পিছুটান পর্ব -০২

0
56

❝পিছুটান❞
দ্বিতীয় পর্ব
লেখায়- তাসনূমা ফারেহীন

– “আমি ঈশা খন্দকার। রিফাত আহমেদ এর প্রেমিকা এবং বর্তমানে তাঁর স্ত্রী। আমার হাতে রিফাত এবং আমার একমাত্র সন্তান।”

ঈশার কথায় নিশার মনে সঞ্চয়িত সকল বিশ্বাস যেন নিমেষেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে নিশা আজ জীবনের সবচেয়ে বড় ধোঁকা উপহার পেয়েছে।

নিশার পাশে রিফাত নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নাতনিকে পেয়ে রেহানা আবেগাপ্লুত হয়ে ঈশাকে সাদরে গ্রহণ করার অপেক্ষায় রয়েছে। রিফাত বার বার নিশার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে নিচ্ছে। সম্ভবত নিশার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছে। নিশাকে কেবল একটি কথাই ভাবাচ্ছে। ঈশা নামক মেয়েটির কথা যদি সত্যি হয়, তবে চার চারটি জীবনের অস্তিত্ব শঙ্কায় পতিত হবে।

– “ঈশার বলা কথাগুলো কি সত্যি?”

নিশাতের অবিশ্বাসী দৃষ্টি রিফাতের মাঝে সীমাবদ্ধ। তাতে জল টলমল করছে। সেখান থেকে এক ফোঁটা জল নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো। নিশার অশ্রুসিক্ত চোখদুটি চাইছে, রিফাত একবার বলুক সবকিছু মিথ্যা। তারপর পুরো পৃথিবী সত্যি বললেও নিশা রিফাতের মিথ্যাকেই সত্য বলে মানবে।

– “আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন? নিরব থাকবেন না। আপনার কাছ থেকে সত্যি জানা আমার জন্য জরুরী।”

রিফাত হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়লো। নিশা পড়ে যেতে গিয়ে দরজায় ভর করে দাঁড়ালো। রিফাত ধরতে এলে ইশারায় তাকে থামতে বললো।

– “শেষ প্রশ্নটি করছি আপনাকে। মেয়েটি কি আপনার সন্তান? নির্ভয়ে সত্য বলবেন প্লিজ।”

রিফাতের হ্যাঁ-বোধক সম্মতি শোনে নিশা সেখানে আর এক মুহূর্ত অবস্থান করলো না। রেহানা নিশাকে থামানোর চেষ্টা করলো। নিশা শোনে নি। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে রেহানা এসে তাকে ধরে। নিশা রেহানার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। সবকিছু জানা সত্ত্বেও রেহানা এতদিন তাকে কিছুই বলেনি।

নিশা শশুড় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। চিরদিন লাঞ্ছনার স্বীকার নিশা জানে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার পরিবার, এমনকি বাবা-মাও তার সাথে থাকবে না। সবার থেকে পাওয়া লাঞ্ছনা, প্রিয় মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অবহেলা এবং চরম ধোঁকা নিয়ে নিশা পা বাড়ালো অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ এক আমৃত্যু সংগ্রামের পথে।

সেদিনের পর নিশাকে কেউ খুঁজে পায়নি। পরদিন নিশার বাবা-মায়ের কাছে যখন সংবাদ পৌঁছায়, অবহেলা-লাঞ্ছনার চাদর ভেদ করে নিশার প্রতি তাদের এতদিনের অদৃশ্য ভালোবাসা যেন প্রকাশিত হয়। এতদিনের অবজ্ঞার জন্য তারা অনুতাপ বোধ করে। যার জন্য নিশা অভিমান করে তাদেরকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করেনি।

