পূর্ণতা পর্ব ৬+৭

0
78

#পূর্ণতা❤️
#লেখনীতে-তানজিলা তাবাচ্ছুম

৬.

এত সব কিছুর মাঝে তারার মাথাটা ঘুরে আসছে। সে ব্যালকনি থেকে দ্রুত রুমে প্রবেশ করে।শত শত প্রশ্ন যেনো তাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে রয়েছে। প্রতিদিন ই কোনো না কোনো ভাবে নতুন কিছুর উপলব্ধি করছে। কিভাবে জানবে সে এত সব কিছুর সত্যি টা।কে তাঁকে উত্তর দেবে?আলোক কি সত্যি একজন সাইলেন্ট কিলার হবে?না চাইতেও তারার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরেই যাচ্ছে।এক অজানা কষ্ট হচ্ছে তার।তারা নিজেও বুঝতে পারছে না কেনো তার এমন হচ্ছে। আলোককে তো সে স্বামী হিসেবে মেনে নেয় নি।আর না কখনো তাকে নিয়ে ভেবেছে। তবুও কেনো আলোককে একজন কিলার ভাবতে,মানতে কষ্ট হচ্ছে তার?হয়তো এই কয়েকদিনে আলোকের সম্পর্কে তার ধারনা টা পাল্টে যাচ্ছিল।আলোকের প্রতি একটা ভালো লাগা কাজ করেছিল।তাই হয়তো এখন সে এইসব মানতে পারছে না।তারা কাঁদছে। জোরে জোরে কাঁদছে।তারা কাঁদো কাঁদো গলায় নিজেকেই বলতে শুরু করে,’কেনো ওই লোক টার সত্যি টা মানতে এত কষ্ট লাগছে আমার? লোকটাকে তো আমি কখনো স্বামী মানি নি বা ওভাবে দেখিও নি!তাহলে কেনো মানতে এতটা কষ্ট হচ্ছে?’তারা নিজের দু’হাত দিয়ে মাথার চুল গুলো টেনে ধরলো।তারপর আবারো কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করল,’এত দিন হয়তো লোকটাকে তার আচার- আচরণের জন্য ভালো ভেবেছিলাম।ভালো লাগতে শুরু করে ছিল।তার সম্পর্কে ধারণা পাল্টে যাচ্ছিল আমার। কিন্তু আমি ভুলে গেলাম কি করে, যে উনি একজন ক্রিমিনাল?১০ বছর ধরে জেলে থাকা একজন ক্রিমিনাল।উনি যেমন তেমনই। হয়তো শুধু নিজেকে ভালো দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার আসল রূপ লুকাতে গিয়েও পারলেন না। ভেবেছিলাম মানুষের অতীতে যেমন থাকুক না কেন সে বর্তমানে একজন ভালো মানুষ হতে উঠতে পারে।আলোক নামে এই লোকটাকে ও এইরকম মনে হয়েছিল।’বলে একটা দীর্ঘশ্বাস হাফ ছাড়লো তারা। আবারো বলতে শুরু করল,’না।ওই লোকটার সাথে আমি কিছুতেই থাকবো না। কিন্তু যাবো কোথায়?কে আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করবে?কে নিয়ে যাবে?কার কাছে যাবো আমি? নিজের বাড়ি থাকতেও তো আমি যেনো অনাথ!’বলে জোরে জোরে কাঁদছে তারা। হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে গিয়ে নিজের চোখের পানি মুছতে শুরু করল তারপর মুছতে মুছতে ই বলল,’কোথায় যাবো!কি করবো।জানি না। কিন্তু এই খুনি লোকটার কাছে আমি কিছুতেই থাকবো না। কিছু তেই না’ বলে ধপ করে নিচে বসে পড়লো তারা।মাথা নিচু করে কেঁদে ই চলছে সে।