পুতুল বউ 💔১৩+শেষ পর্ব

0
52

“পুতুল বউ”
পর্ব-১৩ (শেষপর্ব)
~
অফিসে লাঞ্চের সময় কলিগদের কাছেও কিছু পরাজিত প্রশ্ন শুনলাম।কেয়ার করলাম না ওসব।আমার কাছে রিয়াই সবকিছু।ভালোবাসল
ে লজ্জাশরম যে থাকেনা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমি।রিয়াকে দেখার জন্য মনটা কেমন কেমন যেন করছে।অফিস ছুটি হতে না হতেই আমি তারাতারি বাসায় চলে আসলাম।এসে দেখি রিয়া ঘুমিয়ে আছে।ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখতে ভীষন ভাল্লাগছিল।সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায় শুধু রিয়া কাছে থাকলে।ওর কপালে চুমু একে দিলাম।আজ আমি নিজেই সব কাজ করছি।রিয়া ঘুমুচ্ছে আর ওকে ছাড়া আমি খাইতে বসছি।একবার জিজ্ঞেস করা উচিৎ ও খাইছে কিনা?ওকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করাতে বলল খেয়েছে।রাতের দিকে বসে বসে ফুটবল দেখছিলাম।রিয়া হঠাৎ বাইরে ঘুরতে যেতে চাইলো।ক্যাজুয়াল পোশাকেই বের হয়ে দুজন ফাঁকাঅ রাস্তায় হাটছি।কত স্বপ্ন বুনছি বুনছি দুজন তার শেষ নেই।রিয়া আমাদের বেবি নিয়ে অনেক এক্সাইটেড।হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমরা হাটতে হাটতে অনেক দুর চলে এসেছি।কলোনি ছেড়ে অনেকটাই দুরে।কেমনে আসলাম এতদুর!ভাবতেই পারছিনা।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ২টা বেজে ৮ মিনিট।পাশেই একটা ইটের ভাটা।কয়েকজন লোক সেখানে আড্ডা দিচ্ছে।ভালো করে লক্ষ্য করলাম ওরা চারজন নেশা করছে।রিয়া আমার হাত জড়িয়ে হাটছে।লোকগুলো আমাদের দুজনকে দেখে ফেলার আগেই আমাদের সরে পরতে হবে।নইলে কিঞ্চিত বিপদের সম্ভাবনা আছে।এর আগে এখানে কয়েকটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল।আমরা দুজন তারাতারি ফিরে আসছি এমন সময় ওদের একজন আমাদের দেখে ফেলছিল।ছিনতাই করার জন্য ওরা এখানে ওৎপেতে থাকে।সুযোগ পেয়ে আমাদেরও রক্ষা হলোনা।দৌড়ে আমাদের সামনে চলে আসে ওদের একজন।আমার কাছে সবকিছু চেয়ে বসল।ভেবে দেখলাম ওদের চারজনের সাথে আমি পারবনা।একা হলে দৌড়াতাম কারন আমি জানি এই মাতালের দল আমার সাথে কখনও দৌড়ে পারবেনা।রিয়ার কথা ভেবে সবকিছু দিয়ে দিলাম।একজন ছোট্ট ছুরি বের করে আমাকে ভয় দেখাতে চাইল।ওদের মাঝে ইয়াং বয়সের একজন রিয়ার গলার চেইন নেয়ার চেষ্টা করায় আমি একটা চর বসিয়ে দিলাম।রিয়া প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে।ও আমার পিছনে টি-শার্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে।চর দেয়াতে ছেলেটা আমার গায়ে হাত তুলে ফেলল।দেখো ভাই আমি তোমাদের কেউনা।