পিছুটান পর্ব -০১

0
55

আট মাসের অন্তসত্ত্বা নিশা জানতে পারে তার স্বামী রিফাত দ্বিতীয় বিবাহ করেছে। দ্বিতীয় পক্ষের একটি কন্যা সন্তানও হয়েছে। রিফাত তার প্রথমা স্ত্রীকে না জানিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছে।

তিন মাসের ছোট কন্যা শিশুটিকে নিয়ে রিফাতের দ্বিতীয় স্ত্রী ঈশা নিজের অধিকার চাইতে এলে নিশার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। নিশা এখনো পিট পিট করে চোখ খোলা তিন মাসের বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার এক হাত নিজের উদরে অবস্থান করছে। অপর হাতটি দিয়ে কেবল নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে। কেননা, এত বড় সত্যি জানার পর নিজের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিলো।

নিশার পুরো নাম নাসিমা রহমান নিশা। বাবা-মায়ের চতুর্থ সন্তান। বড় দুই ভাই এবং তৃতীয় কন্যার আড়ালে নিশা নামক মেয়েটি যেন বাবা-মায়ের অবজ্ঞা-বঞ্চনার চাদরে আবৃত ছিলো। তবুও কী করে যেন সেই অবহেলিত মেয়েটি আজকের নিশা হতে বেঁচে রইলো। নিশার সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাবা-মা মেয়েদের বেশিদূর পড়াশুনা করা পছন্দ করতেন না। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশুনোর পাঠ চুকিয়ে নিশাকে রাজি হতে হয় বিয়েতে।

আজন্ম বাবা-মায়ের লাঞ্ছনার স্বীকার মেয়েটি এক প্রকার ভয় নিয়ে পা ফেলে স্বামীর ঘরে। তবে তার শশুড়-শাশুড়ি তাকে সাদরে গ্রহণ করে। একথা ঠিক, বিয়ের পর তারা কখনো নিশার উপর নির্যাতন করেনি। তবে নিশাকে নিয়ে সর্বদাই তাদের মনে অসন্তোষ কাজ করতো।

নিশা তার স্বামীকে নিয়ে কিছুটা ভীতগ্রস্থ ছিলো। স্কুলে পড়াকালীন তার বড় বোন লামিরাকে গায়ে অজস্র আঘাতের চিহ্ন নিয়ে বাবার বাড়ি ফিরতে দেখে নিশার হৃদয়ে সেদিন এক অজানা ভয় জন্মেছিলো। রিফাতকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে সে ভয় যেন আরো ত্বরান্বিত হলো।

রিফাত সর্বপ্রথম বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে নিশা কিছুটা অবাকই হয়েছিলো। শ্যামবরণ মুখশ্রী তার, কঙ্কালসাড় দেহ। তার মুখে সবসময় যেন একরাশ মায়া বিরাজ করে। রূপহীন নিশাকে যখন রিফাত আগলে রাখা শুরু করেছিলো, রিফাতকে নিয়ে জমিয়ে রাখা মনের ভয়কে নিশা যেন ধীরে ধীরে বিদায় জানালো। রিফাতের বদৌলতে দ্বিতীয় বার পড়াশুনা করার সুযোগ পেয়েছিলো নিশা, কিন্তু শাশুড়ির মন রক্ষার্থে সেদিন নিজের স্বপ্ন নিশাকে ত্যাগ করতে হয়েছিলো।

চোখের পলকে দিন বদল হতে শুরু করলো। অফিস থেকে ফেরার পথে রিফাত সর্বদা নিশার জন্য বেলি ফুল কিংবা স্বল্প উপহার নিয়ে আসতো। নিশা তাতেই বেশ সন্তুষ্ট ছিলো। শাশুড়ির কিঞ্চিত অসন্তোষ, অবহেলা, স্বামীর ভালোবাসায় বেশ আনন্দেই নিশার দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। ষড়ঋতুর বৈচিত্রময় পালাক্রমে পেরিয়ে গেল এক জোড়া বছর।

বিয়ের আড়াই বছর পরেও বংশধরের মুখ দেখতে না পেরে নিশার শাশুড়ির অসন্তোষ যেন আরো গাঢ় রূপ নেয়। বিয়ের সময় কনের বাবা-মা মনঃপূত যৌতুক দিতে না পারায় শাশুড়ি রেহানার সেসময়কার মুখভার যেন সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হলো। রেহানা প্রতিনিয়ত নানা কাজে তার ছেলের বউ নিশাকে অপদস্ত করতে শুরু করে।

নিশা চোখের জল ফেলে নিরবে দিনযাপন করা শুরু করলো। অপরদিকে, রেহানা ক্রমাগত নিজের ছেলেকে দ্বিতীয় বিয়ে করার প্ররোচনা দিতে থাকে। রিফাত নিরব শ্রোতার মতো সবকিছু শুনতে থাকে। মায়ের মনে সে কষ্ট দিতে পারবে না। রিফাতের মনে এক প্রকার দ্বন্দের সৃষ্টি হয়।

নিশা সেখানে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে থাকে। নিশা বুঝতে পারে রিফাত দ্বিতীয় বিয়ে করলে রেহানা তাকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করবে। বিশাল পৃথিবীর নিষ্ঠুর মনের মানুষগুলোর মাঝে নিশার ঠাঁই তখন কোথায় হবে? নিশার চিন্তা যেন ফুরোয় না।

নিশার দোয়া এবার কবুল হলো। হতাশার রাজ্যে এক বিন্দু আশার আলো নিশার মা হবার জানান দিলো। পরিবার জুড়ে উৎসবের আমেজ শুরু হলো যেন। রিফাতের মুখেও এক চিলতে মিষ্টি হাসি। শাঁখের করাত থেকে সেও এবার মুক্তি পেল।

নিশাকে নিয়ে পরিবারের আদর-যত্ন সমাপ্তি নেই। রেহানাও তাঁর অনাগত নাতির আগমনের আশায় মুখর হয়ে আছে। নিশা ভাবলো এবার হয়তো তার সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু কে জানত তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম শুরু হতে চলেছে?

