পূর্ণতা ৩৮ এবং শেষ পর্ব

0
95

#পূর্ণতা❤️
#Writer_তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

৩৮.(শেষ পর্ব)

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে আলোক। হটাৎ পাঞ্জাবির নিচে টান অনুভব করে তাকালো। দেখলো পিচ্ছি ছোট পূর্ণতা টানছে। তারপর হাসি মুখে মেয়েকে কোলে নিয়ে গালে এবং কপালে চুম্বন এঁকে দিলো। নিজের বাবার এমন কাজে পূর্ণতা চরম বিরক্ত। সে হাত দিয়ে আলোকের মুখে মারতে লাগলো। বিচারা আলোক নির্শব্দে মেয়ের মাইর খেলো। তারপর আবার একই কাজ করলো কিন্তু এবার পূর্ণতা কিছু বলল না। তারপর ওয়াশরুমের কাছে এসে বলল,

‘ তারা তোমার গোসল করা হয়েছে? লেট হয়ে যাচ্ছে।’

ভিতর থেকে তারা চেঁচিয়ে বলল,

‘ তোমরা বের হও। আমার হয়েছে। রেডি হয়ে আসছি।’

আলোক পূর্ণতাকে কোলে নিয়ে নিচে আসলো। পূর্ণতা কে দেখে রায়হান বসা থেকে উঠলো। তারপর আদুরে কন্ঠে বলল,

‘ আমার ছোট মনিটাকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে। দেখি আসো।’

আলোক তার বাবার কোলে মেয়েকে দিলো। আশা চায়ের কাপ রেখে উঠে বলল,

‘ বাহ দাদী আপু পুরো পিংক ফেয়ারী হয়েছে।’

তারপর রায়হানের কোল থেকে আশার কোলে গেলো পূর্ণতা। গিয়ে আশার গালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,

‘ দিদা এটা পিংক না পার্পেল কালার।’

পূর্ণতার কথায় আশা হালকা হেসে একটু অবাক হওয়ার চেষ্টা করে বলে,

‘ ওহ। তোমার এই বুড়ি দাদী তো এইসব বুঝে না। আচ্ছা আমার পূর্ণতা কে এইরকম পরীর মতন সাজিয়েছে? বাবা?’

পূর্ণতা তার কচি গলায় উত্তর দিলো,

‘ না। আম্মু সাজিয়ে দিয়েছে। বাবা তো নিজে সাজতে ব্যস্ত।’

পূর্ণতার কথায় আলোক ফিক মেরে হাসে সাথে রায়হান, আশাও। আশা আকস্মিক কন্ঠে বলে,

‘ তাই! বাবা এত সাজে?’

পূর্ণতা ঠোঁট উল্টে ‘হু’ বলে। তারপর কিছুক্ষণ পর আলোকের কোলে গেলো। আশা আলোকের কাছে এসে তার চুলে হাত বুলিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,

‘ যাচ্ছিস? সাবধানে দেখে শুনে যাস।’

আলোক ছোট করে ‘হুম’ বলল। পূর্ণতা আশার হাত সরিয়ে দিচ্ছে আলোকের মাথা থেকে বার বার।

‘ কি আমার ছেলের গায়ে আমাকে হাত দিতে দিবে না?’

পূর্ণতা আলোকের কাঁধে মাথা রেখে অসহায় কন্ঠে বলে,

‘ এটা আমার বাবা। তুমি হাত দিবে না।’

‘ আর ছেলেটা যে আমার সেটার কি?’

আশার এমন প্রশ্নের কি উত্তর দিবে পূর্ণতা খুঁজে পেলো না। তার এই কচি মাথায় ঢুকছে না এই বিষয়। নিরুপায় হয়ে পূর্ণতা আলোকের দিকে ছলছলে নয়নে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,

‘ বাবা!’

আশা হাত সরিয়ে নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল,

‘ তারা কোথায়?’

