দৃষ্টিভ্রম পর্ব ১৩

0
72

||দৃষ্টিভ্রম|| ||অংশ: ১৩||

রানুকে সম্পূর্ণ ঘর খুঁজে পায় না শতরূপা। গতকাল রাত থেকেই তাকে দেখছে না। তার মানে হাম্মাদ তাকে আবারো বিদায় করে দিয়েছে। পাঁচ মিনিট এভাবেই চলে যায়। বাকি পাঁচ মিনিটে সে কী খাবার তৈরি করবে ভেবে পায় না। দশ মিনিট বললেও হাম্মাদ নিচে আসলে বিশ মিনিটের মাথায়। টেবিলে বসে দেখে স্যান্ডউইচ বানিয়ে রাখা।

“এটা কী দুপুরের খাবার?”

“না, আমি দুপুরের খাবার রান্না করেছিলাম। কিন্তু গোসল করে এসে দেখলাম পাতিলে কিছুই নেই।”

হাম্মাদ চেয়ারটা বাঁকা করে বসে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “মানে কী? তুমি কী বলতে চাচ্ছ খাবার গায়েব হয়ে গেছে?”

“জি, আমি ঠিক এটাই বলতে চাচ্ছি।”

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সে। মনে হচ্ছে যেন শতরূপা কোনো ঠাট্টা করছে তার সাথে। মাথাটা ঈষৎ বাঁকিয়ে বলল, “রান্না না করলে অন্তত এমন কোনো বাহানা দিও যাতে বিশ্বাস করা যায়৷ তুমি আর আমি ছাড়া এই বাড়িতে এমন কেউ নেই যে খেয়ে পাতিল খালি করে যাবে। আর এখানে নিশ্চয়ই কোনো ভূত নেই যে তোমার খাবার গায়েব করে দেবে। তাছাড়া তোমার হাতের এমন বাজে রান্না কেউ খেয়ে হায়াত থাকতে মরতে চাইবে না।”

শতরূপা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। জবাবে তার বলার কিছুই নেই। কারণ হাম্মাদকে কিছু বললে সে বিশ্বাস করবে না। তাই কথাটা চেপে যায়।

শায়ান হাম্মাদের খোঁজ নিতে ঢাকা এসেছে। ঠিকানা একদিন কথায় কথায় তার মুখ থেকেই শুনেছিল। কিন্তু অবাক হয় এই ঠিকানায় অন্য কেউ থাকে। ঠিকানাটাও ভুল দিয়েছে। অসহায়ভাবে এক বন্ধু আরাফাতের বাসায় গিয়ে উঠে। চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে। নতুন চাকরিও খুঁজতে হবে তাকে। আরাফাতের জন্ম-কর্ম সব ঢাকাতেই। চ্যানেল আই এর একজন সংবাদ কর্মী সে। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সংবাদ কালেক্ট করে। বেশিরভাব সময়ই বাইরে বাইরে থাকতে হয়। সেই সাথে তার আরেকটা পেশা হলো ফটোগ্রাফি করা। নিজস্ব স্টুডিও আছে। শায়ান তার ঢাকা আসার কারণটা তাকে জানায়।

কারণ শুনে আরাফাত বলল, “এই হাম্মাদ খন্দকার কে একটু ছবি দেখাতে পারবি? আমি তোর কোনো সাহায্য করতে পারি নাকি দেখতাম।”

শায়ান ফেইসবুকে ঘাটাঘাটি করে কিন্তু হাম্মাদের কোনো আইডি পায় না। এই যুগে এসে কার ফেইসবুক আইডি নেই এটা ভেবে বেশ খটকা লাগে তার। ইন্সটাগ্রাম, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ সব যোগাযোগ মাধ্যমে খুঁজেও পায় না। হঠাৎ মনে হয় শতরূপার কোম্পানির বসের বিবাহবার্ষিকীর কিছু ছবি আছে তার কাছে। সেখানে হাম্মাদেরও ছবি রয়েছে। গ্যালারি খুঁজে ভাগ্যবশত তার ছবি পেয়েও যায়।

আরাফাত ছবির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “দোস্ত! এই মানুষটাকে তো বেশ চেনা চেনা লাগছে আমার।”

শায়ান উদ্ধিগ্ন হয়ে বলে, “একটু ভেবে দেখ। এর কিছু মনে আসে নাকি। শালা রূপার জীবনটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সব প্রমাণ নিয়ে তাকে জেলের ভাত খাওয়াতে চাই।”

“আচ্ছা, আমাকে দুই দিন সময় দে। আমাকে একটু ঘাটাঘাটি করতে হবে। আমার কলিগ রাহাত আবার গোয়েন্দাগিরিতে বেশ ভালো। ওকে কাজে লাগিয়ে দিলে সব উদ্ধার হয়ে আসবে।”

