দৃষ্টিভ্রম পর্ব ১৮

0
29

||দৃষ্টিভ্রম|| ||অংশ: ১৮||

“শায়ানের সাথে কথা বলতে হবে আমার। সে মানুষটা অনেক ভালো। তাকে ঠকিয়ে ভেতরে শান্তি পাচ্ছি না।”, বলেই শতরূপা আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে উত্তরের অপেক্ষা করে।

আদিয়ান হাতের ফাইলটা বন্ধ করে বলল, “তোমার যা মন চায়, তুমি তাই করবে। আমি কী কখনো বাধা দিয়েছি? কোনো মানুষের অন্যায় হোক এটা অবশ্যই আমরা চাই না।”

কিছুটা আশ্বস্ত হলো। তৃপ্তিভরা চোখে উৎসবের দিকে তাকিয়ে রয়। এই বাচ্চাটাকে পেয়ে তার জীবন পূর্ণ হয়ে এসেছে। আদিয়ান তাদেরকে দেখে চোখ শান্ত করে। তার পরিবার অবশেষে সম্পূর্ণ। এই পরিবারের জন্য অনেক লড়াই করেছে যা সে ছাড়া কেউ জানে না।

আগামীকাল হাম্মাদ এখানে আসছে সিন্থিয়াকে নিয়ে। আফতাব খন্দকার খবর পাঠিয়েছেন আদিয়ান তার বউ বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। হাম্মাদ আসার কথা জানার পর থেকেই শতরূপার ভেতরে অশান্তি শুরু হয়ে গেছে। কোনো না কোনো ঝামেলা তৈরি করার চেষ্টা তো করবেই। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে হবে। এই সময়টাকে সামলে উঠতে পারলে তবেই আর কোনো সমস্যা হবে না। আদিয়ান তাকে বোঝানোর যথেষ্ট চেষ্টা করছে কিন্তু এই চিন্তা কোনোভাবেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না। ভেতরে ভয় হচ্ছে, হাম্মাদ আসলেই তার উৎসবকে কেড়ে নেবে। বাচ্চাটাকে সে কোনোভাবেই হারাতে চায় না। সকাল থেকেই রুমের ভেতর উৎসবকে নিয়ে বসে আছে। কারো কাছে দিচ্ছে না। মমতা মির্জা অনেকবার এসেছেন নাতিকে একটু কোলে নিতে কিন্তু শতরূপা দেয়নি।

বিকেলের দিকে হাম্মাদ আর সিন্থিয়া বাড়িতে আসে। আদিয়ান তখন বাইরে ছিল। নীতি হাম্মাদকে দেখতেই এসে জড়িয়ে ধরে বলল, “হেই, বিগবি! কতদিন পর।”

হাম্মাদকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে যায় নীতি। সিন্থিয়া এগিয়ে এসে বলল, “বেবি, আমাকে একটা হাই বললেও তো পারতে। আমি এতটাও খারাপ নই।”

“স্যরি ভাবিই! ওপ্স স্যরি এগেইন। তুমি তো আবার ভাবি ডাক পছন্দ করো না। স্যরি সিন্থি বেবি। অবশ্য আমার ভাবি ডাকার মানুষ পেয়ে গেছি। একটু অপেক্ষা করো তবেই দেখা হয়ে যাবে তোমাদের।”

“তোমার ভাবিকে দেখার জন্যেই তো আমরা বান্দরবান থেকে ঢাকা ফিরলাম।”, কিছুটা ব্যাঙ্গ করে কথাটা বলল সিন্থিয়া।

সাথের ব্যাগগুলো রেখে রুমে চলে যায় দু’জন। কাজের লোক এসে ব্যাগ নিয়ে রুমে রেখে আসে। নীতি শতরূপার রুমে গিয়ে দরজায় ঠকঠক করে।

ধীর পায়ে এগিয়ে দরজার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, “কে?”

“ভাবি, আমি নীতি। দরজা খোল।”

দরজা খুলতেই নীতি মুখ বাড়িয়ে বলল, “চলে এসেছে দ্য গ্রেট ঘসেটি বেগম। তুমি একদম চিন্তা করিও না। প্রয়োজনে এর উপর কেইস ঠুকে দেব। বাবু এখন আমাদের। কেউ কিছু করতে পারবে না।”

শতরূপা মৃদু হাসে। সে নিজেও জানে সিন্থিয়া এই বাচ্চাকে নিতে চাইবে না। যদি নেওয়ারই হতো তবে এত নাটক করতো না। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে হাম্মাদের জন্য। হাম্মাদ যদি এখন বাচ্চাকে নিতে চায় তাহলে সে কী করবে। যদিও তাদের সব পেপার ঠিকঠাক। এখন কেউ চাইলেও কিছু করতে পারবে না।

একই ঘরের মধ্যে অথচ ঠিকমতো কথা বলে না আদিয়ান আর হাম্মাদ। আদিয়ানকে দেখতেই সিন্থিয়া ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে বলল, “এসেছি প্রায় চার ঘন্টা হয়ে গেল। অথচ তোমার বউ একবার এসে জিজ্ঞেসও করলো না আমাদেরকে।”

