ধারণার অতীত পর্ব -০৬

0
34

#ধারণার_অতীত [০৬]

ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে৷ যেই আন্টির ভয়ে এত কৌশল বের করলাম, নিখুঁতভাবে এতকিছু করলাম, এখন কিনা তার কাছেই ধরা খেয়ে গেলাম!
এদিকে আমি আমার মুখ কিছুতেই সামনে আনতে চাচ্ছিনা, কিন্তু তাতে কি রাফানের মা একদম কাছাকাছি চলে আসছে।
রাফান শুধু ঢোক গিলছে, সে পুরোপুরি নির্বাক। তবুও আমাকে লুকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে৷ এদিকে রাফান আমার হাতটাও ছাড়ছেনা, বেচারা বাজেভাবে ঘাবড়ে গেছে। ভাবছে ছেড়ে দিলেই কি না কি হয়ে যায়!
তাই এখন এই মূহুর্তে তার উচিত অনুচিত বিষয়গুলো বুঝতে পারছেনা।
আন্টি আমার কাছে এসে বিপরীতে ঘুরিয়ে রাখা আমার মাথাটাকে একটানে সামনে নিয়ে এলো, একহাত দিয়ে দুই গালে চাপ দিয়ে সোজা করে দাঁড় করিয়েই আন্টি উচ্চশব্দে বলে উঠলো,
‘ একি উপমা তুমি? তুমি! ছি ছি ছি। এটা আমি কি দেখছি? রাফান মুনতাহা.. ওও আল্লাহ এসব কি!

কেউ কোনো কথা বলছেনা, রাফানও কিছু বলছেনা আর আমি তো একেবারেই না।
পিনপতন নীরবতার মধ্যে আমাদেরকে চমকে দিয়ে রাদিফ ভাইয়া এসে হাজির হলো, রাফান রাদিফ ভাইয়াকে দেখে এবার বিষন্নতার সাথে নিজের মুখ খুললো, আস্তে আস্তে বললো..
‘ রাদি ভাই তুমি এখানে আসলে কি করে?

রাদিফ ভাইয়া রাফানকে শান্ত থাকার ইশারা করে আন্টিকে লক্ষ্য করে বললো,
‘ আন্টি এখানে কি করছেন? আর ওই আমি ওয়াশরুমে আসছিলাম, শাল শালীরা দুষ্টামি করে আমার মাথা নোংরা করে ফেলেছিলো, ওইদিকের ওয়াশরুমে কেউ ছিলো বলে আমি চুপচাপ এদিকে চলে আসছি। এসে দেখি আপনি কেমন হাইপার হয়ে আছেন। কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?

আন্টি রাগে ফোসফাস করছে কিন্তু কিছু বলেছেনা।

রাদিফ ভাইয়া বিষয়টা বুঝতে পেরে গলা খাঁকরে রাফানের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ বাব্বাহ আমার ভাই তাহলে সেই রকম কাজের!

এরপর আবার আন্টির প্রশ্নসূচক চোখের দিকে লক্ষ্য করে বললো,

‘ আরে আন্টি আমার আম্মু বলছিলো যে আপনি নাকি মুনতাহার জন্য রাফানের বিয়ের কথা বলছিলেন, আমি এটা রাফানকে জানাতেই রাফান অবাক হয়ে বলে আমাদের বাড়িতে টিউশনি করতো অথচ আমি খেয়াল করিনি। সে মুনতাহাকে দেখতে চাইছিলো, কিন্তু তখন কি করে দেখাবো? এরপর এখানে এসে মেয়েদের মধ্যে আমি মুনতাহাকে দেখেছিলাম, সে শ্রেয়ার বান্ধবী মনে হয়, শ্রেয়া আমাকে সেটাই বলছিলো।

আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম।

রাদিফ ভাইয়া আবার বললো,
‘ তারপর আমিই ওকে বললাম যে মেয়েটার সাথে কথা বল, দেখ ভালো লাগে কিনা। পরে আমার মতো এমনটা করিস কিনা। এখন তো দেখি সত্যিই আমার কথা শুনেছে, তা রাফান কেমন লেগেছে ওকে?

