পূর্ণতা পর্ব ৮+৯

0
79

#পূর্ণতা❤️
#লেখনীতে-তানজিলা তাবাচ্ছুম ❤️

৮.

তার আগেই লোকটা তার মুখ চেপে ধরলো।আর ছুরিটা দিয়ে_______!

_________

ঘুম থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ধপ করে উঠে বসলো তারা।কপালে ,নাকে,ঠোঁটের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। জোড়ে জোড়ে শ্বাস ফেলেছে তারা।হাতের তালু দ্বারা কপালের ঘাম ও মুখের ঘাম গুলো মুছে নিলো। এক সেকেন্ড এর জন্য তারার দম যেনো আটকে গেছিলো।আলোক !আলোক তাকে মারতে এসেছিল!!এটা তার স্বপ্ন ছিল?বার বার ঢোক গিলছে তারা।ব্যালকনির দিকে তাকাতেই দেখে দরজা টা লাগানো।তারা তার ক্ষত পায়ে এগিয়ে ব্যালকনিতে গেল। দরজাটা একটু খুলতেই শুনতে পেল,

‘তুমি সত্যি চাঁদের মতন।শুধু একটু কাছে এসে আবার দূরে চলে গেছো,বহুদূরে……!

বলে কিছুক্ষন থেমে আবারো বলতে লাগলো,

‘কি লাভ এত মায়া,আবেগ,ভালোবাসা রেখে? যখন একদিন তো সবাই চলে যাবে বহুদূরে….!হয় নিজের ইচ্ছায় নাহয় নিজের অনিচ্ছায়।

বলে আকাশের দিকে তাকালো আলোক।তারপর আবার তাকিয়ে বললো,

‘আচ্ছা তুমি কেনো গেছো?আমার উপর অভিমান করে তুমি কি নিজের ইচ্ছে করে দূরে গেছো??

‘জানি অনিচ্ছায় গেছো তুমি অনেক কষ্ট…..!’

বলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মাথাটাকে রেলিং এ হেলান দিলো আলোক আর চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল।তারপর বলতে লাগলো,

‘ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,
ঘুমাও আমার কোল_________

তারপর থেমে হাসলো।হাসতে হাসতে বললো নিজেকে নিজে বললো,

‘আমার কোলে কেনো বলছি?’

হাসিটা যেনো তার মুখে মানাচ্ছে না। জোরপূর্বক যেনো হাসছে আলোক।তারপর আবার বলতে লাগলো,

‘ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,
ঘুমাও মাটির নিচে…..
ভালোবাসার নাও ভাসাবো,
ভালোবাসি বলে…..’