‘ ও রেডি হচ্ছে। আসছে।’

আশা ছোট মুখে ‘ আচ্ছা ‘ বলল। আলোক পূর্ণতার সাথে কথা বলতে বলতে বাহিরে বের হলো। তারপর দাড়িয়ে আছে তারার অপেক্ষায়।

মিনিট পনেরো পড়ে তারা আসলো। মেয়ে বাবাকে দেখে কিছুক্ষনের জন্য দাড়ালো। তাকিয়ে আছে তার আলোক আর পূর্ণতার দিকে। তারপর তাদের কাছে গিয়ে পূর্ণতাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

‘ দাও। ওকে আমার কোলে দাও।’

বলে তারা হাত বাড়ালে পূর্ণতা গিয়ে আলোকের গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে বলে,

‘ না আমি বাবার কাছে থাকবো।’

তারা পূর্ণতার কথা শুনে অবাক হয়না। কারণ যখন থেকে পূর্ণতা একটু আধটু কথা বলতে শিখেছে তখন থেকেই দেখছে মেয়েটা বাবার ভক্ত! মায়ের থেকে বাবার কাছে বেশি থাকে। তারা আদুরে কন্ঠে বলল,

‘ প্রিন্সেস বাবাকে না ছাড়লে তোমার বাবা গাড়ি আনবে কিভাবে? আসো! আম্মুর কোলে আসো। বাবা পরে নিবে।’

তারপর আলোক পূর্ণতা কে আদর করে বুঝিয়ে বলল। পূর্ণতা তারার কোলে আসলো।

আলোক গাড়ি নিয়ে যাবে এমন সময় কোমল কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ ভালো লাগছে।’

তারা বুঝতে না পেরে ভ্রু উচুঁ করে বলল,

‘ কি?’

আলোক মৃদু হেসে বলল,

‘ তোমাকে।’

আলোকের এমন কথায় লজ্জা পেল তারা। আলোক সেটা বুঝে গেছে। তারা আলোকের সামনে তেমন লজ্জা পায় না কিন্তু মাঝে মাঝে আলোকের এমন কথায় সে লজ্জায় লাল হয়ে যায়।আলোক গেল। কিছুক্ষন পর আলোক গাড়ি নিয়ে আসলো। তারা পূর্ণতাকে কোলে নিয়ে বসলো। তারপর চলল গন্তব্যের পথের দিকে।

গাড়ি পার্ক করে আসলো আলোক। এসে পূর্ণতা তার কোলে নিল। ধীর গতিতে হাঁটতে শুরু করলো আলোক। ভিতর টা যেনো তার দুঃখে জর্জরিত।যেখানে প্রতিনিয়ত ভারী দীর্ঘশ্বাস দেয়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। যেখানে কেউ তার ভিতরের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস গুলো জড়ো হতে হতে বিষাক্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে নিজের গন্তব্যের জায়গায় এসে পৌঁছালো আলোক। পূর্ণতাকে নামিয়ে ধপ করে নিচে বসে পড়লো আলোক। তারা আলোকের কিছুটা পিছনে দাড়িয়ে আছে। আলোকের কথা ভেবেই তার খুব কষ্ট হচ্ছে। আলোকের চোখের কর্নিশে হতে গড়িয়ে পড়তে লাগলো অশ্রুজল। আলোক সামনে থাকা কবরে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো,

‘ কেমন আছো চাঁদপাখি? আমি আজও ভুলতে পারিনি তোমাকে। তোমার হাসি, তোমার দৃষ্টি তোমার সবকিছু আমাকে ঘিরে ধরে আছে আমায়। জানি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই। আজ আমার জন্যই তুমি নেই। কথা দিয়েছিলাম তোমাকে সুখে রাখবো কিন্তু সেই সুখের আগুনেই তোমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিজের অজান্তেই মেরে ফেলছি। জানো, আমার এখনো খুব মনে পড়ে তোমাকে। খুব ইচ্ছে করে একবার দেখার, যদি একটু ছুঁতে পারতাম।’

বলে আলোক মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগে। তারার এইসব দেখে না চাওয়ার সত্ত্বেও কাদঁছে। আলোক মাথা নিচু করে বলে,

‘ আমাকে ক্ষমা করো চাঁদ।’

