দৃষ্টিভ্রম পর্ব ১০

0
80

||দৃষ্টিভ্রম|| ||অংশ: ১০||

শায়ানের কণ্ঠস্বর চিনতে একটুও সমস্যা হয় না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে শতরূপা। এতদিন পর কথা বলার একজন মানুষ পেয়ে নিজের মনের বাক্সকে খুলে বসেছে সে।

“এতদিন পর কল দেওয়ার সময় হলো তোমার?জেনেশুনে কেন আমাকে এই আগুনে ছুঁড়ে মারলে তুমি? আমার সবকিছু যে শেষ হয়ে গেল শায়ান। হাম্মাদ আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। আমাকে বন্দি করে রেখেছে, দিনের পর দিন নানাভাবে অত্যাচার করে যাচ্ছে। কেন এমন করলো আমার সাথে? কেন?”, কান্নার মাত্রা বেড়ে গেছে।

শায়ান কীভাবে সান্ত্বনা দিবে বুঝে উঠতে পারছে না। আসলেই সে জেনে-বুঝে শতরূপাকে এই আগুনে এনে ফেলেছে। এখন এখান থেকে বের করার দায়িত্বও তার।

শায়ান ক্ষীণ গলায় বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দিও প্লিজ। আমি বিয়েটা আটকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি।”

“মানে?”, চোখের জল মুছে শতরূপা।

শায়ান তাহলে হাম্মাদের ব্যবহার সম্পর্কে সবকিছু আগে থেকে জানতো না! আর এমন কী জানলো যে বিয়ে ভাঙানোর জন্য এসেছিল। শতরূপা টেলিফোন নিয়ে ফ্লোরে বসে জিজ্ঞেস করলো, “এমন কী জানো শায়ান? হাম্মাদ কেন এমন করছে? আগের মানুষটার সাথে তো আমি এই মানুষটার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছি না।”

“হাম্মাদ স্যারের সাথে আমার পরিচয় তিন বছরের। তিন বছর আগে তিনি আমাকে বেকার জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়ে চাকরি দিয়েছিলেন। এই তিন বছরে আমি ততটুকুই জেনেছি যতটুকু তিনি বলেছেন। কিন্তু কিছুদিন আগে একদিন আমি স্যারকে এক মেয়ের সাথে দেখতে পাই। মেয়েটা স্যারকে নিতে গাড়ি করে অফিসের বাইরে এসেছিল। ততটুকু পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল কিন্তু…”, বলেই ক্ষণকাল থামে শায়ান।

শতরূপা উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, “কিন্তু কী শায়ান? খুলে বলো সব।”

শতরূপার মনে ভয় করছে। নিষ্পলক মণিজোড়া দিক হারা স্থির তাকিয়ে আছে। এমন কী জানতে পারবে তার সম্পর্কে যা সবকিছু উলটপালট করে দেবে। এর থেকে বেশি খারাপ কিছু না হোক যা সে সহ্য করতে পারবে না।

শায়ান আবার বলতে শুরু করল, “কিন্তু, গাড়িতে উঠার পর মেয়েটা যখন স্যারকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল তখন আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়।”

কথাটা শুনতেই যেন কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরুচ্ছে তার। চোখের পলক পরপর কয়েকবার ফেলে। গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। শরীরের ভর ছেড়ে দেয়। টেবিলের সাথে গিয়ে পিট ঠেকে তার। শায়ান ওপর পাশে কী বলছে কিছুই যেন কানে যাচ্ছে না।

“হ্যালো…হ্যালো… রূপা শুনছো?”

শতরূপা মৃদুস্বরে বলল, “তারপর?”

“নিজেকে শক্ত রাখো। আমি যা বলছি মন দিয়ে শুনো তারপর সিদ্ধান্ত নিও। তারপর আমার মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন জাগে। আমি তড়িঘড়ি করে অফিস থেকে বেরিয়ে সন্দেহজনক তাদের পিছু নেই। একটা বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামে। স্যার সেই মেয়েটাকে…”, শায়ানের কণ্ঠস্বর কাঁপছে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে শতরূপা বলল, “থেমে গেলে কেন? বলো, আমি সব শোনার শক্তি রাখি শায়ান।”

“মেয়েটাকে কো…লে করে ঘরের ভেতরে নিয়ে যান। আমি জানালা দিয়ে দেখলাম তাদের মধ্যে আবেগপ্রবণ শারিরীক সম্পর্ক হচ্ছিল। যা স্বামী স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্কে হয় না। রূপা, শুনছো?”

