পিছুটান পর্ব -০৩

0
51

গল্প- ❝পিছুটান❞
তৃতীয় পর্ব
লেখায়- তাসনূমা ফারেহীন

– “আমাকে ক্ষমা করে দাও নিশা। তুমি একবার ফিরে এসো প্লিজ।”

সকালে,

রিফাত ঘুম থেকে উঠলো। ঈশা বললো, তাকে কেউ পার্সেল পাঠিয়েছে। রিফাত দ্রুত সেই পার্সেলটি খুললো। সেখানে কিছু কাগজপত্র রয়েছে। রিফাত বুঝতে পারে কাগজগুলো আসলে ডিভোর্স পেপার। নিশা তাকে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে। রিফাত বুঝতে পেরে সাথে সাথে সেটি ছিঁড়ে ফেলল।

ক্রোধান্বিত রিফাত সে অবস্থাতেই রওনা দিল। রিফাত জানে এই শহরে নিশার পরিবার ব্যতীত পরিচিত একমাত্র আমিশাই রয়েছে যাকে নিশা ভরসা করে। কলেজে পড়াকালীন নিশা তার সাথে সদ্য হওয়া একমাত্র বেস্টফ্রেন্ড আমিশার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেই সুবাদে আমিশার ঠিকানা জানতে রিফাতের বেগ পেতে হয়নি।

নিশা ঘুম থেকে উঠে বসল। মাথাব্যথা পুনরায় বেড়েছে। তারপর আমিশার সহায়তায় ফ্রেশ হয়ে এলো। ইদানিং খাবারের অরুচি বেশ বেড়েছে। আমিশা তাকে যত্ন সহকারে খাবার খাইয়ে দিল। তারপর প্রেসক্রিপশন দেখে সকালের ওষুধগুলো নিশাকে এগিয়ে দিল। নিশা ওষুধগুলো খাবার সাথে সাথেই বমি চলে এলো। দ্রুত ওয়াশরুমে চলে গেল নিশা। বেশ কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো। আমিশা তাকে ধরলো। নিশা পুনরায় ফ্রেশ হয়ে এসে বসল। তখনি রিফাত এলো।

এতদিন পর রিফাতকে দেখে নিশা মনে এক স্বস্তি অনুভব করলো। কিন্তু তিক্ত সত্যিগুলো মনে পড়ায় নিশার মুখে পুনরায় মলিনতা নেমে এলো। রিফাত রেগে বলে উঠলো।

– “আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠানোর সাহস তোমার কী করে হলো?”

রিফাতের এরূপ আচরণে নিশা বিস্মিত হলো। আমিশা রেগে কিছু বলার আগেই নিশা তাকে থামিয়ে দিলো। বিস্ময় সহকারে জানতে চাইলো,

– “মানে? তুমি এসব কী বলছো?”

রিফাতের ক্রোধ তার চরম পর্যায়ে পৌঁছালো। ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে নিশা পুনরায় কিছু না বুঝার ভান করছে। রেগে নিশাতের দুই হাতে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো,

– “কী ভেবেছিলে? তুমি এত সহজে মুক্তি পেয়ে যাবে? আমাদের অনাগত সন্তানকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে? কখনোই নয়। আমি তা হতে দেব না।”

রিফাত উচ্চস্বরে শেষ কথাগুলো বললো। নিশা নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে রিফাতের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো।

– “হ্যাঁ, আমি ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছি, পাঠানোর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কিন্তু মিস্টার রিফাত, আপনি কোন মুখে আমার সন্তানকে আমাদের সন্তান বলছেন? কোন অধিকারে আমার উপর জোর খাটাতে এসেছেন? দ্বিতীয় বিয়ে করার সময় সেসব মনে ছিলো না?”

আমিশা এবার বলে উঠলো,

– “নিশা এখানে যথেষ্ট ভালো আছে। তাঁর অশান্তি আর বাড়াবেন না। আপনাকে অনুরোধ করছি এখান থেকে চলে যান। নয়তো আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবে। এই সময়ে এরূপ অশান্তি নিশার জন্য ক্ষতিকর। সো প্লিজ!”

