ঠিক যেনো love Story পর্ব ৫

0
85

#ঠিক_যেনো_love_story
#05
#Esrat_jahan_Esha

রিশাত ঠোঁটের কোনে হাসি এনে বলে আমার মায়ের হাতে বানানো রুটি সবচেয়ে বেশি সুন্দর হয়েছে৷ এতো সুন্দর রুটি আমার মা টা বানাতে পারে আমি তো জানতামই না।
রুহামা তো সেই খুশি। সে প্রথমবার রুটি বানিয়েছে রুটি ছিড়ে দুই টুকরো করে বাবার মুখে পুরে দেয়। নাও বাবাই খাও। এখন থেকে আমি তোমাকে রুটি বানিয়ে খাওয়াবো হি হি হি।
রিমলি রুহামা কে একটু শাসনের সাথে বলে উঠে হইছে হইছে মেয়ে একদম কাজ শিখে গেছে আমাকে আর দরকার নেই৷ এখন আসো আমি তোমাকে খাইয়ে দেই আমার অনেক কাজ আছে৷

রিমলি রুহামা কে খাওয়াচ্ছে সাথে নিজেও খাচ্ছে এমন সময় রিশাত রিমলি কে প্রশ্ন করে আচ্ছা রিমলি তোমার বাড়িতে কে কে আছে?
— এইতো স্যার বাবা মা আর ছোট একটা ভাই সবে ৪ বছর।
— কিন্তু আমি যে শুনলাম তোমার মা নেই।
— জ্বী স্যার ঠিকিই শুনেছেন আমার মা বেঁচে নেই।
— উনি কি তোমার সৎ মা?
রিমলি মাথা নিচু করে উত্তর করে জ্বী স্যার। কিন্তু উনাকে আমি মায়ের মতই দেখি বলতে গেলে মায়ের চেয়েও বেশি।
— কিন্তু উনি কি তোমাকে মেয়ের চোখে দেখে?
— তা জানি না স্যার তবে আমার মা ভালো ছিলো না, উনার জন্য আমি খারাপ হয়েছি।
— মানে কি বলো এসব?
— হ্যা স্যার আমার মা আমাকে ছোট বেলা থেকে এতো পরিমান আদর দিয়েছেন সে চলে যাওয়ায় আমি একদম অচল হয়ে গেছি। খুব আদরে বড় করেছেন কখনো আমাকে দিয়ে এক গ্লাস পানি পর্যন্ত ঢালাননি। যখন আমি অভিমান করতাম রাগ করতাম মা আমাকে বকাঝকা করে নিজের হাতে খাইয়ে দিতো। রাতে আমার পাশে বসে থাকত লাঠি নিয়ে যাতে আমি পড়া রেখে না ঘুমাই। বলুন স্যার যখন ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো তাহলে আমাকে এমন আদর দিয়ে আতুর করার কি দরকার ছিলো?

(যখন ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো তাহলে আমাকে আদর দিয়ে আতুর করার কি দরকার ছিলো। রিশাতের কথাটা শুনে চোখ ছলছল করে উঠে)

কিন্তু স্যার যখন বাবা আমার জন্য বিয়ে করে নতুন মা এনেছিলেন সে আমাকে দিয়ে বাড়ির সব কাজ করিয়েছেন আমার রাগ বা জিদের কোনো দাম ছিলো না প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো তারপর মানিয়ে নিয়েছি। পড়াশুনা নিয়ে কখনো কেউ চাপ দিতো না কেউ রাত জেগে পাশে বসে থাকত না। সব কাজ শেষ করে মন চাইলে পড় না চাইলে না।
বলুন স্যার কে ভালো আমার মা নাকি সৎ মা? আমার মা তো শুধু আদর করেছেন আর আমার সৎ মা আমাকে বাস্তবতা শিখিয়েছে।
— তোমার মায়ের কি হয়েছিলো যে অকালেই মৃত্যু বরন করলেন?
— স্যার সে অনেক লম্বা কাহিনি যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অতীত জিবনের কালো একটা অধ্যায় যা আমার জিবন আমার মায়ের জিবন শেষ করে দিয়েছে।
— বলো শুনি।
— গরীবের কষ্টের কথা শুনে লাভ কি স্যার?
— লাভ কষ্টের কি আছে শুনি বলো।

