তোমাতেই রহিব বিলীন পর্ব ৬

0
87

#তোমাতেই_রহিব_বিলীন
#পর্ব_৬
#নিশাত_জাহান_নিশি

“হাতের রিংটা কোথায়? এই? তুমি কি ভেবে নিয়েছ এনগেজমেন্টের রিংটা তুমি পড়বে না? গোপনে আরো কয়েকজনের সাথে ডেইট প্লাস রিলেশান করে বেড়াবে? এতোটাই ক্যারেক্টারলেস তুমি?”

অপমানে, লজ্জায়, ঘৃনায় মাথা নিচু করে ফুঁফিয়ে কাঁদছি আমি। মাথা তুলে উনার দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত কথা গুলোর প্রতিত্তুরে কোনো রূপ প্রতিবাদ করার ক্ষমতাটা ও পর্যন্ত কুলোতে পারছি না আমি। কি এমন অন্যায় করেছিলাম আমি? যার প্রতিশোধ উনি এতোটা নির্দয়ভাবে নিচ্ছেন? এতগুলো মানুষের সামনে আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছেন? আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি, আসলে আমাকে সবার সামনে হেনস্তা করার একটা ছুঁতো খুঁজছিলেন মাএ উনি। আর সেই ছুঁতোটা হলো সামান্য রিং পড়া নিয়ে! যদি ও এই ক্ষেএে দোষটা আমারই ছিলো। আমিই উনাকে সুযোগ করে দিয়েছি আমাকে হেনস্তা করার জন্য। এই ভয়ঙ্কর লোকটা যদি কোনো রকমে জানতে পারেন, রিংটা আমি ইচ্ছে করে হাত থেকে ফেলে দিয়েছি। জানি না উনি ঠিক কি কি করবেন আমার সাথে। সবার সামনে হয়তো আমার গাঁয়ে হাত তুলতে ও দ্বিধাবোধ করবেন না!

আমার মৌনতা দেখে আহনাফ খড়তড় কন্ঠে আমার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বললেন,,

“রিংটা কোথায়? লেট মি আনসার ডেম ইট।”

প্রবল আতঙ্ক নিয়ে আমি অশ্রুসিক্ত চোখে আহনাফের দিকে তাকালাম। কম্পিত চোখে আমি গলা জড়ানো কন্ঠে আহনাফকে বললাম,,

“রিরিরিং বাসায়। সসকালে বলেছিলাম, রিরিংটা ক্যারি করতে আমার প্রবলেম হয়।”

“সামান্য একটা রিং তোমার ক্যারি করতে প্রবলেম হয়? লাইক সিরিয়াসলি প্রভা? এই? তুমি কি বোকা পেয়েছ? মানে আমাকে যা বুঝানো হবে, আমি ঠিক তাই বুঝব?”

কথার পিঠে কথা আওড়াতে পারছিলাম না আমি। চুপ করে অপমান সহ্য করা ছাড়া আপাতত দ্বিতীয় কোনো অপশন আমি খুঁজে পাচ্ছি না। না জানি এই রিংয়ের জন্য আর কি কি সহ্য করতে হয় আমায়। কোনো রকমে এই হিংস্র আহনাফের খপ্পড় থেকে বেঁচে ফিরতে পারলেই আমাকে যতো দ্রুত সম্ভব আবারো ঐ বাড়িতে যেতে হবে একবার। যে করেই হোক রিংটা খুঁজে বের করতে হবে। সত্যিই জানি না, রিংটা এখনো একই জায়গায় আছে কিনা! আদৌ চোর, ডাকাতের হাতে রিংটা পড়েছে কিনা!

আমার সমস্ত জল্পনা কল্পনায় ছেদ ঘটিয়ে আহনাফ ভয়ঙ্কর কন্ঠে পুনরায় বললেন,,

“ইউ নো হোয়াট? একটা মেয়ের যখন এনগেজমেন্ট হয়ে যায়, তখন তাকে মাস্ট বি হাতে রিং পড়ে থাকতে হয়। এটা একটা রিচুয়েল। তোমার কি মনে হচ্ছে না? তুমি প্রতিটা রিচুয়েল ভঙ্গ করে আমার ধৈর্য্যের সমস্ত লিমিট ক্রস করছ?”

