পূর্ণতা পর্ব ২৯+৩০

0
87

#পূর্ণতা❤️
#Writer_তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

২৯.

আলোকের জীবনে আজ আলোর অভাব। জানালা ভেদ করে এক মুঠো রোদ ও ভিতরে ঢুকতে পারে না। দেখতে দেখতে কেটে গেছে তিন দিন। আলোক নামাজে যাওয়া ছাড়া সারাদিন ঘর বন্দী হয়ে থাকে। ঘরের চারিপাশ বন্ধ করে রেখেছে। কোথাও কোনো এক টুকরো আলো নেই। সকাল নাকি রাত কিছুই বোঝা যায় না। এখন রাত। চারিপাশ এমনিতেই অন্ধকার। বাহিরে শো শো বাতাস বইছে। আলোক ব্যালকনির দরজাটা খুলে বারান্দায় গেলো। তীব্র বাতাসে তার পুরো শরীর শিউরে উঠলো। আকাশে চাঁদ উঠেছে, কিন্তু আজ নেই শুধু আলোকের চাঁদ। আলোক চোখ জোড়া চেপে বন্ধ করে ঠোঁট দুটো চেপে ধরলো। তারপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চোখের কর্নিশের থাকা জল মুছে নিয়ে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লো। এই মেঝে টা তেই কতো স্মৃতি রয়েছে জড়িয়ে। কতো সময় পার করেছে। এখানেই আলোক চাঁদ কে প্রপোজ করেছিল, এখানেই হয়েছিল তাদের মিল, এখান থেকেই শুরু হয়েছিল চাঁদ আলোকের কাহিনী। চোখ বয়ে পানি পড়তে চাচ্ছে কিন্তু আলোক যেনো কান্না চেপে ধরে আছে। শেষমেশ না পেরে আলোক দু হাত দিয়ে চোখ মুখ চেপে ধরে নিজের। কয়েক মিনিট পরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো তারপর মাথাটাকে পিছনে হেলান দিলো। চোখ জোড়া বন্ধ করলো। হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির ভিড়ে….

____________

‘ পূর্ণতার বাবা?

ডুকরে কাদছিল আলোক। হটাৎ পাশের এমন মেয়েলি আওয়াজে চেয়ে তাকায়। আলোক বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।

‘ তুমি?

মেয়েটা হেসে বললো,

‘ কেনো ? কাকে আশা করছিলে আলোক বাবু?[ভ্রু উচুঁ করে]

আলোক অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।আলোক কিছু বলবে তার আগে সে বলে উঠলো,

‘ উফফ! আমার আলোক সোনার চোখ মুখ কি করে‌ রেখেছে।’

বলে এগিয়ে এসে আলোকের চোখ মুখ মুছয়ে দিলো। আলোক আর পারলো না কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠলো,

‘ তুমি !তুমি কথা বলতে পারো?’

চাঁদ মুচকি হেসে বললো,

‘ কেনো তুমি চাও নাকি আমি আজীবন বোবা হিয়ে থাকি?’

আলোক ‘থ’ মেরে বসে আছে। চাঁদ আলোকের মাথায় কোলে নিয়ে গেয়ে উঠলো,

‘ ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান
ঘুমাও আমার কোলে…

ভালোবাসার নাও ভাসাবো
ভালবাসি বলে….

আলোকের চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। সে ডুবে যাচ্ছে গভীর ঘুমে।