কিছুতেই তার কান্না থামছে না উল্টো কান্নার বেগ বেড়েই চলছে তার।এত কাঁদতে কাঁদতে তার কানে ফজরের আজানের শব্দ এলো। আজান দিচ্ছে। কিন্তু তারার মাথা প্রচন্ড ব্যথা করছে।আবার তার খুব খিদে ও পেয়েছে কারন কাল রাতে সে কিছু খায় নি। গতকালকে রাতে গরুর মাংস রান্না হয়ে ছিল যেটাতে তারার এলার্জি রয়েছে তাই সে খায় নি।আশা তাকে অন্য কিছু করে দিয়ে খেতে বলেছিল , কিন্তু তবুও তারা না খেয়েই ঘুমিয়ে যায়।তারা উঠে দাঁড়ালো।সে নামাজ পড়ার জন্য ওযু করতে যাবে তখন দেখে তার বিছানার পাশে থাকা ছোট ড্রায়ার টার উপরে একটা বাটি ঢেকে রাখা।তারা ওখানে গিয়ে বাটিটার উপর থেকে ঢাকনা টা সরালো দেখলো ভেজিটেবল স্যুপ।তবে ঠান্ডা।তারা ভাবছে এটা এখানে কিভাবে এলো?নাকি তার শাশুড়ি দিয়ে গেছে? হয়তো তাই হবে তার শাশুড়ি দিয়েছে।তারা ওযু করে এসে নামাজ পড়ে নিলো।তারপর স্যুপের বাটি টা নিয়ে কিচেনে গিয়ে গরম করতে দিলো।তারা হাত ধোয়ার জন্য বেসিনে যেতেই ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে যায়।সে দেখলো পানির ট্যাপের হ্যান্ডেলে ছিটে ছিটে রক্ত।রক্ত দেখেই তার গা কাঁপতে শুরু করে দেয়।তারা বার বার ঢোক গিলছে।তারপর পানি ছেড়ে দিয়ে রক্ত গুলো ধুয়ে দেয়।তারপর সে দ্রত স্যুপ ঢেলে নিয়ে নিজের ঘরে আসে। খাওয়া শুরু করে কিন্তু কালকে রাতে আলোকের রক্ত মাখা সেই সিন আর কিছুক্ষণ আগের দেখা ছিটে ছিটে রক্তের দাগ ,সেগুলো মনে পড়লেই তার গলা থেকে যেনো খাবার নামছে না। কিন্তু তার তো খুব খিদে পেয়েছে তার জোর করে খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষ হতেই দরজার দিকে তাকাতেই দেখে আলোক দাঁড়িয়ে আছে।আর তার মুখে হাসি।তারা হঠাৎ আলোককে দেখে একটু ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু তার কাছে রহস্যময় লাগছে আলোক এভাবে মুচকি হাসছে কেনো?এমন অবস্থায় হাসির কারণ টা তার কি হতে পারে?তারার এবার আলোককে একটু বেশিই ভয় লাগছে।।কোথাও আলোক জানতে পারে নি তো কালকে রাতে তারা আলোককে হাতে ছুড়ি আর রক্ত সহকারে দেখেছিল?তারা ভাবছে ,আলোক কি বুঝতে পেরেছে যে সে জানে আলোক খুনি? তাহলে কি আলোক তাকেও মেরে ফেলবে?নাহলে এভাবে হাসছে কেনো?আলোক ব্যালকনিতে চলে যায়।আর তারা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।তারা কিছুতেই বুঝতে পারছে না আলোককে!আলোকের হঠাৎ এভাবে হাসির মানে টা কি?যেনো সে কোনো কিছুতে সফল হয়ে গেছে।তাহলে কি সত্যি আলোক?তারার চোখ থেকে না চাইতেও পানি পরতে লাগলো। হঠাৎ আলোকের কন্ঠ শুনে তারা তার চোখ মুছে পিছনে ঘুরে তাকায়,