তারা দরজা টাকে আরেকটু খুলে একটু উঁকি দিলো ।দেখলো চোখ বন্ধ করেই হাসছে আলোক।কিন্তু তার চোখ দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে।তারার দেখে খুব খারাপ লাগলো।সে মনে মনে বলতে লাগল,’কখনো আপনার এই নম্র, ভদ্র, লাজুকতা দেখে এ মন বাধ্য করে আপনাকে ভালোবাসতে।আবার যখন আপনার ভয়ংকর কথা বার্তা, আচরন, কাজকর্ম গুলো মনে পড়ে তখন ইচ্ছে হয় আপনার থেকে দূরে কোথাও চলে যাই।’বলে একটা দীর্ঘশ্বাস হাফ ছাড়লো তারা।তার চোখ ছলছল করছে।চোখ বন্ধ করে তারা আর সাথে সাথে চোখ বয়ে পানি পড়লো।তারা আবারো বলতে শুরু করলো,’কে আপনি আলোক?কি আপনার আসল পরিচয়?কি আপনার আসল রূপ?’ তারা কাঁদতে লাগলো। এদিকে তার পায়ের রক্তে যে ব্যান্ডেজ ভিজে যাচ্ছে সে দিকে কোনো খেয়াল নেই তার।তারা আবার বলতে শুরু করল,’ আপনাকে দেখলে মনে হয় আপনি ধার্মিক দ্বীনি হবেন।আপনি কি সেই রকম হবেন? আপনার বাহ্যিক রূপ দেখলে তো তাই মনে হয়! কিন্তু আসলে কি আপনি ভিতরে তাই হবেন আলোক?’বলতে বলতে কাঁদছে তারা। এদিকে তার একটু আধটু ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।সে তার পায়ের দিকে তাকালো। দেখে বুঝতে পারল তারা এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না। তারা বিছানার দিকে পা বাড়ালো। বিছানায় শুতে যাবে তখন তার পায় বিছানায় লাগলো। আর সাথে সাথে তার মুখ থেকে ‘আহ’ শব্দ বের হলো। তারার শব্দ টা একটু জোড়েই করেছিল। এদিকে তারার শব্দ শুনে আলোক চোখ মেলে তাকায়। তারপর উঠে ঘরে গিয়ে দেখে তারা ঘুমিয়ে আছে । আলোক ভাবছে আওয়াজ কোথা থেকে এলো? সে তো স্পষ্ট কারো আওয়াজ শুনতে পেরেছে। আলোক ভাবলো হয়তো তার মনের ভুল হবে। তাই সে আবারো মুখ ফিরিয়ে ব্যালকনিতে যাবে তখন তার নজর পড়ে তারার পায়ের দিকে। আলোক দেখল রক্তে তারার পায়ের ব্যান্ডেজ ভিজে গেছে। আলো ভাবল হয়তো তারা ব্যথা হচ্ছে আর এই জন্যই তারা ঘুমের মাঝে আওয়াজ করেছে। আলোক ফাস্ট এইড বক্স এনে আগের ব্যান্ডেজটা চেঞ্জ করে নতুন ব্যান্ডেজ করে দেয়। তারপর চলে যায় ব্যালকনির দিকে। এদিকে আলোক যেতেই তারার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরাতে লাগল।তারা ঘুরে তাকালো তারপর বলতে লাগল,’আপনি আসলেই কি এমন?’বলে থামল তারপর নিজেকেই নিজে বলতে লাগলো,’আচ্ছা কোথাও আমি ওনাকে ভুল ভাবছি না তো? আমার একবার ওনার সাথে কথা বলা উচিত।এভাবে তো থাকা যায় না।’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলতে লাগল,’ ‘যাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়েছে তার বিয়ে বাতিল”।ইমাম আবু হানিফা ( রহঃ) এ হাদিসের উপর ব্যাখ্যা করেছেন,কোনো নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না। ইসলামে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হারাম।কোন অভিভাবক যদি জোরপূর্বক কোন নারীকে বিয়েতে বাধ্য করে তাহলে ওই নারীর জন্য দুটো অপশন ।হয় উক্ত স্বামীর সাথে ঘর সংসার অব্যাহত রাখা অথবা বিবাহবিচ্ছেদ করা।উক্ত মহিলা যদি তার স্বামীর সংসার করতে অনাগ্রহী হয় বা স্বামীকে মেনে নিতে না পারে তাহলে তার জন্য খোলা তালাক এর মাধ্যমে বিয়ে ভঙ্গ করা বৈধ। এক্ষেত্রে সে স্বামীর নিকট অনুরোধ করবে তাকে তালাক দেওয়ার জন্য। আর যদি সে সমাজ, পরিবারের সম্মান এইসব দেখে তাকে মেনে নেয় তবে সেটাও পারবে সে। তার জন্য দুটো অপশন হয় বিচ্ছেদ হওয়া নাহয় সংসার অব্যাহত রাখা।’

বলে হাত দ্বারা চোখের পানি মুছলো তারা।তারপর আবার বলতে লাগলো,

‘এখন আমাকেও এই দুটো অপশনের মধ্যে যেকোনো একটি মেনে নিতে হবে! কিন্তু কি করবো আমি?আলোক কে মেনে নিবো?নাকি তার থেকে দূরে চলে যাবো?আর যদি যাই তাহলে কোথায় যাবো?কে বা আছে আমার। আচ্ছা আমি যদি আলোকের থেকে বিচ্ছেদ হতে চাই সে বিচ্ছেদ হবে?যদি একজন সৎ চরিত্রবান হয় তবে নিশ্চয়ই সে দিবে।তবে কালকে আমি তাকে বলবো বিচ্ছেদ এর জন্য!তাহলেই বোঝা যাবে আলোক কেমন মানুষ।’

