প্রণয় পর্ব ৪

0
176

গল্পের নামঃ #প্রণয়
#পর্বসংখ্যা_০৪
লেখনীতেঃ #ফারিহা_জান্নাত

সকালবেলা পৃথিশার রুমে ঢুকে সুমিতা বেগম তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।সন্দিহান কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,”এই সকালে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
পৃথিশা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো, “ইন্টারভিউ দিতে।”
সুমিতা বেগম অবাক হয়েপৃথিশাকে হাত ঝাঁকিয়ে বললেন,”পাগল হয়ে গেছিছ নাকি তুই।তোর দাদী আর ছোট চাচী দেখলে বাসায় তুলকালাম কান্ড করে ফেলবে।”
পৃথিশা নিজেকে ছাড়িয়ে আবারো ব্যাগ গুছাতে থাকলো।তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এখনো সুমিতা বেগমের কথা শুনেনি।
সুমিতা বেগম পৃথিশাকে নিজের সামনে এনে অস্হির কন্ঠে বললেন,”মা আমার কথাটা শোন প্লিজ।জানিসই তো তোর দাদী তোকে একটু অপছন্দ করে,এখন যদি তুই তার কথা না শুনিস তাহলে তো তিনি আরোও রাগ করবে তাই না?”
পৃথিশা কড়া কন্ঠে বলে, “মানুষের পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে আমি কি করবো!আমার নিজের কাজটা হলেই হলো।”
সুমিতা বেগম পৃথিশাকে কোমল স্বরে বললেন,”তোর ছোট চাচীকে তো চিনিস মা।পরে সবার সামনে এমন কথা বলে দেবে তোর বাবা কষ্ট পাবে।আর জানিসই তো তোর বাবার প্রেশার টা বেড়েছে।”
পৃথিশা মায়ের দিকে রক্তিম চোখে তাকিয়ে বলল,”আমার নাস্তা রেডি করো,আমি বের হবো।”

সুমিতা বেগমকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই পৃথিশা জামা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।সুমিতা বেগম বেশ বুঝতে পারছেন বাসায় আজ আবারো বড়সড় একটা ঝামেলা হবে।পৃথিশাকে তার দাদি পছন্দ করে না।পছন্দ না করার কারন পৃথিশা ছেলে নয় মেয়ে।সুমিতা বেগমের বিয়ের অনেকদিন পরও বাচ্চা হচ্ছিল না।কত পানি পড়া,কবিরাজ দেখিয়েছিল মানুষের কথায় কোন কাজই হয়নি।পরে ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে পারে কিছু সমস্যা ছিল।ঔষুধ খাওয়ার ঠিকই কাজ হয়।কিন্তু পরে মেয়ে সন্তান হওয়ায় পৃথিশার দাদী সন্তুষ্ট হননি।তার ছেলে চাই বংশের জন্য।সুমিতা বেগম আর মা হতে পারেননি নিজের সমস্যার জন্য।তাই, পৃথিশা তাদের পরিবারের ছোট মেয়ে।বাকি সবাই তার চেয়ে বড়।
তিনি শুনেছিলেন বাড়ির ছোট বাচ্চারা নাকি বেশি আদর পায়।কই পৃথিশা তো পায়নি,তাকে তো সবসময় অবহেলা করা হয়েছে।পৃথিশার বয়স যখন বারো ছিল তখন সে নাচ শিখত।পৃথিশার নাচ খুব পছন্দ ছিল,আর ভালো নাচতে-ও পারত।অনেক পুরস্কারও পেত।কিন্তু পৃথিশার দাদী তার নাচ শিখা বন্ধ করে দেয়।তার কঠিন আদেশ ছিল, ‘এ বাড়ির মেয়েরা নেচে টাকা আনে না।’
সুমিতা বেগমের মনে আছে পৃথিশা অনেক কেঁদেছিলো সেদিন।তারপর থেকে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে তার মেয়ে।নাচের নুপুরটা আগের মতো খুলে দেখে না,আগের মতো আবদারও করে না।বৃত্তির টাকা পেয়ে গল্পের বই কিনত আর সেসব নিয়েই সারাদিন রুমে পড়ে থাকতো।সে কখনো ভাই-বোনদের সাথে লুকোচুরি, এক্কাদোক্কা, কানামাছি খেলে নি।একাই থাকতো,নিজের মতো!
পুরোনো কথা বাদ দিয়ে সুমিতা বেগম ঘর থেকে প্রস্হান নিলেন।পৃথিশার খাবার তৈরী করতে হবে,আবার তার বাবাকে অফিসের জন্য বিদায় করতে হবে।