যা পাওয়ার পেয়ে গেছো এবার আমাদের যেতে দাও।কিন্তু ওই ছোট ছেলেটা রিয়ার পিছু ছাড়ছেনা।ছেলেটা আমাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে আসলে আমি প্রতিহত করতে যাই।আমার হাতে ছুরির আঘাত লেগে কেটে রক্ত বের হয়।রিয়া চিৎকার করে ছেলেটার উপর ভুল করে আক্রমণ করে বসে।তখনই বিপত্তি ঘটে যায়।রিয়াকে বার বার বলেছিলাম তুমি চুপ থাকবে।ওদের কিছু না করলে ওরা জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাবে।ওই বাকি একজন রিয়ার গায়ে আঘাত করে বসলে আমি ওদের একাই মারতে শুরু করলাম।পরে উল্টো ওরা আমাকে মারতে শুরু করে।ছুরি আর লাথির আঘাতে আমি মাটিতে পরে যাই।আমার মুখের দাত ভেঙ্গে যায়।রক্তাক্ত হয়ে আমার দেহ মাটিতে পরে যায়।ওরা রিয়াকে ইটের ভাটার দিকে টেনে হিচরে নিয়ে যাচ্ছিল।আমি কিছুই করতে পারছিলাম না।শুধু সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলাম।রিয়া আমার কাছে ফিরে আসার চেষ্টা করতে চেয়েও সফল হচ্ছেনা।ওরা রিয়াকে ওদের ছোট্ট ছাউনিতে নিয়ে যায়।আমি রিয়াকে বাঁচাতে পারছিনা।চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকছি।আমার চিৎকার কেউ শোনেনি সেদিন।আমার ছোট্ট পবিত্র পুতুলটাকে ওরা ছিড়ে খাচ্ছে।আমার চোখে কোনোদিন আমার পুতুলের এই দৃশ্য দেখতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি।রিয়ার আর্তনাদ আমাকে প্রতিটা সেকেন্ডে মেরে ফেলছিল।আমি নিজের চোখে রিয়ার অসহায় আর্তনাদ শুনছি,ওর বাঁচার আকুলতা শুনছি,পশুগুলোর অট্টহাসি শুনছি।ইচ্ছে করছিল কানের পর্দা ছিড়ে ফেলতে।আমি এই দৃশ্য দেখার জন্য এমন আর্তনাদ শোনার জন্য জন্মেছিলাম!কেউ আসেনি আমাদের বাঁচাতে।রাস্তার পাশে ইটের টুকরা দিয়ে নিজেকে শেষ করতে চাচ্ছিলাম।আমার অসহায়ত্ব আমার পুতুল বউকে ছিড়ে খাচ্ছে।এমন দৃশ্য চোখের সামনে কোনো মানুষ কল্পনা করতে পারেনা।রাস্তার উপর আমি আমার মাথা আর কপালে আঘাত করি।তাজা লাল রক্তে আমার শরীর ছেয়ে যাচ্ছে।ওদিকে রিয়া একটু সাহায্যের আশায় আমার দিকে তাকিয়েছিল।ওর তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া দেখছি আমি।আমার কান্না কেউ শুনল না।বুঝতে পারলাম ওরা রিয়াকে রক্তাক্ত অবচেতন অবস্থায় আমার কাছে ফেলে পালিয়ে গেল।কখন জ্ঞান হারিয়েছি জানিনা।দুজন মানুষের একটাই পৃথিবী ছিল।একটু আগে সেই পৃথিবী কিছু নরপশুর দ্বারা চুরমার হয়ে গেছে।পবিত্র একটা নারীদেহকে ওরা অপবিত্র করেছে।আমি একটা মানুষ হয়েও সেই পশুগুলোর হাত থেকে আমার প্রাণপ্রিয় পুতুলকে রক্ষা করতে পারিনি।কেমন নিষ্ঠুর এই পৃথিবীটা।সুখ কখনও পৃথিবীতে বেশিদিন টিকে থাকেনা।