পূর্ণতা পর্ব ২০+২১

0
125

#পূর্ণতা❤️
#Writer_তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

২০.

আলোক ভিতরে ঢুকেই একটু অবাক হয়ে গেলো। চাঁদ পিছন ফিরে হাত দ্বারা মাথা চেপে ধরে আছে। কিন্তু আলোকের দৃষ্টিপাত আটকে যায় চাঁদের উপর। কারণ সে আজ নীল কালারের সব কিছু পড়েছে। আলোক পিছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আবেগী কন্ঠে বলল,

‘ আজ চাঁদ পাখি থেকে নীল পরী হয়ে গেছো ‘

চাঁদ কোনো সাড়া দিলো না। আলোক একটু নেড়েচেড়ে উঠে ভ্রু কুঁচকে বললো,

‘ আর ইউ ওকে?’

পরক্ষণে চাঁদ সামনে ফিরলো।‌ ঝাপসা দেখছে। চোখ দুটি কেমন ছাপা ছাপা হয়ে আছে। আলোক অস্থিরতা নিয়ে বললো,

‘ কি হয়েছে তোমার? গোসল করেছো?‌জ্বর নিয়ে গোসল করার দরকার কি ছিল‌?‌’

চাঁদ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো তারপর ইশারায় আলোককে বলল সে ঠিক আছে।আলোক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুখে খানিটা হাসি টেনে বলল,

‘ তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে।মা-শা-আল্লাহ্ [টেনে টেনে]। একটা কথা জানো?’

চাঁদ ভ্রু উচুঁ করে কপাল কুঁচকে জানতে চাইলো। আলোক মিষ্টি হেসে বিছানায় হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়লো। তারপর বললো,

‘নীল!আমার এক সময়ের ফেভারিট কালার। ‘

চাঁদ এবার বুঝতে পারল আলোকের বেশি ভাগ জিনিস কেনো নীল কালারের।আলোক চাঁদ কে ইশারায় ডাকলো তারপর উঠে বসে চাঁদের হাত ধরে বললো,

‘ মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটা আমার পাশে। যেদিন তোমার প্রেমে পড়েছি সেদিন থেকে তুমি আমার কাছে দুনিয়ার সব চেয়ে সুন্দর মেয়ে। যাকে আমি পেয়েছি। ‘

বলে আলোক আবারো শুয়ে পড়লো।একজন পুরুষের কাছে ততক্ষণ তার বউ সবচেয়ে সুন্দরী হবে, যতক্ষণ সে নিজের দৃষ্টির হেফাজত করবে।কারণ যে পুরুষ ইচ্ছাকৃত ভাবে পরনারীর দিকে তাকায় সে তখনই তার বউ আর অন্য মেয়ের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য করতে শুরু করে দেয়। আর এর মধ্যেই শুরু হয় ফিৎনা, পরকীয়া, ব্যাভিচার। আল কুরআনে বর্ণিত আছে ,”মুমিন পুরুষ দের বলো,তারা যেনো নিজেদের চোখের দৃষ্টির হেফাজত এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে” [সূরা আন নূর:৩১]। তাই প্রত্যেক টি পুরুষের উচিত পরনারীর দিকে না তাকিয়ে নিজের দৃষ্টির হেফাজত করা।মেয়েদের যেমন চৌদ্দ পুরুষের ছাড়া বাকি সবার সামনে নিজেকে ডেকে অর্থাৎ পর্দার আড়ালে থাকতে বলা হয়েছে , তেমনি ছেলদের ক্ষেত্রেও পর্দা না থাকলেও তাদের দৃষ্টির হেফাজত করতে বলা হয়েছে। তারা যেনো চৌদ্দ নারী ব্যতীত বাকি নারীদের সামনে নিজের দৃষ্টি নত করে অর্থাৎ দৃষ্টির হেফাজত করা।
চাঁদ আলোকের দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করতে লাগলো।আলোক উঠে বসে বোঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু আলোক বুঝে উঠতে পারল না। আলোক একটা হাফ ছেড়ে শুধু বললো,

