পূর্ণতা পর্ব ১২+১৩

0
79

#পূর্ণতা❤️
#লেখনীতে_তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

১২.

তারার মাথায় শুধু একটা কথাই আসছে আলোক তাকে মেরে ফেলবে,আলোক খুনি।

ইরা আলোক কে ডাকার পর আলোক আর ইরা একসাথে কেবিনেট প্রবেশ করতেই অবাক বিয়ে যায়। ইরা বললো,

‘এক্ষুনি তো জেগে ছিল। এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো?’

আলোক শান্ত গলায় বললো,

‘আচ্ছা থাক।ওনার রেস্ট প্রয়োজন।’

ইরা আলোকের কথা শুনে হালকা হেসে মাথা নাড়ালো। ইরা চলে যাবে তখনি আলোক বলে উঠে,

‘আচ্ছা ওনাকে কবে নিয়ে যেতে পারবো?’

ইরা পিছনে ঘুরে তাকাতেই আলোক বললো,

‘আই মিন উনি ডিসচার্জ কবে পাবে?’

ইরা হেসে বললো,

‘চাইলে আজকেই নিয়ে যেতে পারেন ভাইয়া। তবে এখন গেলে সমস্যা হতে পারে।’

আলোক ভ্রু উঁচু করলো।

‘কারণ বাড়িতে গেলে কেউই সারাদিন শুয়ে,বসে থাকতে চাইবে না।তাই এখানে কয়েকদিন থাকাটা ভালো হবে।’

আলোক ছোট করে ‘ওহ’ বললো।তারপর ইরা বললো,

‘আচ্ছা ভাইয়া আপনি এখানে থাকেন। ওকে দেখেন।আমি কিছুক্ষন পর আবার আসবো।’

বলে চলে গেলো ইরা। আলোক তারার একটু কাছাকাছি গেলো।তারার মুখের সামনে একদম মুখ নিয়ে আসলো।তারপর একটু হেসে আবেগী কণ্ঠে বলল,

‘ক-তো__মি-ল_!’

এদিকে তারার ভয়ে শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। জোড়ে জোড়ে শ্বাস ও নিতে পারছে না ,কারণ তাহলে আলোক বুঝে যাবে সে জেগে আছে।আলোকের নাম শুনেই তারার খুব ভয় করে এখন। তাই সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর অ্যাক্টিং করছিল তারা। কিন্তু আলোক তার এতটা কাছাকাছি আসায় সে মৃদু কাঁপছে। ইদানিং আলোককে সে খুব ভয় পায়।আগে আলোকের সামনে জোর গলায় কথা বলতে পারলেও এখন আলোকের দিকে তাকানোর সাহসও নেই তারার।তারা চোখ বন্ধ করেই একটা ঢোক গিলল।আলোক তারার সামন থেকে মুখ সরিয়ে নিতে নিতে কেমন গম্ভীর কন্ঠে বলল,

‘খু-ব__শী-ঘ্র-ই__মু-ক্তি__পা-বে-ন_'[টেনে টেনে]

কথাটা শুনে তারা পুরো ফ্রিজড হয়ে গেলো। আলোক কিসের মুক্তি র কথা বলছে?কিসের মুক্তি দিবে তাকে খুব শ্রীঘ্রই? দরজায় শব্দ হওয়াতে তারা ভাবলো আলোক বাহিরে গেছে।তারা তারাতাড়ি করে চোখ খুলে দীর্ঘশ্বাস নিতে লাগলো।

‘আপনার কিছু লাগবে তারা?’

হটাৎ পাশ থেকে আলোকের কণ্ঠ শুনে তারা ফ্রিজড হয়ে গেলো।পরপর ঢোক গিলতে লাগলো।কিন্তু সে পাশ দূরে তাকাতে পারলো না। ঘাড়ে আঘাত পাওয়ার কারণে ঘাড় ঘুরতে পারবে না এতে তারার সমস্যা হবে আর ব্যাথা লাগবে।আলোক তারার সামনে এসে বলল,

‘আপনার কিছু লাগবে তারা?’

প্রতিউত্তরে তারা কিছু বললো না।শুধু আলোকের দিকে চেয়ে আছে।আলোক আবার বললো,

‘আপনার কিছু লাগলে বলুন আমি এনে দিচ্ছি।’

তারা কিছু বললো না।

‘আপনি ঠিক আছেন তারা?’

