প্রেম এসেছিলো নীরবে পর্ব -২০

0
68

#প্রেম_এসেছিলো_নীরবে(২০)
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
রাতের বাস করে সবাই কক্সবাজার যাবে।সেখান থেকেই সেন্টমার্টিন যাবে।সবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে।অনেকেই বাসে উঠে বসেছে।হেমন্ত,আরাফ আর অর্থ জিনিসপত্রগুলো বাসের ডিকিতে রাখছে।প্রাহি বাসের মাঝখানের সারিতে জানালার ধারের সিটে বসে ইয়ারপোড্স দিয়ে গান শুনছে।ওর ভালোলাগছে না কিছুই।কিছুক্ষন যাবত খেয়াল করছে আরাফদের সাথে আসা একটা মেয়ে ওর দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছে।বিষয়টা ওকে চরম বিরক্তি দিচ্ছে।তাই উপায় না পেয়ে গান শুনছে ও ফোনে।মেয়েটা এসে থেকেই ওর দিকে কেমন যেন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে।কি করছে প্রাহি এই মেয়েকে?এই মেয়েকে তো প্রাহি চিনেও না।তাহলে?এমন কেন সবাই?ওর সাথে কেন এমন করে?ও কি এতোই খারাপ যে মানুষ ওকে ঘৃনার নজরে দেখে।ও তো সবসময় সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে।আর সবাই যেন ভালো থাকে সেই দোয়া করে।লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।এর মাজেই প্রাহির পাশে থপ করে ওর পাশে কেউ বসে পড়লো।প্রাহি তাকিয়ে দেখে অর্থ বসে আছে আর ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।প্রাহি মাথা নিচু করে ফেলে।অর্থ ভ্রু উচু করলো,
-” কি হয়েছে?”
প্রাহি কাচুমাচু স্বরে উত্তর দেয়,
-” কি হবে?”
-” আমি সেটাই কুয়েশ্চেন করেছি এন্ড তোমাকে আন্সার দিতে বলছি।উলটো আমাকে কুয়েশ্চেন করতে বলিনি।এখন ডিরেক্টলি বলো কি হয়েছে?”
প্রাহি আমতা আমতা করছে।অর্থ এইবার ধমকে বলে,
-“এই মেয়ে বলছো না কেন?”
প্রাহি ধমক খেয়ে প্রায় সিট থেকে উড়ে যাওয়ার উপক্রম।ও এইবার অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে,
-” আমার ভালো লাগছে না।”
অর্থ ভ্রু-কুচকে বলে,
-” কেন?”
প্রাহি আশেপাশে চোখ বুলালো।দেখে অন্যসারির সিট থেকে মেয়েটা এখনো ওর দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।প্রাহি বললো,
-” আমাদের বরাবর ওই পাশের সাড়িতে যে মেয়েটা বসেছে ও কে?”
অর্থ কপালে ভাজ ফেলে ওদের বরাবর পাশের সিটে তাকায়, দেখতে পায় আরাফের চাচাতো বোন ইলফা বসে আছে।ওর ভ্রুজোড়া আরো কুচকে আবার প্রাহির দিকে ফিরে বলে,
-” ও আরাফের বোন ইলফা।সেদিন যে ওদের বিয়ের কথাবার্তা চলার সময় আরাফের চাচিকে দেখেছিলে না?তার মেয়ে।কেন কি হয়েছে?”
প্রাহি মাথা নিচু করে বলে,
-” আসছে থেকে আবার দিকে কিভাবে যেন তাকাচ্ছে।মনে হয় আমাকে তার চোখ দিয়েই ভষ্ম করে দিবে।আমি কি করেছি উনি এইভাবে তাকাচ্ছেন কেন?”
