পূর্ণতা পর্ব ২

0
102

#পূর্ণতা❤️
#writer_Tanjila_Tabassum❤️

২.

তারা কথাটা শুনে পুরোই শকড।তার কিছূতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। যেই ছেলে ছোট থেকে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে সে কিভাবে তার সঙ্গে এত বড় অন্যায় করলো?আর কেনোই বা জেলে ছিল ? হাজারো প্রশ্ন হানা দিচ্ছে তারা র মনে।কিছুক্ষণ পর তারা নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় আর কালকের কথা মনে করতে লাগে। কালকে বিয়েতে সে বোরকা , নিকাব পড়েছিল। তার মা তাকে কখনোই বোরকা ,নিকাব পড়তে দেয় না।পড়লেই তাকে নানা রকম কথা বলে।জংলী, পেত্নী আরো নানা রকম আজেবাজে নামে ডাকে তাকে।তবুও তারা এতসব কথা সহ্য করে বোরকা পড়তো।কিন্তু এখন কথা হচ্ছে তার মা সবসময় তাকে এইসব পড়তে নিষেধ করতো ,কিন্তু সেই মা-ই তাকে বিয়ের সময় বোরকা নিকাব পড়তে বলেছে। মানে বলতে গেলে তাকে নিজ হাতে পরিয়ে দিয়েছে। বিষয়টা অনেক অবাক জনক তারার কাছে। আশেপাশের কানাকানি থেকে শুনতে পেয়েছে তাকে নাকি বরপক্ষ এইসব পড়তে বলেছে।’তারা’ এইসব ভাবতে ভাবতে নিজের রুমে চলে যায়।যেতেই দেখে আলোক বিছানায় বসে ফোনে কিছু দেখছে।আলোক দেখা মাত্রই তারা র রাগ উঠে যায়।তারা মনে মনে বলতে লাগে ‘শেষমেশ আমার ভাগ্যে এই বুড়া টাই জুটলো?দুনিয়ায় কি আর কোনো ছেলে ছিল না?’ আলোক তারার দিকে তাকাতেই তারা চোখ সরিয়ে নেয়।কিছুক্ষণ পর তারা দেখে আলোক তার দিকে এগিয়ে আসছে।তারার মনে একটা ভয় কাজ করে।আর এদিকে আলোক তারা কে দেখে ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য এগিয়ে আসে।কিন্তু দরজার সামনে তারা দাড়িয়ে থাকার কারণে তার সামন দিয়ে যেতে হবে কিন্তু তারা অন্য কিছু ভাবছে।আলোক তারা সামনে আসতেই তারা কাপাকাপি কন্ঠে বলে,

‘দে দে দেখুন।দুরত্ব বজায় রাখবেন আম__,আমার থেকে। একদম কাছে আসার চেষ্টা করবেন না।’

আলোক কিছু বললো না।শুধু ভ্রু উচুঁ করে তাকালো তারপর কিছু বলতে যাবে তার আগে তারা আবারো বলে উঠে,

‘আমি কালকে বলেছি না আমি এই বিয়েকে মানি না আর আপনাকে ও স্বামী হিসেবে। সো আমার থেকে নিজের দুরত্ব বজায় রাখবেন।কাছে আসার চেষ্টা করে নিজেকে নির্লজ্জ প্রমাণ করবেন না।’

আলোক এতক্ষণ তারার দিকে তাকিয়ে থাকলেও এখন চোখ নামিয়ে নেয়।তারপর আলোক আর বাহিরে না গিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেলো।আর তারা সে দিকে তাকিয়ে রইলো।তারা মনে মনে আবারো ভাবতে লাগলো,’ছেলেটা কেমন বাংলা সিনেমার সাবানা, ববিতার মত।কিছু বলেই না। মেয়েদের মত সব সহ্য করে নেয়।’তবে আলোকের এভাবে স্বাভাবিক থাকাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না তারা।এমন ছেলেও যে দুনিয়ায় আছে তা হয়তো আলোক কে না দেখলে জানতোই না। তবে একটা দিক লক্ষ্য করেছে সে যখনি আলোকের সাথে কথা বলে তখন আলোক তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা সে কালকেও লক্ষ্য করেছে আর আজকে সকালেও, আবার এখন ও দেখলো।

.

.