‘কি লাগবে বলুন।নাকি কোনো নার্স কে ডাকবো?’

তারা হাত দিয়ে ইশারা করে পানির জগ টাকে দেখলো।আলোক তারাকে বলল,

‘আপনি পানি খাবেন?’

তারা মুখে স্লোলি ‘হু’ বললো।আলোক পানি নিয়ে এসে তারা কে দিলো।তারা অল্প খেয়ে তাড়াতাড়ি করে শুয়ে পড়লো।আলোক দেখে একটু অবাক হলো কারণ এত তাড়াহুড়া করে তারা শুলো তাতে তো তার ব্যাথা হবে।

_______________

এভাবে কেটে যায় ১ সপ্তাহের মতন।তারাকে এখনো ডিসচার্জ দেয়নি।কারণ তারা বাড়িতে যাবে না বলেছে।তাই এখনো এখানেই আছে।এখন প্রায় সন্ধ্যা ৭ টার মতন বাজে।তারা একটু সুস্থ হয়েছে।এখন চলাচল করতে পারে।তবে মুখ ঘুরাতে পারে না।তারা কেবিনে বসে আছে। এখান থেকে পালাবে ভেবেছে।না পালালে তো তাকে আলোকের সাথে আবার ওই বাড়িতেই যেতে হবে।তাই তারা ভেবেছে সে আজকে এখান থেকে পালিয়ে যাবে। তারা উঠে দাড়ালো তারপর ওড়না মাথায় দিয়ে মুখ টা ডাকার চেষ্টা করলো।।তারপর দরজা খুললে বের হলো।বের হতেই একজন নার্সের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে বেছে যায়।তারা কয়েক পা বাড়াতেই দেখে সামনে ইরা কারো সাথে কথা বলছে আর তার কিছুটা দূরত্বে আলোক দাড়িয়ে।তারা ভাবছে এখন সে কি করবে? কেবিনে যাবে? ইরা আড়াল চোখ করে তাকাতেই তারা পিছনে ঘুরে তারপর স্বাভাবিক ভাবে যেতে ধরে তখনি ইরা ডাক দেয়,

‘তারা?’

ইরা র মুখে নিজের নামের ডাক শুনে থমকে দাড়িয়ে যায় তারা।চোখ দুটো চেপে বন্ধ করেছে।শেষমেশ ধরা পড়লো।তারা পিছনে ঘুরে তাকালো। ইরা তারার দিকে এগিয়ে আসলো।আলোক তারার নাম শুনেই তাকালো তারপর সেও এগিয়ে আসলো। ইরা এসে তারাকে প্রশ্ন ছুড়লো,

‘তারা তুমি এভাবে বাহিরে?কিছু___

ইরা কে থামিয়ে দিয়ে তারা বললো,

‘আসলে এখানে থাকতে আর ভালো লাগছে না।’

‘চলে যেতে চাও?’

তারা না চাওয়ার সত্বেও মাথা নাড়ালো। ইরা হেসে বললো,

‘আচ্ছা যেতে পারো।আলোক ভাইয়া ওকে নিয়ে যেত পারেন।আমি ওকে ডিসচার্জ দিয়ে দিচ্ছি।’

আলোক মাথা নাড়ালো।তারপর কেবিনে দিয়ে সব ঠিকঠাক করল।সব ঔষুধপত্র,আর তারার যা যা প্রয়োজন লাগতে পারে সব কিনে আনলো আলোক।তারপর ওরা দুজন ৮ হতে বের বের হলো।আলোকদের যে ড্রাইভিং করতে পারে তা তারার কাছে অজানা ছিলো।আলোক তার বন্ধু নিরবের কার টা নিয়েছে।আর সে ড্রাইভিং করছে।তারা শুধু এক দু’বার আলোকের দিকে তাকিয়েছিল তারপর মুখ ঘুরে জানালার দিকে তাকায়।তারার মনে হাজারো প্রশ্ন জাগছে,যাওয়ার পর কি হবে তার সাথে?সে কি থাকতে পারবে এই দুনিয়াতে?সামনে কি ভয়ংকর কিছু হবে তার সাথে? জানা নেই তারার।আর না আছে কিছু করার।তারা যখনি ডিসিশন নেয় সে আলোকের সাথে কথা বলে সব ক্লিয়ার করবে তখনি কিছুনা কিছু ঘটে যায় তার সাথে বা অন্য কিছুর মাধ্যমে। হসপিটাল থেকে বাড়িতে যেতে কমপক্ষে দেড় ঘণ্টার ও বেশি সময় লাগবে যতটুকু তারা জানে।তারা জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।কেমন তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব আসছে একটা।তারা মাথাটাকে হেলান দিল।তারা হেলান দিয়েই আচমকা আলোক গাড়ি টাকে ঘুরালো।তারা হকচকিয়ে উঠলো।তারা আলোকের দিকে তাকাতেই আলোক তারার দিকে না তাকিয়েই বললো,

