পুতুল বউ 💔পর্ব ৬

0
44

“পুতুল বউ”
পর্ব-৬
~
সকালবেলা ঘুম ভাঙলো ঠান্ডা কোনো পানির অনুভূতিতে।চোখে মেলে দেখি আমার টি-শার্ট ভেজা।কি ব্যাপার টি- শার্ট ভেজা কেন?একি রিয়ার নাক দিয়ে পানি পড়ছে কেন?রিয়া? রিয়া?উম…কি হইছে?(ন্যাকা ন্যাকা কণ্ঠে)।তোমার নাক দিয়ে পানি পড়ছে।হাত দিয়ে নাক মুছতেই ওর হাতে নাকের ঘন পানি লাগল।ছিঃ রিয়া তুমি আমার বুকে,হাতে এগুলা কি লাগাইছো।ও হাসছে কিন্তু বুঝতে পারলাম ঠান্ডা ওকে জাপটে ধরেছে।কিহ্!ঠান্ডার এত বড় সাহস আমার বউকে জাপটে ধরছে?আমি আমার বউয়ের ভাগ কাওকে দিতে পারবনা।উহু..আমার কান্না আসছে।রিয়ার এরকম হতে পারেনা।আচ্ছা!কালকে রাতে ওকে নিজ হাতে আমি আইসক্রিম খাইয়ে দিছিলাম।তাহলে ওই আইসক্রিম ব্যাটাই আমার বউকে ঠান্ডার কাছে নিয়ে গেছে।হ্লার আইসক্রিমওয়ালা তোর বউও যেন আজ ঠান্ডায় মরে।তারাতারি উঠে গরম পানি করে রিয়াকে মধু দিয়ে চা দিলাম।ও খাচ্ছে আর নাক ঝাড়ছে।আজকে ওর রেস্ট দরকার।আমার আজ একাই রেডি হতে হবে।তারাতারি গোসল করে আমি টাই লাগাচ্ছি এমন সময় রিয়া চিৎকার করে উঠল।পিচ্চি বর আমি টাই লাগিয়ে দিব।মাথা ব্যথা নিয়ে পুতুলটা উঠে দাঁড়িয়ে আমার টাই লাগিয়ে দিয়ে আমাকে বিদায় দিল।যাওয়ার সময় শুধু ওর কপালে চুমু দিলাম আর নিজের টেক কেয়ার নিতে বললাম।না পারবনা নিজের টেক কেয়ার করতে।পুতুল আমি অফিসে গেলে কেমন করে যত্ন নিব?আমি প্রতি ঘন্টায় তোমায় ফোন করব।আম্মুকে ডাক দিয়ে বলে গেলাম রিয়ার যত্ন নিতে।অফিসে গিয়ে টেনশন কমছে না।বার বার ফোন দিয়ে ওর খোঁজ নিলাম।দুপুরে নামায পড়ে আল্লাহর কাছে রিয়ার জন্য দোয়া করলাম। বিকেলে তারাতারি বাসায় ফিরে দেখি প্রায় অনেকটাই সুস্থ্য।আল্লাহ্ আমার দোয়া কবুল করেছে।আসলে সত্যি সত্যি মন থেকে যদি কারও জন্য দোয়া চাওয়া যায় তবে সেটা কবুল হয়।কিন্তু রিয়া গোসল করেনি আজ।গরম পানি করে ওকে গোসলে পাঠালাম।গোসল শেষে ও বেড়িয়ে আসল।মাথার চুল বড় হওয়ার জন্য চুলগুলো ভেজা থাকবে অনেকক্ষণ। আর ভেজা থাকলে ওর ঠান্ডা সারবেনা।তাই ওকে বসিয়ে চুল শুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।ওর শরীর থেকে কেমন যেন গন্ধ বের হচ্ছে।প্রিয়াতমার চুলের আর গায়ের গন্ধ আমায় মোহময় করে রাখছে।সন্ধা পর্যন্ত ওর যত্ন নিলাম আর তিন মগ চা খাওয়ালাম।রিয়া এখন মোটামুটি সুস্থ্য।ওর সাথে মাগরিবের নামায পড়ে টিভিতে একটু ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের।রুমে একা থাকতে ওর ভাল্লাগছেনা তাই আমার কাছে এসে বসল।কিন্তু পুতুলটা বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলনা।শুয়ে পড়ল আমার পায়ের উপর।ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম আর সাকিব রিয়াদের ব্যাটিং দেখছিলাম।বউটা কোলের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে।টিভির সাউন্ড কমিয়ে ওর ঘুমের সুবিধা করে দিলাম।নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে পুতুলটা।মেয়েটা বড়ই অদ্ভুত ধরনের।কত আপন হয়ে গেছে আমার কাছে।ও আশ্রয় খোঁজে আমার সারা শরীরে।আমিও কেমন যেন ওকে কাছে রাখতে,আদর করতে,যত্ন নিতে ওর পাগলামি মেনে নিতে ভালোবাসি।এককথায় আমি রিয়াকে ভালোবাসতে ভালোবাসি।মেয়েটা একসময় আমাকে চিনতো না জানতো না।প্রিয় মুখ,মানুষ ছেড়ে একটু সমাজের ধরাবাধা নিয়ম (বিয়ে) মেনে আমার কাছে এসেছে।একজন পিতার কাছে তার কন্যা সন্তান যে কত আদরের তা আমার বড় আপুকে দেখে বুঝেছি।রিয়াকেও ওর বাবা তেমনি ভাবেই ভালোবাসে।কোনো এক অদৃশ্য বিশ্বাস নিয়ে তার রাজকন্যাকে আমার হাতে তুলে দিছে।একজন মানুষের দায়িত্ব দিয়েছে আমার কাধে।আমার হাতে হাত মিলিয়ে দিয়েছে নিজের সবচেয়ে প্রিয় কন্যাকে।কতটা বিশ্বাস থাকলে একজন বাবা এই কাজ করতে পারে তা ভাবার অপেক্ষা রাখেনা।নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখছি আমি।কেমন হাত আমার যে এই হাতে রাজকন্যাকে তুলে দিল?আমি কি এই দায়িত্বের যোগ্য?বাহ্ বাহ্ সাকিবের সেঞ্চুরী হয়ে গেল।চিল্লানি দিতেই রিয়া নরে উঠল।সাবধানে খেলা দেখছি যাতে ওর কোনো কষ্ট না হয়।বিয়ের আগে আমি নিজের দায়িত্বই নিতে পারতাম না এখন নিজেরটাও করি আর পুতুলেরটাও করি।ভাবছি আমি কি একজন সত্যিকারের আদর্শ স্বামী হওয়ার যোগ্যতা রাখি?রিয়া কি আমাকে নিয়ে সুখী?নাকি আমাকে ওর মনের মত করে পায়না তাই পাগলামি করে?একজন মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের এই বিষয়টা খেয়াল রাখা উচিত।বারোটা বাজে রিয়া ঘুম থেকে উঠছেনা।এমনিতেই তিন মগ চা খাওয়াইছি ওকে।রাতে ঘুমাবে না এটা শতভাগ সত্যি।আল্লাহ্ মরছি।😱 তার মানে ও আমাকে রাতে ঘুমুতে দেবেনা।খেলা শেষ হতে না হতেই পাগলী বউ ঘুম থেকে উঠল।এতক্ষন পুতুলের মত ঘুমিয়েছিল আর এখন শুরু করবে আমার উপর অমানুষিক অত্যাচার।বাহ্ ওর ঠান্ডা মাথা ব্যথা আর নেই।রিয়া চলো তোমাকে খাইয়ে দিই।আমি খাব না।কেন?ভাল্লাগছেনা খাইতে।তুমি অসুস্থ ছিলে তার তোমাকে অবশ্যই খেতে হবে।কিছুতেই খেতে চাচ্ছেনা।পুইশাকের মত হাত দিয়ে গলা পেঁচিয়ে দাড়িয়ে আমার কপালে কপাল আর নাকে নাক লাগিয়ে আছে।কিছুই বলছেনা মেয়েটা।আমি কথা বলছি আর ও আমাকে আরে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরছে।মনে হয় ও কথা বলতে আর শুনতে চাচ্ছেনা।একসময় আমার পিঠ দেয়ালে লেগে গেল।ও আমার কপালে কপাল আর নাকে নাক ঘষেই চলেছে।