‘ কিন্তু এখন আমার ফেভারিট কালার পার্পেল। নীল আর ফেভারিট না। ‘

______________________

সন্ধ্যার দিকে তাসলিমা আর আশা একসাথে বসে গল্প করছে। কতদিন পর দুই জা একসাথে। আজ কতো বছর পর আবারো এভাবে বসে সময় কাটাচ্ছে তারা। আশা সবসময় তাসলিমা কে ছোট বোনের মতো দেখত আর ভালোবাসতো। এখনো বাসে। তাসলিমা জোরে জোড়ে হেসে বলছে,

‘ আইজ কতো দিন পরে মন খুইলা কথা কচ্ছি ভাবি। আগের দিনের কথা খালি মনে পড়ত। ‘

আশা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল।তাসলিমা আবার বললো,

‘সেই নাহিদ যখন ক্লাস নাইন এ পড়ত তখন চইলা গেছিলাম। তারপর থাইকা আর ভালো মতন দেখা হইল কই!’

আশা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

‘আহ তাসলিমা। নাহিদের বিয়ে দিচ্ছ কবে? সে তো মাস্টার্স কমপ্লিট করলো তিন বছরের মতন হলো। ‘

তাসলিমা হেসে বললো,

‘দিবো ভাবি ভাবি। একখান চাঁন্দের টুকরা পাই। তারপর দিবো। ‘

আশা আর কিছু বললো না। তাসলিমা বলে উঠলো,

‘ আচ্ছা ভাবি আলোকের বিয়ের তো মেলা দিন ই হইলো। বাচ্চা নাই কেন? ‘

আশা কথা শুনে একটু হিমশিম খেলো। তারপর বললো,

‘হবে তাসলিমা হবে! এত তাড়াহুড়া কি আছে? ‘

‘ না ভাবি দেখেন না মাইসে কিসব কয় ? আর আপনার ও তো বয়স হইয়া যাইতেছে নাতিনাতনির মুখ দেখার ইচ্ছে আছে।তাই কইলাম আরকি। ‘

তাসলিমার কথার উত্তর দেওয়ার মত আশা কিছু খুঁজে পেলো না।

‘আর ভাবি বিয়ের এক বছর হইয়া যাইতেছে। বেশি দেরি করান টা ভালা না। তাই ছোয়াল ডারে বুঝান।’

আশা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো।আর এই টপিক টা স্কিপ করতে সে বললো,

‘ নাহিদের জন্য মেয়ে দেখেছো নাকি? ‘

‘ হ ভাবি দেখছি। ‘

‘কেমন? ‘

বাহির থেকে ফিরছিল আলোক।ভিতরে প্রবেশ করতে দেখলো তাসলিমা উঠে ফোন টা নিতে নিতে বললো,

‘ দাঁড়ান দেখাইতেছি।মাইয়া ডা একবারে জান্নাতের হুর ভাবি। ‘

আলোক সামনে এসে দাড়িয়ে বললো,

‘ মানুষ কে জান্নাতের কোনো কিছুর সাথে কম্পায়ার করা ঠিক না চাচী। ‘

তাসলিমা আশার হাত থেকে ফোন টা নিয়ে বললো,

‘আরে মাইয়া ডারে একবার দেখ। এক বারে জান্নাতের হুর। ‘

বলে আলোকের দিকে ফোন টা এগিয়ে দিলে আলোক বলে উঠে,

‘ আমি কোনো অন্য মেয়েকে দেখার থেকে নিজের দৃষ্টি হেফাজত করা উচিত মনে করি তাই আমাকে এইসব দেখবেন না। আর দুনিয়ার মানুষ যতই সুন্দর হোক তাকে কখনোই জান্নাতের হুর বলা ঠিক না। ‘

তাসলিমা ভ্রু কুচকে কেমন ভঙ্গিতে বলল,

‘হ তোর বউ তো সব চেয়ে সুন্দরী আর বাকি সব অসুন্দরী ।’

আলোক মুখে খানিকটা হাসি টেনে বললো,

‘ মুমিন বান্দার জন্য জান্নাতের নেয়ামতের কথা হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় প্রিয়নবি বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার পূণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত সামগ্রী তৈরি করে রেখেছি, যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি; কোনো কানও তার বর্ণনা কখনো শুনেনি। তাছাড়া কোনো মানুষ কখনো তা প্রত্যক্ষ করেনি; কেউ কোনো দিন তা ধারণা করতে পারেনি।’ এ কথাগুলোর সমর্থনে তোমরা কুরআনের পাকের এ আয়াতটি তেলাওয়াত করতে পার-‘সৎ কাজের প্রতিদান স্বরূপ তাদের জন্য চোখ শীতলকারী যে সব সম্পদ-সামগ্রী গোপন রাখা হয়েছে, কোনো প্রাণীই তার খবর রাখে না।’ (সুরা হামীম আস-সিজদা : আয়াত ১৭) (বুখারি ও মুসলিম)

হূর কি আল্লাহর নিয়ামত না নেক বান্দার জন্য না? যে নিয়ামত কখনো কল্পনা করা সম্ভব না, তা আপনি একজন মানুষ দ্বারা রিপ্রেজেন্ট করছেন? বাহ্!

