দৃষ্টিভ্রম পর্ব ২১ ও শেষ পর্ব

0
50

||দৃষ্টিভ্রম|| ||অংশ: ২১||

হাম্মাদকে মাত্র পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল। সিন্থিয়া বাসায় নেই। তাকে খুঁজতে অফিসে গিয়েছে পুলিশের একটা টিম। আদিয়ান তাদের দু’জনের নামে শতরূপা ও উৎসবকে অপহরণের কেইস করেছে। থানায় নিয়ে হাম্মাদকে শত জিজ্ঞাসা করার পরেও কোনো জবাব পাওয়া যায় না। সিন্থিয়াকে ঘন্টা খানেকের মধ্যে থানায় নিয়ে আসা হয়। থানায় আসার পর থেকেই চিল্লাপাল্লা করছে সে। মানসিক ভারসাম্য যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারছে না।

চিৎকার করে বলছে, “কোন সাহসে আমাকে এখানে ধরে আনা হয়েছে? এখনই আমায় না ছাড়লে আমি সবাইকে এক এক করে দেখে নেবো। আমার ক্ষমতা সম্পর্কে কারো বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। ভালোয় ভালোয় আমাকে যেতে দেন। হাম্মাদ কোথায়? হাম্মাদকে খবর দেন।”

পুলিশ অফিসার হেসে বলল, “চিন্তা করবেন না হাম্মাদ সাহেবও এখানেই আছেন। আপনার আগে তাকেই এনেছি আমরা। একটা নির্দোষ মেয়েকে তার বাচ্চাসহ গায়েব করে দিয়ে পাড় পেয়ে যাবেন ভেবেছেন? এতো সোজা নাকি! আপনাদের দু’জনকে শাস্তি দিয়েই ছাড়বো। তার আগে ভালোয় ভালোয় বলে দেন তাদের কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন।”

সিন্থিয়া যা মুখ দিয়ে আসছে বলেই যাচ্ছে। তার কোনো কথাই পুলিশ কানে নিচ্ছে না। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। শতরূপাকে কোথায় রেখেছে জিজ্ঞেস করা হলে সে পুলিশকে বলল, “আমাকে চেনো তোমরা? এক্ষুনি যদি না ছাড়ো তাহলে তোমাদের সবাইকে খুন করে গুম করে ফেলবো। সবকটার চাকরি খেতেও আমার বেশি সময় লাগবে না। আমার হাত অনেক উপরে আছে। একবার কল করতে দাও।”

মহিলা অফিসার তাকে মোবাইল দিয়ে বলল, “আপনাকে একটা কল করার সুযোগ করে দেওয়া হলো। দেখুন আমাদের কী করতে পারেন আপনি।”

সিন্থিয়া একটা নম্বরে কল করে কিন্তু তার কল রিসিভ হয় না। উপায় না পেয়ে আরেকটা কল করার সুযোগ চায়। নিজের উকিলকে কল করে। উকিল সবকিছু দেখবে বলে কল রেখে দিল।

সিন্থিয়া মৃদুস্বরে বলল, “দেখ মিউচুয়ালি কেইসটা ডিসমিস করে দিলেই হয়। কত টাকা দিলে ছাড়বে বলো।”

পুলিশ অফিসার সিন্থিয়ার মুখের উপর এসে বলল, “পুলিশ অফিসার টাকার কাছে বিক্রিত হতে পারে কিন্তু কোনো মা টাকার কাছে বিক্রিত হয় না। আমিও এক সন্তানের মা। আর আরেক মা, সন্তানকে খুঁজে বের করতে কোনো ত্রুটি রাখবো না। মিসেস শতরূপা এবং তার সন্তান উৎসবকে কোথায় রেখেছেন বলে দিলেই কেইস ডিসমিস হবে এর আগে নয়।”