‘সরি।’

তারা কিছু না বলে আবার জানালার দিকে তাকালো আর মনে মনে বললো নিশ্চয়ই তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য করেছে।তারা আবার মাথা হেলান দিলো।তারপর আস্তে আস্তে তারার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ।

__________

তুমি সুঁতোয় বেঁধেছো ফুল,
নাকি তোমার মন?🥀

আমি জীবন বেঁধেছি,মরণ বেঁধেছি
ভালোবাসে সারাক্ষণ..🖤

চারিপাশে কেমন নিরবতা। আসেপাশে তেমন বেশি মানুষ নেই।রাস্তাটাও কেমন সুনশান, গাড়িঘোড়া খুব কমই চলাচল করছে।তারার ঘুম ভেঙ্গে গেল।সে আস্তে করে মাথা উঠালো তারপর দেখলো আলোক গাড়িতে নেই।সে একাই।তারা গাড়ি থেকে বের হলো।গাড়িটা একপাশে সাইড করা। তারা বেরিয়ে দেখলো সামনে রাস্তার ওপাশে একটা বড় ব্লিডিং হবে ৭ তলার মতন।আর সেখানে উপরের বড় করে সময় লেখা ১০:৪৫।মানে এখন ১০:৪৫ বাজে। তারা বুঝতে পারছে না এত রাতে আলোক তাকে গাড়িতে রেখে কোথায় গেলো।তারা আশেপাশে খুজতে লাগলো।তারা পিছনে ঘুরতেই হতভম্ব হয়ে গেলো ‌।তার পিছনে একটা বড় গেট আর সেখানে প্লাটে লেখা কবরস্থান।তারা একটু হকচকিয়ে গেল। কবরস্থানের সামনে কেনো গাড়ি?তারা একটা ঢোক গিলল।এত রাতে কবরস্থানে তার খুব ভয় করছে।যদি ভূত,আত্মা এইসবে তার বিশ্বাস নেই।তারা কবরস্থানের সামনে যেতেই দেখে গেট টা খোলা। অনেক গুলো কবর।তারার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।কতো মানুষের প্রিয় জন শুয়ে আছে এই কবরে।প্রত্যেকটি মানুষের শেষ স্থান কবর।সবাই একদিন না একদিন এই কবরে আসতেই হবে। কিন্তু দুনিয়ার মানুষেরা আজ দুনিয়াবি কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত!তারা কিছু টা দূরে দেখলো একজন একটা কবরের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে।তারা ভাবে লক্ষ্য করতেই বলল,’আলোক!!আলোক কেনো?’তারার সাহস হচ্ছে না কবরস্থানে ঢোকার। তবুও তারা আয়াতুল কুরসি পড়তে পড়তে ঢুকলো।তারা আলোকের কাছে গেলো।আলোকের সামনে একটা কবর।কার তা জানা নেই।আলোক মাথা নিচু করে আছে।তারা পিছন থেকে ডাক দিলো,

‘আ__আ_আলোক__আলোক___

তারার কন্ঠ শুনে আলোক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেলো।তারপর তারার দিকে ফিরলো। তারা দেখলো আলোকের চোখে পানি।আলোক নিজের চোখ মুখ মুছে নিয়ে তারাকে বলল,

‘আপ__আপনি! আপনি এখানে এসেছেন কেনো?’

তারা আলোক কাপাকাপি কন্ঠে বলল,

‘এ_এই প্রশ্ন __আম__আমার _আপনাকে করা উচিত!