রঙ্গিন একটা শাড়ি পরে বিছানায় বসে আছে তারা।চোখ দিয়ে তার পানি বইছে।সে কাঁদছে।কারণ কিছুক্ষণ পর তাকে নতুন বউ হিসেবে মানুষ দেখতে আসবে।তারার নিজেকে একটা শোপিস মনে হচ্ছে যাকে দেখতে মানুষ আসবে। তারা কাদঁছে কারণ তাকে এভাবে একটা শাড়ি পরে মানুষের সামনে তাকে প্রদর্শন করা হবে।নিজের বাড়িতে থাকতে তার বাবা মায়ের হাজারো কটূক্তি,গালিগালজ,আজেবাজে কথা সহ্য করে থাকতো।কিন্তু তবুও সে নিজের পর্দা ছাড়ে নি।তার মা সব সময় তাকে তার কাজিন দের সামনে যেতে বাধ্য করতো ।কিন্তু তারা তার কোনো ছেলে কাজিনদের সামনে যায় না।কারণ তারা জানে ১৪ পুরুষ ছাড়া বাকি সব পুরুষের সামনে পর্দা করা ফরজ। কিন্তু তার বাবা মা এটা বুঝতে চায় না। মূলত তারা র বাবা মা তার জন্ম থেকে তাকে অপছন্দ করে ।নিজের বাবা মা হয়েও তারা র মনে হয় ওনারা তার সৎ বাবা মা। তারা রা দুই বোন ।তার বড় বোনের নাম তরী।দেখতে অপূরুপ সুন্দর।কিন্তু তারা তরীর মত সুন্দর না।তারার যখন তার মায়ের পেটে এসেছিল তখন তার বাবা মায়ের প্রত্যাশা ছিল তাদের ছেলে হবে ।কিন্তু ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়।তাই তাদের তারা র উপর ক্ষোভ হয়।আর জন্মের সময় তারার গায়ের রং কালো ছিল যা তার বাবা মায়ের অপছন্দ।কিন্তু আস্তে আস্তে তারা র গায়ের রং পরিবর্তন হয়।কিন্তু তবুও তার বাবা মায়ের অপছন্দ মেয়ে হয়েই থাকে।তার মা তাকে দ্বারা বাড়ির সব কাজ করতো,তার বোনকে কিছু করতে দিত না। তারা র বড়ো বোন তরী তাকে ভালোবাসে, যদিও ছোট থাকতে তরীর মনে তার মা তারার বিরুদ্ধে নানান কথা বলত।কিন্তু সময়ের সাথে আর বয়স বাড়ার সাথে তরী বুঝতে পারে। আর এখন তরী তারা কে খুব ভালোবাসে।

.

তারা জোরে জোরে কাদঁছে।কি করবে সে এখন?কিভাবে সবার সামনে যাওয়া থেকে নিজেকে আটকাবে?কে শুনবে তার কথা? তারা এবার উপরে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করে,

‘হে আল্লাহ্।আমাকে এই পরীক্ষা থেকে রক্ষা করো। সব সময় তুমি আমাকে সাহায্য করেছে এইবারও করো আল্লাহ। তোমার রহমতের কারণে সব সময় আমি সকল পরীক্ষায় সফল হয়েছি। আমার পর্দা ভাঙ্গতে দিও না আল্লাহ। আমাকে এই পরীক্ষা থেকে উদ্ধার করো।’

এইসব বলে কাঁদছে তারা। হঠাৎ সামনে চোখ যেতেই দেখে আলোক দাড়িয়ে আছে। আলোক কে দেখে প্রতি বারের মতন এবারও তার রাগ উঠে। তারা মনে মনে বলতে শুরু করে,’এই লোকটার জন্যই আমার সব কিছু শেষ হতে চলেছে। প্রথমত টাকার লোভ দেখিয়ে বিয়ে করেছেন।আর এখন এনার জন্য আমার আমার দ্বীন পালনে ব্যাঘাত ঘটতে চলেছে।’

আলোক কয়েক পা বাড়িয়ে এগিয়ে আসলো। আলোক আসতেই তারা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে আলোক কে বলল,

‘আপনার !আপনার জন্যই সবকিছু হচ্ছে। যবে থেকে আমার জীবনে আপনি এসেছেন তবে থেকে জীবনের সবকিছুই পাল্টে যাচ্ছে।’