সাময়িক সময় মানুষ অতি সুখের সাগরে ভাসলেও তাকে একদিন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করলাম অন্ধকার কোনো এক জগতে।চোখে হাত দিয়ে দেখি ব্যান্ডেজ করা।রিয়ার জন্য আইসিইউ থেকেই আমি চিৎকার করা শুরু করলাম।নার্স আশ্বস্ত করল রিয়া চিকিৎসাধীন আছে।নার্সকে রিয়ার কাছে নিয়ে যেতে অনুরোধ করলে আমাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দেয়া হয়।তারপর আর কিছু মনে নেই।এভাবে কয়েকদিন আমাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখা হলো।রিয়ার কথা জানতে চাইলেই ওরা আমাকে বলে ভালো আছে।চোখের ব্যান্ডেজ টেনে খোলার পর আমি কিছু দেখতে পাচ্ছিনা।ডাক্তার এসে আমাকে ভীষন বকা দিলেন।আমি কাঁদতে কাঁদতে রিয়ার কথা জিজ্ঞেস করলাম।আপনার চোখ থাকলে তো রিয়াকে দেখবেন?রিয়া ভালো আছে।ওনাকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই।আমার মাথায় আঘাত লাগার কারনে নাকি আমার চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হইছে।আমি রিয়াকে দেখব।আপনার পা এখনও ঠিক হয়নি।আপনার হাটা সম্পুর্ন নিষেধ।আমার রিয়াকে একবার সামনে এনে দিন।আমি ওর সাথে কথা বলব।উনি ভালো আছেন।খুব তারাতারি সুস্থ্য হয়ে উঠবেন।আম্মু আসছে আমার কাছে।এসেই কান্নকাটি করছে।আম্মু রিয়া কেমন আছে?ও ভালো আছে।আম্মু রিয়াকে আমি দেখব।আমাকে ওর কাছে নিয়ে চল।কেউ আমার কথা শুনছেনা।রিয়া নাকি বেঁচে থাকতে চায়নি।ওকে নিবির পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।কয়েকদিন পর রিয়াকে আমার কাছে নিয়ে আসা হল।রিয়ার স্পর্শ আমার হাতে অনুভব করলাম আমি।কিন্তু আমি রিয়াকে দেখতে পাচ্ছিনা।রিয়া কই তুমি?জানো ডাক্তার বলছে আমি নাকি আর কোনোদিন চোখে দেখতে পারবনা।কথা বলছো না কেন তুমি?একমাস পর সুস্থ্য হয়ে আমি বাসায় ফিরলাম।আমি অন্ধ হয়ে গেছি।রিয়ার স্পর্শ পাওয়ার আশায় আমি তৃষ্ণার্ত। পিচ্চি বর আমি আর তোমার যোগ্য নই বলেই রিয়া হাওমাও করে কাঁদতে শুরু করল।আরে কে বলছে?আমি তোমাকে ভালোবাসি।তুমি ভালোবাসো অন্য রিয়াকে যে মরে গেছে সেদিন রাতেই।এখন তোমার সামনে দাঁড়িয়ে অপবিত্র একটা মেয়ে।আমি কোনো অপবিত্রাকে দেখতে পাচ্ছিনা।আমি আমার চোখে সেই রিয়াকেই দেখতে পাচ্ছি।যে পুতুলটা পবিত্রতায় ভরপুর।পিচ্চি বর তুমি আমার আশা ছেড়ে দাও।আমি অনেকদূর চলে যাব।কেউ আমাকে চিনবেনা।আত্মহত্যা মহাপাপ না হলে আমি তোমাকে রেখে চলে যেতাম।কিন্তু তোমায় বড্ড বেশি ভালোবাসি।তাই পারিনি তোমায় ধোকা দিয়ে কোথাও যেতে।অনেকবার নিজেকে শেষ করতে যেয়ে ফিরে এসেছি।পিচ্চি বর আমার শরীর এখন পঁচা দুর্গন্ধময়। তুমি আমার শরীরে যে পবিত্র ঘ্রান পেতে এখন তার জায়গায় পশু পঁচা গন্ধ।