আলোক কিছু তারার কথার উত্তর না দিয়ে পাশ কেটে গিয়ে বলল,

‘অনেক রাত হয়েছে চলুন।

তারা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আলোক হনহন করে চলে গেলো।
#পূর্ণতা❤️
#তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

১৩.

তারা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আলোক হনহন করে চলে গেলো।তারা আর কিছু না বলে সেও গেলো।পুরো রাস্তা তারা আলোকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু আলোক কিছুই বলেনি।আর ফুল স্পীড এ ড্রাইভ করছিল।তারা বাড়িতে আসার পর আলোক তার সাথে কোনো কথাই বলে নি।তারা নিজের ভয়কে আড়াল করে আলোকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু প্রতিবার ই আলোক তাকে এড়িয়ে গেছে।আলোক আসার পর তারার মেডিসিন তাকে দিয়ে দরজা লাগিয়ে চলে যায়।আলোকের এমন আচরণ দেখে তারা অনেক হতাশ হয়ে গেছে।তারা নিজের জামা কাপড় চেঞ্জ করে নিয়ে শুয়ে পড়লো।

______

পরের দিন সকালে উঠতেই দেখে আলোক আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।তারা কে দেখতেই আলোক বন্ধ করে বাহিরে চলে গেল।তারা আলোক যাওয়ার পর উঠে আলমারির কাছে গেল।তারপর খুলল।খুলতেই একটা প্যাকেট পেলো।প্যাকেটটা দেখে মনে হচ্ছে বিড়ালের খাবার হবে।তারা একটু অবাক হলো। এখানে এগুলো কেনো?এখানে আসার পর থেকে তো তারা কোনো রকম বিড়াল দেখে নি। তাহলে?তারা আলমারিটা বন্ধ করতেই আলোক খাবার প্লেট নিয়ে আসলো।তারা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তারপর তারা গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলো।তারা আসার পর খেলো।আলোক তাকে মেডিসিন দিতেই তারা বলল,

‘আমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিবেন না?’

আলোক তারার থেকে চোখ সরিয়ে নিচু করে বলল,

‘মেডিসিন খেয়ে নিন।’

বলে তারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে লাগলো। আলোক যেতে যেতে থেমে গেল তারপর বলল,

‘ইরা আর নিরব আসছে আজকে বিকালের দিকে।’

বলে চলে গেল।তারা কোনো রিয়েক্ট করলো না কারন নিরব আর ইরা নিজেদের গাড়ি নিতে আসছে হয়তো। দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে আসলো।নিরব আর ইরা আসলো।ইরা তারা কে জিজ্ঞেস করলো তার শরীর এখন কেমন?তারা গোমড়া মুখে উত্তর দিয়েছে সবকিছুর।তারার কেনো জানি চেয়েও আজকে মুখে হাসি আসছে না।তার মাথায় শুধু একটাই ভাবনা ঘুরছে আলোক কে নিয়ে।আকাশ টা অনেকটা মেঘলা আজকে। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে।নিরব আর ইরা আলোকের সাথে কথা বলছে।তারা এখানে থাকলো না। হেঁটে হেঁটে ছাদে চলে গেল।কারন আলোককে যতবার ই দেখছে তার মনে হাজারো প্রশ্ন জাগছে,কষ্ট লাগছে যে আলোক তার কথার কোনো উত্তর ই দিচ্ছে না।তারা উপরে যাওয়ার পায়চারি দিচ্ছে।দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে আসলো।ইরা নিরব এখন চলে যাবে। কিন্তু ইরা তারাকে খুঁজছে।আলোক তারাকে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে এলো।আসতেই আলোক তারাকে বলল,

‘আপনি আবার এ অবস্থায় এখানে এসেছেন কেনো?যদি আবার কোন দূর্ঘটনা ঘটে?’

তারা আনমনে বলে উঠলো,

‘জীবনটা কি অদ্ভুত! সবচেয়ের কাছের মানুষ গুলোয় বেশি কষ্ট দেয়।’

আলোক তারার কথা ঠিক মত বুঝতে পারলো না।ভ্রু কুঁচকে বলল,

‘কি সব বলছেন?’

