পুতুল বউ 💔পর্ব ১০+১১

0
57

“পুতুল বউ”
পর্ব-১০+১১
~
সকাল থেকে রিয়া আমার কাছে ঘেষছেনা।প্রতিদিন বিড়ালের মত শুধু গা ঘেষতো কিন্তু আজ সকালে ঠিক উল্টো হচ্ছে।রিয়া আমাকে পাত্তাই দিচ্ছেনা।মনে মনে আমাকে কোনো অসহ্য কিছু ভাবছে।ছিঃ আমি এমন কি করেছি যে রিয়া আমার সাথে এমনটা করছে?আচ্ছা আমি কি বাজে কিছু করেছি?রিয়া আমার সাথে অহংকার করছেনা না তো?অন্যসময় আমাকে টেলিভিশনের সামনে দেখলে চেচিয়ে উঠত এখন কিচ্ছু বলছেনা।গুন গুন করে গান গেয়ে সারা ঘর হেটে বেড়াচ্ছে আর চুল আঁচড়াচ্ছে।রিয়া এখানে একটু বস।ভাল্লাগছেনা তুমি টিভি দেখ।বস না একটু।বললাম তো ভালো লাগছেনা।আর সময় তো কোলের মাঝে এসে বসতে আর এখন ডাকছি আসতেছো না।আর সময় যেতাম স্বার্থের জন্য এখন স্বার্থ ফুরিয়ে গেছে।কিসের স্বার্থ? বেবি।কি হ্রামি বউ!😱😱 ও বেবির জন্য আমার কাছে আসত।এখন দিয়ে দিয়েছি আর চার আনার মূল্যও আমাকে দিচ্ছেনা।বেবি হলেই চলবে?আমাকে লাগবে না?নাহ্ কে তুমি?যা পাওয়ার পেয়ে গেছি।তুমি না থাকলেও আমার কিছু যায় আসেনা।আল্লাহ্! কি এমন পাপ করলাম যে তুমি আমাকে এই রহস্যময়ী কন্যার জালে ফেলে দিলে?ও এখন আমাকে ভীষণভাবে ডোমিনেট করছে।বেবি পেয়ে ওর পিচ্চি বরটাকে ভুলে যাচ্ছে।এই শোনো?কি?আমার মনে হয় টুইন বেবি হবে?কেমনে বুঝলা?আমার মন তাই বলছে।রিয়াকে বেবি দিয়ে আমি বউ হারা হলাম।আমার জীবনের সকল কিছু বিনষ্ট করে ফেললাম।এই পিচ্চি বর চলো ঘুরতে যাব।কোথায়? আজকে শহরে ঘুরে বেড়াব।আবারও রিয়া শাড়ি পড়ল।এখন ওকে কেমন যেন বউ বউ লাগছে।আগের সেই কিউটনেস ভাবটা চলে গিয়ে কিছুটা ম্যাচিউর্ড লাগছে।হা হা..রিয়া মা হবে?হুর ও তো আমার বউ।আচ্ছা বেবি হলে রিয়া আমাকে ভুলে গিয়ে ওদের নিয়েই থাকবে!আমাকে আর কেয়ার করবেনা?আমার বুকটা খালি করে ঘুমাবে?টি-শার্টের কলারে হাত চেপে কে ঘুমাবে?আমি বাবা হব!😍😍এই রিয়া আমি বাবা হব?রাস্তার মাঝে একটা লোক আমার কথা শুনে তাকিয়ে আছে।রিয়া আমার দিকে তাকিয়ে আছে।কি লজ্জা কি লজ্জা!!ছিঃ আমি এতটা নির্লজ্জ হলাম কবে থেকে?সব রিয়ার দোষ।হঠাৎ রিয়া বলল সব আমার দোষ তাইনা?আচ্ছা রিয়া কেমনে জানল আমি ওকে এখন দোষ দিচ্ছি?মেয়েটা জাদুটোনা জানে নাকি?এই পিচ্চি বর দেখো এটা কেমন?এটা কি?এটা পাটের তৈরী ব্যাগ।পঁচে যাবে তো।ওই আমি কি এটা বৃষ্টিতে নিয়ে ঘুরব নাকি?দোকানদার আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।ভাই আপনার নাম পিচ্চি বর রাখছে আমার আম্মা না আব্বা?ওহো এই লোকটা এত মাথা মোটা কেন?কেউ রাখে নাই ভাই।আমার বউ রাখছে।জন্ম নেয়ার আগে বউ পাইলেন কই?আপনি বুঝবেন না ভাই।আপনি আমার সাথে কথা না বলে বিক্রি করেন।একটা টুপি দেখা যাচ্ছে ওই দোকানে।রিয়া ওই দোকানে চলো।