তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে পর্ব_৭

0
1976

তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
পর্ব_৭
#Writer_Nusrat_Jahan_Sara

ঘুমের মধ্যেই অনু টের পাচ্ছে ওকে কেউ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখেছে৷ এমনকি অনুর মুখে তার শ্বাসপ্রশ্বাসও আঁচড়ে পরছে৷ অনু আর দেড়ি না করে ফট করে চোখ খুলে বালিশের নিচ থেকে ফোনটা নিয়ে ফ্ল্যাশ অন করে দেখলো সামান্তা ওকে জড়িয়ে ধরেছে৷ অনু সামান্তাকে টেলে দূরে সরিয়ে দিলো৷

“সুবহানআল্লাহ৷ এমন ভাবে ধরেছিলো যেন মনে হচ্ছিলো এক্ষুনি প্রানটা বেড়িয়ে যাবে৷
🍁
সকাল সকাল সামান্তার কান্নার আওয়াজ শুনে ঘুম থেকে উঠলো অনু। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো এগারোটা বাজে৷ কাল রাত করে ঘুমানোর জন্য আজ উঠতে লেট হয়েছে৷ কিন্তু সামান্তা কেনো কাঁদছে সেটাই বুঝতে পারছেনা৷ মাথা ব্যাথার পাশাপাশি গলাও ব্যাথা করছে৷ অনু সামান্তার কাঁধে হাত রাখতেই সামান্তা কান্নার বেগ ভারিয়ে দিলো৷

“কী হয়েছে সামু৷ কাঁদছিস কেন?
.
সামান্তা চোখের জল মুছে নাক টেনে টেনে বললো,,,

“আমার খুব পেঠে ব্যাথা করছে৷
.
তাই বলে কাঁদবি৷ঔষুধ খেলাইত কমে যাবে৷
.
খেয়েছি কমে না৷
.
দেখ ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে কমে যাবে৷
🍁
ড্রয়িং রুমে সবাই মন খারাপ করে বসে আছে৷ কারন আজ অনুরা ফিরে যাবে৷ছোঁয়া আঁড়চোখে শ্রাবনের দিকে তাকাচ্ছে৷শ্রাবন কয়েকবার ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে শেষে আর তাকায়নি৷

আদনানরা সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেড়িয়ে পরলো৷

বাড়িতে এসে ওরা চার ভাইবোন মন খারাপ করে বসে আছে৷ অনুর মনটাও ভারি হয়ে আছে৷ দুইদিন আবিরের কাছে থেকে থেকে এখন যেন আবিরকে না দেখলে তার ভালো লাগছেনা৷ অনু অনেক ভেবেচিন্তে আবিরকে ইনবক্স করলো৷ অনেক্ষন হয়ে গেছে কিন্তু আবির এখনো অনুর মেসেজের রিপ্লাই করেনি৷ রিপ্লাই করবে দূরের কথা সিনও করেনি৷করবেও না ফেসবুকে যেমন নাম দিয়ে ফেসবুক খুলেছে আবিরতো চিনতেই পারবেনা৷ নিজের পরিচয় দিতেও কেমন লাগছে।অনু মন খারাপ করেই একটা উপন্যাস নিয়ে বসলো৷ উপন্যাসের কয়েকপাতা পড়ে অনু আদনান আর আদিলের কাছে চলে গেলো৷ গিয়ে দেখলো ওরা দুইভাই কী কথা বলছে আর হাসছে৷ অনুকে দেখে দুজনই কথা বলা বন্ধ করে দিলো৷