____________

সকালে ফজরের আজানে ঘুম ভাঙ্গলো আলোকের। সে তাড়াতাড়ি চোখ গুলো জোরে জোড়ে শ্বাস নিতে শুরু করে। আশেপাশে চারিপাশ টা ভালো করে দেখলো। কালকে ব্যালকনিতে এসে এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। আর রাতে চাঁদ! চাঁদ এসেছিল! কথা বলছিল! এইসব সব স্বপ্ন ছিল। তবুও স্বপ্নে হলেও চাঁদকে দেখতে, ছুঁতে,কথা বলতে পেরেছে আলোক। মন একটু প্রশান্তি লাগলো তার। আলোক উঠে ওযু করে নামাজে গেলো। আজ আর নামাজ শেষে বাড়ি ফিরলো না , হাঁটতে গেলো বাহিরে। কালকে চাঁদকে দেখার পর তার আর ইচ্ছে হচ্ছে না ঘরের মধ্যে যেতে। কারণ শত শত স্মৃতি রয়েছে সেই ঘরে আবদ্ধ। যেগুলো তাকে প্রতি নিয়ত কষ্ট দিয়ে চলছে। তারপর কিছুক্ষণ বাহিরে হেটে ‌বাড়ির সামনে আসলো কিন্তু ঢুকলো না। তারপর বাড়ীর সামনে স্যান্ডেল রেখে খালি পায়ে আশেপাশে একটু হাঁটতে শুরু করলো বাড়ির আশেপাশে। মনটাকে একটু শান্তি দিতে, যদিও পাবে না। তবুও একটু প্রচেষ্টা।মাঝে মাঝে খালি পায়ে হাঁটা সুন্নত। আলোক হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পিছনে গেলো। চাঁদের কথা ভাবছে। আজ কয়েকদিন হয়ে গেলো চাঁদ কে ছাড়া থাকছে সে। চাঁদ পাখি, মাই সাইনিং, মায়াবিনী এইসব নামে আর কাউকে ডাকতে পারছে না। কতদিন হয়ে গেলো আলোকের মুখে হাসি টুকুও নেই। থাকবে কিভাবে তার হাসির কারণ যে মানুষ টি ছিল সে-ই তো নেই। আজ হাত ধরে হাঁটার জন্য পাশের সেই মানুষটির বড্ডো অভাব। তার প্রিয় মানুষ টি এখন একাই রয়েছে অন্ধকার কবরে।ভাবতেই আলোকের গাঁ শিউরে উঠলো। হাঁটতে হাঁটতে আচমকা আলোকের মুখ থেকে ‘ আহ ‘ শব্দ বেরলো। আলোকের পায়ে কিছু খোঁচা লেগেছে। আলোক ডান পা টা কে উঁচু করে ঝাড়লো। কিছু টুকরো! আলোকের কেমন সন্দেহ জনক দৃষ্টিতে তাকালো।কারন এগুলো তো ইনহেলার এর টুকরো। কিন্তু এটা ভাঙ্গলো কিভাবে? আর এখানেই বা কেনো?আলোর উপরে তাকালো। এটা তো তার ঘর আর পাশের ঘরের মাঝামাঝি জায়গা। আর এই ঘরে নাহিদ থাকতো। আলোক বাড়িতে ঢুকে সোজা সেই ঘরে দিকে গেল। আর যেতেই কিছু কথাকপন কানে আসলো,

‘ তুই! তুই কিভাবে?’

নাহিদ চোয়াল শক্ত করে রুষ্ঠ কন্ঠে বলল,

‘আমিই মেরেছি বোবা টাকে। শা** খুব দেমাগ আর আলোকের খুব *****।’

তাসলিমা আলংকারিত কন্ঠস্বরে বলল,

‘ নাহিদ! পাগল হয়েছিস?‌ কিসব বলছিস?’

নাহিদ তাকিয়ে বাঁকা হাসলো।

‘ ওই মেয়ে__ও তো ওর শ্বাস কষ্টে মারা গেছিল !

নাহিদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তারপর বলতে শুরু করল।
__________

ওইদিন আলোকের পিছে পিছে চাঁদ ও গেল। কিন্তু আলোক দরজা লাগিয়ে দেয় তাই চাঁদ বাহিরে দাঁড়িয়ে যায়। চাঁদ প্রথমে নক করলো আলোক তাতে সাড়া দেয় না। চাঁদ আবার জোরে দরজায় শব্দ করলো তাতে আলোকের কর্কশ কন্ঠের আওয়াজ এলো। তারপর আলোক কানে হেডফোন গুজলো। কিন্তু এদিকে চাঁদের নিজের উপর খুব রাগ লাগছিল। সে আলোককে কষ্ট দিলো ভেবে চাঁদের নিজের ই কষ্ট লাগছিল। স্বামী নামক সেই ছেলে তাকে কতো ভালোবেসেছে, তাকে কতো সম্মান দিয়েছে। একজন স্বাভাবিক মেয়েও মনে হয় এমন স্বামী পায় না ।‌সেখানে সে অনাথ বোবা হওয়ার পরেও আলোক তাকে কত ভালোবেসেছে। আর আজ তার মতন একজনকে চাঁদ কষ্ট দিলো? আলোক তো রাগ করার মতো ছেলে না। আলোক তো কখনোই চাঁদের সাথে এমন করে নি। কিন্তু আজ সে চাঁদের কাজে প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে ভেবেই চাঁদের বুকের ভিতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠছে। চাঁদের নিজের উপর খুব রাগ, ঘৃণা লাগছে। চাঁদ খুব জোরে জোরে কাঁদছে। তার ভিতরে যেন আর্তনাদে ফেটে যাচ্ছে। ভিতর থেকে যেন কেউ চিৎকার করে বলতে চাচ্ছে , আমাকে মাফ করে দাও আলোক। আম সরি।’ কিন্তু সে তো কথা বলতে পারে না যদি পারতো তাহলে চিৎকার করে বলতো। আজ সকালে যখন চাঁদ চোখ খুলল তখন দেখলো ‌আলোক‌ এক পলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর চাঁদ উঠতেই তার কপালে একটা ভালোবাসার পরশ ছুঁইয়ে দেয়। চাঁদের এইসব মনে পড়ছে ।আর কান্নার বেগ এতটাই তীব্র যে, সে ঠিক মতন শ্বাস নিচ্ছে না। চাঁদ জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করে কিন্তু তার কান্না তো কিছুতেই থামছে না। তার শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কিভাবে তা বলবে সে? চাঁদের নিজের বুকের ভিতর কেমন ভার অনুভূতি হচ্ছে। শ্বাস ও ঠিক ভাবে নিতে পারছে না। যেন কেউ আটকে ধরছে। চাঁদ ফ্লোরে বসে পড়ে তারপর আবারো দরজায় শব্দ করলো কিন্তু আলোক তা শুনতে পেল না। সত্যি এবার চাঁদের শ্বাস নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। একজন শ্বাসকষ্ট রোগীই জানে এই সময় তাদের কেমন যন্ত্রনা হয়। হঠাৎ চাঁদের সামনে ধীরে একটা শব্দ হলো। চাঁদ ফ্লোরের দিকে তাকায় দেখে ইনহেলার। দেখা মাত্রই চাঁদের মুখে একটু হাসি ফোটে। চাঁদ ইনহেলার টাকে নিতে চায় কিন্তু সেটা তার থেকে কিছু টা দূরে। আর দাঁড়িয়ে গিয়ে নেওয়ার মত চাঁদের শক্তি হচ্ছে না।

