পুতুল বউ 💔পর্ব ৫

0
58

“পুতুল বউ”
পর্ব-৫
~
বিকেল বেলা অফিস থেকে ফিরে দেখি রিয়া বিছানায় পুতুলের মত জরসরো হয়ে শুয়ে আছে।কেমন যেন বুকের মধ্যে একটা অসার হয়ে যাওয়া অনুভূতি বিদ্যুৎবেগে খেলে গেল।আমি কেমন যেন হয়ে গেলাম।গোসল করে ক্যাজুয়াল ড্রেস পড়ে রিয়ার পাশে বসলাম।মা ডাইনিং থেকে ডাকছে আমায়।আমার একদমই যেতে মন চাচ্ছিল না।রিয়ার মুখটা কেমন মায়াবী লাগছে।ওর কালো ভ্রু আমায় ডাকছে।নাহ্ রিয়া আমাকে অদ্ভুত এক উপায়ে কাছে টানছে।বিয়ের কয়েকদিনের মাঝেই ও আমার কত আপন হয়ে গেছে।বাসায় ফিরে রিয়ার কালো মায়াবী মুখটা না দেখলে ছটফটানি হয়।অফিসে বসে ওর কথাই ভাবি যে বাসায় কখন যাব আর আমার পুতুলের মত সাজিয়ে রাখা বউটাকে কখন দেখব।আগে আমি এমন ছিলাম না।সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গার পর নাস্তা করে অফিসে যেতাম।ফিরতাম খুব তারাতারি তারপর একটা লম্বা ঘুম দিয়ে সন্ধায় বন্ধুমহলের আড্ডাখানায় রাত ১০ পর্যন্ত চলতো আড্ডা।বাসায় ফিরে খাওয়াদাওয়া করে নিউজ,ফেসবুক চেক,ক্লাব ফুটবল দেখে ঘুম।রিয়া আমার জীবনে এসে এসব বদলে দিল তার সাথে আমাকেও বদলে দিল।আগে সারাদিন কি সব আজেবাজে চিন্তা করতাম আর এখন চিন্তা করি রিয়াকে নিয়ে।এসব চিন্তা করতে করতে রিয়ার কপালে চুমু এঁকে দিলাম। ডায়নিং -এ যাব খাইতে এমন সময় রিয়া আমার হাত টেনে ধরল।মনে হয় ওর ঘুম ভেঙে গেছে।আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছি।কিছু যেন ও বলতে চাইছে কিন্তু পারছেনা।নিরবতা ভেঙে বললাম তুমি খাইছো?আমি তোমাকে না খাইয়ে কখনও খেতে পারি।এসো চলো খাবে আমার সাথে।মা টেবিলে খাবার দিয়ে গেছে।রিয়া উঠতেই চাচ্ছেনা।অগত্যা ওকে কোলে নিয়ে ডাইনিংরুমে চলে গেলাম।চেয়ারে বসিয়ে আমার পুতুলকে আগে খাইয়ে দিলাম।রিয়ার চোখে পানি টলমল করছে।তুমি কাঁদছো কেন?কই নাতো?ও লুকিয়ে গেল ব্যাপারটা।মেয়েরা যেন কেমন টাইপের হয়।নিজের মনের কথা,চাপা অনুভূতি,ভালোবাস
া,কষ্ট,অভিমান,রাগ এসব পুষে রাখে খুব যত্ন করে।সৃষ্টিকর্তা মেয়েদের এই ক্ষমতাটা দিয়েছেন খুব ভালোভাবে।আর পুরুষেরা এই ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত।বেশিরভাগ পুরুষ মেয়েদের ডোমিনেট করতে পছন্দ করে।মেয়েদের দাসি ভাবে।মনে করে মেয়েরা জন্মেছে পুরুষের সেবা করার জন্য।আসলে কি তাই?একটা পুরুষও মানুষ একটা নারীও মানুষ।এদের সবার সমান অধিকার।প্রত্যেক স্বামী তার স্ত্রীর হক আদায় করবে এটাই নিয়ম।আমিও সেটা করার চেষ্টা করি।রিয়ার কিছু হলে আমি মনে হয় বাঁচবোনা এটা টের পাই।এই কয়েকদিনে ও আমাকে ওর দিকে ডায়ভার্ট করে নিছে।উহু ডোমিনেট করে নয় ভালোবাসা দিয়ে।মেয়েরা ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবী জয় করার সামর্থ্য রাখে।রিয়া ওর সামান্য ভালোবাসা দিয়ে আমাকে জয় করেছে।আমি সত্যিই রিয়াকে ভালোবেসে ফেলছি।