আদনানঃবোন তোর গলা ব্যাথা কমেছে৷
.
অনুঃওই একটু একটু৷ আচ্ছা তোমরা কী নিয়ে ডিসকাস করছিলে৷
.
আদিলঃকিছুনা
.
অনুঃবলো বলো৷
.
আদনানঃআসলে কাল তোকে পাত্র পক্ষ দেখতে আসবে সেটা নিয়েই কথা বলছিলাম৷
.
অনুঃমজা করছো আমার সাথে৷
.
আদিলঃনা বোন মজা না৷ সত্যি কথাই৷
.
অনুঃকিন্তু এটা তোমাদের কে বললো?
.
আদনানঃএকটু আগে আম্মু বললো৷
.
অনুঃদেখ ভাইয়া এসব নিয়ে মজা করবে না বলে দিলাম৷
.
আদিলঃঠিকাছে আর মজা করব না৷
.
আচ্ছা ভাইয়া তোমাদের খারাপ লাগছেনা?
.
আদনানঃকেন৷
.
মামার বাসা থেকে চলে আসার জন্য৷
.
আদনানঃহ্যাঁ খারাপ তো লাগছেই৷

আদিল কিছু বলার আগেই ওর ফোনে কল আসল৷ অনু উঁকি দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে আরুহির নাম দেখে কিছুটা অবাক হলো৷ আদিল অনুর দিকে তাকাতেই অনু চোখ সরিয়ে এমন ভাব নিলো যেন সে দেখেইনি৷

আদিলঃতোরা থাক আমি একটু কথা বলে আসছি৷
.
অনুঃকে কল দিয়েছে ভাইয়া
.
আদিলঃওই আমার এক ফ্রেন্ড স্পেশাল ফ্রেন্ড আরকি৷
.
আচ্ছ স্পেশাল ফ্রেন্ড!!! বলো বলো কথা বলো৷
🍁
সন্ধ্যায়,,,,,,

ছোঁয়াঃআম্মা নুডুলসের পাকোড়া বানাইয়া দেও৷ কতদিন ধইরা খাইনা৷
.
অনু প্লেট হাতে নিতে নিতে বললো,,,

অনুঃহ্যাঁ মা সাথে তোমার হাতের সেই বিখ্যাত মালাই চা টাও বানিয়ে দিও৷
.
আদনান কিচেনে ঢুকতে ঢুকতে বললো,,,,

আদনানঃআর পাটিসাপটা হলে তো কথাই নেই৷

অনুর মা হাতের খুন্তিটা রেখে ওদের দিকে একটু রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,,,,

“আরেক নবাব কই৷ সেও আসুক এসে হুকুম করুক৷
.
আদিলঃএই তো মা আমি এসে গেছি৷আজ এই ঠান্ডা ঠান্ডা ওয়েদারে পরোটা খেলে মন্দ হয়না৷
.
অনুর মা ড্রয়িংরুমে উঁকি দিয়ে আদনানের বাবাকে বললেন,,,,

“কই গো শুনছো তোমার ছেলেমেয়েরা হুকুম করছে তা তুমি করবেনা৷ তুমিও করো৷ তুমি বাদ যাবে কেন৷
.
হ্যাঁ হুকুম তো করবই৷ আমার হুকুম হলো আজ আমার ছেলেমেয়েরা আমাদের স্ন্যাকস বানিয়ে খাওয়াবে৷
.
আদনানঃকী আমরা৷
.
বাবাঃহুম৷
.
আদিলঃআচ্ছা এটা কোনো ব্যাপারনা৷ আজ নাহয় আমরাই বানাবো৷
.
আদনান কথা বলার মধ্যেই খেয়াল করলো অনু থালা বাসন নিয়ে ভেসিনের দিকে যাচ্ছে৷ আদনান তারাতাড়ি গিয়ে ওর হাত থেকে বাসন নিয়ে নিলো৷

অনুঃকী করছো ভাইয়া এগুলো দাও আমি ধুবো৷
.
আদনানঃআমি ধুয়ে দিব৷ তুই গিয়ে অন্যকিছু কর৷
.
অনুঃকিন্তু কেন
.
আদনানঃতোর এমনিতেই ঠান্ডা লেগেছে এখন আরও পানি লাগালে আরও বেশি ঠান্ডা লাগবে৷ তুই বরং অন্য কিছু কর গিয়ে
.
ছোঁয়াঃআমি পাকোড়া বানাবো৷
.
আদিলঃতাহলে আমি পরোটা
.
অনুঃআমি মালাই চা৷