‘শুনুন।’

তারা আলোকের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না তাই মাথা নিচু করে আছে।আলোককে তার কেমন ভয় লাগছে।

‘আপনাকে মা ডেকেছিলো।’

তারা মাথা নাড়িয়ে দরজা খুলে নিচে চলে আসলো।

.

__________

এভাবেই কেটে যায় এক সপ্তাহ।তারা আর আলোকের সম্পর্ক আগের মতোই রয়েছে। শুধু বদলেছে তো তারার মনের ধারনা।এখন তারা আলোককে কিছু বলার তো কি ,তার দিকে তাকানোর ও সাহস পায় না।সে আলোককে সেদিনের পর থেকে খুব ভয় পায়। আলোকের সেদিনের হঠা্ৎ তাকে দেখে হাসার কারন টা অজানা।তার মনে করে নিয়েছে হয়তো তারা তার সম্পর্কে সব জেনে গেছে ।আর হয়তো এই জন্যই আলোক তারাকে দেখে হাসছিল। বিছানায় বসে আছে তারা।আর ভাবছে, না নিজের বাড়িতে শান্তি তে থাকতে পারলো আর না এখানে। প্রতিনিয়ত তার সামনে নতুন কিছু আসছে।যেন বাড়ির প্রত্যেকটি মানুষ আর বাড়ির প্রত্যেকটি কোনায় কোনায় রহস্য লুকিয়ে আছে। প্রত্যেকটি মুহূর্তে ই তার প্রশ্নের সংখ্য বেড়েই চলছে কিন্তু সব কিছুর উত্তর একটাই। লেখনীতে তানজিলা।সেটা হলো অজানা।সব কিছু র উত্তর ই তার কাছে অজানা।তারা শশুর শাশুড়ি ডাকছে। তার কানে ডাকার শব্দ আসছে।তারা বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দেখে তার শশুর শাশুড়ি হয়তো কোথাও যাচ্ছে।তার শাশুড়ি আশা বোরকা পরা আর তার শশুর রায়হান শার্ট প্যান্ট পরা।আর তাদের পাশে থাকা সুটকেস টা দেখে তারা ভ্রু কুঁচকালো।তারা কিছু বলবে তার আগেই আশা তার কাছে এসে হাত ধরে বলতে শুরু করে,

‘মামনি ভালো থেকো।আর নিজেকে একদম একা মনে করবে না আলোক আছে তোমার সাথে।’

তারা এতক্ষণ একটু হাসছিল। কিন্তু আশার কথা গুলো সে ঠিক বুঝতে পারলো না।তাই আস্তে আস্তে বলল,

‘আ___আলোক__আলোক আছে মানে?আর নি__নিজেকে একা কেনো ভাববো?’

আশা ভ্রু উঁচু করে মৃদু কন্ঠে বলল,

‘আসলে আমি আর তোমার বাবা চলে যাচ্ছি।’

তারা কথাটা শুনে হতবাক হলো।

‘চ__চলে__চলে যাচ্ছেন মানে?’

‘মানে আমরা আমাদের বাড়িতে যাচ্ছি।তারা এবার হালকা হাসলো তারপর বলল,

‘ওহ।একটু দাঁড়ান আমি রেডি হয়ে আসছি।

বলে যেতে লাগলো আশা বলে উঠে,

‘আরে আরেএএএ।’

তারা থেমে গিয়ে পিছনে তাকাতেই আশা বলে,

‘তুমি কোথাও যাচ্ছ না।’

তারা নিচের ঠোঁট টাকে জিভ দ্বারা ভেজালো তারপর বলল,

‘মা আপনি তো বললেন বাড়ি তে যাবেন তাহলে?’

আশা হাসতে শুরু করলো।তারপর বলল,

‘হ্যা সেটা আমি আর তোমার শশুর মশাই যাচ্ছি।’

তারা একটা ঢোক গিলে বলল,

‘তা_তা__তাহলে__তাহলে আম__আমি একা থাকবো কিভাবে?’

