প্রেম এসেছিলো নীরবে পর্ব -১৬

0
69

#প্রেম_এসেছিলো_নীরবে(১৬)
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
আজ শুক্রবার জুম্মার নামাজ আদায় করে বাড়ির লোকেরা মাত্রই বাড়িতে এলো।এখন খাওয়া দাওয়ার পালা।টেবিলে প্রাহিকে না দেখে ভ্রু-কুচকে আসে অর্থ’র। সকালেও মেয়েটা আসেনি।রেস্টুরেন্টে একটা ইম্পোর্ট্যান্ট মিটিং থাকায় অর্থ নিজেও খোজ খবর নিতে পারিনি।আর আজ দুদিন যাবত অর্থ’র উপর কাজের চাপটা একটু বেশিই।কারন সামনেই হিয়ার বিয়ে কতোগুলো কাজ বাদ যাবে।এইযে খেয়ে আবারও চলে যেতে হবে কাজের জন্যে।অর্থ আর কিছুই বললো না চুপচাপ খেয়ে নিলো।তারপর উঠে গিয়ে সোজা প্রাহির রুমের দিকে অগ্রসর হয়।রুমে ডুকেই দেখতে পায় বিছানার উপর আপাদমস্তক ঢেকে রেখে প্রাহি সুয়ে আছে।অর্থ গম্ভীরমুখে সেদিকে এগিয়ে যায়।প্রাহির কাছকাছি আসতেই কম্বলের ভীতর থেকে চাপা আর্তনাদ আসছে।অর্থ অবাক হয়।হলো কি মেয়েটার?অর্থ তাড়াতাড়ি কম্বলটা সরিয়ে দেখে।প্রাহি পেট চেপে ধরে হালকা ক্ষীণ আওয়াজে কাঁদছে।অর্থ অস্থীর হয়ে উঠে,
-” কি হলো প্রাহি?হোয়াট হেপেন্ড টু ইউ?এমন করছো কেন?”
প্রাহি কিছুই বলছে না দাঁতেদাঁত চিপে নিজের ব্যাথাটা নিয়ন্ত্রনের আনার চেষ্টা করছে।কিন্তু কিছুতেই পারছে না।অর্থ আরো হাইপার হয়ে যায়,
-” কি হলো? বলছো না কেন?কি হয়েছে তোমার?”
এরই মাজে পিছন থেকে হিয়ার গলার আওয়াজ পেলো অর্থ।নিজেকে দ্রুত প্রাহির থেকে একটু দূরে সরালো।তাকিয়ে দেখে হিয়ার হাতে কিছু ফ্রুট্স, ডিম সেদ্ধ,ধোঁয়া উঠা একগ্লাস দুধ ট্রেতে রাখা।
হিয়া টেবিলের উপর ট্রেটা রেখেই অর্থ’র উদ্দেশ্যে বলে,
-” আসলে ভাইয়া প্রাহির শরীরটা ভালো না।একটু অসুস্থ ও।”
অর্থ অস্থির হয়ে উঠলো,
-” অসুস্থ মানে?আমাকে আগে জানাসনি কেন?”
হিয়া বিরক্ত হয়ে বলে,
-” উফ! তুমি প্রাহির থেকেই জেনে নেও আর ওই খাবারগুলো খাইয়ে দিও।আমি গেলাম।”
-“আরে শুনে যা কিরে….!” অর্থকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হিয়া চলে যায়।অর্থ এইবার রেগে যায়।প্রাহির দুবাহু শক্ত করে ধরে ওকে উঠিয়ে বসিয়ে দেয়।শক্ত কন্ঠে বলে,
-” বাচ্চাদের মতো না কেঁদে এটা তো বলবে কি হয়েছে তোমার? ইডিয়ট!”