গিয়েই পুতুলটাকে টুপি পড়িয়ে দিলাম।ওয়াও!!হেব্বি লাগছে তোমাকে।আমার ভালো লাগেনি।কি হ্রামি বউ!😱😱আমি দিচ্ছি নাও এটা।বললাম তো ভালো লাগেনি।ওহ… রিয়া, হোয়াই আর ইউ ডোমিনেটিং মি?কই তুমি কি হইছে যে তোমাকে ডোমিনেট করব?এদিকে এসো।দেখ তো ওই ড্রেসটা কেমন। ওয়াক একদমই বাজে।ওইটাই নিব। আমি বিল পে করবনা।হাহা..তুমি করবে তোমার ঘারে করবে।আমার সাথে সোজা দোকানে গিয়ে ড্রেসটা প্যাকিং করতে বলল।তারপর নিয়ে বের হয়ে আসল।আমি বের হব এমন সময় দোকানদার বলে ভাই বিলটা!কি খ্রাপ বউ!ফাসায় দিয়া চইলা গেল।দোকানের বাইরে এসে ওর পাশে দাঁড়ালাম।কি মশাই আপনি নাকি পে করবেন না?এটা বউ নাকি হাঙ্গর মাছ!শুধু শক্তির বড়াই দেখায় আর আমাকে বার বার খেয়ে ফেলে।আবার বমি করেও দেয়। আমি কেন ওকে বেবি দিলাম।😭😭 এখন ও আমাকে পাত্তাই দিচ্ছেনা।সারাটা দুপুর শপিং শেষে বিকেলে ক্লান্তি নিয়ে রিয়া ঘুমিয়ে পড়ল।আর আমি ঘুমাতে পারছিনা।ছটফট করছিলাম একা একা।হঠাৎ রিয়া ঘুম থেকে উঠে আমার এই অবস্থা ডাইনির মতো খিল খিল করে হাসতে শুরু করল।ভয়ে ঘরের এক কোনায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার এই দুরাবস্থা দেখে রিয়া অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।আমি পারছিলাম না নিতে।শেষে ঘরের কোনায় বসে পড়লাম।চোখ বন্ধ করে আছি কিন্তু চোখের পানি ঠিকি বেড়োচ্ছে।হঠাৎ শরীরে একটা কোমল স্পর্শ পেলাম।মুহূর্তের মধ্যে শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল।রিয়া আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।আমিও কাঁদছি।রিয়াকে কখনও এরকমটা মনে হয়নি যতটা এখন ওকে ফেস করছি।এখন ওকে আমার বউ বউ লাগছে।তাহলে কি এতক্ষণ ডাইনি ভর করেছিল?পিচ্চি বর ভালোবাসি।আমাকে দুই হাত দিয়ে রিয়া উঠালো।চোখের পানি মুছে দিয়ে দেয়ালের সাথে আমাকে আটকে ফেলল।আমার চোখে রিয়া চোখ রেখে তাকিয়ে আছে।কি যেন চায় মেয়েটা।কিছু একটা বলতে চায় আমাকে।হঠাৎ পায়ের উপর পা উঠিয়ে ও আমার কপালে চুমু একে দিল।আমার কান্না,ক্ষোভ,অভিমান সব নিমিষেই পানি হয়ে গেল। কিছু বলব এমন সময় রিয়া আমার মুখ বন্ধ করে দিল।কিছুই বলতে পারছিনা।আমার হাতটা নিয়ে রিয়া ওর কোমড়ে লাগিয়ে দিল।আমি কেমন যেন হয়ে গেলাম।নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল।আমি কিছুই করতে পারলাম না।কিছুক্ষণ পরে রিয়া আমার বুকে মুখ লুকাল।আমাকে দেয়ালের সাথে আটকে দিয়ে ও আমার শরীরের মাঝে মিশে যেতে চাচ্ছিল।ভীষণ চাপ অনুভব করছিলাম।ওর হাতের নখগুলো আমার পিঠে দাগ কেটে দিয়ে গেল।জীবনের প্রথম এরকম একটা অনুভূতি পেলাম।মানুষ এরকম সুখের সাগরে হারিয়ে যেতে পারে তা আমি জীবনেও কল্পনা করিনি।