রিফাত কিছু না বলে হন হন করে বেরিয়ে গেল। নিশা হাঁফ ছেড়ে বসে পড়লো। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ছিলো। রিফাতকে দেখে তার সকল অভিমান যেন অভিযোগরূপে অশ্রুধারায় প্রবাহিত হলো। নিশা তার চোখদুটি মুছে নিলো। আমিশা চিন্তিত কন্ঠে বললো,

– “রিফাত কি এই খবরটা জানে? স্বামী হিসেবে তার এটা জানা উচিত।”

নিশা বললো,

– “না জানে না। আর স্বামী? স্বামীর অধিকার সে অনেক আগেই হারিয়েছে।”

আমিশা চিন্তিত স্বরে বললো,

– “কিন্তু তুই হুট করে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছিস কেন? আর রিফাত তোর ঠিকানা জানলো কী করে?”

নিশা তাচ্ছিল্য হেসে বললো,

– “তাঁকে আমি নিজের চেয়েও বেশি ভরসা করতাম। তাই বলেছিলাম, এই শহরে আমার আপন বলতে একমাত্র তুই আছিস। তাই দুয়ে-দুয়ে চার মিলিয়ে আমাকে খুঁজে বের করতে বেশি সমস্যা হয়নি। কিন্তু আমি তাঁকে কোন ডিভোর্স লেটার পাঠাইনি। তখন রাগ করে বলেছিলাম। সে না বাসলেও আমি তাকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছি। তাকে ডিভোর্স দেয়ার সাধ্য আমার নেই।”

নিশা আবারো চোখ মুছলো। আমিশা আরো চিন্তিত হয়ে বললো,

– “তাহলে রিফাতকে ডিভোর্স পেপার কে পাঠালো?”

নিশা কিছু বলার আগেই তখন পেছন থেকে একটি কন্ঠে ভেসে এলো, “নিশার স্বাক্ষর নকল করে আমিই রিফাতকে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছিলাম।”

ঈশার কন্ঠ শুনে নিশা পেছন ফিরলো। তাচ্ছিল্য হেসে বললো,

– “স্বামীকে হারিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছেন?”

ঈশা বললো,

– “ভয় পাচ্ছিনা। কারণ রিফাতকে আমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি।”

– “মানে?”

– “আমাকে ক্ষমা করে দিও নিশা। আমি তোমার সাথে অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি।”

– “এসব বলার উদ্দেশ্য?”

– “আমার কোন উদ্দেশ্য নেই, নিশা। আমি কেবল তোমাকে সত্যি জানাতে এসেছি।”

ঈশা, নিশাকে সবকিছু খুলে বলতে শুরু করলো। ঈশা এবং রিফাত অনেক আগে থেকেই একে অপরের পরিচিত ছিলো। এমনকি, তারা একে অপরকে দীর্ঘদিন ধরে পছন্দ করতো। রিফাত তাকে প্রচুর ভালোবাসতো। কিন্তু ঈশা অর্থসম্পদকে বেশি ভালোবেসেছিলো। তাই রিফাতকে ফেলে একজন বিত্তশালী বিজনেসম্যানকে বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলো।

কিন্তু তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিলো না। ঈশা এবং রফিক উভয়ের মতে অনেক পার্থক্য ছিলো। ফলে তাদের সংসারে নিত্য-নতুন কলহ-ঝগড়া হতো। কিছুদিন পর ঈশা তার ভুল বুঝতে পেরেছিলো। অর্থ-সম্পদেই কেবল সুখ নিহিত থাকে না। ততদিনে অর্থের উপর থেকো তার মোহ উঠে যায়। ঈশার রিফাতের কথা মনে পড়ে।

পুরোনো প্রণয়ের টানে ঈশা ফিরে আসে বাংলাদেশে। কিন্তু ততদিনে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। ঈশা দেশ ছাড়ার পরেই রিফাত সপরিবারে অন্যত্র চলে যায়। রিফাতকে খুঁজে পেতে ঈশার দেড় বছর সময় লেগে যায়। ততদিনে রিফাতের সাথে নিশা শান্তির নীড় গড়ে তুলেছিলো। রিফাতের মনের সম্পূর্ণ জুড়ে তখন কেবল নিশাই ছিলো।