সে কম্পিত কণ্ঠে বলল, “হ…হ্যাঁ শুনছি। তারপর?”

“আমি ওখান থেকে বেরিয়ে সোজা অফিসে চলে আসি। কিন্তু আমার দূর্ভাগ্য! যখন আমি জানালা দিয়ে দেখছিলাম তখন স্যার আমাকে দেখে ফেলেন। সেদিনই আমাকে লোক দিয়ে তুলে নেওয়া হয়। আমি জানতাম না কে কিডন্যাপ করেছে কিন্তু যখন সেই গোডাউন থেকে পালিয়ে আসি তখন বাইরে থাকা বিলবোর্ডে আমাদের কোম্পানির ব্যানার দেখে বুঝতে পারি হাম্মাদ স্যারই আমাকে কিডন্যাপ করিয়েছেন।”

“হাম্মাদ কী পূর্ব বিবাহিত?”

“হ্যাঁ, সেটা আমি শিওর জানতে পারি তোমার বিয়ের দিন। ওইদিন আমি গিয়েছিলাম স্যারের অবৈধ সম্পর্কের কথা বলে তোমার বিয়ে ভাঙতে কিন্তু আমার কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না, এখনো কোনো প্রমাণ নেই। তবে বিয়ের দিন সন্ধ্যায় স্যার নিজেই আমার কাছে স্বীকার করেছেন সবকিছু।”

“আমাকে কেন বিয়ে করলেন তাহলে? এই বিয়ের উদ্দেশ্যটা আসলে কী?”

“সেটা আমি জানি না। তবে তুমি যত দ্রুত সম্ভব ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে যাও।”

“পালিয়ে যাব কোথায়? যাওয়ার যে কোনো জায়গা নেই। জলে ভাসা পদ্মের কী আর কোনো ঠাঁই থাকে? আমি সেই জলে ভাসা পদ্ম। বাবা-মা এসব জানলে হার্ট অ্যাটাক করবে। পরিবারের অবস্থা এমনিতেও শোচনীয়। এখন আমি আবার গিয়ে তাদের উপর বোঝা হবো? তাছাড়া হাম্মাদ কেন আমাকে বিয়ে করলো সেটা না জেনে আমি কোথাও পা ফেলব না।”

শায়ান নীরব বসে থাকে। আর কোনো উত্তর জানা নেই তার। তবে যতটুকু সম্ভব সে তাকে সাহায্য করবে। এখন তার একটা পরিচিতি আছে মার্কেটে। অন্যত্র চাকরি পেতে খুব একটা সমস্যা হবে না। তাকেও নতুন চাকরির ব্যবস্থাও করে দেবে। কল রেখে চিন্তায় ডুব দেয় শতরূপা। এসব নাটক কেন সাজালো হাম্মাদ! এই প্রশ্নের জবাব সে নিয়েই ছাড়বে। কিন্তু এখন নিজের কষ্টটাকে আর সহ্য করতে পারছে না। পায়ের ব্যথা বেড়ে চলেছে। শাড়ির আঁচল দাঁত দিয়ে কামড়ে কিছুটা ছিঁড়ে পা বেঁধে দেয়। অনেক রক্ত ঝরে গেছে এর মধ্যেই।

মেঝেতে শুয়েই রাত কাটিয়ে দেয়৷ শীতের মধ্যে সারা রাত শরীর কেঁপেছে কিন্তু রুমে কোনো বিছানা বা কাঁথা বালিশ কিছুই নেই। গরম কোনো কাপড়ও নেই। সকালে শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে তার। কখন যে হাম্মাদ তাকে রুমে নিয়ে এসেছে বলতেই পারে না। কম্বল পেচিয়ে শুইয়ে দিয়েছে বিছানায়। শরীরে উষ্ণতা অনুভব করতেই আরাম পায়। রানু সম্পূর্ণ সকাল মাথায় জলপট্টি দিয়েছে। এখন জ্বর কিছুটা কমে এসেছে বলে রান্নাঘরে গিয়েছে।

হাম্মাদ তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “ওর শরীর কেমন?”