২. “তিন বস্তু দ্বারা হুর সৃষ্টি- (১) নিম্মাংশ মিশ্ক -এর তৈরী (২) মধ্যভাগ আম্বরের তৈরী (৩) উপরিভাগ কাপুর জাতীয় পদার্থ দিয়ে তৈরী। তাঁদের চুল ও ভ্রু হবে কালো এবং নূরের রেখা সমৃদ্ধ” (তিরমিযি শরীফ)

আপনাদের আগে হূর আর মানুষের মধ্যে আগে তফাৎ বুঝতে হবে। দুইজনের সৃষ্টিকৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

হূরের যে বর্ণনা কুরআন ও হাদিসে আছে তার সাথে কখনো কোনো মানুষের তুলনা সম্ভব না। তাদের রূপের বর্ণনা, কণ্ঠ, আচরণ, সৃষ্টিকৌশল সব মানুষ হতে অনেক ভিন্ন।

হূরদের কণ্ঠ এমন যে, কয়েক দশক বছর শুনে যাবে জান্নাতিরা কিন্তু আয়েশ মিটবে না। মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব?

উপমা, রূপকে আপনি অবশ্যই তুলনা করতে পারেন কিন্তু নিশ্চয়ই এমন কিছুর যা মানুষের কল্পনাতীত এবং যার মধ্যে বিন্দুমাত্র হলেও কোনো না কোনো ক্ষেত্রে মিল থাকবে।তাই মানুষ কে এইসব বলে নিজের পাপের বোঝা আর বাড়াবেন না।©unknown

আর হ্যা চাচী অন্য কারো কাছে আমার বউ সুন্দর না হলেও আমার কাছে বিশ্বের সব চেয়ে সুন্দর মেয়ে আমার বউ।ইভেন প্রতিটি স্বামীর কাছে তার বউ সব চেয়ে সুন্দরী লাগার ই কথা, যদি তাদের মধ্যে ‘ভালোবাসা ‘ নামক এই শব্দ টা থাকে তবে।আর যদি না লাগে তবে বুঝবেন তাদের মধ্যে ভালোবাসার নেই আছে ‘ভালো লাগা’ আর ‘মোহ’ যেটা সময়ের পরিপেক্ষিতে বদলে যায়।’

তাসলিমা আর কিছু বলল না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সিড়ি বেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।আলোক পিছন ঘুরে তার যাওয়ার দিকে তাকালো। আশা গলা ঝেড়ে আলোক কে ডাকলো,

‘ আলোক! ‘

আলোক সামনে ফিরলো। আশা তার সমানে এসে হিমশিম খেতে লাগলো। আলোক উৎকণ্ঠ নিয়ে বললো,

‘ মা কিছু বলবা? ‘

আশা আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,

‘ আসলে বাবা বলছিলাম কি আমার তোর বাবার তো বয়স হয়ে গেছে। আর তোদের বিয়েরও তো এক বছরের মতন হতে চললো। আমাদের তো অনেক আশা , প্রত্যাশা আছে তাইনা বল? ‘

আলোকের আর বুঝতে বাকি রইলো না তার মা কি সম্পর্কে কথা বলতে চাচ্ছে।আলোক একটা বিরক্তি কর শ্বাস ফেলে বললো,

‘ যখন সময় হবে তখন এমনি বেবি আসবে মা। আল্লাহ্ যখন চাবেন তখন এমনিতেই আসবে। আমি বুঝি না তোমরা এই গুলা নিয়ে এত হাইপার হচ্ছো কেনো? ‘