রিফাত সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলো ঈশাকে। যেভাবে ঈশা একদিন তাকে ফেলে পাড়ি জমিয়েছিলো দূরদেশে। নিশাকে আপন করে নিয়েছিলো। নিশার প্রতি রিফাতের এই ভালোবাসটুকুই যেন ঈশা মানতে পারছিলো না। রিফাতকে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে ঈশা। আত্মহত্যা করার হুমকি দেয়। রিফাত চিন্তিত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ঈশাকে বিয়ে করে। এসবের মধ্যে নিশার সাথে তার দূরত্ব বাড়ে।

অবশেষে ঈশার পাতা ফাঁদে পা দেয় রিফাত। ঈশার অনুরোধে রিফাত তার সাথে ডিনার করতে গিয়েছিলো। নানা কথার ছলে ঈশা রিফাতের খাবারে কিছু ওষুধ মিশিয়ে দেয়। তারপর রিফাত ধীরে ধীরে তার চেতনা হারিয়ে ফেলে। আর তারপর-

ঈশা অনুতাপ প্রকাশ করে বললো,

– “সেদিন রিফাতের কোন দোষ ছিলো না, নিশা। রিফাত সম্পূর্ণ নিরাপরাধ। আমি রিফাতকে প্রচুর ভালোবেসেছিলাম। ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। নিজের ভালোবাসার মানুষটির কষ্টের কারণ হবার যন্ত্রণা তুমি বুঝতে পারবে না। আমাকে ক্ষমা করে দাও নিশা।”

আমিশা বললো,

– “কিন্তু এখন এসব বলে কী লাভ ঈশা। ভুলে যেও না তোমার একটি মেয়ে রয়েছে।”

ঈশা পুনরায় বললো,

– “রিফাত আর আগের মতো নেই নিশা। তুমি হয়তো তাকে পর্যবেক্ষণ করেছ কিংবা করনি। তোমাকে ছাড়া সে প্রতিদিন ধুকে ধুকে মরে। অনুতাপে ভোগে, নিজেকে কষ্ট দেয়। দিনের বেশিরভাগ সময় নিজেকে ঘরবন্দি রাখে। সবকিছু থেকেও যেন সে একলা, ছন্নছাড়া! গতকাল সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরেছে। জ্বরের ঘোরে বার বার কেবল তোমাকেই ডেকেছিলো। আমি তখনই তোমাকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিই। আমার কেন যেন মনে হয়েছিলো, রিফাত জানে তুমি কোথায় আছো। তাই আমি আজ সকালে একটি ডিভোর্স পেপার তোমার তরফ থেকে রিফাতকে পাঠাই। যাতে আমি তোমাকে সবকিছু জানাতে পারি। রিফাতকে এভাবে দেখতে আমার ভালো লাগছিলো না নিশা। তোমার মাঝেই তার সব আনন্দ নিহিত। এই কথাগুলো বলার আগ পর্যন্ত আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। তাই তোমাকে আমি খুঁজে বের করেছি। তুমি তাঁর জীবনে পুনরায় ফিরে এসো। আমি তোমাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবো না।”

নিশা নির্বাক, নিঃস্তব্ধ! তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রুবর্ষণ হচ্ছে। নিজের ভালোবাসাকে অবিশ্বাস করেছিলো নিশা। সে অস্থির কন্ঠে বললো,

– “আমি কী করে এতো বড় ভুল করলাম আমিশা? আমি একবারও নিজের ভালোবাসার উপর ভরসা করলাম না! এমন পরিস্থিতিতে আমি তাঁকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম যখন তাঁর আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো। আজও আমি তাকে ভালো-মন্দ কথা শুনিয়ে ফিরিয়ে দিলাম।”

নিশা মাথা চেপে ধরে বসে পড়লো। আমিশা বুঝলো নিশার প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে।

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here