পূর্ণতা তার বাবার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। তার ছোট মাথায় কিছু ঢুকছে না। তার বাবা কেনো কাদঁছে সে বুঝতে পারছে না। কেমন অসহায়ের মতন তাকিয়ে আছে। আলোক মাথা উচুঁ করে পূর্ণতা কে টেনে বলে,

‘ দেখো তোমার পূর্ণতা।’

‘ তুমি চেয়েছিলে পূর্ণতা। এইযে তোমার পূর্ণতা।’

তারপর আলোক জোরে কেঁদে দিয়ে বলল,

‘ আমাকে ক্ষমা করে দিও। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুক।’

বলে পূর্ণতা কে নিয়ে উঠে গেলো আলোক। কারণ ছোট মেয়ের সামনে এভাবে কাঁদায় সে কেমন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আর এটা তার উপর ব্যাড ইফেক্ট পড়তে পারে। তাই আলোক আর থাকলো না সেখান থেকে চলে গেল। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল তারা। আলোক তার পাশ কেটে গেলো। তারা ধীর পায়ে এগোলো। তারপর চাঁদের কবরের সামনে বসে কাঁদলো। কান্না কিছুটা থামিয়ে বলল,

‘ আমি কখনোই আলোকের মন থেকে তোমার জায়গা চাইনা, চাইনা আলোকের মন থেকে তোমাকে মুছে ফেলতে চাইনা। আলোক তোমারই থাকবে। আমি শুধু একটু জায়গা চাই। আমি জানি আমি কখনোই তোমার মত হতো পারবো না। তুমি এমন একজন, যার মতন হওয়ার আমার সাধ্য নেই। আকাশে হাজার টা তারা থাকলেও চাঁদ থাকে একটা। আর চাঁদের জায়গা কখনো কেউ নিতে পারে না। চাঁদের আলোয় আলোকিত হয় তারা। চাঁদবিহীন তারা থাকলেও তাতে আলো শূন্য। তাই আমি চাইনা তোমার জায়গা নিতে।’

এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে থামলো তারা। তারপর একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,

‘ আলোকের মত মানুষ হয় না। জানি আজ যদি তুমি বেচেঁ থাকতে তাহলে আমি আলোকের জীবনে থাকতাম না! আলোকের মত মানুষকে পেতাম না তবুও আমার মন বলে যদি তুমি বেচেঁ থাকতে। আলোকের জীবনে থাকতে।’

তারার কান্নার বেগ বেড়ে যাচ্ছি। কিছুতেই নিজেকে থামাতে পারছে না সে।

‘ আমি তোমার আলোক কে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমাকেও ক্ষমা করো। আম_আমি আলোক কে নিজের সবটা দিতে খুশি রাখার চেষ্টা করবো। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের অধিবাসী করুক।’

বলে উঠলো তারা। যাওয়ার আগে স্নান হেসে বলল,

‘ পূর্ণতা আমার নয়! তোমার মেয়ে।’

বলে সামনে ফিরে হাঁটলো তারা। আলোক এতক্ষণ দাঁড়িয়ে মেয়ের সাথে কথা বলছিল। তাকে বোঝাচ্ছিল। কারণ তার বাবাকে কান্না করা পূর্ণতা ভয় পেয়েছিল। তারাকে দেখে আলোক ধীর গতিতে হাঁটতে শুরু করে। তারা গিয়ে আলোকের হাত ধরে। এক হাতে পূর্ণতা কে কোলে নিয়েছে আর অপর হাত তারার হাতের সাথে আবদ্ধ করেছে। এভাবেই আস্তে আসতে হাঁটছে তাঁরা(they)। তারা আলোকের দিকে চেয়ে আছে। জানে আজ আলোক কতো কষ্টে আছে এবং থাকবে।