অর্থ এইবার গম্ভীর স্বরে বললো,
-” হাইপার হবা না ওকে।আমি আছি তো তোমার সাথে।কিছু হবে না তোমার।আসলে আরাফের সাথে বন্ধুত্ব আমার অনেক দিনের।আমরা তো এব্রোড ছিলাম তাই ওদের ফ্যামিলির বেশি কেউ আমাকে দেখেনি।ইনফেক্ট বিদেশ যাওয়ার পর কারো সাথে ভিডিও কলে কথা বলিনি ওদের বাড়ির মানুষদের সাথে।কিন্তু হিয়ার যখন এংগেজমেন্ট করালাম সেখানেই ইলফার সাথে পরিচয় হয়।আর ওইখান থেকেই মেয়েটা আমার পিছনে পরে আছে।মানে ইউ নো নাহ্ আমাকে লাইক করে।ওর মাও চায় তার মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিতে।বাট সি ইজ আ ক্যারেক্টারল্যাস গার্ল।ইনফেক্ট আই ডোন্ট লাইক হার এট ওল।শুধু আত্মীয়তার খাতিরে সহ্য করতে হয়।আমার সাথে অনেকবার জোড়াজুড়ি করেছিলো রিলেশনে যাওয়ার জন্যে।বাট তখন আমার এমন একটা বয়স যে আমি পুরোপুরি বদলে গিয়েছে ওসব রিলেশন, প্রেমের প্রতি আমার কোন ইন্টেরেস্ট ছিলো না।মানে আগেও ছিলো না।বাট বাহিরের দেশের কালচার ইউ নো।ইউনিভার্সিটিতে থাকা কালিন দু চারটা করেছিলাম।বাট গ্রানি মারা যাবার পর আর কখনো ওসবের ধারে কাছেও যায়নি।”
কথাগুলো বলে প্রাহির দিকে তাকিয়ে দেখে প্রাহি ওর দিকে চোখ ছোট ছোট করে ঠোঁট উলটে তাকিয়ে আছে।অর্থ হঠাৎ প্রাহির এমন রিয়েকশন দেখে ও কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।বললো,
-” কি ফেস রিয়েকশন এতো উইয়ার্ড কেন?”
প্রাহি কাঁদো গলায় বলে,
-” আপনি প্রেম করেছেন?তাও দু চারটে?”
অর্থ অবাক হয়ে বললো,
-” হ্যা তো?এমন করছো কেন?”
-” প্রেম যেহেতু করেছেন সেইসব নাউযুবিল্লাহ কাজও নিশ্চয়ই করেছেন?”
প্রাহির এরূপ কথায় অর্থ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-” কেন কি হয়েছে?এটা আবার কেমন কথা?”
-” সেটা জিজ্ঞেস করেছি উত্তর দিন না?”
অর্থ শান্ত চোখে প্রাহির দিকে তাকায়।তারপর ওর গালে একটা হাত রেখে বলে,
-” আমাকে এতোটাও খারাপ ভেবো না।যে আমি মেয়েদের সাথে ওইসব করবো।আরে আমি যাদের ভালোই বাসতাম না তাদের স্পর্শ করবো কিভাবে?আমি সেসব জীবনেও করিনি।”
একটু থেকে তারপর অবাক হয়ে প্রাহির দিকে তাকিয়ে বলে,
-” ওয়ান মিনিট?তুমি এইসব কিভাবে জানো যে প্রেম করলেই সেসব করে।”
প্রাহি একটু ভাব নিয়ে বলে,
-” ইসস, আমি জানি হ্যা।আমার আগের স্কুলের অনেক বান্ধবীরা প্রেম করতো।আর ওরা আমাকে বলতো ওদের বয়ফ্রেন্ডরা ওদের অনেক আদর করে।”
অর্থ এইগুলো শুনে রেগে যায়।বললো,
-” তুই ওরকম খারাপ মেয়েদের সাথে চলতে কেন?”
-“আরে তেমন ফ্রেন্ড না।মানে একক্লাসে পড়তাম একটু আধটু তো কথা হতো তাই না।ওই সময় বলতো।”
অর্থ একটু মজা নেওয়ার জন্যে বললো,
-” আচ্ছা প্রাহি তুমি কেন জিজ্ঞেস করলে আমি কোন মেয়ের সাথে খারাপ কিছু করেছি নাকি।আমি কিছুই করেনি।তারপরেও যদি ধরো করলাম। তাহলে তোমার কি?তুমি তো আমাকে ভালোবাসো না।তো?”
অর্থ দুষ্টু হেসে ভ্রু নাচালো।প্রাহি এইবার নিজেই ফেসে গেলো। কি বলবে ও?আচ্ছা, ও কি সত্যিই অর্থকে ভালোবাসে?ভালো না বাসলে অর্থকে নিয়ে এতো ইন্সিকিউর ফিল কেন করে?কেন অর্থ যখন বললো ও অনেক প্রেম করেছে তা শুনে ওর বুকের বাপাশে একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তবে কি সত্যিই ও ভালোবেসে ফেলেছে অর্থকে।হ্যা,ভালোবাসে ও অর্থকে।ভালোবাসে।কিন্তু এই কথা তো ও মুখে কোনদিন বলতে পারবে না।ও তো লজ্জায় নির্ঘাত হার্ট এট্যাক করে মারা যাবে।এটা তো জীবনেও বলতে পারবে না।এখনি প্রাহির লজ্জায় গালফুলো গরম হয়ে গিয়েছে।অর্থ শীতল কন্ঠে বললো,
-” কি হলো লজ্জা পাচ্ছো কেন?আমি কি এখানে লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু বলেছি?”
