তোমাতেই রহিব বিলীন পর্ব ৯

0
87

#তোমাতেই_রহিব_বিলীন
#পর্ব_৯
#নিশাত_জাহান_নিশি

আহনাফ হতবিহ্বল চোখে আমার দিকে তাকালেন। চোখ দুটো অসম্ভব রকম লাল হয়ে চোখের কোটরে জল জমেছে উনার। যেকোনো মুহূর্তে শ্রাবণ ধারা বইবে। সেই ধারায় বুঝি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর!

সমগ্র মুখমন্ডলে বিষাদের ছাপ ফুটিয়ে আহনাফ আমাদের সবাইকে উপেক্ষা করে তড়িৎ বেগে রুম থেকে প্রস্থান নিলেন। আমি উনার যাওয়ার পথে নির্লিপ্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে চেয়ে আছি। কেনো জানি না, উনাকে এতোটা বিষন্ন দেখতে আমার বুকটা আকস্মিক ভাবে এক নিদারুন ব্যাথায় কেঁপে উঠছে। বদরাগী স্বভাবেই লোকটাকে দেখতে অভ্যস্ত আমি। বিষন্ন মনে দেখতে একদমই অভ্যস্ত না। মন ভেঙ্গেছে উনার খুব জঘন্যভাবে। আমি ভেবে উনি যাকে ভালোবেসেছিলেন, যাকে মন প্রাণ দিয়ে চেয়েছিলেন, সেই মেয়েটাই খুব নিঁখুতভাবে উনার মন ভেঙ্গেছে। হয়তো খুব একটা সম্ভবপর হবে না, কিছু সময়ের মধ্যে উনার এই নিদারুন ক্ষতটা কাটিয়ে উঠা। দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে এই মর্মান্তিক ক্ষতটা উনার কাটিয়ে উঠতে হবে।

বড় আপু, হৃদি আপু, শশী এবং শ্যামা আপু চরম আশ্চর্যিত ভাব নিয়ে আহনাফের যাওয়ার পথে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে নীরবতা ভেঙ্গে এবার এক এক করে আপু আমাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে বললেন,

“কি রে? কিছু হয়েছে নাকি তোর আহনাফের সাথে? ছেলেটা হঠাৎ মনমরা হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো কেনো?”

ইতস্ততবোধ করে আমি শুকনো কন্ঠে আপুকে বললাম,,

“কিছু হয় নি আপু। উনি তো একটু এমনিই। এই ভালো তো এই খারাপ!”

আপু প্রতিত্তুর করার পূর্বেই নেহাল ভাই আমার পাশ থেকে উত্তেজিত কন্ঠে আপুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

“ভাবী। বিয়ের ডেইট কি সত্যিই ফিক্সড হয়ে গেছে?”

আপু উচ্চ শব্দে হেসে নেহালের দিকে চেয়ে বললেন,,

“হুম নেহাল। বাবা এই মাএ ডিকলার দিলেন। ১৫ দিন বাদেই আহনাফ এবং প্রভার বিয়ে। উই আর সো এক্সাইটেড।”

নেহাল পুনরায় উত্তেজিত কন্ঠে বললেন,,

“কিন্তু প্রভা তো আহনাফকে ভালোবাসে না। ইভেন প্রভা আহনাফকে বিয়েই করতে চায় না। আই থিংক বিষয়টা নিয়ে তোমাদের আরো একটু ভাবা উচিত।”

আপু থমকালেন। আমার দিকে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আপু গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন,,

“বিয়ের পর ভালো লাগা, ভালোবাসা সব হয়ে যাবে। আমি আমার দেবরকে খুব ভালো ভাবেই চিনি। প্রভাকে খুব সুখেই রাখবে আহনাফ। আহনাফের মতো নম্র, ভদ্র, উদার, ভালো এবং নরম মনের একজন ছেলেকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পাওয়াটা প্রভার জন্য সত্যিই খুব ভাগ্যের ব্যাপার। প্রভা এই বিষয়টা যতো তাড়াতাড়ি মেনে নিবে ততোই প্রভার জন্য ভালো হবে।”

আপু রাগে গজগজ করে প্রস্থান নিলেন। আপুর পিছু পিছু হৃদি আপু, শশী আপু এবং শ্যামা আপু ও প্রস্থান নিলেন। তবে হৃদি আপু যাওয়ার পূর্বে পিছু ফিরে আমাকে এবং নেহাল ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

“নিচে চলে এসো তোমরা। ডিনার সার্ভ করা হচ্ছে।”

রুম থেকে সবাই বেরিয়ে যেতেই নেহাল ভাই উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সামনের চুল গুলো হালকা টেনে আমায় প্রশ্ন ছুড়ে বললেন,,

“তুমি কি সত্যিই বিয়েটা করতে চাও প্রভা? আহনাফকে তুমি হাজবেন্ড হিসেবে চাও?”