তাদের কাছ থেকে কোনো কথা বা তথ্য উদ্ধার করা যায় না। কেইস আদালতে চলে যায়। শতরূপা আর উৎসবের নিখোঁজের পেছনে সম্পূর্ণভাবে দায়ী হাম্মাদ আর সিন্থিয়া এটা প্রমাণ করে আদিয়ানের উকিল। এসবের সাক্ষী দেয় কাজের মেয়ে রানু, বাড়ির দারোয়ান আর শায়ান। সকল সাক্ষ্য প্রমাণকে সামনে রেখে হাম্মাদকে চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড দেয়। সিন্থিয়া এসব দেখে আদালতেই চিল্লাপাল্লা শুরু করে দেয়। এই পাগলামীর কারণে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই সাথে পুলিশকে নির্দেশ দেয় যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে খুঁজে বের করতে। শেষ মুহূর্তে এসেও হাম্মাদ বারবার বলছিল সে কিছুই করেনি। এসবের কিছুই জানে না কিন্তু ততক্ষণে রায় হয়ে গেছে। পুলিশ অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তাদের খুঁজে পায় না। সময় বাড়তে লাগে। আদিয়ান এসবে ক্লান্ত হয়ে কাউকে কিছু না জানিয়েই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

সময়টা শরৎকাল।
শতরূপা উৎসবকে স্কুলে রেখে মাত্র বাসায় ফিরেছে। উৎসব এখন ক্লাস থ্রীতে পড়ে। দুপুরের রান্নার আয়োজন করতে হবে শতরূপাকে তার হাতের রান্না না হলে ছেলেটা খাবেই না। সাথে আরেকজন আছে তার বাবা। বাপ ছেলে দু’জনই একরকম হয়েছে। আলমারি থেকে নীল রঙের শাড়িটা টান দিতেই একটা ফটো ফ্রেম ঠাস করে মেঝেতে পড়ে যায়। শতরূপা সেটা দু’হাতে তুলে ধরে। দেখতেই চোখের কোণে জল জমে যায়। এই মানুষটাকে তার আর কখনো দেখা হবে না। কখনো চারটে কথা বলা হবে না। তার বড় বোন চম্পার ছবি। দশ বছর ধরে যে বোনের মুখটা আর দেখা হয়ে উঠেনি তার। চম্পা যেদিন ছাদ থেকে পড়ে মারা যায় সেদিন শতরূপা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার মৃত্যুর জন্য যে দায়ী তাকে শাস্তি দেবে সে। সেই শাস্তি সে তাদের দিয়েছেও। আর তাতে সহায়তা করেছে স্বয়ং আদিয়ান।

গত কয়েক বছরে শতরূপার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আদিয়ানকে সরাসরি সবকথা বলার সাহস ছিল না বলে সেদিন পালিয়ে এসেছিল। তার কাছে কোনো উপায় ছিল না। যখন সে চিঠির মাধ্যমে আদিয়ানকে সব সত্যি কথা জানায় তখনও সে জানতো না আদিয়ান তাকে এসবের জন্য ক্ষমা করবে কি না। অথচ আদিয়ান শতরূপাকে কখনো দোষ দেয়নি বরং সবকিছুতে সাহায্য করেছে। আর শতরূপার এমন কাজের পেছনে রয়েছে সেই চাপা রহস্য যা সে আজ অবধি আদিয়ান ছাড়া কাউকে বলেনি।

সিন্থিয়া প্রথম যাকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করেছিল সেই মানুষটা ছিল শতরূপার বড় বোন চম্পার স্বামী রাফি। তাদের পরিবারের একমাত্র ভরসা, একমাত্র আয়ের মাধ্যম। যে মানুষটা তাদের পরিবারকে নিজের পরিবার ভেবে চালাতো। ছোট বোনের মতো আদর করতো তাকে। তাদের বাবা-মাকে নিজের বাবা-মা বলে ভাবতো। সেই মানুষটাকেই ছিনিয়ে নিয়েছিল। অথচ সেদিন চাইলে তারা ডাক্তারের কাছে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারতো তার।