আন্টি চোখ পিটপিট করে বললো,
‘ রাদিফ দাঁড়াও, তুমি যা বলছো তা কি সত্য?

রাদিফ মাথা নেড়ে বললো,
‘ অবশ্যই। জিজ্ঞাসা করেন ওদের!

এমন সময়ই একজন এসে বরকে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য বললো।
রাদিফ ভাইয়া রাফানের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ আরে ভীতুর ডিম, বল আন্টিকে সবকিছু, চুপ করে থাকলে তো অপরাধ না করেও অপরাধী হয়ে যাবি।

রাদিফ ভাইয়া চলে যেতেই আন্টি নাক ফুলিয়ে বললো,
‘ সবই বুঝলাম, কিন্তু তুই উপমার হাত ধরেছিলি কেন?

এইটুকু বলতেই আমি গম্ভীর কণ্ঠে বলতে লাগলাম,
‘ আন্টি আপনার ছেলেকে ভালো ভেবে আমি একটু কথা বলছিলাম, বলছিলো যে জরুরী কথা আছে। কিন্তু আপনি আসতেই এভাবে হাত চেপে ধরেছে। আমি কথা বলতে রাজী হওয়ার আরেকটা কারণ হলো, আমার আম্মু বলছিলো আপনি নাকি আপনার ছেলের জন্য বিয়ের আলাপ দিয়েছেন, সেই হিসাবে ভাবলাম আসলেই একটু জানা দরকার আর এইটুকু সুযোগ পেয়ে উনি এমন কাজটা করবে আমি কল্পনা করিনি। আমি আপনাদের পরিবারকে খুব সম্মান করি নাহলে আপনার সামনেই চিৎকার মারতাম।

আন্টির ঠোঁটে এবার একটা লুকায়িত হাসি দেখলাম। রাফান কিছু বলার আগেই বললো,
‘ কিরে রাফান আমাকে দেখে ভয় পেয়েছিলি তাইনা? এইজন্য ওর হাতে ধরে ফেলেছিলো, আমার ছেলেটা আমাকে এতো ভয় পায়, উফফ! আচ্ছা নে এখন কথা বল, কিন্তু হাতে ধরবিনা, তোকে মেয়েটা ভুল বুঝেছে, সুন্দর করে বুঝিয়ে বল। নিজেকে ভালো প্রমাণ কর। এবার আমিও দেখি মুনতাহার বাবা কি করে বিয়েতে না করে! রাজী তো উনাকে হতেই হবে। আমার ছেলে সম্পর্কে আজেবাজে গুজব বিশ্বাস করে আমাকে ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছিলো!

এসব বিরবির করতে করতে আন্টি হনহনিয়ে চলে গেলো। আমি বুকে হাত দিয়ে বিরাট সময় নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। আর রাফানের মাথায় জোরে একটা থাপ্পড় দিয়ে বললাম,
‘ একটা বিড়ালের বাচ্চার সাথে প্রেম করি। এই যাত্রায় রাদিফ ভাই না বাঁচালে যে কি হতো!

রাফান চিন্তার সাথে বললো,
‘ কিন্তু ওই আসর ছেড়ে রাদি ভাই আসলো কি করে? খবর পেলো কোথায়?

আমি মাথা নেড়ে বললাম,
‘ জানিনা, আমি তোমার সাথেই তো ছিলাম।

রাফান কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললো,
‘ আম্মু জানি কি বলছিলো? তোমার বাবা আমার কোন গুজবের জন্য মেয়ে দিতে নারাজ?

