পিছুটান পর্ব -০৪ শেষ

0
56

❝পিছুটান❞
চতুর্থ পর্ব
লেখায়- তাসনূমা ফারেহীন

– “আমি কী করে এতো বড় ভুল করলাম আমিশা? আমি একবারও নিজের ভালোবাসার উপর ভরসা করলাম না! এমন পরিস্থিতিতে আমি তাঁকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম যখন তাঁর আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো। আজও আমি তাকে ভালো-মন্দ কথা শুনিয়ে ফিরিয়ে দিলাম।”

নিশা মাথা চেপে ধরে বসে পড়লো। আমিশা বুঝলো নিশার প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে। আমিশা বললো,

– “নিশা শান্ত হ। আমি দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা করছি।”

– “আমিশা, আমার মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা করছে।”

তখন রিফাত ছুটে এলো। ভুলবশত নিজের ফোনটি সে এখানে ফেলে গিয়েছিলো। সেটি নিতে সে ফেরত এসেছিলো কিন্তু ঈশাকে দেখে বাহিরে দাঁড়িয়ে যায়। এতক্ষণ ধরে ঈশার বলা সবগুলো কথাই রিফাত শুনেছে। নিশার মাথা নিজের কোলে নিয়ে রিফাত বললো,

– “নিশা, চোখ খোলো। আমি তোমার কিছু হতে দেবো না।”

নিশা কাতর কন্ঠে বললো,

– “তুলিকে নিয়ে আপনার, আমার সুখের নীড় গড়ে তোলার আমাদের এই স্বপ্নটি বোধ হয় অসম্পূর্ণই থেকে যাবে রিফ-

নিশা আর কিছু বলতে পারলোনা। অচেতন নিশাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নিশার বাবা-মা, বড় দুই ভাই, বড় বোন লামিরা, রিফাতের মা রেহানা, উভয় পরিবার এবং তাদের পরিজনকে খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে নিশার মা আমেনা এবং বোন লামিরা অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসপাতালে সর্বপ্রথম ছুটে আসেন। চিরকাল মেয়েকে অবহেলা করা নিশার বাবা-মায়ের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল।

ভাই-বোনদের চোখের কার্নিশেও পানি, অযত্নের আড়ালে বেড়ে উঠা ছোটবোনটির এতদিনের সকল আর্তনাদ যেন নিশাকে একটিবার দেখার হাহাকার রূপে তাদের সকলের চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। আজীবন মনে অসন্তোষ লালন করা শাশুড়ি রেহানার চোখেও অশ্রুবর্ষণ হয়েছে বউ এবং নাতির সুস্থতা কামনায়। কিন্তু অবহেলিত নিশা তার আপনজনদের ভালোবাসা দেখার এইবারেও সুযোগ পেল না। বর্তমানে সে অপারেশন থিয়েটারে।

ইতিমধ্যে রিফাত এবং ঈশার বিয়ের লুকায়িত রহস্য সকলে জানতে পেরে গেছে। সব জানতে পেরে হাসপাতালেই নিশার ভাইয়েরা রিফাতকে মারতে উদ্যত হয়। মাঝখানে বাঁধ সাধে ঈশা। অবশেষে ঈশা সকলকে বুঝাতে সক্ষম হয়, তাতে রিফাতের কোন দোষ ছিলো না। রিফাতকে সে পুরোপুরি ফাঁসিতে ফেলেছিলো। পুলিশের কাছে যাবারও কোন পথ অবশিষ্ট রাখেনি। কারণ ঈশার নিকট এমন কিছু মিথ্যে প্রমাণ ও ছবি ছিলো যা রিফাতের কথায় অবিশ্বাস করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। কাউকে কিছু বলার আগেই ঈশা সেসব তথ্য দিয়ে রিফাতকে পুনরায় ব্ল্যাকমেল করা শুরু করে। নিশার পরিবার রেগে ঈশার উপর আক্রমণ করতে গেলে রেহানা নানা কারণ দেখিয়ে সকলকে থামিয়ে দিলো।