“সে এখানে নতুন এসেছে। তাছাড়া দুইদিনের মেহমান মাত্র। আর আপনি হলেন এই বাড়ির মালিক। বড় বউ বলে কথা। সে যখন এখানে আসেনি, আপনার উচিত ছিল আগে তার সাথে গিয়ে দেখা করা।”, কথাটা বলেই সে সোজা রুমে চলে যায়।

সিন্থিয়া বিড়বিড় করে বলল, “ইম্প্রেসিভ! ঠিকাছে তবে আমিই দেখা করতে যাই।”

হাম্মাদের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও জোর করে তাকে সাথে নিয়ে সিন্থিয়া আদিয়ানের রুমের দিকে যাচ্ছে। নীতি নিজের রুম থেকে বের হয়ে তাকিয়ে দেখছে তাদের। না জানি তারা সরাসরি আসলে কী হবে! ভেতরে ভেতরে কিছুটা চিন্তা হচ্ছে তার। হাম্মাদ দরজায় এসে ঠকঠক শব্দ করে। ভেতর থেকে আদিয়ান জিজ্ঞেস করলো, “কে?”

হাম্মাদ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমরা এসেছিলাম।”

শতরূপার কলিজার পানি শুকিয়ে আসে। উৎসব পাশেই ঘুমাচ্ছে। আদিয়ানের শার্ট শক্ত করে খামচে ধরে বলল, “আমি আমার বাচ্চাকে কাউকে নিতে দিব না। কেউ আমার বাচ্চাকে নিতে চাইলে আমি তাকে খুন করে ফেলব। তুমি প্লিজ তাদের এখান থেকে তাড়িয়ে দাও।”

“শান্ত হোও রূপা। তুমি তো জানতেই এখানে আসলে কিছু একটা সমস্যা হবে। তাদের সম্মুখীন হতে হবে। যখন একা একা জমের ঘরে ছিলে, একই ছাদের নিচে রাত কাটিয়েছ, কত বিপদের সম্মুখীন হয়েছ। হাম্মাদ তোমাকে কতভাবে বিপদে ফেলেছে। শেষ পর্যন্ত ভূতের ভয় দেখিয়েছে। তখনও তুমি নিজেকে সামলেছো। তখন তো ভয় পাওনি, তবে এখন কেন ভয় পাচ্ছো? তুমি ভেতর থেকে কতটা শক্ত আমি তা ভালো করেই জানি। নিজেকে একটু সামলে রেখ। কেউ আমাদের সন্তান কেড়ে নিতে পারবে না।”

আদিয়ানের কথায় মানসিক শান্তি পায় শতরূপা। হাম্মাদ তাকে অনেকভাবে জ্বালিয়েছে৷ সবকিছু উপেক্ষা করে এতদূর আসতে পেরেছে এখনো সে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। ভয় পেলে চলবে না।

আদিয়ান দরজা খুলে দিতেই সিন্থিয়া আগে ভেতরে ঢুকে। শতরূপা পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল।

“এক্সকিউজ মি, মিসেস জুনিয়র খন্দকার।”

শতরূপা পেছন ঘুরে তাকায়। সিন্থিয়ার চোখ স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকার ধারণ করে। হাম্মাদ দরজায় যেভাবে দাঁড়িয়েছিল সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। কদম ভেতরে আনার মতো শক্তি সে সঞ্চয় করতে পারে না। এসব কী হচ্ছে! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। মাথাটা ঝিম ধরে এসেছে। কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরুচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন, এটা কঠিন কোনো স্বপ্ন কিংবা কোনো কল্পনা। কিন্তু না চোখ বারবার বন্ধ করে খুলেও দেখলো আগের মতোই অবস্থা। একে অপরের দিকে তাকায়। তারা চোখের সামনে শতরূপাকেই দেখছে এটা মানতে পারছে না।

সিন্থিয়া দু’হাতে তালি দিয়ে বলল, “ওহ মাই গুডনেস! ইজ ইট রিয়েলি ইউ? শতরূপা রাইট? ওয়াও! ইম্প্রেসিভ! আই কান্ট বিলিভ! হাম্মাদ, চিনতে পেরেছ?”

হাম্মাদ তার সামনে তেড়ে আসে। উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “শতরূপা! তুমি এখানে! কীভাবে?”

আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, “আদিয়ান, এটাই তোর স্ত্রী?”

“হ্যাঁ সে আমার বিবাহিতা স্ত্রী।”

হাম্মাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আশ্চর্যের চরম সীমানায় পৌঁছে গেছে সে। কিছুই বুঝতে পারছে না কীভাবে কী হলো!

উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, “তুই জানিস এই মেয়ে কে? কতবড় ছল করেছে এই মেয়ে আমাদের সাথে, তোর সাথে। এই মেয়ে আস্ত একটা ধোঁকাবাজ। তোকে ফুসলিয়েছে নিশ্চয়ই। এই মেয়ে আমাকে বিয়ে করেছিল! এর মানে সে আমার সাথে অনেক বড় নাটক করেছে। তুই জানিস না কিছুই!”