পার হয়ে গেছে চার বছর। ঐদিনের পর থেকে আলোক তারার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যায়। তারার সামনে সব কিছু ক্লিয়ার হয়ে যায়। রুমানা নামের ওই মেয়েটাকে রেপ অ্যান্ড মাডার সাথে তার‌ বাবাকে মাডার করা। সবকিছুই! কারণ সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর শুনতে পায় রুমানার মা কেও মেরে ফেলেছে। তাদের ফুল ফ্যামিলি কে মাডার করা হয়েছে। আর সব করেছিল রুমানা মেয়েটার প্রেমিকের প্রভাবশালী ফ্যামিলি! তারা সব বুঝতে পেরেছে। যেদিন রুমানার বাবার খুন হয় ওইদিন বিকেলে রুমানার মা তাদের বাসায় এসেছিলেন। আশার কথা কথা বলছিলেন রুমানার বিয়ে নিয়ে, যে আজ রুমানার বাবা রুমানার প্রেমিকের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবেন।
তখন তারা আর আলোক বাহিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।[৫ পর্বে উল্লেখ আছে]। তারপর আলোক তারা বাহিরে যায় এবং ঘণ্টা কয়েক পর বাড়িতে আসে। তারা সেদিন না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে কারণ বাড়িতে গরুর মাংস রান্না হয়েছিল আর তারার এটাতে অ্যালার্জি ছিল। তারা খালি পেটেই ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর রাত ১ টায় তারার ঘুম ভাঙছে আর সে আলোক কে আবিষ্কার করে রক্ত মাখা গায়ে সাথে হতে ছুরি নিয়ে। তারপর পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনে সে-ই মহিলাটার স্বামী অর্থাৎ রুমানার বাবা কে খুন করা হয়েছে। তখন তারার মনে মনে ভেবে নেয় আলোক খুন করেছে। আর এই ধারণা পেশন করে সে রুমে যেতেই দেখে বাটিতে ভেজিটেবল স্যুপ[৬ পর্বে]। তারার ভেবেছিল হয়তো তার শাশুড়ি আশা দিয়ে গেছে কিন্তু না! সেটা সেদিন রাতে আলোক বানিয়েছিল তারার জন্য। আলোক জানত তারা না খেয়ে ঘুমিয়েছে তাই সে রাতে উঠে তারার জন্য ভেজিটেবল স্যুপ রান্না করে। যাতে তারা ক্ষুধা পেয়ে উঠলে খেতে পারে। কিন্তু ভেজিটেবল স্যুপ বানাতে গিয়ে আলোকের হাত কেটে যায়। আর ব্লাডিং হয়। আর রক্ত তার গায়েও লেগে যায়। আবার সেইসময়ে কিচেনের পানির লাইনে সমস্যার কারণে পানি আসা অফ হয়ে যায়। যার কারণে আলোক রুমের ওয়াশরুমে আসে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তারা উঠে আলোক কে রক্ত সহকারে দেখে। তারপর তারা ভয় ভীতি রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। আলোক স্যুপ পাশে রেখে যায়। পরের দিন রুমানার বাবার খুন হয়। কারণ উনি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যখন ছেলের বাড়িতে গেছিলেন তখন সেই ছেলের বাবার কিছু গোপন তথ্য জানতে পারেন । তারপর ওনারা বিয়েতে অস্বীকার প্রদান করলে তখন রুমানার বাবা হুমকি স্বরূপ সবাইকে বলে দেবেন এমন কিছু বলে বের হন। আর তারপর রাতে তাকে মানুষ পাঠিয়ে খুন করিয়ে দেন। রাতে রুমানার বাড়িতে এই খবর টা আবদ্ধ থাকলেও ভোর হতে হতে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। আলোক ফজরের নামায পড়ে আসছিল তখন সেখানে জানার জন্য যায়। আর এদিকে তারার ঘুম ভেংগে সে সব শুনে উল্টা বুঝে ফেলে। তারপর তারা স্যুপ খেয়ে বিছানায় বসে ছিল, তখন আলোক তাকে দেখে হেসে ছিল কারণ আলোকের বানানো স্যুপ তারা খেয়েছিল কিন্তু তারা অন্য কিছু ভেবেছিল। তারপর ঐ লোক গুলোই রুমানাকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলছে কারণ রুমানাও তার বাবার মতো একই কাজ করেছিল তাদের থ্রেট দিয়েছিল। যার ফলস্বরূপ তাকে রেপ করে মেরে ফেলা হয়। আর নীরবের কথা ঠিক ছিল, যে কেনো আলোক ‘কাজ হয়েছে ‘ এই কথা বলেছিল ওইদিন। তারার কাছে সব ক্লিয়ার হয়ে যায় ৫-৬ মাসে। তারপর এক বছর পেরিয়ে যায়। আর এরমধ্যে তাদের দুজনের মধ্যে আগমন ঘটে পূর্ণতার। পূর্ণতা আসল নাম রাখা হয় ‘চাঁদনী আলো তারানা’। যেমনটা চাঁদ আলোক ভেবেছিল। কিন্তু যেহেতু তারা আছে তাই তার নাম অনুযায়ী ‘ তারানা ‘ দেয়। তবে ডাক নাম পূর্ণতা-ই দেয়। পূর্ণতার বর্তমান বয়স আড়াই বছর। কিন্তু বয়সের তুলনায় তার ব্রেইন অনেক ফাস্ট। তারা বয়স অনুযায়ী যতটা বোকা তার মেয়ে ঠিক ততটাই চালাক। পূর্ণতা কে দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না সে মাত্র আড়াই বছরের বাচ্চা। পূর্ণতা মায়ের থেকে বাবার কাছে থাকে বেশী। কারণ পূর্ণতা হওয়ার পর তারা অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন আলোক ই পূর্ণতার সব কিছু করতো শুধু খাওয়া বাদ দিয়ে। পূর্ণতা আলোক কে খুব ভালোবাসে। সারাদিন আলোকের সাথে থাকে। নামাজে গেলেও তার পিছু পিছু যায়। আলোক ও তার একমাত্র মেয়েকে কখনো ছাড়ে না , নিজের সাথেই রাখে।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে আলোক। তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, আকাশের সেই চাঁদের দিকে। এই চাঁদ রয়ে গেলো কিন্তু তার চাঁদ ফুরিয়ে গেল। হটাৎ তার পাশে তারা রেলিং ধরে দাড়ালো। তারার উপস্থিতি বুঝতে পারে আলোক শান্ত গলায় বলল,

