার!!
– ইনায়াত!!
ইনায়াত আর আফিম একে অপরকে একসাথেই ডেকে ফেললো। পরক্ষনেই নিজেরা চুপ হয়ে গেলো। অনেকটা সময় নদীর পারে দাঁড়িয়ে রইলো দুইজন মূর্তীর মতো। তখন আফিমই বললো,,
– বসি একটা জায়গায়??
ইনায়াত মাথা নাড়িয়ে সাঁই জানিয়ে বসে পড়লো ঘাসের উপরেই। আফিমও বসে পড়লো ঘাসের উপর ইনায়াতের পাশে কিছুটা দূরত্ব রেখে।
– ইনায়াত!! তোমাকে আমার কিছু বলার ছিলো।
ইনায়াত ঘামাচ্ছে এখন রীতিমতো। হাতের উল্টো পিঠে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে ইনায়াত বললো,,
– আমারও।
আফিম অবাক হলো। ইনায়াত কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না আফিম। তবুও নিজের সব ভাবনা ঝেড়ে নদীর দিকে তাকালো। চোখ বন্ধ করে বলতে লাগলো,,
– ইনায়াত!! আমার পাস্ট লাইফ নিয়ে তোমাকে কিছু জানানোর আছে।
ইনায়াত এবার চমকে ঝট করে তাকালো আফিমের দিকে। আফিমের কাজেকর্মে আফিম যে ইনায়াতের প্রতি কিছু একটা অনুভব করতে শুরু করেছে তা এই কয়েকদিনের কথা গাড়িতে বসে ভেবেই বুঝেছে ইনায়াত। আফিম নিজের ভালো লাগার ইঙ্গিত দেবে আর মুখেও জানাবে আন্দাজ করেই নিয়েছিলো ইনায়াত। কিন্তু এতো জলদি জানাবে তা ভাবতেও পারেনি। কিন্তু ইনায়াত তো শুনতে চায় না আফিমের এই কথাগুলো। ইনায়াত তো চাকরিটা ছেড়ে দেবে জানাতেই চাইছিলো।
– আমাকে এখন যেমন দেখছো। তেমনটা আমি আগে ছিলাম না। তোমার কাছে হয়তো আমি খুব খারাপ। তবে,,,
– স্যার!! আমি সবটা জানি। নীলা আপুর সাথে যা যা হয়েছে সবটাই। আফরা আপুর ঘটনা আর কনা ও মাহিম নামক মানুষগুলো সম্পর্কেও।
আফিমের কথা মাঝপথে থামিয়ে বলে ফেললো ইনায়াত। আফিম চোখ খুলে তাকালো ইনায়াতের দিকে অবিশ্বাস নিয়ে। আফিমের চোখের ভাষা বুঝলো ইনায়াত ভালো ভাবেই।
– আমাকে লাবিবা আন্টি সব বলেছে। তার থেকেই সবটা জানা।
আফিম মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো মাথা চুলকে। ইনায়াত হাতে হাত ঘষে যাচ্ছে ক্রমাগত। কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুই সে শুনতে চায় না। কোনভাবেই শুনতে চায় না।
– তোমাকে আরো কিছু বলার আছে আমার ইনায়াত।
ইনায়াত উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। আফিম ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।
– কি হলো ইনায়াত??
– স্যার!! আমার আপনাকে কিছু বলার আছে।
– আচ্ছা বলবে। আগে আমি বলেনি। আমারটা খুব জরুরি ইনায়াত। তুমি তো কাজ আর কাজ নিয়েই কথা বলবে। কিন্তু আমার তোমাকে নিয়ে কিছু কথা বলার আছে।
ইনায়াত চোখ বন্ধ করে ফেললো অন্যদিকে ফিরে। আফিম মৃদু হেসে বললো,,
– ইনায়াত!! ভালোবাসা কি আমি জানতাম না। কনাকে আসলেই খুব ভালো লাগতো আমার। তাই কনার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম আমি। কিন্তু ওর আসল চেহারা সামনে আসার পর আমি একদম শিউর আমি ভালোবাসা কি জানি না। এতোদিন জানতেও চাইতাম না। কিন্তু আমি যে ভালোবাসার জালে আটকা পড়ে গেছি তাও বুঝতে পারিনি। তুমি ছদ্মবেশ নিয়ে আমার জীবনে লুকায়িত ভালোবাসা হয়ে এসেছো। তা তো আমার জানা ছিলো না। হ্যাঁ ইনায়াত!! আমি এখন ভালোবাসার কিছুটা হলেও বুঝতে শিখতে পেরেছি। আর তার থেকেই বলছি,, আমি ভালোবাসি তোমাকে।
আফিম চোখ বন্ধ করে শেষের লাইন হড়বড়িয়ে বলে দিলো। ইনায়াতের জামা খামচে ধরে থাকা হাত দুটো আলগা হয়ে গেলো। জল ভেজা চোখ খুলে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইলো সে শূন্যে।