হেচকি তুলে কেঁদে আমি আহনাফের তেজী দুচোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বললাম,,

“আর এই ভুলটা হবে না আহনাফ। সত্যি বলছি, আমি এবার থেকে রোজ হাতে রিং পড়ে থাকব৷ দয়া করে আপনি শান্ত হউন। রাগটাকে একটু কন্ট্রোল করুন। দেখুন, লোকজন আমাদের দেখছেন। আমাকে, আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করছেন। প্লিজ নিজেকে আর হাসির পাত্র করে তুলবেন না। আমাকে ও আর ইনসাল্ট করবেন না, প্লিজ।”

আমার হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে আহনাফ রাগে ফুসফুস করে আশেপাশের লোকজনদের দিকে তাকালেন। সবাই আমাদের দিকে আড়চোখে চেয়ে হাসছেন। আহনাফের অগ্নিঝড়া দৃষ্টিতে ব্যাপক ভয় পেয়ে লোকজন তড়িৎ গতিতে আমাদের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। মিনিট পাঁচেক পর আহনাফ একবার আমার দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আচমকাই উনার পাশে থাকা চেয়ারটা টেনে ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়লেন। সামনের, পেছনের চুল গুলো টেনে উনি প্রখর রাগ এবং বিরক্তি প্রকাশ করছেন। প্যান্টের পকেট থেকে টিস্যু বের করে কপালে উদয়স্ত বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো উনি মুছে নিলেন। চশমাটা চোখ থেকে খুলে উনি উচ্চ শব্দে টেবিলের এক পাশে চশমাটা রাখলেন। আমি, তিস্তা এবং নির্ঝড় ভাই উনার কার্যকলাপ দেখে ভয়ের পাশাপাশি অবাক ও হচ্ছি। ভাবতে পারি নি আসলে, লোকটা এতো শীঘ্রই আমার কথা মেনে নিবেন। রৌদ্রমূর্তি পরিত্যাগ থেকে বেগতিক শিথিলতার রূপ নিবেন। কপালটা আলতো হাতে মাসাজ করে উনি আচমকা আমার দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে উনার পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে বললেন,,

“সিট ডাউন।”

আশ্চর্যিত চোখে আমি আহনাফের দিকে চেয়ে আছি। বিশ্বাস ই হচ্ছে না, উনি আচমকা আমার সাথে এতোটা স্বাভাবিক আচরন করছেন! কিছু সময়ের জন্য মনে হচ্ছিলো, আমি হয়তো কল্পনার জগতে দিব্যি ঘুড়ে বেড়াচ্ছি! আমার অবাক করা ভাবভঙ্গি দেখে আহনাফ রূঢ় কন্ঠে পুনরায় বললেন,,

“কথা কানে যাচ্ছে না? বসতে বলেছি।”

তড়িৎ বেগে ছুটে এসে আমি আহনাফের পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়লাম। চোখ থেকে বাহিত হওয়া জলরাশি কতক্ষনে শুকিয়ে ত্বকের সাথে মিশে গেছে তা ঠিক মনে করতে পারছি না আমি। তিস্তা এবং নির্ঝড় ভাই গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন। নির্ঝড় ভাই তো পারছেন না, চোখ দিয়ে আহনাফ শেখকে গুলি করে একদম খুলি উড়িয়ে দিতে। আমার পারমিশান পেলেই হয়তো উনি এই অতি অত্যাবশকীয় কাজটা দ্রুততার সহিত পালন করতেন! যাই হোক, আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আহনাফ এবার তিস্তা এবং নির্ঝড় ভাইয়ের দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,,

“তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেন? প্লিজ সিট।”

নির্ঝড় ভাই কিঞ্চিৎ রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,,

“স্যরি ভাইয়া। বসার ইচ্ছেটা আর নেই। উই আর গো নাও।”

তিস্তার হাত ধরে নির্ঝড় ভাই আমাদের সম্মুখ থেকে প্রস্থান নেওয়ার পূর্বেই আহনাফ পেছন থেকে নির্ঝড় ভাইয়ের ডান হাতটা চেঁপে ধরে ম্লান কন্ঠে বললেন,,

“আই থিংক, তুমি আমার বয়সে ছোট হবে। বড় ভাই হিসেবে বলছি, প্লিজ হ্যাভ ইউর সিট।”