আদনানঃআর আমি পাটিসাপটা
.
অনুঃব্যস হয়ে গেলো৷ তা আর লেট কিসের কাজে লেগে পরো৷
🍁
আবির হাতে কফি নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে৷ দুইদিন তো ছলে বলে অনুর কাছাকাছি থাকতে পেরেছে আজ কেমন যেন বড্ড একা একা লাগছে৷ অনুকে দেখতে খুব মন চাইছে৷ যতই হোক ভালোবাসে সে অনুকে৷ অনুর কান্না কান্না ফেস, রাগী মুড সবকিছুই আবির খুব মিস করছে৷ ঘড়ির সাথে শাড়ির আঁচলও আবিরই আটকে ছিলো যাতে অনু আবিরের সাথে কথা বলে৷ পাশে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে তাকিয়ে দেখলো সামান্তা এসেছে৷

অনুকে খুব মিস করছো তাই না ভাইয়া৷
.
একদম না৷
.
তাহলে দৃষ্টি লুকাচ্ছো কেন৷ আমার দিকে তাকিয়ে বলো৷
.
ওই আসলে না৷
.
আমি জানি ভাইয়া অনুর জন্য তোমার মনে এখনোও ভালোবাসা আছে যেমনটা আগেও ছিলো৷
.
অনু এটা বুঝলো কই৷
.
বুঝেছে ভাইয়া অনুও তোমাকে খুব ভালোবাসে৷
.
মিথ্যা বলিস কেন৷
.
ওয়েট৷

সামান্তা ওর রুম থেকে একটা ডায়েরি নিয়ে এলো৷

“এটা তো তোর ডায়েরি৷
.
হুম৷ কাল অনু নিজের ডায়েরি মনে করে কিছু লিখে রেখে দিয়েছিলো৷
.
আবির ডায়েরিটা বের করে পড়তে লাগলো

,,,তাকেই ভালোবাসো যে তোমাকে ভালোবাসে৷ আমার ক্ষেত্রে তা ভিন্ন হয়ে গেছে৷আমি যাকে ভালেবাসি সে আর আমাকে ভালোবাসে না৷ ভালোবাসা দূরে থাক দুচোখেও সহ্য করতে পারেনা৷ সামান্য একটু অপমানের জন্য যে আমাকে এত তারাতাড়ি ভুলে যেতে পারে তাকে আমি কী করে ভালোবাসি৷ আবির যখন বিদেশে চলে যায় তখন খুব কান্নাকাটি করি আমি৷ যে আমার দোষে তাকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ আবির চলে যাওয়ার পর থেকে আমি কোনো ছেলের সাথে আজ পর্যন্ত কথা বলিনি৷ শুধু এটাই মনে হতো কথা বললে আবির রাগ করবে৷আমি বাইরে থেকে আবিরের সাথে যতই রুড হইনা কেন ভিতর থেকে তার দিকে একেবারেই দুর্বল৷ আমি আমার ভুল বুঝতে পারছি৷ আর এটার জন্য আমার খুব আফসোসও হয়৷ যে আমি আবিরের মতো একজন প্রেমিককে দূরে টেলে দিয়েছি।সব শেষে বলবো ভালোবাসি আবির।,,,,,,,,

আবির সামান্তার হাতে ডায়েরিটা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললো,,,,

“এখন আমার তাহলে কী করা উচিৎ৷
.
অনুকে দেখবে৷
.
কীভাবে৷
.
ভিডিও কলে৷
.
আচ্ছা কল দে৷
.
সামান্তা ছোঁয়ার হুয়াট্সআ্যাপে ভিডিও কল দিলো৷ ছোঁয়ার কাছেই ফোন থাকার জন্য সে সাথে সাথে কল রিসিভ করে নিলো৷