‘ পূর্ণতা ঘুমিয়েছে?’

তারা মুখ টা গোমড়া করে বলল,

‘ মেয়ে তোমাকে ছাড়া খাবে না। ঘুমাবেও না। অনেক চেষ্টা করছি।’

‘ কোথায় ও?’

‘ কাদঁছে তাই মা কোলে নিছে।’

আলোক ছোট গলায় বলল, ‘ আচ্ছা আমি যাচ্ছি।’

বলে চলল আলোক। তারা দাড়িয়ে গেল সেখানেই। সে-ও তাকালো খোলা আকাশের দিকে। চারিপাশে জ্বলজ্বল তারা আর মাঝে চাঁদ খানা। তারপর তপ্ত নিশ্বাস ফেলে তারাও চলল।

রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই। আলোক ব্যালকনিতে এক কোণায় হাঁটু ভাঁজ করে মুখ গুঁজে আছে। আজ চাঁদের ১৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী। আজকের দিনেই চাঁদ চলে গেয়েছিল না ফেরার দেশে। আলোক এখনো নিজেকে অপরাধী মনে করে। এই দিনে সে খুব কষ্ট হয়। আজও আলোকের আফসোস হয় কেনো ওইদিন চাঁদের উপর অভিমান করতে গেয়েছিল। এই ভেবে আলোক এই দিনে এখানে থেকে কাঁটায়। আর মাঝে মাঝে মন খারাপের সময় আসে। হটাৎ কাঁধে কার স্পর্শ অনুভব করলো। তাকিয়ে দেখে তারা এসেছে। তারা জানে এইদিনে আলোক কেমন অবস্থায় থাকে। বিগত ৪ বছর ধরেই দেখে আসছে। তারার দিকে তাকানোর পরে আলোক কান্নায় ভেঙে পরে তারাকে জড়িয়ে জাপটে ধরে কাঁদে । তারা আলোকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করে। তারপর কোমল কন্ঠে বলে,