আমি দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে সাবলীল কন্ঠে নেহাল ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললাম,,

“আহনাফ যা ডিসিশান নিবেন তাই হবে। আহনাফের ডিসিশানের উপরই এখন আমার বিয়ে করা, না করাটা ডিপেন্ড করছে। বিয়ের তো আরো ১৫ দিন বাকি আছে। কিছুটা সময় দিতে চাই আমি আহনাফকে। বিয়ের অন্তত ৭ দিন পূর্বে ও যদি উনি উনার ডিসিশান পাল্টে নেন, দেন বিয়েটা ভেঙ্গে যাবে। আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না এতে। খুব একটা খুশি ও যে হবো এমনটা ও কিন্তু না। উনার মন ভাঙ্গার পেছনে আমি ও পরোক্ষভাবে দায়ী। কারণ, উনি আমাকে ভেবেই অন্য কাউকে ভালোবেসেছিলেন। খারাপ আমার ও লাগছে। দোষী হয়তো আমি নিজে ও।”

নেহাল ভাইকে পাশ কাটিয়ে আমি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে রুম থেকে প্রস্থান নিলাম। বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে এসব আমার সাথে? কে করল আমার এই সর্বনাশ? কে আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করল? আমাকে খারাপ প্রমানিত করে আহনাফকে ফাঁসালো? আমার কোন বিশেষ ফ্রেন্ড এই জঘন্য পাপ কাজটা করতে পারে? তিস্তা তো এমন মেয়ে নয়। তাছাড়া ফেইক আইডির পাসওয়ার্ড টা আমি এবং তিস্তার বাহিরে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি জানে না। তবে কি সত্যিই কেউ আমার আইডিটা হ্যাক করেছিলো? উদ্দেশ্য প্রবণ ভাবে আমাকে আহনাফের চোখে খারাপ সাজিয়ে আহনাফকে কষ্ট দিতে চেয়েছিলো? সে নিশ্চয়ই আমাদের দুজনেরই খারাপ চায়। যদি খারাপ চেয়ে ও থাকে তবে কে সেই ব্যক্তি? তাকে খুঁজে বের করাটা এই মুহূর্তে ভীষণ জরুরী!

ড্রইং রুমে পা রাখতেই সবাই মিলে আমাকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দিলেন। আপু এবং শ্যামা আপু এক এক করে খাবার সার্ভ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ইয়ানাত আঙ্কেল খাবারের লোকমা মুখে তুলে হাসিমুখে আমার দিকে চেয়ে বললেন,,

“আর মাএ ১৫ দিন বাকি আছে। এরপর থেকে কিন্তু আমাকে বাবা বলে ডাকতে হবে। রিমেম্বার ইট। ওকে প্রভা মা?”

আমি ডানে, বায়ে মাথা হেলিয়ে বললাম,,

“ওকে আঙ্কেল।”

খাবার টেবিলে সবাই থাকলে ও আহনাফ এবং নেহাল ভাই মিসিং। চোখ দুটো উতলা দৃষ্টিতে আহনাফকে খুঁজছে। একটা নজর উনাকে দেখতে চাইছে। না জানি উনি কতোটা যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে! পারছে তো? এই তীব্র মন ভাঙ্গা যন্ত্রণা সহ্য করতে? খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে হয়তো! ইতোমধ্যেই আঙ্কেল আচমকা উদ্বেগী কন্ঠে বলে উঠলেন,

“আহনাফ কোথায়? নেহালকে ও তো কোথাও দেখছি না!”

জিজু খাবার মুখ তুলে অস্পষ্ট কন্ঠে আঙ্কেলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

“আছে হয়তো রুমে বা ছাঁদে। এক সপ্তাহ পর দুজন একসাথে হয়েছে। দুজন তো দুজনকে ছাড়া একটা মুহূর্ত ও থাকতে পারে না। সে জায়গায় তো ১ সপ্তাহ। কতো কথা জমে আছে তাদের বলো তো?”