“প্লিজ দোস্ত, তাড়াতাড়ি কর তাহলে।”

শায়ান এবার যেন একটু স্বস্তি পায়। কেন জানি তার মনে হচ্ছে সামনে ভালো কিছু হতে যাচ্ছে। কিছু একটা জানতে পারবে এবার৷ এই হাম্মাদের চেহারার পেছনের চেহারা উদঘাটন করেই ছাড়বে সে। শতরূপাকে মুক্ত করে উন্মুক্ত আকাশের নিচে নিয়ে আসবে। যেখানে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে কোনো বাধা থাকবে না।

দু’দিন পর পুনরায় অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে শতরূপার সাথে। ঘড়ির কাটা তখন রাত দুইটা। বিকট এক শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। ঘুম থেকে উঠে পূর্বের ন্যায় হাম্মাদের রুম থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পায় সে। কিন্তু এবারের শব্দটা ভিন্ন। দ্রুত পায়ে সেদিকে আগায় সে। আজকে তাকে জানতেই হবে এই শব্দটা কোত্থেকে আসছে। এটা অন্তত তার শোনার ভুল নয়। রুমের বাইরে এসে দরজায় ধাক্কা দিতেই দেখল খোলা। হাম্মাদ এত রাতে দরজা খোলা কেন রেখেছে এই ভেদ বুঝতে পারে না। তবু এসব তোয়াক্কা না করে ভেতরে ঢুকে যায়। তাকে দেখামাত্রই হাম্মাদ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। হাম্মাদের চোখে জল। শতরূপার মন যতটা শক্ত হয়ে এসেছিল তার চোখে জল দেখে মুহূর্তেই তা নরম হয়ে আসে। মনের ভেতর একটা সহানুভূতি তৈরি হয়ে যায়।

“তুমি এখানে কেন এসেছ? চলে যাও এখান থেকে। এক্ষুনি বের হয়ে যাও। নাহলে আমি ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব।”, বলেই আড়ালে চোখের জল মোছার চেষ্টা করছে হাম্মাদ।

শতরূপা এগিয়ে এসে বলল, “আমিও এখানে থাকতে আসিনি। কিন্তু আপনার কান্নার শব্দ শুনে ছুটে এসেছি। কী হয়েছে বলবেন? কষ্ট ভাগ করলে তার পরিমাণটা কমে আসে আর সুখ ভাগ করলে তার পরিমাণ বেড়ে যায়।”

“আমার কোনো কষ্ট নেই৷ আর থাকলেও তোমার কী?”

“আমার কিছুই না, তবে আমি শুনতে চাচ্ছিলাম।”

“যদি বলি, তাহলে কী তুমি বুঝবে?”

“কেন বুঝব না? একবার বলেই দেখুন।”

হাম্মাদ বিছানায় শান্ত হয়ে বসে। শতরূপার দিকে তাকিয়ে তাকে পাশে বসতে বলল। যেদিন থেকে সিন্থিয়া এখানে আসা বন্ধ করেছে সেদিন থেকেই হাম্মাদের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে সে। কিন্তু আজ যেন সে তার চরিত্রের একদম বাইরে চলে গেছে। বিয়ের পর এই প্রথম তার সাথে এত ভালো করে কথা বলছে। সে যেন পূর্বের সব কষ্ট ভুলে যাচ্ছে। শুরু থেকেই হাম্মাদের প্রতি তার একটা দুর্বলতা ছিল এখন আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

“সিন্থিয়া আমাকে ভালোবাসে না।”, বলেই হাম্মাদ মাথাটা নিচের দিকে করে নেয়।

কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে তাকায় শতরূপা। এই কথার মানে কী! এখন মনে হচ্ছে এতদিন ধরে সিন্থিয়া না আসার পেছনে অনেক বড় কারণ আছে। হাম্মাদের সাথে হয়তো ঝামেলা লেগেছে।

“ভালোবাসবে না কেন? সে তো আপনার স্ত্রী। একটুতে মনমালিন্য হতে পারে তার মানে এই নয় যে সে আপনাকে ভালোবাসে না।”

“তুমি জানো না তাই এভাবে বলছ। সিন্থিয়া সত্যিই আমাকে ভালোবাসে না। যদি সে আমাকে ভালোবাসতো তাহলে কী আমার ভালোবাসার চিহ্নকে সে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইতো?”