– মজার বিষয় কি জানো?? তোমাকে ভালোবাসা আমার এখন না। অনেকটা আগে থেকেই। যে আফিম আহসানকে বাগে আনা সম্ভব হয় না কারোর পক্ষে তার মা ছাড়া। সেই আফিম আহসানকে মিস্টার ইনায়াত বাগে এনেছিলো এটা ভাবা কি বোকামি নয়। তোমার প্রতি আমার আলাদা এক টান আর ভালোবাসা ছিলো। তাই হয়তো হাজার বিরক্তির পরেও না বলতে পারিনি তোমার কথার উপর। তুমি আমাকে সামলাতে পেরেছো কারণ আমারও হয়তো কোথাও না কোথাও সাঁই ছিলো। হ্যাঁ এটাও ঠিক যদি তুমি সত্যিই ছেলে হতে,, তাহলে তোমাকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বানিয়ে রেখে দিতাম। এই ভালোবাসা তখন মনে জন্মাতো না। কিন্তু এখন যখন তোমার সত্য জানলাম,, স্বাভাবিক ভাবেই মনের ভেতর চাঁপা অনুভুতি জেগে উঠলো। ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো আমার মাঝে। এই অনুভুতি আমি স্বীকার করতে চাইনি। বিশ্বাস করো ইনায়াত!! আমি সত্যিই অস্বীকার করার চেষ্টা করেছি এই অনুভুতি। তবুও এই অনুভুতি যখন শেষ হওয়ার পরিবর্তে নিজের ডালপালা বৃদ্ধি করছিলো আমার মাঝে,, তখন তোমার উপর আর নিজের উপর রাগ দেখাতে লাগলাম। আমার জন্মদিনের দিন তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করাটাও এই কারনেই যাতে তুমি দূরে থাকো। আমি ভেবেছি তুমি দূরে থাকলে আমি তোমাকে ভাববো না,, চাইবো না। কিন্তু তুমি যেই আমার সাথে ফর্মালি চলা শুরু করলে,,, আমার থেকে দূরে থাকা শুরু করলে। সেই থেকে আমি যেন পুড়তে লাগলাম। ভালোবাসা আসলে কি তা এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রনার মধ্যে দিয়ে জানলাম আমি।
চুপ হয়ে গেলো আফিম এটুকু বলেই। মাথা উঁচিয়ে তাকালো ইনায়াতের দিকে।
– আমি তোমাকে ভালোবাসি বলে তোমার ভালোবাসা কামনা করছি না ইনায়াত। আমার সীমা তোমাকে ভালোবাসা পর্যন্তই। কেননা তোমার চোখের সামনেই আমি কম খারাপ কাজ করিনি। আর আমি সেই কাজগুলো অস্বীকারও করিনা। তবে আমি ভালো হতে চাই। একটা সুন্দর জীবন বানাতে চাই। তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চাই। তবে সবটাই সম্ভব যদি আমি তোমার মন জয় করতে পারি। আমাকে ভালোবাসা দেবে না আমি জানি। একটা সুযোগ অন্তত দাও যাতে আমি তোমার মন জয়ের চেষ্টা করতে পারি। নিজেকে তোমার কাছে প্রমাণ করতে পারি।
– আমি বাসায় যেতে চাই।
কঠিন স্বরে উত্তর দিলো ইনায়াত। আফিম তাচ্ছিল্য ভরে হাসলো। জানা ছিলো এমন কিছুই হবে। আফিম নিঃশব্দে গাড়ির কাছে এগিয়ে গেলো। আর ইনায়াত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফিমের পিছু পিছু এলো।
.
.
এতোক্ষন এক বডিগার্ড নজর রাখছিলো আফিম আর ইনায়াতের উপর। ঝোঁপের ভিতর থেকে ক্যামেরায় সবটাই ভিডিও হচ্ছিলো ইনায়াত আর আফিমের কার্যক্রম। আফিম আর ইনায়াত চলে যেতেই কল করলো তার বসের কাছে। অপরপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই বললো,,
– স্যার!! আমি ভিডিও করে নিয়েছি।
– সাথের ছেলেটা কি তাহজিব??
– না জন স্যার!! এটা তাহজিব না আমি শিউর।
– তাহলে??
– স্যার!! ইয়াং টাইকুন আফিম আহসান।
– হুম,,, স্পন্দনকে আগে পিছে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়নি??
– না স্যার!!
– ভিডিওটা পাঠিয়ে দে।
অপরপাশের থেকে বাঁকা হেসে জনাথন মুলার ফোন কেটে দিলেন।
– কি মেয়েরে বাবা!! এক মেয়ের জন্য তিনজন ছেলে?? ব্যাপার না!! তিনজনকেই রাস্তা থেকে সড়িয়ে দেবো। এই বাঙ্গালী পরী আমার চাই।
মদের গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়ালেন সামনে কি করা যায় তা ভেবে।
.
.
তাহজিব হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো। আসিফ বিরক্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
– কি হয়েছে আসিফ??
– স্যার!! ইরশাদ মির্জা কোথাও নেই। লোকজন লাগিয়েছি তাকে খুঁজতে।
– কি???
– হ্যাঁ স্যার!! আমি বুঝে পাচ্ছিনা হাঁটতে পারে না মানুষটা কোথাও যাবে কিভাবে??
– নিশ্চয় কেও নিয়ে গেছে।
– তাহলে কে নিয়ে গেলো?? কাজটা আমাদের কোন বডিগার্ডের মনে হয় না। সিসিটিভি ফুটেজও নেই সেই সময়টার।
– শিট!! আমি ভেবেছিলাম অনুশোচনায় আছে ঐ শয়তান। কিন্তু ও যে এভাবে পালিয়ে যাবে।
– নির্ঘাত পালিয়ে নতুন প্ল্যান বানাবে আপনার আর ইনায়াত ম্যামের ক্ষতি করার।
– রুহি কোথায়?? রুহি??
হঠাৎ তাহজিবের এমন প্রশ্নে অবাক হলো আসিফ।
– কেন??