বলে থামলো ।তারা ভাবছে কালকে কি করবে?তারা আবার নিজেকে প্রশ্ন করছে,’আচ্ছা বিচ্ছেদ না হয়ে থাকি না ওনার সাথে!যদি উনি খারাপ মানুষ হয় তবে আল্লাহ ওনার বিচার করবেন। আল্লাহ যা করবেন তাই ভালো হবে। আল্লাহ তায়ালার তাকদিরে তো বিশ্বাস রয়েছে।তাহলে নাহয় আমার তাকদিরে উপর ভরসা করে থাকি। বিচ্ছেদ হলে যাবো বা কোথায়?’

বলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল তারা।তারপর আবার বলল,’কালকে আমি আলোকের সাথে কথা বলবো। যে ছেলেকে আমি এত আমার এত কথা শোনার পর চুপ থাকে,আমার এত কেয়ার করে সে কিভাবে একজন ভালো মানুষ হবে না? আমার মন বলছে নিশ্চয়ই হবে বাকিটা আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন।’ তারা মুখে একটু হাসি ফুটলো।সে ভাবতে লাগলো,’কালকে আমি আলোকের সাথে কথা বলবো ইন শা আল্লাহ।আর আমার মনের মিস আন্ডাস্টেনিং গুলোও দূর করবো। আপনি আমার বয়সের যত ই বড় হন না কেনো তাতে আমার কোনো যায় আসে না।যদিও প্রথম প্রথম আমাদের বয়সের ডিফারেন্স দেখে আমি আপনাকে চাইতাম না। কিন্তু এখন আমার এইসবে কোনো কিছুই আসে না।আর আপনি জেলে ছিলেন কেনো তা আমি জানি না আর জানতেও চাই না আলোক কারন মানুষের পাস্টে অনেক কিছুই থাকে ,অনেক গুনাহ থাকে কিন্তু সে যদি তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় ,রবের দিকে ফিরে আসে তবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন। সেখানে আমি কে?কে আমি যে আপনার অতীত নিয়ে পড়ে থাকবো?কাল হয় আমাদের বিচ্ছেদ হবে নাহয় মিল হবে আলোক।’ বলেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করলো তারা। মনে মনে সে আল্লাহর কাছে দোয়া করছে যাতে তাদের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যায়।আর এ আশা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল তারা।প্রায় মাঝ রাতে আবারো তারার ঘুম ভেঙ্গে গেল কিছু অস্পষ্ট আওয়াজে।সে আস্তে আস্তে চোখ মেলে তারপর দেখে আলোক কথা বলছে।তারা শোনার চেষ্টা করলো শুধু শুনতে পারলো আলোক কারো সাথে ফোনে কথা বলছে,’কাজ হয়ে যাবে!’তারপর আর ভালো ভাবে শুনতে পারলো না।তারার ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।আর সে আলোকের দিকে খেয়াল না দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