সেদিন রাতে মাত্র ঝড় থেমেছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। মানুষজনের চলাচল কম। চম্পা আর রাফি ঘরের টুকটাক খরচ করে বাড়ি ফিরছিল। চম্পাকে নিয়ে কিছুদূর আসতেই মনে পড়ে একটা ব্যাগ ফেলে এসেছে। সেই ব্যাগ আনার জন্য তাকে রাস্তার কোণে দাঁড় করিয়ে রেখে ফিরে যায় দোকানে। তখনই চম্পার চোখের সামনে এক্সিডেন্ট ঘটে যায়৷ রাফির হাস্যোজ্জ্বল মুখে রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠে। চম্পা বোবা থাকার কারণে সেদিন কোনো চিৎকার করতে পারেনি। রাফি শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখার সাথে সাথে দৌড়ে আসে। তাদের ওভাবেই ফেলে রেখে পাশ কাটিয়ে সিন্থিয়া আর হাম্মাদের গাড়িটা চলে যায়। চম্পার চোখে ছেপে যায় তাদের চেহারাসহ গাড়ির নম্বর। রাফিকে জাগানোর শত চেষ্টা বৃথা যায় তার। কখন যে নিজে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় বুঝতেই পারে না। লোকজন এসে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার রাফিকে মৃত ঘোষণা করে। চম্পাকে সাথে নিয়ে শতরূপা পুলিশ কেইস করে। মেজ বোন অর্পা তখন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে শহরের বাইরে ছিল। থানায় যাতায়াত করতে করতে তারা ক্লান্ত হয়ে উঠে। একটা সময় কেইস আদালতে যায় কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণে দুর্বলতা থাকায় তাদের কিছুই হয় না। হাম্মাদ টাকার জোরে সব ধামাচাপা দিয়ে দেয়। কিছুদিন পর এই শোক সামলাতে না পেরে চম্পা আত্মহত্যা করে। চম্পা যখন মারা যায় তখন সে অন্তঃসত্ত্বা ছিল। যেটা পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে জানতে পারে তারা। সেদিন থেকেই শুরু হয় শতরূপার প্রতিশোধ নেওয়ার নতুন অধ্যায়। যেখানে সে শিকারের প্রথম ধাপ হিসেবে বেছে নেয় আদিয়ানকে। কিন্তু আদিয়ানের ছোট বেলা থেকে বড় হওয়ার সকল কষ্ট শুনে সে তার প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। ভালোবেসে ফেলে তাকে। বিয়ে করে নেয় বছরের মাথায়। প্রতিশোধের আগুন যখন নিভুনিভু তখনই সেখানে ঘি এর কাজ করে একটা পরিস্থিতি। যখন জানতে পারে সে কোনোদিন মা হতে পারবে না তখনই ভাগ্যবশত হাম্মাদের ছেলেকে নিজের করে নেওয়ার মতো একটা বিশাল সুযোগ পায়। প্রতিশোধের আগুন পুনরায় জ্বলে উঠে। তখনই নতুনভাবে নাটক সাজাতে শুরু করে সে। প্রত্যেকটা ঘটনা তার পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে। আদিয়ানকে প্রথমে কিছুই জানায়নি। পরবর্তীতে যখন দেশ ছেড়ে যাওয়ার পালা আসে তখন নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছিল তার৷ যে মানুষটা তাকে এত ভালোবাসলো, তার ভালো থাকার জন্য এতকিছু করলো তাকে সে ঠকাতে চাচ্ছিলো না। তাই আদিয়ানের জন্য রাতে চিঠিতে সবকিছু লিখে রাখে। তাকে এয়ারপোর্টে ফেলেই চোরের মতো পালিয়ে যায়। আদিয়ান সব জানার পর রাগ ধরে রাখতে পারে না। তাছাড়া শতরূপা একমাত্র মানুষ যে তাকে মন থেকে ভালোবেসেছে। তাকে ঠকাতে চায় না বলেই সবকিছু বলে দিয়েছে৷ অনুতপ্ত হয়েছে নিজের কাজের প্রতি। তখনই আদিয়ানের মাথায় ভিন্ন একটা পরিকল্পনা আসে হাম্মাদ আর সিন্থিয়াকে শাস্তি দেওয়ার। শতরূপা কোথায় আছে তা কেবল আদিয়ান ছাড়া কেউ জানতো না। কারণ সে চিঠিতে লিখে দিয়েছিল, সবকিছু জানার পর যদি তাকে ক্ষমা করতে পারে তাহলে তার কাছে ফিরে যেতে নাহলে দু’জনের পথ আলাদা হয়েই থাকবে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আদিয়ান হাম্মাদ আর সিন্থিয়াকে ফাঁসিয়ে দেয়। যার ফলে আজও তারা জেলের অন্ধকার কুঠরীতে শাস্তি ভোগ করছে।