রিয়া আমার সেই কল্পনা বাস্তবোচিত করল।আমার পুতুল বউটাকে পুতুল বললে ভূল হবে।পুতুলের মাঝেও যে অনুভূতি পাওয়া যায় তা রিয়া আমাকে না শেখালে কখনও জানতামই না।আমি কি গাধা ছিলাম।রিয়া আমার জীবনে এসে পক্ষান্তর ঘটিয়ে ফেলল।তারপর আমাকে একের পর এক নতুন নতুন অনুভূতির সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।জীবনের শুরু থেকে যদি রিয়া আমার জীবনে থাকত তবে কতই না ভালো হতো।আমি সবকিছু অনেক বেশি বেশি করে উপভোগ করতে পারতাম।পুতুলটা বুকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে।চুপ করে নিয়ে ওকে শুইয়ে দিয়ে আমি শুধু দেখছি রিয়াকে।ভাবছি এই মেয়েটা আমার জীবনকে রাঙিয়ে দিল।কি আছে এই মেয়ের মাঝে?একা একটা মেয়ে,ছোট্ট একটা দেহ কিন্তু তার মাঝে এতটা ভালোবাসা,রোমান্টিকতা,প্রেম।মেয়েটাকে যদি আগেই পেতাম তাহলে আরো কতকিছু শিখতে পারতাম,কত অভিজ্ঞতা হতো।সন্ধা হয়ে যাওয়ার পর রিয়া ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখে আমি ওর দিকে হা করে তাকিয়ে আছি।কি হলো কি দেখছো?আমার ছোট্ট আদুরে পুতুলটাকে দেখছিলাম।তুমি ঘুমাওনি?না।কেন?তোমাকে এত সুন্দর লাগছে যে বারবার তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল।তাই না ঘুমিয়ে তোমাকে দেখছিলাম।আমার কথা শুনে রিয়া কেমন যেন হয়ে গেল।বুঝতে পারছেনা ও কি বলবে।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল।হুট করে আমাকে জড়িয়ে ধরল।পিচ্চি বর তোমাকে ভালোবাসি।কতক্ষণ এরকম ছিলাম জানিনা।রিয়া আমাক জড়িয়ে ধরলে আমার মেডিটেশন হয়ে যায়।ও আমার বুকে থাকলে ঘুম পালিয়ে যায়।হঠাৎ আযানের শব্দে দুজনের ঘোর কাটল।আমি রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছি।নামায পড়বেনা?হ্যা,যাও ওযু করে আসো।নামায শেষ করলাম দুজন তারপর ডিনার করতে বের হলাম বাইরে।একটা ভালো রেস্টুরেন্টের খোঁজ নিলাম হোটেল বয়ের কাছ থেকে।সেখানে গিয়ে দেখলাম লোকজন খুব কম।একদম পাহাড়ের চুড়ায় রেস্টুরেন্ট।চারদিক অনেক সুন্দর করে সাজানো গোছানো।দুইদিকে জানালা খুলে দেয়া।আসলে খাবার খুব একটা মুখরোচক না হলেও জায়গাটা দেখেই মন ভরে যায়।রিয়া তো ওখান থেকে আসতেই চাইছিল না।রাতে হোটেলে ফিরলাম দুজনে।নিরব নিস্তব্ধ রাঙামাটির রাস্তাগুলো।ওই দুর পাহাড় থেকে কিছু অজানা শব্দ কানে ভেসে আসে মাঝে মাঝে।তাছাড়া সবকিছু কেমন যেন স্বপ্নের মত সুন্দর।রিয়া রাতে চুলে তেল দিয়ে দিতে বলল।ওর মাথা নাকি অনেক চুলকাচ্ছে।চুলে তেল মেখে দিচ্ছি পুতুলটাকে।মেঘকালো চুলে রিয়াকে আমার বেশ ভালোই লাগে।জানালার পাশে বসে ঝিরি ঝিরি বাতাসে বউয়ের চুলে তেল দেয়াটা কেমন যেন বেমানান লাগছে।