এমন কেন মেয়েটা?এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে কেন?আরেকটু এগোতে পারেনা?ও বোঝে না আমার কষ্ট হয়!অনেক্ষণ যাওয়ার পর রিয়ার মুখে কথা ফুটল।পিচ্চি বর?কি?বাইরে নিয়ে চল।আচ্ছা বাইরে যাওয়ার জন্য তাহলে কপালে কপাল ঠেকানো আর নাকে নাক ঘষাঘষি?কি হ্রামি বউ?কেমন ভয়ংকর উপায় বের করছে আমাকে নরম করার। কোথায় যাবে?ক্ষুধা লাগছে খাইতে যাব।বাইরে কেন?বাসায় রান্না করা আছে আমি গরম করে দিই তুমি খাও।না আমি বাইরে খাব।আর জোড় করলাম না কারন আমি জানি ওকে জোড় করে লাভ নেই।সুন্দর একটা শাড়ি কুচি দিয়ে পড়ে, হাতে চুরি লাগিয়ে, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, ঠোঁটে হালকা লিপ্সটিক নিয়ে,গলায় চিকন একটা সোনার চেইন পরে, চুলগুলো কাঠি দিয়ে বেধে সামনে আসল রিয়া।আমি কাকে দেখছি? এটা তো কোনো ফিল্মের নায়িকা!উহু ফিল্মের নায়িকারা অনেকের সাথে অভিনয় করে।রিয়া সবার সাথে অভিনয় করেনা।ও স্পেশাল।ও শুধু আমার নায়িকা।অন্য কোনো নায়কের যোগ্যতা নেই ওর সাথে অভিনয় করার।কি হলো কি দেখছো?যাবেনা? হ্যা যাব তো(অপ্রস্তুতভাবে)! বাইকে করে একটু দূরে ভালো একটা রেস্টুরেন্ট আছে সেখানে গেলাম।আলোকিত নগরীতে আলোকিত ঘরে বসে আছি দুজন।রিয়ার মনে হয় আলো ভাল্লাগছেনা।অন্ধকার চাইছে ও।আচ্ছা আলো সহ্য করতে পারছেনা কেন রিয়া?তাহলে কি ওর প্রেশার বেড়ে গেছে?রিয়া খারাপ লাগছে?পিচ্চি বর চলো স্পেশাল কাপল রুমে যাই।কেন এখানে কি খারাপ?না তবে ওখানে গেলে তোমার ভালো লাগবে।এখানেও ভালো লাগছে।তুই যাবি কিনা বল?(রেগে গিয়ে)ডায়নি ভর করেছে ওর উপর।রক্ষা নেই আর, চলে গেলাম স্পেশাল কাপল রুমে।ওয়েটারকে ডেকে যা যা খাবে তা অর্ডার করল।আর বলল একটা বড় ক্যান্ডেল নিয়ে আসতে।খাবার চলে আসলো আর রিয়া ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে দিয়ে রুমের লাইট অফ করে দিল।পিচ্চি বর তোমায় ভালোবাসি। তোমায় নিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করার ইচ্ছা ছিল তাই ইচ্ছা করে বেশিক্ষন শুয়েছিলাম।ঘুম ভাঙার পরও শুয়েছিলাম গভীর রাতের অপেক্ষায়।সামনে মোমবাতি জ্বলছে আমি স্পষ্ট রিয়া নামক ডায়নিকে দেখতে পাচ্ছি যে ডায়নিটা পুতুলের মত দেখতে।রিয়া খাচ্ছে আর আমি ওকে দেখছি।অদ্ভুত মেয়েটা।প্রতিদিন আমাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা উপহার দিচ্ছে।আজকে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করবে আমাকে বলেইনি।ভাগ্যিস ভিসা কার্ড ছিল নইলে এত টাকা বিল পে করতাম কিভাবে?ওয়েটারকে ডেকে একটা বুকে নিয়ে আসলাম চুপি চুপি।রিয়াকে ওটা দিয়ে সারপ্রাইজ দিলাম।