‘ না মানে বাবা আশেপাশের মানুষেরা কতোজন বানিয়ে বলছে। ‘

‘মা তুমি ওদের কথায় কবে থেকে কান দিতে শুরু করলে? কিছু কিছু মানুষ তো থাকবেই এইরকম ।যারা নিজেদের সময় নষ্ট করে অন্যের পিছে লাগবে। ‘

আশা এবার ভারী কন্ঠে বলল,

‘ আলোক কথাটা মানুষ ছাড়াও আমার নিজের। আমারও তো ইচ্ছে আছে নিজের নাতি নাতনীর মুখ দেখে মরবো। আর তোর ও ইচ্ছে আছে তাইনা? মনে আছে তোকে ছোট বেলায় ‘ বড় হয়ে কি হবি ‘ এই প্রশ্ন টা জিজ্ঞেস করলে তুই কি উত্তর দিতি? ‘

তারপর হেসে বললো,

‘ বলতি তুই বড়ো হয়ে বাবা হতে চাস।’

বলে একটু জোড়ে হেসে ফেলল আশা। এদিকে আলোক লজ্জা তে মাথা নত করছে। ছোট বেলায় না বুঝে কিসব বলত ভেবে তার লজ্জা বোধ হচ্ছে।তারপর আশা হাসি থামিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

‘ এখনো কি সময় হয়নি আলোক? ‘

আলোক বলার মতন কিছু খুঁজে পেল না। সে জানতে চাইলো তার মা কি চায়।

‘ তোরা কাল সময় করে ডাক্তারের কাছে যাস। ‘

আলোক ছোট করে ‘ আচ্ছা ‘ বললো। আশা আলোকের হাতের দিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

‘ কিসের কাগজ আলোক ?’

আলোক কাগজ গুলো সামনে এনে বললো,

‘ এগুলো চাঁদের। ‘

আশা আর কিছু বললো না। তারপর আলোক নিজের ঘরে চলে এলো। এসে দেখলো চাঁদ ব্যালকনিতে দাড়িয়ে। আলোক চাঁদকে ডাকলো তারপর পেপার এ সাইন করতে বলল। কিন্তু চাঁদ সাইন করার সময় তার হাত কাঁপতে শুরু করে।আলোক চাঁদকে বলল অন্য কোথাও আগে লিখতে তারপর এই পেপার এ লিখতে। একটা খাতা আর কলম এগিয়ে দিল চাঁদের দিকে। চাঁদ কিছু লিখল। আলোক চাঁদের থেকে খাতাটা নিয়ে দেখতেই বিষ্ফোরিত দৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকালো। তারপর বলল ,

‘ চাঁদ? তুমি নাহিদের নাম কেন লিখছো? ‘

চাঁদ কেমন অস্থির হয়ে আলোকের দিকে তাকালো। চোখ দুটো কেমন ছলছলে।দেখে মনে হচ্ছে খুব চিন্তিত। চাঁদ আহাম্মকের মত চেয়ে রইলো। আলোক বলল,

‘ তুমি “নাহিদ্রিয়ান” মানে নাহিদের নাম লিখেছো! ‘

চাঁদ তার মাথায় দু’হাত দেয় তারপর কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। চোখ থেকে অনাবৃত অশ্রু ঝরছে। আলোক হতবাকের মত তাকিয়ে আছে। চাঁদের অবস্থা লক্ষ্য করে আলোক তার কাছে গিয়ে বলল,

‘ রিল্যাক্স। এটা কোনো ফ্যাক্ট না। মাথায় যেটা এসেছো সেটাই লিখেছো। তুমি কালকে সাইন করো। ‘

_____________

গভীর রাত হয়েছে। নাহিদ তার ঘরে খালি পায়চারি দিচ্ছে। মেয়েটাকে অর্থাৎ চাঁদকে দেখা না পর্যন্ত তার কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। তার মায়ের থেকে জানতে পেরেছে মেয়েটা আলোকের বউ।আর তার নাম “চাঁদ”।নামটা শুনে নাহিদের মন আরো ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সে ভাবছে সেই মেয়েটা হয়তো চাঁদের মতন ই সুন্দর হবে। মনে মনে কথা ভাবছে তার সম্পর্কে। চাঁদ আলোকের ঘর নাহিদের পাশেই। একপাশে রুমে তার মা বাবা থাকছে আর অপর পাশে চাঁদ আলোক। নাহিদ চোখ বন্ধ করে খালি তখনের দেখা সেগুলোকে মনে করছে আর বিশ্রী ভাবে বাঁকা হাসছে। কিছুক্ষণ পর নিজের শুষ্ক ঠোঁট টাকে জিহ্বা দ্বারা ভিজিয়ে কামড়ে ধরে বলল,

‘ তোমাকে না দেখা পর্যন্ত শান্তি নেই। তোমাকে আমি কাল দেখবোই সুইটহার্ট।
#পূর্ণতা ❤️
#Writer_তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

২১.