বাবা-মায়ের তাদের ছোট কন্যাটির জন্যে, বড় ভাইদের তাদের ছোট বোনটির জন্য ভালোবাসা উথলে উঠল। বড় বোন লামিরা নিশার মাঝে নিজেরি প্রতিচ্ছবির সন্ধান পেয়ে ছোট বোনটিকে একটি বার দেখতে ব্যাকুল হলো। চিরকাল বঞ্চনার স্বীকার, এক বিন্দু ভালোবাসার কাঙ্গাল মেয়েটি সকলের ভালোবাসা পাওয়ার আগেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

নিশার ফেরার আশায় এক মাস অতিক্রান্ত হলো। কোথাও খুঁজেও কেউ তাকে পায় নি। আসলে যে নিজ থেকে হারিয়ে যেতে চায়, তাকে খুঁজে পাওয়া বড় মুশকিল। সবাই যখন নিশাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে ব্যস্ত, একজন তখনো সেখানে নিরব দর্শকের মতো বসে ছিল।

নিশার স্বামী, রিফাত। সে এমন কারো বিশ্বাস ভেঙ্গেছে, যে তাকে নিজের চেয়েও বেশি ভরসা করেছিল। স্বীয় অনুতাপ থেকে সে যেন আর নিজের মাঝে নেই। বহুদিন নিজের দিকে তার তাকানো হয়নি, ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া হয়নি বহুদিন। প্রাণবন্ত চোখদুটিতে আজ কালো দাগ পড়ে গেছে, সম্ভবত বহুরাত তার নির্ঘুম কেটেছে। রিফাতের এরূপ দশা দেখে কারো হৃদয়ের দহন যেন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেল।

কাঁধে কারো কোমল স্পর্শ পেয়ে রিফাত বাস্তবে ফিরলো। রেহানা দাঁড়িয়ে আছে। রিফাত নির্জীব কন্ঠে বললো,

– “কিছু বলবে মা?”

রেহানা ইতস্ততঃ করে বললো,

– “বাবা, নিজেকে আর কত কষ্ট দিবি? তোর একটা মেয়ে আছে। স্ত্রী আছে। বাবা হয়েছিস। এখন তোর এমন চালচলন মানায় না বাবা। যে চলে গেছে তাকে নিয়ে ভেবে কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস? যে আছে তাদের নিয়েও ভাব!”

রিফাত দৃঢ় কন্ঠে বললো,

– “সে চলে যায় নি, মা। নিশা ভুল বুঝেছে। নিশা ভুল বুঝে আভিমানে আমার থেকে দূরে সরে গেছে। কিন্তু সে আজও অপেক্ষায় রয়েছে।”

রেহানা বিস্ময়ের স্বরে বললো,

– “তুই জানিস নিশা কোথায় আছে? তাকে ফিরিয়ে আন না বাবা-”

রিফাত দ্রুত রেহানাকে থামিয়ে বললো,

– “না, আমি জানি না। আমি জানি না সে কোথায়। মা, আমি কিছু সময় একা থাকতে চাই।”

রেহানা চোখ মুছে ফিরে গেল। ছেলের করুপ পরিণতি মা হয়ে রেহানা সহ্য করতে পারছে না। আগে জানলে সে কখনো নিশাকে যেতেই দিতো না। না জানি নিশা এখন কোথায়? যেখানেই থাকুক, নিশা তার সন্তানকে নিয়ে ভালো থাকুক আর দ্রুত ফিরে আসুক। রেহানার মনে মনে দিন-রাত কেবল একই প্রার্থনা করে।

ঈশা সবকিছু নিরব দর্শকের মতো দেখে যাচ্ছে। তার কোলে থাকা চার মাস বয়সী তন্বী কেঁদে উঠলে ঈশা দ্রুত চোখ মুছে নিলো। তন্বী নামটি সে রিফাতের পছন্দেই রেখেছে। এক সময় রিফাত এবং ঈশা দুজন মিলে তাদের কন্যা সন্তানের নাম ঠিক করেছিলো। ঈশা তা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার জন্য পাঁচটি জীবন নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