– রুহির ক্ষতি করলে ঐ ইরশাদ?? আমি ছাড়বো না ওকে। রুহিকে কল করো। ওকে আমার এখানেই রাখতে হবে।
আসিফ অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। নিজের আর ইনায়াতের কথা ভুলে তাহজিব রুহির কথা ভাবছে?? কিভাবে সম্ভব??

আফিম আর ইনায়াতের সামনে যা হবে তা ইনায়াতের ইচ্ছায়। আর তাহজিব এইডা আজকের পর্বে কি করলো?? যাই হোক রাতে এক পার্ট দিয়ে দিবো আপিরা। ভালো থেকো,, সাথে থেকো

চলবে,,,#ছদ্মবেশে_লুকানো_ভালোবাসা
#মৌমি_দত্ত
#পর্ব_১৮

আফরা আর স্পন্দন জুটি যেখানে সব শেষে একে অপরের মনের কথা জেনে এক হলো। ওখানে ইনায়াত কান্না করে দেওয়ার যোগাড়। আফিমের কোন কাজ,, কোন কথা তার মাথায় ঢুকছে না। কফি বানিয়ে যখন কফি নিয়ে গেছিলো ইনায়াত। তখন আফিম চিনি কমের গল্প ফাঁদলো। আর ইনায়াতকে দিয়ে জোড় করে হাফ কফি শেষ করালো। এরপর অবশিষ্ট কফি নিজে খেলো। অফিসের কোন কাজ করলো না নিজে। আর না ইনায়াতকে করতে দিলো। ইনায়াতের ছবি আঁকার চেষ্টা করলো। ইনায়াতের চুল খুলে তা দিয়ে হেয়ার স্টাইলের চেষ্টা করলো। এক কথায় সন্ধ্যা পর্যন্ত আফিমের দুষ্টামি সহ্য করতে করতে ইনায়াতের অবস্থা প্লাস্টিক!! এখন একটু আগেই অফিস শেষ হয়েছে। সব স্টাফরা এক এক করে বের হচ্ছে। ইনায়াত আফিমকে আফিমের বাসায় নামিয়ে দিয়ে নিজের বাসায় যাওয়ার অপেক্ষায় অস্থির।
– স্যার!! বাসায় যাবেন না??
– না তো!! তুমি আর আমি ডিনারে যাবো।
– কিইইইই??
– জ্বীইইই।
ইনায়াতের হাত ধরে আফিম নিয়ে আসলো গাড়ির কাছে। এরপর ইনায়াতকে গাড়িতে উঠতে ইশারা করলো। ইনায়াত উঠে বসলো কাঁদো কাঁদো মুখ করে। পরক্ষনেই ইনায়াতের মাথায় ঘন্টা বাজলো। কি ব্যাপার?? আফিম আজকে এমন করছে কেন?? আর গতকালকে আমার বাসায় কেন গিয়েছিলো?? গিয়েছিলো যখন কিছু বললো না কেন?? হাজারটা ভাবনার পর গাড়ি ব্রেইক কষাতে হুশ ফিরলো ইনায়াতের। গাড়ির জানলা দিয়ে দেখলো নদীর পাড়ে এসে গাড়ি থামানো। আফিমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আফিম মিষ্টি করে হাসলো। কিন্তু আজকে আফিমের এই ভদ্র ব্যবহার আর মিষ্টি হাসিই যেন ভয়ের কারণ। ইনায়াতের মন বলছে ” আফিম কোনভাবে আমাকে অন্য নজরে দেখছে না তো?? ”
– স্যার!! আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। আমাকে ফিরতে হবে।
কাঁপা স্বরে তোতলিয়ে বললো ইনায়াত। আফিমের ভ্রু কুঁচকে এলো।
– কি হয়েছে ইনায়াত?? শরীর খারাপ লাগছে?? ডাক্তারের কাছে যাবে?? কেমন লাগছে তোমার??
ইনায়াত ক্রমশ ভয়ে সিটিয়ে যেতে লাগলো গাড়ির সিটেই।
– না স্যার!! আমি ঠিক আছি। চলুন নামি।
ইনায়াত দ্রুত নেমে এলো গাড়ি থেকে। আফিমের আশপাশে থাকা ইদানীং তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। আফিমের হাবভাব স্পষ্ট জানান দিচ্ছে তার মনের কথা। তবে তা ভুল হতে পারে বলে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে ইনায়াত। আফিম নেমে এলো নিজেকে শান্ত করে। আজকে সে জোসেফের সাহায্য নিয়ে,, লাবিবার প্ল্যানিং মতো ইনায়াতকে বুঝাবে নিজের ভালোবাসার কথা। কিন্তু ভয়ও হচ্ছে। কোনভাবে যদি ইনায়াত তাকে না বলে দেয়?? সমস্যা নেই!! ইনায়াত রিজেক্ট করলে সে অপেক্ষা করবে,, ইনায়াতের মন জয় করে নেবে বলে নিজেকে সাহস দিলো আফিম। ইনায়াত নদীর দিকে স্থির দৃষ্টি দিয়ে ভাবছে আজকেই সে আফিমকে জানিয়ে দেবে যে এই চাকরি আর করবে না। আর আফিম মনে মনে একবার আউড়ে নিচ্ছে কি বলবে ইনায়াতকে।
– স্যার!!
– ইনায়াত!!
ইনায়াত আর আফিম একে অপরকে একসাথেই ডেকে ফেললো। পরক্ষনেই নিজেরা চুপ হয়ে গেলো। অনেকটা সময় নদীর পারে দাঁড়িয়ে রইলো দুইজন মূর্তীর মতো। তখন আফিমই বললো,,
– বসি একটা জায়গায়??