তুমি যে পুতুলকে আদর করতে এখন সেই পুতুল নোংরা। আদরের অযোগ্য।রিয়া তুমি কখনও আমাকে ছেড়ে যেওনা।তুমি চলে গেলে আমি কি নিয়ে থাকব?আমার সাথে কে দুষ্টুমি করবে,কে আমাকে ভালোবাসবে?তোমার ভালোবাসার জন্যই আমি বেঁচে আছি।ঠিক আছে তাহলে শোনো।তুমি আর কোনোদিন তোমার পুতুল বউকে আদর করবেনা,ভুলেও না।তুমি পবিত্র তাই আমাকে আদর করতে যেয়ে অপবিত্র হও তুমি, তা চাইনা।তোমায় নিয়েই বেঁচে থাকব আমি।তুমি অন্ততপক্ষে ভালো থাকবে কারন তোমার ওই চোখে আর অপবিত্র কিছু চোখে পরবেনা।যখন তোমাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করবে তখন তোমার শার্ট আমি জড়িয়ে থাকব।তোমার গায়ের গন্ধ নিব।আর আমি কি করব?তোমার কিছুই করতে হবেনা।শুধু আমায় ভালোবেসো একটু।তুমি কোনোদিন আমাকে দেখবেনা আর আমিও কোনোদিন তোমাকে কাছে টানব না।দুজনের কাছে আসার আকুলতাকে বিসর্জন দিব আমরা।আমাদের ভালোবাসায় কোনো স্পর্শ থাকবেনা,থাকবে শুধু অনুভূতি।আমরা দুজন দুজনের ভালোবাসা অনুভব করে সারাজীবন বেঁচে থাকব।পিচ্চি বর তোমাকে এতটাই ভালোবাসি যে তোমাকে ছেড়ে এই পৃথিবী থেকে যেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।ভালোবাসি তোমায় ভালোবেসে যাব চিরদিন।প্রায় দশ মাস পর জন্ম হয় একটি ছেলের।পুতুল বউ ওর নাম রেখেছে প্রিন্স।প্রিন্স দেখতে একদম পিচ্চি বরের মত।অবিকল বাবাকে নকল করা একটা ছেলে।ছেলেটা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে।অন্ধ বাবা আর মাকে প্রচন্ড ভালোবাসে।রিয়া ওর পিচ্চি বরকে সবসময় বলে তোমার ছেলে তোমার মতই দেখতে।পিচ্চি বর আমি আমার গর্ভে তোমাকেই পুনর্জন্ম দিয়েছি।প্রিন্স এখন ওর বাবা মাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা।পিচ্চি বর এখন বুড়ো হয়ে গেলেও পুতুল বউয়ের কাছে পিচ্চিই রয়ে গেছে।ওদের ভালোবাসা একটুও কমেনি।দিন গেছে আর একটু একটু করে পিচ্চি বর আর পুতুল বউয়ের ভালোবাসা বেড়েই চলেছে।প্রিন্সের নতুন ঘরে আজ নতুন প্রিন্সেস এসেছে।ভালোবাসা এমনই..কখনই শেষ হয়না।যদি সেই ভালোবাসা স্পর্শের বাইরে হয় তবে তা চোখ বন্ধ করেও অনুভব করা যায়।সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই,যতই বাধা আসুক তা কখনও ফুরিয়ে যায়না।ভালোবাসার মানুষকে কখনও দুঃখ দিয়ে ভালো থাকা যায়না।একে অপরের দুঃখ সমান ভাগে ভাগ করে বেঁচে থাকা যায় সহস্র বছর।হাজার হাজার বছর ধরে ভালোবাসা এমন করেই বেঁচে থাকবে প্রতিটি পিচ্চি বর আর পুতুল বউয়ের অন্তরে অন্তরে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here