কথার মাঝখানে ফোঁড়ন কেটে নেহাল ভাইয়ের আম্মু আচমকা অট্ট হেসে বলে উঠলেন,,

“দুজন কিন্তু জামাই বৌয়ের চেয়ে কম না! সারাক্ষণ চিপকে থাকবে! মাঝখান থেকে প্রভা সাফার করবে!”

উপস্থিত সবাই খিলিখিলিয়ে হেসে উঠল। আমি না চাইতে ও জোরপূর্বক হাসি টানলাম। যেনো কেউ বুঝতে না পারে আমার মনটা ও ভীষণ খারাপ!

ঐ দিন রাতে আহনাফকে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়েই আমাকে বাড়ি ফিরতে হলো। আহনাফের দেখা মিলল না এক পলকের জন্যেও। তবে ফেরার পূর্বে নেহাল ভাইয়ের সাথে একবার দেখা হয়েছিলো। উনি হাসি মুখেই আমাকে বিদায় জানিয়েছিলেন। সে এক রহস্যময়ী হাসি। যার ভেদ করা আমার পক্ষে হয়তো সম্ভবপর ছিলো না।

,
,

প্রায় এক সপ্তাহ পর। বিকেল ঠিক ৫ টায়, বাড়ির পাশের মেরিন রেস্টুরেন্টে আহনাফের সাথে আমার দেখা করার কথা। গতকাল রাতেই উনি আমাকে ছোট্ট টেক্সট করে জানিয়েছিলেন রেস্টুরেন্টে দেখা করতে। বিশেষ কিছু জরুরী কথা আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই এক সপ্তাহে আহনাফ একবারের জন্যে ও আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন নি। না ছোট্ট একটা টেক্সট করেছেন। তবে নেহাল ভাইয়ের সাথে রোজ আমার ভার্সিটির গেইটের সামনে দেখা হতো। ভার্সিটি যাওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে গাড়ি নিয়ে উনি ফুল গেটাপে ভার্সিটির গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মাঝে মাঝে চা- কফি, আসইক্রীম ও অফার করতেন। তবে প্রতিবারই আমি বিষয়টা খুব সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে গেছি। উনার এই হুট হাট আসা যাওয়া, বিনা কারনে দেখা করা, চা-কফি অফার করা আমার তেমন পছন্দ ছিলো না। সরাসরি কিছু বলতে না পারলে ও কিছু কিছু ব্যবহারে আমি বুঝিয়ে দিতাম উনার প্রতি বিরক্ত। তবে উনি ও নাছোড়বান্দা। কিছুতেই হাল ছাড়ছিলেন না। কড়া রোদে ঠিক গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। আমাকে এক নজর দেখে, একটু কথা বলেই তবে নিজের কাজে ফিরে যেতেন। উনার এই দিকটা অবশ্য আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। প্রেমিক পুরুষদের মতো উদ্ভট আচরন! জানি না উনার মনে কি চলছে, তবে উনি কারোর প্রেমিক হিসেবে অতোটা ও মন্দ হবেন না। বরং প্রেমিকার মন জয় করে চলতে পারবেন। এটলিস্ট আহনাফের মতো তো উনি বদরাগী নন! যথেষ্ট শান্ত, শিষ্ট এবং ভালো মনের মানুষ।

এই এক সপ্তাহে আমি এবং তিস্তা মিলে ফ্রেন্ড সার্কেলের সবক’টা ফ্রেন্ডকে সন্দেহের তালিকায় রেখে গুপ্ত অনেক অভিযান চালিয়েছি। তবে কিছুতেই কোনো ফ্রেন্ডকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না যে আমি সেজে আহনাফের সাথে মিথ্যে ভালোবাসার অভিনয় করেছিলো, আহনাফকে ফাঁসিয়েছিলো, অতঃপর ধোঁকা দিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, আত্নীয় স্বজনদের মধ্যে কেউ হবে যে আমাকে এবং আহনাফকে খুব ভালোভাবে চিনে সেই ব্যক্তিটাই হয়তো উদ্দেশ্য প্রবণ ভাবে আমার আইডি হ্যাক করে আহনাফের সাথে ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ মিটিয়েছে। এবং মাঝখান থেকে আমাকে ও খুব বাজে ভাবে ফাঁসিয়েছে৷ আহনাফের চোখে আমাকে নিচু বানিয়েছে। আমাদের সম্পর্কটাকে নষ্ট করতে চেয়েছে। আমার এক পাক্ষিক চেষ্টায় আমি যতোটা সম্ভব চেষ্টা করেছি ঐ কার্লপ্রিটতে খুঁজে বের করার। যদি ও আহনাফের দিক থেকে এই বিষযটা নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখতে পাই নি। গাঁ ছাড়া ভাব ছিলো উনার বিদ্যমান। আচ্ছা? উনার কি একবার ও জানতে ইচ্ছে করছে না? কে উনার সাথে ফ্রড করেছে? অসৎ উদ্দেশ্যে উনাকে আঘাত করেছে? উনার দুর্বলতার সুযোগ দিয়ে উনার মন ভেঙ্গেছে? চরম আশ্চর্য এই লোক! বুঝা বড় দায়।