________________

আজও তারার ঘুম ভাঙ্গলো কিন্তু আজানের শব্দে নয় ওইদিনের মত চেঁচামেচির শব্দে।তারা উঠলো।তারপর নিজের ক্ষত পা নিয়েই ব্যালকনির দিকে গেল দেখলো আলোক নেই। আরেকটু সামনে গিয়ে দেখল ওই বাড়িতে আজও লোক জড় হয়েছে আর সেখানে পুলিশ রয়েছে। তারা বুঝতে পারছে না আজ কেনো এমন আবার কি হলো ?নাকি ওই লোকটার খুনের জন্য এসেছে? তারা এতসব প্রশ্নের উত্তর জানে না। তাই সে ভাবল নিচে গিয়ে শুনবে। কিন্তু আশা তো তাকে বারন করতেছিল একা একা কোথাও না যেতে। তারা ভাবছে কি করবে সে?যাবে নাকি যাবে না? শেষমেষ ভাবল গিয়ে শোনা উচিত।আর যেই ভাবা সেই কাজ।তারা খুরে খুরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক কষ্টে নিচে গেলো।দেখলো তাদের বাড়ির নিচেও অনেক মহিলা রয়েছে আর ওনারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।তারা তাদের কাছাকাছি যেতেই শুনতে পেলো,’আরে কয়েকদিন আগোত ওর বাপে খুন হইলো।আর কাইলকা ওই খুন হওয়া লোকটার মাইয়া রুমানারে খুন হইলো‌।’ আরেকজন মহিলা বলে উঠলো,’আরে খুন হইল কি?মাইয়াডা রে কাইল রাইত ধর্ষণ কইরা মাইরা ফেলছে।’ ব্যাস এতটুকু শোনার পর তারা আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেলো না। নিজের রুমে চলে গেল।আর ভাবতে লাগলো কয়েকদিন আগে তো ওই মেয়ের মা এসে বলেছিল মেয়েটার বিয়ে দেবে।আর তার পরের দিন ওর বাবা খুন হলো।আর কালকে রাতে মেয়েটা কে ধ_______। তারার চোখ বয়ে পানি পড়ছে।তখনি দরজার শব্দ পায় আর নিজের চোখ মুছে নেয় তারা। দেখে আলোক এসেছে কিন্তু ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। আলোক তারার দিকে তাকিয়ে আছে।আর তার দিকে তাকিয়ে থেকেই সে ফোনে বলল ,’কাজ হয়েছে’।তারপর ওপাশ থেকে হয়তো কিছু বলল আলোক হাসলো।আর হাসতে হাসতে চলে গেল ব্যালকনিতে।তারা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।তারার বুকের স্পন্দন খুব দ্রুত গতিতে চলছে। চারদিকে খোলা মুক্ত বাতাস থাকার পরও তার যেনো দম বন্ধ হয়ে আসছে।আলোক কিসের কাজ হয়েছে এর কথা বলছে?আর কালকে রাতেও আলোক কে এমন কিছু ফোনে কথা বলতে শুনেছিল। তাহলে কি আলোক?তারা বিছানার চাদর খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,’না আপনি এমন করতে পারেন না আলোক।না। আজকে ভেবেছিলাম আপনার আমার সব কিছু নতুন ভাবে শুরু হবে কিন্তু তার আগেই সব শেষ করে দিলেন আলোক। না এমন করতে পারেন না আলোক।না’ বলে কাঁদতে শুরু করে তারা। হাউমাউ করে জোরে জোরে কাঁদতে লাগে।
#পূর্ণতা❤️
#লেখনীতে-#তানজিলা_তাবাচ্ছুম ❤️

৯.

হাউমাউ করে কাঁদতে লাগে তারা।তার মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে।যেনো তার ভিতরে কেউ জোরে জোরে আঘাত করছে।কাল রাতে কতকিছুই না ভেবেছিল সে কিন্তু এক রাতে সব যেনো শেষ হয়ে গেলো।তারা আর পারলো না জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করলো।তার কান্নার শব্দ শুনে আলোক তাড়াতাড়ি করে ভিতরে এলো। দেখছে তারা জোরে জোরে কেঁদেই চলছে। আলোক বুঝতে পারছে না তারা কেন কাঁদছে। আলোক ভাবল হয়তো তার আর ক্ষত স্থানে পেইন হচ্ছে, আর তাই সে কাঁদছে। এদিকে তারার কান্নার বেগ বেড়েই চলছে। তারা চোখ উঁচু করে আলোকের দিকে তাকিয়ে কেঁদেই চলেছে। তার এমন অবস্থায় আলোক ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

‘আপ__আপনার__আপনার কি খুব পেইন হচ্ছে?’

তারা কোনো উত্তর দিলো না।শুধুই কেঁদেই চলছে।

‘একটু অপেক্ষা করুন আমি ডক্টরকে ডাকছি।’

তারপর ফোন বের করে কাউকে কল দিলো আলোক।

‘হ্যালো আসলামলাইকুম ।’

ওপাশ থেকে হয়তো সালামের উত্তর দিল।

‘নিরব!ইরা আজকে ফ্রি আছে না?’

‘__________

‘ইরাকে নিয়ে একটু আসতে পারবি এখন?খুব আর্জেন্ট!’