‘ ভাবি জি?’

সামনে তাকাতেই দেখলো বাঁকা হেসে দাঁড়িয়ে আছে নাহিদ। চাঁদ তার দিকে তাকাতেই নাহিদ বলল,

‘ আরে ভাবি ওটা নিন নাহলে আপনার সমস্যা হবে।’

চাঁদ ফ্লোরের সাথে মিশে আস্তে আস্তে এগোয় তারপর ইনহেলার এর উপর হাত রাখতেই নাহিদ তার হাতের উপর পা দিয়ে চেপে ধরে। ব্যথায় চাঁদ কুঁকড়ে উঠে। হাত সরানোর চেষ্টা করে কিন্তু নাহিদ জোরে চেপে ধরার জন্য পারে না। চাঁদের প্রচন্ড ব্যথা অনুভব হয়। এমনিতেই শ্বাসকষ্টে সে কাঁদছিল এবার ব্যথায় তার চোখ বয়ে অশ্রুজল ঝরতে লাগে। ভিতরে সে কতোই না চিৎকার করছে কিন্তু আফসোস বাহির দিক দিয়ে প্রকাশ করতে পারছে না। নাহিদ পা সরাতেই চাঁদ নিজের হাত সরিয়ে নেয়। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে সে। চাঁদ উল্টো হয়ে আছে।

‘ আরে ভাবি নেবেন না?’

চাঁদ আবার নেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু নাহিদ পা দিয়ে দূরে সরিয়ে বলল,

‘ ইশশ! এটা কোনো কথা হলো ভাবি? নিতেই পারলেন না!’

চাঁদ মাথা তুলে তাকানোর চেষ্টা করলো। নাহিদ চাঁদের চারিপাশে ঘুরতে শুরু আর বলতে লাগে,

‘ এত কিসের ভাব দেখাস রে?‌‌ না সুন্দরী! না বাচ্চা দিতে পারবি! না কথা বলতে পারিস তবুও এত কিসের ভাব দেখাস তুই শা**

কথাটা শেষ করতেই চাঁদকে পেটে একটা জোরে লাথি মারলো নাহিদ। মরার সাথে সাথে চাঁদ পেট হাত দ্বারা চেপে চোখ বন্ধ করে আরো জোরে কেঁদে উঠে। আস্তে আস্তে তার শ্বাসের কষ্ট বেড়েই চলছে আর আরেকদিকে এইসব। নাহিদ আবার বলতে লাগলো,

‘ কি এমন হতো রে যদি আমার সাথে একটু মজাই করতি? তাতে এমন কি ক্ষতিটা হতো?‌তুই ও মজা পেতিস আমিও পেতাম! কিন্তু না তোর তো খুব ঢং!

বলার পর ইনহেলার টা পা দ্বারা চেপে ধরে ভেঙ্গে ফেলল। চাঁদ জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। আলোক বলেছিল এইসময় রিল্যাক্স এ জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয়। চাঁদ ও তাই করছে। মনে মনে চাঁদ যেন চিৎকার করে আলোককে ডাকছে। নাহিদ তার এক পা চাঁদের পিঠের উপর রেখে ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,

‘ তোর মধ্যে এমন কি পেয়েছে রে আলোক?‌তোকে নিয়ে এমন ভাব করে যেন তুই হীরা। তোকে দেখাও যাবে না, ছোঁয়াও যাবে না।’

বলে গাঁয়ের সম্পূর্ণ ভর চাঁদের উপর দেয়। চাঁদের খুব কষ্ট হচ্ছে। চাঁদের নিজের মনে হচ্ছে সে আর বাঁচবে না। তার যে কষ্টে ভিতর টা ফেটে যাচ্ছে। তার মুখ ঘেমে ভিজে গেছে।নাহিদ আতকে গিয়ে বলল,

‘ আরে ভাবি ভাবি কি হলো?‌চোখ খুলুন ভাবি!ভাবি?’

চাঁদের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আস্তে আস্তে তার শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। নাহিদ হাসতে শুরু করলো তারপর বলল,

‘ তোর আলোক কোথায়? শা**র আজকে কোথায় গেল? ডাক না ওই মা******* কে। ডাক, ডাক জোরে ডাক!’