প্রাহি ভয় পেয়ে যায়।মিনমিনিয়ে এইবার বলে,
-” আ…আমার সেন্সিটিভ টাইম চ..চলছে।”
অর্থ এইবার বুজলো আসল কাহিনি কি।রেগে গিয়ে বলে,
-” এটা বলতে এতোক্ষন লাগে গাধি একটা।মাথামোটা কোথাকার।”
প্রাহি ধমক খেয়ে আরো জোড়ে কান্না করে দেয়।অর্থ আবারও ধমক দেয় ওর এমন কান্না দেখে,
-” চুপ! একটা চটকনা মেরে সব দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদ্দপ মেয়ে।এখন চুপচাপ এইসব খাবার গুলো খাওয়া স্টার্ট করো।আমি হটব্যাগে করে পানি নিয়ে আসছি।আর হ্যা সবার আগে দুধটা খাওয়া যেন হয়।গরম গরম খাবা এতে ভালো লাগবে ওকে।যদি দেখি খাওনি।এক থাপ্পড়ে চাপা ঝুলিয়ে দিবো।”
প্রাহিকে শাষিয়ে অর্থ চলে যায়।প্রাহি না চাইতেও নাক মুখ কুচকে দুধটুকু খেয়ে নেয়।

[অনেকেই বলছেন প্রাহি আর অর্থ’র প্রেমটা একটু বেশি।সমস্যা নেই।আর দু একটা পার্ট হবে হয়তো।তারপরেই ওদের বিচ্ছেদ ঘটবে মেনে নিতে পারবেন তো?দীর্ঘ বিচ্ছেদ কিন্তু।কি বলেন আপনাদের কি মতামত?জানাবেন কিন্তু।যদি আপনাদের মতামতে মত পালটে ফেলি ভাবা যায় না দুঃখিত গল্পের মাজে এসব বলার জন্যে]

কিছুক্ষন পরেই অর্থ চলে আসে।দেখে প্রাহি দুধটুকু খেয়েছে।স্বস্তির নিশ্বাস নেয় অর্থ।তারপর প্রাহির কাছে হটব্যাগটা দিয়ে বলে,
-” এটা দিয়ে তলপেটে সেক দেও।ভালো লাগবে!”
প্রাহি বাধ্য মেয়ের মতো তাই করলো।তারপর অর্থ প্রাহিকে ফল গুলো আর ডিমটা খাইয়ে দেয়।খাওয়া শেষে একটা পেইনকিলারও খাইয়ে দেয়।প্রাহির চোখ ছলছল করছে।এই সময়টা তার জীননে বহুবার এসেছে।ব্যাথায় ও এইভাবেই কাতরাতো।কিন্তু একটিবারও ওর প্রতি ওর মামা মামির কোনরূপ মায়া দয়া হতো না।এই অসহ্য যন্ত্রনা নিয়েই প্রাহির ঘরের সকল কাজ করতে হতো।কি বেদনাদায়ক লাগতো সেইসময় বলে বুজানো যাবে না।অতীত ভাবতেই একফোটা অস্রু গড়িয়ে পড়ে প্রাহির চোখ থেকে।অর্থ জিজ্ঞেস করলো,
-” কাঁদছ কেন?এখনো ব্যাথা করছে পেটে?”
প্রাহি আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।বাচ্চাদের মতো ফুফিয়ে উঠে দ্রুত সহিত ঝাপিয়ে পড়লো অর্থ’র বুকে।দুহাতে অর্থকে শক্তকে জড়িয়ে ধরে ফুফিয়ে কাঁদছে মেয়েটা।এদিকে অর্থ হতভম্ব হয়ে আছে।মেয়েটা হঠাৎ এইভাবে ঝাপিয়ে পড়ায় বোধশূন্য হয়ে যায় ও।অর্থ খানিক বাদে সম্ভীত ফিরে পেতেই নিজেও দুহাতে জড়িয়ে ধরলো প্রাহিকে।আদুরে কন্ঠে বলে,
-” কি হয়েছে বলবে তো?”