‘আলোক! আলোক থাকবে তো তোমার সাথে।

আশার পিছন থেকে তার শশুর রায়হান বলল।তারা জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করলো।

‘আর স্বামী থাকলে আর কি লাগে?আর আমি আলোকে বলে যাচ্ছি যাতে আমার বউ মাকে কখনো একা না রাখে।’

তারপর রায়হান হাসতে শুরু করলো সাথে আশাও।হঠাৎ রায়হান কিচেনের দিকে তাকিয়ে জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

‘আলোক বাবা আমার বউ মাকে কখনো একা রাখবা না। সবসময় ওঁর সঙ্গে থাকবা।’

তারা কথাটা শুনে কিচেনের দিকে তাকিয়ে দেখে আলোক হাতে একটা ছুড়ি নিয়ে তাদের দিকে আসছে।আলোক এসে দাঁড়ালো।আশা আলোকের কাঁধে একটা হাত রেখে বলল,

‘শুন বাবা।বউ মার খেয়াল রাখবি।’

আলোক ছোট করে’হুম’উত্তর দিলো। আশা আবারো আলোককে বলল,

‘ও কি চায় শুনবি।ওকে দেখে রাখবি।’

আলোক আবারো ছোট করে ‘হুম’উত্তর দিলো।

‘ওকে কখনোই একা রাখবি না। সবসময় ওর সাথে থাকবি।’

এবার আলোক তারার দিকে তাকালো।তারা নিজের চোখ নামিয়ে নিল।আলোক তারার দিকে তাকিয়ে নিজের হাতে থাকা ছুরি টা হাতের তালুতে স্লাইড করতে করতে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

‘আচ্ছাআআ।ক-খ-নো-ই_ এ-কা__ রা-খ-বো_ নাআআআ ।'[টেনে টেনে]

তারার ভয় বেড়েই চলছে। আলোকের কথা বলার ভঙ্গি টা অদ্ভুত লাগলো।আগে কখনোই তাকে এভাবে কথা বলতে শুনে কিংবা দেখে নি তারা।তারা আলোকের দিকে তাকানোর সাহস ই পাচ্ছে না। আলোককে তার এতটাই ভয়ংকর লাগছে।তারার এটা ভেবে আরো ভয় লাগছে আজকে থেকে এই বাড়িতে কেউ থাকবে না। শুধু সে আর আলোক ই থাকবে।যদি আলোক নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দেয়?তাহলে কি হবে? ভাবতেই তারার গলা শুকিয়ে আসছে।
__#পূর্ণতা❤️
#লেখনীতে-তানজিলা তাবাচ্ছুম❤️

৭.

[সবাই একটু কষ্ট করে নিচের বিঃদ্রঃ টা পরে নেবেন]

আশা আর রায়হান কে এগিয়ে দেওয়ার জন্য তারা বাহিরে বের হয়।তারা নিজের ওরনা টাকে মাথায় ভালো করে দেয় একদম ঘোমটার মতন করে।আশা হাঁটছে আর তারার পিঠে হাত রেখে বলছে,

‘মন খারাপ করো না মা।এখন তোমার বিয়ে হয়েছে। ভবিষ্যতে তো আমরা তোমার সাথে থাকবো না,থাকবে আলোক।তাই এখন থেকে ওর সাথে একাই থাকার অভ্যাস করে নাও।’

বলে একটুখানি হাসলো আশা। তারপর আবারো বলতে শুরু করল,

‘আমি জানি তুমি আলোককের সাথে কখনো বোর হবা না।দেখবা ও তোমাকে অনেক হাসিখুশি রাখবে।’

তারা আশার দিকে তাকাতেই আশা চোখ গুলোকে একটু ছোট করে বলে,

‘এইটুকু তো আমি নিজের ছেলে কে জানিই।জানো তো আলোক না খুব নরম মনের একটা ছেলে।কাউকে যদি একটু উঁচু গলায় কথা বলত, পরে ও সেটার জন্য কাঁদতো।কারন আলোক খুব গিলটি ফিল করতো।ওই মানুষ টা তার কথায় কতটা কষ্ট পেয়েছে ভেবে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে করতো, নিজেকে খুব অপরাধী মনে করতো।’

তারা আগের মতন থাকলো।

‘তুমি আবার ভেবো না নিজের ছেলে বলে বলছি। আলোক আমার ছেলে না হলেও_____

তারা চোখ তুলে তাকাতেই আশা চুপ হয়ে যায়।আশা কথাটা সম্পূর্ণ না হতেই সে চুপসে গেল।তারা ভ্রু কুঁচকে বলল,

‘আলোক আপনার ছেলে ন____

তারার কথা শেষ হওয়ার আগে একজন এসে বলে,

‘এননেরা কেডা?’