আমি তর্জনী আঙুল উঁচিয়ে বললাম,
‘ ওহ হ্যাঁ সেদিন বলছিলাম না যে দেখা হলে বিষয়টা বলবো। সেটা হচ্ছে তোমার আম্মু ফোন দিয়ে আমাদের পরিবারের সম্মতি জানতে চাইলে আব্বু বলে যে উনি নাকি তোমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জেনেছে একটা মেয়ের সাথে তোমার অনেকদিনের সম্পর্ক, যাকে ছাড়া তুমি কাউকে বিয়ে করতে পারবেনা৷ আর সেই মেয়েকে পাবার জন্য নাকি তোমার আম্মুর সম্মতি আদায়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করছো।

রাফান হেসে বললো,
‘ আহারে পরিবার। এতটা কাছে এসেও আমরা দুজন দুজনের ব্যপারটা বলতে পারিনা। বিয়েটা একবার হোক, এই অত্যাচারের হিসাব দিবো, বিয়ের পরেই মাইক লাগিয়ে বলে বেড়াবো আমরা অনেক বছর প্রেম করে এরপর বিয়েতে আবদ্ধ হয়েছি।

আমি ওর কথায় ব্যাঙ্গ এক হাসি হাসলাম। আমি জানি এই ছেলে বৃদ্ধ হলেও তার মাকে অতীত জানাতে পারবেনা ।

এরপর আর কিছু হবার আগেই দুজন দুদিকে সরে পড়লাম।
এবার আর আন্টির সামনে যেতে দ্বিধা করলাম না। আমি মানুষের ভীড়ে চলে গেলাম।যেখানে শ্রেয়া আর রাদিফ ভাইয়ার ছবি তুলতে সবাই ব্যস্ত! ভেতরে যেতেই আম্মু এসে আমার কানের কাছে বললো,
‘ এতো সাহস তোর? আর আমি মা হয়ে সেটা সহ্য করতে হলো। তবুও শেষবার আমি সাহায্য করলাম, এরপর কিছু হলে আমি আর কিছু জানিনা৷

আমি ফিসফিস করে বললাম,
‘ মানে কি আম্মু?

আম্মু রাগী চোখে বললো,
‘ পেছনের বারান্দায় যে ঝামেলাটা হলো, তখন আমি রাদিফকে বিষয়টা না জানালে এতক্ষণে কি হতো বলতো?

আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
‘ ওওহ তুমি তাহলে জানিয়েছিলে? অঅ আমার সেরা মা৷ তুমি শুধু মা না আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। লাভ ইউ আম্মু!

আম্মু আমার হাত টেনে ছাড়ানোর চেষ্টায় বললো,
‘ ছাড় এবার, মানুষজন দেখছে।

আমি আম্মুকে ছেড়ে শ্রেয়া আর রাদিফের দিকে তাকালাম। দুজনেই খুব খুশিমনে বিয়ে করছে। আসলেই সবকিছু উপর থেকে সুন্দর করে সাজিয়ে লেখা থাকে, নাহলে এক সপ্তাহ আগেই বা কে জানতো শ্রেয়ার হুট করে বিয়ে হয়ে যাবে তাও আমার আর রাফানের প্রেমের ইস্যুকে কেন্দ্র করে!

সবশেষে বর কনের বিদায়ের সময় আমরা গাড়ী পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ালাম।
আম্মু আর আমি একসাথে দাঁড়িয়ে আছি। রাফানের মা গাড়ীতে উঠার আগে আম্মুর কানে কানে কি যেন বললো। এটা শুনে প্রথম আম্মু হাসছিলো আবার মন খারাপ। আমি বিষয়টা আঁচ করতে পারিনি। তারপর সবাই চলে যাওয়ার পর পরেও আমি আমার আম্মুকে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘ আন্টি কি বলছিলো?

আম্মু একটু হেসে বললো,
‘ বলেছে প্রস্তুত হোন এমন একটা আয়োজনের জন্য। খুব শীগ্রই আপনার স্বামীকে প্রমাণ দিবো আমার ছেলে নিখাঁদ! আর আমরা আপনার মেয়েকে নিজের মেয়ে বানিয়ে আমাদের কাছে নিয়ে যাবো।

আমি আওয়াজ করে হাসতে গিয়েই দেখি আম্মুর মুখের হাসিটা থেমে গেছে।
আমিও আর হাসতে পারলাম না! বুঝতে পারলাম আম্মু প্রথম হেসেও কেন মুখ মলিন করে ফেলেছিলো?

চলবে……

লেখাঃ #তাজরীন_খন্দকার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here