নির্ঝড় ভাই হীন কন্ঠে বললেন,,

“বড় ভাই হলে নিশ্চয়ই এতোটা রুড বিহেভ করতে পারতেন না? অযথা সিনক্রিয়েট করতেন না। ছোট হলে ও আমার কথার যথেষ্ট ইম্পর্ট্যান্টেস দিতেন।”

“যা হয়েছে ভুলে যাও। আমি মনে করি, হাত ধরার পর আর কোনো কথাই থাকতে পারে না।”

দম নিয়ে আহনাফ পুনরায় বললেন,,

“আমি কফি অর্ডার করছি। ট্রিট আজ আমার তরফ থেকে। না খেয়ে তোমাদের কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। এডভাইজ করলাম।”

ভ্রু উঁচিয়ে নির্ঝড় ভাই আমাকে ইশারা করে বললেন,,

“উনি কি পাগল? সাইকো টাইপ? এই ভালো তো এই খারাপ?”

মুখটা অমবস্যার মতোন কালো করে আমি মাথা নাঁড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালাম। পরমুহূর্তে আমি মুখে হাসি ফুটিয়ে ঐ পাশ থেকে নির্ঝড় ভাইকে ইশারা করে বললাম যা হচ্ছে মেনে নিতে, আর তিস্তাকে নিয়ে দ্রুত বসে পড়তে। তিস্তা ও ইশারা করে নির্ঝড় ভাইকে বলছে শান্ত হতে, রাগটা কন্ট্রোল করতে, যা হয়েছে ভুলে যেতে। শেষ পর্যন্ত আমাদের দুজনের চাপে নিরুপায় হয়ে নির্ঝড় ভাই আহনাফের প্রস্তাবে রাজি হলেন। তিস্তাকে নিয়ে আমাদের মুখোমুখি চেয়ার দুটোতে বসে পড়লেন। আহনাফ জোর পূর্বক হাসি টেনে নির্ঝড়ের দিকে চেয়ে বললেন,,

“বলো? কি কফি অর্ডার করব? ক্যাপাচিনো অর ল্যাটে কফি?”

নির্ঝড় ভাই তিস্তার দিকে চেয়ে পুনরায় আহনাফের দিকে চেয়ে বললেন,,

“ক্যাপাচিনো।”

আহনাফ এবার তিস্তার দিকে চেয়ে সম্ভাবনা নিয়ে বললেন,,

“আই গেইস তুমি ও ক্যাপাচিনো?”

তিস্তা ম্লান হেসে মাথা নাঁড়ালো। চোখ ঘুড়িয়ে আহনাফ আমার দিকে তাকাতেই আমি তাড়াহুড়ো করে মাথাটা নিচু করে নিলাম। ভেবেছিলাম আহনাফ হয়তো আমাকে ও জিগ্যেস করবেন, আমি কোন কফিটা খাবো বা আমার কোন কফিটা পছন্দ। কিন্তু না! উনি যে আমার ভাবনা চিন্তায় এক বালতি জল ঢেলে দিবেন তা আমি পূর্ব থেকে জানলে হয়তো অহেতুক সময় নষ্ট করে ভাবনা চিন্তায় ডুব দিতাম না। আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আহনাফ উচ্চ আওয়াজে ওয়েটারকে ডাকতেই ওয়েটার এসে হাজির হলেন। আহনাফ অণর্গল কন্ঠে অর্ডার করে দিলেন,,

“তিনটে ক্যাপাচিনো আর একটা… ল্যাটে কফি।”

ওয়েটার প্রস্থান নিলেন। আমি আশ্চর্যিত চোখে আহনাফের দিকে চেয়ে উনাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে বললাম,,

“ল্যাটে কফি কার জন্য?”

আহনাফ অন্য পাশ ফিরে ভাবশূণ্য ভঙ্গিতে বললেন,,

“তোমার জন্য!”

“কিভাবে জানলেন? ল্যাটে কফি আমার ফেভারিট?”

আহনাফ আমার দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বেশ সাবলীল কন্ঠেই বললেন,,

“আই গেইস তোমার পড়ালেখা ছেড়ে ড্রামা, থিয়েটার, সিনেমা বা সিরিয়াল টাইপ কিছু করা উচিত। এই বিষয় গুলোতে তুমি খুব এক্সপার্ট। একটা ইউটিউব চ্যানেল তো খুলে বসছ না কেনো? চাইলেই কিন্তু তুমি এবং তোমরা ফ্রেন্ডরা মিলে ড্রামা এবং সিরিয়ালের বিভিন্ন স্ক্রিপ্ট তৈরী করে ইউটিউবে শেয়ার করতে পারো। বিজনেসটা কিন্তু ভালোই জমবে!”