আশা ,তারা মুখ ফিরে তাকালো।আশাকে মহিলাটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে বলল,

‘আহে আশা না?’

আশা হাসি মুখে উত্তর দেয়,

‘জ্বি।’

মহিলাটি মৃদু হেসে বলল,

‘এত বছর কই ছিলা?’

তারপর তারার দিকে তাকিয়ে বলল,

‘আর এইডা কে?আলোক বাবা কি আবার বিয়ে করছে নাকি?’

তারা মহিলা টির কথা শুনে’থ’মেরে দাঁড়িয়ে আছে।আশা হিমশিম খাচ্ছে।আশা মহিলাটার হাত ধরে সামনে হাঁটতে শুরু করল তারপর বলল,

‘যেতে যেতে কথা বলি!’

বলে খুব দ্রুত গতিতে হাটা শুরু করলো আশা সাথে মহিলাটিও।তারা তাদের পিছন থেকে আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করল কিন্তু তাদের কথা কোপন শুনতে পেলো না।তারা নিজের ভাবনা তে ব্যস্ত। হঠাৎ তারা হচট খেয়ে পড়ে গেলো।সে ভাবনাতে এতটাই ডুবে ছিলো যে সামনে থাকা গর্ত খেয়াল করে নি।তারা পড়ে যেতেই পিছন থেকে আলোক চেঁচিয়ে বলে উঠে,

‘এই তারাআআআ____

আলোকের চেঁচানো শুনে আশা , মহিলাটা আর রায়হান পিছনে ঘুরে তাকায়। তারপর দ্রত গতিতে তারার কাছে চলে আসে। তারা মাটির উপরে পড়ে আছে।হাতে ,গায়ে জামায় ময়লা লেগেছে। হাতে আর পায়ে মাটিতে থাকা গুটি গুটি ইটের টুকরা গুলোর সাথে ঘষা খেয়ে ছিলে গেছে।ব্যাথায় তারা কুঁকড়ে উঠেছে।চোখ বন্ধ করে আছে কিন্তু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তার।আশা তারার কাছে এসে একটু ঝুঁকে বলে,

‘তারা তুমি ঠিক আছো?’

‘হাতে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে।ওই দেখো রক্ত বের হচ্ছে।’

রায়হান এসে বলল।আলোক এসে হাঁটু ভাঁজ করে বসলো দেখলো তারার চোখ বন্ধ কিন্তু সে কাঁদছে।যেনো কারো বলা কথা তারার কানে পৌঁছচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর তারা চোখ খুলে ।

‘এদিকে সময় হয়ে গেছে আর এখন তারার এই অবস্থা।’

কথাটা রায়হান বলে মাথায় হাত দিলো।আশা কিছু বলল না। তাদের সাথে থাকা মহিলাটি বলল,

‘আপনারা যান ভাইজান।সময় হইয়া গেছে যেহেতু।আলোক বাবা তো আছেই’

‘কিন্ত________

রায়হান বলার আগে আশা তারাকে বলল,

‘তারা তুমি বাড়িতে গিয়ে রেস্ট করো।আলোক ওকে নিয়ে যা।’

তারা উঠার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না।পায়ে ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখলো স্যান্ডেলের ভিতর দিয়ে কাঁচ ঢুকেছে।ওই গর্তে কয়েকটা কাঁচের টুকরো ছিল।হাতের থেকে পায়ে বেশি আঘাত পেয়েছে তারা।আশা আর মহিলাটি মিলে তারাকে উঠানোর চেষ্টা করলো।তারা উঠলো কিন্তু ডান’পা ফেলতে পারছে না উচুঁ করে আছে।এক পায়ে দাঁড়ালো তারা।তারার এমন অবস্থা দেখে রায়হান অলোককে বলল,

‘বাবা ওকে কোলে করে নিয়ে যাও। যেহেতু পায়ে বেশি আঘাত পেয়েছে।’