রিমলি চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করে স্যার আমি একজন কে ভালোবাসতাম তখন আমি সবে ৯ম শ্রেণিতে পড়ি। আমি মায়ের সাথে মামা বাড়িতে বেড়াতে যাই তখন সাফওয়ান নামে একটা ছেলের সাথে আমার পরিচয় হয়।ওর বাবা বলতে গেলে কুটি পতির কাছাকাছি খুব বড়োলোক ছিলো তবে আমার আব্বুও ভালো জব করত তার ইনকাম ভালো ছিলো। সাফওয়ানের নানা বাড়ি আমার মামার বাসার সাথে ছিলো। মামাতো বোনের সাথে প্রথম দেখাতেই ও আমার পিছু নেয়। সাফওয়ান ১বছরের মতো আমার পিছনে ঘুরে বলতে গেলে আমার জন্য পাগল ছিল। ও আমার ঠিকানা নিয়ে আমার মায়ের সাথে যোগাযোগ করে।
মায়ের হাত পা ধরে পড়ে মা আমার অনেক সরল সোজা ছিলো। ওর কান্না দেখে মায়ের মনে দয়া হয় মা চিন্তা করে আদরের দান কখনো ফেলতে নেই সেই চিন্তা করে মা রাজি হয়।
কিন্তু সর্ত দেয় আমার এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলে বিয়ে দিবে। এর আগে আমাকে বিয়ে দিবে না শুধু কথা ফেলে রাখবেন।
সাফওয়ান মায়ের কথা মেনে নেয়। আর পারিবারিক ভাবে কথা দেয় কিন্তু সেইখানে ওর বাবা মা কেউ উপস্থিত ছিলো না উপস্থিত ছিল ওর এক চাচা। মা তাতে রাজি হহনি কিন্তু সাফওয়ান মাকে অনেক বুঝায় বলে আন্টি তারাও রাজি তবে এসএসসি পরীক্ষার পর তারা যোগাযোগ করবে।মাকে ও ছোট বাচ্চার মতো বুঝাতো ওর চাচা বুঝাতো পরে মা রাজি হয়ে যায়।

দুই পরিবার রাজি ছিলো তাই সাফওয়ানের সাথে আমার কথা হতো মাঝে মাঝে ঘুরতে যেতাম। সব মিলিয়ে অনেক আনন্দে দিন কাটত আমাদের।

এসএসসি পরীক্ষা শেষে সাফওয়ান আর আমার বিয়ের কথা পারিবারিক ভাবে আলোচনা হলে সাফওয়ানের বাবা মুখের উপর না বলে দেয় সে কোনো ভাবে এই সম্পর্ক মেনে নিবেন না। এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয় আমি অনেক কান্নাকাটি করি। মাও অনেক কষ্ট পায় আমার কান্না দেখে নিজের উপর সবসময় দোষারোপ করতেন। সব সময় এটা বলে কান্নাকাটি করতেন শুধু আমার জন্য আমার মেয়ের জিবন নষ্ট হয়ে গেছে।
ওদের সাথে ঝামেলা হওয়ার কয়েক দিন পরে আমার মা স্ট্রোক করেন পনেরো দিন পর মা আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যায়৷

আমি তখন খুব ভেংগে পড়ি আমার কোনো হুশ ছিলো না বলতে গেলে। সময় তো আর থেমে থাকে না পরিক্ষার রেজাল্ট দেয় আমার রেজাল্ট খুব ভালো আসে জিপিএ ৫ পেয়েও খুশি না। খুশি কি ভাবে হবো বলেন আমার রেজাল্ট দেখে যে বেশি খুশি ছিলো সেই তো আমার মাঝে নেই৷ মায়ের কতো আশা ছিলো আমাকে নিয়ে মা রাত নেই দিন নেই পাশে পড়ার জন্য বসে থাকত।
ভেবেছিলাম লেখাপড়া আর হবে না এখানেই শেষ।
— তারপর?সাফওয়ানের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল?
— নাহ স্যার ছিলো মা মারা যাওয়ার পাঁচ মাস ছিলো। জানেন স্যার মা মারা যাওয়ার পর সাফওয়ানের জন্য বেঁচে ছিলাম বলতে গেলে ওর সাথে কথা বললে অন্য রকম একটা শান্তি অনুভব করতাম সব কষ্ট ভুলে যেতাম।