ইনায়াত মাথা নাড়িয়ে সাঁই জানিয়ে বসে পড়লো ঘাসের উপরেই। আফিমও বসে পড়লো ঘাসের উপর ইনায়াতের পাশে কিছুটা দূরত্ব রেখে।
– ইনায়াত!! তোমাকে আমার কিছু বলার ছিলো।
ইনায়াত ঘামাচ্ছে এখন রীতিমতো। হাতের উল্টো পিঠে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে ইনায়াত বললো,,
– আমারও।
আফিম অবাক হলো। ইনায়াত কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না আফিম। তবুও নিজের সব ভাবনা ঝেড়ে নদীর দিকে তাকালো। চোখ বন্ধ করে বলতে লাগলো,,
– ইনায়াত!! আমার পাস্ট লাইফ নিয়ে তোমাকে কিছু জানানোর আছে।
ইনায়াত এবার চমকে ঝট করে তাকালো আফিমের দিকে। আফিমের কাজেকর্মে আফিম যে ইনায়াতের প্রতি কিছু একটা অনুভব করতে শুরু করেছে তা এই কয়েকদিনের কথা গাড়িতে বসে ভেবেই বুঝেছে ইনায়াত। আফিম নিজের ভালো লাগার ইঙ্গিত দেবে আর মুখেও জানাবে আন্দাজ করেই নিয়েছিলো ইনায়াত। কিন্তু এতো জলদি জানাবে তা ভাবতেও পারেনি। কিন্তু ইনায়াত তো শুনতে চায় না আফিমের এই কথাগুলো। ইনায়াত তো চাকরিটা ছেড়ে দেবে জানাতেই চাইছিলো।
– আমাকে এখন যেমন দেখছো। তেমনটা আমি আগে ছিলাম না। তোমার কাছে হয়তো আমি খুব খারাপ। তবে,,,
– স্যার!! আমি সবটা জানি। নীলা আপুর সাথে যা যা হয়েছে সবটাই। আফরা আপুর ঘটনা আর কনা ও মাহিম নামক মানুষগুলো সম্পর্কেও।
আফিমের কথা মাঝপথে থামিয়ে বলে ফেললো ইনায়াত। আফিম চোখ খুলে তাকালো ইনায়াতের দিকে অবিশ্বাস নিয়ে। আফিমের চোখের ভাষা বুঝলো ইনায়াত ভালো ভাবেই।
– আমাকে লাবিবা আন্টি সব বলেছে। তার থেকেই সবটা জানা।
আফিম মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো মাথা চুলকে। ইনায়াত হাতে হাত ঘষে যাচ্ছে ক্রমাগত। কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুই সে শুনতে চায় না। কোনভাবেই শুনতে চায় না।
– তোমাকে আরো কিছু বলার আছে আমার ইনায়াত।
ইনায়াত উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। আফিম ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।
– কি হলো ইনায়াত??
– স্যার!! আমার আপনাকে কিছু বলার আছে।
– আচ্ছা বলবে। আগে আমি বলেনি। আমারটা খুব জরুরি ইনায়াত। তুমি তো কাজ আর কাজ নিয়েই কথা বলবে। কিন্তু আমার তোমাকে নিয়ে কিছু কথা বলার আছে।
ইনায়াত চোখ বন্ধ করে ফেললো অন্যদিকে ফিরে। আফিম মৃদু হেসে বললো,,
– ইনায়াত!! ভালোবাসা কি আমি জানতাম না। কনাকে আসলেই খুব ভালো লাগতো আমার। তাই কনার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম আমি। কিন্তু ওর আসল চেহারা সামনে আসার পর আমি একদম শিউর আমি ভালোবাসা কি জানি না। এতোদিন জানতেও চাইতাম না। কিন্তু আমি যে ভালোবাসার জালে আটকা পড়ে গেছি তাও বুঝতে পারিনি। তুমি ছদ্মবেশ নিয়ে আমার জীবনে লুকায়িত ভালোবাসা হয়ে এসেছো। তা তো আমার জানা ছিলো না। হ্যাঁ ইনায়াত!! আমি এখন ভালোবাসার কিছুটা হলেও বুঝতে শিখতে পেরেছি। আর তার থেকেই বলছি,, আমি ভালোবাসি তোমাকে।
আফিম চোখ বন্ধ করে শেষের লাইন হড়বড়িয়ে বলে দিলো। ইনায়াতের জামা খামচে ধরে থাকা হাত দুটো আলগা হয়ে গেলো। জল ভেজা চোখ খুলে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইলো সে শূন্যে।
– মজার বিষয় কি জানো?? তোমাকে ভালোবাসা আমার এখন না। অনেকটা আগে থেকেই। যে আফিম আহসানকে বাগে আনা সম্ভব হয় না কারোর পক্ষে তার মা ছাড়া। সেই আফিম আহসানকে মিস্টার ইনায়াত বাগে এনেছিলো এটা ভাবা কি বোকামি নয়। তোমার প্রতি আমার আলাদা এক টান আর ভালোবাসা ছিলো। তাই হয়তো হাজার বিরক্তির পরেও না বলতে পারিনি তোমার কথার উপর। তুমি আমাকে সামলাতে পেরেছো কারণ আমারও হয়তো কোথাও না কোথাও সাঁই ছিলো। হ্যাঁ এটাও ঠিক যদি তুমি সত্যিই ছেলে হতে,, তাহলে তোমাকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বানিয়ে রেখে দিতাম। এই ভালোবাসা তখন মনে জন্মাতো না। কিন্তু এখন যখন তোমার সত্য জানলাম,, স্বাভাবিক ভাবেই মনের ভেতর চাঁপা অনুভুতি জেগে উঠলো। ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো আমার মাঝে। এই অনুভুতি আমি স্বীকার করতে চাইনি। বিশ্বাস করো ইনায়াত!! আমি সত্যিই অস্বীকার করার চেষ্টা করেছি এই অনুভুতি। তবুও এই অনুভুতি যখন শেষ হওয়ার পরিবর্তে নিজের ডালপালা বৃদ্ধি করছিলো আমার মাঝে,, তখন তোমার উপর আর নিজের উপর রাগ দেখাতে লাগলাম। আমার জন্মদিনের দিন তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করাটাও এই কারনেই যাতে তুমি দূরে থাকো। আমি ভেবেছি তুমি দূরে থাকলে আমি তোমাকে ভাববো না,, চাইবো না। কিন্তু তুমি যেই আমার সাথে ফর্মালি চলা শুরু করলে,,, আমার থেকে দূরে থাকা শুরু করলে। সেই থেকে আমি যেন পুড়তে লাগলাম। ভালোবাসা আসলে কি তা এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রনার মধ্যে দিয়ে জানলাম আমি।
চুপ হয়ে গেলো আফিম এটুকু বলেই। মাথা উঁচিয়ে তাকালো ইনায়াতের দিকে।
– আমি তোমাকে ভালোবাসি বলে তোমার ভালোবাসা কামনা করছি না ইনায়াত। আমার সীমা তোমাকে ভালোবাসা পর্যন্তই। কেননা তোমার চোখের সামনেই আমি কম খারাপ কাজ করিনি। আর আমি সেই কাজগুলো অস্বীকারও করিনা। তবে আমি ভালো হতে চাই। একটা সুন্দর জীবন বানাতে চাই। তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চাই। তবে সবটাই সম্ভব যদি আমি তোমার মন জয় করতে পারি। আমাকে ভালোবাসা দেবে না আমি জানি। একটা সুযোগ অন্তত দাও যাতে আমি তোমার মন জয়ের চেষ্টা করতে পারি। নিজেকে তোমার কাছে প্রমাণ করতে পারি।
– আমি বাসায় যেতে চাই।
কঠিন স্বরে উত্তর দিলো ইনায়াত। আফিম তাচ্ছিল্য ভরে হাসলো। জানা ছিলো এমন কিছুই হবে। আফিম নিঃশব্দে গাড়ির কাছে এগিয়ে গেলো। আর ইনায়াত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফিমের পিছু পিছু এলো।
.
.
এতোক্ষন এক বডিগার্ড নজর রাখছিলো আফিম আর ইনায়াতের উপর। ঝোঁপের ভিতর থেকে ক্যামেরায় সবটাই ভিডিও হচ্ছিলো ইনায়াত আর আফিমের কার্যক্রম। আফিম আর ইনায়াত চলে যেতেই কল করলো তার বসের কাছে। অপরপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই বললো,,
– স্যার!! আমি ভিডিও করে নিয়েছি।
– সাথের ছেলেটা কি তাহজিব??
– না জন স্যার!! এটা তাহজিব না আমি শিউর।
– তাহলে??
– স্যার!! ইয়াং টাইকুন আফিম আহসান।
– হুম,,, স্পন্দনকে আগে পিছে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়নি??
– না স্যার!!
– ভিডিওটা পাঠিয়ে দে।
অপরপাশের থেকে বাঁকা হেসে জনাথন মুলার ফোন কেটে দিলেন।
– কি মেয়েরে বাবা!! এক মেয়ের জন্য তিনজন ছেলে?? ব্যাপার না!! তিনজনকেই রাস্তা থেকে সড়িয়ে দেবো। এই বাঙ্গালী পরী আমার চাই।
মদের গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়ালেন সামনে কি করা যায় তা ভেবে।
.
.
তাহজিব হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো। আসিফ বিরক্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
– কি হয়েছে আসিফ??
– স্যার!! ইরশাদ মির্জা কোথাও নেই। লোকজন লাগিয়েছি তাকে খুঁজতে।
– কি???
– হ্যাঁ স্যার!! আমি বুঝে পাচ্ছিনা হাঁটতে পারে না মানুষটা কোথাও যাবে কিভাবে??
– নিশ্চয় কেও নিয়ে গেছে।
– তাহলে কে নিয়ে গেলো?? কাজটা আমাদের কোন বডিগার্ডের মনে হয় না। সিসিটিভি ফুটেজও নেই সেই সময়টার।
– শিট!! আমি ভেবেছিলাম অনুশোচনায় আছে ঐ শয়তান। কিন্তু ও যে এভাবে পালিয়ে যাবে।
– নির্ঘাত পালিয়ে নতুন প্ল্যান বানাবে আপনার আর ইনায়াত ম্যামের ক্ষতি করার।
– রুহি কোথায়?? রুহি??
হঠাৎ তাহজিবের এমন প্রশ্নে অবাক হলো আসিফ।
– কেন??
– রুহির ক্ষতি করলে ঐ ইরশাদ?? আমি ছাড়বো না ওকে। রুহিকে কল করো। ওকে আমার এখানেই রাখতে হবে।
আসিফ অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। নিজের আর ইনায়াতের কথা ভুলে তাহজিব রুহির কথা ভাবছে?? কিভাবে সম্ভব??