‘ মা তুমি একাই এত কষ্ট করছ কেনো? দাও আমাকে দাও। আমি বানাচ্ছি।’

আলোক তার মাকে বলল।

‘ তোমাকে ভাঁজতে হবে না।’

আলোকের মা সকালে সবার জন্য নাস্তা হিসেবে রুটি বানাচ্ছিল। আলোক তার থেকে নিয়ে বানানো শুরু করলো। আলোকের হালকা হাসলো। এখন প্রায় সকাল সাড়ে সাতটার মতন বাজে। সবাই ঘুমোচ্ছে।

‘ চাঁদ উঠে নি আলোক? ‘

‘ উঠেছিল কিন্তু আবার ঘুমিয়েছে তাই আর ডাকি নি মা। ‘

তারপর আশা আলোক অনেক কথা বলতে শুরু করলো। আজ কত দিন পর তাঁরা এভাবে কথা বলছে। বেশ কিছুক্ষণ পর সেখানে চাঁদের আগমন ঘটলো। চাঁদ হাসি হাসি মুখ করে এলো। এসে রুটি ভাঁজতে চাইলে আলোক তাকে কড়া কন্ঠে বলল,

‘ তোমাকে এখন তাপের কাছে যেতে হবে না। আগে সুস্থ হও ঠিকমত তারপর করো। ‘

চাঁদ আর কিছু বলল না। আশা , চাঁদ বের হলো। আলোক তাদের এখান থেকে যেতে বলেছে। আশা আসতে আসতে ধীর গলায় বললো,

‘ জানো চাঁদ! আলোক আমার নিজের ছেলে নয়। ‘

চাঁদ বিস্ময় নিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকালো। আশা সামনে তাকিয়ে আছে । মুখে মৃদু হাসি। তারপর চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ কি ? অনেক অবাক হলে? ‘

চাঁদ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আশা সামনে চোখ দিয়ে ইশারা করে বললো, ‘ বসো ‘। তারা দুজন বসলো।

‘ হ্যাঁ এটা সত্যি আলোক আমার সৎ ছেলে। তবুও দেখো আমাদের সম্পর্ক টা কেমন! কতটা ঘনিষ্ট, কতটা গভীরতা। আমার কখনো একবারের জন্যেও মনে হয়নি ও আমার নিজের ছেলে নয়। নিজের সন্তানের থেকেও অনেক বেশি কিছু ও। ‘

চাঁদ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে মনোযোগ সহকারে শুনছে। আশা আনমনেই আবার বলে উঠলো,

‘ আলোকের মা আলোকের জন্মের প্রায় ৪-৫ মাস পর মারা যান। তখন আলোকের দাদী মানে আমার শাশুড়ি মা উনি রায়হান কে আমার সাথে বিয়ে দেন। প্রথম প্রথম আমার কেমন অস্বস্তি লাগতো। যে একজনের স্ত্রী হওয়ার আগেই আমি একজন মা হয়ে গেলাম। কিন্তু যখন আলোক কে দেখতাম তখন কেমন মায়া ধরে যেত। আসলে ছোট বাচ্চারাই এমন মায়াময় হয়। ‘

একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার বললেন,

‘ প্রায় বিয়ের কয়েক মাস পর রায়হান আর আমার মধ্যে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। আর এরই মধ্যে আমার শাশুড়ি মা মারা যান। ‘

বলে হাসলো আশা।

‘ আমার ভাগ্য টা কিরকম দেখো! বিয়ের কয়েক বছর চলে যায় কিন্তু আমার নিজের কোনো সন্তান নেই। তারপর ডক্টর দেখিয়ে জানতে পারি আমি কখনোই মা হতে পারবো না। সে সক্ষমতা আমার মধ্যে নেই। কিন্তু জানো? এতে কেনো জানি আমার বিন্দু পরিমাণ খারাপ লাগে নি। ডক্টর বলেছেন আমি মা হতে পারবো না কিন্তু! আমি তো আগে থেকেই একজনের মা হয়ে আছি। নিজের গর্ভে নাহয় নাই ধরি তাতে কি? আমারই ছেলে ও। ‘