বিকেল ৪ঃ৩০ মিনিট বাজতেই আমি রেডি হওয়ার জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। পড়নে ডিপ ব্লু কালার টপস এন্ড ব্ল্যাক কালার জেগেন্স পড়ে আমি চুলটা মাঝখানে সিঁথি করে কাঁধের দুপাশে ছেড়ে দিলাম। কপালের মাঝখানে ব্লু কালার ছোট টিপ, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক পড়ে কাঁধে পার্সটা ঝুলিয়ে আমি রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মনটা বেশ ফুড়ফুড়া লাগছে আজ। জানি না, কেনো এতোটা বেহেশেবি খুশিতে মনটা ক্ষনে ক্ষনে দুলে উঠছে। খুশিটা কি আহনাফ শেখকে দেখার উত্তেজনায় নাকি অন্য কোনো ব্যাপার আছে তাই বুঝার বৃথা চেষ্টা করে চলছি প্রায় অনেকক্ষন যাবত!

৫ঃ১০ মিনিট বাজতেই আমি রেস্টুরেন্টের উপর তলায় ডান পাশের ঠিক কর্ণারের টেবিলটায় বসলাম। ডান পাশটায় লোকজনদের কোলাহল খুবই কম। হাঁকডাক নেই বললেই চলে। পাশেই আবার খোলা জানালা। দক্ষিনা বাতাসে মনোমুগ্ধকর একটা পরিবেশ বিরাজ করছে টেবিলটার আশপাশ জুড়ে। ঠোঁটের আলিজে এক চিলতে প্রাণবন্ত হাসি ফুটিয়ে আমি জানালার পাশে বসতেই দু পাশে ঝুলে থাকা অবাধ্য চুলেরা উত্তাল বাতাসে দোল খেতে আরম্ভ করল। শহুরে কোলাহল, রাস্তায় যানবাহনের চলাচল, কর্ম ব্যস্ত মানুষদের নানারূপ প্রতিচ্ছবি দেখছি আনমনে। ১০ মিনিট ওভার হয়ে যাওয়ার পরে ও আহনাফ কেনো এখনো এলেন না, সেই নিয়ে আমার বিন্দু পরিমান ভ্রুক্ষেপ নেই। তবে মন বলছে উনি আমাকে ঠকাবেন না। কথা দিয়ে ঠিক কথা রাখবেন। অবশ্যই উনি আমার সাথে দেখা করতে আসবেন।

টেবিলে মাথা ঠেঁকিয়ে আমি ভীষন উদাসীচিত্তে জানালা দিয়ে বাহারী আকাশটা দেখছিলাম। পড়ন্ত বিকেলে কমলা রঙ্গের সূর্য্যটাকে দেখছিলাম খুব মনযোগ দিয়ে। ইতোমধ্যেই মনে হলো কেউ গলা খাঁকারি দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাইছেন। টেবিল থেকে মাথা উঠিয়ে আমি ব্যাকুল চিত্তে ঐ ব্যক্তিটির দিকে তাকালাম। আহনাফকে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখা মাএই আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেনো দুমড়ে মোচড়ে উঠল। পড়নের হোয়াইট কালার শার্টের অর্ধ অংশটা কাঁধের পেছনে হেলে আছে। বাঁধা টাই টা গলা থেকে ঝুলে বুকের পাজরে ঠেকেছে। ফোল্ড করা হাতা জোড়া কব্জির দিকে খসে পড়ছে। মুখটা চুপসে একদম একটু হয়ে আছে। চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল গুলো আমার দু চোখে স্পষ্টত। চশমা ভেদ করে উনার বেদনাযুক্ত চোখ গুলো আমি নির্লিপ্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে দেখছি। বাউন্ডুলে ভাব উনার শরীরের সর্বএ অবলোকন করতে পারছি আমি খুব সূক্ষ্ম চোখে। আমার দিকে রুক্ষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আহনাফ আমার ঠিক মুখোমুখি চেয়ারটায় বসে চোখ থেকে চশমাটা খুলে প্রশ্নবিদ্ধ কন্ঠে বললেন,,

“কখন এলে?”