বলে চাঁদকে আরেকটা লাথি মারলো। কিন্তু এবার চাঁদ যেন নেই নেই ভাব। তার কোনো রেসপন্স নেই। চাঁদ জোরে শ্বাস ফেলার চেষ্টা করে শেষ বারের মত মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলো, ‘ আলোক! সরি আল_আলোক! কিন্তু তা শব্দ আকারে বের হলো না কিন্তু ভিতরে আর্তনাদে ফেটে যাচ্ছে। তারপর চাঁদের চোখ আস্তে আস্তে আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল । সে চলে যাচ্ছে বহুদূরে….!! নাহিদ রেগে বলল,

‘ আমাকে সবার সামনে মেরেছিল, অপমান করেছিল‌ ওই‌ শা***!‌দেখ এবার শা*** বোবা।’

বলে শেষবারের মত চাঁদের মুখের দিকে একটা লাথি মারলো। চাঁদের চুল গুলো এলে মেলো হয়ে গেল।‌সে কিছুটা দূরে সরে গেল। চাঁদের বন্ধ চোখ দিয়ে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

‘ শা***‌ কি হত আমার সাথে একটু ইনজয় করলে?‌নিজেও ভালো থাকতি আমাকেও ভালো রাখতি। মর এখন।’

বলে আবার একটা লাথি মারবে । কিন্তু ভিতর থেকে কেমন শব্দ আসছে। নাহিদ তাড়াতাড়ি করে ইনহেলার এর টুকরো গুলো নিয়ে পাশে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে। আর তার কয়েক সেকেন্ড পড়েই দরজা খুলে আলোক বের হলো। বের হতে চাঁদকে মেঝেতে উল্টো পড়ে থাকতে দেখলো। তারপর তার আহাজারি।
___________

‘ আমাকে সবার সাম_____

‘ আলোক!’

ভীরু কন্ঠস্বরে তাসলিমা বলল। নাহিদ তার কথা আর সমাপ্ত করতে পারলো না। রেগে গিয়ে তার মাকে বলল,

‘ ওই ব*** টার নাম নিচ্ছো কেনো?’

তাসলিমার ভয়ে গা কাঁপতে শুরু করছে। ভীতি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে আলোকের। এরপরে যে কি হবে তা সে ভালো করেই জানে। নাহিদ তার মায়ের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে পিছনে ঘুরতেই থমকে যায়। নাহিদ একটা ঢোক গিলল। আলোকের চোখ বয়ে গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা অশ্রু। তার ভাবতেই গা শিউরে উঠছে তার চাঁদ কত কষ্ট পেয়ে এই দুনিয়া থেকে চলে গেছে। কত জোরে হয়তো ভিতরে চিৎকার করে আলোক কে ডেকেছে, কতোই না ভিতরে ছটফট করছে। কিন্তু শেষে ব্যর্থ হয়ে চলে গেছে। আলোক কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,

‘ তোকে মেরেছিলাম তো আমি! সবার অপমানও আমিই করেছিলাম! তাহলে ওকে কেনো কষ্ট দিলি?‌কেনো এত কষ্টে দিয়ে মেরে ফেললি?’

আলোকের কথায় নাহিদ চুপসে গেছে।

‘‌কেনো ওকে এতটা কষ্ট দিলি?‌একবারো‌ কি‌ তোর কষ্ট লাগলো না? মানুষ নাকি পশু তুই?’

নাহিদ এবার রক্তিম চোখে তাকিয়ে বলল,

‘ বেশ করেছি মেরেছি। ওই বোবার জন্য তুই আমাকে মেরেছিলি না?তাই ওই বোবাটাকেই উপরে পাঠিয়ে দিয়েছি।’

আলোক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করলো। তারপর খুলে বলল,

‘ শুধু মাত্র আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ওকে কষ্ট দিয়ে মারলি?’

নাহিদ চোয়াল শক্ত করে বলল,

‘ আরে বন্ধ কর তোর মেলো ড্রামা। কিসের শোক পালন করছিস এত ওই বন্ধ্যা বোবার জন্য?‌একটা গেছে তাতে কি হাজার টা আসবে।’

আলোক কর্কশ কন্ঠে বলে উঠে,

‘চুপ ।’

নাহিদ শয়তানি হেসে বললে,

‘ নাকি এখন ইনজয় করতে পারছিস না ওই বন্ধ্যার সাথে তার শোক পালন করছিস? সমস্যা নেই এর চেয়ে ভালো মাল এনে দিবো।’

‘ মুখ সামলে কথা বল নাহিদ।’

‘ আরে রাখ তো তোর! এখন বুঝলাম প্রতি রাত ইনজয় হচ্ছে না তো তাই তু______

বলার আগেই আলোক এসে একটা ঘুষি মারল। নাহিদ কিছুটা দূরে গেল। আলোক এখন কি পরিমান রেগে আছে তা তাসলিমা, নাহিদ দু জনের ই ধারনার বাহিরে। আর নাহিদকে কি করবে তা তাসলিমা হয়তো আগেই আন্দাজ করতে পেরেছে। তাসলিমা ইশারায় নাহিদ কে পালাতে বলে। নাহিদ সুযোগ খুঁজছে। আলোক আবার একটা মারলো নাহিদ কে। নাহিদের ঠোঁটের কর্নিশ হতে রক্ত বেরিয়ে এলো। আর সে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে পড়ে গেল। আলোক নাহিদ কে একটা সর্বজোরে লাথি মারলো তারপর আবার মারতে যাবে নাহিদ আলোকের পা ধরে ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয়। আলোক কিছুটা দূরে সরে যেতেই নাহিদ উঠে তড়িৎ বেগে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
#পূর্ণতা❤️
#Writer_তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

৩০.