প্রাহি নিজেকে সামলে নিয়ে কপালে ভাজ ফেলে বলে,
-” আপনি একটা পাষাণ লোক।কথা বলবেন না আমার সাথে।”
মুখ ফুলিয়ে কথাগুলো বলে অন্যদিকে ফিরে চাপা হাসি দিলো প্রাহি।অর্থ এইবার হেচকা টানে প্রাহিকে নিজের দিক ঘুরিয়ে আনে।বাঁকা হেসে বলে,
-” নিজেকে কি অনেক চালাক ভাবো?মানে আমি কিছু বুজি না?কথা ঘুরানোর ভালো টেকনিক ইউজ করলা!”
প্রাহি ছোট করে জীভে কামড় দেয়।ইসস,ধরা পড়ে গেলো।প্রাহি এইবার জোড়পূর্বক হেসে অর্থর দিকে তাকালো।অর্থ প্রাহির গাল টেনে দিয়ে হেসে বলে,
-” ইউ আর সো কিউট প্রাহি।আ’ম জাস্ট ব্যাডলি লাভ ইউথ ইউ।”
প্রাহির এইবার এমনভাবে লজ্জা পেলো কথাটা শুনে ও সাথে সাথে অন্যদিকে ফিরে গেলো।ইসস,শেষ কথাগুলো শুনে এখনো ওর বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করছে।লোকটা ওকে এতো লজ্জা দেয় কেন?পাশ থেকে অর্থ’র হাসির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সেই হাস্যজ্জ্বল মুখটা প্রাহির বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু প্রাহি তাকাবে না।একটুও তাকাবে না লোকটার দিকে।অর্থ হাসি থামিয়ে সিটে গা এলিয়ে দিলো।বাস চলতে শুরু করে দিয়েছে অনেক আগেই।বাসের লাট্সগুলোও ওফ।জানালা হালকা করে একটু খুলে দেওয়া সেখান থেকে বাতাস আসছে আর বাতাসে প্রাহির চুলগুলো এলোমেলো উড়ে এসে অর্থ’র চোখেমুখে বারি খাচ্ছে।অর্থ চোখ বুজে তা উপভোগ করছে।ইসস,সমটা যদি থেমে যেতো পারতো ও আর প্রাহি সারাজীবন এইভাবেই একে-অপরের সাথে থাকতো।অর্থ’র কাছে অপেক্ষা করাটা ভীষন দুষ্কর হয়ে পড়েছে।এই মেয়েটাকে ছাড়া এখন আর একমুহূর্তও ওর ভালো লাগে না।অর্থ চোখ বুজে একটা কবিতা বললো,

ভালোবাসা কি বয়স মানে?
কিংবা প্রতিবন্ধকতা?
ভালোবাসা ভালোবাসতে জানে;
কিসের এতো জড়তা?
সময়ের সাথে বাড়লে বয়স,
কমবে প্রেম কে বলেছে?
বৃদ্ধ বেলায়- কথা সরস;
আদিখ্যেতা! কে জেনেছে?
পাকা চুলেও হয় যে খোপা; বেনির গাথুনি-
পাঞ্জাবিতেও লুকনো যায় গাজরা, ফুলের রানী।
ঘামের বিন্দু মুছে আজও বিবর্ণ আচল,
শখ করে আনাও যায় আলতা আর কাজল।
বৃদ্ধ বুকে শ্রান্তি খুজে, বৃদ্ধার আলিঙ্গন,
দুজনেই নীড় খুজে পাই, ছাপিয়ে সকল মহারন।
যুবককালে কদমে কদম যেমন রাখা যায়,
বাড়লে বয়স কদমরা সব ঠিকানা খুজে পায়।
দেহ-মনের সৌন্দর্য সব বয়সে বাড়ে,
অনুভূতির পরিপক্বতা হৃদয় জুড়ে-
ভালোবাসা নেই যে বয়স, নেই যে জড়তা
খাটি ভালোবাসায় মেলে সকল পূর্নতা।

~~~~ভালোবাসার পূর্ণতা
লিখেছেনঃ সাকিসেফ উম্মে ফাতেমা
#চলবে______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here