সকলে চাতক পাখির ন্যায় নিশাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে রয়েছে। ডাক্তার এসে জানায় অবস্থার অবনতির কারণে মা ও সন্তানের মধ্যে একজনকে বাঁচানো সম্ভব। রেহেনা প্রথমে সন্তানকে বাঁচানোর কথা বলে। কিন্তু সকলের মতের বিরুদ্ধে রিফাত নিশাকে বাঁচানোর কথাই বললো।

তখনই সেখানে আমিশা একটি রিপোর্ট হাতে নিয়ে আসে। আমিশার মুখের বিষন্নতা খারাপ কিছু ঘটার ইঙ্গিত বহন করছে। আমিশা রিপোর্টটি রিফাতের হাতে দিলো। হন্তদন্ত হয়ে রিপোর্টটি পড়ে রিফাত সেখানেই নির্জীব পাথরের ন্যায় ধপ করে বসে পড়ে। রেহানা কাতর স্বরে রিফাতের এরূপ আচরণের কারণ জানতে চায়। সকলের কৌতুহলের অবসান ঘটিয়ে আমিশা বললো, ‘নিশার ব্রেন টিউমার হয়েছে।’

আমিশার কথায় সেখানে যেন কান্নার রোল পড়ে যায়। আমিশা তাদের উদ্দেশ্যে বিদ্রুপের স্বরে বলে,

– ‘এখন কেঁদে কী হবে? নিশার এই পরিণতির জন্যে আপনারাই তো দায়ী।’

নিশার ভাইয়েরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। রেহানা আমিশার কথায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললো,

– ‘এই মেয়ে। আমাদের নামে তুমি এসব কী বলছো? নিশার রোগ হলে সেখানে আমাদের দোষ কোথায়?’

আমিশা এবার বেশ জোরে হেসে উঠলো। যেন এইমাত্র তাকে কোন কৌতুক শোনানো হয়েছে। আমিশা এবার বলতে শুরু করলো,

– ‘নিশার সাথে আমার পরিচয় হয় কলেজে। রিফাত ভাইয়ার সাথেও পরিচয় হয়েছিলো তখন। সেদিন নিশার চোখে মুখে আমি নতুন স্বপ্নের ঝলক দেখতে পেয়েছিলাম, নতুন আশা-আকাঙ্খা সঞ্চার দেখেছিলাম। কিন্তু ভাবিনি তা কেবল কিছুকালের জন্যই স্থায়ী ছিলো। শাশুড়ির মন রক্ষার্থে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটিকে ত্যাগ করা নিশার নিষ্প্রাণ মলিন মুখশ্রীও আমি সেদিন দেখেছিলাম।’

কিছুক্ষণ থেমে আমিশা আবারো বলতে শুরু করলো।

– ‘নিশার সাথে আমার ঠিক তার দুবছর পর আবারো দেখা হয়। যেদিন নিশাকে বাধ্য হয়ে তার শশুড়বাড়ি থেকে ফিরে আসতে হয়। সেদিন আবহাওয়া বেশি ভালো ছিলো না। শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতায় আকস্মিক শোক সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। বড়সড়ো এক্সিডেন্ট থেকে কোনভাবে রক্ষা পায়। কিন্তু মাথায় বিরাট আঘাত পেয়েছিলো। তাকে এরূপ অবস্থায় দেখে কোন দিক বিবেচনা না করে তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাই। ডাক্তার সেদিন বলেছিলো, তাকে সেখানে নিয়ে যেতে কালবিলম্ব করলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারতো।’