চাঁদ ছলছলে চোখ নিয়ে আসলো। আশা কথা গুলো বলতে বলতে তার নয়নে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। কিন্তু তাতে বিন্দু মাত্র কষ্টের ছাপ নেই। আশা চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ দেখো ও তোমাকে সবসময় নিজের দ্বারা যতটুকু সম্ভব খুশি রাখার চেষ্টা করবে। ‘

চাঁদ মাথা নিচু করে একটু হাসলো। আশা চাঁদের হাত ধরে ছলছলে চোখে তাকিয়ে করুণ কন্ঠে বলল,

‘ তুমি ওকে কখনো কষ্ট দিও না। ওর মন মেয়ে মানুষের থেকে অনেক নরম। বাহিরে প্রকাশ না করলেও আমি জানি, ভিতরে ও কতটা কষ্ট পায়। আ__

সিঁড়ি বেয়ে রেলিং ধরে নামছে তাসলিমা। আশা তাকে দেখেই চুপসে গেলো। তাসলিমা এসে বসলো। আশা হাসি মুখে বললো,

‘ ঘুম হলো? ‘

তসলিমা ঘুমোঘুমো কন্ঠে বলল, ‘ হ ভাবি।’

‘ রিদওয়ান , নাহিদ উঠে নি? সবাই একসাথে নাস্তা করতাম। ‘

‘ না ভাবি উঠে নাই। সারাদিন কি যে করে আল্লাহ জানে।’

চাঁদ উঠে কিচেনে গেলো। আলোক বানানো শেষ করলো। চাঁদ যেতেই তার মুখে একটু আটা মেখে দিল। খুনসুটি ভালোবাসা চলছিল তাদের মধ্যে। হটাৎ বাহির থেকে এক পুরুষের কণ্ঠে তাদের ধ্যান ভেঙ্গে গেল। চাঁদ শাড়ির আঁচল টা মাথায় টেনে দিলো ঘোমটার মতন। যাতে তার মুখ না দেখা যায়। শুধু মাত্র হাতের তালু ও পিছন ছাড়া চাঁদের পুরো শরীর ঢাকা। চাঁদ খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে টেবিলে এসে রাখলো। তাসলিমা মুখে বিষন্নতার ছাপ নিয়ে তাকিয়ে আছে। আর বিড়বিড় করে বলছে, ‘ এ আবার কেমন বউ। স্বামী কে দ্বারা কাজ করার! ‘ তারপর নিজের চোখ ঘুরিয়ে নেয়। চাঁদ রাখার পর পিছনে ঘুরে যেতে ধরবে তখনই তার সামনে একজন এসে বলে,

‘ আরে ভাবি জি। ‘

চাঁদ মাথা নিচু করে আছে। নাহিদের মুড অফ হয়ে গেলো। তার প্রচন্ড রাগ লাগছে। এই মেয়েকে দেখার জন্য সে কতো ব্যাকুল হয়ে আছে আর এই মেয়ে কিনা সামনে ঘোমটা দিয়ে আছে। চাঁদ তার পাশ কেটে চলে যাবে নাহিদ তার সামনে এসে বললো,

‘ আরে ভাবি জি দাঁড়ান। আপনার একমাত্র দেবরের সাথে পরিচিত হবেন না? ‘

তারপর হাত বাড়ায় হ্যান্ড সেক করার জন্য আর বলে উঠে,

‘ আমি নাহিদ! আপনার হাসব্যান্ড এর একমাত্র চাচাতো ভাই আর আপনার একমাত্র দেবর। ‘

চাঁদ কি করবে বুঝতে পারে না।তাই কোনোরকম তাড়াতাড়ি করে পাশ কেটে চলে আসে। চাঁদ যেতেই নাহিদ কেমন বাকা হাসে। তারপর নিজে নিজে বলে, ‘ Unbelievable ‘ ।বলে আবারো হাসে। চাঁদ তাড়াতাড়ি করে এসেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। আলোক দেখে বলে,