‘______________

‘আচ্ছা।’

বলে ফোনটা রেখে দিলো আলোক।তারপর তারার কাছে গিয়ে বলল,

‘আপনার কি খুব পেইন হচ্ছে? কিছুক্ষণ সহ্য করুক ডক্টর আসছে।’

তারার মুখে কোনো কথাই নেই।সে যেনো বাকবিরুদ্ধ হয়ে গেছে।আর চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরেই যাচ্ছে।তারা আলোকের দিকে চেয়ে আছে। তারা এইসব কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না।আলোক তারার পায়ের দিকে দেখলো ,যে রক্ত পড়ছে।আলোক আবার নতুন ব্যান্ডেজ করিয়ে দিলো।তারা শুধু দেখেই যাচ্ছে।তার মুখে কোনো কথা নেই।তারা পাথরের মত হয়ে আছে ।কোনো নড়াচড়া নেই ,কোনো কথা নেই শুধু চোখ বয়ে পানি পড়ছে। অনেকক্ষণ পর আলোকের ফোনে একটা কল আসলো আলোক কলটা রিসিভ করার পর কথা বলতে বলতে বাহিরের দিকে পা বাড়ালো। একটু থেমে পিছন ফিরে তারাকে বলল,

‘ডক্টর এসেছে।আপনি নিজেকে ঠিক করুন।’

বলে চলে গেলো আলোক।তারা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।তারা গাঁয়ে মাথায় ওরনা টাকে ভালো মতন জড়ালো। কিন্তু তার কান্নার বেগ কিছুতেই থামছে না।তারা নিজেও পারছে না। অটোমেটিক তার চোখ থেকে খালি পানি পড়ছে।তারা কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করে,’এত জঘন্য অপরাধ করতে পারলেন কিভাবে আপনি? ছিঃ আলোক! ছিঃ। আসলে আমিই ভুল ছিলাম।’ বলে থামলো তারপর জোরে কেঁদে আবার বলা শুরু করলো,’আপনার মত কিছু মানুষ বদলায় না।আমি ভুল ভেবেছিলাম। নিশ্চয়ই আপনি আগেও অনেক জঘন্য অপরাধ করেছেন।’ থামলো তারা।দরজায় শব্দ হওয়াতে তাকিয়ে দেখে আলোকের সাথে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে।সবাই ভিতরে ঢুকলো।তার মধ্যে মেয়েটা তারার কাছে এসে তাকে সালাম দিয়ে বলল,

‘ওহ এত কাঁদছো।আই থিংক খুব পেইন হচ্ছে তোমার তাই না?’

তারা কোনো উত্তর দিলো না।

মেয়েটার হাতে একটা ব্যাগ ।মেয়েটা ব্যাগ থেকে কিছু বের করছে আর তারা কে বলছে,

‘তোমাকে ‘তুমি’ করে বলছি কিছু মনে করো না আবার। আসলে তোমাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে তুমি আমার ছোট।’

তারা কোনো কথা বলল না। মেয়েটা তার আর পায়ে ব্যান্ডেজ খুলতে লাগলো।তারপর হঠাৎ পিছনে ঘুরে বললো,

‘নিরব আর আলোক ভাইয়া আপনারা দুজন বাহিরে গেলে ভালো হয় ।’

কথাটা শুনে নীরব আলোকের কাঁধে হাত রেখে বলল,

‘দোস্ত চল । অনেকদিন পর একসাথে একটু আড্ডা দেই।’

আলোক হালকা হেসে তারপর চলে গেল। নীরব আর আলোক ছাদে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুজনেই নিশ্চুপ। এই নিশ্চুপতা কাটিয়ে নিরব বলে উঠলো,

‘তারাকে খানিকটা ওর মতন লাগে দেখতে।’

আলোক কিছু না বলে হালকা হাসলো।

‘বিশেষ করে ওর চোখ দুটো আর চোখের নিচে তিল পুরোই মিলে গেছে।’

আলোক নিরবের দিকে তাকালো তারপর সামনের রেলিং ধরল । নিরব আলোকের কাঁধে হাত রেখে বলল,

‘তুই বিশ্বাস করবি না আমি প্রথমে তারা কে দেখে ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভেবেছিলাম ও এসে গেছে।’

আলোকের মুখে কোন কথাই নেই। সে শুধু সামনে তাকিয়ে দেখছে আর মাঝেমধ্যে একটু হাসছে।

‘আলোক।’

নিরব খুব গভীরতার সাথে ডাকলো আলোককে।আলোক ছোটো করে ‘হুমমম’ বললো। তারপর নিরব সিরিয়াল মুডে বলতে শুরু করল,

‘ওকে কি সব বলেছিস?’