আঁখিযুগলে নোনা পানি এসেছে। প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে তারার। সে কখনোই ভাবে নি এইসব কিছু হবে। আলোক যে এইরকম একজন মানুষ তা আজ জানতে পারলো। নিরব চোখের কর্নিশের পানি টুকু মুছে বললো,

‘ কি থেকে কি হয়ে গেল!’

তারা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,

‘ তারপর!’

নিরব তপ্তশ্বাস ফেলে বলল,

‘ তারপর____

___________________

আলোকের আর্তনাদে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠে। আলোকের এই মুহূর্তে নিজেকে নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে মনে হচ্ছে। নিজের করা কর্মে সে প্রচন্ড অনুতপ্ত হচ্ছে। কেন চাঁদের সাথে সে রাগ করেছিল? রাগ করা তো শয়তানের কাজ। কেন সে এতটা অভিমান করল চাঁদের উপর? যার ফলস্বরূপ আজ চাঁদ নেই। যদি আলোক অভিমান না করে সেইদিন চাঁদের সাথে থাকতো তাহলে হয়ত চাঁদ বেঁচে থাকতো। কিন্তু এখন আফসোস করে কি হবে? আশা উপরে আসলো দেখলো আলোক হাঁটু ভেঙ্গে বসে মাথা নিচু করে জোরে কাঁদছে। আশা আসতেই তাসলিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আলোককে এভাবে দেখতেই আশা তার কাছে গিয়ে আলোকের দু’গালে হাত রেখে অসহায় ভাবে বলল,

‘ কি হয়েছে বাবা? কাঁদছিস কেনো? নাহিদ! নাহিদ ওভাবে দৌড়ে গেল কেনো?’

আলোক এই মুহূর্তে কথা বলার মত শক্তি টুকু পাচ্ছে না। সে অনাবৃত কাঁদছে। তার মায়ের দিকে তাকাতেই আশা ছেলেকে দু’হাতে বুকে চেপে ধরে। আর ইতস্তত কন্ঠে বলে,

‘ বাবা কাঁদছিস কেনো? তুই জানিস না তুই কাঁদলে যে তোর মায়ের খুব কষ্ট হয় বাবা।’

আলোক সজোরে তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো‌ আর কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,

‘ ম্_মা্_ মা না_ নাহিদ অনেক কষ্ট দি_দিয়ে মেরেছে মা_ অনেক কষ্ট দি_দিয়ে মের_মেরেছে।’

তারপর আশা আলোকের মাথায় হাত বুলাতে শুরু করে। আস্তে আস্তে আলোক সব কিছু বলে আশা কে। আশা সব শোনার পর আলোককে নিজের থেকে ছাড়ালো। তারপর আলোকের দু’গাল ধরে শক্ত ভাবে বলল,

‘ আলোক আমার দিকে দেখ। আলোক।’

অনেকক্ষন পরে আলোক তাকলো। আশা আলোকের চোখের পানি মুছে দিল তারপর জোর কন্ঠে বলল,

‘ দেখ বাবা যারা এইসব করে তাদের উদ্দেশ্য থাকে আমাদের কাঁদানো , আমাদের কষ্ট দেওয়া। আর যদি আমরা সেটাই করি তাহলে সে তার উদ্দেশ্যে সফল হয়ে যাবে। তার জয় হয় আর আমাদের পরাজয়। কিন্তু আমরা যদি তাকে দেখিয়ে দেই আমরা অনেক স্ট্রং, সহজেই ভেঙ্গে পরি না তাহলে সে তার কাজে ব্যর্থ হয়ে যাবে। নাহিদ ও এই উদ্দেশ্যে এইসব করেছে! যাতে তুই ভেঙ্গে পরিস, কাদিস, কষ্ট পাস।’

বলে থামলো আশা। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললো,

‘ তুই এখন দেখ তুই সেটাই করছিস। তাহলে নাহিদ নিজের উদ্দেশ্য সফল হয়ে গেল। তুই কি চাস ও সফল হোক?’

আলোক মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলল।

‘ তাহলে কাঁদছিস কেন?’

আলোকের চোখের কার্নিশ হতে আঙ্গুলে এক ফোঁটা জল নিয়ে বলল,

‘ জানিস এই পানির মূল্য কি? যেটাকে তুই অপচয় করছিস। রাতে তাহাজ্জুদ নামাজে এটা ফেলবি তাহলেই এর মূল্য বুঝবি। বুঝেছিস?’