প্রাহি কাঁদতে কাঁদতেই বলে,
-” আপনি এতো ভালো কেন?কেন এতো ভালোবাসেন আমাকে।জানেন এইসময়টায় আমি মামা মামির কাছে থাকতে কতোটা কষ্ট করতাম।বাড়ির কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওরা আমায় খাবার দিতো না।এই সময় এমনিতেও আমার খেতে ইচ্ছে করতো না আবার ওরা খাবারও দিতো না।খিদে বসে যেতো তাই আমি আর খেতামও না।এভাবে প্রায় দুদিন চলে যেতো আমি পানি ছাড়া কিছুই খেতাম না।যখন সহ্য করতে না পারতাম খুদা তখন শুধু মরিচ ভর্তা দিয়ে ভাত দিতো মামি।কারন আমি তো ঘরের কাজ ভালোভাবে কর‍তে পারতাম না।কারন আমি যে না খেয়ে থাকতাম শক্তি পাবো কোথা থেকে?খিদে চোটে যা দিতো তাই খেতাম।আর আজ দেখুন এতো এতো খাবার খাবো না বলে আমাকে কিভাবে আপনি খাইয়ে দিচ্ছেন।এতো সুখ কি আমার কপালে থাকবে বলুন।আমি যে বড্ড ভীতু।আমার ভয় করে এতো সুখে থাকলে।মা বাবাকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব।আপনাকে ভালোবাসি কিনা জানি না।তবে আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। আমি পাগল হয়ে যাবো।আপনি আমাকে ছেড়ে কোনদিন যাবেন না অর্থ কোনদিন না।”

আবারও কাঁদতে লাগলো প্রাহি।এদিকে প্রাহির কান্নাজড়িত কন্ঠে উচ্চারিত হওয়া প্রতিটা শব্দ যেন অর্থ’র কলিজায় গিয়ে বিধেছে।তার প্রেয়সী ঠিক কতোটা কষ্টে ছিলো।কতোটা কষ্টের মাজেও নিজেকে বাচিঁয়ে রেখেছে।অন্যথা প্রাহির মতো এই বয়সী মেয়েরা কবেই আত্মত্যাগ করে দিতো।কিন্তু তার প্রাণনাশনী নিজেকে স্ট্রোং রেখেছে।অর্থ’র চোখের কোণেও অস্রুরা ভারি হয়ে উঠছে। অর্থ প্রাহির মুখটা সামনে আনে।তারপর যত্ন করে প্রাহির চোখের জল মুছে দেয়।দুহাতের আজলে প্রাহির মুখটা ধরে ওর কপালে গভীর চুম্বন করে।প্রাহি আবেশে চোখ বন্ধ করে নেয়।অর্থ এইবার বলে,
-” অতীতের কথা ভেবে নিজেকে আর কখনই কষ্ট দিবে না।মনে রাখবে তুমি এখন আমার ভালোবাসা।তোমাকে প্রতিটা মুহূর্তে আমি আগলে রাখবো।আর কখনো দুঃখ পেতে দিবো না।আর রইলো আমার কথা।আমি নিজেও তো তোমায় ছাড়া নিজের অস্তিত্ব ভাবতে পারিনা।তাহলে তোমাকে রেখে কোথায় যাবো আমি বলো।আর তুমি আমাকে না ভালোবাসলেও চলবে।আমার ভালোবাসাই যথেষ্ট।আমি তোমাকে আমার কাছেই রাখবো সারাজীবন।”
প্রাহির ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠে অর্থ’র কথা শুনে।অর্থ প্রাহিকে সুইয়ে দিয়ে বলে,
-” সাবধানে থাকবে ওকে।কিছু লাগলে হিয়া অথবা আম্মুকে ডাক দিও।কাকিমার শরীরটা ভালো না হাটুতে ব্যাথা তাই তাকে ডেকো না ঠিক আছে।সেলিমা খালাকেও ডাকতে পারো।আমি একটু কাজে যাচ্ছি।আমি আসলে আর কাউকে লাগবে না। ঠিক আছে?”