তারা হালকা হাসলো।তারপর কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,

‘সবার জীবনে কি এরকম নাকি শুধুই আমার?’

আলোক দু’টো ঠোঁট চেপে ধরলো।তারা ফিক মেরে হেসে বলল,

‘হয়তো আমার জীবন ই এইরকম।’

আলোকের মাথায় তারার কোনো কথাই ঢুকছে না।আলোক তারার কাছে আসলো তারপর বলল,

‘ইরা নিরব চলে যাচ্ছে।ইরা আপনাকে ডাকছে।’

তারা র কোনো মনযোগ আলোকের প্রতি নেই।যেনো কোনো কথাই তার কানে ঢুকছে না।আলোক তারাকে ডাকার জন্য কাঁধে একটা আঙ্গুল রাখতেই তারা আলোককে একটা ধাক্কা মারলো তারপর জোরে চেঁচিয়ে বলল,

‘একদম আমাকে ছুঁবেন না।আপনি একজন ক্রিমিনাল,খারাপ লোক আপনি, চরিত্র হীন!

আলোক কিছু বলবে তখনি চোখ যায় দরজার দিকে।দেখলো নিরব হতবাকের মত তাকিয়ে আছে।আলোক নিরবের দিকে তাকাতেই নিরব চোখ নামিয়ে বলল,

‘আলোক আমরা যাচ্ছি।’

বলে সাথে সাথে চলে গেল নিরব।তারপর আলোক ও চলে আসলো। কিন্তু তারা নামলো না।তারপর আলোক নিরব আর ইরাকে বিদায় দিয়ে ভিতরে আসলো।আসতেই সে বিছানায় বসে পড়লো।তারপর নিজের দু’হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো। কিছু ভাবছে সে।প্রায় ৩০-৪০ মিনিট চলে গেল আলোক এখনো মাথায় হাত দিয়ে গভীর মনোযোগে কিছু ভাবছে।বাহিরে জোরে জোরে বৃষ্টি পড়ছে। কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি নেমেছে।আলোকের ফোনটা বেজে উঠলো। আলোক দেখলো নিরব কল দিয়েছে। আলোক নিরবের ফোনটা ধরলো।ধরতেই নিরব ওপাশ থেকে বলল,

‘আলোক ইরা না ওর পার্সটা রেখে এসেছে।’

আলোক দাঁড়ালো তারপর বলল,

‘আচ্ছা সমস্যা নেই।পরে এসে নিয়ে যাস।’

তারপর আলোক পা বাড়ালো ব্যালকনির দিকে।নিরব বলল,

‘তোর সব কিছু ঠিক আছে?’

আলোক উত্তর দিবে তখনি তার চোখ নিচের দিকে গেলো।বাহিরে ভারী বর্ষণ আর তারা নিচে ভিজছে।আলোক তো যেনো তারার কথা ভুলেই গেছিল। কিন্তু তারা ছাদ থেকে কখন বাহিরে নিচে গেলো,আলোক বুঝতেই পারলো না।আলোক জোরে চেঁচিয়ে উঠলো,

‘তারাআআ’

কিন্তু বৃষ্টির শব্দে হয়তো তা তারার কান পর্যন্ত পৌঁছালো না।তার তারা একবারে স্ট্রেট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আলোক তাড়াতাড়ি বাহিরে যাওয়ার জন্য বের হলো। এদিকে আলোকে র এভাবে চেঁচানো শুনে নিরব অস্থির হয়ে গেলো।আলোক হাতে ফোন নিয়েই বেরিয়েছে সাথে একটা ছাতা নিয়েছে।নিরবের কল এখনো কাটে নি।আলোক বাহিরে এসে তারার কাছে গেল তারপর তাকে ছাতার নিচে নিয়ে বলল,

‘তারা আপনি এভাবে ভিজছেন কেনো?’