আলোক মাথা নাড়িয়ে আশাকে জরিয়ে ধরল।আশা আর কিছু বলল না।

________________

তারা ভাবতেও পারছে না তার শাশুড়ি আশা এতটা ভালো। যেখানে তার নিজের মা তাকে এতটাও ভালোবাসে না সেখানে আশা আলোকের সৎ মা হওয়ার পরেও তাকে কতটা আদর, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখেছে। তারার খুব আফসোস হচ্ছে যদি তার মা-ও এইরকম হতো।

‘ তারপর রাতে আলোক নিজের ঘরের মেঝেতে বসে ছিল। এমন সময় হঠাৎ বাহির অনেক শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। আলোক তা দেখতে বের হল দেখলো বাড়িতে পুলিশ এসেছে আর তার সমানে আশা দাঁড়িয়ে জোড় কন্ঠে কিছু বলছে। আলোক কে দেখতেই পুলিশ অ্যারেস্ট করে নেয়।’

তারা অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বললো,

‘ কিন্তু কেনো?’

নিরব মুখে প্লাস্টিক হাসি হেসে বললো,

‘ কারণ নাহিদ পালিয়ে গেছিল। সেইদিন ওখানকার রাস্তায় কাজ চলছিল। নাহিদ তাড়াহুড়ায় পালাতে গিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে, তাতে নাহিদের অনেক ব্লাডিং হয়। তখন কার সময়ে হসপিটাল ছিল আরো দূরে তাই যেতে অনেক দেরি হয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে নাহিদ মারা যায়। আর একমাএ ছেলেকে হারিয়ে তাসলিমা অ্যান্টি থানায় আলোকের বিরুদ্ধে কেস করে।’

তারা ধীর কন্ঠে বললো,

‘ তাহলে কি এইজন্য আলোক জেলে ছিল?’

নিরব শব্দ করে হাসলো। আর নীরবের হাসিতেই বোঝা যাচ্ছে সে সম্মতি জানাচ্ছে এতে। তারা কিছুক্ষন চুপ থেকে অস্থিরতা নিয়ে বলে উঠলো,

‘ কিন্তু ওটা তো রোড অ্যাকসিডেন্ট ছিল। তাহলে আলোক জেলে গেলো কেনো?’

‘ কারন তাসলিমা অ্যান্টি অনেক জটিল কেস সাজিয়েছিল। উনি চাঁদের হত্যার খুনিও আলোক কে বানিয়েছেন। উনি বলেছিলেন চাঁদের সাথে নাহিদের একটা সম্পর্ক ছিল। আলোক জানার পর নাহিদকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তারপর চাঁদের উপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালায়। কিন্তু মাস কয়েকখানিক পর নাহিদ চাঁদের সাথে দেখা করতে এলে ওরা দুজন আলোকের হাতে ধরা পড়ে। আর এইজন্য আলোক চাঁদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমে ঝগড়া করে তারপর তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলার প্রয়াস চালায়। আর এই খবর যাতে কে জানতে না পারে সেই জন্য ওই দিন রাতেই চাঁদ কে দাফন করে। তারপর কিছুদিন যেতে যখন নাহিদ আলোক কে হুমকি দেয় যে, সে পুলিশ কে সব বলে দিবে তখন নাহিদ আর আলোকের মধ্যে একটা হাতাহাতি হয়। আর আলোক নাহিদ কে অনেক মারে যার ফলে নাহিদের রক্ত ক্ষরণ হয় আর হসপিটাল যাওয়ার পথে আলোক নাহিদ কে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করে আর সেটাকে রোড অ্যাকসিডেন্ট নামে সবার কাছে দেখায়। অর্থাৎ আলোক চাঁদ ও নাহিদ কে ‘এটেম্পট টু মার্ডার’ করেছে।’

সব শুনে তারা হতবাক! মানুষ এতটা নীচ কিভাবে হতে পারে? এতটা নিকৃষ্ট!

‘ এইরকম একটা কেস সাজান তাসলিমা অ্যান্টি। আর তার সাথে সঙ্গ দেন রাহেলা নামে ওই মহিলাটা।’

তারা রুষ্ঠ কন্ঠে বলল,

‘ কিন্তু আলোক ,আশা মা, বাবা কেউ কিছু বলে নি?’

নিরব তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বললো,

‘ আলোক আর কি বলত? সে তো এমনিতেই চাঁদের মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করেছে। আর আদালতে আলোক কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল
, ‘ চাঁদের মৃত্যুর আগে চাঁদের সাথে আলোকের রাগারাগি, ঝগড়া হয়েছিল কিনা?’ প্রতত্তরে আলোক ‘হ্যাঁ’ বলেছিল। কারণ সত্যি তাদের মাঝে তা হয়েছিল। তারপর নাহিদের সময়ের মৃত্যুর আগে হয়েছিল কিনা সেটাও জিজ্ঞেস করে আর এটার উত্তর ও আলোক ‘হ্যাঁ’ দেয়।’

‘ কিন্তু! কিন্তু চাঁদ কে তো আলোক মারে নি সেটা কেনো বলে নি আলোক?’