আফিম আর ইনায়াতের সামনে যা হবে তা ইনায়াতের ইচ্ছায়। আর তাহজিব এইডা আজকের পর্বে কি করলো?? যাই হোক রাতে এক পার্ট দিয়ে দিবো আপিরা। ভালো থেকো,, সাথে থেকো
#ছদ্মবেশে_লুকানো_ভালোবাসা
#মৌমি_দত্ত
#পর্ব_১৯

আফিম ইনায়াতকে বাসার সামনে নামিয়ে দিতেই ইনায়াত এক ছুটে চলে গেলো বাসায়। আফিম সেদিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য ভরে হাসলো।
– আমার সাথে থাকতেও কি এখন ভয় করছে তোমার ইনায়াত??
আপনমনেই প্রশ্নটা করলো আফিম। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পৌছালো বাসায়। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে লাবিবা আর জোসেফ। আফিমকে এমন ক্লান্ত,, বিদ্ধস্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে দেখে তাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না কি হতে পারে। আফিম একবার অসহায় চোখে লাবিবা ও জোসেফের দিকে তাকিয়ে সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলো।
এদিকে আফিমের মনের এই হাল। তার উপর ইনায়াতের ঘোর বিপদ। ইনায়াত চাবি দিয়ে দরজা খুলে রুমে ঢুকতেই কেমন অদ্ভুত অনুভব করলো। মনে হলো ঘরে কেও আছে। নিজের এই ভাবনাটাকে পাত্তা দিলো না ইনায়াত। সোফায় গিয়ে বসলো ক্লান্ত ভাবে। চোখ বুজতেই মুখে কাপড় জাতীয় কিছু চেপে ধরলো বলিষ্ট একজোড়া হাত। ইনায়াত ধপ করে চোখ খুলে সেই হাত খামচে,, থাপড়ে মুখের থেকে সড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো। হাত পা ছুড়তে লাগলো। লাভ হলো না। কালো মুখোশ পড়া একটা মুখই চোখের সামনে ছিলো যা আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে আসলো। জ্ঞান হারালো ইনায়াত ক্লোরোফর্মের কারণে। ইনায়াত জ্ঞান হারাতেই ঘরের মধ্যে থেকে বের হয়ে এলো আরো ৩ টা লোক। ইনায়াতকে বস্তা বন্দি করে নিচে নামানো হলো। নিচেই একটু দূরে পার্ক করে রাখা গাড়ির ব্যাকসিটে ইনায়াতকে তুলে বস্তার মুখ খুলে দিলো একজন। অপরজন কল লাগালো তাদের বস জনের কাছে। জন তখন নিজের সিক্রেট বাংলোয় ইরশাদের সাথে বসে আড্ডা দিতে ও মদ খেতে ব্যস্ত। ফোন বেজে উঠতেই হালকা বিরক্তি নিয়ে তা রিসিভ করলো জনাথন মুলার।
– হ্যালো?? বস?? মেয়েটাকে ধরা হয়ে গেছে।
– গুড!! দ্রুত আমার বাংলোয় চলে আসো।
প্রাইভেট নাম্বার বলে গার্ড বা মুলার কারোর চিন্তা হলো না কল করা নিয়ে। কল শেষেই জন ফোন কান থেকে নামিয়ে ইরশাদের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি দিলো।
– তোমার মেয়ে আসছে।
– বাহ জন!! তুমি আসলেই অনেক পাওয়ারফুল।
– আর তুমিও অনেক ভালো বন্ধু। একটা মেয়ের ডিল করেছিলে। এখন দুটো মেয়ে দিচ্ছো।
জনাথনের চেয়ারের পাশেই হাত পা বাঁধা অবস্থায় বেহুশ পড়ে থাকা রুহির দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো জন। জনের এই দৃষ্টি দেখে শয়তানি হাসলো ইরশাদ।
– এখন ইনায়াত এসে পৌছানোর দেরি। ইনায়াতের পিছনেই সুরসুর করে আনাবো দি স্পন্দন আজাদ ও তাহজিব খানকে। খেলা হবে।
আর মৌজ হবে।
ইরশাদ আর জন দুজনেই কুৎসিত হেসে উঠলো। আর বেচারি রুহি তো জানেও না এখনের এই কথাগুলো। দুপুরের দিকে সবে স্নান করে বের হয়েছিলো। এরপর হঠাৎ কেও পেছন থেকে মুখে রুমাল চেপে ধরে আর জ্ঞান হারায় সে।
.
রুহির বাসায় খোঁজ করে এসে আসিফ খবর জানিয়েছে রুহি বাসায় নেই। রুহির ফোনও বন্ধ বলছে। তাহজিব চিন্তায় মাথা চেপে ধরে বসে থাকলো সোফায়। চোখের সামনে ভেসে উঠছে রুহির মুখটা। আজকে সকালে যদি রুহিকে আটকে দিতো,, কোথাও যেতে না দিতো। এই কথাগুলো ভেবেই নিজের প্রতি নিজের রাগ বাড়ছে। আসিফ তাহজিবের পাশেই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আরভিদ সাহেবকে কল করা হয়েছে। কিন্তু মিশনে থাকায় সে ফোন ধরেনি। তাই তাহজিব তাকে খবরটা আপাতত জানানো হবে না বলেই সিদ্ধান্ত নিলো। নিজেকে শক্ত করে উঠে দাঁড়ালো তাহজিব।
– ইরশাদের খোঁজ করো আসিফ। যেভাবেই হোক খোঁজ চায়। ইরশাদকে পেলে রুহিকেও পাবো। আমার রুহিকে যদি ঐ ইরশাদ একবার চোখ তুলেও দেখে,,, আমার হাতেই ওকে জঘন্য ভাবে মরতে হবে।
আসিফ অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো তাহজিবের দিকে। তাহজিবের অজান্তেই তাহজিবের চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রুহির জন্য চিন্তা,,, পাগলামী। এগুলো কি শুধুই অকারণ ?? এগুলোকি ভালোবাসা না??