আমি তব্ধ কন্ঠে বললাম,,

“এইতো কিছুক্ষণ!”

“কিছু অর্ডার করেছ?”

“নাহ্।”

“আমি করব?”

“আপনার ইচ্ছে।”

“কি খাবে বলো? কফি/বার্গার/পিজ্জা/স্যান্ডুইচ?”

“কফি।”

“ল্যাটে?”

“হুম।”

“আর কিছু?”

“নাহ্।”

ওয়েটারকে উচ্চ আওয়াজে ডেকে উনি একটা ল্যাটে কফি এবং একটা ব্ল্যাক কফি অর্ডার করে দিলেন। ওয়েটার প্রস্থান নিতেই আমি উদ্বিগ্ন ভরা কন্ঠে উনার দুচোখে অস্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললাম,,

“এই অবস্থা কেনো আপনার? খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করছেন না?”

আহনাফ পাল্টা আমায় প্রশ্ন ছুড়ে বললেন,,

“খুব উদ্বিগ্ন দেখছি আমায় নিয়ে?”

আমি খানিক ইতস্ততবোধ করে বললাম,,

“উদ্বিগ্ন হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। রিলেটিভস হোন আপনি আমার। সামান্য উদ্বিগ্ন হওয়াটা হয়তো আমার দায়িত্বের পর্যায়েই পড়ে!’

আহনাফ ভ্রু যুগল তীক্ষ্ণভাবে উঁচিয়ে বললেন,,

“শুধু রিলেটিভস? আর কিছু না?”

আমি নিশ্চুপ হয়ে মুহূর্তের মধ্যে মাথা নিচু করে নিলাম। জড়তায় ভুগছিলাম দারুনভাবে। সত্যিই তো আমি উনাকে রিলেটিভস ছাড়া বিশেষ কিছুই ভাবি না। নিজের বেটারহাফ হিসেবে তো মোটে ও না! পিনপতন মৌনতা কাটিয়ে আহনাফ হেয়ালী কন্ঠে আমায় প্রশ্ন ছুড়ে বললেন,,

“আমি যদি আবার কানাডা ব্যাক করি, তুমি হয়তো খুব খুশি হবে তাই না?”

আহত দৃষ্টিতে আমি উনার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। চোখে অপার বিদ্বেষী ভাব ফুটিয়ে আমি সন্দিহান কন্ঠে উনাকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বললাম,,

“আপনি সত্যিই কানাডা ব্যাক করবেন?”

আহনাফ হেয় হেসে বললেন,,

“খুব শীঘ্রই। হতে পারে আগামী ৪/৫ দিনের মধ্যেই!”

আমি উত্তেজিত কন্ঠে বললাম,,

“তাহলে বিয়ে?? বিয়ের কি হবে?”

আহনাফ নিস্তেজ কন্ঠে বললেন,,

“বিয়ে ক্যান্সেল!”

আমি নিষ্ক্রিয় দৃষ্টিতে আহনাফের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম আহনাফের চোখ দুটো বড্ড বেসামাল হয়ে পড়েছে অগনিত জলের আনাগোনায়। বৃথা জোরপূর্বক হাসি টেনে উনি চোখের কোটরে ভাসমান জলকণাকে গড়াতে না দিয়ে চোখের ভেতরেই বিলীন করে আমার দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,,

“আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি প্রভা। কোনো কিছু যাচাই বাছাই না করেই আমি অযথা তোমাকে ব্লেইম করেছি, হার্ট করেছি, ইনসাল্ট করেছি, সিনক্রিয়েট করেছি, প্যারা দিয়েছি, বিরক্ত করেছি, রাগ, জেদ সব দেখিয়েছি। অনেক সময় ভায়োলেন্ট হয়ে তোমার গাঁয়ে হাত ও তুলেছি। এর জন্য আমি সত্যিই খুব দুঃখিত এবং অনুতপ্ত। না জেনে বুঝে অনেক বড় ক্ষতি করেছি তোমার। এবার সবটা জেনে ও আমি তোমার ক্ষুদ্র কোনো ক্ষতিটা ও করতে পারব না। তোমার লাইফটা আমার মতো বদরাগী ছেলের জন্য হেল হতে দিবো না। তুমি ঠিকই বলেছিলে -” আমার মতো রাগী, জেদী, খারাপ মনমানসিকতার মানুষ কখনো কারো ভালো জীবন সঙ্গী হতে পারে না। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি রিয়েলাইজ করতে পারছি সেটা! সব দিক বিবেচনা করেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি “বিয়েটা যতো দ্রুত সম্ভব ভেঙ্গে দেওয়ার।” বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পূর্বেই আমি ইমেডিয়েট কানাডা ব্যাক করতে চাই। পাসপোর্ট, ভিসা সব রেডি করছি। আই থিংক দু, চারদিনের মধ্যে ফ্লাইট নিশ্চিত হয়ে যাবে। আর তুমি ও এজ আর্লি এই বদরাগী ছেলেটার থেকে মুক্তি পাবে!”

থমকালাম আমি। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেছে কন্ঠনালী। লোকটা কি বলছে এসব? সত্যি সত্যি লোকটা বিয়ে ভেঙ্গে কানাডা ব্যাক করবে? এতো দিন.. এতো দিন যে আমি কিনা বিয়ে ভাঙ্গার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিলাম, সে আমিই কিনা আজ এতো বড় স্কোপটা হাতের কাছে পেয়ে ও মন থেকে সেই স্কোপটা মানতে পারছি না? প্রবল সংশয় এবং দ্বিধা দ্বন্ধে ভুগছি? গলা জড়িয়ে আসছে, আঁখি ভিজে আসছে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে? কেনো এমনটা হচ্ছে কেনো? আমার তো খুশি হওয়ার কথা তাই না? ঘাঁড় থেকে আপদ দূর হওয়ার খুশিতে তো আমার নাচা উচিত, দিনটাকে সেলিব্রেট করা উচিত!

আহনাফ মাথা নিচু করে সামনের চুল গুলো টেনে হয়তো কষ্ট দমন করছেন নয়তো বিপুল রাগ নির্গত করছেন। উনার এসব খামখেয়ালিপনা আচরণ দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছি না। অল্প সময় পর কন্ঠনালীতে বিঘ্ন ঘটিয়ে আমি গলা খাঁকিয়ে আহনাফকে প্রশ্ন ছুড়ে বললাম,,

“পরিবারকে কিভাবে ম্যানেজ করবেন? আঙ্কেল, জিজু, আপু, আমার আম্মু, আব্বু তাদের কি রিজন দেখাবেন?”

আহনাফ মাথা নিচু করেই গলা জড়ানো কন্ঠে বললেন,,

“কাউকে মুখ খুলে কিছু বলার সাহস নেই আমার। তাই ভাবছি কাউকে কিছু না জানিয়েই হঠাৎ কানাডা ব্যাক করব। কানাডা পৌঁছানোর পর, প্রয়োজনে সবাইকে সত্যিটা খুলে বলব৷ তখন তারা হাজার চেষ্টা করে ও কিছু করতে পারবে না। বিয়েটা ভাঙ্গতে বাধ্য হবে। আর তুমি ও তখন মুক্তি পাবে! এক তরফা দোষটা আমার ঘাঁড়েই পড়বে!”

ইতোমধ্যেই মনে হলো চেনা কোনো কন্ঠস্বর পেছন থেকে প্রফুল্লিত কন্ঠে বলে উঠল,,

“দেট’স লাইক এ্যা গুড আইডিয়া আহনাফ।”

সামনে চোখ তুলে তাকাতেই নেহাল ভাইকে দেখতে পেলাম। প্রশ্বস্ত ঠোঁট জোড়ায় উনার মৃদ্যু হাসি লেগে আছে। আহনাফ পিছু ঘুড়ে জোর পূর্বক হাসি টেনে নেহাল ভাইকে উদ্দেশ্য করে দৃঢ়তার সাথে বললেন,,

“এতোক্ষন খুব অসম্পূর্ণ লাগছিলো। তোর আবির্ভাবে প্রভা ষোল আনায় পরিপূর্ণ হলো!”

#চলবে….?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here