‘ কি হয়েছে তোমার তুমি ঠিক আছো? ‘

চাঁদ আঁচল টা কিছুটা উঠিয়ে মাথা নাড়ায়। আলোক দেখলো চাঁদের মুখে ঘামে ভিজে আছে।

‘ তুমি খেয়ে ঘরে যাও। এভাবে থাকার দরকার নেই। আর হ্যা আজকে আমরা কিছুক্ষন পর হসপিটালে যাবো। রেডি থেকো।’

চাঁদ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।

_______________

টেবিলে সবাই খাচ্ছে । রিদওয়ান রায়হান খেয়ে চলে গেছে বাহিরে। বসে আছে তাসলিমা , আশা, নাহিদ, আলোক।তাসলিমা উৎকণ্ঠা বলে উঠলো,

‘ কি আলোক? তোর বউ কে কি আমাদের সামনে আনবি না নাকি? সারাদিন ঘরের ভিতর ই থাকে। বের হলে এত বড় একটা ঘোমটা টেনে দেয়!’

আলোক খেতে খেতে থেমে গেলো। শান্ত গলায় বললো,

‘ কেনো চাচী আপনি কি ওকে দেখেন নি?’

‘ দেখব না কেনো? দেখেছি। কিন্তু এইভাবে চললে কি হয় নাকি? ‘

আলোক আবার খাওয়া শুরু করলো। তারপর খেতে খেতে বললো,

‘ তাহলে সমস্যা কি চাচী! ওর এই ভাবে থাকার? ‘

তাসলিমা ব্যাঙ্গ করে বললো,

‘ আরে আমরা তো ঘরেই মানুষ ! ‘

আলোক এবার জোড় গলায় বললো,

‘ আহ চাচী এতে আপনার সমস্যা কি? আমি ওর স্বামী আমার তো কোনো সমস্যা নেই। ‘

তাসলিমা আর কিছু বলল না। রাগে ভিতর ভিতর ফুঁসছে সে।

‘ হেই ব্রো। ভাবির সাথে তো আমার পরিচয় ই হলো না ইভেন তাকে দেখলাম ও না।’

আলোক তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

‘ কেনো তুই দেখে কি করবি? ‘

নাহিদ আলোকের কোথায় একটু নড়েচড়ে উঠলো তারপর বললো,

‘ আরে ব্রো আমার একমাত্র ভাবি। তাকে আমি দেখবো না! স্ট্রেজ্ঞ না? ‘

আলোকের খাওয়া শেষ হলো। সে উঠতে উঠতে বললো,

‘ না তোর দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। ‘

আলোকের কথায় নাহিদ কিছু অপমান বোধ করলো। আলোক যাবে এমন সময় তাসলিমা বলল,

‘ আরে ও তো ভাইয়ের মত। ‘

আলোক থেমে পিছনে ঘুরে হেসে বললো,

‘ “দেবর মৃত্যুর সমতুল্য “[সহীহ বুখারী :৫২৩২, মুসলিম ৩৯/৮ ,হাঃ২১৭২ ,আহমাদ ১৭৩৫২](আধুনিক প্রকাশনী – ৪৮৪৯, ইসলামিক ফাউ্ডেশনের – ৪৮৫২)

______________________

হসপিটাল এ বসে আছে আলোক, চাঁদ। তাদের কয়েকটা টেস্ট করতে দেয়েছে ডক্টর। সেগুলো করলো। রিপোর্ট একদিন পর দিবে। তাই তাঁরা আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়লো হসপিটাল থেকে। আলোক ভাবলো আজ যখন বের হয়েছে তখন চাঁদ কে নিয়ে একটু ঘুরবে। এতে চাঁদ কে ভালো লাগবে। চাঁদ কে নিয়ে একটা পার্কে গেলো। পার্কের পাশে কিছুটা দুরত্বে একটা বড় রাসায়নিক ফ্যাক্টরি। চাঁদ আলোক পাশাপাশি বসে আছে। চাঁদের হাত আলোকের হাতে আবদ্ধ। আলোক চাঁদ কে বললো,

‘ সাইনিং মুন কিছু খাবে? অনেকক্ষণ হয়েছে খেয়েছি। আমারও ক্ষুদা লেগেছে। তুমি নিকাবের ভিতর থেকে খেও?’