তারা কোনো উত্তর দিল না।আলোক আবার বলল,

‘তারা আপনার এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে ঠিক হবে না।এতে আপনার সমস্যা হতে পারে।’

এবার ও তারা কোনো উত্তর দিলো না। যেনো তারার কানে কোনো কথা পৌঁছাচ্ছে না। বৃষ্টি র তারা কাঁদছে।তার চোখ বয়ে পানি ঝরছে। কিন্তু বৃষ্টির শব্দে জন্য তা বোঝা যাচ্ছে না।আলোক তারাকে আবার বলে উঠল,

‘তারা ভিতরে চলুন আপনি পুরোই ভিজে গেছেন।’

তারার কোনো সাড়া পেলো না।এবার আলোক তারার হাত ধরে বলল,

‘তারা এভাবে ভিজছেন কেনো?চলুন ভিতরে।’

বলে তারা র হাত ধরে টানতেই তারা নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে আলোককে ধাক্কা মারলো।আলোক তাল সামলাতে না পেরে কিছুটা পিছনে সরে গেল আর আলোকের হাত থেকে ছাতাটা পরে গেল।তারা আলোককে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,

‘বন্ধ করুন আপনার এইসব!আমি_আমি হাঁপিয়ে গেছি।’

বলে শ্বাস নিলো তারা।তারপর বলল,

‘এইসব কিয়ারিং দেখানো বন্ধ করুন।কিসের অধিকার দেখাচ্ছেন? আপনি স্বামী?কিসের স্বামী আপনি?কেমন স্বামী আপনি?আপনাকে তো আমি বিন্দু মাত্র ও চিনি না।আপনার ভিতরে যে কতো রুপ, রহস্য লুকিয়ে আছে আল্লাহ ই জানেন। আপনি কে বলুন তো?কেনো জেলে ছিলেন আপনি?কি আপনার আসল রূপ?’

আলোকের মুখে কোনো উত্তর নেই।ওপাশ থেকে এতক্ষণ নিরব সব শুনলো। কিন্তু এখন ফোনে পানি পড়ছে তাই ভালো মত আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না।তারা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

‘আপনার সম্পর্কে এতসব প্রশ্ন জন্মছে যে শেষেই হবে না।আমার প্রশ্নের উত্তর কেনো দেন নি!কেনো?কেনো এড়িয়ে চলছেন আমাকে।কেনো সব সত্যি বলেন না আমাকে?যে আপনি একজন খুনি,একজন ধর্ষক আপনি। ছিঃ আমার ভাবতেই ঘৃণা হয়।কেনো করলেন?’

তারা থামলো। বৃষ্টি কিছুটা কমছে।আলোক একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো নড়াচড়া নেই।তারা আলোকের দিকে তাকালো তারপর বলল,

‘যে নিজের সম্পর্কে সব সত্যি বলবেন সেদিন নাহয় নিজের জোর দেখাবেন।তার আগে ভুলে আসবেন না।পারলে আমাকে মেরে ফেলুন এটাই ভালো হবে আপনার জন্য।কারন আমি তো সব জেনে গেছি তাইনা?আর আপনি তো আমাকে মারতেই চান।সবার সামনে খুব ভালো, একজন আদর্শ হাসবেন্ড দেখান নিজেকে যে আপনি আমাকে খুব ভালো বাসেন।আমি ছাড়া আপনি কিছুই নন। আপনার এইসব দেখে আমি নিজেও আপনার প্রতি দুর্বল হয়ে গেছিলাম কিন্তু আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে এইসব আপনার দেখানো শুধু।’

তারা আলোকের একবারেই কাছাকাছি গেলো।তারপর আলোকের দিকে কেঁদে কেঁদে বলল,

‘প্লিজ আমাকে এইসব থেকে মুক্তি দিন আলোক ‌আমি আর পারছি না।’

বলে ধপ করে নিচে বসে পড়লো তারা।আলোক কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেলো ‌।আলোক যেতেই তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,

‘আলোক’

__________

অপর দিকে নিরবের অস্থিরতা বেড়েই চলছে।নিরবের বাড়িতে আসতে ১ ঘন্টার মতন লাগলো। তারপর নিরব ইরা কে রেখে আবার আলোকের বাড়িতে আসার উদ্দেশ্য রওনা হলো।নিরবের আসতেই দরজায় নক করলো।ভিতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না।নিরব জোরে জোরে ধাক্কা তেই তারা দরজা খুলল। দরজা খুলতেই নিরব তারাকে বলল,

‘আলোক কোথায়?’

তারা কিছু বলল না। এবার নিরব জোরে বলল,

‘আলোক কোথায় তারা?’