কিন্তু রিয়াকে যদি আমি শুধুই বউ ভাবতাম তাহলেই শুধু এমনটা মনে হত।কিন্তু রিয়া আমার অক্সিজেন যাকে ছাড়া একমুহূর্ত বেঁচে থাকা অসম্ভব।ও সকালবেলা আমার সাথে এমন করাতে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।বুঝতে পারছিলাম রিয়াকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকাটা অসম্ভব।মেয়েটা কয়েকদিনেই আমার সবকিছু কেড়ে নিল।শান্তিমত শ্বাস-প্রশ্বাস নিব সেটাও অনেক কঠিন হয়ে গেছে।আমি রিয়াকে আমার করে নিতে পারলাম না।উল্টো রিয়া আমাকে ওর করে নিলো।মাথায় তেল দিয়ে চিরুনি করে দিলাম।অনেক রাত হয়ে গেছে।দু একটা পাহাড়ি শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে।রাতটা কেমন যেন বেশিই রোমান্টিক।উহু.. সেটা আবার রিয়ার জন্যই।কালকে সকালে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হব।সমুদ্রের বিশাল জলরাশিতে আমি আর রিয়া হারিয়ে যাব।সুর্যাস্ত দেখব রিয়ার কাধে মাথা রেখে।

ঘুম ভেঙ্গে দেখি পুতুলটা বুকের সাথে আঠার মত লেগে আছে।মেয়েটা আমার সাথে মাঝে মাঝে পাগলামি করে আবার মাঝে মাঝে ভালোবাসি বলে। নির্ঘাত এই মেয়ের কোনো সমস্যা আছে।আল্লাহ্‌ 😱আমি কি বোকা?নিজের সমস্যা আগে না দেখে অন্যের সমস্যা ধরছি!আমিও বা সাধু কিসে?আমারও সমস্যা আছে।রিয়াকে প্রচন্ড ভালোবাসি।আচ্ছা পৃথিবীতে ভালোবাসা ছাড়া কি মানুষ বেঁচে থাকে?ছোটবেলা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাবা-মায়ের ভালোবাসা অটুট থাকে।তার মানে ভালোবাসা কখনও শেষ হয়না।এছাড়া বিয়ের পর বর/বউয়ের ভালোবাসা আরও যোগ হয়।তার মানে ভালোবাসা কখনও শেষ হওয়ার নয় বরং দিন গেলে আরও বাড়ে।হি হি😁😁রিয়ার প্রতি আমার ভালোবাসাও বাড়ছে।কিন্তু ডাইনি বউটা কি আমাকে ভালোবাসা দিচ্ছে?ও আমাকে প্যারা দেয় আবার ভালোওবাসে।।বুঝিনা ওর ভালোবাসা। কখন কোনটা চায় সেটাও বুঝিনা।জানালা দিয়ে সূর্য্যের সোনালি রোদ ঘরে ঢুকছে।আমি মাথাটা সরালেই রিয়ার মুখে রোদ লাগবে।সরিয়ে দিব?নাহ্ থাক তাইলে ওর ঘুম ভেঙ্গে যাবে।বউ বউ বউ….রিয়া লাফিয়ে উঠে বলে কি হইছে?কক্সবাজার যাইবা না?ছোঁচা জামাই কোথাকার!😡এই কথা কেউ এভাবে চিল্লায়া বলে?মিষ্টি করে কপালে চুমু দিয়ে জাাগিয়ে বলতে পারলিনা?সকাল সকাল মেজাজ গরম করলি।এখন যাবনা,আগে ঘুমাব তারপর।কাল রাতে তোক অত্যাচার করতে যেয়ে ঘুমাতে পারিনি।এখন ঘুমিয়ে সেটা উসুল করব।কাছে আয় ঘুমাব।মাথাটা সরিয়ে নেয়াতে রিয়ার রোদ লাগছে।মুখে রোদ লাগাতে ও কেমন যেন অনুভব করছে।বার বার মাথাটা সরিয়ে ছায়ায় আসতে চাইলেও আমি ওকে ছায়া দিচ্ছিনা।আমি উঠে ওয়াশরুমে যাব তখন দেখি বউটা আমার টি-শার্ট হাত মুচরে ধরে আছে।যেতে দাও আবার আসব তো।না।কাছে থাকো।কষ্ট করে চেপে গেলাম।