আলোক কোনো কথা বলল না।নিরব আলোককে ডাকলো,

‘আলোককক!’

আলোক ফিরে তাকালো।নিরব আবার বলল,

‘ওকে কিছু বলিস নি?’

আলোক স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দেয়,

‘জানি নাহ।’

নিরব এগিয়ে রেলিং ধরে বলল,

‘জানিস না মানে?’

নিরবের দৃষ্টি নিচে গেল আর সে নিচে তাকিয়েই বলল,

‘আচ্ছা ওখানে কী হয়েছে? এত মানুষ এর ভিড়। আসার সময় ওখানে পুলিশ কেও দেখলাম। ব্যাপার কি?’

আলোক নিরবের দিকে তাকালো তারপর বলতে শুরু করলো।

_________

‘বের হয়ে গেছে। শুধু আজকে একটু ব্যাথা করবে তারপর ঠিক হয়ে যাবে।’

তারা অসহায়ের মত তাকিয়ে আছে।

‘এইযে__এই কাঁচ টুকু পায়ের ভিতর ছিল তাই তোমার পেইন হচ্ছিল। কিন্তু বের করে দিয়েছি এখন ঠিক হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ্।’

তারা একটু হাসার চেষ্টা করলো।

‘আচ্ছা তোমার নাম তো জানাই হলো না!আমি ইরা । তুমি?’

তারা জোরপূর্বক হেসে বলল,

‘জ্বি তারা আমার নাম।’

ইরা উল্লাসী কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ওয়াও কি সুন্দর নাম।’

তারা একটু হাসলো।

‘আলোক ভাইয়া তোমাকে খুব ভালোবাসে তাইনা?’

হঠাৎ করে এমন কথা শুনে তারা একটু হকচকিয়ে গেল।ইরার কথাটা তারার বুকে গিয়ে আঘাত করলো।তার চোখ বয়ে পানি আসছে।তারা ভাবছে যদি সত্যি এমন টা হতো।তারার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে কিন্তু ইরার সামনে পারছে না।ইরা তারাকে ঝাঁকিয়ে বললো,

‘এই কোন ভাবনায় ডুবে গেলে?তারা?’

তারা হুস ফিরলো সে ইরার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বললো,

‘হা?’

ইরা হাসলো।ইরা ভাবলো তার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে তারা।

‘জানতাম ই।কারন আলোক ভাইয়া এত সকালে যেভাবে কল করে আসতে বলেছিল আমি তো পুরো ভয় পেয়ে গেছিলাম।’

তারা ছলছলে চোখে ইরার দিকে তাকালো।

‘আচ্ছা এখন উঠি।আমার মেয়ে দুটা বাসায় একাই আছে।’

তারা ভেবে পাচ্ছে না ইরাকে কি বলবে!তারা তাড়াতাড়ি করে বলে উঠলো,

‘এভাবে এসে যাবেন। কিছু খেয়ে____

‘আরে না না আজকে না।পরে একদিন ইন শা আল্লাহ্।’

কিন্তু তবুও তারার কেমন লাগছে এভাবে এসে চলে যাবে ?ইরা উঠতে যাবে তারা ইরার হাত ধরার চেষ্টা করে কিন্তু ধরতে গিয়ে নিজেই হাতে ব্যাথা পায়,

‘আউ__আউচ___

‘তুমি ঠিক আছো?’

তারা বিছানায় বসে পড়লো।ইরা তারার ব্যথা পাওয়া দেখে বলল,

‘হাতেও লেগেছে?’

‘জ্বি বেশি না ।’

‘তাতে কি ?’