বলে একটা হাঁফ ছাড়ল তারা। তারপর আবার বলতে শুরু করল,

‘সবকিছু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে!! নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে,স্বামী! আর এখন নিজের ঈমান ও নষ্ট হতে চলেছে। আমি পারবোনা কোনো লোকের সামনে যেতে। কোন শোপিস নই আমি কিংবা কোন পুতুল যে আমাকে সবার সামনে প্রদর্শন করাবেন। পারবোনা আমি নিজের পর্দা ভঙ্গ করতে।’

কাঁদতে কাঁদতে এসব বলে ধপ করে নিচে বসে পড়ল তারা। আলোক তাকে কিছু না বলে চলে গেল। তারা আলোকের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর আবারও তারা উপরে তাকিয়ে বলতে লাগলো,’হে আল্লাহ এ কেমন লোকের ভাগ্যে জড়ালে আমাকে? যার জন্য জন্য নিজের দ্বীনের বিপক্ষে যেতে হবে! আমাকে সাহায্য করো আল্লাহ। একমাত্র তুমি ছাড়া সাহায্য করার মত আমার কেউ নেই। তুমি আমার একমাত্র আশা ভরসা তুমি আমার সব।’

বলে কাঁদছে তারা। প্রায় ৩০-৩৫ মিনিট পর দরজায় কেউ নক করে। তারা উঠে দাঁড়ায় তারপর নিজের চোখ মুখ মুছে নেয়। নিজেকে স্বাভাবিক করে গিয়ে দরজা খোলে । দেখলো তার শাশুড়ি এসেছে। তারা কে দেখে আশা বলল,

‘ তারা মামনি রেডি হয়েছো?’

তারা কিছু বলল না চুপ করে থাকলো। আশা তারাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে বলল,

‘মা-শা-আল্লাহ। অনেক সুন্দর লাগছে আমার বউমনি কে।’

তাঁরা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল। আশা তারা র হাত ধরে বলল,

‘এসো মামনি।’

তারপর তারা কে নিয়ে নিচে আসতে লাগলো। তারা মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে, যেন তার পর্দা ভঙ্গ না হয়। তারা কে নিচে নিয়ে এসে এক জায়গায় বসিয়ে দিল। তারপর এক এক করে অনেকগুলা মহিলা তাকে এসে দেখল, তার সাথে কথা বলল। কিন্তু কোন পুরুষ লোক তাকে দেখতে আসেনি। বেশ অনেকক্ষণ পর তারা উঠলো। কিছুক্ষণ যাবত সে একাই বসে আছে তাই তার আর ভালো লাগছে না বসে থাকতে। তারা উঠে বাহিরে গেলো তখন একটা বৃদ্ধ বয়স্ক লোক তার সামনে আসলো। তারা থমকে দাঁড়ালো। লোকটা হয়তো চোখে ঠিক মতো চোখে দেখতে পারছে না।লোকটা আস্তে করে বলল,

‘আরে চাঁদ মামনি না?এত…এতদিন পর?’

তারা অবাক হয়ে গেল! কি সব বলছে এই বৃদ্ধ লোকটা? সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তখনই পিছন থেকে কেউ একজন বলে,

‘আরে দাদা।’

তারা পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখে আলোক। তারপর আলোক সামনে আসলো। বৃদ্ধ লোকটা আলোককে দেখে বলল,

‘বাবা তোমরা এতদিন কোথায় ছিলে?আর চাঁদ মামনি এখন সুস্থ আছে তো?'[তারার দিকে তাকিয়ে]

আলোক কিছু না বলে হাসল। তারপর তারা দিকে তাকিয়ে বলল,

‘আপনি ভিতরে যান।’

তারা কিছু না বলেই ভিতরে আসার জন্য পা বাড়ালো।আর পিছন ঘুরে দেখল আলোক বৃদ্ধ লোকটাকে কিছু বলছে। কিন্তু তার আর মনে প্রশ্ন হানা দিচ্ছে যে, বৃদ্ধ লোকটা তাকে চাঁদ বলে সম্বোধন করল কেন? আর এতদিন কোথায় ছিল মানে? তাহলে কি আলোকরা এখানে থাকত না? হাজারো প্রশ্ন আসছে তারার আর মনে। কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর অজানা!

__________

#চলবে….

কপি করা নিষেধ।

[*

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here