😫রিয়া ঘুমুচ্ছে আর আমি দেখছি।অদ্ভুত মেয়েটাকে শুধু ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।আমার চোখটা যে কখন লেগে গেছে বুঝতেই পারিনি।হঠাৎ খেয়াল করলাম রিয়া আমার বুকের মধ্যে নেই।গেল কই তাহলে।চোখ মেলে দেখি ভেজা চুল শুকাচ্ছে একটা মেয়ে।পবিত্রতায় ভরপুর তার শরীর।চারপাশ মেয়েটার পবিত্রতায় পবিত্র হয়ে আছে।কেমন যেন একটা ঘ্রান নাকে চলে আসল।বুঝতে পারলাম এই ঘ্রান কোনো পবিত্র কিছু থেকেই পাওয়া যায়। একটা সাদা শাড়ি হালকা কোমড় বের করে পড়া,শাড়িতে মাঝে মাঝে ছোপ ছোপ লাল দাগ।শরীরে পবিত্র পানি এখনও শুকিয়ে যায়নি।চুল দিয়ে টপটপ পানি বেয়ে পড়ছে আর পিঠ ভিজে যাচ্ছে।সুর্য্যের আলো মেয়েটার শরীরে এসে পড়ছে আর পানিগুলো শুষে নিচ্ছে।চুলে সাদা টাওয়াল লাগিয়ে একপাশে সবগুলো চুল এনে দুহাতে পানি মুছে দিচ্ছে।তার মেঘ কালো চুলের মাঝে সাদা টাওয়ালকে মনে হচ্ছে কোনো বরফের টুকরা জড়িয়ে আছে চুলে।কি সব ভুলভাল জিনিস দেখছি ঘুম ঘুম চোখে।দুহাতে চোখ মুছতেই সত্যটা বেড়িয়ে এলো।যাকে একটা মেয়ে ভাবছিলাম সেটা আমারই পুতুল বউ রিয়া।এই মেয়েটার অদ্ভুত সব সৌন্দর্য।আচ্ছা রিয়া কি আসলেই সুন্দরী?নাকি আমি ওর সৌন্দর্যের উপমা খুজে পাই বলে ও সুন্দরী?কি জানি কোনটা সঠিক বলতে পারবনা।তবে রিয়া আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে যার ভালোবাসার গভীরতায় চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া যায়,যাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করা যায়।রিয়ার মত মেয়েকে ভালো না বেসে পারাই যায়না।এই পিচ্চি বর ওঠো।যাও ফ্রেশ হয়ে নাও বের হব আমরা।ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি রিয়া রেডি হয়ে বসে আছে।আমাকে পোশাক পড়িয়ে, শার্টের বোতাম লাগিয়ে, চুল আঁচড়ে রেডি করে দিল।আসলেই তো আমি রিয়ার পিচ্চি বর।ও আমার সবকিছু করে দেয় যেমনটা পিচ্চি থাকতে আম্মু করে দিত।আমি এখনও পিচ্চিই রয়ে গেলাম।কবে বড় হব আমি?😭আচ্ছা আমি এরকম বেবি টকিং করি কেন?ওমা! আমি যে একটা মেয়ের পিচ্চি বর।ইশ.. রিয়া যদি সেই ছোট্টবেলার পুতুল খেলার সাথি হত তবে তখনই ওকে বউ করে নিতাম।তাহলে এই ২০ বছর রিয়াকে ছাড়া থাকতে হতনা।আমি রিয়াকে আরো বেশি ভালোবাসতে পারতাম বেশি ভালোবাসা পেতাম।ভাগ্যে সবকিছু মনের মত হয়না।কিছু জিনিস চেপে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।আচ্ছা আমি যে রিয়ার প্রতি সব ভালোবাসা লিখে সবাইকে জানাচ্ছি এতে কি ভালোবাসা কমে যাবে?হুর..তা কেন কমবে?রিয়া জানে আমি ওকে কতটা ভালোবাসি।হোটেলের দেনা পাওনা মিটিয়ে কক্সবাজারের বাসে উঠে পড়লাম।রিয়ার সাথে সমুদ্র দেখব, মজাই আলাদা।একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম।বিয়ের আগে বন্ধুদের সাথে থাকতেও আমি ফোন ইউজ করতাম না হয় কবিতার বই হাতে থাকত।কিন্তু রিয়া আমার জীবনে আসার পর ওসবের কোনো প্রয়োজনই হচ্ছেনা।রিয়া পাশে থাকলে আমি সব ভুলে গিয়ে ওর মাঝে মগ্ন থাকি।পাহাড়ের গিরিখাত বেয়ে বাস চলছে প্রচণ্ড গতি নিয়ে।একটু ভুল হলেই জীবন শেষ।হুর কিসব ভাবছি আমি!রিয়া পাশে থাকলে এসব কখনও হবেনা।কক্সবাজার পৌছে গেলাম খুব তারাতারি।রিয়াকে নিয়ে আগে থেকেই চেনাপরিচিত একটা ভালো হোটেলে উঠলাম।রিয়ার মনটা আজ অনেক ভালো।পথে কোনো দুষ্টুমি করে নাই।সবার সাথে ফোনে কথা বলে নিল।এই পিচ্চি বর শোনো বিকেলে সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবা কিন্তু।ওর কথায় সায় দিয়ে খোজ নিলাম জোয়ার-ভাটার হিসাব।নাহ্ বিকেলে জোয়ার-ভাটা কোনোটাই নেই।তার মানে সৈকতে আজ বেশ মজা করা যাবে।বিকেলে সমুদ্র দেখতে বের হতে গিয়ে সমস্যা হলো পোশাক নিয়ে।আমি ছেলে মানুষ তাই পোশাকে কোনো সমস্যা থাকলোনা।কিন্তু পুতুলটাকে নিয়ে ঝামেলায় পড়লাম।শেষে শাড়ি বাদ দিয়ে সালোয়ার কামিজ পড়ে সৈকতে যাওয়ার জন্য বের হলাম।দুর থেকেই সমুদ্রের উত্তাল জলরাশির ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।রিয়া বেশ খানিকটা উৎফুল্ল।সৈকতে পা রাখতেই রিয়া অতি দুর সমুদ্রের পরে পার খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো।পিচ্চি বর এখানে না আসলে ভাবতেই পারতামনা পৃথিবীটা এত বড়।আর আমার ভালোবাসা এর চেয়েও বড়।এহ্ আইছে লেকচার মারতে।বুঝলাম রিয়া ঝগড়ায় মেতে উঠতে চাচ্ছে তাই চুপ করে রইলাম।আমি আর রিয়া খালি পায়ে সৈকতের বালুতে পা মিলিয়ে মিলিয়ে হাটছি।রিয়া সাগরের দিকে থাকায় ওর চুলগুলো আমার মুখের উপর উড়ে এসে পড়ছে।রিয়ার ওড়না মাঝে মাঝে উড়ছে সাগরের উত্তাল বাতাসে।সুন্দর,সুবর্ণ,অপূর্ব,লাবণ্য,রুপসী,রুপেতে অনন্য আমার রিয়া।যার সবকিছুর মাঝেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই।ও পিচ্চি বর।কি?চলো ভিজি।ঠান্ডা লাগবে যে আর গায়ে বালু লাগবে।তো কি হইছে।গোসল করে নিব পরে।চলো যাই।রিয়া নামতে ভয় পাচ্ছে কারন ও সাতার জানেনা।আমি ছেটবেলায় গ্রামের বাড়িতে একমাস থেকেছিলাম।ওই সময় ছোট চাচ্চু আমাকে সাতার শিখিয়েছিল পুকুরে।রিয়ার ভয় কমিয়ে ওকে নিয়ে গেলাম পানিতে।ঠান্ডা বালুময় পানিতে সারা শরীর মুহূর্তেই ভিজে গেল।প্রথম ঢেউয়ের কবলে পরে রিয়া প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে।বুঝলাম রিয়ার হাত ছেড়ে দেয়া যাবেনা।ওর হাত চেপে ধরে রেখে পানিতে ভিজলাম।রিয়া ভয় পাচ্ছে খুব।প্রচণ্ড ঠান্ডায় থাকতে না পেরে রিয়া বলেই দিল বাসায় যাব।