আদিয়ান পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “প্রথমত, আমার সাথে কথা বলার সময় তুই-তুকারি করবেন না। দ্বিতীয়ত, সেই আমার স্ত্রী, শতরূপা খন্দকার। আর সে কোনো ধোঁকাবাজ নয়।”

হাম্মাদ নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে। শান্ত করার চেষ্টা করছে। মাথাউ রক্ত উঠে গেছে তার। কী শুনছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আদিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তুমি জানো না আদিয়ান, এই মেয়ে আমাদের সাথে কী করেছে।”

“আচ্ছা! কী করেছে সে?”

সিন্থিয়া এগিয়ে আসে। শতরূপার চারদিকে ঘুরে বলল, “যতটা সহজ সরল তোমাকে ভেবেছিলাম তুমি তো তার থেকেও দারুণ বাজিমাত করে গেলে। তা এমন ছলচাতুরী কোথা থেকে শিখেছ?”

“শুধু কী ছলচাতুরী? মিথ্যের পর মিথ্যে বলেছে এই মেয়ে। আমাদের সাথে নাটক করেছে। আমাদেরকে ফাঁসিয়েছে।”, বলেই হাম্মাদ শতরূপার সামনে দাঁড়ায়।

শতরূপা নিচের দিকে তাকিয়ে খানিকটা হাসে। অবাক হয় তাদের ব্যবহারে। যারা তাকে ব্যবহার করেছে, তাকে খেলার সামগ্রী করে রেখেছে আজ তারাই তাকে বলছে সে নাকি তাদের সাথে ছলচাতুরী করেছে! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে মানুষ কত দ্রুত গুছিয়ে মিথ্যে সাজাতে পারে। তার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে তো সেই মেয়েকে এখন পথে বসতে হতো। জীবন নষ্ট হয়ে যেত সেই মেয়ের। সে তো কেবল অন্য আরেকটা মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছে। তাদের খেলাটাকেই উলটো তাদের সাথেই খেলে দিল। সাপলুডু খেলায় খেলোয়ার যেমনভাবে ইচ্ছে খেলতে পারে। সাপ বারবার কামড়ে দিলে হার না মেনে আবার নিচ থেকে উপরে উঠে। বিজয়ী সেই হয় যে এই খেলা সঠিকভাবে খেলে যেতে পারে। সে সঠিকভাবে খেলে গেছে তাই জয়ের ঘরে পৌঁছাতে সময় লাগেনি। এখানে নিশ্চয়ই তার কোনো দোষ নেই অথচ তাকে দোষ দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খেলাতে হার জিত আছেই। যে হারবে সে খালি হাতে যাবে আর যে জিতবে সে লাভবান হবে। সাধারণ নিয়ম তো এটাই।

শতরূপা হাম্মাদের মুখের সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখজোড়া কিঞ্চিৎ কুঁচকে বলল, “কেন হাম্মাদ সাহেব? আপনি কী ধোয়া তুলসীপাতা? আপনি আমাকে ঠকাননি? শুরু থেকেই মিথ্যার জালে রেখেছেন। আমাকে তো আপনিই ফাঁসিয়েছিলেন। আমি তো কেবল সেই জাল থেকে বেরিয়ে আসতে উলটো খেলে গিয়েছি। যে খেলা আপনি শুরু করেছেন এক মাস পর সেই খেলার প্ল্যানিং আমি করেছি এক বছর আগে। এখানে নিশ্চয়ই আমাকে ছলচাতুরী করেছি বলা যায় না। আপনি আমাকে বলতে পারেন আমি চতুরতার সাথে খেলেছি।”

“মিথ্যে! সব মিথ্যে সাজিয়েছিলে তাই না? এতবড় ধোঁকা আমাদের কেন দিয়েছ? কী স্বার্থ ছিল তোমার? তোমার পরিবারের সাথে আমি কথা বলব।”, কথাটা বলেই হাম্মাদ চিন্তায় পড়ে যায়।

সে কোন পরিবারের সাথে কথা বলবে। শতরূপার পরিবারের কাউকেই তো সে চেনে না। এক বোন এসেছিল বিয়েতে তার সাথেও কোনো যোগাযোগ নেই। এই পরিবারও কী তাহলে সাজানো ছিল!

“কোন পরিবারের সাথে কথা বলব! নিশ্চয়ই বাকি সব মিথ্যের মধ্যে এই পরিবারটাও মিথ্যে তাই না?”

“আপনি কী আমার সাথে কম মিথ্যে বলেছেন? আপনিও তো মিথ্যে পরিবার সাজিয়ে বিয়ে করেছেন আমাকে৷ মনে নেই? নাকি ভুলে গেছেন সবকিছু? অবশ্য এতে সুবিধা আমারই হয়েছে। কেননা আসল পরিবার সামনে আসলে আমাকে চিনে ফেলতো।”

হাম্মাদের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। শতরূপা কীভাবে এতকিছু করলো! আদিয়ানের স্ত্রী হয়ে কীভাবে সে তাকে বিয়ে করলো! কেন করলো! কী স্বার্থ এসবের পেছনে! তাকে এভাবে ফাঁসালো আর সে টেরও পেলো না!

চলবে…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here