দাঁতে দাঁত চেঁপে আমি উনাকে কিছু বলার পূর্বেই উনি টেবিলের তলায় আমার বাঁ হাতটা চেঁপে ধরে চোয়াল শক্ত করে আমার কানে ফিসফিসিয়ে বললেন,,

“শাট ইউর মাউথ। একটা টু শব্দ ও যেনো বের না হয়। তোমার জন্য আমি এগেইন ভায়োলেন্ট হতে পারব না। পাবলিক প্লেইসে উইদাউট এ্যানি রিজন সিনক্রিয়েট করতে পারব না। লাইফে ফার্স্ট টাইম তোমার কারণে আমি পাবলিশ প্লেইসে ঠাট্টার পাত্র হয়েছি। সো প্লিজ, শাট ইউর মাউথ।”

ব্যাথায় খানিক কুঁকিয়ে উঠে আমি তেজী কন্ঠে বললাম,,

“হাতটা ছাড়ুন প্লিজ। পেইন হচ্ছে। আপনি এতো হিংস্র কেনো বলুন তো? দয়া, মায়া নেই আপনার মধ্যে?”

আহনাফ আমার হাতটা ছেড়ে তেজী দৃষ্টি পাল্টে শান্ত এবং স্বাভাবিক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। খুব অমায়িক উনার এই দৃষ্টি। চশমা ছাড়া লোকটাকে দেখতে অতোটা ও খারাপ লাগে না। তবে চোখে চশমা পড়লে দেখতে অত্যধিক আকর্ষনীয় লাগে। খুব ড্যাশিং একটা লুক আসে। তখন কোনো মতেই উনার থেকে দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব হয়ে উঠে না। যদি ও এই চশমা পড়ার কারণেই আমি উনাকে চাশমিশ ডাকি। তবুও এই চশমাটার জন্যই লোকটাকে এতো ড্যাশিং এন্ড হ্যান্ডসাম লাগে!

আচমকা কি হলো জানি না। আহনাফ উনার প্যান্টের পকেট থেকে টিস্যুর প্যাকেটটা বের করে ওখান থেকে একটা টিস্যু নিয়ে খুব যত্নে এবং প্রেম মাখানো দৃষ্টিতে আমার কপালে উদয় হওয়া বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো মুছে দিতে গিয়ে ও হঠাৎ থেমে গেলেন। সংকোচ বোধ করে উনি আমার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্য পাশ ফিরে টিস্যুটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে খানিক গলা ঝাঁকিয়ে গুরু গম্ভীর কন্ঠে বললেন,,

“টেইক ইট। ঘামটা মুছে নাও। এন্ড অলসো টেয়ারস।”

উনার উপকারী মনোভাবকে গাঁয়ে না মেখে আমি ক্ষীণ কন্ঠে বললাম,,

“ইট’স ওকে। আপনার উপকার আমার লাগবে না। উড়না আছে না? আমার উড়নাই যথেষ্ট!”

“হোয়াট দ্যা হ্যাল!”

ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে উনি আমার দিকে তাকাতেই ওয়েটার কফি নিয়ে এলেন। আমি শুকনো ঢোক গিলে উনাকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললাম ওয়েটার এসেছে। আমার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে উনি ওয়েটারের দিকে তাকালেন। ঐদিকে তিস্তা এবং নির্ঝড় ভাই চনমনে ভঙ্গিতে নিজেদের মধ্যে প্রেমালাপে মগ্ন ছিলেন অনেকক্ষণ যাবত। ওয়েটার আসতেই তাদের প্রেমে মনে হলো বিঘ্ন ঘটল। বিরূপ মুখ ভঙ্গি দেখে ঠিক তাই মনে হলো!