আমিশা বললো,

– ‘নিশার জ্ঞান ফিরতে আরো কিছুক্ষণ সময় লেগেছিলো। জ্ঞান ফেরার পর, নিশা যখন বললো তার যাবার কোন জায়গা নেই, সেদিন দ্বিতীয়বারের মতো অবাক হলাম। নিশা আমাকে সেদিন সবকিছুই খুলে বলেছিলো। তার জীবনের শুরু থেকে ঘটে যাওয়া সবকিছু। আমি নির্বাক শ্রোতার ন্যায় সবকিছু শুনে গিয়েছি। কীভাবে একজন মা তার নিজের সন্তানের মাঝে ছেলে-মেয়ের বৈষম্য দাঁড় করিয়েছিলো, কীভাবে একজন বাবা নিজেই নিজের মেয়ের স্বপ্ন ভেঙ্গে তাকে বিয়েতে রাজি হতে বাধ্য করেছিলো, কীভাবে একজন ভাই স্বচক্ষে তা দেখেছিলো। কীভাবে একজন বোন তা দেখেও নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলো, যেখানে সে নিজেও তার ভুক্তভোগী। অতঃপর নিশার শেষ আশ্বাসের প্রতীক রিফাত মূহুর্তেই তার ভরসা ভঙ্গ করেছিলো! নিশার জীবনের অতিসংক্ষিপ্ত সারসক্ষেপ শোনে কখন আমার চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়েছিলো বুঝতেই পারিনি।’

চারপাশের পরিবেশ নিঃস্তব্ধ। হাসপাতালের বাতাস ক্রমাগত ভারী হয়ে আসছে। সকলে সেখানে নিরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করছে। আমিশা আবারো বলতে শুরু করলো।

– ‘কিছুদিন আমার বাড়িতে থাকার পর, নিশা আমাদের বিদায় জানিয়ে দিলো। ততদিনে সে নিজের ভরণপোষণ চালনার জন্য একটি অনলাইন জব খুঁজে নিয়েছিলো। সে সাথে নিজের জন্য স্বল্প ভাড়ায় একটি বাড়ি খুঁজে নেয়। তার ইচ্ছে ছিলো, তুলির জন্মের পর পড়াশুনো কন্টিনিউ করবে। এবার নিজ পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটি সে পূরণ করবেই। কিন্তু ভাগ্য এবারো তার সহায় ছিলো না। নিজের অজান্তেই নিজের ভেতর সে এমন একটি মরণব্যাধি লালন করেছিলো, যা তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মেয়েটি নিজের ব্যাপারে বড্ড উদাসীন। বার বার মাথা ঘুরে সেন্সলেস হওয়া, প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণাকেও দুর্বলতার কারণ বলে চালিয়ে দিলো। আমিও বিষয়টি আমলে নিইনি। তবে তার ফল যে এতটা মারাত্মক হবে ভাবিনি। ভাড়া বাড়িটিতে নিশা একাই থাকতো। পাশাপাশি হওয়ায় আমি মাঝে মাঝে সেখানে যাওয়া-আসা করতাম। একদিন আমার সামনেই সেন্সলেস হয়ে যাওয়ায় সন্দেহবসত জোর করেই টেস্ট করিয়েছিলাম। যার ফলাফল আজকের এই রিপোর্ট।’

আমিশা চোখ মুছলো। তারপর ডাক্তারের সাথে কিছু কথা বলে এলো। ঈশা শেষবারের মতো নিশার কাছে ক্ষমা চেয়ে এলো। সে সত্যিই সবকিছুর জন্যে অনুতপ্ত। নিশাকে বিদায় জানিয়ে ঈশা চোখ মুছলো। নিশার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তার সন্তানকেই বাঁচানো হবে। কিছুক্ষণ পর বাচ্চার চিৎকার শুনে সকলে মৃদু হাসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। তারা জানে, ক্ষণেক বাদেই নবজাতক কন্যা শিশুটির মায়ের মৃত্যু ঘটবে। তখন শিশুটির ঠাঁই কোথায় হবে? একই ঘটনার আবারো পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আরো একটি নিশার গল্পের সূচনা রচিত হবে।