তারা শান্ত গলায় বলল,

‘নিজে গিয়ে দেখুন।’

নিরব হনহন করে ভিতরে ঢুকলো। আলোককে পেল না তারপর ব্যালকনিতে যেতেই দেখে আলোক মেঝেতে পড়ে আছে।আলোকের গাঁ পুরোই ভেজা।নিবর হাটু ভেঙ্গে বসলো তারপর বলল,

‘আলোক!এই আলোক।’

নিরব আলোককে ছুঁতেই বুঝতে পারলো আলোকের জ্বর এসেছে আর সে কিছুই বুঝতে পারছে না।নিরব আলোককে রুমে এনে ওর জামা কাপড় চেঞ্জ করে দিয়ে শুইয়ে দিল। ছোট্ট থেকেই আলোকের সামান্য বৃষ্টি তে ভিজলে তার প্রচন্ড জ্বর হতো।সেটা নিরব ভালো মতন জানে কারন নিরব আলোকের ছোট বেলার বন্ধু।আলোককে শুইয়ে দেওয়ার পর নিরব তারার কাছে গিয়ে রাগী কন্ঠে বলল,

‘আপনি মানুষ?কেমন স্ত্রী আপনি তারা?

তারা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো।

‘আলোকের প্রচন্ড জ্বর এসেছে।

তারা স্বাভাবিক ভাবে বলল,

‘তো আমি কি করবো?’

তারার কথা শুনে নিরব অবাক হয়ে তাকালো।

‘আপনি ওর স্ত্রী সেটা কি ভুলে গেছেন?’

তারা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

‘স্ত্রী?কোন দিক থেকে?আমি কোন খুনির স্ত্রী নই।’

‘কি বলছেন আপনি?’

‘আচ্ছা আপনারা দুই বন্ধু মিলে কি লুকাচ্ছেন বলুন তো?নাকি আপনিও এই খূনির মতই____

তারাকে থামিয়ে নিরব জোরে বলে ঊঠলো,

‘তারা নিজের মুখ সামলে কথা বলুন।কার সম্পর্কে কি বলছেন আপনি?’

তারা রাগী কন্ঠে বলল,

‘কার সম্পর্কে আবার? আপনার এই খুনি বন্ধুর সম্পর্কে, এই ধর্ষকের ব্যাপারে।’

‘ছি কিসব বলছেন আপনি?এত নিচু মানের কথা বলতে আপনার মুখে আটকালো না?’

‘যা সত্য তাই বলেছি।আর সত্য সবসময় তেতো হয়।’

‘আলোকের সম্পর্কে জানেন কি আপনি?জানলে এইসব মুখেও আনতেন না।’

‘আচ্ছা এটা বলুন তো আপনার এই ধর্ষক বন্ধু কেনো ১০ বছর জেল খেটেছে?’

নিরব ছলছলে চোখে তাকিয়ে বলল,

‘আরে আপনার তো যোগ্যতাই নেই আলোকের মত ছেলের স্ত্রী হওয়ার।আপনি তো ওকে ডিজার্ভ ই করেন না।’

‘করিনা বলেই তো এই খুনি বন্ধু টাকার লোভ দেখিয়ে বিয়ে করেছেন।’

নিরব শুনে অনকেটা রেগে গেল।

‘চুপ করুন।আলোকের সম্পর্কে একটাও বাজে কথা বলবেন না।আপনার কোনো যোগ্যতাই নেই ওর সম্পর্কে কথা বলার।আরে আপনি তো ওর বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখেন ই না। শুধু আপনার ফেস কিছুটা ওর সাথে মিলে যায় তাই আপনি আলোকের স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা পেয়েছেন।’

তারা ভ্রু কুঁচকে তাকলো তারপর বলল,

‘ও কে?’

‘আগে ভালো মত আলোকের সম্পর্কে জানুন তারপর কথা বলুন।’

‘একদম কথা প্যাচাবেন না। সত্যি করে বলুন কি ছিল আলোকের অতীতে? কেনো উনি জেলে গেছিলেন?’

নিরব ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে বলে উঠলো,

‘শুনতে চান এমন কি হয়ছিল আলোকের অতীতে যার জন্য ওকে এত বছর জেলে থাকতে হয়েছে?তবে শুনুন।

আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগে________

#চলবে….
_________________

#

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here