তারপর ব্যাগ থেকে একটা এন্টি বায়োটিক বের করে বলে ,

‘দেখি হাত দেও দিয়ে দেই।’

‘না আমি নিজে দিতে পারবো।’

ইরা হেসে বলল,

‘আচ্ছা ঠিক আছে দিয়ে দিও। নাহলে বলা যায় না ইনফেকশন হতে পারে।’

তারা হাসি মুখে মাথা নাড়ালো।তারার হাতের কনুই তে বেশি লেখেছে তার কারনে হাত একটু নড়াচড়া করলে ব্যথা অনুভব করে।ইরা দরজা খুলে বের হলো।আলোক আর নিরব ছাঁদ থেকে নিচেই আসছিল তখন ইরার সাথে দেখা হলো।আলোক ইরাকে দেখে প্রশ্ন ছুড়লো,

‘উনি__উনি ঠিক_ঠিক আছে?

ইরা হেসে বলল,

‘হ্যা ।আসলে কাঁচের অল্প একটা টুকরো ঢুকে ছিল যার জন্য ওর পেইন হচ্ছিল।’

আলোক শুনে নিচের ঠোঁট টা কে কামড়ে ধরলো।

‘চিন্তার কিছু নেই ভাইয়া ঠিক হয়ে যাবে।আর হ্যা এখন আপনি ওর কাছে যান,ওর আপনাকে প্রয়োজন।'[মুচকি হেসে]

আলোক কথাটা শুনে খানিকটা লজ্জা পেল।ইরা বুঝতে পেরে বলল,

‘না মানে ওকে এন্টিবায়োটিক দিয়েছি সেটা দিতে সাহায্য লাগবে। আপনি গিয়ে হেল্প করেন।’

আলোক মাথা তুলে তাকিয়ে ‘আচ্ছা’ বলে গেলো।আলোক গিয়ে দেখে তারা বাম হাত দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।আলোক তারার কাছে গিয়ে বলল,

‘দিন আমি দিয়ে দিচ্ছি।’

হঠাৎ আলোকের কন্ঠ শুনে তারা চেয়ে তাকায়।আলোক তারার হাত থেকে নিয়ে নেয়।তারা শুধু আলোকের দিকেই তাকিয়ে আছে। আশেপাশে কি হচ্ছে তারার সে দিকে কোনো খেয়াল নেই।তার মনোযোগ শুধু আলোকের দিকে।তারার আলোকের এই কাজ কর্ম গুলো তাকে আলোকের প্রতি দুর্বল করছে।তারা নিজেও বুঝতে পারছে না কেনো আলোকের প্রতি এইরকম হয় তার।আলোক লাগাতে যাবে তখন তারার ধ্যান ভেঙ্গে যায়।সে আলোকের থেকে নিয়ে বলে ,

‘থাক লাগবে না আমি লাগিয়ে নিতে পারবো।’

‘আপনি একাই দিতে গেলে সমস্যা হবে।তাই আমি লাগিয়ে দেই।’

বলে আলোক তারার হাত থেকে নিল।তারার চোখে পানি চলে এসেছে। ইচ্ছে করছে আলোককে জরিয়ে ধরে জোরে জোরে কাঁদতে যে,সে কেনো এমন করলো?যদি সব ঠিক থাকতো তাহলে তারা আজ আলোককে নিজের অনুভূতি কথা ,আর বাকি সব কথা বলতো। কিন্তু সব শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেলো।তারা মনে মনে বলতে শুরু করে,’ইস আপনি আসলেই যদি এমন হতেন আলোক তাহলে কতো ভালো হতো। কিন্তু আপনি তো মানুষ রূপি একটা পশু। জানি না অতীতে কি করেছেন। কিন্তু বর্তমানে আপনি একজন খুনি,একজন ধর্ষক । ছিঃ ভাবতে ঘৃণা হয় যে আপনার মত একটা জঘন্য লোককে আমি ভালোবেসে ফেললাম কিভাবে?’ তারা নিজের চোখের পানি মুছে আলোককে বলল,

‘বললাম না লাগবে না।’

‘আপনি পারবেন না ____

তারা রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

‘পারবো আমি । আপনি যান এখান থেকে।’

আলোক আবার নিয়ে বলবে,

‘পার______

তারা উঠে আলোককে ধাক্কা দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

‘দূরে সরুন আমার থেকে। আপনি বোঝেন না আমি আপনার কাছে থাকতে চাই না।ছেড়ে দিন আমাকে।আমি থাকতে চাই না আপনার মত লোকের সাথে।ডির্ভোস দিয়ে ছেড়ে দিন আমাকে প্লিজ।আর এইসব দেখিয়ে কোনো লাভ নেই।বুঝেছেন?’