বাচ্চাটিকে এনে রিফাতের কোলে দেয়া হলো। রিফাত বাচ্চাটিকে আমেনার কোলে দিয়ে কাঁদতে লাগলো। তখন একজন নার্শ এসে বললো,

– ‘পেশেন্টের হাতে বেশি সময় নেই। তিনি তাঁর স্বামী রিফাত এবং আমিশা রহমানের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।’

নিশার রিফাতের সাথে দেখা করার ইচ্ছে শুনে সকলে অবাক হলো। কথাটি শুনামাত্র রিফাত হন্তদন্ত হয়ে নিশার কাছে ছুটে গেল। রিফাতকে শেষবারের মতো দেখলো নিশা। রিফাত বললো,

– “কেন আমাকে এভাবে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছ নিশা? আমাদের স্বপ্নের কী হবে?”

নিশা অনেক কষ্টে বললো,

– “আমার হাতে বেশি সময় নেই, আমিশা নিশ্চয়ই আপনাদের সবকিছু বলেছে। আমি আমার সন্তানকে একবার কোলে নিতে চাই।”

নিশার কোলে তার সন্তানকে দেয়া হলো। শিশুটি নিশ্চুপ হয়ে মায়ের সংস্পর্শ অনুভব করছে। নিশা তা দেখে চোখের জল ফেলল। শিশুটির জন্য মায়ের সংস্পর্শ আর মাত্র কিছুক্ষণের জন্য স্থায়ী হবে। তা ভেবে কক্ষের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা সকলের নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো। নিশা আমিশার কোলে নবজাতকটিকে তুলে দিলো। তারপর বললো,

– “আগলে রাখিস ওকে। আমার মেয়ে তোকে আমার চেয়েও ভালোবাসবে দেখিস।”

আমিশা কেঁদে ফেললো। মেডিসেনর প্রভাব কমে যাওয়ায় নিশার মাথা ব্যথা তীব্রতর হতে লাগলো। আমিশা, নিশার হাত ধরে বললো,

– “অবশ্যই, আমি ওকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখবো।”

নিশা সবাইকে একনজর দেখে নিয়ে তাচ্ছিল্যস্বরূপ মুচকি হাসলো। তারপর তাদের বিদায় জানালো। ডাক্তাররা তাকে বাঁচানোর শেষ প্রচেষ্টা করলেন। কিন্তু সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। সকল মায়া, সকল পিছুটান ফেলে, এক বুক অভিমান নিয়েই অবহেলিত নিশা পাড়ি জমালো দূর দেশে।

গল্পে উল্লেখিত নিশা এবং রিফাত উভয় চরিত্রই পরিস্থিতির স্বীকার। প্রাক্তনকে বিশ্বাস করে রিফাত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করে। এবং তা বুঝার আগেই ঈশা তার জঘন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ফেলে। রিফাত দ্বিতীয় ভুলটি করে নিশাকে সবকিছু খুলে না বলে, যা তার পূর্বেই করা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু রিফাতের অবহেলায় নিশা ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়েছিলো। তাই নিশাকে এমন পরিস্থিতিতে আরো মানসিক চাপ সে চায়নি। ঈশার এমন আকস্মিক আগমনে রিফাত, নিশা উভয়েই হতভম্ব হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ রিফাতকে ভুল বুঝে তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিশা চলে আসে। তৃতীয় পক্ষের আগমনে এমন হাজারো সত্যিকারের ভালোবাসা হারিয়ে যায়। অবশেষে ঈশা তার ভুল বুঝতে পারে। প্রকৃত ভালোবাসা কখনোই ভালোবাসার মানুষটিকে কষ্ট দেয় না, বরং ভালোবাসার মানুষটিকে তার নিজের ভালোবাসার সাথে আনন্দদীপ্ত হয়ে বাঁচতে মুক্ত করে দেয়।

সমাপ্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here