“জ্বর কিছুটা কমে এসেছে স্যার। কিন্তু বেয়াদবি মাফ করবেন, আপু… মানে ম্যাডামের একটু খেয়াল রাখলে আজ এই অবস্থা হতো না। পায়ের অবস্থা দেখেছেন? ফুলে কেমন হয়ে গেছে! দেখলেই ভয় লাগছে। সাথে সাথে মেডিসিন পড়েনি। সম্পূর্ণ সকাল ব্যথায় গুঙিয়ে কেঁদেছেন, একটুও ঘুমাননি তিনি। আমি ব্যান্ডেজ করে দিলাম। জ্বরের ওষুধ আর একটা পেইন কিলার খাইয়ে দিয়েছি। এই মাত্র ঘুমিয়েছেন। হয়তো শরীরে একটু আরাম পেয়েছেন।”

“বড্ড বেশি কথা বলো তুমি। যা লাগবে আমাকে বলবে, এনে দিব। আর কিছু ভাবতে হবে না তোমাকে।”, বলেই হাম্মাদ নিজের রুমের দিকে চলে যায়।

ফোনটা বেজে উঠে তার। স্ক্রিনে সুইটহার্ট কলিং ভেসে উঠে। কল রিসিভ করতেই ওপর পাশ থেকে বলল, “এখন কেমন আছে তোমার বউ?”

“এভাবে বলছো কেন?”

“ওপ্স! স্যরি বেবি। কেমন আছে আমার সতীন?”

“সিন্থিয়া প্লিজ।”

“ওকে ওকে! আচ্ছা বলো তার শরীরের কী অবস্থা এখন? কেমন সেবা যত্ন করছো?”

“জ্বর কিছুটা কমে এসেছে। আর আমি কেন সেবা যত্ন করতে যাব?”

মিহি হেসে সিন্থিয়া বলল, “বারেহ! তোমার বউকে কী সেবা যত্ন একটু করবে না? দেখিও আবার যেন তার প্রেমে না পড়ে যাও।”

“অসম্ভব! এই হাম্মাদ খন্দকার তার জীবনে একজনকেই ভালোবেসেছে সেটা হলো তুমি সিন্থিয়া। আর তুমি ছাড়া আমি কাউকেই কখনো ভালোবাসবো কল্পনাও করি না।”

এবার সিন্থিয়া শব্দ করেই হেসে দেয়। এই হাসির অর্থ হাম্মাদ জানে না। আজ অবধি সে যা কিছুই করেছে সিন্থিয়ার জন্য করেছে। অনেক মেয়ের সাথে শারিরীক সম্পর্কে জড়িয়েছে কিন্তু সিন্থিয়াকে বিয়ের পর থেকে কারো সাথে কোনো মেলামেশা করেনি। শতরূপার সাথে দূর্ঘটনাবশত সেদিন উলটা পালটা কাজ করে বসেছে৷ এটা যদি সিন্থিয়া জানতে পারে তবে তাকে মেরেই ফেলবে। মেয়েটা তাকে যেমন ভালোবাসতে জানে তেমনই শাসন করতে জানে। রাগ মাথায় চড়ে গেলে কারো কথা শুনে না। সে যেই হোক না কেন। হাম্মাদ তার কাছে বিড়ালছানার মতো থাকে। যখন যেভাবে ইচ্ছে আদর করে পুষে রেখেছে তাকে। আর সেও পোষ মেনেছে।

রাতের বেলা হাম্মাদ শতরূপাকে দেখতে রুমে আসে। এতক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে সে। রানু তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, “খাওয়া শেষ?”

“জি স্যার। ওষুধ বাকি আছে।”

“তুমি যাও, ওগুলো আমি খাইয়ে দিব তাকে।”

শতরূপা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “না, রানু কোথাও যাবে না। আমি তার থেকেই ওষুধ খাব, অন্য কারো থেকে না।”

রানু কী করবে ভেবে পায় না। নীরব দাঁড়িয়ে থাকে। হাম্মাদ তাকে দরজার দিকে ইশারা করে বলল, “এই ঘরের মালিক আমি। তোমাকে বেতন দিচ্ছি আমি। তাই আমি যা বলব তোমাকে তাই শুনতে হবে। যেতে বলেছি মানে যাবে।”

আর কোনো কথা বলে না কেউ। রানু নিশ্চুপ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। শতরূপা অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে থাকে হাম্মাদের দিকে। আজ তার এত দরদ উতলে পড়ছে কেন বুঝতে পারছে না। নিশ্চয়ই নতুন কোনো স্বার্থ আছে। তার মতো মানুষ স্বার্থ ছাড়া কিছুই করতে পারে না। খুব ভালো করে চেনা হয়ে গেছে তাকে।

চলবে…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here