🍁

ড্রয়ংরুমের খাবার টেবিলে সবাই খেতে বসেছে।পৃথিশা বড় চাচী ও সুমিতা বেগম খাবার পরিবেশন করছেন।পৃথিশার বড় চাচা সকাল সকাল বেড়িয়ে গেছেন কাজে।ছোট চাচা টেবিলে বসে পেপার পড়ছে আর খাচ্ছে।পৃথিশার বাবা খেতে আসেন নি এখনো।ছোট চাচীর বড় ছেলেকে নিজের রুমে খাবার দিয়ে আসতে হয়,ছোট ছেলে অনেক আগেই খেয়ে স্কুলে চলে গেছে।বড় চাচীর মেয়ে আনিকা রান্নাঘরে মশলা বাটছে,কিছুদিন পরই তার বিয়ে। পৃথিশার দাদী সোফায় বসে পান খাচ্ছে।তার সামনে একটা ছোট টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখা।তিনি টিভি দেখতে দেখতে খান।তাদের পরিবারে এমন প্রচলিত নিয়ম আছে।নিয়মটি হলো, মেয়েরা ছেলেদের পর খাবে।বাড়ির ছেলেদের সাথে কোন মেয়ে খেতে বসবে না।
পৃথিশা রেডি হয়ে এসে ধপ করে নিজের বাবার চেয়ারের পাশে বসে পড়ল।বাড়ির সবাই অবাক হয়ে তাকিয়েআছে।সুমিতা বেগম পৃথিশাকে ইশারা করছে উঠে পড়ার জন্য।পৃথিশা দেখেও না দেখার ভান করলো।