.
.
স্পন্দন আফরার সাথে কলে কথা বলছে নিজের রুমের মিনি ট্যারেসে বসে৷ তখনই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো কামাল।
– স্যার!! সর্বনাশ!! আফিম আহসান আজকে ইনায়াত ম্যামকে প্রোপোজ করেছে।
কামালের কথাটা কর্ণগোচর হতেই কিছু সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে ছিলো স্পন্দন। পরমূহুর্তেই দাঁড়িয়ে পড়লো মোবাইল কান থেকে সড়িয়ে।
– হোয়াট!! ঐ চরিত্রহীন আফিম আহসান?? ওর সাহস কেমনে হয় আমার পুতুলের মতো বোনকে নিয়ে ভাববার?? গাড়ি বের করো। আমি এক্ষুনি ওর হাড়গোড় ভাঙ্গতে যাবো।
কামাল একবার অস্থিরতা নিয়ে স্পন্দনের মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে যেখানে জ্বলজ্বল করছে কলের অপরপাশের আফরার উপস্থিতি। কামালকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্তি ও রাগ নিয়ে বলে উঠলো স্পন্দন।
– কি সমস্যা?? গার্ডস এক করো। গাড়ি বের করো। ঐ চরিত্রহীন লম্পট ছেলের সব স্বপ্ন আর হাড়গোড় আমি ভেঙ্গে দিবো আজকে।
– স্যার একটা সমস্যা আছে।
কামালের মিনমিনিয়ে বলা কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো স্পন্দন।
– কি সমস্যা??
– স্যার,, ইয়ে মানে,, আসলে,,, আফরা ভাবী আফিম স্যারের বোন।
– তোহ কি হয়েছ,,,
সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে পারলো না স্পন্দন। ধুপ করে আবারও নিজের রকিং চেয়ারে বসে পড়লো স্পন্দন। কাঁপা হাতে একবার মোবাইলটা চোখের সামনে এনে দেখলো। মোবাইলটা কানের কাছে নিয়ে বললো,,
– হ্যালো!! আফরামনি??
– আমার ভাই চরিত্রহীন?? লম্পট?? আমার ভাইয়ের হাড়গোড় ভাঙ্গবেন আপনি?? তাই না??
খুব আদুরি স্বরে জিজ্ঞেস করলো আফরা। আফরার এই স্বর শুনে শুকনো ঢোক গিললো স্পন্দন।
– না মানে আসলে,,, এসব তো আর মিথ্যা না। তাই না??
– রাখেন আপনার সত্যি মিথ্যা। আপনি না আমার ভাইয়ের হাড়গোড় ভাঙ্গবেন বলেছেন। আসেন আপনি,,, ২০ মিনিট সময় দিলাম। যদি ২০ মিনিটে আমার বাসায় না দেখি তাহলে আপনার সাথে সম্পর্ক শেষ। ব্রেকাপ!!
আফরার কথা শুনে চমকালো স্পন্দন। কিসের ব্রেকাপ??
– আজকেই না ভালোবাসার আদানপ্রদান হলো। আজকে আবার কিসের ব্রেকাপ??
– ব্রেকাপ,, শুনেছেন?? ২০ মিনিটে আমার বাসায় এসে যদি আমার ভাইয়ের কাছে সরি না বলেন। তাহলে ব্রেকাপ।
খট করে ফোন কেটে দিলো আফরা। এখন সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। ভাই তার কাছে আগে। আর এদিকে স্পন্দন ক্যাবলার মতো মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছে। পরক্ষনেই একরাশ রাগ নিয়ে বললো,,
– বোন আগে,, বৌ পরে। কামাল গাড়ি বের করো।
কামাল শুকনো একটা ঢোক গিলে নিচে নেমে এলো গাড়ি বের করতে আর স্পন্দন রেডি হতে লাগলো।
.
.
আফিম নিজের রুমে শুয়ে আছে বিষন্ন মনে। আজকে সত্যিই তার আফসোস হচ্ছে। যদি কনার মতো একটা মেয়ের জন্য নিজের জীবন না বিগড়াতো। তাহলে ইনায়াতের মতো একটা ভালো মেয়ের মনে নিজের জন্য জায়গা করতে পারতো সে অনায়াসে। তবুও নিজেকে সাহস দিচ্ছে আফিম ক্রমাগত। কাল থেকে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলে যখন অনুপ্রেরনা দিচ্ছিলো আফিম। তখনই ধুপধাপ পা ফেলে ঘরে ঢুকলো রাগে ফোসফোস করতে থাকা আফরা। ঢুকেই আফিমের খাটে গিয়ে ধুপ করে বসে পড়লো। হঠাৎ কেও খাটে নিজের পাশে বসেছে অনুভব করতেই চমকে সেদিকে তাকালো আফিম। নিজের বোনকে ফোসফোস করতে দেখে অবাক হলো খুব।
– কি হলো বোনু?? তোর অবস্থা এমন কেন লাল লাল??