কথাটা শুনেই তারার চোখ জোড়া রসগোল্লার মত হয়ে গেছে।তাই হোক নিজের শশুরেরে মুখে এইরকম কথা শুনে সে অনেক লজ্জা পেয়েছে। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিলো না।মাথা নিচু করলো।এদিকে হতবাকের মত আছে।তার মুখে লজ্জার প্রতিছবি ফুটে উঠেছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।আর আশা জানে আলোক এইসবে লজ্জা বোধ করে। লজ্জা ছেলে-মেয়ে উভয়ের ই ভূষণ।আশা কর্কশ কন্ঠে বলল,

‘আহ আলোক এটা লজ্জা পাওয়ার সময় নয়।ওর অবস্থা দেখো।’

আলোক মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়াচ্ছে।

‘আলোক বাবা আমাদের দেরি গিয়ে যাচ্ছে।তুমি ওকে নিয়ে যাও।আর আশেপাশে কেউ নেই।’

রায়হান বললো। এবার মহিলাটি ভ্রু কুঁচকে বললেন,

‘নিজের বউরে নিয়া যাইতে এত কিসের লজ্জা আলোক বাবা? আর ছোয়াল দের লজ্জা পাইতে নাই।’

আলোক মাথা উচুঁ করে তারার দিকে তাকালো।তারার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ওনাদের কোথায় অখুশি। তারার প্রচন্ড ব্যাথা লাগলেও সে জোরপূর্বক মুখে হাসি এনে বললো,

‘আরে না-না ।কোনো সমস্যা নেই আমি যেতে পারবো।আপনারা যান আপনাদের লেট হয়ে যাচ্ছে।’

আশা এবার রাগী দৃষ্টিতে আলোকের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘আমার কথা কি তোর কানে যায়নি আলোক?’

আলোকের মুখে কোনো কথা নেই।সে চুপ করেই আছে।

‘আলোককক___!!'[রাগান্বিত কন্ঠে]

আলোক এবার তারার দিকে তাকিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসলো।তারা বুঝতে পেরে নিজের চোখ বন্ধ করে নেয়।আলোক তারাকে কোলে নেয়। আজ প্রথম আলোক তারাকে স্পর্শ করলো।আজ প্রথম তারা আলোকের স্পর্শ পেলো।তারার কেমন এক অনুভূতি হচ্ছে।সে চোখ বন্ধ করেই রয়েছে।

‘তুমি ওকে সাবধানে নিয়ে যাও।আর ওর খেয়াল রেখো বাবা।আমরা আসি।’

রায়হান বললো।আশা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললো,

‘ওকে আপাতত কোনো কিছু করতে দেস না ।যতদিন না পর্যন্ত আঘাতটা শুকিয়ে যায়।’

আলোক মাথা নাড়ালো।তারপর হাঁটতে শুরু করলো।

‘আর শুন যেহেতু কাঁচ ঢুকেছে।সেহেতু ওটা ডক্টর কে দেখাস। ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

আলোক কিছু বললো না। মৃদু গতিতে হাঁটতে আছে সে।

‘আর যদি বেশি ব্যাথা পেয়ে থাকে তাহলে আজই ডক্টর কে দেখিও।’

রায়হান পিছন থেকে বললো।আলোক তাদের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে হেঁটেই চলছে।কিছুটা দুর যাওয়ার পর আলোক আপনাআপানি বলে উঠলো,

‘এই আঘাত ,এই ব্যাথা তো কিছুই নয়।সামনে যেই আঘাত আসবে সেটা সহ্য করার সক্ষমতা থাকবে তো?থাকবে না।’