রিয়া এতটা খুশি হবে ভাবিনি।মনে হয় আজকে রাতে ও আমার কাছে এই উপহারটাই মনে মনে চেয়েছিল।ডিনার শেষে বাইক নিয়ে বের হলাম।প্রায় রাত দুটো।পিচ্চি বর আমার রাতের শহর দেখার খুব ইচ্ছা,ঘুরিয়ে দেখাবে?আমি তোমার পিঠে মাথা রেখে পুরে শহর ঘুরে দেখব।সামনে একটা তেল পাম্প থেকে তেল নিয়ে শহরের রাজপথে বের হলাম।হালকা ঠান্ডা বাতাস, নিয়ন আলোয় রাস্তা চুপ করে ঘুমিয়ে আছে।ঘুমন্ত শহরের বুকে আমি আর রিয়া ছুটছি।রাতের শহরটা দেখতে যে এত সুন্দর তা কল্পনার বাইরে। রিয়ার মাথা আমার কাধে আর হাত আমার কোমড়ে পেঁচিয়ে রাখছে লতার মত।শহরের অলিগলিতে বাইক নিয়ে রিয়াকে ঘুরিয়ে দেখালাম।একটা ফাকা জায়গায় আসার পর দেখলাম অনেক জোনাকিপোকা উড়ছে।জোনাকির আলোয় অন্ধকার রাস্তা আলোকিত হয়ে গেছে।রিয়া আমাকে বাইক থামাতে বলল।বাইক থেকে নেমে পুতুলটা জোনাকি কুড়াতে দৌড়াচ্ছে।আমি বাইকে হেলান দিয়ে ওর জোনাকিপোকা ধরা দেখছি।ও এদিক ওদিক ছুটছে।দেখছি আর ভাবছি।এটা কেমন মেয়ে!অদ্ভুত রকমের স্বপ্ন চাওয়া নিয়ে এসেছে আমার জীবনে!অনেকগুলো জোনাকিপোকা আমার সামনে এসে উড়ছে।মনে হয় ওরা আমার কাছে ধরা দিতে আসছে।মুঠোয় মুঠোয় জোনাকি কুড়িয়ে নিলাম।রিয়া একটাও জোনাকিপোকা ধরতে না পেরে ক্লান্ত হয়ে আমার কাছে আসলো হেল্প নিতে।চোখ বন্ধ কর পুতুল।রিয়া চোখ বন্ধ করে আছে।হাতের মুঠো খুলে দিতেই কয়েকটা জোনাকি উড়ে যাচ্ছে আর কয়েকটা আমার হাতেই লেগে আছে আর আলো দিচ্ছে।রিয়াকে চোখ খুলতে বলাতেই ও অবাক এই দৃশ্য দেখছে।হ্যা রিয়া এমনটাই চেয়েছিল আমার কাছে।জোনাকিপোকা রিয়ার মুখে মেখে দিলাম।ওর গলায়, পিঠে,চুলে,শাড়িতে জোনাকি লাগিয়ে দিলাম।মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে কোনো অপ্সরী চলে আসছে নিজস্ব কোনো আলো নিয়ে।হ্যা রিয়া আমার কাছে অপ্সরীর মতই।যার রুপের কোনো শেষ নেই।প্রতিদিন নতুন নতুন রুপ নিয়ে আমার সামনে হাজির হয় রিয়া।ফযরের আযান দিচ্ছে দূরের কোনো এক মসজিদে।একটু পরই সকাল হয়ে যাবে।পুতুলটা অনেক ক্লান্ত তাই বাসায় নিয়ে ওকে ঘুমিয়ে দিতে হবে।বাইকে করে বাসায় যাচ্ছি।রুমে ঢুকে দেখি রিয়ার সাথে জোনাকিপোকাগুলো এখনও লেগে আছে।ওকে বিছানা শুইয়ে দিলাম।আমিও শুয়ে পড়লাম।আমার পাশে পৃথিবীর অপ্সরী ঘুমাচ্ছে।কত বড় ভাগ্যবান আমি।ওর ঘুমিয়ে যাওয়া দেখছি আমি সম্মোহিত হয়ে।কখন যে আমিও ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি।
চলবে(…..)

লাইক কমেন্ট না করলে পরবতী পোস্ট আপনার ফিড নিউজে যাবে না।।।
আমাদের পোস্ট গুলা নিয়মিত পড়তে অবশ্যই লাইক দিয়া কমেন্ট করবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here