খাওয়া শেষে পুতুলটাকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আমি রুমেই হাটাচলা করলাম।ও আমায় কাছে ডাকছে।নাহ্ পারিনা রিয়াকে ইগনোর করতে।ওর পাশে যাওয়ার পর আমার টিশার্টের বুকের সামনের গলা ধরে আমার হাতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।কি অদ্ভুত মেয়েটা।দুইদিন আগে আমাকে চিনতো না এখন কত আপন করে নিছে আমাকে।ওর কয়েকটা চুল আমার মুখের উপরে বাতাসে ঘোরাফেরা করছে।মেয়েটা কালো হলেও বেশ মায়াবী আর সুন্দরী(আমার কাছে)।সন্ধায় ঘুম থেকে উঠে নামায শেষে রিয়ার আবদার শুনতে হচ্ছে।তখন ঘুম আর ক্ষুধার জন্য আমাকে প্যারা দেয়নি কিন্তু এখন ওসবের ছিটে ফোটাও নাই তাই অত্যাচার শুরু হচ্ছে ধীরে ধীরে।এটা কেমন মধুর অত্যাচার?ও রান্না করছে আর আমি ওকে পাহাড়া দিচ্ছি।কেন দিচ্ছি? ওর গায়ে যদি আগুন লাগে সেজন্য।আমিও কেমন যেন হয়ে গেছি।সবসময় রিয়ার পাশে থাকতে ভালো লাগে।তাহলে কি আমি বউ পাগলা?ধুর তা হতে যাবে কেন?রিয়াকে ভালোবাসি তাই ওর পাশে থাকি আর টেক কেয়ার করি এখানে বউ পাগল হওয়ার কি আছে?আমার মাথায় এসব চিন্তা আসছে কেমনে?আচ্ছা রিয়ারও কি এমন চিন্তা আসে মাথায়?জিজ্ঞেস করে দেখব?নাহ্ থাক।যদি আবার ডায়নি রুপ ধারন করে তবে এবার হাত দিয়ে নয় বটি দিয়ে গলা নামাবে।হায় খোদা?আমি বউকে ভয় পাই?আরে ধুর ছাই!বউয়ের মিষ্টি আদরগুলোকে ভয় পাই আমি।লাউ গাছের ফুলের বরা ভাজতেছে রিয়া।এক কাজ করি লাউ গাছের ফুল দিয়ে ওকে প্রপোজ করি!ওয়াক!বউকে কেউ প্রপোজ করে?গার্লফ্রেন্ডকে প্রপোজ করতে হয় তাইলে রিলেশন টেকে বেশিদিন।বউকে প্রপোজ করলে ডিভোর্স হয়।রিয়াকে পেছন থেকে কেমন যেন জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে।ইচ্ছে করছে ওর কোমড়ে হাত দিই।ছিঃ রিয়ার পারমিশন ছাড়া গায়ে হাত দিলে ও কি ভাববে?ভাববে আমি খারাপ ছেলে।আচ্ছা রিয়া আমার বউ তাই যা ইচ্ছা তাই করব তাতে খারাপ ভাবার কি আছে?নাহ্ আমি ওকে ভোগ্য পণ্য ভাবতে পারিনা।ও আমার পথ চলার সাথী।ওর সাথে এমনটা করা ঠিক হবেনা।পিচ্চি বর?হ্যা বলো?এসব আজে বাজে চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো আর আমাকে পেছন থেকে কোমড় জড়িয়ে ধরো।কি লজ্জা কি লজ্জা!রিয়া জানলো কেমনে আমি এসব ভাবছি?ওর ইন্দ্রিয় এতটা সচল ভাবতেই অবাক লাগছে।মন চাইছে প্লেট দিয়ে ওর মাথায় ঠাস করে একটা মাইর দিই।এত বোঝে কেন আমাকে?আমিতো কিছুই বুঝিনা খালি অাজেবাজে চিন্তা করি।গাধা জামাই একটা।রান্না শেষ হলো প্রায় নয়টায়।রিয়া ফ্রেশ হয়ে এসে বলে এই আমাকে কেমন লাগছে?এই রাতের বেলায় ও শাড়ি কেন পড়ল বুঝলাম না।কালো মেয়ে কালো শাড়ি, ভেজা চুলগুলো ছেড়ে দেয়া এখনও চুল দিয়ে টপটপ পানি পড়ছে।এ কেমন পবিত্রতা? এরকম পবিত্রা কখনও দেখিনি তো!এমনকি চিন্তাও করিনি একটা মেয়েকে গোসলের পর ভেজা শরীরে, ভেজা চুলে এতটা পবিত্রা লাগে।জীবনটা আসলেই অদ্ভুত ধরনের।রিয়াকে না পেলে আমার এসব কখনও দেখাই হত না,লেখাও হত না আর চিন্তা করাও হত না।