প্রাহি নিশব্দে মাথা নাড়ায়।অর্থ প্রাহির কপালে চুমু দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।রুম হতে বের হতেই মুখটা থমথমে হয়ে যায় অর্থ’র।প্যান্টের পকেটে ক্রমাগত ভাইব্রেড হওয়া ফোনটা বাহির করে দেখে আরাফের কল।অর্থ দ্রুত রিসিভ করে কানে দেয়।ওপাশ থেকে আরাফের অস্থির কন্ঠে,
-” হ্যালো! অর্থ।দরকারি কথা শোন।প্রাহির মামা মামিকে এতো করা গার্ডে রাখার পরেও উনারা উধাও হয়ে গিয়েছে।”
অর্থ ডোন্ট কেয়ার মুড নিয়ে বললো,
-” আমি জানি।ইনফেক্ট আমি নিজেই তো উনাদের৷ পালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছি।”
আরাফ অবাক হয়ে চিল্লিয়ে উঠে,
-” হোয়াট?আর ইউ ম্যাড অর্থ।তুই এটা কিভাবে করতে পারলি?এখন তারা গিয়ে যদি আরো ভয়ানক প্লান বানায় প্রাহিকে কিছু করে বসে।”
অর্থ’র চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।রাগি গলায় বলে,
-” সেটা করার আগে ওদের এই ফাহিয়াশ অর্থ এর সাথে মুখোমুখি হতে হবে।একেকটার ভয়ানক মৃত্যু লিখা আছে এদের কপালে তাও আমার হাতে।শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
আরাফ তুমুল অস্থিরতা নিয়ে বলে,
-” তোর প্লানটা এক্সেক্টলি ঠিক কি বলবি আমাদের?এতো খামখেয়ালি কেন করছিস?”
-” চিন্তা করিস না।আমাদের ডিপুতে রাতে আসছি হেমন্তকে নিয়ে সবটা ক্লিয়ার করবো।”
আরাফ বলে উঠে,
-” সে নাহয় বুজলাম।বাট এতোটুকু তো বল।তুই ওই খচ্চর বুড়োবুড়িকে এতো সহজে পালাতে দিলি কিভাবে?নাহলে আমি শান্তি পাবো না দোস্ত।”
অর্থ বাঁকা হাসলো। বললো,
-” তাহলে শোন……!”
একে একে অর্থ সব বললো আরাফকে। সব শুনে আরাফ ইয়া বড় একটা হা করে বলে,
-” মামা তুই দেখি হিটলারের উপরে হিটলার।আমি সিআইডি অফিসার হয়েও আমার মাথায় এতো বুদ্ধি নাই কেন?”
অর্থ হালকা হাসলো।তারপর আবারও করুন গলায় বলে,
-” তোকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো আরাফ আমি ভেবে পাচ্ছি না।সামনে তোর বিয়ে তাও তুই এই কেসটা নিয়ে উঠেপুটে আমাদের সাথে তদন্ত করতে নেমেছিস।আমি তোর এতো বড় অবদান ভুলবো না।”
আরাফ রেগে যায়।রাগ নিয়ে বলে,
-” ফালতু কথা বললে তোকে এসে ঘারাবো হারামি।আমি তোর বন্ধু হয়ে যদি এটুকু কর‍তে না পারি।তাহলে কি করবো বল।আর তুই আমাকে কি দিবি রে।তুই আমার দুনিয়ার সবচেয়ে বড় চাওয়াটা পূরন করেছিস।নিজের কলিজার টুকরো বোনটাকে সারাজীবনের তরে আমার হাতে তুলে দিয়েছিস।তার কাছে তোর এতোটুকু কাজ তো নিছক কিছুই না।”
অর্থ’র প্রান জুরিয়ে যায়।বললো,
-” আমার কলিজাটাকে দেখে রাখিস ভাই।”
-” ইনশাআল্লাহ। যতোদিন বেঁচে থাকবো।শেষ নিশ্বাস অব্দি ওকে আগলে রাখবো।”
-” আচ্ছা রাখি।ডিপুতে দেখা হবে।”
-” ওকে।”
ফোন কেটে দিতেই অর্থ নিজের কাজে চলে যায়।অপেক্ষা শুধু রাতের প্লানটা সবার সাথে ডিস্কাস করার।

#চলবে____
কেমন হয়েছে জানাবেন।ভুলগুলো ক্ষমা করে তা ধরিয়ে দিবেন।যাতে আমি পরিবর্তীতে তা ঠিক করতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here