নিরব হাতের তালু দ্বারা কপাল মুছে বললো,

‘ কারণ তাতে তাকে প্রশ্ন উঠেছিল, যদি চাঁদের মৃত্যু একটা অ্যাকসিডেন্ট ই হয়। তাহলে আলোক ও তার পরিবার কেনো এতো কম সময়ে, এতটা তাড়াহুড়া করে চাঁদ কে দাফন করলো। আরো নানান সব প্রশ্ন উঠেছিল। আলোক আর কিছু বলে নি। কিন্তু আলোক চাইলে তাদের টাকা, ক্ষমতা দিতে জামিন পেতে পারত কিন্তু সে রায়হান আঙ্কেল আর আশা অ্যান্টিকে আলোক কড়া ভাবে বারণ করে দেয়। কারণ আলোক সত্যি চাঁদের মৃত্যুর জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবত। আর এভাবেই ‘এটেম্পট টু মার্ডার’’ দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩০৭ ধারায়, যদি কোন লোক এমন অভিপ্রায় বা অবগতি সহকারে বা এমন আশংকা জানার পরও এমন অবস্থায় এমন কার্য করে, যার ফলে মৃত্যু ঘটলে সে খুনের অপরাধে অপরাধী হবে, তাহলে সে লোক যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে যার মেয়াদ দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে ও জরিমানা-দণ্ডেও দণ্ডিত হবে। সাথে নারী নির্যাতনের কেস টাও দেওয়া হয় কিন্তু পরে তা মিথ্যা সাব্যস্ত হয়। ‘

তারার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে ভাবতে পারে নি আলোকের অতীত এমন হবে। বিনা দোষে আলোক শাস্তি পেয়েছে আর এর জন্য তারা তাকে কতো বাজে বাজে কথা না শুনিয়েছে।তারার চোখ বয়ে অশ্রুজল পড়ছে।

‘ আর এভাবেই বিনা দোষে আলোক দশ বছর জেলে কাটালো। আলোক জেলে থাকায় প্রতিটা সময় নিজে খুব অনুতপ্ত হয়েছে। আল্লাহ কাছে ক্ষমা,তওবা করছে। নিজের সেই সামান্য অভিমান, রাগটুকুকেই আলোক এইসব কিছু জন্য দায়ী করছে। যার জন্য সে প্রচন্ড অনুতপ্ত। আলোক চাঁদকে অনেক ভালোবাসত। অনেক___! এতটাই যে ওইদিন চাঁদকে আর আশা আন্টি মিথ্যা আশ্বাস দেয় যে, সে অনাথ বাচ্চা নেবে। কারন আলোক জানতো সন্তান দত্তক নেওয়া নিয়ে অনেক মতাভেদ আছে। কেউ জায়েজ আর কেউ বা নাজায়েজ বলে আর আলোক এইসব মতাভেদ বিষয় এড়িয়ে চলে। আলোক যদি মেয়ে সন্তান দত্তক নেয় তাহলে মেয়েটা সাবালিকা হলেই আলোকের সামনে‌‌ সে একজন পর নারী হয়ে যাবে আর এর মত চলতে হবে ।আর আলোক ও তাকে নিজের সন্তানের মত আদর, মানুষ করতে পারবে না। আলোক এইসব ভালো করেই জানতো কিন্তু সেইদিন চাঁদ আর আশা আন্টিকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়।’

তারা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠে,

‘ তা_ তাহলে রুমানা নামের ওই মেয়েটার বাবা আর ওই মেয়েটা কে কে মারলো? আম_ আমি শুনেছিলাম যেদিন রাতে রুমানার বাবা কে হত্যা করা হয় সেদিন আমি আলোককে মাঝ রাতে রক্ত মাখা গাঁয়ে আর হাতে ছুড়ি নিয়ে দেখেছিলাম। তারপর যে_যেদিন রুমানাকে ধর্ষন সাথে হত্যা করা হয় তার পরেরদিন সকালে আলোক ফোনে কাউকে বলছিল ‘ কাজ হয়ে গেছে।’

নিরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

‘ আপনি একটু অতিরিক্ত বুঝেন তারা। আর ‘অতিরিক্ত’ কোনো কিছুই কিন্তু ভালো নয়। এইসব শোনার পর আপনার কি মনে হয় আলোক ওইরকম ছেলে? আর এইরকম কোনো কাজ সে করবে? আর ওই লোক টা আর তার মেয়ে রুমানাকে কে মেরেছে আমি জানি না। কিন্তু ১০০% সিউরিটি দিয়ে বলতে পারবো আমার ভাই, আমার আলোক কখনো এইসব করবে না। আর আপনি যে বললেন ‘কাজ হয়েছে’ বলে শুনেছিলেন! আপনার মনে আছে আপনার পায়ে যে ক্ষত হয়েছিল তার জন্য ইরা আলোককে অন্টিবায়োটিক দিয়েছিল আপনাকে দেওয়ার জন্য আর সেটা জানতেই আমি আলোককে একদিন সকালে কল করেছিলাম তখন আলোক বলেছিল ‘কাজ হয়েছে’! হয়তো আপনি সেটাই শুনেছেন।’