“হাই সামু৷
.
হাই৷
.
অনু কোথায়
.
অনু ওখানও ওই৷
.
ছোঁয়া ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে অনুকে দেখাচ্ছে৷ অনু তখন চুলায় পাতিল বসিয়ে আদনান আর আদিলকে কী যেন দেখিয়ে দিচ্ছে৷
.
ছোঁয়াঃঅনু সামান্তা কল করেছে৷
.
দে আমার কাছে৷
.
সামান্তার সাথে কথা বলার সময় অনুর চোখ পরলো আবিরের শার্টের দিকে ওর একটু শার্ট দেখা যাচ্ছে৷ সামান্তাকে বিজি বলে ফোন রেখে দিলো৷
.
আবিরঃফোন রাখলে কেনো৷
.
সামান্তাঃঅনু বোধহয় তোমাকে দেখে ফেলেছে তাই কল কেটে দিয়েছে
🍁
অনু,ছোঁয়া,আদনান,আদিল ওরা স্ন্যাকস বানিয়ে ওদের বাবা মার সামনে রাখলো৷ ওদের বাবা মাও খুব খুশি৷ সব কিছুই অনেক ভালো হয়েছে৷ অনু আড়ালে গিয়ে কাশছে৷ আদিল মুখে পাকোড়া দিতে গিয়েও দিলোনা অনুর কাছে গেলো আগে৷

আদিলঃবোন কাশছিস৷
.
হ্যা ভাইয়া খুব কষ্ট হচ্ছে৷
.
বাসায় হিস্টাসিন নেই৷
.
না শেষ হয়ে গেছে৷
.
দাঁড়া আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি৷ একটু ধৈর্য্য ধর৷
.
ভাইয়া খেয়ে তারপর যেয়ো৷
.
আগে আমার বোন তারপর খাওয়া দাওয়া৷
.
আদিলকে বেড়িয়ে যেতে দেখো আদনান ওকে ডাক দিলো৷

“আদিল কই যাস৷
.
অনুর জন্য ঔষধ আনতে৷
.
কী হয়েছে বোনের৷
.
ও কাশছে৷
.
তাহলে দাঁড়া আমিও আসছি৷
.
আদনানও আদিলের সাথে চলে গেলো

ছোঁয়াঃধুর আমার যে কেন অসুখ হয়না৷

ছোঁয়ার কথা শুনে ওর মা বাবা হেসে দিলেন৷ মনের মতো ছেলে মেয়ে পেয়েছেন উনারা৷ বোনদের এত ভালো কেয়ারিং ভাই দিতে পেরে নিজেদের কাছে নিজেদের খুব ভালো লাগছে৷

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওরা দুইভাই ঔষধ নিয়ে হাজির৷ আদনান পাতা থেকে ঔষধ বের করছে আর আদিল পানি আনতে গেছে৷
অনুকে ঔষধ খাইয়ে দিয়ে ওর গায়ে শাল জড়িয়ে দিলো আদনান৷

অনুঃআমি চা টা বানিয়ে আনছি৷

আদিলঃএকদম নড়াচড়া করবি না৷ সোফায় চুপটি মেরে বসে থাকবি৷ আমি চা বানিয়ে আনছি৷ দুধ দিয়ে চা খেলে কাশ আরও বারে৷ আমি লিকারের চা বানিয়ে আনছি৷আর আমরা আজ সবাই লিকারের চা খাবো৷ মালাই চা অনুর অসুখ কমলে তারপর খাবো৷

[আর দুয়েক পর্ব দিয়ে শেষ করে দিবো৷তবে চিন্তা নেই ঘুছিয়েই শেষ দিব?]

চলবে…….

আগের পর্ব https://www.facebook.com/groups/1099991637091029/permalink/1117739135316279/?app=fbl

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here