পড়ে আব্বু আমার দেখাশুনা করার জন্য নতুন মা নিয়ে আসে। কিন্তু সে আসার পর থেকে ঘরে আরেক অশান্তি শুরু হয়।আমাকে আমার সৎ মা সহ্য করতে পারত না। ঘরের সব কাজ আমিই করতাম আমার নতুন মা পায়ের উপর পা তুলে খেত।
ভেবেছিলাম সাফওয়ানের সাথে পালিয়ে যাবো সেই চিন্তা করেই সাফওয়ানের সাথে দেখা করলাম। কিন্তু যাওয়ার পর,,,,
— কি?
— সাফওয়ান কে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে সাফওয়ান বলে উঠে তোকে নিয়ে পালাব আমি তোকে নিয়ে?
এই কি যোগ্যতা আছে তোর? সবে উঠেছিস ইন্টারে পড়ালেখা শেষ করতে করতে তো জিবন শেষ করে দিবি। আর তোরে বিয়ে করে আমি কি পাবো? ভেবেছিলাম এক বাপের এক মেয়ে এখন তো আর তা নও শুনলাম তোর বাপের চাকরি নাকি চলে গেছে। চলে গেছে কি আমার বাবা খেয়েছে। তোরে বিয়ে করে না পাবো ভালো জামাই আদর না পাবো পরিবারের আদর সব শেষ শোন তোর থেকে ভালো ভালো মেয়ে আমার পিছনে ঘুরে তুই তো আমার বা পায়ের গোরালীর সমানও না।
তুই সরে যা আমার চোখের সামনে থেকে কখনো যেনো তোকে আর আমার আশে পাশে না দেখি।
ওকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু ও বুঝেনি সাফওয়ান আর ওর চাচাতো ভাই রিমন দুজন মিলে সব সময় আমাকে অপমান করত।

২ মাসের মতো অপমান সহ্য করতে করতে আর পারছিলাম না। সাথে আমার সৎ মা সেও সারাক্ষণ বকাঝকা করত বাবার চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে বাবাও আমাকে তেমন সহ্য করতে পারত না। আল্লাহ রহমতের মালিক পড়ে আমার বড় খালা আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায় ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে বাড়িতে খালা আর খালু থাকতেন তারা আমার উপর দয়া করে তাদের কাছে নিয়ে যায়।
নতুন করে আবার পড়া লেখা শুরু করি। ঐখানে গিয়ে আর সাফওয়ানের সাথে যোগাযোগ করিনি মনে অনেক জেদ তৈরি হয় আর কখনো ফিরে যাবো না। কোনো ছেলের সাথে সম্পর্ক করব না।
এরপর খালার বাসায় থেকে ইন্টার কমপ্লিট করি কিন্তু রেজাল্ট আশানুরূপ হয়না।
পরে খালা আমাকে বলে দেখ মা তুই নার্সিং ট্রাই করে ঐখানে সরকারি ভাবে পড়তে পারলে তোর খরচ অনেক কমে যেতো। খালার কথা মতো নার্সিং ট্রাই করি আল্লাহর রহমতে পেয়েও যাই।
এবং আজ এখানে দাড়িয়ে।
— পড়ে সাফওয়ানের সাথে তোমার আর দেখা হয়নি?
— হয়েছে স্যার।
— কোথায়?
— স্যার আপনি যেখানে ছিলেন তার দক্ষিণ পাশে কর্নারের সিটে ছিলো পা ভংগা অবস্থায়।

রিশাত একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিশ্বাস ফেলে বলে উঠে নিয়তি কোথায় নিয়ে যায়।
তবে যাই যা হোক রিমলি তুমি এখন নিজের পায়ে দাড়িছো কখনো আর পিছনে তাকাবে না।
তোমার সম্মান নিয়ে তুমি বেঁচে থাকবে। রিভেঞ্জ অফ ন্যাচার বলতে একটা কথা আছে জানো তো?
আর সেটাই হলো। হয়ত এখন সাফওয়ান তোমাকে দেখে জ্বলছে। তা জানি না স্যার তবে এটা জানি কখনো পিছনে তাকাবো না।
— ঠিক আছে। শোনো তুমি আমার বাড়িতে যেহুতু আছো কখনো অন্যের বাড়ি মনে করবে না। এখন থেকে যতদিন তুমি এখানে আছো রুহামার সাথে বাড়ির সব দায়িত্ব তোমার।

চলবে,,,,,

(আসসালামু আলাইকুম। ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন বানান গুলো একটু বুঝে পড়ে নিবেন)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here