– ইনায়াতের ভাই হয় বলে জীবন কিনে নিয়েছে স্পন্দন?? উনার সাহস কেমনে হয় তোমাকে চরিত্রহীন আর লম্পট বলার?? আগামী ২০ মিনিটে এসে যদি উনি তোমার কাছে ক্ষমা না চায়। তাহলে উনার সাথে ব্রেকাপ। দেখে নিও ভাইয়া,, সত্যি সত্যি ব্রেকাপ।
আফরার কথাগুলো যেনো মাথার উপর দিয়ে গেলো আফিমের। পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো রাগে ফুসফুস করতে থাকা বোনের দিকে। হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন ঝড় তুললো ” ব্রেকাপ বলতে কি বুঝিয়েছে আফরা?? নিজের সম্পর্কের কথা?? আফরা ও স্পন্দন একে অপরকে চেনে কিভাবে তারা?? তাদের কি সম্পর্ক আছে?? সম্পর্ক হলো কবে?? আর ইনায়াতের ভাই স্পন্দন মানে?? ইনায়াত তো বলেছিলো তার কোন ভাই নেই!! তাহলে স্পন্দন কিভাবে ইনায়াতের ভাই হয়?? “। বেচারি আফরার মাথায় রাগ বলে খেয়ালই হলো না সে কি বলছে আর না খেয়াল হলো ইনায়াত ও স্পন্দনের ভাই বোন হবার ব্যাপারটা।
– কি হয়েছে খুলে বল। এসব শুরু হলো কবে??
আফিমের গম্ভীর গলার আওয়াজে আফরার রাগ টাঁই টাঁই ফিস হয়ে গেলো যেন। আস্তে করে ঘাড় ঘুড়িয়ে আফিমের দিকে তাকাতেই আবার ঘাড় ঝট করে ঘুড়িয়ে নিলো। আফিমের গম্ভীর মুখ দেখে খেয়াল হলো সে এতোক্ষন কি বলেছে। জোড়পূর্বক হেসে আফিমের দিকে তাকালো আফরা।
– আমি আসি ভাইয়া। অনেক পড়া বাকি। খুব ব্যস্ত আমি,, খুব খুব ব্যস্ত।
এই বলে আফরা যেই না উঠতে যাবে। অমনি ডাক দিলো আফিম গম্ভীর আওয়াজে।
– দাঁড়া আফরা। সব না বলে এক পাও বের হবি না রুম থেকে।
আফরা থেমে গেলো। ভাইয়ের কথা অমান্য করে বের হয়ে যাওয়ার সাহস তার নেই। আফরা মাথা নিচু করে অপরাধী ভঙ্গীতে ফিরে তাকালো আফিমের দিকে।
– সবকিছু শুনতে চাই। পাই টু পাই!!
আফরা চোখ বন্ধ করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আল্লাহর নাম নিলো। আসলেই ক্রোধ ভালো না তার প্রমাণ হয়ে গেলো আজকে আবারও।
– ভাইয়া!! ঠান্ডা মাথায় শুনিস! কেমন??
আফরা বলতে শুরু করলো তার ট্রিপে হওয়া এক্সিডেন্টের কথা। আর এক্সিডেন্ট থেকে বাঁচিয়ে নেওয়া স্পন্দনের কথা। এরপর স্পন্দনকে ভালো লেগে যাওয়া। স্পন্দনেরও আফরাকে নিয়ে ভাবার কথা। আজকে সকালে স্পন্দনের ভার্সিটি আসা আর প্রোপোজ করবার কথা। প্রোপোজ এক্সেপ্ট করবার কথা। এরপর একটু আগে আফরার স্পন্দনের সাথে কথা বলার কথা। কামালের মাঝখানে এসে বলা কথা এবং আফরা ফোন কেটে দেওয়া পর্যন্ত সব বললো আফরা। আফিম তো হা। তার পিঠ পিছে এতোকিছু হয়ে গেলো??
বোনের সামনে এভাবে স্পন্দন অসম্মান করেছে দেখে খারাপ লাগলো আফিমের। আবার পরমূহুর্তেই মাথায় আসলো ভাই বোনের ব্যাপারটা। তখনই নিচে গাড়ির আওয়াজ পেলো আফরা আর আফিম।
– ঐ যে,, চলে এসেছে আপনার আশিক আমাকে মারতে।
আফিম বিরক্ত হয়ে বলল আফরার দিকে তাকিয়ে। আফরা কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকালো আফিমের দিকে। আফিম নাহয় সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে নিলো। কিন্তু মা বাবা?? ভেবেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে আফরার। আফিম নিচে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে নিলো নিজেকে। আফরার দিকে তাকিয়ে বললো,,
– চল বোনু,, তোর বিয়ে পাঁকা করেনি।
আফিম বের হয়ে আসলো রুম থেকে। আফরা কিছুক্ষন ক্যাবলার মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। পরমূহুর্তে নিচে কি হচ্ছে ভাবতেই দৌড়ে বের হয়ে আসলো রুম থেকে।

আজকে লাস্টে বলার কিছু নাই। 😑 আমি কেলান্ত আপনাদের কথাগুলো শুনে। ফার্স্ট গল্প ছিলো এটা ভাই। এতেই এতো গালাগালি?? মান সম্মান ধুয়ে দেওয়ার মতো বাংলা গালিও আছে ইনবক্সে। 💙

চলবে,,,
চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here