বলে তারা কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো বিছানায়।আলোক কিছু বলল না। হঠাৎ দরজার দিকে চোখ যেতেই দেখলো নিরব দাঁড়িয়ে আছে।নিরব দুটো ঠোঁট কে চেপে ধরে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আলোক তাকাতেই নিরব চোখ নামিয়ে বলে,

‘আসলে_ব__বলতে এসেছিলাম আমরা যাচ্ছি।পরে একদিন আসবো।’

নিরবের কন্ঠ শুনে তারা চোখমুখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো।আলোক নিরবের কাছে গেল তারপর ওরা দুজন বাহিরে গেলো।বাহিরে যেতে ই তারা চিৎকার করে কাদতে শুরু করলো।

____________

রাত ১ টার মতন বাজে কিন্তু আজ তারা চোখে ঘুম নেই। শুধু অনাবৃত পানি ঝরেই যাচ্ছে।তারা ভাবছে আলোকের থেকে বিচ্ছেদ হলে কোথায় যাবে?বিয়ের পর আলোকের স্বভাব আচরন দেখে তারার ভালো লেগেছিল। শেষমেষ তারা ভেবেছিল সে আলোকের সাথেই থাকবে কিন্তু তা তার হলো না। আলোককে যখন একজন খুনি ভেবেছিল তখন তারার খুব কষ্ট হয়েছিল কিন্তু আজ তার থেকেও বেশি কষ্ট হচ্ছে আলোককে একজন ধর্ষক ভাবতে।যাই হোক না কোনো তারা একজন ধর্ষকের সাথে কিছুতেই থাকবে না।মানুষকে খুন করা জঘন্য অপরাধ তার থেকে জঘন্য অপরাধ রেপ।এইসব ভাবতে তারার চোখ থেকে পানি ঝরছে।তারা বিছানার চাদর আকড়ে ধরে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছে। হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।তারা মুখ উঁচু করে তাকালো । লেখনীতে তানজিলা তাবাচ্ছুম।দেখলো দরজা টা নড়ছে যেনো কেউ বাহিরে গেল।ব্যালকনির দিকে তাকালো দেখলো ওখান কার দরজাটাও খোলা।তার মানে আলোক বাহিরে গিয়েছে।তারা কষ্ট করে উঠলো।পায়ে চাপ দিতে নিষেধ করেছিল ইরা কিন্তু তবুও তারা উঠলো কারন দেখতে হবে আলোক আজকে এত রাতে আবার কোথায় গেলো।তারা উঠে বাহিরে গেলো।দেখলো এপাশের তিনটি রুমের ওইদিক আলোক।আর ওই দিন তারা যেই ঘর টাতে ঢুকেছিল আলোক ও সেই ঘরটাতে ঢুকলো। কিন্তু আশা যে তারাকে বলেছিল এই ঘর বন্ধ থাকে তাহলে আলোক ঢুকলো কিভাবে?চাবি তো সব আশা নিয়ে গেছে। প্রত্যেক টা রুমেই তালা দেওয়া ।আশা নিজের থাকা ঘরটাতেও তালা দিয়েছে।তারা ওই ঘর দিকে এগলো।দেখলো ভিতর থেকে লাগা।তারা ভাবছে আলোক এই ভূতুড়ে ঘর টাতে কেনো ঢুকলো?আর এই ঘর তো তালা বদ্ধ ছিল তাহলে?তারা লক্ষ্য করলো ভিতর থেকে কিছু আওয়াজ আসছে।তারা দরজায় কান লাগালো।কারো কান্নার আওয়াজ পাচ্ছে সে।তারার ভয় ও করছে আবার অবাক ও হচ্ছে!এত রাতে কে কাঁদছে?আর কেনোই বা কাঁদছে? আলোক কাঁদছে ওখানে? কিন্তু কেনো? তারার মাথা ঘুরছে।আলোক এখানে ঢুকেছে আর কান্নার আওয়াজ আসছে কেনো?কে কাঁদছে?কি হচ্ছে?

_________

#চলবে….

না]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here