“মাম্মা আমরা চলে এসেছি…”, উৎসবের কণ্ঠে পেছন ফিরে তাকায় শতরূপা।

চোখের সামনে তার সম্পূর্ণ পৃথিবী দেখতে পাচ্ছে। আদিয়ান উৎসবের ব্যাগ হাতে ঘরের ভেতরে ঢুকে। উৎসব দৌড়ে এসে মায়ের কোলে ঝাপিয়ে পড়ে। সে তাকে চুমু খেয়ে সারাদিনের গল্প শুনতে লেগে যায়। ভেতর থেকে শতরূপার মা রেহানা বেগম বেরিয়ে আসেন।

উৎসবের কাছে এসে বললেন, “আরে আমার চোখের মণি এসে গেছে দেখছি!”

মাকে ছেড়ে তার কাছে ছুটে যায় সে। উৎসবকে গোসল করাতে নিয়ে যান তিনি। যাওয়ার সময় বলে যান শতরূপার বাবাকে এক কাপ চা করে দিতে। সে সায় দিয়ে কাজে লেগে যায়।

আদিয়ান শতরূপাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, “খুব বাইরে ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করছে।”

“যাওয়া যাবে। অর্পা আপু আর দুলাভাই আসতেছে উৎসবের জন্মদিনে। সবাই একসাথে যাবো।”

শতরূপাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আদিয়ান জিজ্ঞেস করলো, “স্বল্প আয়ের মানুষ বলে তোমাদের কখনো ভালো কিছু উপহার দিতে পারি না। খাওয়াতে পারি না। তুমি আমার সংসারে খুশি তো?”

সে স্মিত হেসে বলল, “সাধ্যের মধ্যে আমি সবটুকু সুখ পাচ্ছি। তুমি আর উৎসব আমার জীবনে আছো মানেই আমি সুখী। আমি আমাদের সংসারে অনেক বেশি খুশি।”

আদিয়ান শতরূপার কপালে আলতো চুমু এঁকে দেয়। কষ্টের পর সুখ যেন অল্পতেই ধরা দিয়েছে তাদের সংসারে৷ এই সুখ অনন্তকাল এভাবেই থেমে থাকুক। মোবাইলের রিং টোন বাজছে। আদিয়ান তাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছিলো না তবুও গিয়ে কল রিসিভ করে।

ওপর পাশ থেকে অশান্ত কণ্ঠে কিছু কথা বলতে লাগে, “শায়ান হাসপাতালে। বাঁচবে কি না জানি না। আমার সন্দেহ সত্যি হলে সামনে কঠিন বিপদ হতে পারে। শুনেছি হাম্মাদের ভালো আচরণের জন্য সে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে। তোমাদের খোঁজ করছে চারদিকে। সাবধানে থেকো তোমরা।”

সমাপ্ত…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

[”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here