– “তোর বাবাকে দেখিনি আজ এক মাস হয়ে এলো। জানিনা তারা সবাই কেমন আছে? হয়তো আমাকে ভুলে ভালোই রয়েছে। জানিস, তোর মাকে কেউ ভালোবাসে না। এই দুনিয়াটা না বড় স্বার্থপর।”

নয় মাসের উঁচু উদরে হাত বুলিয়ে কথাগুলো বলছিলো নিশা। তারপর কিছুসময় থেমে চোখের জলটুকু মুছে নিলো। নিশা খুব করে চেষ্টা করে তার সন্তানের কাছে নিজেকে শক্ত প্রমাণ করার। কিন্তু মন যে মস্তিষ্কের বারণ শোনে না। সে বার বার সেই স্বার্থপর মানুষগুলোর জন্যেই কেঁদে উঠে। নিশা নিজের আর্তনাদ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলো।

– “চিন্তা নেই। আমি একাই তোকে বাবা-মায়ের দুজনের আদরে আগলে রাখবো। কোন অবহেলার আচ তোর উপর পড়তে দেব না। আমি জানি, আমার সন্তান আমাকে অনেক ভালোবাসবে, মা বলে এসে জড়িয়ে ধরবে।”

– “আমায় ভালোবাসবে না?”

কারো আদর মিশ্রিত অভিমানের কন্ঠ শুনে নিশা মুচকি হাসলো।

– “আমি কি তাই বলেছি? আমার মেয়ে তোকেও ভালোবাসবে।”

আমিশা এসে নিশাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো,

– “রিপোর্ট এসেছে?”

নিশা চিন্তিত স্বরে বললো,

– “না রে। এখনো আসেনি। ইদানিং মাথাটা ভীষণ ঘুরে।”

আমিশা নিশাকে আশ্বাস দিয়ে বললো,

– “চিন্তা করিস না। উইকনেস-এর কারণেই এমন হচ্ছে। ঠিকমতো খাবার-দাবার খেতে হবে। এখন তোরা একজন না, দুজন বুঝলি?”

আমিশার কথায় নিশা এবং সে দুজনেই হেসে উঠে। নিশার মিথ্যে হাসির আড়ালের আর্তনাদ আমিশার চোখে ঠিকই ধরা পড়ে।

আমিশা নিশার কলেজ জীবনের বেস্টফ্রেন্ড। নিশার পরিবারের সাথে তার পরিচয় নেই। আসলে নিশা কখনো তাকে পরিবারের সাথে দেখা করানোর সুযোগই পায়নি। স্কুলের গন্ডি পেরোতেই নিশাকে বিয়ের সাজে সাজতে হয়। রিফাতের বদৌলতে কলেজে পড়ার সুযোগ পেলে তখনই আমিশার সাথে নিশার পরিচয় ঘটে।

রিফাত আজ বৃষ্টিতে ভিজে অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেছে। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে ঈশা এসে তাকে ধরল। ঈশা, রিফাতের ফিরে আসার অপেক্ষা করছিলো। ঈশা বুঝতে পারে রিফাত মানসিক ভাবে অনেক ভেঙ্গে পড়েছে। ঘর পর্যন্ত এগিয়ে রিফাতকে শুইয়ে দিলো ঈশা। রিফাত শুধু বির বির করে বলছে,

– “আমাকে ক্ষমা করে দাও নিশা। তুমি একবার ফিরে এসো প্লিজ।”

সকালে,

রিফাত ঘুম থেকে উঠলো। ঈশা বললো, তাকে কেউ পার্সেল পাঠিয়েছে। রিফাত দ্রুত সেই পার্সেলটি খুললো। সেখানে কিছু কাগজপত্র রয়েছে। রিফাত বুঝতে পারে কাগজগুলো আসলে ডিভোর্স পেপার। নিশা তাকে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে। রিফাত বুঝতে পেরে সাথে সাথে সেটি ছিঁড়ে ফেলে।

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here