চাঁদ সম্মতি দিল। কারণ সে না করলে আলোক ও খাবে না তা চাঁদ ভালো করে জানে। তাই সম্মতি দিল। আলোক দাড়িয়ে বললো,

‘ দাড়াও আমি একটু দেখে আসি ভালো রেস্টুরেন্ট কোথায়। কয়েক বছর যাবত এদিকে আসা হয়নি তাই জানাও নেই। ‘

‘ তুমি বসে থাকো আমি দেখে আসছি।’

আলোক গেলো। চাঁদ বসে আছে। আশেপাশে আরো মানুষ রয়েছে। চাঁদ চারিপাশ টা দেখছে আর আলোকের কথা ভাবছে । আলোকের মত ছেলে খুব কমই আছে। চাঁদের নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে করে কারণ সে আলোকের মত একজন কে পেয়েছে। চাঁদ কখনোই ভাবে নি তার জীবনেও এইরকম দিন আসবে। এতটা সুখের জীবন। হঠাৎ চাঁদ নাকে গন্ধ ভেসে আসছে। কেমন পোড়া পোড়া। চাঁদ সামনে তাকিয়ে আলোককে খুঁজছে। চাঁদ দাঁড়ালো। আশেপাশে কেমন কোলাহল। আসতে আসতে দেখলো মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। চাঁদ আশেপাশে কয়েক পা বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা সামনে যেতেই দেখলো রাসায়নিক ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগেছে। মানুষ দৌড়াদৌড়ি করছে। আশেপাশে শত শত মানুষের ভিড়। চাঁদ ঘামতে শুরু করলো।তার চোখ বয়ে পানি পড়তে শুরু করে। সে কাঁদতে শুরু করে। হঠাৎ পাশ থেকে তার একজন হাত টানে। তারপর জরিয়ে ধরে। চাঁদ কাঁদতে এতটাই ব্যস্ত যে কে টেনে জরিয়ে ধরলো তা দেখার পরিস্থিতি তে নেই। কিছুক্ষণ পর ছাড়লো তার পর গালে হাত রেখে বলল,

‘ চাঁদ?তুম_তুমি ঠিক আছো? ওখানে থেকে এখানে এসেছো কেনো? জানো আমি তোমাকে খুঁজছি।’

চাঁদ কোনো রেসপন্স করলো না। আলোক চাঁদকে দেখতেই বুঝতে পারল চাঁদ কাঁদছে। আলোক ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইলো,

‘ কি হয়েছে তুমি কাঁদছো কেন? ‘

তারপর আশেপাশে ভালো করতেই বুঝতে পারল চাঁদের কেন কাঁদছে! আলোক চাঁদ কে আশ্বাস দিয়ে বলল,

‘ আরে তুমি কাঁদছো কেন ? ওখানে কোনো মানুষ নেই। আজকে ওই ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল আর ভাগ্যক্রমে আজকেই আগুন লেগেছে।’

কিন্তু তবুও চাঁদ কাঁদছে। আলোক চাঁদ কে বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা হলো। বাইকে করে এসেছিল তারা। তাদের বাড়ি থেকে হসপিটাল কয়েক ঘন্টার রাস্তা। আলোক যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলো চাঁদ প্রায় অর্ধেকের বেশি রাস্তা কেঁদেছে। স্বাভাবিক ভাবে এমন ঘটনা ঘটলে অবশ্যই খারাপ লাগবে আর কষ্ট পাওয়া টাও স্বাভাবিক কিন্তু চাঁদকে অস্বাভাবিক লাগছে।তার এভাবে কাঁদার কারন টা আলোকের কাছে অন্য মনে হচ্ছে।

______________

দেখতে দেখতে বাড়িতে এসে গেল তারা। চাঁদ নামতেই আলোক বলল,

‘ চাঁদ তুমি যাও আমি একটু আসছি।’

চাঁদ শুনে ভিতরে সোজা নিজের ঘরে গেল। বোরখা খুলে গিয়ে ফ্রেশ হলো। শাড়ি টাও চেঞ্জ করে করলো। সাথে মাথাটাও ধুয়ে ফেলল। যাওয়ার সময় গোসল করেই গিয়েছে। ওয়াশরুম থেকে মাথা মুছতে মুছতে বের হয় চাঁদ।তারপর তার কানে একটা পুরুষের কন্ঠ ভেসে আসলো,

‘ ভাবি জি?’

চাঁদ মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখলো নাহিদ।

#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here