নতুন অতিথির আগমনবার্তার আরো পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। রিফাতকে আজকাল বেশি প্রফুল্ল দেখা যায় না, নিশার সন্তানসম্ভবা হবার সময়কার আনন্দটুকুও তার মাঝে বিরাজ করছে না। নিশা বুঝতে পারে রিফাত কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত। রিফাত ক্রমাগত নিশাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। সম্ভবত রিফাত তার দুঃচিন্তার কথা নিশাকে বলে তাকে চিন্তায় ফেলতে চাচ্ছে না। এই শান্ত্বনায় নিশা নিজেকে মিথ্যে আশ্বাস দিলেও রিফাতের অবহেলা নিশার মনে গাঢ় দাগ কাটে।

এমনই একদিন নিশা একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে রিফাতের কাছে গিয়েছিলো। কিন্তু রিফাত চিন্তিত চিত্তে তার কথায় কোন গুরুত্ব প্রয়োগ না করেই তার কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেরিয়ে যায়। সেদিন রিফাত বেশ রাত করেই বাড়ি ফিরেছিল। নিশা কিছু জানতে চাইলে রিফাত নানা অযুহাতে তা এড়িয়ে গেল।

নানা স্বপ্নের বুননে, নানা আশঙ্কা-আকাঙ্খায় আরো তিনটি মাস অতিক্রান্ত হলো। নিশা এখন আট মাসের সন্তানসম্ভবা। ধীরে ধীরে নতুন অতিথির আগমনের দিন এগিয়ে আসার সাথে সাথে পরিবারটির আনন্দও যেন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেল। সকলের মুখে হাসি থাকলেও আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু নিশার মুখের হাসিটুকু কোথায় যেন বিলিয়ে গিয়েছে। রিফাতের অবহেলা যেন নিশা মেনে নিতে পারছেনা। চিরকাল ধরে অবহেলার চাদরে আবৃত নিশা একটি নির্দিষ্ট মানুষের অবহেলা সহ্য করতে না পেরে অগণিতবার নিরবে চোখের জল ফেলে রাত্রিযাপন করেছে।

অবশেষে নিশার সকল সত্যির সম্মুখীন হবার দিনটি চলে এলো। সেদিনের প্রভাত ছিলো অন্যান্য দিনের মতোই। অন্যান্য সাধারণ দিনের মতো সূর্যের মৃদু রোদ নিশার মায়াবী মুখশ্রীতে এসে পড়লো। আলোর ঝলকানিতে চোখ দুটো দুই বাহুর আড়ালে নিয়ে এল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো। তার দুটি চোখ অনবরত কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কাঙ্খিত মানুষটিকে আজও দেখতে না পেয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

উদরে কারো অস্তিত্ব অনুভব করে নিশা মুখের মুচকি হাসি ফিরে এলো। রিফাতের সাথে বহুদিন তার ভালোভাবে কথা হয়নি। নিশা যেন কোন এক অজানা দোষের দোষী। যার শাস্তিস্বরূপ রিফাত তাকে অবহেলিত করেছে। তবে উদরের অতিথির সঙ্গে নিশা বেশ ভালোই সখ্যতা গড়ে তুলেছে। নিশা তার মনের সকল ভাব তার সাথে বিনিময় করতে থাকে। নিঃসঙ্গ নিশা তার একমাত্র অনাগত সঙ্গীটির সঙ্গে নানারূপ কল্পিত আলাপচারিতায় মেতে উঠে।

রেহেনা নিশাকে খাবার দিয়ে যায়। নিশা হাত-মুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে নিলো। শাশুড়ির কড়া নিষেধ। ঘরের বাহিরে নিশা যেতে পারবে না। যদি নিশা কোন দুর্ঘটনার স্বীকার হয়? বর্তমানে নিশা ঘরবন্দি। এই যুক্তিতে তিনি নিশাকে বাবার বাড়িতে পর্যন্ত যেতে দেননি।

কিন্তু নিচের হইচই শুনে নিশা নিজের কৌতুহল দমিয়ে রাখতে অপারগ হলো। তাই শাশুড়ির নিষেধ অমান্য করে সিড়ি হয়ে নিচে নেমে এলো। নিশার জন্য তা ভীষণ কষ্টদায়ক এবং বিপজ্জনক ছিল। নিশার এক রমণীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স আনুমানিক বিশ। কোলে একটি শিশু। যার বয়স দুই কিংবা তিন মাস। দুধে আলতা গায়ের রঙ। ঠিক রিফাতের মতো। শিশু কন্যাটির মুখটিতে রিফাতের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে নিশা। শিশু কন্যাটির মা, গৌড় বর্ণ মেয়েটির মুখশ্রীতে মিশে আছে এক রাশ বিষন্নতা। নিশাকে দেখে তা যেন আর গাঢ় হয়ে ক্রোধে পরিণত হলো। নিশা মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলো,

– “কে তুমি?”

মেয়েটি প্রতিবাদী কন্ঠে জবাব দিলো,

– “আমি ঈশা খন্দকার। রিফাত আহমেদ এর প্রেমিকা এবং বর্তমানে তাঁর স্ত্রী। আমার হাতে রিফাত এবং আমার একমাত্র সন্তান।”

চলবে,

#পিছুটান
প্রথম পর্ব
লেখায়- তাসনূমা ফারেহীন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here