ওকে নিয়ে হোটেলে ফিরে গোসল করে চেঞ্জ করলাম।সন্ধা হয়নি এখনও।পশ্চিম আকাশে সুর্য্য রক্ত বর্ণ ধারন করছে।এমন সময় রিয়া সৈকতে আবারও যাবে তবে এবার ভিজতে নয়।সাগরের সাথে নাকি ওর অনেক কথা জমে আছে।রিয়া আর আমি পাশাপাশি হাটছি।কালো শাড়িতে রিয়াকে বেশ মানিয়েছে।বাতাসে শাড়ির আচল উড়ছে,চুল উড়ছে আর উড়ছে আমার মন।কিন্তু রিয়া চুপ করে আছে কোনো কথাই বলছেনা।নিরবতা ভেঙ্গে প্রশ্ন করলাম কিন্তু কোনো উত্তর নেই রিয়ার।মনে হয় ও কথা বলতে চাচ্ছেনা।পশ্চিমাকাশ রক্ত বর্ণে রঞ্জিত।সোনালি সূর্য্যটাও লালা বর্ণের হয়ে গেছে।রিয়া একটা পাথরের উপরে বসে ওই দুরে তাকিয়ে আছে।জীবন থেকে একটা দিন মুছে যাচ্ছে।বেরসিক সূর্য্যটা পানির মধ্যে ডুবে গেল।রিয়া পাথরের উপরে বসে তাকিয়েই আছে।এই ফাকে আমি ফোনের ক্যামেরায় রিয়াকে বন্দি করে ফেললাম।ক্যামেরার আলোতেও ওর মনযোগ ভাঙ্গতে পারলাম না।এরকম গোমড়া মুখো হয়ে কি দেখছে রিয়া?অথচ আমরা নাকি স্বামী-স্ত্রী।চুপচাপ আমিও বসে গান শুরু করলাম।চলো না ঘুরে আসি অজানাতে যেখানে নদী এসে থেমে গেছে।আবার এলো যে সন্ধা শুধু দুজনে।পিচ্চি বর একটু চুপ করবে?আমাকে সমুদ্রের বিশালতা আর গভীরতাকে উপভোগ করতে দাও।চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় নেই।ডাইনি বউ সমুদ্র দেখছে তাই আমিও তার সাথে সমুদ্র দেখছি।তবে আমার ফিলিংসের অভাব থাকার কারনে সমুদ্রের বিশালতা,গভীরতা কোনোটাই উপভোগ করতে পারছিনা।সন্ধা নেমে গেছে।রিয়াকে বললাম ফিরতে হবে।ও আর কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে আসলো রুমে।ডিনার করে দুজনে রুমে এসে বসলাম।হঠাৎ রিয়ার মুখে কথা ফুটল।পিচ্চি বর একটা জিনিস আজকে অনুভব করলাম।কি?তোমাকে আমি ওই সমুদ্রের বিশালতার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।আর ভালোবাসার গভীরতার কাছে সমুদ্রের গভীরতা মামুলি ব্যাপার।এসব তো সিনেমার ডায়ালগ পিচ্চি বউ।এগুলো আমাকে কেন শোনাচ্ছ?ওই তুই কি আমার বয়ফ্রেন্ড যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আমাকে এসব সিনেমার ডায়লগ মারতে হবে?সেটাও মন্দ বলনি।তাহলে সিনেমার ডায়ালগ কেন বলছিস?আমার তো আর তোমার মত ফিলিংস নাই, তাইনা?ছোঁচা জামাই বলেই বালিশ দিয়ে ঢিল শুরু করল।এই মেয়েকে এখন থামানো বড়ই কষ্টকর ব্যাপার।বুঝছি এখন তার আমাকে দরকার।যাই কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে একটু ভালোবাসা দেখাই।পারলে ওই সমুদ্র থেকে কিছু ভালোবাসা নিয়ে আমার ভালোবাসার পুকুরে রেখে দিব।দেরী না করে এখন এটা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
চলবে(…..)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here