কফি খেয়ে প্রায় আধ ঘন্টার মধ্যে আমরা ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হয়ে এলাম। আহনাফ মুডি ভাব নিয়ে তিস্তা এবং নির্ঝড় ভাইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। যাওয়ার পূর্বে আমাকে পই পই করে হুমকি দিয়ে গেলেন ১০ মিনিটের মধ্যে গাড়িতে এসে বসতে। আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই উনি অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। উনার মুখের উপর কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলা না। তাই আরো কিছুক্ষন থাকার জন্য কোনো রকম আবদার করি নি।

আহনাফের হয়ে আমি তিস্তা এবং নির্ঝড় ভাইয়ের থেকে স্যরি চেয়ে নিলাম। নির্ঝড় ভাই যদি ও এখনো মন থেকে আহনাফকে ক্ষমা করতে পারেন নি, তবে তিস্তা এবং আমার চাপে পড়ে উনি লোক দেখানো ক্ষমাটা ঠিক করে দিয়েছেন। আহনাফের কথা মতো প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যেই আমি তিস্তা এবং নির্ঝড় ভাইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ার বিপরীত পাশে পার্ক করা আহনাফের গাড়িটায় উঠে বসলাম। ড্রাইভিং সিটে উনার পাশে বসতেই উনি ইশারা করে বললেন সিট বেল্ট পড়তে। উনার কথা মতো সিট বেল্টটা লাগাতেই উনি মুহূর্তের মধ্যে ফুল স্পীডে গাড়িটা স্টার্ট করে দিলেন। আড় চোখে উনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই বুঝতে পারলাম উনার রাগ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ভয়ঙ্কর রাগী ভাবটা এখন আর মুখ মন্ডলে নেই। আই হোপ, এখন উনাকে যাই প্রশ্ন করি না কেনো, উনি ঠান্ডা মাথায় সবক’টা প্রশ্নের উত্তর দিবেন। সুযোগ বুঝে ইতস্তত বোধ করে আমি উনার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বললাম,,

“আচ্ছা? আপনি কি আমাকে ফলো করছিলেন?”

উনি গম্ভীর ভাব নিয়ে বললেন,,

“তোমাকে ফলো করার এক রত্তি ইচ্ছে ও নেই আমার!”

“তাহলে ক্যাফেটেরিয়ায় এলেন কেনো? আমার সন্ধানে? নাকি অন্য কোনো কাজে?”

এক হাতে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে কন্ট্রোল রেখে উনি অন্য হাত দিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে অবিশ্বাস্যভাবে উনার পড়িয়ে দেওয়া এনগেজমেন্ট রিংটা আমার মুখের সামনে ধরে ভ্রু যুগল উঁচিয়ে বললেন,,

“চিনতে পারছ? এই মূল্যবান জিনিসটা দিতেই তোমার সন্ধানে বের হয়েছিলাম! ফার্স্টে কলেজ যেতে হয়েছে দেন কলেজ থেকে কারো মাধ্যমে ক্যাফেটেরিয়ায় যেতে হয়েছে।”

শুকনো কন্ঠে আমি রিংটার দিকে চেয়ে বললাম,,

“কোথায় পেলেন এটা?”

আহনাফ দাঁতে দাঁত চেঁপে বললেন,,

“যেখানে তুমি ছুড়ে ফেলেছিলে, ঠিক সেখানেই!”

ছোঁ মেরে আমি উনার হাত থেকে রিংটা আমার হাতে নিয়ে সাইড ব্যাগে রিংটা ঢুকাতেই আহনাফ তেজর্শী কন্ঠে বললেন,,

“রিংটা হাতে পড়ো বলছি, ইস্টুপিট গার্ল।”

থমতম খেয়ে আমি তাড়াহুড়ো করে হাতে রিংটা পড়ে নিলাম। কিছু সময় পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই আমি শান্ত দৃষ্টিতে আহনাফের দিকে চেয়ে পুনরায় উনাকে প্রশ্ন ছুড়ে বললাম,,

“ক্যাফেটেরিয়ায় এভাবে সিনক্রিয়েট করেছিলেন কেনো? আমাদের সম্পূর্ণ কথা না শুনেই এতোটা ভায়োলেন্ট হয়ে গিয়েছিলেন কেনো?”