‘ কেনো নিজেকে প্রতিবার এভাবে কষ্ট দাও? কেনো নিজেকে অপরাধী ভাব? তুমি মেরে ফেলে নি ওকে। তাহলে কেনো কষ্ট পাও।’

আলোক মুখ নাড়াচড়া করে।

‘ ভাগ্যের উপর কারো হাত থাকে না আলোক। তুমি জানো তোমাকে এভাবে দেখতে আমার সহ্য হয়না। হয়তো তোমার চাঁদ পাখির ও কখনো হবে না। উল্টো সে-ও আমার মতই কষ্ট পেত। প্লিজ তুমি এভাবে ভেঙে পরো না আমার খুব কষ্ট হয়।’

বলে তারা আলোকের পিঠে মাথায় হাত বুলাতে থাকে। আলোক গুটি মেরে তার কোলে মাথা রেখে কাদছে । তারা তার কান্না চেপে রেখেছে। সে তো খুবই ইমোশনাল কিন্তু এখন ইমোশনাল হওয়া যাবে না।

‘ আম্মু? বাবা।’

হটাৎ ভিতর থেকে ডাক শোনা গেল। পূর্ণতা উঠে গেছে।

‘ বাবা। বাবা।’

কারো সাড়া না পেয়ে চোখ ঘোচলে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে

‘ ওই বাবা। বাবা।’

আলোক তড়িৎ বেড়ে তারার কোল থেকে উঠে নিজের চোখ মুখ মুছে হাসিমুখে ভিতরে গিয়ে বলল,

‘ মা। তুমি উঠলে কেনো? ঘুম হয়েছে?’

পূর্ণতা তার দু’হাত বাড়ালো কোলে চড়ার জন্য। আলোক মেয়েকে কোলে নিল। তারপর কিছুক্ষণ হাঁটতেই পূর্ণতা ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে হয়তো খারাপ কিছু দেখেছিল তাই আচমকাই উঠে পড়েছে । আলোক আর পূর্ণতকে শোয়ালো না। কারণ এখনো তার ঘুম গভীর হয়নি। আলোক পূর্ণতা কে কোলে নিয়েই তারার কাছে গিয়ে বসলো। তারপর তারার কাঁধে মাথা হেলান দিলো। তারা তার মাথার ভার আলোকের মাথার উপর দিল। তারপর তাঁরা (they) তিন জন একসাথে এভাবেই রইলো। তারালোক আকাশের দিকে চেয়ে আছে। দেখছে চাঁদের আলোকে তারা…

___________________

“শূন্যতাতে পরিপূর্ণতা পেয়েছি,
নিঃসঙ্গতাকে পাথের করেছি..
অভিমান করতে গিয়ে
তোমাকে হারিয়েছি..

হাজার খানেক ভিড় জমেছে,
তার মাঝে তোমাকে খুজে ফিরি
যখন ঘিরে ধরে শূন্যতা,
অবহেলাতেই পেয়েছি তোমার পরিপূর্ণতা..

চাঁদ তুমি নেই আজ, নেই আকাশে আলো!
তবুও নাহয় থাকুক তোমার প্রিয় মানুষটি ভালো..
চাঁদের অনুপস্থিথিতে আকাশটা আজ বড়ই শূন্যতা,
জ্বলজ্বলে হাজার তারা থাকলেও, নেই আকাশে পূর্ণতা…!!

তোমাতেই খুঁজি আহরহ, জীবন রাঙ্গার ছায়া,
শূন্য হৃদয়ে ভরি, তোমারই স্নিগ্ধতার মায়া..
যন্ত্রে বাঁধা মন, ছিল ক্লান্ত অসহায়!
অর্থে কেনা সুখ, ম্রিয়মান দুঃখের ছায়ায়..

তুমিহীন জীবনটা বিবর্নের ছায়ায় শূন্যতা
অপূর্ণতা ছড়িয়ে শুধু তোমাতেই পাওয়া আমার ‘পূর্ণতা'”❤️
______তানজিলা তাবাচ্ছুম ❤️

_______________সমাপ্ত__________________

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here