পৃথিশার দাদী খেঁকিয়ে উঠলেন,”মাইয়া আদব কায়দা কিছু জানে না।এতগুলা পোলা মাইনষের লগে খাইতে বইসা পড়ল।বলি এ বাড়িত একডা নিয়ম আছে বুঝলি।”
পৃথিশা কড়া কন্ঠে জবাব,”আপনি মনে ভুলে গিয়েছেন এ বাড়িতে আরও একটা নিয়ম আছে যে সবাই খাবার টেবিলে খাবে।কিন্তু আপনি সোফায় শুয়ে খেতে বসেছেন।আপনি নিয়ম ভাঙলে আমি কেন ভাঙতে পারব না।আফটার অল আমি তো আপনারই নাতনি তাইনা?”
পৃথিশার দাদী হিসহিসিয়ে বললেন,”তুই এইটুকুন মাইয়া আমারে নিয়ম শিখাইতো আসছ?”
পৃথিশা নিজের নিকাবটা টেনে জবাব দিল,”তাহলে এইটুকুন মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা তুলতে লজ্জা করলো না।”
পৃথিশার দাদী রাগে পৃথিশার দিকে ঝোলের চামচটা ছুড়ে দিলেন।চামচটা সরাসরি পৃথিশার মাথায় গিয়ে লাগল।স্টিলের চামচের আঘাতে মাথা থেকে হালকা রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো।ঠিক সেই সময়ই পৃথিশার বাবা রুম থেকে বের হচ্ছিলেন।নিজের মায়ের এমন কাজ দেখে তিনি হুংকার দিয়ে বললেন,”আম্মা!”
পৃথিশার দাদী তেড়ে এসে বললেন,”কি এহন এই মাইয়ার লইগ্গা আমারে বাইর কইরা দিবি?”
পৃথিশার বাবা কোন কথা পৃথিশার কাছে এগিয়ে যান।পৃথিশা বড় আদরের মেয়ে তার,সাত রাজার ধনের মতো।এই মেয়েটাই তো তাকে প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতি দিয়েছে,আর আজ সেই মেয়েকেই নিজের জন্মদাত্রী মা তার সামনে আঘাত করেছে।চোখ ফেটে পানি বের হইতে চাইছে তার।কিন্তু,বাবাদের তো কাঁদতে নেই!আর তিনি তো একজন বাবা!
পৃথিশার বড়চাচী তাড়াতাড়ি বরফ এনে পৃথিশার মাথায় লাগিয়ে দিলেন।পৃথিশা কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া করছে না,চুপচাপ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।কিছুসময় পর নিজের বাবার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে তার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,”বাবা তুমি কি চাও আমি এর প্রতিবাদ করি?নাকি অন্যান্যদের মতো আমিও চুপচাপ সবকিছু মাথা নিচু করে মেনে নেব!”
পৃথিশার বাবা পৃথিশার হাত দুটো শক্ত করে ধরে চোখ বুঝলেন। মৃদু হেসে পৃথিশা নিজের দাদীর সামনে গিয়ে বলল,”আপনি আমাকে বলেছিলেন না আমি মেয়ে,ছেলে নই।তাই আমি কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখি না।আমি আপনাকে আজ দেখাব আমি কতকিছু করার ক্ষমতা রাখি।”

কথাটা বলেই পৃথিশা নিজের ব্যাগ ঘেটে একটা কাগজ বের করলো।
নিজের দাদীর সামনে দেখিয়ে বললো,”দেখুন এটা।আপনি কি মনে করেছিলেন আমাকে ঘরবন্দি করে রেখেই সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে নেবেন।আপনার কি মনে হয় আমি চুপচাপ আপনার কথা মেনে ঘরে বসে থাকব?ভুল ভেবেছেন।আমি এতদিন ঘরে বসে থেকেছিলামই ঠিকই কিন্তু কাজ ঠিকই করেছি।অনলাইনে যতগুলো ইন্টারভিউ দেওয়া যায়,আমি দিয়েছি।আর এইযে দেখুন,আমার একটা ইন্টারন্যাশনাল কম্পানিতে জবও হয়ে গেছে।আর আপনার নাতনি দুইবছর আগে পড়াশোনা শেষ করে এখনো বেকার বসে আছে।”

পৃথিশার দাদী চুপ করে থাকলেন।তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে পৃথিশা ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।পৃথিশার বাবাও না খেয়ে বেরিয়ে গেল।পুরো ঘর থমথমে হয়ে গেলো।

🍁

বাসে করে যাওয়ার সময় কোমড়ে কারো খারাপ স্পর্শ পেয়ে ঘৃণায় গা গুলিয়ে ওঠলো পৃথিশার।আজ তার কপাল খারাপ তাই কোন রিকশা পায়নি।রাগে লোকটার পায়ের মধ্যে নিজের জুতা দিয়ে জোরে চেপে ধরলো। তার সাথে মাথা থেকে হিজাব পিনটা খুলে হাতে গেঁথে দিল।
পেছন ফিরে লোকটার দিকে ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,”পারলে নিজের মা-বোনের সাথে এগুলো করবেন।অন্য মানুষের সাথে না করে!”
কথাগুলো বলেই পৃথিশাবাস থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লো।চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার।
বেঁচে থাকার বড় কষ্ট,বড় কষ্ট!

চলবে,
প্রতিক্রিয়া (রিয়েক্ট),মন্তব্য (কমেন্ট) লিখার মনোবল বাড়ায়।তাই আপনাদের প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের আশা করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here