“অযথাই আমি সিনক্রিয়েট করি নি। তোমার দু দুটো ফল্ট আমার চোখে ধরা পড়েছে। প্রথমত তুমি কলেজে যাবে বলে ও কলেজে যাও নি। ফ্রেন্ডের বয়ফ্রেন্ডের সাথে হ্যাংলার মতো দেখা করতে চলে গেলে! দ্বিতীয়ত, প্রধান এবং সব’চে বড় ফল্টটা হলো, “রিং।” আমি সকালেই আঁচ করতে পেরেছিলাম, তুমি রিংটা নিশ্চয়ই লুকিয়ে রেখেছ নয়তো কোথাও ছুঁড়ে ফেলেছ। আমার আন্দাজ কিন্তু সঠিক নিশানাতেই লেগছিলো। তুমি সত্যিই সত্যিই রিংটা ছুড়ে ফেলছিলে। বিয়েটা ভাঙ্গার জন্যই তুমি একের পর এক ড্রামা ক্রিয়েট করছ। তোমার উদ্দেশ্য হয়তো এই জন্মে কখনো সফল হবে না মিসেস প্রভা। আহনাফ শেখ এই উদ্দেশ্য কখনো তোমাকে সফল হতে দিবে না। আই হোপ, তুমি বুঝতে পেরেছ!”

থমকে গেলাম আমি। হাতের রিংটা বার বার নাড়াচাড়া করে আমি কন্ঠে বিষাদের ছাপ ভর করে বললাম,,

“হাতে ধরে আপনি আমার জীবনটা নষ্ট করছেন আহনাফ। কেনো করছেন এমন বলুন তো? আমি আপনার কোন ক্ষতিটা করেছিলাম?”

“ক্ষতি? শুধু ক্ষতি বলছ? তুমি আমার লাইফটাকে জাস্ট নরক করে দিয়েছিলে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছিলে। বাঁচার আশা দুরাশা হয়ে উঠেছিলো। ভাগ্যিস নেহাল ছিলো!”

“সব আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আহনাফ। বার বার মনে হচ্ছে আপনি ভুল করছেন। অন্য কারো সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলছেন। লাস্ট আমি আপনাকে এক বছর পূর্বে দেখেছিলাম। আপুর বিয়েতে। এরপর থেকে না আপনার সাথে না আমার কখনো যোগাযোগ হয়েছে না দেখা হয়েছে। যেখানে আমাদের মধ্যে কোনো কমিউনিকেশন ই ছিলো না, সেখানে আমি আপনার ক্ষতি করব কিভাবে বলুন?”

ইতোমধ্যেই গাড়ি এসে আমাদের বাড়ির সামনে থেমে গেলো। আহনাফ অন্য পাশ ফিরে রাগী কন্ঠে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

“গেট আউট অফ মাই কার। আগামী এক সপ্তাহ ও তোমার মুখ দেখতে চাই না আমি। মাইন্ড ইট!”

কথা বাড়ালাম না আমি। অপমানিত হয়ে আমি চোখের কোণে জল নিয়ে তড়িঘড়ি করে উনার গাড়ি থেকে নেমে এক দৌঁড়ে বাড়ির মেইন গেইটে ঢুকে পড়লাম। পিছু ফিরে একবারের জন্যে ও উনার দিকে তাকালাম না। তাকাতে ও চাই না ঐ লোকটার দিকে। এক সপ্তাহ কেনো? আগামী ১ বছর ও আমি উনার মুখোমুখি হতে চাই না।

,
,

কেটে গেলো মাঝখানে ১ সপ্তাহ৷ এই এক সপ্তাহে অন্তত একবারের জন্যে ও আহনাফের কথা আমার মনে পড়ে নি। না উনার সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। এমনটা না যে, উনি ও আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। আমাকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। উনি ও আমার মতোন দারুন শক্ত মনের পরিচয় দিয়েছিলেন। কোনো ভাবে এক বারের জন্যে ও আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন নি!

শনিবার আজ। বিকেল ৫ টা বাজতেই ঐ বাড়ি থেকে ফোন কল আসতে আরম্ভ করল। নেহাল ভাই আজ দেশে ফিরছেন! সেই খুশিতে ঐ বাড়ির প্রত্যেকেটা সদস্য আত্নহারা। আহনাফ তো বিকেল হতেই এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেছেন, নেহাল ভাইকে পিক করতে। আম্মু সহ আমি রেডি হয়ে বিকেল ঠিক ৫ঃ৩০ বাজতেই ঐ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। যদি ও আমার ইচ্ছে নেই ঐ বাড়িতে যাওয়ার, আহনাফকে ফেইস করার। তবু ও আপু, জিজু এবং আঙ্কেলের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে আমাকে রাজি হতে হলো!

#চলবে….?

(রি-চেইক করা হয় নি। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here