মেয়েটা আমার জীবনে এসে সব চিন্তাভাবনার মাঝে পক্ষান্তর ঘটাল আর আমি ভালোভাবেই সবকিছু মনের চোখ দিয়ে দেখতে পারলাম এবং পারছি।এ কেমন মেয়ে!যাদুটোনা করল নাকি আমাকে?ব্লাক ম্যাজিক?ওয়াক জামাইকে কেউ ব্লাক ম্যাজিক করে?রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়েছি।মধ্যরাতে রিয়া ঘুম থেকে উঠে বলে এই পিচ্চি বর ঔঠ।কি হইছে?আমার হাতে মেহেদী দিয়ে দাও।কি হ্রামি বউরে!!মাঝরাতে এসব কথা বলে কেন?ঘুম আসছেনা?এসো ঘুমিয়ে দেই তোমাকে।ওই আমি তোক বলছি মেহেদী দিয়ে দিতে ঘুমিয়ে দিতে নয়।কানে কম শুনিস নাকি?আমি মেহেদী দিতে পারিনা।আম্মু আমাকে বলেছে তুই ভালো মেহেদী দিতে পারিস।হায়রে মা আমার!এটা না বললে কি হত না?অত্যাচারটা সহ্য করতে হত না তাইলে।জীবন শেষ করে দিচ্ছে এই মেয়ে।মাঝরাতে বউয়ের হাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছি না ঘুমিয়ে।পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় নিপীড়িনের ঘটনা একটাও খুজে পাওয়া যাবেনা।এই শোনো?আবার কি?বাইরে চলো তিন নাম্বার রোডে ফুসকা বিক্রি হয় সারারাত।হ্যা, তো?ওই! তো আবার কি?ফুসকা খাওয়াইতে নিয়ে চলো।এরকম উতাল-পাতাল বউ আমার কপালে কেন দিছো খোদা?একটা বোবা আর ল্যাংড়া বউ দিলেই শান্তিতে থাকতে পারতাম।না পারতো কিছু বলতে, না চাইতো কিছু খেতে, না চাইতো বাইরে বের হতে।হাতে মেহেদী নিয়ে কেউ ফুসকা খায়?তোমার হাতে খাব।ওরে আল্লাহ্ আমারে তুইলা নাও।গেলাম তিন নাম্বার রোডে ফুসকা খাইতে।গিয়ে ফুসকা অর্ডার করলাম।রিয়াকে খাইয়ে দিচ্ছি।একবার বললও না তুমিও খাও।স্বার্থপর বউ।এই শোনো?আবার কি?আইসক্রিম কিনে দাও খাব।বাম হাত দিয়ে খেতে হবে কিন্তু।কিহ্ আমি বাম হাত দিয়ে খাব তোর ডান হাত ভালো থাকতে?হাত ভেঙে ঝুলিয়ে রাখব জাদুঘরে।আচ্ছা আচ্ছা আমি খাইয়ে দিচ্ছি।বাসায় এসে ঘুমাব এমন সময় কানের কাছে এসে বলে ভালোবাসি।কেমনটা লাগে?এরকম প্যারার নাম কখনও ভালোবাসা হয়?পিচ্চি বর।কি?বিকেলে তোমার হাতে খাবার খেয়ে আমার খুব ভালো লাগছিল।ইচ্ছে করছিল আবারও তোমার হাতে খেতে।তাই মাঝরাতে উঠে তোমায় ডেকে নিজের হাত বন্ধ করলাম মেহেদী দিয়ে।তারপর তোমায় নিয়ে গেলাম ফুসকা খাইতে যাতে তোমার হাত দিয়ে খেতে পারি।ফুসকা খেয়েও শান্তি হচ্ছিল না।আরও তোমার হাতে খেতে মন চাচ্ছিল।তাই পরে আইসক্রিম কিনতে বলছি।আমি শুুধু অবাক হয়ে রিয়ার কথা শুনছি।এমন বিটলামি বুদ্ধি ও পায় কোত্থেকে? তোমাকে অনেক কষ্ট দেই তাইনা?তুমি অনেক রাগ করো আমি বুঝি।কিন্তু জানো তোমাকে সবসময় চাই, সবসময় ভালোবাসি তাই এমন করি।ঘুমের মাঝেও তুমি আমার চিন্তার কারন হইছো।কেমনে থাকি বলো তোমায় ছেড়ে।আল্লাহ্ কারে দিছো তুমি আমার ভাগ্যে! এ মেয়েকে না পেলে আমার অর্ধেক জীবন না দেখা থাকত।আলহামদুলিল
্লাহ্। হাজার শুকরিয়া তোমার দরবারে এমন একটা বউ দিছো আমারে।
চলবে(….)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here