চমকে উঠে শতরূপা। ভেতরে ভেতরে একটা ভয়ও কাজ করছে। কী বলতে চাইছে হাম্মাদ! ভালোবাসার চিহ্ন মুছে ফেলতে চাইছে এর মানেটা কী! তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়৷

হাম্মাদ শতরূপার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। তার চোখে চোখ রেখে বলল, “তুমি চাইলে আমার ভালোবাসার চিহ্নিটা এই পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকবে রূপা।”

সে ইতস্তত করে বলল, “আপনি কী বলতে চাচ্ছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“আমার উৎসবকে মায়ের আদর দেবে?”

নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে শতরূপার। সে যা ভিয় পাচ্ছিল অবশেষে সেটাই হলো। তাকে চিন্তাভাবনার কোনো সুযোগ না দিয়ে হাম্মাদ আবারো বলল, “দেখ রূপা, আমি সারাজীবন উৎসবের খরচ চালিয়ে যাব। তুমি শুধু তাকে মায়ের আদরটুকু দাও। আমি চাইলে জোর করে তোমার উপর তাকে চাপিয়ে দিতে পারতাম। একটু ভাবলেই বুঝতে পারবে এই কথা আমি কেন বলছি কিন্তু আমি চাই তুমি তাকে ভালোবেসে গ্রহণ করো। প্লিজ রূপা, একটা শিশুকে তুমি অনাথ আশ্রমে যেতে দিবে না নিশ্চয়ই। তোমার মন তো পাথর নয়। তুমি তো বাচ্চাদের অনেক ভালোবাসো, আমি তা নিজ চোখে দেখেছি।”

এখন শতরূপার কাছে বিষয়গুলো সব ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে। হাম্মাদ কেন কাবিননামাতে লিখিয়েছিল যে, শতরূপা কখনো তাকে ডিভোর্স দিলে হাম্মাদের সন্তানকে মোহরানার সাথে পাবে। হাম্মাদ তাকে কেন পছন্দ করেছে সেটাও বুঝতে বাকি রইল না। প্রথম যেদিন তাকে দেখেছিল বাচ্চা মেয়েটাকে সাহায্য করতে সেদিনই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সেটা তো তিন বছর আগে। তাহলে হাম্মাদের সন্তানের বয়স কী তিন! যদি তিন বছর হয় তবে কেন এই তিনটি বছর বাচ্চাটাকে নিজেদের কাছে রেখেছে! আদৌও নিজেদের কাছে রেখেছে নাকি! প্রশ্নে শতরূপার মাথা কিলবিল করছে। মনে হচ্ছে এখনই মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়ে যাবে। মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা বন্ধ হয়ে গেছে তার। হাম্মাদ তার সাথে এতবড় ছল করেছে! যাকে বিশ্বাস করে সে জীবনের বাকিটা পথ পার করার স্বপ্ন দেখছিল সেই কিনা মাঝপথে এনে ফেলে দিতে চাচ্ছে।

শতরূপার ঠোঁট কাঁপছে। কিছু একটা বলতে চাচ্ছে সে। তৎক্ষনাৎ হাম্মাদ তাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। কান্নার ফোয়ারা তৈরি হয়েছে তার চোখে। সে কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে বলল, “রূপা, আমাকে ফিরিয়ে দিও না তুমি। আমি জানি তোমার মনে এখন অজস্র প্রশ্ন। আমি তোমার সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। শুধু জেনে রেখ ভুল কিছু করছি না আমি। আমার সংসার, আমার ভালোবাসাকে বাঁচাতে উৎসবকে তুমি মায়ের আদর দাও।”

আচমকা এভাবে তাকে জড়িয়ে ধরবে কল্পনাও করতে পারেনি সে। বুকের ধুকপুকানি শান্ত হয়ে এসেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে শতরূপা। হাম্মাদ তাকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসে বলল, “উৎসবের বয়স সাড়ে তিন বছর। আমার একমাত্র ছেলে। কিন্তু অনেক চাওয়ার পরেও আমরা তাকে আমাদের কাছে রাখতে পারছি না। তাই তুমি আগামী সপ্তাহে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে উৎসবকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবে। আমি সব কাগজপত্র তৈরি করে নিয়েছি। দশ লক্ষ টাকা তোমার একাউন্টে জমা করে দিব আর প্রতি মাসে একটা এমাউন্ট যাবে।”

শতরূপা হাম্মাদের কথাগুলো নিশ্চুপ বসে শুনছে। একটা মানুষ কীভাবে এমন কথা বলতে পারে! নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না তার৷ মনে হচ্ছে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। স্বপ্নটা ভেঙে গেলেই সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

হাম্মাদ আবারো বলল, “তবে, তুমি চাইলেও এই কাজ করতে হবে, না চাইলেও করতে হবে। কারণটা জানতে চাইলে বলতে পারি আমি।”

অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। আর কী বাকি আছে তার বলার! এত কথা একসাথে হজম করতে পারছে না সে।

চলবে…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

[।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here