বলে থামলো। তারপর আবার বলতে লাগলো,

‘আর আপনার সাথে আলোকের দেখা হয় কয়েক মাস আগে। কোথায় কিভাবে জানি না! কিন্তু আপনার সাথে আলোকের দেখা হয়। আপনার চোখযুগল একদম চাঁদের মত লাগে আলোকের কাছে। সেই ডগর ডগর বড় চোখ, আর চোখের কোনিরে সেই তিল! একদম চাঁদের মত। আলোক আপনাকে দেখে এক মূহুর্তের ‌জন্য থমকে গেছিল। আশা আন্টি আলোকের সাথে থাকায় এটা নোটিস করে। আলোক আশা আন্টি কে কিছু বলে না। সেইদিনের পর থেকে আশা আন্টি আপনাকে খোঁজা শুরু করে আর পেয়েও যায় আর সাথে সাথে বিয়ের প্রস্তাব ও দেয়। আলোকরা বড়লোক হওয়ায় হয়তো আপনার ফ্যামিলি প্রস্তাবে ‘হ্যা’ বলে। তারপর আশা আন্টি অনেকটা অসহায়ের মত আলোককে বলে আপনার সাথে আলোকের বিয়ে দিতে চায়। আলোক তার মায়ের দিকে তাকিয়ে ‘না’ বলতে পারে নি কারন সে জানতো আশা আন্টি আলোককে নিয়ে কতটা সেনসিটিভ। কিন্তু আলোক বলে, যাতে আপনাকে বিয়ের আগেই সব জানানো ‌হয়। আলোকের আগের বিয়ে, জেলে থাকা সব। আর আশা আন্টি সেটাই করে। আপনার ফ্যামিলি কে সব জানায়। আর আপনার বাবা বলে আপনি তবুও রাজি। তারপর বিয়ের সময়ই আপনার মোহরানা দিয়ে দেয়।

তারা অনেকটা হতবাক হয়ে গেলো।কারণ সে কোনো মোহরানা পায়নি। তারমানে তারার বাবা তার মোহরানার সব টাকা নিয়েছে আর তাকে কিছুই বলে নি।

‘ কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতে আলোক বুঝতে পারে আপনাকে কিছুই জানানো হয়নি। আর আশা আন্টিকে আলোক বলে। কিন্তু পরে আশা অ্যান্টি আপনাকে কিছু জানাতে চায় না কারণ উনি নিজের ছেলে কে খুশির জীবনে থাকতে দেখতে চাইতেন। মা মানুষ তো! তাই একটু সার্থপর হয়ে গেছিল আশা অ্যান্টি। আর আলোক ও সাহস পায়নি আপনাকে কিছু বলার। কারণ আলোকের সম্মন্ধে এমনিতেই আপনার মনে অনেক কু ধারণা ছিল । যদি বলতো তাহলে হয়তো আপনি তাকে আরো____

থেমে গেলো নিরব। নিরবে চোখের জল ফেলল। তারপর মুছে বললো,

‘ তাই আর সাহস পায়নি আলোক এইসব বলার।’

তারা মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগলো। এই মুহূর্তে তারার নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ বলে মনে হচ্ছে।ছিহ্! আলোকের সম্পর্কে এত নিচু ধারনা কিভাবে পেষন করল সে?

‘ তারা আপনি আলোকের সাথে থাকতে চান না। তাই তো? আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আমি আপনাকে ওর থেকে ডিভোর্স পাইয়ে দিবো তবুও ওকে কষ্ট দিবেন না। আমি আর পারছি না আমার ভাইটাকে এতটা কষ্টে দেখতে। বিনা দোষে ও শুধু কষ্ট পেয়ে যাচ্ছে। আলোক হয়তো সামনে শক্ত হয়ে আছে, কিন্তু আমি জানি ও ভিতরে কতোটা আঘাত, কষ্ট পেয়েছে।

বলে নিরব উঠলো। তারপর বললো,

‘ আজ আসি। অনেক কথা হয়েছে। আর হ্যাঁ তখন রাগের মাথায় আপনাকে অনেক কিছুই বলে ফেলেছি। এর জন্য আমাকে মাফ করবেন।চলি।’

বলে আর দাড়ালো না নিরব । আলোকের কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে চলে আসলো। নিরব যেতেই তারা পর্দা টা সরিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে আবার কাঁপতে কাঁপতে ভিতরে ঘরে আসলো। এখন বুঝতে পারছে আলোক তার সাথে কথা বলার সময় সবসময় তার চোখের দিকে কেনো তাকিয়ে থাকতো। তারার নিজের উপর খুব ঘৃনা লাগছে! প্রচণ্ড রাগ লাগছে নিজের উপর।

#চলবে…..

[*

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here