আলোকের মুখে আচমকা এমন কথা শুনে তারা চোখ খুলে আলোকের দিকে তাকায়।আলোকের কথাটা শুনে তারার বুক ধড়পড় করতে শুরু করেছে।তারা আলোকের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ আলোককে এতটা কাছ থেকে দেখলো সে।আলোকের মুখ মাঝারি আকারের দাড়ি।দেখতে ফর্সা নয় শ্যামলা । আলোকের ডান চোখের নিচে কোনায় একটা তিল আছে লক্ষ্য করলো তারা। হটাৎ আলোক সামনে তাকিয়েই ভ্রু কুঁচকে চোখ জোড়া ছোট ছোট করলো। লেখনীতে তানজিলা।তারা একটা ঢোক গিললো।তার খুব ভয় করছে আলোক কে। এই ইনোসেন্ট লুক এর পিছনে কি রয়েছে টা একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালা ই ভালো জানেন।তারা পর পর ঢোক গিলেই যাচ্ছে।আলোক তারা কে নিজে বাড়িতে ঢুকে নিজেদের রুমে চলে এলো।তারপর তারাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কোথাও চলে গেলো।আলোক যেতেই তারা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগলো,’হে আল্লাহ ।রক্ষা করো।এই সাধারণ,লাজুক চেহারার পিছনে কি আছে তুমি ভালো করে জানো। আল্লাহ তু_____

বাকিটুকু বলার আগেই আলোক ঘরে প্রবেশ করলো। হাতে একটা ইলেকট্রনিক কেটলি আর একটা পানির জগ।আলোক এসে কেটলিটার সুইচ লাগিয়ে পানি গরম করতে দিলো।তারপর আবার বাহিরে গিয়ে একটা বড় বাটি নিয়ে আসলো। পানি কুসুম গরম হলে সেটাকে নিয়ে তারার পায়ের কাছে বসে।তারপর বাটিটাকে পায়ের নিচে রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে পায়ের থাকা রক্ত ধুয়ে দিলো।তারপর ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে এসে হাতে ,পায়ে ব্যান্ডেজ করিয়ে দিল।তারা আর কিছু বলে নি।সে ‘আলোক’ নামে এই লোকটাকে ঠিক বুঝতে পারছে না। আলোক কি চায় কেমন মানুষ ঠিক বুঝতে পারছে না তারা।ব্যান্ডেজ করা শেষে আলোক আবার বাহিরে চলে যায় জিনিস পত্র গুলো রাখতে।তারা শুয়ে পড়ে।আর ভাবছে আলোকের সম্পর্কে।একবার আলোকের এত নম্র,ভদ্র ,লাজুক স্বভাব দেখে তার ইচ্ছে করছে সব ভুলে আলোকের সাথে থাকতে আবার যখন আলোকের অদ্ভুত কথা বার্তা,আলোকের আগের বউ আর সে কোথায়,সেই দিন সকালে ওই লোকটার বাড়িতে যাওয়া,আর রাতে রক্ত সহকারে দেখা তারপরের দিন ওই লোকটার খুন হওয়া,আর আজকে আলোকের কথা বলার ভঙ্গি পরিবর্তন হওয়াটা এইসব ভাবলে তারার আলোকের সাথে এক মুহুর্ত ও থাকতে ইচ্ছে করছে না উল্টো তার খুব ভয় করে আলোক কে।

.

.

_________________

রাত ১২ টা বাজবে।হাতে একটা ছুড়ি নিয়ে একজন এগিয়ে আসছে তারার দিকে।ঘরটা অন্ধকার থাকার জন্য ঠিক ভাবে বোঝা যাচ্ছে না।তারা ঘুমে মগ্ন। আস্তে আস্তে করে তারার কাছাকাছি চলে এলো।তারার মুখের সামনে ঝুঁকে তাকে গভীর ভাবে দেখছে আর ছুড়িটা দিয়ে তার গালে স্লাইড করছে।ঘুমের মধ্যে কারো উষ্ণ শ্বাস অনুভব করছে তারা।মনে হচ্ছে কেউ তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে যে বাতাস তার কাছে আসতে পারছে না।গালে কিছু একটার স্পর্শ পাচ্ছে তারার ঘুম খুবই গভীর তাই সে এখনো চোখ মেলে তাকায় নি।আস্তে আস্তে তার ঘুম হালকা হয়ে আসছে ।চোখ খুলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছুড়িটি আর তার পিছনে থাকা চেনা মুখটি।তারার হার্ট বিট যেন বন্ধ হয়ে গেছে।সে শুধু জোরে চেঁচিয়ে উঠলো,

‘আলোকক_________’

তার আগেই লোকটা তার মুখ চেপে ধরলো।আর ছুড়িটা দিয়ে__________

_________

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here